ভারতী গুহ
ন্যাড়ার মনে একটুও সুখ নেই। আমাদের ন্যাড়াকে মনে আছে তো? সেই যে গো, চাপকান আর পায়জামা পরা, হাসি হাসি মুখ, ন্যাড়া মাথা! সব্বাইকে গান শোনাতে চায়! সেই মস্ত মামলামোকদ্দমা, কত তার সাক্ষী। কিন্তু মামলার রায় দিতে গিয়ে দেখা গেল, ঐ যাঃ আসামীতো কেউ নেই। তখন ভালোমানুষ ন্যাড়াকেই আসামী খাড়া করা হল, আর ন্যাড়া ভাবল সাক্ষীদের মতো আসামীরাও বুঝি পয়সা পায়। বিচারে ন্যাড়ার সাতদিনের জেল আর তিনমাসের ফাঁসি। এত কথা যদি তোমাদের না জানা থাকে তবে ‘হযবরল’টা আবার পড়ে নিও, ন্যাড়াকে চিনতে পারবে, আর চিনতে পারবে ‘কাক্কেশ্বর কুচকুচে’কে।

সেই ন্যাড়ার মনে একটুও সুখ নেই। মুখে হাসিও নেই। তার গানগুলো যে হারিয়ে গেছে! মামলামোকদ্দমা, তিন মাসের জেল, সাতদিনের ফাঁসি, এইসব ঝামেলা মিটিয়ে ন্যাড়া একটা ল-ম্বা ঘুম লাগিয়ে ছিল। আজ ঘুম ভেঙে উঠে দেখে তার চাপকানের পকেট একদম ফাঁকা, গানটান কিচ্ছু নেই। সে গান না গেয়ে তো একটুও থাকতে পারে না। ন্যাড়া আর কী করে? হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে চলে এসেছে। হঠাৎ মনে হল সাদা মতো কী যেন একটা বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গেল, ভালো করে বোঝাই গেল না। ঘুম থেকে উঠে অবধি একটা জনপ্রাণীর সঙ্গে ন্যাড়ার দেখা হয়নি। যদিও বা একজনের দেখা পেল, তাকে চেনাই গেল না, সে কে? তবু ন্যাড়া তার সরু গলায় খানিক চেঁচিয়ে ডাকল, “ও ভাই শুনছ, একটু দাঁড়াও না।” কে শোনে কার কথা! চোখের নিমেষে সে দূরে মিলিয়ে গেছে। ন্যাড়া নদীর ধারে মস্ত একটা গাছের গায়ে হেলান নিয়ে বসে পড়ল। মুখখানা ভার ভার, চোখদুটো ছলছল করছে, ঠোঁটে হাসি নেই, গলায় গান নেই, উদাস ভঙ্গি, ন্যাড়াকে আর চেনা যায় না। যেন এ ন্যাড়া সে ন্যাড়া নয়! শুধু বড়োসড়ো পাকা বেলের মতো মাথাখানা দেখে একটু একটু চেনা যাচ্ছে ঐ আবার আসছে। বিদ্যুৎগতিতে ফিরে আসছে। ন্যাড়াও চটপট উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত মাথার ওপর তুলে নাড়তে লাগল, “দাঁড়াও, দাঁড়াও”। প্রাণীটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ও হরি। এ তো একটা বুড়ো খরগোস। খুব হাঁপাচ্ছে। খরগোশ তার লাল পুঁতি চোখ দুটো ঘুরিয়ে ধমকে উঠল, “আমাকে থামালে কেন? মোটে ঊনচল্লিশ কোটি, ঊনষাটলক্ষ, ঊনত্রিশ হাজার, ঊনিশ শ, ঊনপঞ্চাশ হয়েছে, আরও ঊনসত্তর হাজার বাকি।” ন্যাড়া অবাক হয়ে গেল, “তুমি তো বেশ বুড়ো হয়ে গেছ, এত দৌড়োদৌড়ির দরকার কি?” খরগোশ রাগ রাগ গলায় বলল, “দৌড়তে আমাকে হবেই। আমি বাজি রেখেছি ঊননব্বই কোটি উনিশ হাজার বার আমি জিতব।” তারপর মুখখানা কাঁদো কাঁদো করে বলল, “আমার অপমান হয়েছে। কচ্ছপ আমায় দৌড়ে হারিয়ে দিয়েছে। সবাই সে কথা বিশ্বাস করে আর আমাকে ছি ছি করে, সেই থেকে আমি বাজি লড়ছি।” এবার খরগোশ ব্যস্ত হয়ে বলল, “শিগগির পথ ছাড়ো, কচ্ছপ এসে পড়ল বলে।” তক্ষুণি মাথার ওপর থেকে হেঁড়েগলায় কে বলে উঠল, “কচ্ছপ আলিপুরের চিড়িয়াখানায় রোদ পোহাচ্ছে, দৌড়াদৌড়ি করতে তার বয়েই গেছে।” কখন জানি বুড়ো কাক্কেশ্বর এসে মাথার ওপর গাছের ডালে বসেছে। খরগোশ রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি জানলে কী করে?” “জানব না কেন? গত পরশুইতো আমি চিড়িয়াখানা দেখতে গিয়েছিলাম, বুড়ো কচ্ছপের পিঠে বসে কত গল্প করে এলাম।” কাকের কথা শুনে খরগোশের মনটা খুব দমে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল, দূর! এতকাল ধরে মিছিমিছি আমি ছুটে মরেছি। ঘুমোলে কাজ দিত। এই বলে সে গুটিগুটি নিজের গর্তে ঢুকে পড়ল। ন্যাড়া একটা ইটের টুকরো নিয়ে গাছের গায়ে লিখল,
“দৌড়বাজ খরগোশ ছিল খুব গর্ব,
নিজেকে বড়ো করে, অন্যকে খর্ব,
সব্বাই হেরে যাবে, কচ্ছপ তুচ্ছ,
আজ কেন ছোটাছুটি তুলে ঐ পুচ্ছ।”
ন্যাড়ার ভার ভার মুখে একটু হাসি ফুটে উঠল। নদীর তীরে ফুরফুরে হাওয়া। মনটাও একটু ফুরফুরে লাগছে। বালির ওপর পায়চারি করতে করতে শুনতে পেল কে যেন ভাঙা ভাঙা গলায় অনবরত বলছে, ইঃ! যা টক! মুখে দেওয়া যায় না। বত্রিশটা দাঁতই টকে যাবে।” সেই বুড়ো শেয়ালটা এখন বুড়ো হয়ে গেছে। ন্যাড়া বলল, “আবার তুমি আঙুর খেতে গিয়েছিলে!” শেয়াল সে কথার উত্তর না দিয়ে বলে চলল, “বাপ্রে যা টক মুখে দেওয়া যায় না।” মাথার ওপরে কাক হো হো করে হেসে উঠল, “আঙুর ফল অতি সুস্বাদু, আমি দুবেলা খাই।” শেয়াল কাককে যেই তাড়া করেছে কাক্কেশ্বর উড়ে যেতে যেতে বলল, “পালাও তুমি বুড়ো শেয়াল, কুমির আসছে তোমাকে ধরতে।” শেয়াল চমকে উঠে নদীর দিকে তাকিয়ে চোঁ চাঁ ছুট। ন্যাড়া একটা কাঠি নিয়ে মাটির ওপরে লিখল,
কুমির শুনে শেয়াল পালায়
সাতটা ছানা প্রাণ খোয়ালে,
পণ্ডিতের ঐ পাঠশালায়।
পাজি শেয়াল চালাক ভারি,
আঙুর ফল পাবেই না তো
দোষ করেছ কাঁড়ি কাঁড়ি।
ন্যাড়ার মুখে হাসিটা একটু বড়ো হল। খানিক দূরে যেতেই একটা ঘুড়ুৎ ঘুড়ুৎ ফোঁৎ ফোঁৎ আওয়াজ শুনে সে থমকে দাঁড়াল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। শুধু মাদার গাছটার নীচে একটা খুব পুরোনো ভাঙা কুয়ো আগাছায় ঢাকা পড়েছে। শব্দটা যেন সেদিক থেকেই আসছে। ন্যাড়া এগিয়ে গিয়ে উঁকি মেরে দেখল, কুয়োয় জলটল কিচ্ছু নেই। হঠাৎ মনে হল, অন্ধকারের মধ্যে কে যেন গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। ন্যাড়া হাত দুটো চোঙার মতো করে মুখের সামনে ধরে চেঁচিয়ে ডাকল, “কুয়োর মধ্যে কেউ কি আছ?” দুতিনবার ডাকার পর কে যেন ঘড়ঘড়ে গলায় বলে উঠল, “কে রে আমার ঘুম ভাঙালি?” ন্যাড়া চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কুয়োর মধ্যে গেলে কী করে?” কুয়োর ভেতরটা এবার বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। হাড়-জিরজিরে বুড়ো থুরথুরে একটা সিংহ। সিংহটা গর্জন করার চেষ্টা করল কিন্তু ঘড়ঘড় আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই নেই। ফ্যাঁসফেসে গলায় বলল, “আমি পশুরাজ। আমার সঙ্গে কি না চালাকি?” ন্যাড়া বলল, “সেই কোনো আদ্যিকাল থেকে তুমি কুয়োর মধ্যে পড়ে আছ। আমি একটা গাছের ডাল নাবিয়ে দিচ্ছি, সেটা ধরে তুমি উঠে এসো।” সিংহ বলল, “আমাকে বিরক্ত করো না। আমি এখানে বেশ আছি। এখন আমার একটুও খিদে পায় না। পশুটশু ধরে খাওয়া খুব ঝকমারি। তুমি যাও আমি এখন ঘুমোব।” বলেই সিংহটা আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ফোঁৎ ফোঁৎ করে তার নাক ডাকতে লাগল। ন্যাড়া একটা মাটির ঢেলা কুড়িয়ে ভাঙা কুয়োর গায়ে লিখল,
সিংহ পশুর রাজা
এতটুকু খরগোশ,
বুদ্ধিতে দিল সাজা।
কত কাল পড়ে আছে
কুয়োটায় নির্জন
তেজ নেই বল গেছে,
ভুলে গেছে গর্জন।
ন্যাড়ার ঠোঁটের হাসিটা আরও চওড়া হল। নদীর চড়ে কাক আর বকের মেলা বসে গেছে। বকগুলো একপায়ে খাড়া হয়ে খুঁটে খুঁটে মাছ ধরছে, ছিঁচকে চোর কাকগুলো ছোঁ মেরে খেয়ে নেয়। এই নিয়ে সারাদিন ধরে ঝগড়াঝাঁটি। দেখতে দেখতে বেলা পড়ে এল। পাখিরা এবার ডালে ডালে ক্যাঁচর ম্যাঁচর শুরু করেছে। সারাদিন উড়ে উড়ে যে যার ঘরে ফিরছে। গল্পগুজব, হাসিমস্করা। তাদের চেঁচামেচিতে কান ঝালাপালা।
ন্যাড়া বালির ওপর তার সরু সরু আঙুল দিয়ে লিখল,
সাঁঝের বেলা পাখির মেলা।
নদীর জলে আবির গুলে
সুয্যিমামা ডুবটি দিলে
দিনের মতো সাঙ্গ খেলা।
তার মুখ জুড়ে এবার হাসি ছড়িয়ে পড়ল। ন্যাড়ার গানগুলো সব হারিয়ে গেছে। সেই পুরোনো গান কি আর খুঁজে পাওয়া যায়? সে নদীর তীরে চাঁদের আলোয় হাতে তালি দিয়ে দিয়ে নতুন গানগুলো এবার গাইতে শুরু করল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন