ভারতী গুহ
রাজপুত্র অমিতবিক্রম। যেমন বীর তেমনি সাহসী আর তেমনই বিদ্বান। মোটা মোটা পুঁথি সব পড়ে শেষ করেছে। সমস্ত রকম অস্ত্র চালনায় সে নিপুণ। আশেপাশের যত রাজ্য, সব সে জয় করেছে। সব রাজা আর রাজপুত্র তার কাছে হার মেনেছে। দশদিকে তার নাম ডাক, রাজ্যজুড়ে জয়জয়কার। ছেলের গর্বে রাজার বুক দশখান। রানির মনে সুখ আর ধরে না।
রাজকুমার অমিতবিক্রমের ঘোড়ার নাম সাগর। সাগরের ফেনার মতো তার গায়ের রঙ। ভীষণ তেজী সেই সাদা ঘোড়ার পিঠে চড়ে রাজকুমার ঝড়ের বেগে চলে, কোমরের তলোয়ার ঝনঝন করে বাজে। রাজ্যশুদ্ধু লোক অবাক হয়ে দেখে আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, -ওই আমাদের রাজপুত্র চলেছেন।
রোজ ভোরবেলা সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রাজকুমার অমিতবিক্রম রাজপ্রাসাদের সিংহদরজা দিয়ে, সাগরের পিঠে চড়ে ছুটে বেরিয়ে যায়। চাষার ছেলে দুখু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। সূর্য ওঠার আগেই লাঙল আর গরু নিয়ে বাবার পিছু পিছু সে মাঠে যায়। লাঙল টানে, বীজ বোনে, ধান কাটে, বাবাকে সব কাজে সাহায্য করে। ঠিক দুপুর বেলা সূর্য যখন মাথার ওপরে, সে ফিরে আসে তাদের ভাঙাচোরা কুঁড়ে ঘরে। কাঠকুটো জ্বেলে মাটির হাঁড়িতে ভাত রাঁধে, নিজে খায় আর মাঠে নিয়ে যায় বাবার জন্য। তারপরেই দুখুর ছুটি। সে সারা দুপুর বনে বাদাড়ে, নদীর পাড়ে, পুকুরধারে, ঝোপে ঝাড়ে আপন মনে ঘুরে বেড়ায়। বনের যত প্রাণী সব দুখুর বন্ধু। পাখিরা তাকে গান শোনায় আকাশপারের গল্প বলে। কোন মাটির গভীরে, পাতার আড়ালে কীটপতঙ্গ বাসা বাঁধে দুখু তার খবর রাখে। সব পোকামাকড়ের গতিবিধি তার নখদর্পণে। আর জানে গাছেদের ফুল ফোটানো, পাতা ঝরানোর খবর, ঘাসের বনে লুকিয়ে থাকা একবিন্দু ফুলটিও তার নজর এড়ায় না। সূর্য যখন তার আকাশ ভ্রমণ শেষ করে পশ্চিমের পথটি ধরে ঘরে ফেরে, দুখুও তখন গভীর জঙ্গলের মধ্যে বুড়ো বটগাছের কোলটিতে এসে বসে। বটের ঝুরি চারদিক থেকে তাকে এমন করে ঢেকে রাখে যে কারও সাধ্য নেই সেই ঘেরা টোপের ভেতর থেকে দুখুকে খুঁজে পায়। তারপর বুড়ো বটের সঙ্গে দুখুর গল্প জমে ওঠে। যত রাজ্যের যত খবর সে একটি একটি করে বলে। অসংখ্য ডালপালা নাড়িয়ে, পাতায় ঝরঝর শব্দ তুলে বুড়ো বট মন দিয়ে শোনে। বুড়ো বটের সব কথাও দুখু বুঝতে পারে। গল্প বলা শেষ করে গাছের কোটর থেকে বের করে তার বাঁশিখানা। বটের গায়ে হেলান দিয়ে এবার সে তার বাঁশিতে ফুঁ দেয়। পাখিরা শিশ দিতে ভুলে যায়। বনের মাথা ছাড়িয়ে বাঁশির সুর আবির ছড়ানো গোধূলির আকাশে গিয়ে মেশে। ঘরমুখো গরুদের খুরে খুরে ধুলো ওড়ে। চাষিরা আলপথে ঘরে ফেরে। নগর, গ্রাম, নদী পাহাড় বন পরিক্রমণ শেষ করে ঘরে ফেরে রাজকুমার অমিতবিক্রম। সমুদ্রের ফেনার মতো সাদা ঘোড়া সাগর রাজপুত্রকে পিঠে নিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে আসে। বন্ধ হয়ে যায় মস্ত লোহার ফটক।
