ফেরা

ভারতী গুহ

বাবা-মার আশঙ্কাই শেষটায় সত্যি হল। রাজু মাধ্যমিক পরীক্ষায় অসম্ভব খারাপ রেজাল্ট করল। উঠতে বসতে তাঁরা রাজুকে সাবধান করেছেন, বুঝিয়েছেন,

-এত আড্ডা মেরে, খেলে, টিভি দেখে আর গল্পের বই পড়ে কিছুতেই ভাল রেজাল্ট করা যায় না।

দুপুরের দিকে বাবা যখন অফিসে, মা স্কুলে, রঞ্জন ফোন করে জানাল, রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। রাজু চটপট তৈরি হয়ে নিল। টেবিলের ড্রয়ার টেনে অ্যাডমিট্‌ কার্ড আর খুচরো পয়সা বের করতে গিয়ে সামনের দেওয়ালের ছবিটার দিকে তার চোখ পড়ে গেল। রোজই যখন তখন ছবিটার দিকে চোখ পড়ে যায়। সুন্দর এক যুবকের ছবি। মাথা ভর্তি কালো চুল, বড়ো বড়ো উজ্জ্বল চোখ, ধারালো মুখ, ঠোঁটের কোণে হাসি। রাজুর ঠাকুরদা যাঁকে রাজু কোনোদিন দেখেনি। মাও দেখেন নি, বাবারও তাঁকে মনে নেই। এই সুন্দর চেহারার যুবক, যিনি নাকি রাজুর ঠাকুরদা, হঠাৎ একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে যান, আর ফিরে আসেননি।

রাজুদের স্কুলে অসম্ভব ভিড়। চেঁচামেচি, ঠেলাঠেলি। রাজু অনেক কষ্টে বোর্ডে টাঙানো রেজাল্টের কাছে পৌঁছতে পারল। ঘাড় উঁচু করে নিজের রেজাল্ট দেখতে পেয়েই মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। ছেলেদের ভিড় ঠেলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল। কে যেন নাম ধরে ডাকছে ‘রাজর্ষি, রাজর্ষি!’ রাজুর কানে কিছুই ঢুকছে না। ….এই রেজাল্ট নিয়ে রাজু বাড়ি ফিরবে কী করে? কোনো ভাল স্কুলে, কলেজে ভরতির কোনো সুযোগই পাবে না। বাবা-মার এত আশা, এত চেষ্টা, এত স্বপ্ন, সব শেষ! মাথার ভেতরটা ঝাপসা হয়ে আসছে। এই ভিড়, এই কোলাহল, সব কেমন অস্পষ্ট। অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে রাজু পথে এসে নামল।

হাতল ধরে একটা কামরায় উঠে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন ছেড়ে দিল। বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ট্রেনের ভেতরটা মালপত্র, বোঁচকাবুঁচকি আর মানুষে মানুষে ঠাসা। হই হট্টগোল, ঠেলাঠেলি। দরজার কোণটায় দেওয়াল ঘেঁসে দাঁড়িয়ে, কামরার স্তিমিত আলোয় সেই ভিড়ের দিকে রাজু অন্যমনস্ক চোখে তাকিয়ে থাকল। কোনো দৃশ্য কোনো শব্দই তার কাছে স্পষ্ট নয়। মাথাটা ভারি হয়ে আছে। চলন্ত ট্রেনের দেওয়ালে মাথা রেখে সে চোখ বুজল।

আচমকা হুইসিলের তীক্ষ্ণ, তীব্র আওয়াজ রাজুর চেতনায় আছড়ে পড়ে। চমকে চোখ মেলে হলদেটে আলোয় দেখতে পেল ট্রেনের ভেতরটা নিশ্চুপ, সব যাত্রীরা এ, ওর গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ট্রেন মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, হয়তো সিগনাল পায় নি। বাইরে গভীর কালো অন্ধকার। হঠাৎ মনে হল তার কাছে তো টিকিট নেই। হাওড়ার প্ল্যাটফর্মে এসে টিকিট কাটার কথা তখন মনেও পড়েনি। দরজা খুলে সিঁড়িতে পা দিয়ে রাজু নিঃশব্দে অন্ধকারে লাফিয়ে পড়ল। হুইসিল দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল। ট্রেনের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। মাথার ওপর তারা ভরা আকাশ। রাজু হঠাৎ অন্ধকার ভেদ করে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল। ঝোপঝাড়ে পা জড়িয়ে যাচ্ছে, হোঁচট খেতে খেতে নিজেকে সামলে নিচ্ছে বার বার। চোখের সামনে শুধু জোনাকির জ্বলা নেভা, ঝিঁঝিঁর একটানা ডাক। ছুটতে ছুটতে একসময় চোখ পড়ল সামনেই আকাশের গায়ে হেলান দেওয়া সারি সারি পাহাড়, অন্ধকারে দৈত্যপুরীর প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রাজু মুহূর্তের জন্য দাঁড়াল, আবার ছুটে চলল অন্ধকারে সেই পাহাড় লক্ষ্য করে। ছুটতে ছুটতে একটা বিশাল গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা খেয়ে শ্যাওলা ঢাকা নরম মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

