ভারতী গুহ
পাহাড় ঘেরা সুন্দর সে এক রাজ্য। পাহাড়ের কোলে সবুজ বন ফুলে ফলে ছেয়ে থাকে। গাছে গাছে ঝাঁক বেঁধে কত না রং-বেরঙের পাখি এসে বাসা বাঁধে, গান গায়। আর আছে রুংতা নদীর মিষ্টি জল, কাঁচের মতো স্বচ্ছ আর টলটলে।
দেশের রাজা বড়ো দয়ালু। প্রজাদের সুখ-সুবিধের দিকে তাঁর তীক্ষ্ণ নজর, বিপদে-আপদে তাদের রক্ষা করেন। দেশের রানি বড়ো দয়াবতী। প্রজাদের সুখে-দুঃখে পাশে এসে দাঁড়ান। মায়ের মতো স্নেহ করেন। সেই সুন্দর রাজ্যের প্রজারা সুখে শান্তিতে বাস করে।
রাজার কোনো ছেলে নেই, শুধু একটি মেয়ে। রাজ্যের রাজকন্যা। রাজকুমারী ঝরনাবতী রাজারানির নয়নের মণি। রাজার সাতমহলা বাড়ির যেখানে যা কিছু আছে সবই রাজকন্যার। হাতি, ঘোড়া, দাস-দাসী, মণিমাণিক্য। এছাড়াও রাজা তাঁর আদরের কন্যাকে উপহার দিয়েছেন একখানা মস্ত দিঘি। ফুলের বাগান দিয়ে ঘেরা ভারী সুন্দর! রাতের আকাশ সব তারাদের নিয়ে সেই দিঘির আয়নার মুখ দেখে। রূপসী রাজকন্যা তার রূপে দিঘির জল আলো করে সখীদের নিয়ে স্নান করে, খেলা করে।
কিন্তু সব দিন তো সমান যায় না। সেই সুন্দর রাজ্যে একদিন নেমে এল বিপদের কালো ছায়া। গ্রীষ্ম ঋতুর শুরুতেই সূর্যদেব আকাশ থেকে যেন আগুন ঢালতে লাগলেন। পাহাড়ের গা গরমে তেতে উঠল। শুকিয়ে গেল রুংতা নদীর জল। এমন অসহ্য গ্রীষ্মকাল এই রাজ্যে আর কখনো আসেনি। পুড়ে খাক হয়ে গেল খেতের ফসল। গাছে গাছে ফুল ফল সব শুকিয়ে গেল। পাখিরা শুকনো ঠোঁট মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাদের গলায় গান নেই। বর্ষাঋতু এল, কিন্তু কোথায় বর্ষা? আকাশ আগুন ঝরাতেই থাকে। মেঘের চিহ্নমাত্র নেই। এই প্রথম রাজভান্ডারে প্রজার খাজনা জমা পড়ল না। রাজ্য জুড়ে হাহাকার উঠল। রাজবাড়িতেও খাবারে টান পড়ল। অত লোকলশকর, পাইক-পেয়াদা দাস-দাসী। ভাঁড়ারে যা কিছু খাবার মজুত ছিল রাজা সব প্রজাদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। কিন্তু এভাবে ক-দিন চলবে? রুংতা নদী শুকিয়ে গেছে। রাজ্যের কোথাও তৃষ্ণার জলটুকুও নেই।
কোথাও যখন একফোঁটা জল নেই, তখন কিন্তু জল আছে রাজকুমারী ঝরনাবতীর দিঘিতে। টলটলে স্বচ্ছ জলে রাজকন্যা দিনরাত খেলা করে। সে জানেই না রাজ্য জুড়ে কি হচ্ছে! প্রজার হাহাকার তার কানে এসে পৌঁছয় না। এইবার রাজা তাঁর আদরের কন্যাকে ডেকে বললেন, “ঝরনা মা আমার, দেশের লোক তেষ্টায় মরতে বসেছে, শুকিয়ে গেছে রুংতা নদী, তোর দিঘিখানা এবার তুই প্রজাদের মধ্যে বিলিয়ে দে।”
ঝরনাবতীর ঠোঁটের হাসি গেল মিলিয়ে। সুন্দর মুখখানা রাগে লাল হয়ে উঠল। তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠল, “কক্ষনো নয়। ও দিঘি আমার ওর একফোঁটা জলও আমি কাউকে দেব না।” রাজা গম্ভীর হয়ে বললেন, “বহুযুগ আগে এই রাজ্যেরই একরাজা দেবতাকে খুশি করে পেয়েছিলেন এই দিঘি। দেবতার দান দিঘির জল তাই কক্ষনো শুকোয়না। আমি রাজা, প্রজাকে কষ্ট দিলে আমার পাপ হবে, দেবতা রুষ্ট হবেন।”
রাজকন্যাকে কেউ বোঝাতে পারল না। রাজারানি, মন্ত্রী, সবাই হার মানলেন। রাজকন্যার এক কথা, “আমার জীবন থাকতে আমি আমার দিঘির একফোঁটা জল কাউকে দেব না।”
রাজকন্যার সখীরা ধীরে ধীরে সব চলে গেল মুখ ফিরিয়ে। রাজকন্যার দিকে তাকাতে তারা লজ্জা পেল। রানি এসে বললেন, “তোর দিঘির জল তোরই থাক। প্রজারা আমার সন্তান, তাদের তৃষ্ণার জলটুকুও তুই দিলি না। আজ থেকে একফোঁটা জলও আমি আর মুখে দেব না।”