একদিন রাজপুত্র অমিতবিক্রম বনের পথ ধরে ঘরে ফেরার সময় শুনতে পেল এক আশ্চর্য বাঁশির সুর। মনে হল গোধূলির আকাশ থেকে নেমে আসছে সেই সুর। মুখ তুলে রাজকুমার আকাশের দিকে তাকায়। আবার মনে হল সবুজ ঘাসে ঢাকা মাটির বুক থেকে উঠে আসছে সুর। মুখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকায়। সাগরকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে ঢুকে যায় বনের গভীরে। বনের ডালপালা সরিয়ে, ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে ঘুরে বেড়ায় সেই সুরের সন্ধানে। কখনও মনে হয় ডাইনে, কখনও বাঁয়ে, কখনও ওপরে কখনও বা নীচে। এক সময় থেমে যায় বাঁশির সুর। আকাশের রঙ মুছে গিয়ে গভীর আঁধার ঘনিয়ে আসে। ক্লান্ত রাজকুমার সেদিন যখন প্রাসাদে ফিরে এল রাজা ছুটে এলেন, রানি ছুটে এলেন। মন্ত্রী সেনাপতি পাত্র মিত্র, রাজবাড়ির যে যেখানে ছিল সবাই ছুটে এল।
“রাজপুত্র, রাজপুত্র, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
রাজকুমার অমিতবিক্রম একটিও কথা না বলে অন্ধকার মুখ করে নিজের মহলে চলে গেল।
পরের দিন ভোরবেলা পাখি ডাকার আগে রাজবাড়ির ফটকে ঢ্যাঁড়া বেজে উঠল, “বনের ভেতর বাঁশির সুরের সন্ধান যে দিতে পারবে, কুমার অমিতবিক্রম তাকে লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেবেন”।
ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে এসে রাজবাড়ির ঘোষণা শুনল। নিজেদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। বনের পথে যেতে যেতে অনেকেই শুনেছে বাঁশির সুর, কিন্তু কেউ জানে না কে বাঁশি বাজায়। চারিদিকে রাজা লোক পাঠালেন। তারা সারা দেশ, নদী, পাহাড়, অরণ্য তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই সুরের সন্ধান পেল না।
এদিকে রাজ্যে দেখা দিল এক ঘোর বিপদ। কী এক সর্বনাশা রোগে শুকিয়ে যেতে লাগল খেতের ফসল। মরতে লাগল গরু, ছাগল, ভেড়া। ভয়ঙ্কর কোনো বিষ যেন ফসলের সব রসটুকু শুষে নিচ্ছে, পড়ে থাকছে ছিবড়ে। অসহায় প্রাণীগুলোর রক্ত কারা যেন রাতের অন্ধকারে চুষে খেয়ে যায়, সকালবেলা প্রাণহীন দেহগুলো পড়ে থাকে। ঘরে ঘরে কান্নার রোল উঠল, দেশ জুড়ে হাহাকার। যেখানে যত হাকিম, বদ্যি, রোজা, সবাই প্রাণপণ চেষ্টা করেও রোগ ধরতে পারল না। হার মানলেন রাজবৈদ্যও। রাজবাড়িতে এসেও হানা দিল সেই ভয়ঙ্কর রোগ। রাজার গোশালে ছাগল গরু, ভেড়া মরতে শুরু করল, ঘোড়াশালে তেজিয়ান ঘোড়া মরতে লাগল। রাজবাড়িতে শোকের ছায়া নামল। রাজমন্ত্রী রাজ্যে ঘোষণা করে দিলেন –যে যেখানে আছ সবাই সাবধান, এবার রোগ হানা দেবে মানুষের শরীরে। সেই ঘোষণা শুনে সবাই শিউরে উঠল। রাজ্য শুদ্ধু লোক রাজবাড়ির সিংহদরজায় এসে হাহাকার করে আছড়ে পড়ল, “রাজপুত্র অমিতবিক্রম” “রক্ষা করো রক্ষা করো”।
রাজপুত্র অমিতবিক্রমের মুখ রাগে দুঃখে হতাশায় কালো হয়ে উঠল। সে তার রাশি রাশি পুঁথি, অস্ত্র শস্ত্র সব ছুঁড়ে ফেলে দিল আগুনে। তার এত দিনের শেখা বিদ্যা বীরত্ব সাহস সব নিষ্ফল হয়ে গেছে। কিছু দিয়েই এই ভয়ঙ্কর রোগ ঠেকাতে পারল না। রাতের অন্ধকারে মুখ ঢেকে রাজপুত্র তার প্রিয় ঘোড়া সাগরের পিঠে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। সাগরের গায়ে হাত বোলায় আর মনে মনে বলে, “সাগর, আমি জানি এবার তোর রক্তও চুষে খাবে কালান্তক রোগ। আমি তোকে বাঁচাতে পারব না, আমার সব বিদ্যা সব শিক্ষা আজ মিথ্যে হয়ে গেছে।”
দুখুর বাবা কেঁদে কেঁদে সারা। তিনদিন তিনরাত দুখু ঘরে ফেরেনি। দুখু তখন বুড়ো বটের কোলে চুপটি করে শুয়ে আছে। তার চোখের জলে বুড়ো বটের কঠিন শিকড় ভিজে গেছে। কোটরে বাঁশের বাঁশি অমনি পড়ে আছে, দুখু একটিবারও বাজায়নি। হঠাৎ বটগাছের পাতায় পাতায় ফিসফিস শব্দ ওঠে। দুখু ধড়মড় করে উঠে বসে কান পাতে। বুড়ো বটের সব কথা মন দিয়ে শোনে। তারপর কোটর থেকে বাঁশিখানা বের করে, চাঁদের আলোয় পথ চিনে চিনে বনের পথ ধরে হাঁটে। ঠিক গাছটির সামনে এসে দাঁড়ায়। কঙ্কালের লম্বা আঙ্গুলের মতো বিষগাছের সরু সরু পাতা চাঁদের আলো পড়ে রক্তের মতো জ্বলছে। দুখু নিঃশ্বাস বন্ধ করে ছিঁড়ে নেয় একগোছা পাতা, কালো পাথর দিয়ে থেঁতো করে, বাঁশির প্রত্যেকটা ফুটোর মধ্যে বিন্দু বিন্দু পাতার রস ভরে দেয়। বাঁশি আবার বটের কোটরে রেখে ঢুকে যায় বনের আরও গভীরে। ছোট্ট একটা পুকুর। জ্যোৎস্নায় পুকুরের জল দুধের মতো সাদা। পুকুরে নেমে দুখু তিনটে ডুব দেয়। গা ভাসিয়ে সাঁতার কাটে। আঁজলা ভরে সেই দুধ পুকুরের জল খায় পেট পুরে। ডাঙায় উঠে তার ছেঁড়া খোঁড়া কাপড় খানা গিট দিয়ে পরে।
পুবের আকাশ তখনও অন্ধকার, শুকতারাটা জ্বল জ্বল করে চেয়ে আছে। সূর্যি ঠাকুরের ঘুম ভালো করে ভাঙেনি। গাছে গাছে পাখিদের ডানা ঝটপট সবে শুরু হয়েছে। ঠিক সেই সময় রাজবাড়ির সিংহদরজায় এসে কে ঘা দিয়ে ডেকে উঠল, -প্রহরী দরজা খোল।
সারারাত পাহারায় থেকে প্রহরী শেষ রাতের দিকে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছিল। দরজায় ঘা শুনে ধড়মড় করে উঠে প্রাসাদের দরজা খুলে অবাক! আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা ছেলে। ছেঁড়াখোঁড়া কাপড় পরা, রুক্ষ চুল বাতাসে উড়ছে। প্রহরী ধমকে উঠল, -
“কে তুই? কী চাস? ভোর না হতে রাজবাড়ির ঘুম ভাঙাস?”
“আমি রাজপুত্রর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
রাজপুত্র অমিতবিক্রম সারা রাতের পর্যটন শেষ করে ক্লান্ত দেহে সবে একটু চোখ বুজেছে, ছোটো ছেলের তীক্ষ্ণ মিষ্টি গলার স্বর ঠিক তার কানে গেছে। প্রহরীকে ডেকে হুকুম দিল,
“প্রহরী, ওকে আসতে দাও।”
রাজা জেগে উঠলেন, রানি উঠে এলেন, রাজবাড়ির সবাই একে একে এসে দাঁড়াল। ধুতিখানা গিট দিয়ে পরা, খালি গা, রুক্ষ চুল, বছর বারোর এক ছেলে, ফটক পেরিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে ছুটে আসছে। তার পেছনে ভোরের আলো। সে দু-হাত জোড় করে ঝুঁকে রাজপুত্র অমিতবিক্রমকে প্রণাম জানাল। রাজকুমারের মুখখানা বড়ো বিষণ্ন। সে মৃদু কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
- কে তুমি?
- আজ্ঞে, আমি দুখীরাম।
- তোমার পরিচয় কি?
- আমি চাষার ছেলে, মাঠে কাজ করি।
- কেন এসেছ?
- রোগ তাড়াতে।
রাজপুত্র চমকে উঠল। রাজা রানি মন্ত্রী, সেনাপতি যে যেখানে ছিল অবাক হয়ে গেল!
এই চাষার ছেলে বলে কি?
দুখু বলল,
“রাজপুত্র, তুমি রাজ্যে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দাও, আজ রাত দুপ্রহরের পর একটি প্রাণীও যেন ঘরের বাইরে না থাকে।”
অমিতবিক্রম স্থির দৃষ্টিতে দুখুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“যদি রোগ তাড়াতে পার এ রাজ্যের অর্ধেক তোমার।”
দুখু বলল,
“তিনদিন পরে আমি আবার আসব।” সে রাজপুত্রকে প্রণাম করে চলে গেল। রাজার লোক সারা রাজ্যে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দিল—রাত দুপ্রহরের পর মানুষ, পশু, পাখি, কীট, পতঙ্গ যে যার ঘরে, যে যার কোটরে আশ্রয় নেবে, কেউ যেন বাইরে না থাকে।
বুড়ো বটগাছের কোলে শুয়ে দুখু সারা দিন পড়ে পড়ে ঘুমল। দ্বাদশীর চাঁদ যখন বনের মাথায়, বুড়ো বট দুখুকে ফিসফিস করে ডেকে তুলল। দুখু তার বাঁশিখানা কোমরে গুঁজে, বটগাছের কাছে বিদায় নিয়ে বনের পথ ধরে হেঁটে চলল। সঙ্গে নিল একটা চকমকি পাথর আর হাতে নিল বিষগাছের লম্বা, সরু একটা ডাল।
চরাচর জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। গাছের পাতাটিও নড়ে না। নদীর স্রোতেও শব্দ নেই। পৃথিবী নিশ্চুপ। নগরের মাঝ বরাবর একটা উচুঁ টিলা। দুখু সেই টিলার মাথায় উঠে দাঁড়াল। থমথমে রাত কেটে যায়। একটু পরে দূরে রাজবাড়িতে দ্বিপ্রহরের ঘণ্টা বাজে। তারপর সব নিস্তব্ধ। দুখুর দুই চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। মাটির বুক চিরে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে চুলের মতো সরু লম্বা একটা ফাটল। তারপর সেই ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করল পিঁপড়ের থেকে আরও অনেক ছোটো বিন্দু বিন্দু পোকা। খালি চোখে তাদের দেখা যায় না। অযুত, নিযুত, কোটি সেই পোকারা ছড়িয়ে যাচ্ছে চারধারে। প্রতিদিনের মতো আজও তারা রাতের গভীর হানা দেবে প্রাণীর শরীরে। লক্ষ লক্ষ পোকা মুহূর্তে ঢেকে ফেলবে প্রাণীর শরীর, নিমেষে সব রক্ত চুষে নিঃশেষ করে দিয়ে আবার ফিরে যাবে ফাটলের গভীরে। কেউ তাদের কখনও খুঁজে পাবে না। গরু, ভেড়া, ছাগলের প্রাণহীন দেহগুলো শুধু পড়ে থাকবে। সূক্ষ্ম সেই ফাটল দিয়ে সব পোকারা বেরিয়ে এসেছে। সার বেঁধে চলেছে মানুষ আর জীবজন্তুর আবাসের দিকে। একখন্ড কালো মেঘ হঠাৎ ঢেকে ফেলল চাঁদকে। বিশ্বচরাচর মুহূর্তে অন্ধকার। দুখু তার বাঁশিতে ফুঁ দিল – বিষে ভরা বাঁশির সুর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। মরতে লাগল রক্তপায়ী পোকার দল। এক পাও আর চলতে পারছে না। বিষের বাঁশি বেজেই চলেছে। কালো মেঘের ঘোমটা সরিয়ে চাঁদ উঁকি মারতেই দুখু লাফ দিয়ে টিলা থেকে নেমে এল। চকমকি পাথর ঠুকে আগুন বের করে জ্বালিয়ে নিল বিষ গাছের ডালখানা। লম্বা সরু সেই ফাটলের ওপর দিয়ে জ্বলন্ত বিষের ডাল টেনে নিয়ে সে ছুটে চলল।
ভোর হতেই পশু পাখি আর মানুষের কলরব শোনা গেল। সেই রাতে কারুর ঘরে একটিও পশু একটিও পাখি মরেনি। খেতের ফসল লকলকিয়ে উঠে হাওয়ায় দুলছে।
তিনরাত কেটে গেল। রাজ্যে কোনো প্রাণীর মৃত্যু হল না। রোগ চলে গেছে দেশ ছেড়ে। সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। লোকের মুখে আবার হাসি ফুটল। রাজা রানি, মন্ত্রী সেনাপতি, সবার মুখেই হাসি। রাজা রাজ্য জুড়ে উৎসবের আয়োজন করলেন।
রাজকুমার অমিতবিক্রম সাগরের পিঠে চড়ে রাজপ্রাসাদের সিংহদরজার সামনে এসে দাঁড়াল। তিনদিন কেটে গেছে, আজ দুখীরাম আসবে।
দুখু তার বিষের বাঁশি আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছে। কচি বাঁশগাছের কঞ্চি দিয়ে নতুন করে মনের মতো আর একটা বাঁশি বানিয়েছে। বনের পুকুরে চান করে ভোরবেলা রাজবাড়ির সামনে এসে হাজির। সাগরের পিঠ থেকে নেমে এল অমিতবিক্রম। দুখুর হাত ধরে রাজপ্রাসাদে নিয়ে গিয়ে নিজের সিংহাসনে বসিয়ে দিল। রাজামশাই দুখুকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রানিমা হিরে-মুক্তোয় গাঁথা রেশমের পোশাক নিয়ে এলেন, দুখুকে নিজের হাতে সাজাবেন। দুখু তাড়াতাড়ি সিংহাসন থেকে নেমে এসে রাজারানিকে প্রণাম করে বলল,
“রানিমা, আমার এই কাপড়খানা বড্ড ছিঁড়ে গেছে, তুমি আমাকে কালো পেড়ে মোটা একখানা ধুতি দাও তো পরি।”
রাজামশাই হুকুম দিলেন রাজভান্ডার খুলে দিতে। যত খুশি সোনাদানা দুখীরাম দু-হাত ভরে নিয়ে যাবে। দুখুর চোখ দুটো ছল ছল করে উঠল। সে হাত জোড় করে বলল,
“মহারাজ, আমাদের হেলে গরু দুটো মরে গেছে। লাঙল ঠেলতে আমার বাবার বড়ো কষ্ট হয়, তুমি আমার বাবাকে দুটো গরু দাও, আর আমার কিচ্ছু চাই না।”
রাজপুত্র অমিতবিক্রম দুখুর হাত দু-খানা ধরে বলল,
“দুখীরাম আজ থেকে এই রাজ্যের অর্ধেক তোমার।”
দুখু একগাল হেসে বলল,
“রাজপুত্র, তোমার রাজ্য তোমারই থাক। আমি চাষার ছেলে, রাজ্য নিয়ে কী করব? কিন্তু আমি তোমাকে একটা জিনিসের সন্ধান দেব, যা তুমি অনেক খুঁজেও পাওনি।”
রাজকুমার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী সেই জিনিস, দুখীরাম?” দুখু কোনো কথা না বলে কোমরে গোঁজা নতুন বাঁশিখানা বের করে তাতে ফুঁ দিল। এক আশ্চর্য সুর বেজে উঠল।
রাজপুত্র অমিতবিক্রম হাঁটু গেড়ে বসল দুখুর সামনে। দুখুর ছোটো হাত দু-খানি নিজের হাতে নিয়ে বলল,
“দুখীরাম, আমি অনেক বিদ্যা শিখেছি, অনেক রাজ্য জয় করেছি, কিন্তু আজ হেরে গেছি তোমার কাছে। তোমার ঐ বাঁশির সুর আমাকে শিখিয়ে দেবে?”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন