শতরূপা সেনগুপ্ত
ঝাঁ ঝাঁ করা দুপুরেতে একা শুয়ে তেতলাতে
খালি খালি খিদে পায় কেন রে?
একলা একলা শুয়ে থাকলে, মানে যখন করবার কিছু থাকে না, তখন তোমাদের খালি খালি খিদে পায় না? পায় তো? আমার তো খিদে পায়। এখন মিন্টু আর ঝন্টুর হয়েছে সেই অবস্থা। সারা বাড়ি ত্যাগ করে শেষপর্যন্ত এখন তারা তিন-তলার ছাদের চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে এবং খাটে লম্বা হয়ে শুয়ে ওপরের কড়িকাঠ গুনছে। কেন এমনটা হল? আচ্ছা শোনো তবে কারণটা।
রাস্তা থেকে এসে মিন্টুদের পিসেমশাই তাঁর হাতঘড়িটা নাকি সামনের টেবিলের ওপর রেখেছিলেন পরে আলমারিতে তুলবেন বলে, কিন্তু এখন সারাবাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও সেটিকে পাওয়া যাচ্ছে না। ভুলো পিসেমশাইয়ের সঙ্গে এইরকম ঘটনা বেশ কয়েক বারই ঘটেছে। পরে সেটি অন্য জায়গা থেকে পাওয়াও গিয়েছে। যাইহোক, এইবার সারাবাড়িতে যখন খোঁজ খোঁজ রব উঠেছে তখন ঝন্টু বেচারি বলে ফেলেছিল যে, পিসের তো এরকম ভুল হয়েই থাকে, দ্যাখো হয়তো অন্য কোথাও থেকে পাওয়া যাবে।
ব্যাস আর যায় কোথা, ‘বড়োদের মুখে মুখে কথা, এই শিক্ষাদীক্ষা হচ্ছে?’ তাই সকলে এখন মিন্টু-ঝিন্টুকেই সন্দেহ করছে আর সেই রাগেই ওরা দুজন আশ্রয় নিল চিলেকোঠার ঘরে। আর ঠিক করল বড়োরা সব ওদের খুঁজুক, শত ডাকাডাকিতেও ওরা আর সাড়া দেবে না যতক্ষণ ঘড়ি না পাওয়া যায়।
কিন্তু পেটের রাক্ষসটা তো আর সেকথা শুনবে না, তারা কিছুক্ষণ অন্তর অন্তরই তাদের খোঁচা মারতে লাগল। ঝন্টু পেটে হাত দিয়ে বলল, ও দাদা, আর তো পারছি না, রান্নাঘর থেকে রসগোল্লার হাঁড়িটা নিয়ে এলে হত আসবার সময়।
‘দুর বোকা, রসগোল্লা খেলে তো বার বার জলতেষ্টা পাবে। তখন জল পাব কী করে? তার থেকে এখন চুপটি মেরে শুয়ে থাক, দুপুর বেলা সব নিস্তব্ধ হয়ে গেলে তোর ব্যবস্থা করতে উঠব ক্ষণ।’ মিন্টু গম্ভীর গলায় বলল।
এমনসময় শোনা গেল— ‘ও মিন্টু... ও ঝন্টু ... চক্ষের নিমেষে তোরা সব কে কোথায় গেলি রে...?’
এ বাবা, এ তো ঠাম্মার গলা! কিন্তু না, মিন্টুরা কিছুতেই সে-ডাকে সাড়া দেবে না। তবে ছাদের ঘর থেকে বেশ বোঝা গেল যে নীচে তাদের নিয়ে খোঁজাখুঁজি চলছে।
মিন্টু বলল, ঝন্টু ভাইটি, চুপ করে শুয়ে থাক, উঠিস না, খুঁজতে দে ওদের।
‘কিন্তু বড়ো খিদে পাচ্ছে যে, বেলার দিকে ফল, বিস্কুট, চকোলেট সব খাই-না?’
‘সেতো বুঝলাম ভাই, খিদে তো আমারও পাচ্ছে কিন্তু কী করব? আমরা ছোটো বলে বড়োরা সবসময় আমাদের সন্দেহ করবে কেন? আমাদের কি মনপ্রাণ নেই?’
‘দাদা, ওই দ্যাখো সামনে ...’
দুই ভাই জুলজুল চোখে দেখল, সামনের র্যাকে পর পর কয়েকটা আচারের শিশি সাজানো রয়েছে—কুলের আচার, তেঁতুলের আচার, আমের আচার। মিন্টু এবার বলল, ‘তবে ভগবান আছেন রে ঝন্টু। চল আচারই খাই গিয়ে।’ বলে দু-ভাই এক খাবলা করে কুলের আচার নিয়ে খেতে বসল।
‘এ নিশ্চয় ঠাম্মার করা আচার। বলো দাদা?’
‘হুঁ, তার মানে ঠাম্মার আচারের ভাড়ার এই ঘরেই থাকে। না কি ভগবান জেনে ফেলেছেন যে এই ঘরেই আমরা আস্তানা গাড়ব তাই এঘরে এইগুলোকে রাখিয়ে দিয়েছেন ঠাম্মাকে দিয়ে?’
যাইহোক অত্যন্ত পরিতৃপ্তি করে আচার খেয়ে আবার লম্বা হয়ে চলল তাদের কড়িকাঠ গোনা।
এরপর দুপুর সাড়ে তিনটের সময় যখন চারিদিক সব নিজঝুম, নিস্তব্ধ ও শুনশান হয়ে গেছে তখন মিন্টু উঠে গুটিগুটি পায়ে আস্তে করে ঘরের ছিটকিনি খুলে পা টিপে টিপে গেল নীচে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল কেউ কোথাও নেই, সব যে যার ঘরে চলে গেছে। নিশ্চিন্ত হয়ে সে রান্নাঘরের দিকে এগোল। সামনেই রাখা ছিল হাঁড়িটা, সেটা জাপটে ধরে আর একটা জলের বোতল নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে সে ওপরে উঠতে যাবে, এমন সময় কোনো একটা ঘর থেকে ঠাম্মা ও পিসের কথা বলার আওয়াজ সেশুনল। যাইহোক একটু জোরে পা চালিয়ে মিন্টু ওপরে উঠে গেল। ঘরের দরজা বন্ধ করে দু-ভাই সাবাড় করল রসগোল্লার হাঁড়ি, তারপর খেল একপেট জল। ওই হল তাদের লাঞ্চ।
সন্ধ্যা বেলায় ঠাকুমার কান্নার আওয়াজে তাদের ঘুম ভাঙল। ‘ওরে কী হবে রে, দু-দুটো আস্ত ছেলে কোথায় উবে গেল রে... বাছারা আমার কাছে আচার খেতে চেয়েছিল... কিন্তু তোরা কোথায় গেলি বাপ... নাহয় একটু বকাবকিই করা হয়েছিল... তার শোধ কি এইভাবে তুলতে হয়?... ভগবান! এও দেখবার জন্য তুমি আমায় বঁাচিয়ে রেখেছ?’ ইত্যাদি।
এদিকে মিন্টুদের মা খুব মাথাঠাণ্ডাওয়ালা মহিলা। তিনি জানেন যে বিপদের সময় মাথা গরম করলে কোন সমস্যারই সমাধান হয় না। তিনি ভাবলেন সত্যি তাদের কাছে টাকাপয়সাও নেই আর এ পাড়ায় তাদের কোনো বন্ধুটন্ধুও নেই, তবে তারা যাবে কোথায়?
এমন সময় চিলেকোঠার ঘরের দরজায় শোনা গেল ঠক ঠক ঠক!
দাদাকে জড়িয়ে ধরে ঝন্টু বলল, ‘ও দাদা, ভূ...ত’
‘দুর বোকা ছেলে, ভূত বলে কিছু আছে নাকি? তোদের স্কুলে এই পড়ায় বুঝি? নিশ্চয় কোনো দমকা হাওয়া ধাক্কা দিচ্ছে দরজায়। পুরোনো দিনের দরজা তো, দুর্বল হয়ে গেছে।’
‘না দাদা, আমি গল্পে পড়েছি যে চিলেকোঠার ঘরে ভূত থাকে।’
‘না না, ওসব কিছু নয়, আমি তো আছি, আমাকে তোর ভরসা নেই?’ কিন্তু যে বলছে তার কি সত্যি একটুও ভয় করছে না? সে কতই-বা বড়ো ঝন্টুর থেকে। একজন তো ক্লাস ফাইভ, আর একজন ক্লাস সেভেন। তাই কে কাকে ভরসা করবে বলো তো? এদিকে বেশ সন্ধে অন্ধকারও ঘনিয়ে এসেছে। মিন্টু ভাবল সত্যি এখন যদি লোডশেডিং হয়, এখানে তো টর্চও নেই আর ইনভার্টার তো নীচে আছে, সেখানের আলো তো এখানে পৌঁছোবেই না, দরজাই তো বন্ধ। আলোটাও কাঁপছে। তবে? না, মিন্টুর ভয় পেলে আর ঝন্টুকে সামলানো যাবে না। আবার ঠক ঠক ঠক!
‘দাদা গো, হাওয়া হলে গুনে গুনে তিন বার ধাক্কা দিয়ে থেমে যাচ্ছে কেন?’
মিন্টু দেখল ঝন্টুর কথার সত্যি যুক্তি আছে তো! এবার ওরও একটা অজানা ভয় ঢুকল মনের মধ্যে। এ কীসের আওয়াজ? ব্যাস যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়— চলে গেল কারেন্ট, সব অন্ধকার।
ঠক ঠক ঠক।
‘ও দাদা তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেয়ো না।’
‘এক কাজ কর ভাই। তুই বরং আমার কোমরটা জড়িয়ে ধরে আমার পিছু পিছু আয়, আমি আস্তে আস্তে দরজাটা খুলি, ভয় নেই রে এখন এদিকে কেউ আসবে না।’
ঝন্টু দাদার কোমর জাপটে ধরল। গুটিগুটি পায়ে দুই ভাই এগোতে লাগল দরজা খোলার জন্য। ঝন্টু জপ করতে লাগল —
ভূত আমার পুত শাঁকচুন্নি আমার ঝি
রাম-লক্ষ্মণ বুকে আছেন করবে আমার কী।
যাইহোক কাঁপা কাঁপা হাতে মিন্টুও রামনাম করতে করতে ছিটকিনিটা খুলল। খুলে দেখল কী বলো তো? সাদা শাড়ি পরা আবছা এক ছায়ামূর্তি। ‘ও বাবা গো...’ বলে এবার দুই ভাই পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল। এ কী, শাঁকচুন্নি না অন্য কিছু? এখন ছায়ামূর্তিটাই মিন্টুদের দিকে টর্চের আলো ফেলল। চোখ ধাঁধিয়ে গেল। অতি সন্তর্পণে আস্তে আস্তে চোখ খুলে তারা যা দেখল তা আর বলবার মতো নয়। দেখল কী জান? স্বয়ং মা দাঁড়িয়ে রয়েছেন টর্চ হাতে, পরনে হালকা নীল শাড়ি, অন্ধকারে যেটা সাদা বলে মনে হচ্ছিল। আর কথাটি নয়, ঝন্টু ছোটো ছেলে সেছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।

C-ছায়ামূর্তিটা মিন্টুদের দিকে টর্চের আলো ফেলল
‘ও মা! দুষ্টু দুটো তোরা এখানে ছিলি? কিন্তু কেন? তাই বলি, যাবে কোথায়, কিন্তু এখানে তো কোনো খাবারই নেই, সারা দিনটা কাটালি কী করে? আয় আয় তোদের জন্য নীচে সবাই খুব চিন্তা করছে, ঠাম্মা তো কান্নাকাটিই করছেন। চল রাতের ডিনারটা অন্তত ভালো করে খাবি আয়। শুধু রসগোল্লায় কি আর পেট ভরে?’
‘ও মা, তুমি বুঝলে কী করে আমরা রসগোল্লা খেয়েছি? আর আমরা এখানেই আছি?’
‘ধরলাম তখনই, যখন দেখলাম সারা বাড়িটাই রসে চটচট করছে আর রান্নাঘরেও হাঁড়িটা নেই। আরে বাবা সেই রসই তো পথ দেখিয়ে আমাকে এখানে আনল। তবে শোন, কোনো কিছু লুকিয়ে করলে না তার প্রমাণটাও লোপাট করতে হয়, তাও জানিস না? সামনে ওটা কী?’ দুই ভাই তাকাতাকি করে টর্চের আলোতে দেখল রসের খালি হাঁড়িটা ঘরের মাঝখানে বসানো রয়েছে।
কী আর করা, এবার মায়েরই পেছু পেছু অনুসরণ করল তারা। তাদের প্রতিজ্ঞা রক্ষা আর হল না।
‘সাবধানে নামবি, সিঁড়িতেও রস পড়েছে।’
নীচে আসার পর তাদের নিয়ে দারুণ হইচই পড়ে গেল, তাদের দেখে সকলের আনন্দ উপচে পড়ল। যারা এতক্ষণ রামনাম জপছিল তারা সত্যি রাম-লক্ষ্মণের মতোই বনবাস থেকে ফিরে এল ইনভার্টারের ঝলমলে আলোর মধ্যে। অন্ধকারের পর আলোয় এসে তারা হাঁফ ছেড়ে বঁাচল, আর বঁাচলেন পিসেমশাই; তাঁর জন্যই তো ঘটল এতসব অঘটন, তাই লজ্জা হবে না? তিনি বার বার বললেন যে অকারণে পুরোটা না দেখে সন্দেহ করবার জন্য তিনি খুবই লজ্জিত, দুঃখিত ও অনুতপ্ত। আসলে তিনি ভেবেছিলেন যে ঘড়িটা টেবিলে রেখেছেন, কিন্তু রেখেছিলেন আলমারির ভেতর। বোঝো ব্যাপার। তবে তো ঝন্টুর কথাই ঠিক হল, তাই না? তাই বলি খুদে বন্ধুরা এবার তোমরাই বিচার করো—এত যে কান্ড ঘটল এরমধ্যে আসল ভুলটা কার, আসল কালপ্রিটটা কে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন