ভারতী গুহ
“হেই বাবা, তু এই ইস্কুলটোর মাষ্টর বটে?”
একটু আনমনেই হাঁটছিলেন বাড়ির পথে, হাতে টান পড়তেই একটু চমকে তাকালেন, এই শহরের একমাত্র উচ্চশিক্ষা বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক; দ্বিজেন আচার্য। বছর দশেক বয়েস হবে ছেলেটার। কালোকুলো গোলগাল মুখখানা, চ্যাপটা নাক। সাদা দাঁতের সারি বের করে, একমুখ হাসি নিয়ে তাঁর হাতখানা ধরে মুখ তুলে তাকিয়ে আছে, তাঁর চোখে চোখ রেখে। খালি গা, পরনে শুধু একটা ঢলঢলে হাফপ্যান্ট।
স্কুল ছুটির পরেও তাঁকে বেশ কিছুক্ষণ থাকতে হয়, অনেক কাজ বাকি থাকে। বলতে গেলে এই স্কুলের প্রায় সবরকম দায়িত্বই তাঁর ওপরে। অন্যান্য শিক্ষকরাও সবাই আছেন, লোকজনও আছে। তবে প্রথম থেকেই এরকমটাই চলে আসছে। দ্বিজেন স্যারের মনে পড়ল এই ছেলেটাকে তিনি মাঝে মধ্যে স্কুলের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন। ছেলেটা কিন্তু তখনও তাঁর হাত ছাড়েনি, তেমনি করেই মুখ তুলে তাকিয়ে আছে তাঁর চোখের দিকে। আবার বলল, “স্কুলটোর মাষ্টর বটে?”
তিনি হেসে মাথা নাড়লেন। ছেলেটা তাঁর হাত ছেড়ে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকল।
“নাম কি তোর?”
মুখে সেই হাসি, “কালু বটে, কালাচাঁদ মুন্ডা”।
“থাকিস কোথায়?”
“হৈ উদিক পানে”।
এই ছোটো শহরতলির উত্তর-পুব দিক ঘিরে আছে ছোটো-বড়ো টিলা, মাঝারি পাহাড়। তার নিচ থেকেই শুরু হয়েছে ঘন সবুজ বন। টিলার খাঁজে খাঁজে ছোটো ছোটো ঝুপড়িগুলোতে এদের বসতি। আদিবাসী এই মানুষগুলো কোন কাল থেকে আছে, কেউ জানে না। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণা একটা ছোটো নদী হয়ে, শহরের একটু দূর দিয়ে বয়ে চলেছে। বনে জঙ্গলে পাখী শিকার করে, নদীতে মাছ ধরে, ছোটোখাটো জন্তুজানোয়ার মেরে, আর অল্পস্বল্প চাষবাস করে ওদের জীবন ধারণ। মাঝে মাঝে নেমে আসে শহরে, প্রয়োজনে কাজকাম করে দেয় বাবুদের। আবার ফিরে যায় বনের পথে পাহাড়ের কোলে।
স্কুল থেকে দ্বিজেন স্যারের বাড়ি আট-দশ মিনিটের পথ। এখানেই তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়েছে, স্যারের এই কোয়ার্টার, এখানকার সবাই চেনে, যেমন চেনে তাঁকে।
এই অঞ্চলের সবচাইতে বড়ো মানুষ দেবতোষ মুখুজ্জে। বলা যায় এই ছোট্ট শহরতলির তিনিই মালিক। এখানকার জমিজায়গা, বাড়িঘর, চাষ-আবাদ, চিনির কল, ধানের কল সবই তাঁর। এখানকার প্রায় সবাই তাঁরই কর্মচারী, রুজিরোজগার তাঁরই কাছে। তিনি সবারই ‘কর্তাবাবু’। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা তিনিই। তাঁর স্বর্গীয় পিতার নামে স্কুলের নাম, ‘আশুতোষ বিদ্যামন্দির’।
অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেল। কাজের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে দ্বিজেন আচার্য কেমন করে যেন একদিন এখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। দেবতোষবাবু তাঁকে সেদিন আশ্রয় দিয়েছিলেন, আশ্বাস দিয়েছিলেন, সম্মান দিয়েছিলেন। সেই থেকেই তিনি এখানে।
অন্যান্য সব মাস্টারমশাইরা একটু দূরের বিভিন্ন শহরতলি থেকে আসেন। পাকা রাস্তায় বাস তাদের নামিয়ে দিয়ে যায়। এখান থেকে মাইল দেড়েকের হাঁটা পথ। স্কুলের অন্যান্য কর্মীরা এই অঞ্চলেরই, সবাই কর্তাবাবুর লোক।
“মাস্টার বাবা। তু মুকে পড়া লিখ্যা শিখাবি”? ছেলেটা তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি। মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল “শিখাবি পড়া লিখ্যা”?
ঘরের তালা খুলতে খুলতে প্রধানশিক্ষক দ্বিজেন আচার্য একটু হেসে বললেন, “সে কিরে? তুই লেখাপড়া শিখবি?” ছোট্ট ছেলেটা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “তুর যত্ত কাম কাজ, সব মু কইরে দিবো।” ওর হাসি মুখটা একটু করুণ দেখাল।
“ঘরে কে কে আছে?”
