ডাকাত

শতরূপা সেনগুপ্ত

পানু হল ছোটকার আজন্মকালের বন্ধু বা উলটো করেও বলা যায় যে ছোটকা হল পানুর একমেবাদ্বিতীয়ম বন্ধু। সম্পর্কে ছোটোকাকা হলেও, বয়েসটাতে তো খুব-একটা কিছু তফাত নেই, তাই যা মনপ্রাণের কথা— তার সবই পানু তার ছোটকাকে বলে। পানুর বাবারা তিন ভাই— সিদ্ধেশ্বর, রামেশ্বর ও প্রাণেশ্বর; তাই ছোটকা প্রাণেশ্বরের কাছে পানু যে প্রাণের সব কথাই খুলে বলবে তাতে আর আশ্চর্য কী আছে? ছোটকাও ভাইপোর কথা মন দিয়ে শোনে ও যথাসাধ্য চেষ্টা করে সঠিক উত্তর দেবার। কাউকে যদি কিছু পরামর্শ বা উপদেশ দেওয়া যায়, তবে নিজেকে কেমন একটা বড়ো বড়ো মনে হয় না? একজন একটা-কিছু জানতে চাইছে আমার কাছে আর আমি সেটা তাকে বোঝাচ্ছি, এটাতেই তো একটু গর্ব গর্ব ভাব লাগে তাই না? নিজেকে বেশ শিক্ষক শিক্ষক লাগে।

গতকাল সন্ধ্যা বেলা পড়ার শেষে পানু ছোটকাকে বলল, ‘ও ছোটকা, জানো তো, কাল একটা ম্যাগাজিনে ডাকাত সম্পর্কে একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম। কিন্তু সে-লোকটার ভাষা এতই খটোমটো যে পুরোটা ঠিক বুঝতেই পারিনি, তবে মনে হল লেখাটা বেশ ‘ইন্টারেস্টিং’; ডাকাতদের নিয়ে লেখা তো। তুমি একটু পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেবে আমায়?’

এই এতগুলো কথার উত্তর একটি কথায় সেরে ছোটকা বলল, ‘সময় হলে দেব।’

পানু ছোটকার এই উত্তরটার কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। সে বোধহয় তখন সেই ম্যাগাজিনের ডাকাতদের নিয়ে লেখাটার কথাই ভাবছিল। তাই বলল, ‘ছোটকা লোকে কথায় বলে ‘‘চোরডাকাত’’, কিন্তু আমি ভাবছি চোর এবং ডাকাতদের একটা তফাত বার করে আমি এবার আমার স্কুল ম্যাগাজিনে লিখব। কেমন, ভালো হবে না? ও দুটো কি আলাদা জাত?’

‘না রে, আলাদা কোনো জাত না শুধু একটু পোস্টের তফাত।’

‘কেন? কেন?’ উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল পানু।

‘এই দেখ! যারা চোর তারা চুরি করে চুপি চুপি, কাউকে তারা সেটা জানতেও দেয় না। ভালোমানুষের মুখোশ পরে মানে যার সম্পর্কে তোর মনে হয়তো খারাপ কোনো সন্দেহের অবকাশই নেই, সে-ই হয়তো তোর সরলতার সুযোগ নিয়ে ভালোমানুষ সেজে চুরি করছে। তুই দেখছিস ক্রমশ তোর সম্পদ কমে যাচ্ছে, কিন্তু কীভাবে কমছে তা বুঝতে পারছিস না। এরা হল চেনা চোর। আর একদল চোর আছে যারা রাতের অন্ধকারে আটঘাট বেঁধে চুপিসাড়ে চুরি করে পালিয়ে যায়।’

‘আর ডাকাতরা?’

‘হ্যাঁ, ডাকাতরা কিন্তু হাঁকডাক না করে কিছু করে না। তারা বলে-কয়ে তর্জন-গর্জন করেই লুঠপাঠ করে, যাকে বলে ডাকাতি।’ পানু এবার আগ্রহ নিয়ে বলল,

‘একটু বোঝাও তো।’

‘তবে শোন।’ ছোটকা বলতে লাগল, ‘আগে আগে এইসব ডাকাতদের উৎপাত ভীষণ বেশি ছিল। আজকাল শহরে এসব হয় না বটে তবে কোনো মফসসল বা ঘন জঙ্গলটঙ্গলে এরা সব আছে।’

‘সেকেমন?’

‘মনে কর তুই কোনো জায়গায় যাচ্ছিস। অন্ধকার নিশুতি রাতে হঠাৎ দেখা গেল কয়েক জন ভীষণাকৃতির লোক ‘‘হা রে রে রে’’ শব্দে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে লাঠি সড়কি নিয়ে তোর দিকে তেড়ে আসছে। তাদের মাথায় লাল ফেট্টি বঁাধা, দু-কানে বড়ো বড়ো মাকড়ি, লাল জবাফুলের মতো টকটকে চোখ আর কপালে রক্তসিঁদুরের টিপ।’

‘ইন্টারেস্টিং! শুনেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, তারপর?’

‘তারপর আর কী? তারা তোকে পিছমোড়া করে বেঁধে তোর কাছে যা যা ছিল তার সর্বস্ব লুঠ করে তোকে বঁাধা অবস্থাতেই জঙ্গলে ফেলে রেখে গেল। এরপর তুই বঁাচবি না মরবি সেটা ভাগ্যের হাত। এইসব ডাকাতরা যে খালি লোকের সম্পদ লুঠ করেই ক্ষান্ত হয়েছিল তা নয়, আগে আগে যেসব ডাকাতে কালীমন্দিরে নরবলি হত সেই বলির জন্যও এরা মানুষ ধরে নিয়ে যেত।’

‘ও বাবা গো...’ এবার পানু ছোটকার একটু গা ঘেঁষে বসল। বলল, ‘আগেকার দিনের ডাকাতদের আরও গল্প বলো-না ছোটকা’। ছোটকা বলতে লাগল, ‘হ্যাঁ রে, ভবানী পাঠক, চিতে, রঘু, রণ, বিশে, বুধো, ভাস্কর পন্ডিত প্রভৃতি বহু ডাকাতদের গল্প ছড়িয়ে আছে এই বাংলায়। এসব খালি ডাকাতের গল্পই নয়, এর যথেষ্ট ঐতিহাসিক তাৎপর্যও আছে। কেন জানিস?’

‘কেন?’ ছোটকা বলল, ‘এইসব ডাকাতদের সাংঘাতিক সব নৃশংস গল্প থাকলেও এদের মাতৃ আরাধনার জোর কিন্তু অসম্ভব বেশি ছিল। এসব কথা তো কেউ জানেই না, অনেক অনেক পুরোনো বইতেই এদের কথা পাওয়া যায়। ষোড়শোপচারে মায়ের পুজো না করে ডাকাতি করতে তারা বেরোতই না। আজ ক্রমশই ডাকাতদের কাহিনিগুলো প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে কিন্তু টিকে আছে মন্দিরগুলো, যেগুলোকে ডাকাতে কালীমন্দির বলে। শোনা যাবে হয়তো কোনো ডাকাতই সেই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা।’

‘তুমি কত জান ছোটকা, বলো-না ডাকাতদের গল্প।’

‘বলছি। তবে তার আগে একটা কথা শোন। যেসব ডাকাতেরা নরবলি দিত বা লুঠপাঠ করত তারা কিন্তু বেশিরভাগই পরে পরমভক্ত হয়ে পড়ে বা তাদের মধ্যে শুভ চৈতন্যের উদয় হয়। নে, এবার গল্প বলি।’

‘অমাবস্যার ঘন কালো রাত, চারিদিকে নিজঝুম নিস্তব্ধ। আলোর কোনো ছিটেফোঁটা নেই, সারা পরিবেশে একটা বেশ রহস্যময় রোমাঞ্চের ভাব রয়েছে। মন্দিরে প্রদীপের মৃদু ক্ষীণ আলো পরিবেশকে যেন আরও ভয়ার্ত করে তুলেছে। মন্দিরের মধ্যে একশো আট মুন্ডমালা গলায় পরে খড়্গ হাতে লাল লকলকে জিহ্বা নিয়ে দেবী কালিকা উগ্র জ্বলন্ত মুখমন্ডল নিয়ে শিবঠাকুরের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে আছে হাড়িকাঠ আর পাশটিতে রয়েছে রক্ত ও সিঁদুরমাখা একটি খাঁড়া। কেন বল তো? আসলে ওই হাড়িকাঠে মাথা ঢুকিয়ে নরবলি দেওয়া হবে। এরপর মা কালীকে প্রণাম করে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে ‘‘হা রে রে রে’’ শব্দে প্রচন্ড চিৎকার করতে করতে কয়েক জন ভীষণদর্শন লোক দৌড়ে চলে গেল জঙ্গলের ভেতর। কেন জানিস? বলির খোঁজে। এরাই হল ডাকাত। যে মন্দিরে তারা মায়ের আরাধনা করত তা-ই হল ডাকাতে কালীমন্দির।’

এইসব গল্প শুনে ছেলেমানুষ পানুর অবশ্যই একটু ভয় ভয় করছিল, তাই সে ছোটকার আরও কাছে সেঁটে এসে বসল। কিন্তু কৌতূহলেরও তো শেষ নেই। তাই বলল, ‘তারপর?’ ছোটকা বলল, ‘তারপর শোন, সেই গভীর রাতে প্রচন্ডভাবে বেজে উঠত ঢাক। নিস্তব্ধ রাতে সেই ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজ আরও জোরালো শোনাত। মনে হত বুঝি-বা ঘাড়ের কাছেই বাজছে। মন্দির চত্বর থেকে শোনা যেত অসহায় কোনো মানুষের করুণ কান্না। মানে বলি পাওয়া গেছে— নিশ্চয় কাউকে না কাউকে ডাকাতগুলো ধরে নিয়ে গেছে বলি দেবার জন্য। ভেবে দেখ, কার মায়ের কোল খালি হয়ে গেল কে জানে? ওইরকম শব্দ শুনে আশপাশের কারোর ঘুম হত না ভীতসন্ত্রস্ত চিত্তে সকলে জেগে বসে থাকত, মা-ঠাকুমা-দিদিমারা জড়িয়ে ধরতেন তাঁদের নাতি-নাতনিকে। ঘাতক যে, মানে যে বলি দেবে সে এত জোরে মা মা চিৎকার করত যে তাতে সত্যিই বুকের রক্ত হিম হয়ে যেত।’

‘তবে ডাকাতরা খুব ভয়ংকর ছিল বলো? আজকাল আর তাদের দেখা যায় না?’

‘না রে, আজকাল সব বনজঙ্গল কেটে সাফ হয়ে যাচ্ছে, বহু উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি উঠছে, মানুষের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অনেক উন্নত হচ্ছে, তাই ডাকাত বাবাজিদের আর দেখাই যায় না; একমাত্র যেখানে জঙ্গলটঙ্গল আছে বা যেখানটা খুব অনুন্নত এলাকা সেখানেই এখন তারা রয়েছে। এ তো গেল ডাকাতদের একটা দিকের কথা, এবার অন্য দিকের কথাটাও শোন। আজ থেকে বেশ কয়েক-শো বছর আগে যখন জমিদার জায়গিরদারদের সব নৃশংস অত্যাচারের কাহিনি শোনা যেত, ঠিক সেই সময় ডাকাতদেরও অনেক গল্প শোনা যেত, যেমন—ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে পুজো করা, নরবলি বা পশুবলি দেওয়া, ডাকাতির অর্থ গরিব মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া, এমনকী লুঠতরাজ করে সেই লুঠের অর্থে গরিবের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কাহিনিও শোনা যায়। মানে তাদের মধ্যে কিছু ভালো গুণও ছিল। আরে বাবা সব ডাকাতের মন তো আর একরকম হয় না; সত্যিই যাদের মন খুব উঁচু তারা কী করত জানিস? তারা বড়োলোক জমিদার বা ধনী ইংরেজ যারা কিনা গরিবদের ওপর অত্যাচার করে তাদের নি:সম্বল করে দিত, ডাকাতরা তাদের বদলা নিত, তাদের অর্থ লুঠ করে গরিবদের দান করত অর্থাৎ, তাদের প্রাণে মারত না কিন্তু ধনে মারত। সুতরাং দেখা গেছে যে অনেক ভালো এবং জনকল্যাণের কাজও তারা করেছে, তাই সব কিছুই তাদের নিন্দনীয় নয়, খারাপের আড়ালে ভালো দিকও তাদের মধ্যে ছিল।’

C-কালীপুজো করে ডাকাতরা চলেছে ডাকাতি করতে।

এখন ছোট্ট পানুর মনের মধ্যে রয়েছে অগাধ কৌতূহল, সে বলল, ‘আচ্ছা ছোটকা, তুমি যে বলছিলে অনেক ডাকাত নাকি পরে ভালো হয়ে গেছে সেইরকম একটা ঘটনা বলো-না।’

‘লক্ষ্মী ভাইপো আমার, অনেক তো বললাম, এটুকুই আগে হজম করো। ওই ঘটনা কাল আবার বলব তোকে, এখন সত্যি বড্ড ঘুম পাচ্ছে রে ...।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%