ধীরে ধীরে চেতনা ফিরে আসছে। মুখের ওপর কার যেন ঠান্ডা স্পর্শ, চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে কে যেন আদর করছে, কপালের ওপর টুপ্‌ করে ঝরে পড়ল দুফোঁটা জল। রাজু চমকে চোখ মেলে তাকাল। খুব উঁচু লম্বা লম্বা গাছ। ডালপালা আর পাতায় পাতায় জড়াজড়ি হয়ে আকাশ ঢেকে ফেলেছে। পাতার জাফরির ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্যের গোলাপি আভা। ঝিরঝির করে পাতাগুলো কাঁপছে ঠান্ডা হাওয়ায়। রাজুর চুলে মুখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পাতা থেকে ঝরে পড়ছে শিশির। একটা বিশাল প্রাচীন গাছের কোলে সে শুয়ে আছে। চারিদিকে আবছা অন্ধকার, পায়ের নীচে ঘাস নেই, পুরু শ্যাওলা। রাজু দু-হাতে ভর দিয়ে উঠে বসার সঙ্গে সঙ্গে ডালে ডালে পাতায় পাতায় ঝরঝর শনশন শব্দ শুরু হয়ে গেল! বিশাল বিশাল গাছের গভীর অরণ্য। ছড়ানো লম্বা লম্বা ডালপালা আর কালচে সবুজ পাতা ঘন হয়ে আকাশকে আড়াল করে রেখেছে। সূর্যের আলো প্রবেশের পথ পায় না। পায়ে চলার কোনো পথ চোখে পড়ে না, ডালপালা আর পাতার ঝরঝর শনশন শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। একটিও পাখির ডাক শোনা যায় না। কোনো পতঙ্গের ওড়াউড়ি নেই। পাতার বুনো গন্ধ বাতাসে ভাসছে। রাজু উঠে গিয়ে গাছেদের ভিড় থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ খুঁজতে চাইল। যে দিকেই পা বাড়ায় মোটা মোটা গাছের লম্বা গুঁড়ি, লম্বা লম্বা ডালপালা আর ঘন সবুজ পাতা পথ আটকে দেয়। অনেকক্ষণ ধরে এদিকে-ওদিকে পথ খুঁজতে খুঁজতে, ছোটাছুটি করতে করতে বড়ো ক্লান্ত লাগছে। গাছেদের এই গভীর অরণ্য থেকে বেরোবার সব পথ যেন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। বুক ঠেলে কান্না এল। দু-হাতে মুখ ঢেকে রাজু আর্ত স্বরে চিৎকার করে উঠল- “আমাকে যেতে দাও, এই গাছের জঙ্গল থেকে আমাকে বেরোতে দাও।” রাজুর ঘাড়ের ওপর ছোট্ট একটা দমকা হাওয়া এসে লাগল। হাওয়া? না কি দীর্ঘ নিশ্বাস? সে দারুণ চমকে উঠল। হাতের ওপর পাতা থেকে দু-ফোঁটা শিশির ঝরে পড়ল। শিশির? নাকি চোখের জল? আশেপাশের গাছগুলো সব একসঙ্গে দুলতে শুরু করেছে। পাতায় পাতায় যেন ফিসফিস আর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। গাছের ফাঁক গলে পালাবার পথ খুঁজতে রাজু পাগলের মতো এগাছে-ওগাছে ধাক্কা খেয়ে ফিরছে, বুকের ভেতরটা শুকিয়ে গেছে, বিস্ফারিত দুই চোখে আতঙ্ক। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল এক বুড়ো। শুকনো খট্‌খটে চেহারা, শনের নুড়ির মতো চুল, বুক পর্যন্ত লম্বা দাড়ি। সর্বাঙ্গে সবুজ শ্যাওলা আর পাতা লেগে রয়েছে। কোনো পাতার স্তূপে যেন ঘুমিয়ে ছিল, ঘুম ভেঙে মুখে, গায়ে, মাথায় পাতা মেখে উঠে এসেছে। বুড়ো তীব্র চোখে রাজুর দিকে তাকিয়েই হনহন করে হাঁটতে শুরু করল, একটুও না ভেবে রাজুও তার পিছু পিছু ছুটে চলল। গাছগুলো সরে সরে যেন বুড়োকে পথ করে দিচ্ছে। পাতাদের কানাকানির বিরাম নেই যেন, ফিসফিস শব্দের শেষ নেই। রাজুর গালে কপালে এসে লাগছে কাদের নিঃশ্বাস, মাথায় গায়ে ঝরে পড়ছে যেন কাদের চোখের জল।

হঠাৎ এসে রাজু হাজির হল এক আলোর রাজ্যে। মাথার ওপর ঝকঝকে নীল আকাশ, পাখির ডাক, ভোরের নরম হাওয়া। বুড়ো দাঁড়িয়ে পড়ল। ভাঙা ভাঙা স্বরে কঠিন উচ্চারণে বলল, ‘পালিয়ে যাও এখান থেকে, এখুনি চলে যাও।’ শুকনো ডালের মতো একখানা হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘সূর্যকে সামনে রেখে চলতে থাক, নদীতে ডিঙি বাঁধা আছে, খুব তাড়াতাড়ি দাঁড় বেয়ে ওপারে পৌঁছে যাও। একটুক্ষণ রাজুর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল,-‘যে ঘর ছাড়ে সে আর ঘরে ফিরতে পারে না, জীবন থেকে যে পালাতে চায় তার চলার পথ বন্ধ, সে তখন গাছ হয়ে যায়, এক পা-ও আর এগোতে পারে না।’ রাজু অপলক চোখে বুড়োর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। বুড়ো আবার বলতে শুরু করল, “যারা জীবন থেকে পালাতে চেয়েছিল তারা সব গাছ হয়ে গেছে। তোমাকে এগোতে হবে, সব লজ্জা, সব দুঃখ, সব ভয় ঠেলে শুধু এগিয়ে যেতে হবে, তুমি মানুষ হয়ে বাঁচবে।” বুড়ো তার শুকনো হাতখানা একবার রাজুর মাথায় রাখল। “তুমি জয়ী হবে”। তারপর খুব ব্যস্ত হয়ে বলল, “এবার তুমি ঘরে ফিরে যাবে। সূর্যের দিকে মুখ করে এগিয়ে যাও, নদীর ধারে নৌকো বাঁধা আছে।” রাজু নিজের হাতখানা দিয়ে বুড়োর শুকনো ডালের মতো হাত জড়িয়ে ধরে রুদ্ধ কন্ঠে বলল “ তোমাকেও আমি সঙ্গে নিয়ে যাব, আমি তোমাকে চিনি, তুমি আমার ঠাকুরদা।” বুড়ো ম্লান হাসল। ‘আমার যে আর ফেরার উপায় নেই ভাই, আমিও যে গাছ হয়ে গেছি।” রাজুর দু-চোখ জলে ভরে এল। “ সেই ছেলেবেলা থেকে তোমার ছবি দেখে দেখে আমি যে তোমাকে খুব ভালবেসেছি, মনে মনে খুঁজছি। এতদিন পরে তোমাকে আমি পেয়েছি, তোমাকে ফেলে আমি কেমন করে যাব?” রাজুর কথা শেষ হতে না হতে কোথায় চলে গেল বুড়ো। সামনে শুধু বিশাল এক গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। ঘন সবুজ পাতা থেকে শুধু দু-ফোঁটা জল ঝরে পড়ল রাজুর মাথায়।

সূর্যকে সামনে রেখে রাজু প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল। বাঁধা ডিঙি খুলে নদীর বুকে দাঁড় বাইতে বাইতে দেখল দূরে মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত এক প্রাচীন গাছ, ডালপালা নেড়ে রাজুকে বিদায় জানাচ্ছে। হাত দিয়ে চোখের জল মুছে রাজু জোরে জোরে দাঁড় বাইতে শুরু করল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%