তিনি আঁচলে চোখ ঢেকে ঘরে গিয়ে খিল দিলেন। রাজা তাঁর রাজমুকুট ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সাতমহলা বাড়ি ছেড়ে কোথায় চলে গেলেন। রাজার কন্যা প্রহরীকে ডেকে আদেশ দিল, “রাজবাড়ির সিংহদরজা বন্ধ করে দাও; একটি প্রাণীও যেন আমার প্রাসাদে প্রবেশ করতে না পারে।”
মণি-মাণিক্যে ভরা বিশাল রাজবাড়ি শূন্য হয়ে গেল। হাতিশালে হাতি মরল, ঘোড়াশালে ঘোড়া। বাগানের সব ফুল সব পাতা ঝরে গেল। দিঘির জলে স্নান করে রাজকন্যা এসে বসল তার সোনার থালার সামনে। বসেই রইল। এককণা খাবারও তাকে কেউ দিতে এল না। রাগে অভিমানে রাজকুমারী চিৎকার করে উঠল। সাতমহলা বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে সেই চিৎকার প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল। ঝরনাবতী তার প্রাণের থেকে প্রিয় দিঘির কাছে ছুটে গেল। দিঘির শ্বেতপাথরের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে চাঁপার কলির মতো দুই হাতের অঞ্জলিতে দিঘির জল তুলতে গেল। কোথায় জল? রাজকন্যা অবাক। মস্ত দিঘি শুকনো খটখটে। বিশাল, গভীর একটা গর্ত ছাড়া আর কিছুই নেই। তেষ্টায় রাজকুমারীর বুক ফেটে গেল। চারধারে তাকিয়ে দেখতে পেল শুকনো গাছের কঙ্কাল সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফুল নেই, পাতা নেই, কিছু নেই। শুকনো ডালপালা ঘেরা মস্ত এক গর্ত তাকে যেন হাঁ করে গিলতে আসছে। এবার রাজকন্যা প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল। শুকনো দিঘি, শুকিয়ে যাওয়া বাগান আর শূন্য রাজপ্রাসাদ ছেড়ে সে ছুটে চলল। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে শুরু করল। পাহাড়ে গাছপালা কিছুই নেই, শুধু কালো কঠিন পাথর। পাহাড়ের গা যেন আগুন। খিদেয়, তেষ্টায় রাজকন্যার বুক জ্বলে যাচ্ছে। পাথরের গায়ে আছাড় খেতে খেতে সে এসে পৌঁছোল পাহাড়ের চূড়ায়। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল এক মহাশ্মশান। জল না পেয়ে তার সোনার রাজ্য ছারখার হয়ে গেছে। কোথাও কোনো প্রাণের সাড়া নেই। পাহাড় চূড়ায় রাজকুমারী ঝরনাবতী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক যেন পাথরে গড়া এক মূর্তি। আকাশ থেকে ঝরে পড়া গনগনে আগুনে তার কোমল শরীর ঝলসে যেতে লাগল। তারপর রাজকুমারী ঝরনাবতীর বুক ফেটে বেরিয়ে এল কান্না, গলা চিরে বেরিয়ে এল হাহাকার, “জল দেব, জল দেব, জল দেব,।” সেই হাহাকার পাহাড়ে পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ল। এবার রাজকন্যার দুই চোখ থেকে জল পড়তে শুরু করল। বুক বেয়ে চোখের জল নেমে এল। কঠিন পাথর বেয়ে অজস্র ধারায় ঝরে পড়ছে ঝরনাবতীর চোখের জল। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে শুকিয়ে যাওয়া মাটি।
দিন তো সমান যায় না। একদিন সেই প্রচন্ড খরা শেষ হয়ে আকাশ কালো করে নামল বর্ষা। মাটির বুকে আবার জন্মাল সবুজ গাছপালা। পাহাড়ের কোল ফুলে ফলে ভরে গেল। ফিরে এল পাখিরা। এল কত মানুষ। পাখির গান, মানুষের কলরব। গড়ে উঠল নতুন রাজ্য।
পাহাড়ের পথে চলতে চলতে তৃষ্ণার্ত মানুষ ঝর ঝর শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ায়। দেখতে পায় পাহাড় থেকে সবুজ ঘাস আর ফুলে ঘেরা অপরূপ সুন্দর এক ঝরনা নেমে আসছে। সেই ঝরনার জল বড়ো ঠান্ডা, বড়ো মিষ্টি। মানুষ সেই জলে তাদের তেষ্টা মেটায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন