সর্পযজ্ঞ

ভারতী গুহ

“চৌকিদার, চৌকিদার, এই চৌকিদার,…” রায়সাহেবের গমগমে গলার ডাক ধমকের মতো শোনায়। বাগানের একধারে বাংলোর রান্নাঘর, রঘু হাত চালিয়ে রান্নার জোগাড় করছিল, সাহেবের হাঁক শুনে ছুটে এল।

একা জিপ চালিয়ে সাহেব যখন এই ফরেস্ট বাংলোয় এসে পৌঁছলেন, বেলা তখন দশটা। এসে থেকেই হাঁকডাক শুরু করেছেন। রোজকার মতো আজও রঘু সকাল আটটায় ডিউটিতে এসে গিয়েছিল। জঙ্গলের মধ্যে দু-কামরার ছোটো বাংলো, ছোটো বাগান। বাগানের একধারে রান্নাঘর, বাঁধানো কুয়ো। রঘু রোজ এসে ঘরদোর ঝাড়পোঁছ করে, গাছগুলোতে জল দেয়, কাঠকুটো, শুকনো পাতা পরিষ্কার করে, বেলা বারোটা নাগাদ বনের পথ ধরে গান গাইতে গাইতে নিজের ঘরে ফিরে যায়। আজ ঘরে ফেরার প্রশ্নই নেই। সতেরো বছরের হাসিখুশি ছেলে রঘুনাথ একাই বাংলোর চৌকিদার, রাঁধুনী, মালি সব কিছু। সাহেবের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে বেলা বাড়ছিল। তাকে একবার বাজারে যেতে হবে। আরও অনেক কাজ। এখানে শীতকালে ছাড়া লোক প্রায় আসেই না। এখন বর্ষার শুরু।

বাংলোর বারান্দায় বেতের চেয়ারে পা ছড়িয়ে রায়সাহেব বসেছিলেন, মুখে জ্বলন্ত চুরুট। পাশের ছোটো টেবিলে খালি চায়ের কাপ। রঘু বিনীত ভঙ্গিতে বারান্দায় ওঠার সিঁড়িতে এসে দাঁড়াল। চুরুট দাঁতে চেপে সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,

“তোদের এখানে সাপটাপ বেরয়?”

রঘু বাগানের চারপাশটা একবার তাকিয়ে নিল। ক-দিন একটানা বর্ষার পর আজ বেশ রোদ উঠেছে। বাগানটা ছোটো হলেও রঘুর যত্নে পরিষ্কার, তকতকে। বেলফুল আর গোলাপফুল অনেক ফুটেছে, সব গাছেই অনেক কুঁড়ি। বাগানের গেটের পাশেই হাস্নাহানার ঝাড় ফুলে ভরে আছে। রঘু মৃদু কন্ঠে বলল,

“মাঝেমধ্যে।”

“বাগানে সাপের গর্তটর্ত আছে না কি?”

রঘু অস্পষ্ট মাথা নাড়ল। তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করল,

“কফি খাবেন, স্যার?”

“নাঃ এখন আর কিছু খাব না। লাঞ্চের কত দেরি?”

“একটার মধ্যে হয়ে যাবে, স্যার।”

রায়সাহেব রঘুর পুরোনো আধময়লা প্যান্টসার্ট পরা রোগা কালো চেহারাটা আপাদমস্তক দেখে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

“হাতটাত ভাল করে ধুয়ে নিয়ে আমার খাবার তৈরি হয় যেন, নোংরা আমি সহ্য করতে পারি না।” রঘু মাথা নেড়ে ব্যস্ত পায়ে রান্নাঘরে ছুটল।

সাহেবের স্নান সারা। পাটভাঙা পাজামা পাঞ্জাবি পরে বারান্দার বেতের চেয়ারে এসে আবার বসলেন। সূর্য তখন মাথার ওপর থেকে একটু সরে গেছে পশ্চিমে।

“রঘু, রঘুনাথ, চৌকিদার”- রায়সাহেব অস্বাভাবিক জোরে চিৎকার করে উঠলেন। রঘুর রান্না প্রায় শেষ। সে হাতা দিয়ে নেড়ে মুরগির মাংসে গরম মশলা মেশাচ্ছিল। সাহেবের বাজখাঁই গলার হুঙ্কার শুনে পড়ি-মরি করে ছুটে এল। ততক্ষণে রায়সাহেব ঘর থেকে তাঁর বন্দুকটা বের করে এনেছেন। রঘু আর্তনাদ করে উঠল,

“মারবেন না স্যার, মারবেন না।” তার কাতর মিনতি শেষ হবার আগেই বন্দুকের কান-ফাটানো গর্জনে দুপুরের নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। বনের মধ্যে শুরু হল পাখিদের ভয়ার্ত কলরব। বন্দুকের শব্দ অরণ্যের গাছে গাছে ধাক্কা খেয়ে ফিরতে লাগল। পেয়ারা গাছের নীচে সাপের লম্বা দেহটা যন্ত্রনায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, হলদে কালো ডোরাকাটা শরীর দুপুরের রোদে ঝকঝক করে উঠল। রঘু দু-হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল। রুদ্ধ গলায় বলল,

“মারলেন কেন, সাহেব? ও যে মা মনসার গলার হার।”

রায়সাহেব হা হা করে প্রচন্ড জোরে হেসে উঠলেন, বিদ্রুপের স্বরে বললেন,

“মা মনসার গলার হার! অশিক্ষিত জংলি ভূত। সাপের মতো হিংস্র প্রাণী আর দুটি নেই, বুঝলি? দেখলেই শেষ করে দিতে হয়।”

রঘু মাথা নীচু করে ধীরে ধীরে ফিরে চলল রান্নাঘরে, উনুনে মুরগির মাংস বসানো আছে। ঘরের টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিয়ে রঘু বারান্দার সিঁড়িতে এসে বসল। মরা সাপের নিথর দেহটা পড়ে আছে। বর্ষার জল পেয়ে গর্ত থেকে বেরিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল বাগানে। মুরগির ঠ্যাং চিবুতে চিবুতে সাহেব ঘর থেকে ঠিক শুনতে পেয়েছেন, রঘু চাপাগলায় সুর করে কিছু বলছে। ঠাট্টার স্বরে বললেন,

“কি গান গাইছিস? ও রঘুনাথ, সাপের মন্ত্র না কি?”

রঘু গাইছিল,

“মনসা মাগো আমার

না করিও রোষ,

অধম সন্তানের না ধরিও দোষ

সাঁঝ সকাল দুইটা বেলা

সাজিয়ে দেব দুধকলা…”

“চুপ কর” – সাহেব ঘরের ভেতর থেকে জোরে ধমকে উঠলেন,

“আজকালকার ছেলে সেকেলে বুড়োদের মতো সাপের মন্ত্র আওড়াচ্ছে, অশিক্ষিত জংলি…”।

বাংলোয় অতিথি এলে রঘু এখানেই খেয়ে নেয়। আজ তার একটুও খিদে নেই। সে ভাতের হাঁড়িতে জল ঢেলে রান্নাঘরে শিকল তুলে দিল। দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ্দুরে বনভূমি নিথর, নিস্তব্ধ। পাখির কলরব থেমে গেছে। গাছের শান্ত ছায়ায় পশুপাখি কীটপতঙ্গ বিশ্রাম নিচ্ছে। আকাশ বেয়ে সূর্য পশ্চিমে অনেকটা নেমে এসেছে। রান্নাঘরের দাওয়ায় রঘু গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে। ফুরফুরে হাওয়ায় বাগানের গোলাপ আর বেলফুল অল্প অল্প দুলছে, হাস্নাহানার পাতা নড়ছে। আচমকা বন্দুকের বিকট শব্দে শান্ত দুপুর, ছায়ায় ঘেরা বনভূমি থরথর করে কেঁপে উঠল। বন থেকে বনান্তরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল বন্দুকের মুহুর্মুহু কান-ফাটানো গর্জন। রঘু ঘুম ভেঙে লাফ দিয়ে উঠে বসেছে, বিস্ফারিত দু-চোখ মেলে দেখতে পেল রায়সাহেব বাগানের আনাচেকানাচে যত গর্ত খুঁজে খুঁজে বন্দুকের নল দিয়ে খুঁচিয়ে চলেছেন। বেরিয়ে আসছে লম্বা সরীসৃপ, নানা রঙের, ছোটো, বড়ো, মাঝারি। মুহূর্তের মধ্যে তাদের মাথা লক্ষ্য করে ছুটে যাচ্ছে গুলি, বন্দুকে চটপট গুলি ভরছেন আর দু-হাতে উঁচিয়ে ধরছেন। তাঁর মাথার চুল উস্কোখুস্কো, কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, গায়ের পাঞ্জাবি ঘামে লেপটে আছে, দু-চোখ যেন খুনের নেশায় ধকধক করছে। রঘু রান্নাঘরের দাওয়ার খুঁটি আঁকড়ে ধরে কাঁপতে শুরু করেছে।