“বাপটো বটে। মা লাই। ভাই বুন কেউ লাই।”
সেই থেকে কালু থেকে গেল দ্বিজেন মাস্টারের কাছে। প্রথম প্রথম সন্ধ্যের দিকে ছুটে ছুটে ঘরে ফিরে যেত। আবার ভোরবেলা ফিরে আসত। প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেল, আর সে ঘরে ফেরেনি। ওর বাবা এসে মাঝে মাঝে দেখা করে যায়। দ্বিজেন স্যার কয়েকবার ছেলেটার বাবাকে কিছু টাকাপয়সা দিতে চেয়েছিলেন। হাতজোড় করে বলেছিল – ‘পয়সা কড়ি লাগবেক নাই। ছ্যালাটা আপনার ঠ্যাকে মানুষ হবেক।” আরও বলেছিল ছেলেবেলা থেকেই ওর লেখাপড়ার খুব শখ। কালুর দাদা, অর্থাৎ ঠাকুরদা, পাহাড়ের ওপারে এক সরকারী কর্মীর কাছে কাজ করত। তাঁর কাছেই লেখাপড়া শিখেছিল। প্রতিদিন কাজ থেকে ঘরে ফিরে নিজের ছোট্ট নাতিটাকে কোলে বসিয়ে পড়া শেখাত, লেখা শেখাত। তারপর এক-দিন সন্ধ্যার অন্ধকারে কারা যেন এসে ওপারের সেই ভালোমানুষ বাবুটাকে মেরে কালুর দাদাকেও মেরে রেখে গেল।
কালুও ওর মাস্টারবাবাকে দাদার কথা বলত। দাদা চলে যাওয়ার পর, ঘরে আর মন লাগত না।
ছুটির দিনগুলোতে স্কুলের ছেলেরা, দল বেঁধে তাদের হেডস্যারের কাছে পড়তে আসে। তিনি অঙ্কের মাস্টারমশাই হলেও মোটামুটি প্রায় সব বিষয়ই তিনি পড়াতে পারতেন। এই সব ছাড়াও তাঁর প্রধান কর্তব্য ছিল, প্রত্যেকদিন স্কুল থেকে ফিরে সন্ধ্যের পর বড়ো বাড়িতে গিয়ে কর্তাবাবুর একমাত্র নাতি পার্থপ্রতিমকে পড়ানো। তাঁর ছেলে বিদেশে চাকরি করে। নাতির সব দায়িত্ব তিনি নিজে নিয়েছেন। তাঁরই প্রতিষ্ঠিত স্কুলেরই সে ছাত্র। আর তার এই একমাত্র বংশধর, তাঁর নয়নের মণি নাতির পড়াশোনার সব দায়িত্ব দ্বিজেন মাস্টারের ওপর ছেড়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত। নাতি অন্ত প্রাণ, দেবতোষ বাবুর একটাই লক্ষ্য তাঁর নাতি শুধু এই স্কুলের বা এই শহরের নয়, সমস্ত জেলার মুখ উজ্জ্বল করবে একদিন একথা তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, আর বিশ্বাস করেন দ্বিজেন মাস্টারকে। তাঁর নাতি বুদ্ধিমান ও মেধাবী। ক্লাসের ফার্স্ট বয়।
কালুকে এই অঞ্চলের প্রায় সবাই এখন চেনে। অনেকটা লম্বা হয়ে গেছে সে, পেটানো চেহারা হাসিখুশি। গত পাঁচবছর ধরে প্রায় প্রতিদিন সে মাস্টারবাবার ব্যাগটা হাতে নিয়ে তাঁকে স্কুলের গেট অবধি পৌঁছে দেয়। আবার ছুটি হয়ে গেলে, গেটের একপাশে এসে তাঁর জন্য অপেক্ষা করে। এই কাজের দায়িত্বটা সে প্রায় জোর করেই নিয়েছে। এই কাজটাতে সে খুব আনন্দ পায়। স্যার যখন বেরিয়ে আসেন তখন স্কুল প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। সেই সময় কালু মাঝে মাঝে স্কুলের কম্পাউন্ডে ঢুকে পড়ে। উঁকি ঝুঁকি মেরে দ্যাখে সারি সারি ক্লাস রুম, ফাঁকা বেঞ্চগুলো, দেয়ালের ব্ল্যাকবোর্ড এই সব কিছু।
কালু তার মাস্টারবাবার একার জীবনের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘরে বাইরের যাবতীয় কাজ সে খুব যত্ন নিয়ে করে। ফাঁকা বাড়িতে একা একা সারাদিন সে স্কুলের ছেলেদের যত খাতাপত্র, বই, পাঁজা করা পরীক্ষার সব খাতা, নেড়েচেড়ে দেখে, আবার যত্ন করে তাকের ওপর গুছিয়ে রাখে।
দ্বিজেন স্যারও ওর প্রয়োজনের দিকে যতটা সম্ভব নজর রাখেন। জামাকাপড়, টুকিটাকি জিনিসপত্র, আর মাঝে মাঝে স্কুল থেকে বইখাতা এনে দেন। প্রথম থেকেই এই রকম চলে আসছে। সারাটা দিন তিনি স্কুল নিয়ে বড়ো ব্যস্ত থাকেন। কালুকে লেখাপড়া শেখানোটা আর হয়ে ওঠেনা।
ছুটির দিনে বিভিন্ন ক্লাসের ছেলেরা তাদের পড়াশোনার নানা বিষয়ের সমস্যা নিয়ে তাদের হেডস্যারের কাছে এসে হাজির হয়। অঙ্ক, ইংরেজী, বাংলা, ভূগোল, ইতিহাস, বিজ্ঞান ইত্যাদি প্রায় সব বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়। এই সব দিনগুলোতে, কালু ওর কাজকর্ম খুব তাড়াতাড়ি সেরে নেয়। ঘরের এককোণে বসে খুব নিবিষ্ট মনে সব কিছু শোনে।
কর্তাবাবুর নাতিকে পড়িয়ে দ্বিজেন মাস্টারের বাড়ি ফিরতে প্রতিদিনই বেশ রাত হয়। কালু ততক্ষণ ওর ছোটো ঘরখানাতে নিজের বইখাতার ওপর ঝুঁকে থাকে। বাইরে গেট খোলার আওয়াজ হলেই হাসিমুখে ছুটে আসে। মাস্টারবাবার কাঁধ থেকে কাপড়ের ঝোলাটা নামিয়ে নেয়। কালুর মুখের ভাষাও এখন পালটে গেছে, ওর ছেড়ে আসা গাঁও, বনজঙ্গলের ভাষা আর বলেনা।
ছুটির দিনগুলোতে স্কুলের ছাত্ররা চলে যাবার পর, দুপুরের খাওয়াদাওয়া মিটতে অনেক দেরি হয়ে যায়। শেষ বেলার দিকে দ্বিজেন বাবু একটু ঘুমিয়ে পড়েন। সেদিন তাঁর ঘুম আসছিল না, খাণিকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে উঠে পড়লেন। কালুর খোঁজ করতে গিয়ে দেখেন, সে তার ছোট্ট একফালি ঘরটায় দরজার দিকে পেছন ফিরে, মাটিতে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে একমনে কিছু করছে। তিনি নিঃশব্দে পেছনে এসে দাঁড়ালেন। সামনে ছড়ানো তাঁরই এনে দেওয়া বইপত্র। সাদা কাগজ দিয়ে সেলাই করা একটা লম্বা খাতায় পরিষ্কার অক্ষরে, খুব দ্রুত লিখে চলেছে। ওর লেখার ধরন এবং হাতের লেখা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর নিঃশব্দে ফিরে এলেন নিজের ঘরে। ওর বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল। পাঁচটা বছর পেরিয়ে গেছে ছেলেটা তাঁর কাছে আছে। এত বাধ্য এত অনুগত। এতদিন ধরে সে তার কর্তাবাবার শুধু সেবা করেই চলেছে। মনে পড়ে গেল সেই ছোট্ট ছেলেটার প্রথম দিনের বলা কথাগুলো – ‘মুকে তু পড়া লিখ্যাপড়া শিখাবি? তুর সব কাম কাজ মু কইরে দিব।’ কালু তার কথা রেখেছে, দ্বিজেন মাস্টার কথা রাখেননি।
রোজই রাতে কালু পরিপাটি করে তার মাস্টারবাবার বিছানা পেতে, মশারি টাঙিয়ে রাখে। বড়ো বাড়ি থেকে অনেক রাত করে বাড়ি ফিরেই তিনি হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসে যান। কালু যত্ন করে টেবিলে তাঁর খাবার বেড়ে দেয়। যখন ছোটো ছিল, তখন কাছেই মাটিতে বসে নিজের খাবারটাও খেয়ে নিত। মাস্টারবাবার সেরকমই হুকুম ছিল। কখন যেন ছেলেটা বড়ো হলে গেল! এখন দ্বিজেনবাবু শুয়ে পড়লে, তাঁর মশারি গুঁজে দিয়ে লাইট নিভিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে আস্তে করে দরজা ভেজিয়ে দেয়। জিজ্ঞেস করলে বলে, “পরে খাব তোমার কত পরিশ্রম হয় সারাটা দিন, তুমি ঘুমিয়ে পড়।” সত্যিই দ্বিজেন স্যার বড়ো ক্লান্ত থাকেন, কথা না বাড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।
রবিবার আজ ছুটির দিন তাই বড়োবাড়ি যাওয়া নেই। সন্ধ্যের মুখে সামনের একফালি বারান্দায় নিজের চেয়ারে চায়ে চুমুক দিতে দিতে কালুর কথাই ভাবছিলেন। সামনের ছোট্ট জমিটাতে কালু বাগান করেছে। কোথা থেকে চারা খুঁজে খুঁজে এনে যত্ন করে গাছ লাগিয়েছে, রকমারি ফুল ফুটিয়েছে। একধারে কিছু সবজিও। লঙ্কা, বেগুন, ঢ্যাঁড়স এই সব। ছেলেটা পারেও বটে। দ্বিজেনবাবু ওকে কখনও বিশ্রাম করতে দেখেননি। মাস্টারবাবাকে চা দেবার পর, গাছে জল দেওয়া এই শেষ করল।
তিনি সস্নেহে ডাকলেন, “কালু আয় এদিকে, বস আমার পাশে।” কালু এখন বছর পনেরোর লম্বা স্বাস্থ্যবান একটা ছেলে। মেঝেতে চেয়ারের পাশে বাবু হয়ে বসে হাসিমুখে তার মাস্টারবাবার মুখের দিকে মুখ তুলে তাকাল।
“তুই এত পড়াশোনা শিখলি কখন? আমি তো তোকে কিছু শেখাইনি।”
“কেন, তোমার ঘরে যে কত্ত বই। তুমি বড়োবাড়ি থেকে ইস্কুল থেকে এনে রাখ। তারপরে তোমার ছাত্তরদের লেখা খাতাগুলান, পরীক্ষার খাতাগুলান, পার্থ দাদাবাবুর খাতা, সব তো থাকে। দেখে দেখেই তো শিখেছি। ছুটির দিনগুলান তোমার ইস্কুলের ছাত্তরদের কত কিছু পড়াও, আমি তো শুনে শুনেই শিখি।” উৎসাহের সঙ্গে কালু বলে চলে। তিনি অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকেন। বুকের মধ্যে কেমন একটা কষ্ট, একটা অপরাধ বোধ জেগে ওঠে।
কোমল কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন “যাবি একদিন স্কুলে?”
“তুমি যদি নিয়ে যাও।” ওর কন্ঠস্বরে দ্বিধা।
“তুই তো অনেকটা বড়ো হয়ে গেছিস, তোর বয়সের ছেলেরা তো ক্লাস নাইনে পড়ে।”
“যদি তুমি বল, সেই কেলাসেই বসব” একটু চিন্তা করে এবার বলল, “কেউ কিছু বলবেক নাইতো?”
“একটা দিন স্কুলের ক্লাসে বসলে, কে আর কি বলবে?” দ্বিজেন মাস্টার ওকে আশ্বস্ত করেন। “কালই তবে চল।”
দ্বিজেন আচার্য বুঝতে পারলেন, কর্তাবাবুর নাতির পুরোনো যেই বইগুলো স্কুলের কিছু দুস্থ ছেলেদের জন্য এনে তিনি ঘরে রেখেছেন, সেই-গুলোই কালু এই ক-বছর ধরে পড়ে ফেলেছে।
মনে তাঁর একটা দুশ্চিন্তা ছিলই, তবু খানিকটা যেন জেদের বশেই কালুকে নিয়ে স্কুলে ঢুকলেন। তখনও স্কুল শুরু হতে একটু দেরি আছে, ছাত্ররা কেউ এসে পৌঁছয়নি। কালু ক্লাস নাইনের খালি ঘরটাতে একদম পেছনের সারির বেঞ্চে গিয়ে চুপ করে বসল। ওর সামনে একটা খাতা আর কলম।
একে একে ছেলেরা আসতে শুরু করল। ক্লাসে ঢুকতে গিয়ে সবাই একবার করে থমকে দাঁড়িয়ে ওকে অবাক চোখে দেখে, যে যার নিজের জায়গায় গিয়ে বসতে লাগল। ক্লাসে শুরু হয়ে গেল গুঞ্জন, আর পেছনে ফিরে ফিরে দেখা। সব শেষে এল ক্লাসের ফার্স্ট বয় পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায়। মুহুর্তে কয়েকটি ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে ওকে ঘিরে ফিসফিস করতে শুরু করেছে। পার্থ একটু তাচ্ছিল্য ভরে পেছন ফিরে একবার তাকিয়েই নিজের নির্দিষ্ট জায়গা ফার্স্ট বেঞ্চে গিয়ে বসল।
স্কুল ছুটি হয়ে যাবার পর রোজকার মতো প্রধানশিক্ষক তাঁর নিজস্ব ঘরে ঢুকে কিছু কাজ সেরে নিচ্ছিলেন। কালু গেটের বাইরে তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিল, আজও সে মাস্টারবাবাকে সঙ্গে নিয়েই ঘরে ফিরবে।
দারোয়ান এসে খবর দিল, কর্তাবাবু লোক পাঠিয়েছেন, মাস্টারমশাই বাড়ি ফেরার আগে যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করে যান। দ্বিজেন আচার্যকে সামান্য চিন্তিত দেখাল। কালুকে ডেকে, ওর হাতে চাবিটা দিয়ে বললেন- “তুই বাড়ি যা হাত মুখ ধুয়েই কিছু খেয়ে নিবি আগে। সেই সকাল থেকে বসে আছিস। আমি ঘুরে আসি, কর্তাবাবু কেন ডেকেছেন দেখি। দেরি হলে, একেবারে পার্থকে পড়িয়েই ফিরব।” কালু তার মাস্টারবাবার মুখের দিকে তাকিয়ে একবার মাথা নাড়ল শুধু। একটু ধীরপায়ে স্কুলের গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল।
বড়োবাড়িতে বসার ঘরে দেবতোষ মুখার্জী সহাস্যে আপ্যায়ন করলেন, “এসো মাস্টার, তোমাকে একটু কষ্ট দিলাম। হাত মুখটা ধুয়ে নেবে নাকি?” রুমালে কপালের ঘাম মুছে স্কুলের প্রধানশিক্ষক কর্তাবাবুর মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন, “নাঃ ঠিক আছে।”
ভেতর বাড়ি থেকে কাজের লোক ট্রেতে করে চা জলখাবার নিয়ে ঢুকল। কর্তাবাবু নরম সুরে বললেন, “নাও আগে খেয়ে নাও। সেই সকাল থেকে খাটুনি তো তোমার কম যায় না! ওরে মাস্টারকে হাত ধোবার জল দে।”
খাওয়া শেষ করে, দ্বিজেন আচার্য এবার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আশুতোষ বিদ্যামন্দিরের মালিকের সামনে সোজা হয়ে বসলেন।
দেবতোষবাবু একটু নিম্নস্বরে শুরু করলেন, “আজ তোমার ছাত্রটির ভারি অভিমান হয়েছে মাস্টার! আমার দাদুভাই তোমায় কতটা সম্মান করে জানোতো? আজ স্কুল থেকে ফিরেই আমাকে যা বলল, তাতে কিন্তু আমি ভারি আশ্চর্য হয়ে গেছি।” দ্বিজেন স্যার কোনো প্রশ্ন না করে দেবতোষ মুখার্জীর চোখের দিকে একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
“মাস্টার, তুমি বিদ্বান, বুদ্ধিমান আর ভদ্রলোক বলেই তো আমি আমার স্বপ্নের স্কুল আর আমার দাদুভাইয়ের সব দায়িত্ব তোমার উপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত আছি।” এবার স্বর পাল্টে গম্ভীর গলায় বললেন, “তুমি হঠাৎ কি ভেবে ঐ জংলী মুন্ডা ছোঁড়াটাকে আমার স্কুলে ঢোকালে? আমার দাদুভাইয়ের সঙ্গে একই ক্লাসে বসালে? আমি তো এর অর্থ খুঁজে পেলাম না! তোমার কাছে এইটে কিন্তু আমি আশা করিনি। তোমার ছাত্রটি এতে কতটা দুঃখ পেয়েছে, অপমানিত হয়েছে তুমি জান?”
একটু চুপ করে থেকে, দ্বিজেন আচার্য নম্র সুরে এবার বললেন, “কর্তাবাবু ও লেখাপড়া খুব ভালোবাসে। আমার কাছে পাঁচ বছর ধরে আছে। বড়ো ভালো ছেলেটা। খুব বাধ্য ভদ্র। ওর ইচ্ছে একদিন স্কুলে গিয়ে একটু ক্লাসে বসবে। কোনোদিন তো স্কুলে পড়েনি। তাই আমি ভাবলাম, একটা দিন একটু বসুক না, কি এমন ক্ষতি হবে?”
গমগমে গলায় দেবতোষ মুখার্জী বলে উঠলেন, “ওর যদি ইচ্ছে হয় স্কুলে ভর্তি হবে, আমাদের সব ছেলেদের সঙ্গে ক্লাসে, একসঙ্গে বসে লেখা পড়া করবে, তাই এলাউ করতে হবে? তুমি তো ভালো করেই জান, এখানে ঐ অচ্ছুৎগুলোর সঙ্গে কারুরই মেলামেশা নেই! ওর বাপটাকে আমি ভালোই চিনি। মেধো মুন্ডা। আমাদের বাস রাস্তা তৈরির সময় মাটিকাটার কাজ পেয়েছিল। তাছাড়া এই কয়েকবছর আগেও মাঝে মাঝে এসে আমার গোয়ালঘর, আস্তাবল পরিষ্কার করে দিয়ে যেত। আমি তো জানতামই না, তোমার ঘরের ঐ কাজের ছোঁড়াটা, মেধোর ছেলে। আমার ড্রাইভার হরিসিং বলল।”
এবার প্রসঙ্গ পালটে নিজেকে সংযত করে নরম স্বরে বললেন, “তোমার ছাত্রটি মনে হয় তার পড়ার ঘরে তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে।”
দ্বিজেন আচার্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত স্বরে বললেন, “মাপ করবেন কর্তাবাবু, খুব ক্লান্ত লাগছে। আজ বোধহয় পার্থকে পড়াতে পারব না, ওকে বুঝিয়ে বলবেন একটু। আসি আজ।” দেবতোষ মুখুজ্জে গম্ভীর মুখে বললেন, “হ্যাঁ, ক্লান্ত লাগারই তো, সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছ। ঠিক আছে দাদুভাই কে বুঝিয়ে বলব খন। একটু দুঃখ পাবে এই যা।” দ্বিজেন স্যার দরজার দিকে এগোতেই কর্তাবাবু আবার একটু জোর গলাতেই বললেন, “কাল আসছ তো?” উনি মাথা নেড়ে দরজার কাছাকাছি পৌঁছতেই আবার পেছন থেকে বিদ্রুপের স্বর শুনলেন, “ঐ জংলী ছোঁড়াটাকে তুমি লেখাপড়া শেখাচ্ছ নাকি?” ঘুরে দাঁড়িয়ে কর্তাবাবুর চোখে চোখ রেখে সামান্য হেসে দ্বিজেন বাবু বললেন, “আমার সময় কোথায়? ওকে শেখাবার।” “তা বটে, তুমি তো শুনি আমার স্কুলের ছেলেদেরও পড়াটরা দেখিয়ে দাও। তোমার কাছেই সবাই পড়তে যায়।” এবার হেসে বললেন, “যাবেই তো, এই তল্লাটে তোমার মতো মাস্টার পাবে কোথায়?”
প্রধানশিক্ষক দ্রুত পায়ে এবার বড়ো বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন।
পুজো শেষ হয়ে গেছে। দেখতে দেখতে স্কুলের ছাত্রদের ফাইনাল পরীক্ষার দিন এগিয়ে এল। সামনেই টেস্ট পরীক্ষা। মাস দেড়েক বাকি আছে। পার্থপ্রতিম মুখার্জীও এবার ফাইনালের পরীক্ষার্থী। তার জন্য প্রধানশিক্ষককে আরও বেশি সময় দিতে হচ্ছে। বড়ো বাড়ি থেকে ফিরতে অনেকটা রাত হয়ে যায়। তাছাড়া ছুটির দিনগুলোতে অন্য সব পরীক্ষার্থীরা সকাল বিকেল ভিড় করে যাওয়া-আসা করছে। তাঁর যেন নিঃশ্বাস ফেলারও সময় হচ্ছে না।
একদিন রাতে শুতে যাবার আগে কালুকে কাছে ডেকে কোমল স্বরে বললেন, “ওরা তো তোকে স্কুলে পড়তে দেবে না! তুই ঘরে বসেই পড় না আমি তোকে সব বইপত্র এনে দেব।” কালু মাথা নেড়ে, মাস্টারবাবার মশারি গুঁজে লাইট নিভিয়ে নিঃশব্দে নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল।
দ্বিজেন স্যার, কালুকে বইখাতা পেন্সিল কলম সব এনে দিয়েছেন। এর বেশি কিছু করার ছিল না তাঁর। কালুও তাঁর কাছে কোনো দিন পড়ালিখার কথা আর বলেনি। তবে স্কুলের ছেলেরা যখন ছুটির দিনে সকাল বিকেল তাঁর কাছে পড়তে আসে, সে নিয়ম করে ঘরের কোণে বসে থাকে। এই পাঁচ বছর ধরে এটা দেখে দেখে সবার অভ্যেস হয়ে গেছে। কেউ আর তাকায় না ওর দিকে।
সেদিন রবিবার ভোরবেলা, বারান্দায় চেয়ারে বসে দ্বিজেন আচার্য, পুরোনো খবরের কাজটারই পাতা ওল্টাচ্ছেন। কালু মাস্টারবাবার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে, নিজে তাঁর পাশেই মেঝেতে বসল। একটু দ্বিধা জড়িত গলায়, খুব আস্তে করে বলল, “রঘুদাদা বলছিল, ইস্কুলে না পড়েও নাকি পেরাইভেটে ইস্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়া যায়।” একটু থেমে ব্যাকুল কন্ঠে জিজ্ঞেস করল” আমি পারি না মাস্টার বাবা?” চমকে উঠলেন দ্বিজেন স্যার। রঘুনাথ স্কুলের দারোয়ান। সারাদিনই প্রায় স্কুলের গেটের পাশে একটা টুলে বসে থাকে। কালুর সঙ্গে প্রায়ই ওকে কথা বলতে দেখেছেন তিনি। খালি কাপ পাশের টুলে রেখে মাথা নেড়ে বললেন- “হ্যাঁ, দেওয়া যায় প্রাইভেটে পরীক্ষা। নরম করে বললেন, “দিবি তুই পরীক্ষা? পারবি?”
কালুর মুখে হাসি ফুটল- “পারব, যদি তুমি বল।” দ্বিজেন আচার্যর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ঠিক আছে, আমি দেখছি।”
পরের দিনই প্রধানশিক্ষক, ছুটির পর, অন্য সব শিক্ষকদের নিয়ে মিটিংএ বসলেন। কালুর সব কথা তাঁদের জানালেন। এখানে কালুকে সবাই প্রায় চেনে, দেখেছে ওকে। দ্বিজেন বাবু তাঁর বক্তব্য পেশ করে তাঁদের মতামত জানতে চাইলেন। তাঁর একটাই প্রশ্ন যদি কালু এই স্কুল থেকে টেস্ট পরীক্ষা দেয় এবং এলাউ হয়, প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল দিতে পারে কিনা! শিক্ষকরা নীচু গলায় নিজেদের মধ্যে একটুক্ষণ আলোচনা করে, অবশেষে বললেন, “আপনি যদি ব্যবস্থা করতে পারেন আমাদের আপত্তি থাকবে কেন? এখন সমাজ এগিয়ে গেছে, সমাজের বাইরে থেকে এসে যদি কেউ পড়াশোনা করার সুযোগ পায়, শিক্ষক হিসেবে তো আমাদের বাধা দেওয়া উচিত নয়।” দু-একজন একটু আপত্তি তুললেও, বাকি প্রায় সবাই প্রধানশিক্ষকের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেন। কিন্তু মূল কথা কর্তাবাবুর অনুমতি। সেই দায়িত্ব হেডস্যারকে একাই নিতে হবে।
এই সব কিছুই দ্বিজেন আচার্য জানেন। সব ব্যবস্থা তাঁকে একাই করতে হবে, তাও জানেন। এখন প্রধান এবং সব থেকে বড়ো কাজ এই স্কুলের এবং বলতে গেলে এই শহরের দন্ডমুন্ডের কর্তা দেবতোষ মুখার্জীর মুখোমুখি হওয়া।
দেরি হয়ে গেছে অনেকটা। তাই তিনি মিটিংয়ের শেষে বাড়ি না ফিরে সোজা বড়ো বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালেন।
তাঁকে এই সময় দেখে দেবতোষ মুখুজ্যে একটু অবাক হলেন।– “আরে, মাস্টার তুমি এ সময়? বাড়ি যাওনি?”
“নাঃ, আপনার সঙ্গে একটু দরকার আছে।”
“ঠিক আছে শুনব। তার আগে তুমি চা টা খেয়ে নাও।” বলেই অন্দরের দিকে হাঁক পারলেন। দ্বিজেন মাস্টার বাধা দিয়ে বললেন, “আগে কথাটা সেরে নিই।”
“এতই জরুরি কথা?” হালকা মেজাজে জিজ্ঞেস করলেন, কর্তাবাবু।
স্কুলের প্রধানশিক্ষক দ্বিজেন আচার্য, খুব সংক্ষেপে এবং স্পষ্ট ভাষায় নিজের বক্তব্য পেশ করলেন। বোমা ফাটার মতো গর্জন করে উঠলেন স্কুলের মালিক—“তার মানে? ঐ অচ্ছুৎ জংলী ছোঁড়াটা আমার স্কুলে টেস্ট পরীক্ষায় বসবে? তুমি ভাবলে কি করে?” রাগে তাঁর চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছে।
দ্বিজেনবাবু নিজের মনকে প্রস্তুত করে নিলেন। তারপর দৃঢ় স্বরে বললেন, “আপনার স্কুল। আপনি এই শহরের মাথা। এখানে সবাই আপনাকে শ্রদ্ধা করে। একটি দরিদ্র ছেলে, শুধু একবারের জন্য একটি পরীক্ষায় যদি বসতে চায়, তাতে আপনি আপত্তি করবেন, এটা কিন্তু ভাবিনি কর্তাবাবু! তাছাড়া ও অন্য ছেলেদের সঙ্গে বসবেও না। আমি ভেতরের দালানে ব্যবস্থা করে দেব, সেখানে বসে যদি ও পরীক্ষাটা দিতে পারে। প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল দেবার ইচ্ছেটাই ও শুধু প্রকাশ করেছে, আর কিছুই চায় না।”
কিছুক্ষণ নিঃশব্দে থেকে দেবতোষ মুখার্জী নিজের রাগ সংবরণ করে এবার বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “একেই বলে গরিবের ঘোড়ারোগ। সাপ ব্যাঙ খেয়ে, জঙ্গলের জানোয়ার মেরে যারা বেঁচে থাকে তারাও স্কুল ফাইনাল দিতে চায়! বলেই হা-হা করে অট্টহাস্য করে উঠলেন। হাসি থামিয়ে এবার কঠিন স্বরে কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন, “নেহাৎ তোমাকে পছন্দ করি, আমার এই স্কুল বড়ো হওয়ার পেছনে তোমার অনেক অবদান আছে; সবচাইতে বড়ো কথা আমার দাদুভাইয়ের শিক্ষক তুমি। তাই আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও তোমার কথায় আমাকে রাজি হতে হবে। তুমি আমি আমরা সবাই খুব ভালো করেই জানি, ফাইনালে বসা ওর কোনোদিনই হবে না।” রাগ রাগ গলায় এবার বললেন, “ও কি ভাবছে তোমার কাছে আবদার করে টেস্টে বসতে পারলেই ও পাশ করে যাবে আর ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারবে? অতই সোজা! লেখাপড়ার বোঝে কিছু? তোমার কাছে থাকতে থাকতে আর চোখের সামনে স্কুলের ছেলেদের দেখে চাঁদ ধরার শখ হয়েছে।” একটু থেমে কিছু চিন্তা করে নিয়ে বললেন, “ঠিক আছে দিলাম অনুমতি। কিন্তু এই প্রথম আর এই শেষ। এটা আমার দাদুভাই এর পরীক্ষার বছর, এখন এসব উটকো ঝামেলা আমার একেবারেই পছন্দ নয়।”
দ্বিজেন আচার্যর বুক থেকে যেন ভারি একটা পাথর নেমে গেল। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, “আমি বাড়ি ফিরে একটু চান করে এসে পার্থকে পড়াচ্ছি”- চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। কর্তাবাবুর মুখ এবার প্রসন্ন হল, “যাও একটু বিশ্রাম নিয়ে এসো। যা ধকল যায় তোমার ওপর দিয়ে। ও! একটা কথা, আজ কিন্তু এখানে রাতের খাবার খেয়ে তবে যাবে। কোনো অজুহাত শুনব না।” দ্বিজেন স্যার সামান্য হেসে মাথা নেড়ে বড়ো বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন।
দিনগুলো যেন বড়ো তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যে একদিন দ্বিজেনবাবু স্কুল থেকে ফিরে চা খাবার খেয়ে, কালুকে ডাকলেন। ওর হাতে তুলে দিলেন নতুন একটা টেস্ট-পেপার, জ্যামিতির একটা বাক্স, দুটো ঝর্ণা কলম আর কালির দোয়াত। হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “এই মোটা বইটা চিনিস? আর এই বাক্সটা?” কালু একগাল হাসলো, “টেস্ট পেপার আর জ্যামিতির বাক্স। এতবছর ধরে তোমার ঘরে এইগুলো দেখে দেখেই তো এতটা বড়ো হলাম।” দ্বিজেন স্যার হাসতে হাসতে বললেন, “তোকে কিচ্ছু শেখাতে লাগে না।”
“তোমার তাকের যত বই যত জিনিসপত্তর সব তো আমিই গুছোই। তোমার ছাত্তরদের কতকিছু পড়াও শেখাও, তা কি আমি দেখি না?”
প্রধানশিক্ষকের বই এর তাকগুলোতে প্রায় সব ক্লাসের সব বই সারাবছর ধরে থাকে। থাকে কয়েকবছর জমানো টেস্ট-পেপার, পরীক্ষার খাতা, জ্যামিতি বাক্স। অনেক বছর ধরে এই স্কুলের প্রায় সব ছাত্রদের দায়িত্ব তিনিই যেন বহন করে চলেছেন। তাঁর অক্লান্ত নিষ্ঠা আর পরিশ্রমের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে ‘আশুতোষ বিদ্যামন্দির’। তার উন্নতি অবনতি সব তাঁরই হাত ধরে।
টেস্ট পরীক্ষার দিন একটু সকাল সকাল স্কুলে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। বেরোবার আগে কালুর মাথায় হাত রেখে বললেন, “যা বলে দিয়েছি সব মনে আছে তো? কলম পেন্সিল স্কেল সব গুছিয়ে নিয়েছিস তো? কলমে কালি ভরেছিস?” কালু ওর সেই গালভরা হাসি নিয়ে ঘাড় কাৎ করে বলল, “তুমি আমার জন্য একটুও চিন্তা কোরো না মাস্টারবাবা, সব ঠিক আছে।”
বাগানের ছোটো কাঠের গেটটা ঠেলে বেরোতে বেরোতে বললেন, “ঠিক সময় বেরিয়ে পড়িস। স্কুলের গেটের পাশে গিয়ে দাঁড়াবি, আমি সময়মতো তোকে ডেকে নেব।
আজ কালু, এবার পুজোতে পাওয়া নতুন জামা-প্যান্ট, নতুন চটি পরে চুল আঁচড়ে মনভরা খুশি নিয়ে স্কুলের গেটে হাজির। কাঁধ থেকে ঝুলছে মাস্টারবাবারই পুরোনো কাপড়ের ঝোলাটা। দারোয়ান রঘুনাথ তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে পিঠে আদরের চাপড় মেরে বলল, “সাবাস কালচাঁদ! তুই পারবি আমি জানি।” কালু ওর রঘুদাদার হাতখানা জড়িয়ে ধরল, কালো মুখটা হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
যে ক-দিন পরীক্ষা চলল, কালু স্কুলের ভেতর দালানের এক কোণে একটা টুলে বসে, সামনে রাখা একটা বেঞ্চির ওপর খাতা রেখে একমনে পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষার্থী সব ছেলেরা প্রথম দিকে উঁকিঝুঁকি মারত। পরের দিকে আর কেউ তাকায়নি। শুধু দু-একজন মাস্টারমশাই এসে মাঝে মাঝে দেখে যেতেন।
স্কুলের ফল বেরোবার সময় ঘনিয়ে এল। কয়েক দিনের মধ্যেই পরীক্ষা উত্তীর্ণদের তালিকা প্রত্যেক বছরের মতো এবারও স্কুলের সামনের বারান্দার দেয়ালের বোর্ডে টাঙিয়ে দেওয়া হবে। তারপর দিন যে যার নম্বর হাতে পেয়ে যাবে।
রেজাল্ট বেরোবার দিন কয়েক আগে, স্কুল ছুটির পর, প্রধানশিক্ষকের ঘরে অন্য সব শিক্ষকরা তাঁদের যে যার বিষয়ের খাতা জমা দেবার জন্য এক সঙ্গে মিলিত হলেন। দরজা ভেজিয়ে দেওয়া হল। দ্বিজেন আচার্য গম্ভীর মুখে নিজের চেয়ারে এসে বসলেন। পরিবেশটা একটু থমথমে। মাস্টারমশাইরা নিজেদের মধ্যে একবার দৃষ্টি বিনিময় করলেন। দ্বিজেন বাবু বললেন, “এবার আপনাদের মতামত আমি শুনব।”
বিজ্ঞানের শিক্ষক তাপসবাবু শুধু উচ্চারণ করলেন, “এটা কি করে সম্ভব হল স্যার?” বাকি শিক্ষকরা সবাই প্রায় সমস্বরে একথাই যেন বলতে চাইলেন। দ্বিজেন আচার্য চিন্তিত মুখে বললেন, “সমস্যা সাংঘাতিক জটিল হয়ে উঠল।” নিজের সামনে রাখা খাতাখানা হাত দিয়ে একবার স্পর্শ করে, দু-এক পৃষ্ঠা উল্টে দেখে নিয়ে বললেন, “আমার শিক্ষক জীবনে এই প্রথম একটি ছাত্রকে অঙ্কে পূর্ণ সংখ্যা দিতে আমি বাধ্য হলাম। পার্থপ্রতিম নব্বই শতাংশ পেয়েছে। কালাচাঁদ মুন্ডা একশোয় একশো”। একটু চুপ করে থেমে আবার বললেন, “এই স্কুলে প্রথম থেকেই প্রায় সব ছেলেদের অঙ্ক আমিই শিখিয়েছি। কালাচাঁদকে একদিনও শেখাবার সময় আমার হয়নি।” তাঁর গম্ভীর মুখ বিষণ্ন হয়ে উঠল। এবার বাকি শিক্ষকরা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “ওর খাতায় আমরা লাল আঁচড়টুকু কাটতে পারিনি, কেউ না।”
“ব্যাপারটা কেমন যেন অলৌকিক মনে হচ্ছে।” বাংলার শিক্ষক মন্তব্য করলেন।
কিছুক্ষণ নিরবতার পর, প্রধানশিক্ষক সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে এবার পরিষ্কার গলায় বললেন, “আপনাদের সবাইকে এখানে একসঙ্গে ডাকার উদ্দেশ্য একটাই এই খবর যেন ঘুণাক্ষরেও বাইরে প্রকাশ না পায়। ওর খাতাগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরিয়ে ফেলতে হবে।” তারপর দৃঢ় কন্ঠে বললেন, “উর্ত্তীনদের লিস্ট টাঙিয়ে দেওয়া হোক, কাঁলাচাঁদ মুন্ডার নামও সেখানে থাকবে, কিন্তু নম্বর ওকে জানানো হবে না।” একটু থেমে বললেন, “এটা না করে আমার আর কোনো উপায় নেই।”
কালু লিস্টে নিজের নাম দেখে এসেছে। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেছে, “কর্তাবাবা! আমার পরীক্ষার নম্বর ভালো হয়েছে, তুমি আমাকে বললে না তো কিছু?”
দ্বিজেনবাবু গম্ভীর স্বরে বললেন, “হ্যাঁ ভালো হয়েছে। আচ্ছা কালু একটা কথা বলত, এতসব শিখলি কোথায়? আমি তো তোকে কিছুই শেখাইনি।”
কালু ওর কালো মুখখানায় হাসি ছড়িয়ে বলল, “কেন? তোমার কাছেই তো সব শিখেছি। এতদিন ধরে এত ছাত্তর তোমার কাছে পড়তে এসেছে, আমিও তো সেখানেই থেকেছি।”
দ্বিজেন আচার্য আশ্চর্য দৃষ্টিতে ওর দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন।
ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক আগের দিন পর্যন্ত তাঁর কাছে পরীক্ষার্থীদের লাগাতার আসা-যাওয়া চলল। বড়ো বাড়িতে পার্থকে পড়িয়ে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। বড়ো ক্লান্ত লাগে নিজেকে।
এখানকার স্কুলের ছেলেদের ‘সিট’ পড়েছে একটু দূরের শহরতলির এক স্কুলে। বাসে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হবে। সব ব্যবস্থাই তাঁকে করতে হয়। দেখতে দেখতে স্কুলে ‘আডমিট কার্ড’ এসে গেলো। কালুর হাতে তুলে দিলেন তার কার্ডখানা। সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে, তার ভুলে যাওয়া ভাষায় হঠাৎ বলে উঠল, “মাস্টারবাবা এটা কি বটে?”
দ্বিজেন বাবু সামান্য হেসে বললেন, “পরীক্ষায় বসার ‘অনুমতি-পত্র’ সাবধানে রাখিস, পরীক্ষা দেয়ার সময় দেখাতে হয়।”
হাসিতে মুখ ভরিয়ে কালু একটু আবেগের সঙ্গে বলে উঠল, “এবার আমি সত্যিই পরীক্ষা দিতে পারব?” ঘরে ঢুকতে ঢুকতে তিনি ছোট্ট করে বললেন, “হ্যাঁ”।
আগামীকাল পার্থপ্রতিম মুখার্জীর স্কুল-ফাইনাল পরীক্ষা। কর্তাবাবু মাস্টারকে আজ রাতের খাবার না খাইয়ে ছাড়লেন না। অনেক রাত হয়ে গেল স্কুলের ফার্স্ট বয়ের শেষ পরীক্ষার প্রস্তুতিতে।
আজ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা, স্কুলের মালিক এবং এই ছোটো শহরটার সর্বময় কর্তা দেবতোষ মুখার্জী বেশ কিছুক্ষণ অন্তরঙ্গ সময় কাটালেন তাঁর স্কুলের প্রধানশিক্ষকের সঙ্গে। কর্তাবাবুকে আজ একটু বেশি উতলা আর আবেগপ্রবণ লাগছিল। দেয়ালের বড়ো ঘড়িতে রাত এগারোটার ঘণ্টা বাজতেই দ্বিজেন আচার্য উঠে দাঁড়ালেন। এবার তাঁকে ফিরতে হবে, ছেলেটা জেগে বসে আছে।
সারারাত তিনি চোখের পাতা এক করতে পারলেন না। অনেক রাত অবধি কালুর ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছিল।
শেষ রাতের দিকে হয়তো চোখের পাতা একটু লেগে এসেছিল, শুনতে পেলেন কুয়োতলায় বালতি দিয়ে জল তোলার আওয়াজ। রোজ ভোরের বেলা মাস্টারবাবার স্নানের জল কালু ভরে রাখে। রাত ফুরোবার আগেই এতবছরের এই নিত্য কর্তব্য কালু করে রাখছে। আজ একটু তাড়া আছে, আজ যে ওর পরীক্ষা!
দ্বিজেন আচার্য বিছানা ছেড়ে নিঃশব্দে সামনের ছোট্ট বারান্দাটায় এসে দাঁড়ালেন। পুবের আকাশে ভোরের আলো ফুটছে। স্থির দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন মনে মনে উচ্চারণ করলেন, ‘এখানে সবাই বলে দেবতোষ মুখার্জী স্কুলের জন্মদাতা, দ্বিজেন আচার্য স্কুলের জীবন।’
“মাস্টার বাবা! রাত্তিরে তোমার ঘুম আসেনি?” কালু কখন যেন এসে নিঃশব্দে তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছে। কালো মুখখানার একপাশে ভোরের আবছা আলো। দ্বিজেন স্যার মনকে প্রস্তুত করলেন। কালু এখন অনেকটা লম্বা, মাস্টার-বাবার বুক ছাড়িয়ে উঠেছে ওর মাথা। দ্বিজেন আচার্য ঘুরে দাঁড়িয়ে, ওর দুই কাঁধে দু-খানা হাত রেখে, কোমল কন্ঠে বললেন, “তোকে একটা কথা বলব? রাখবি আমার কথা?” কালু স্থির দৃষ্টিতে ওর মাস্টার-বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
একটু যেন ব্যাকুল কন্ঠে তিনি বললেন, “সামনের বছর আমি নিজে দায়িত্ব নিয়ে তোকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাব। এই বছরটা তুই পরীক্ষা দিস না কালু!”
মাস্টারবাবার কাছ থেকে নিজেকে আস্তে করে সরিয়ে নিয়ে মুখ নামিয়ে শব্দহীন পায়ে ভেতরে চলে গেল। দ্বিজেন মাস্টার তাঁর নিজস্ব চেয়ারটায় বসে পড়ে, চেয়ারের পিঠে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজলেন । “তোমার চা, মাস্টারবাবা”- পাশের টুলটায় কালু চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে চলে গেল।

আজ সকাল হতে না হতেই প্রধানশিক্ষকের ব্যস্ততা। পাশের শহরের হাইস্কুলের ছাত্রদের সিট্ পড়েছে তাঁদের স্কুলে। তাড়াতাড়ি স্কুলে পৌঁছে ব্যবস্থা সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখতে হবে। এরপর তো নিজেদের স্কুলের ছাত্রদের পরীক্ষা দিতে একটু দূরের স্কুলে নিয়ে যাওয়া, বাস ঠিক করাই আছে। ছেলেদের সঙ্গে তিনি তো যাবেনই, অন্য দুজন শিক্ষকও আছেন।
কালু সময়মতোই টেবিলে তাঁর খাবার গুছিয়ে রেখেছে। চটপট খেয়ে নিয়ে তিনি ব্যস্ত হয়ে গেট ঠেলে বেরিয়ে গেলেন।
এখনও স্কুলে এসে কেউ পৌঁছয়নি। ক্লাসরুমগুলোতে ঝাড়পোঁছ চলছে। তিনি স্কুলের সামনের টানা লম্বা বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। সিঁড়ি দিয়ে নেমেই স্কুলের কম্পাউন্ড পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। আনমনা হয়ে তিনি দূরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। চমকে উঠলেন কন্ঠস্বরে, “মাস্টারবাবা”! সামনে কালু। না আঁচড়ানো রুক্ষ চুল, কালকের বাসী কোঁচকানো জামাকাপড়, খালি পা।
হঠাৎ ওকে এখানে দেখে অবাক চোখে তাকালেন। কালু নিঃশব্দে নিজের পকেট থেকে ‘অ্যাডমিট্ কার্ড’ খানা বের করে, দু-হাতের আঙুলের চাপে দুই টুকরো করে ছিঁড়ে, হেঁট হয়ে মাস্টারবাবার পায়ের কাছে রাখল। তাঁর দুই পায়ে হাত ছুঁইয়ে কপালে ঠেকাল, কিছু বোঝবার আগেই, সিঁড়ি দিয়ে নেমে, কম্পাউন্ড পার হয়ে, গেট থেকে বেরিয়ে প্রাণপণে ছুটে চলল উল্টো দিকে। যে দিক থেকে সেই বালক বয়সে সে একদিন এসেছিল।
ছুটে এল রঘুনাথ,- ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল “স্যার, স্যার, কালু কোথায় চলে গেল?”
বহু দূরের দিকে দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি, যেদিকে শহর আর জঙ্গলের সীমারেখা। একই ভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর চোখ দুটো ঝাপ্সা হয়ে গেছে। রুদ্ধ কন্ঠে উচ্চারণ করলেন- “একলব্যকে আরও একবার ফিরিয়ে দেওয়া হল”।
গল্প শেষ হলেও একেবারে শেষ হয়ে যায় না।
পাহাড়ের ঝুপড়িগুলো থেকে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বুড়ো বটগাছটার নীচে কালু যে স্কুলটা শুরু করেছিল। শোনা যাচ্ছে, এই জঙ্গলের মানুষদেরই উৎসাহে সেই স্কুল বসে এখন বেশ বড়োসড়ো একটা আটচালায়। আরও শোনা যায়, এই স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা নাকি বেড়েই চলেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন