বোকা ভূতের কারনামা

শতরূপা সেনগুপ্ত

অনেক দিন আগে চঞ্চলনগরে ছিল এক ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী এবং তাদের এক ছোটো ছেলে। ব্রাহ্মণ সেই নগরেরই এক মন্দিরের সেবাইত ছিল এবং মন্দিরের যাবতীয় কাজকর্ম সে-ই দেখত। ব্রাহ্মণী তাকে সাহায্য করত মানে ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে ফুলগাছ থেকে ফুল তুলে ভক্তিভরে মালা গেঁথে ব্রাহ্মণের হাতে দিত; এ ছাড়া মন্দিরে সেঠাকুর-সাজানো, চন্দন ঘষা, পুজোর আয়োজন করা—এইসব কাজ করত। এইভাবেই তারা জীবনযাপন করত। তারা গরিব ছিল ঠিকই তবে তাদের সংসারে সুখশান্তি ছিল। তা ছাড়া তারা দারুণ ঈশ্বরের ভক্ত ছিল আর ভক্তের সংসারে যে ঈশ্বর বাসা বঁাধেন এ আর কার অজানা? তারা দুজনে মন্দির থেকে যা পারিশ্রমিক পেত তাতে তাদের পক্ষে সংসার-চালানো ক্রমশই খুব কষ্টকর হতে লাগল। ব্রাহ্মণী প্রায়ই তার স্বামীর কাছে এই ব্যাপারে অভিযোগ জানাত, ঘ্যানঘ্যান করত ও তার নিজের দুর্ভাগ্যের দোষ দিত। সে বলত, বাপের বাড়ি থাকতে সে তবুও ঠিকভাবে খেতে-পরতে পেত কিন্তু এখন আর তাও হয় না। এই ধরনের কথা ব্রাহ্মণ শুনত, মনে দুঃখও পেত কিন্তু সত্যিই তার কিছু করবার ছিল না বলে সে কোনো উত্তর দিত না। কিন্তু সব মানুষেরই ধৈর্যের একটা সীমা থাকে, তাই বার বার এই নালিশ শুনতে শুনতে নিজের প্রতি তার খুব ধিক্কার লাগল এবং পৌরুষেও আঘাত লাগল। ব্রাহ্মণ একদিন রেগে গিয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল যে সে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে এবং যতদিন না সে প্রচুর পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে ততদিন সে কোনোমতেই বাড়িমুখো হবে না বা ছেলে-বউয়ের সামনে এসে দাঁড়াবে না। এই ভেবে সেইদিনই রাতের অন্ধকারে একটি ঝুলিতে তার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি নিয়ে সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে বিছানা খালি দেখে ব্রাহ্মণী চিৎকার করে হা-হুতাশ করতে লাগল। কেন মরতে সে ব্রাহ্মণকে কটুকথা শুনিয়েছে এই বলে বুক চাপড়ে চাপড়ে সে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করতে লাগল। কিন্তু কথা একবার মুখ থেকে বেরিয়ে গেলে তো তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না, তাই শুধুমাত্র বিলাপ করা ও কাঁদা ছাড়া তার আর কোনো উপায় রইল না।

এদিকে ব্রাহ্মণের কী মজার ব্যাপার ঘটল এবার তা তোমরা শোনো। ব্রাহ্মণের ঘটনাটা থেকে আর একবার প্রমাণ হয়ে গেল যে সৎ লোকের সঙ্গে ঈশ্বর সর্বদাই থাকেন। ঘটনাটা এবার বলি।

ব্রাহ্মণ ঘুরছে মনের দুঃখে। বউ-ছেলেকে ঠিকমতো খেতে-পরতে দিতে না পারার দুঃখ তার মনে শেলের মতো বিঁধছে। কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে সেই তার একমাত্র চিন্তা। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে এক বিরাট স্বচ্ছ জলের পুকুরের সামনে এসে একটি অশ্বত্থ গাছে হেলান দিয়ে সে বসল। পুকুরের স্বচ্ছ টলমলে ঠাণ্ডা জলে মুখ-হাত ধুয়ে সে কিছুটা সুস্থ বোধ করল। এখন হয়েছে কী, ওই অশ্বত্থ গাছে ছিল একটা ভূতের বাসা। সেখানে সাত জন ভূত থাকত। গাছের গোড়ায় একটা মানুষকে বসে থাকতে দেখে তারা আর লোভ সামলাতে পারল না; ব্রাহ্মণের সবেমাত্র যখন একটু তন্দ্রা এসেছে তখন মুলোর মতো কান আর কুলোর মতো দাঁত নিয়ে সদলবলে তারা গাছ থেকে নামল ব্রাহ্মণের ঘাড় মটকাবার জন্যে। নাকি নাকি গলায় কালো কালো হাত-পা নেড়ে ভূতের লিডার বলল, ‘কেঁ রেঁ তুঁই আমাদের বিঁরক্ত কঁরতে এঁসেছিস?

আঁয় তোঁর ঘাঁড় মঁটকাই।’ ব্রাহ্মণ তো একেবারেই হতবাক, সে বেচারি বুঝতেই পারল যে সে ভূতের হাতে পড়েছে। তবে তার খুব উপস্থিত বুদ্ধি ছিল আর সে খুব সাহসীও ছিল। তাই বিন্দুমাত্র ঘাবড়ে না গিয়ে সেকী করল শুনবে তোমরা? তার ঝোলায় যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল তারমধ্যে দাড়ি কামাবার সরঞ্জামের মধ্যে একটি ছোটো আয়না ছিল। সেসেটিকে বার করে বলল, ‘আরে! আরে! এই গাছেই তোরা থাকিস নাকি? তবে তো আমার ভালোই হল। তা তোরা কজন রে? দেখ দেখ তোদের মতো কতজন ভূতকে আমি আমার ঝোলায় পুরেছি। বলে আরশিটা তার সামনে ধরল। এদিকে তোমরা জান বোধ হয় যে ভূতেরা সচরাচর খুব বোকা হয়, তাদের যা বোঝানো হবে তা-ই তারা বুঝবে। আরশিতে নিজের চেহারা দেখে ভূতের লিডার ভাবল, আরে এ তো দেখছি আর একটা ভূত। তখন ভূতকে ভয় পেতে দেখে ব্রাহ্মণ আবার বলল, ‘আরও দেখবি? তবে পেছন ঘোর।’ পেছন ঘুরে পুকুরের স্বচ্ছ জলে নিজের ছায়া দেখে ভূতটা ভাবল ওটা বুঝি আর একটা ভূত হবে। তখন ব্রাহ্মণের কাছে প্রচন্ড কাকুতিমিনতি করে ভূত বলল, ‘আঁজ্ঞে আঁমাদের আঁপনি ধঁরবেন নাঁ বঁাবা, আঁপনি যাঁ চাঁইবেন তাঁই আঁমরা দেঁব কিঁন্তু আঁমাদের ঝোঁলায় পুঁরবেন নাঁ।’ ব্রাহ্মণ দেখল এই সুযোগ, ভূতকে যখন সে কবজা করে ফেলেছে তখন তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়াই উচিত হবে। তাই ব্রাহ্মণ বলল, ‘বটে? তবে শোন এক্ষুনি আমায় রাশ রাশ মোহর এনে দে আর আমার বাড়ির গোলায় ধান ভরতি করে দে। কিন্তু খবরদার পালাবার চেষ্টা করবি না।’ একথা শুনে ভূত দৌড়ে গিয়ে একটা ছোটো ছাগল নিয়ে এল।

‘এ দিয়ে আমি কী করব?’

C-ব্রাহ্মণের সবেমাত্র যখন একটু তন্দ্রা এসেছে তখন মুলোর মতো কান আর কুলোর মতো দাঁত নিয়ে...

ভূতটা বলল, মঁহাশয়, যঁখনই আঁপনার টাঁকাপয়সার দঁরকার হঁবে তঁখনই এঁই ছাঁগলের গাঁয়ে কুঁতুকুঁতু দেঁবেন, ছাঁগল হাঁসবে আঁর তাঁর মুঁখ দিঁয়ে অঁজস্র মোঁহর ঝঁরে পঁড়বে।

‘বটে? তবে বার কর তো একঘড়া মোহর।’

ভূতটা ছাগলকে সুড়সুড়ি দিল, ছাগল হা-হা করে হাসল আর সত্যিই অনেক মোহর বার হল তার মুখ থেকে। ব্রাহ্মণ এই দেখে তো মহা খুশি, তবে চালাকি করে মুখে সে সেটিকে প্রকাশ করল না। বরং বলল, ‘আমার গোলাটা রাতের মধ্যে যেন ধানে ভরে যায় খেয়াল রাখিস। নয়তো আমি তোদের কিছুতেই ছেড়ে দেব না, তোদের সব ক-টাকে ঝোলায় পুরব।’

‘নাঁ নাঁ বঁাবা, এঁই আঁমি যাঁচ্ছি আঁপনার আঁদেশ পাঁলন কঁরতে।’

এদিকে সারাদিন সারারাত কেঁদে কেঁদে তো ব্রাহ্মণীর চোখ ফুলে গিয়েছে। এমন সময় ব্রাহ্মণকে হাসিমুখে আসতে দেখে অবাক হয়ে কান্না থামিয়ে সে তাড়াতাড়ি স্বামীর কাছে গেল। তারপর ঘড়া-ভরতি মোহর দেখে তো ব্রাহ্মণীর চোখ কপালে ওঠবার জোগাড়। মোহর কোথা থেকে এল, সেসব শুনেটুনে মোহর-ঝরে-পড়া ছাগলটাকে ব্রাহ্মণী খুব আদর করল এবং ছাগলের সেবাযত্নের জন্য সেতৎপর হয়ে পড়ল। এর ওপর আবার ধান-ভরতি গোলা দেখে তো ব্রাহ্মণীর সুখের আর অন্ত রইল না। আর তারপর তো তোমরা বুঝতেই পারছ; অতি সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে তারা বাকি জীবন কাটিয়ে দিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%