একসময় থেমে গেল বন্দুকের আওয়াজ। বাগানের চারধারে সাপের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের ওপর ছড়িয়ে আছে ছেঁড়া ফুলের পাপড়ি। রায়সাহেব গাছের সরু ডাল নিয়ে মরা সাপের দেহগুলো একটা একটা করে বাগানের মাঝখানে ঘাসের ওপর জড়ো করতে লাগলেন। টকটকে লাল সূর্য আকাশে রক্ত ঢেলে, বনভূমি আঁধার করে অস্ত গেল। ঈশান কোণ থেকে একটুকরো কালো মেঘ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।

“রঘু, কাঠকুটো জোগাড় করে নিয়ে আয়।” সাহেব গম্ভীর গলায় হুকুম দিলেন। রঘুর পা দুটো ভারি হয়ে গেছে, গলা দিয়ে স্বর বেরচ্ছে না। রান্নাঘরে উনুন ধরাবার কাঠ বোঝাই করা ছিল, সে একবোঝা কাঠ এনে সাহেবের সামনে রাখল, তারপর দূরে সরে গেল, বাগানের বেড়া ঘেঁষে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

সাপের চিতা যখন লকলক করে জ্বলে উঠল, বনের মাথায় তখন কালো মেঘ জমাট বেঁধেছে। রায়সাহেব বারান্দায় চেয়ারে বসে, চুরুট মুখে সাপের অন্ত্যেষ্টি দেখতে লাগলেন মনোযোগ দিয়ে। নিজের মনেই বলে উঠলেন,

“সর্পযজ্ঞ জানিস? মহাভারতের রাজা জন্মেজয় সর্পযজ্ঞ করেছিলেন, এই সেই সর্পযজ্ঞ। সাপের বংশ ধ্বংস”। তিনি হা হা করে অট্টহাস্য করে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কালো আকাশের বুক চিরে একফালি বিদ্যুৎ এঁকেবেঁকে ঝলসে উঠল।

রঘু রান্নাঘরে লম্ফ জ্বালিয়ে, সাহেবের রাতের খাবার জন্য তাড়াতাড়ি রুটি তৈরি করে ফেলল। খাবার ঘরে, শোবার ঘরে দুটো হারিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে এল। ক্ষিপ্র হাতে টেবিলে রাতের খাবার গুছিয়ে দিয়ে বিছানা করল, মশারি টাঙাল তারপর ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে বলল,

“স্যার, আপনার খাবার রেডি করে দিয়েছি, জানালা দরজা ভাল করে বন্ধ করে শোবেন, আমি ঘরে যাচ্ছি, বৃষ্টি নামবে।”

রায়সাহেব বাধা দিয়ে কিছু বলার আগেই সে মুহূর্তে বাগানের গেট খুলে বেরিয়ে বনের পথ ধরে উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে চলল। নিকষ কালো মেঘ তখন সমস্ত আকাশখানা ঢেকে ফেলেছে। সন্ধ্যা হতে না হতেই নেমে এল রাত্রি। গভীর কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল বন। শনশন শব্দে হাওয়া উঠল। সাপের চিতার আগুন লকলকিয়ে ওপরে উঠছে, আরও ওপরে হঠাৎ দমকা হাওয়ায় দপ করে নিভে গেল সেই আগুনের শিখা, শুধু সাপের পোড়া দেহের ওপর ধিকধিক করে জ্বলতে লাগল অঙ্গার। হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে স্ফূলিঙ্গ। ঘাসের ওপর, পাতার ফাঁকে, ছেঁড়া ফুলের পাপড়িতে বিন্দু বিন্দু আগুনের কণা, ঠিক যেন সাপের চোখ। বনের মাথায় সাপের সরু জিভের মতো বিদ্যুৎ চমকে উঠল। চড়বড় শব্দে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। রায়সাহেব তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন। টেবিলের ওপর হ্যারিকেনের শিখা হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। বাগানের দিকে জানালা দুটো তিনি ছিটকিনি এঁটে বন্ধ করে দিলেন। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।

খুব ক্লান্ত লাগছে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। হাতঘড়িতে সময় দেখলেন সন্ধ্যে সাতটা। শোবার ঘর আর খাবার ঘরের মাঝখানের দরজাটা খোলা, দুই ঘরেই হারিকেন জ্বলছে। খাবার ঘরের টেবিলে ঢাকা দেওয়া রাতের খাবার। এই ঘরের চৌকিতে পরিপাটি বিছানা পাতা, দেয়ালে পেরেকের সঙ্গে লম্বা দড়ি দিয়ে মশারি টাঙানো, দেয়ালের হ্যাঙারে ঝুলছে তাঁর ছেড়ে রাখা জামাপ্যান্ট, চামড়ার চওড়া বেল্ট। একধারে কাঠের ছোটো টেবিল আর চেয়ার, টেবিলের ওপর হারিকেনের সামনে রায়সাহেব তাঁর বন্দুকটা শুইয়ে রাখলেন। ভাল করে হাতমুখ ধোওয়া দরকার। বাথরুমের বালতিতে রঘু কুয়োর জল ভরে রেখে গেছে। বাথরুমে আলো নেই, শোবার ঘর থেকে একফালি আলো বাঁকাভাবে এসে পড়েছে। বাইরে বৃষ্টির জোর আর নেই, হিসহিস শব্দে বাতাস বইছে। সাপের চিতা নিভে গেছে, ভেজা ছাইয়ের ভেতরে আগুনের দু-চারটে কণা শুধু রয়ে গেছে।

রায়সাহেব বাথরুমের তাক থেকে হাত-মুখ ধোবেন বলে মগটা নিতে গেলেন, হাতে ঠান্ডা তেলতেলে স্পর্শ পেলেন, ঠিক যেন সাপের মসৃণ দেহ। ঝট করে হাত সরিয়ে নিলেন। দু-হাতের আঁজলায় বালতি থেকে জল তুলতে যেতেই জলের বদলে নরম শীতল সরীসৃপের শরীর তাঁর হাতকে ছুঁয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন বাথরুম থেকে। হারিকেনের আলোটা কেমন নিভে আসছে, হয়তো তেল নেই। ঘরের সাদা দেয়ালে লম্বা লম্বা ছায়া দুলছে। ওগুলো কি? রায়সাহেব প্রচন্ড চমকে গেলেন। আরে! ওটা তো তাঁর নিজেরই বেল্ট। আশ্চর্য চোখের ভুল। নিজের বোকামিতে অবাক হলেন। দেয়ালের হ্যাঙার থেকে চামড়ার বেল্টটা নামাতে যেতেই সরসর করে দেয়াল বেয়ে নেমে এল কালো লম্বা শরীর, সিমেন্টের মেঝেতে বুক ঘেঁষে এঁকেবেঁকে চলতে শুরু করল। লাফ দিয়ে সরে আসতে গিয়ে মাথায় ঠেকল ঝুলে থাকা মশারির দড়ি, মাথা বেয়ে পিঠ বেয়ে ঘাড়ে ঠান্ডা স্পর্শ বুলিয়ে নেমে গেল লিকলিকে দেহের সরীসৃপ। ছুটে গিয়ে হাত বাড়ালেন টেবিলের ওপর তাঁর অনেকদিনের সঙ্গী বন্দুকটার দিকে। বন্দুকের শরীর আর শক্ত নেই, নরম পেছল, হিলহিলে। এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিতে গিয়ে উলটে পড়ল হারিকেন, কাঁচভাঙার শব্দ, কেরোসিনের কটু গন্ধে অন্ধকার ঘর ভরে গেল। পাশের খাবার ঘরে আলো আছে, খোলা দরজার দিকে দৌড়লেন, ধাক্কা লেগে চেয়ার উলটে গেল, মাথা ঠুকে গেল দেয়ালে। হ্যাঙারে টাঙানো তাঁর ছেড়ে রাখা জামাপ্যান্ট ঝপঝপ করে পড়ল গায়ে মাথায়। আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, জামাকাপড়গুলো এত ঠান্ডা? এমন মসৃণ? সারা শরীর বেয়ে নেমে গেল, আবছা অন্ধকারে মেঝের ওপর কিলবিল করে চলতে শুরু করেছে। চিৎকার করার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছেন, সারা শরীর থেকে ঘাম ঝরে পড়ছে, প্রবল জ্বরআসা রুগীর মতো ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করলেন, গলা, বুক শুকিয়ে কাঠ। খাবার ঘরের এককোণায় হারিকেনের স্তিমিত আলো। টেবিলের ওপর ঢাকা দেওয়া তাঁর রাতের খাবার, পাশে ঢাকনা দেয়া জলের গ্লাস। ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে, একটু জল! জলভরা গ্লাসে হাত ছোঁয়াতে না ছোঁয়াতেই কুন্ডলীপাকানো দেহ নড়ে চড়ে উঠল, লম্বা হতে শুরু করল চকচকে শরীর। চমকে হাত সরিয়ে নিতে গিয়ে টের পেলেন, স্টিলের ব্যান্ডে বাঁধা তার প্রিয় হাতঘড়িটার শরীর আর কঠিন নয়, নরম তেলতেলে, কবজি ছেড়ে হাত বেয়ে নেমে আসছে। সজোরে হাত ঝাড়তে গিয়ে ঝনঝন শব্দে ঠিকরে পড়ল থালাবাসন, উলটে গেল টেবিল, মাটিতে ছড়িয়ে গেল তাঁর রাতের খাবার। হারিকেনের নিভুনিভু আলোয় দেখলেন, সরু লম্বা অসংখ্য ছায়া শূন্যে দোল খাচ্ছে, চুলের, মতো সরু সরু চেরা জিভ বাতাসে ছোবল মারছে, ঘরের আনাচেকানাচে শোনা যাচ্ছে ফোঁসফোঁস, হিসহিস। সাহেবের দিশেহারা বিস্ফারিত দুই চোখ উন্মাদের মতো, গলা থেকে বেরিয়ে এল বিকৃত, আর্ত, অমানুষিক চিৎকার। বিশাল শরীর আছাড় খেয়ে পড়ল ফরেস্ট বাংলোর কঠিন মেঝেতে।

বৃষ্টিধোয়া সবুজ বন জেগে উঠেছে। গাছে গাছে পাখিদের আনন্দ কলরব। মেঘমুক্ত নীল আকাশে আবির ছড়িয়ে সূর্য উঠেছে। বাগানের সতেজ গাছগুলো ভোরের হাওয়ায় দুলতে শুরু করেছে, সব কুঁড়ি ফুল হয়ে ফুটেছে। গেট ঠেলে রঘু ঢুকল। সাহেবের জন্য চা তৈরি করে, ট্রে সাজিয়ে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বারবার ডাকতে লাগল,

“স্যার আপনার বেড-টি রেডি, দরজা খুলুন, সাহেব দরজা খুলুন।” অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে সে একটা লোহার শাবল জোগাড় করে এনে, দরজার ফাঁক দিয়ে খিল খুলে ফেলল। ঘরে ঢুকতে গিয়ে রঘু থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সারারাত ধরে ঘরে যেন দক্ষযজ্ঞ চলেছে। সাহেবের জামাকাপড় চারদিকে ছড়ানো, টেবিল চেয়ার উলটে পড়ে আছে মশারির দড়ি ছেঁড়া, ভাঙা হারিকেন, কাঁচের টুকরো। ঘরে সাহেব নেই। পাশের ঘরে ঢুকেই রঘুর চক্ষুস্থির। সারাঘর লণ্ডভণ্ড। রুটি, মুরগির মাংস, স্যালাড ঘরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। জলের গ্লাস উলটে মেঝেতে জল গড়িয়ে পড়েছে, টেবিল চেয়ার একধারে কাত হয়ে পড়ে আছে। ঘরের মাঝখানে উপুড় হয়ে পড়ে আছে রায়সাহেবের বিশাল শরীর। রঘুর বুকটা কেঁপে উঠল। একটু দ্বিধা করল, তারপর তার রোগা হাত দু-খানা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে শরীরটা সোজা করে দিল। কপালে রক্ত শুকিয়ে আছে, জটপাকানো এলমেলো চুল, মলিন পোশাক, গালে মুখে ধুলো লেগে আছে, হাতের ঘড়ির কাঁচ ভেঙে পাশে পড়ে আছে। রঘু কুঁজো থেকে জল এনে চোখে-মুখে ঝাপটা দিয়ে আকুল হয়ে ডাকতে লাগল,

“সাহেব, সাহেব, চোখ খুলুন, আমি রঘু, রঘুনাথ বাংলোর চৌকিদার…”। ধীরেধীরে চোখ মেললেন রায়সাহেব, উদভ্রান্ত দৃষ্টি। হঠাৎ তিনি উঠে বসে রঘুর রোগা কালো মলিন শরীরটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরলেন। পরক্ষণে রঘুর কোলে মুখ গুঁজে শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন, বার বার বলতে লাগলেন,

“রঘু তোর ছড়াটা বল, তোর ছড়াটা বল…”। রঘু বাবু হয়ে বসে সাহেবের মাথাটা সযত্নে কোলে তুলে নিল। চুলে-মাথায় পরম স্নেহে হাত বোলাতে বোলাতে সুর করে গাইতে শুরু করল,

“মনসা, মা আমার না করিও রোষ

অধম সন্তানের না ধরিও দোষ,

সাঁঝ সকাল দুইটা বেলা

সাজিয়ে দেব দুধ কলা…”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%