ভারতী গুহ
ব্যাস! বিকট শব্দে বাসের টায়ার গেল ফেটে। খুব জোর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বাস থেমে গেল। ড্রাইভার, কন্ডাক্টার আর বাসের যত লোক তাড়াতাড়ি বাস থেকে নেমে এসে ফাটা চাকার সামনে ভিড় জমাল আর নানারকম কথাবার্তা বলতে শুরু করে দিল; ব্রতী আর কী করে। সেও ব্যাগটা কাঁধে ফেলে সবার শেষে বাস থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল।
রাস্তার দু-ধারে যত দূর চোখ যায় ফাঁকা ধু ধু মাঠ আকাশে গিয়ে ঠেকেছে। পশ্চিম আকাশের ঢালু পথ দিয়ে নেমে যাচ্ছে রক্তরাঙা সূর্য।
বাসটা ভালো মতোই বিগড়েছে। যাত্রী খুব বেশি নেই। সবাই প্রায় আশপাশের গ্রামের মানুষ-খালি পা, হাঁটুর কাছে ধুতি। বিড়ি ধরিয়ে রাস্তার পাশে বসেছে কেউ, কেউ বা বাসের ভেতরে গিয়ে বসে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছে, কারুরই যেন কোনো তাড়া নেই।
সুজনকাকু যখন ব্রতীকে বাসে তুলে দেয় তখন বেলা তিনটে। বলেছিল-“ঘন্টা দুই-আড়াইয়ের মধ্যেই কলকাতা পৌঁছে যাবি।” সুজনকাকু বাবার ছেলেবেলার বন্ধু। ব্রতীদের কলকাতার বাড়িতে ছুটিছাটায় মাঝে মধ্যেই এসে হাজির হয়, আর ব্রতীকে মজার মজার গল্প শোনায়। নাইনের অ্যানুয়াল পরীক্ষা হয়ে গেছে। রেজাল্ট বেরোতে দেরী আছে। এরপর তো ক্লাস টেন। আদা জল খেয়ে পড়াশোনা শুরু করতে হবে। তাই সুজনকাকু এসে যখন বলল, “চল ব্রতী, ক-টা দিন আমাদের বাড়ি কাটিয়ে আসবি, গ্রাম কাকে বলে দেখবি” ব্রতী তো এক পায়ে খাড়া। বাবাও বলল, “যা ঘুরে আয়। রোববার ফিরে আসবি, সুজনকাকু বাসে তুলে দেবে। তোর বয়সে আমি তো একাই গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত করতাম, তখন বাস ছিল না, দিনে দুটো মাত্র ট্রেন। ট্রেন থেকে নেমে গরুর গাড়িতে—সারাদিন লেগে যেত।”
সুজনকাকুর বাড়িতে হইহই করেই তিনটে দিন কোথা দিয়ে কেটে গেল। আকাশে হঠাৎ একখানা কালো মেঘ এসে সূর্যের শেষ আলোটুকু খুব তাড়াতাড়ি মুছে নিল। দু-ধারের ছড়ানো মাঠে ছায়া নেমে এল। ব্রতী ভেবে পাচ্ছে না কী করবে! কখন বাস ছাড়বে তার কোনো ঠিক নেই। এইবার ব্রতীর একটু একটু ভয় করছে। সে এখানে কিছু চেনে না। দু-ধারে ফাঁকা মাঠ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না।
“চল আমি তোমাকে ইস্টিশানের রাস্তায় পৌঁছে দিই, ট্রেন পেয়ে যাবে।” ব্রতী দারুণ চমকে উঠল। ওর কাছাকাছি কেউ তো ছিল না! একা একাই পথের ধারে পায়চারি করছিল অথচ যে কথা বলল সে ব্রতীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় তারই বয়সী একটা ছেলে, পরনে ধুতি আর হাফ শার্ট। মাথার চুল এলমেলো! হাসি হাসি মুখখানা। বাসের মধ্যে ব্রতী একে দেখেনি মনে হয়, কাছের কোনো গ্রামেই বাড়ি। ব্রতী একটু দ্বিধা করে জিজ্ঞেস করল “স্টেশনের রাস্তা কোনদিকে? কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না।”
ছেলেটা হাসিমুখে বলল, “সোজা পথ আছে। বেশিক্ষণ লাগবে না।” মাঠের মাঝখান দিয়ে খুব সরু পায়ে চলা পথ। দুজন পাশাপাশি হাঁটা যায় না। ব্রতী ছেলেটির পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। মাটি আর ঘাসের বুনো গন্ধ। আকাশের এখানে ওখানে এখনও ডুবে যাওয়া সূর্যের রক্তরঙ লেগে আছে। হাওয়া নেই। ব্রতী হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”
“বিশু।”
“কোথায় থাক?”
“কাছেই।”
“স্কুলে পড়?”
“এখন আর পড়ি না।”
“কেন? পড় না কেন?”
“আমার আর পড়া হল না।”
ব্রতীর একটু খারাপ লাগল। গ্রামের ছেলে, হয়তো অভাবের সংসার। সুজনকাকুর গ্রামেও দেখেছে, ওর বয়সী অনেক ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে মাঠে চাষবাস করছে। বিশু ব্রতীর ঠিক সামনে সামনে হাঁটছে। ওর গা থেকে কেমন ভেজা ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ নাকে এসে লাগছে। বিশু মুখ না ফিরিয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি বুঝি কলকাতার ইস্কুলে পড়?”
“হ্যাঁ।”
“খুব বড়ো ইস্কুল তাই না? আমারও ইচ্ছে করত কলকাতায় গিয়ে খুব বড়ো ইস্কুলে পড়ব।”
বিশুর বুক থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস ব্রতী স্পষ্ট শুনতে পেল। একটু ভেবে নিয়ে বলল, “আমি কলকাতায় ফিরে গিয়ে বাবাকে বলব, যদি সেখানে তোমার পড়ার কোনো ব্যবস্থা করা যায়।”
বিশু যেন নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “সে আর হবে না।”
“কেন হবে না? চেষ্টা করলেই হবে।”
বিশু বলে উঠল, “সামনের ঐ বিলটা পেরিয়ে একটু এগোলেই রেল ইস্টিশান।”
অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, কিছু দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকার মাঠে অসংখ্য জোনাকি জ্বলছে আর নিভছে। সামনে থেকে এক ঝলক ভেজা হাওয়া এসে মুখে চোখে ঝাপটা মারল। জলের ছলাৎছল্ শব্দ শোনা যাচ্ছে। আকাশের কালো মেঘখানা সরে গিয়ে কখন যেন চাঁদ উঠেছে। সামনেই মস্ত এক জলাশয়। দিগন্ত জোড়া ছোটো ছোটো ঢেউ যেন আকাশকে ছুঁতে যাচ্ছে। চাঁদের আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
ব্রতী চেঁচিয়ে উঠল, “এই জল পেরোব কী করে?”
ঝিঁঝির ডাক শুরু হয়ে গেছে। মাথার ওপর রাতচরা পাখি কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল।
বিশু একইভাবে চলতে চলতে বলল, “আমি তোমাকে পার করে দেব, ভয় পেও না।”
চাঁদের আলোয় ব্রতী দেখতে পেল, ছোটো একখানা ডিঙি নৌকো ঢেউয়ের মাথায় দুলছে। বিশু মাঠ বেয়ে একটু ঢালুতে নেমে গিয়ে লাফ দিয়ে নৌকোয় উঠল। ব্রতীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আমার হাত ধরে উঠে এসো। মারণ বিলকে আর আমি ভয় পাই না।”
ব্রতী বিলের ধারে এসে বিশুর হাতখানা শক্ত করে ধরল। বিশুর হাত ভেজা, স্যাঁতসেঁতে নৌকায় উঠতেই নৌকো জোরে দুলে উঠল। বিশু একটা লম্বা বাঁশ দিয়ে ঠেলতেই নৌকো চলে এল বিলের অথৈ জলে। জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। দূরে অস্পষ্ট গাছের ছায়া। ডিঙির ঐ প্রান্তে বিশু দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতের বাঁশ ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই প্রান্তে ব্রতী, দুইহাতে নৌকোর কাঠ চেপে ধরে কোনোরকমে বসে আছে মাথার ওপর জ্যোৎস্নামাখা রাতের আকাশ। ব্রতীর চোখে কেমন যেন ধাঁধাঁ লাগছে। মনে হচ্ছে বিশু যেন জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে। শরীরের ওপর দিয়ে বিলের ঢেউ বয়ে চলেছে। হঠাৎ দমকা হাওয়া উঠল। বিশু চিৎকার করে বলল, “সামলে বসো, মারণ-বিলের মাঝবরাবর ঘুর্ণি আছে, নৌকো তলিয়ে যাবে এক্ষুণি। তার কথা বাতাসে ভেসে গেল। মুহূর্তে নৌকোখানা বাঁই বাঁই করে ঘুরে গেল। ঝপাং করে একটা শব্দ। বিশু টাল সামলাতে না পেরে জলে পড়ে গেছে। ব্রতী মুখ থুবড়ে পড়ল নৌকোর পাটাতনের ওপর। হঠাৎ সব শান্ত। নৌকো স্থির। ব্রতী অনেক কষ্টে উঠে বসে, দেখল বাতাস থেমে গেছে। ঘূর্ণি পেরিয়ে এসেছে নৌকো। কিন্তু বিশু নেই। বিলের জল ছলাৎ-ছল্ ঢেউ তুলে বয়ে যাচ্ছে। জনপ্রাণীর সাড়া নেই। চরাচরে জলের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ব্রতীর চোখে জল এসে গেল। সে দু-হাত মুখের কাছে নিয়ে প্রাণপণে চিৎকার করে বিশুকে ডাকতে লাগল, “বি-শু, বি-শু।”
নৌকো দুলে দুলে পাড়ের কাছে চলে এসেছে। কাঁধের ব্যাগ সামলে ব্রতী লাফ দিয়ে নরম মাটিতে পড়ল। দূরে আলো দেখা যাচ্ছে।
“ঐ ইস্টিশান দেখা যাচ্ছে, একটু পরেই গাড়ি এসে পড়বে। সামনের এই রাস্তা দিয়ে পা চালিয়ে চলে যাও।”

ব্রতী এমন চমকে উঠল যে আর একটু হলেই পড়ে যেত। রেগে গিয়ে বলল, “উঃ!, কি ভীষণ ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে, কোথায় গিয়েছিলে তুমি?” বিশু বলল, “কেন? ভয় কেন?”
“ভয় পাব না? জলে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেলে, আবার হঠাৎ ভূতের মতো সামনে এসে দাঁড়িয়েছ।”
বিশু চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে, তার সারা শরীর থেকে জল বেয়ে পড়ছে। সে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল- “তুমি কোনো দিন ভূত দেখেছ?”
ব্রতী হেসে বলল, “না দেখলেই বা, গল্পের বইতে তো পড়েছি, যত সব গাঁজাখুরি।“
“কেন? গাঁজাখুরি কেন?”
“যত সব অদ্ভুত কথা, কোনো কোনো ভূতের পা নাকি আবার গরুর মতো।”
বিশু বলল, “আমার পা দেখেছ?”
ব্রতী তাকিয়ে দেখল ধুতি পরা বিশুর পা দু-খানা গরুর। ব্রতী এত অবাক হয়ে গেল যে ভয় পেতেও ভুলে গেল। বিশু তখন আর সেখানে দাঁড়িয়ে নেই। অন্ধকারে কখন যেন হারিয়ে গেছে। সামনেই রেলস্টেশনের আলো দেখা যাচ্ছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন