ভারতী গুহ
বাঘের ভয়ে গ্রাম শুদ্ধু লোক জড়সড়। গাঁ পেরোলেই জঙ্গল। সেখান থেকে ইয়া বড়ো এক কেঁদো বাঘ রোজ সন্ধ্যে হলেই গাঁয়ে এসে হানা দেয়। গেরস্তের গরু, ছাগল, ভেড়া যা পায় তুলে নিয়ে হাওয়া। তাই সূর্য অস্ত যেতে না যেতেই যে যার কাজকম্ম সব সেরে, তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দেয়। একটি লোকও আর বাইরে থাকে না। বাঘের তাই খুব রাগ। তার মানুষ খেতে খুউব লোভ হয়, কিন্তু একটাও মানুষ খুঁজে পায় না। পাবে কী করে? সবাই তো নিঃশ্বাস বন্ধ করে ঘরের ভেতর লুকিয়ে বসে আছে। সারারাত বাঘ গ্রামের পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। রাত যখন শেষ হয়ে আসে, তখন মানুষ না পেয়ে, গরু, ছাগল, মুখে করে একলাফে জঙ্গলে ফিরে যায়। গাঁয়ের মানুষও নিশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না। সবাই ভেবে ভেবে হয়রান। কী করে বাঘের হাত থেকে বাঁচা যায়?
মুশকিল হয়েছে হারাধনকে নিয়ে। সে এক দন্ডও ঘরে থাকে না। তার পিসির সাধ্য কি তাকে ঘরে আটকে রাখে? কার বাগানে আম, কার গাছে পেয়ারা, কোনো পুকুরে শালুক, পদ্ম, কোনো ঝোপে ফড়িং, কোনো গাছে পাখির ছানা, সে সারাদিন টো টো করে খুঁজে বেড়ায়। রোগা লিকলিকে, একরত্তি ছেলে, তার জ্বালায় গাঁয়ের লোক অস্থির। সন্ধ্যে হবার আগেই পিসি হারুকে বনবাদাড়, মাঠঘাট খুঁজে, ধরে এনে ঘরে ঢুকিয়ে, মোটা দড়ি দিয়ে হাত পা বেঁধে দরজায় তালা দিয়ে রাখে।
কিন্তু একদিন পিসি হারাধনকে কোথাও আর খুঁজে পেল না। এদিকে সন্ধ্যে হয় হয়। পিসি তো ডেকে ডেকে সারা—“হারু, হারাধন, ওরে কোথায় তুই? তোকে যে বাঘে খাবে! ঘরে আয়”। সবাই যে যার ঘরে বসে পিসির চিৎকার শুনতে পেল, আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল, “আজ আর ওকে কেউ বাঁচাতে পারবে না, আজ ও বাঘের পেটেই যাবে।”
পিসি আর কী করে? কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে এসে দরজায় খিল দিল। সন্ধ্যে যেই হল, বাঘও দেখা দিল। হারাধনের হুঁশ নেই। সে তখনও জামরুল গাছের তলায় একমনে ডাংগুলি খেলছে। হঠাৎ একটা ডোরাকাটা ছোট্ট কাঠবেড়ালি হারুর পায়ের কাছ দিয়ে ছুট্টে যেতেই হারুও পড়িমড়ি করে তাকে ধরতে ছুটল। এদিকে সেই মস্ত কেঁদো বাঘ দূর থেকেই হারুকে দেখতে পেয়েছে। লোভে তার জিভ চকচক করে উঠল। বিরাট হাঁ করে সে ছুটে এল হারুর দিকে। হারাধনও পাঁই পাঁই করে ছুটছে কাঠবেড়ালি ধরতে। ব্যাস! বাঘের হাঁ-করা মস্ত মুখের মধ্যে শাঁ করে ঢুকে গেল লিকলিকে একরত্তি ছেলে হারাধন। গাঁয়ের লোকেরা বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে দেখল এই ভয়ানক দৃশ্য। তারা কপাল চাপড়ে ‘হায় হায়’ করে উঠল।
এদিকে বাঘ তো হারুকে চিবিয়ে খাবার কোনো সুযোগই পায়নি। হারুতো একটা তিরের মতো সোজা বাঘের পেটের ভেতর গিয়ে পড়েছে। বাঘের পেটের ভেতরটা নরম নরম, তাই হারুর একটুও লাগেনি। কিন্তু বড্ড অন্ধকার, শুধু দুটো ঘুলঘুলি দিয়ে একটু আলো আসছে। সে দুটো আসলে বাঘের নাকের দুটো ফুটো। হারাধনের কখনোই খুব একটা খিদে পায় না। সে সারা দিন ঘুরে ঘুরে ফল পাকুড় খায়। তাই অন্ধকারে গুটিশুটি মেরে নরম গদিওলা বাঘের পেটের বিছানায় আরাম করে ঘুমিয়ে পড়ল।
বাঘ তো ভ্যাবাচ্যাকা। একটা মানুষ যে সে খেয়েছে, সে বিষয়ে তার কোনোও সন্দেহ নেই। কারণ পেটটা তো ভরে গেছে। কিন্তু না পেল কোনো স্বাদ, না পেল কোনো গন্ধ। মানুষ খাবার মজা একটুও টের পেল না। মন খারাপ করে সে বনে ফিরে চলল। পাখিদের কিচিরমিচিরে হারাধন বাঘের পেটের ভেতর ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে। বাঘ ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে তখনও ঘুমোচ্ছে। নিশ্বাসের তালে তালে পেটের ভেতরটা নড়ছে। হারুর খুব মজা লাগল। সে বসে বসে খানিকটা দোল খেল। বাঘের অল্প হাঁ করা মুখ আর দুই নাক দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়েছে। হারাধন পকেট থেকে গুলতি বের করে একটা নাকের ফুটো লক্ষ্য করে জোরে ছুঁড়ল। হ্যাঁচ্চো করে বিকট এক হাঁচি দিয়েই বাঘ ধড়মড় করে উঠে বসল। হারু ততক্ষণে বাঘের পেটের ভেতর ডাংগুলি খেলতে শুরু করেছে। জায়গা একটু কম, তার মধ্যেই ঘুরে ঘুরে, লাফিয়ে লাফিয়ে সে ডাংগুলি খেলছে। বাঘের তো পেটের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। সে কী করবে ভেবে না পেয়ে এদিক-ওদিক পায়চারি করতে লাগল। হারুও দুলতে দুলতে ডাংগুলি খেলছে, তার দারুণ মজা লাগছে। ঠিক যেন রথের মেলার নাগরদোলা। হারু এবার হি হি করে হাসতে হাসতে লাফ ঝাঁপ ডিগবাজি শুরু করে দিল। বাঘ অস্থির হয়ে চরকির মতো ঘুরতে শুরু করেছে, হারুও হি হি হাসছে, আর নরম পেটের গদির ওপর লাট্টুর মতো পাক খাচ্ছে। এত আনন্দ এত মজা হারাধন জীবনে পায়নি।
এদিকে বাঘের তো প্রাণ যায় যায়। সে জঙ্গল জুড়ে ছোটাছুটি দাপাদাপি শুরু করে দিল। তার পেটের মধ্যে তান্ডব চলছে। ছুটে বসে শুয়ে দাঁড়িয়ে কিছুতে স্বস্তি পায় না। কী করে? কোথায় যায়? বনের যত পশু পাখি বাঘের কান্ড দেখে অবাক। চোখের সামনে দিয়ে হেলে দুলে হরিণ যাচ্ছে, গুটি গুটি পায়ে খরগোশ, শেয়াল বাঘকে আড়চোখে দেখতে দেখতে চলেছে, বাঘ কাউকেই ধরছে না, মারছে না। ধরবে কী? তার তো খিদেই নেই। হারাধনকে খেয়ে তার ভীষণ বদহজম হয়েছে। মাথা ঘুরছে, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, জিভ ঝুলে পড়েছে। পেটের ভেতর যা হচ্ছে তা আর বলার নয়।
বাঘ তো যন্ত্রণায় আর কষ্টে অস্থির হয়ে পাগলের মতো বনময় ছোটাছুটি করতে করতে হাঁ করে হাঁপাতে লেগেছে। হারাধনও বাঘের গলার কাছে বসে, উঁকি মেরে, বায়োস্কোপ দেখার মতো বনের দৃশ্য দেখছে। নদী, নালা, গাছপালা, ফুল পাখি হরিণ, খরগোশ কত কী! সারাটা দিনের ধকলে আর পেটের যন্ত্রণায় বাঘ খুব কাহিল হয়ে পড়ল। তার মনে হল এক্ষুণি সে মরে যাবে। মানুষ খেয়েই তার এই দশা। মানুষের কাছেই নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে এই রোগের ওষুধ। তাই সে সন্ধ্যে হতে না হতে বন ছেড়ে গ্রামের বড়ো মাঠটার কাছে এসে হাজির হল। তার সেই তেজ আর নেই, দুই চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে। বাঘ মাঠের একধারে বসে ঘ্যাঁও ঘ্যাঁও করে বিকট স্বরে চেঁচিয়ে কান্না জুড়ে দিল। বাঘের কান্না শুনে ঘরে ফেরা পাখিরা থমকে গিয়ে, দল বেঁধে বাঘের মাথার ওপর ঘুরে ঘুরে কিচিরমিচির শুরু করে দিল। সব হই হট্টগোল শুনে গ্রামের লোক ভীষণ চমকে উঠল। তারাও দলে দলে মাঠের দিকে ছুটে আসতে লাগল ব্যাপারখানা কী দেখবার জন্য। একটা মানুষ খেয়েই বাঘের এই বদহজম, প্রাণ বেরোবার জোগাড়, একসঙ্গে অত মানুষ দেখে বাঘতো ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল। তার গা গুলিয়ে বমি পেল, মাথা বনবন করে ঘুরতে লাগল, পেটের ভেতরটা আঁকপাঁক করে উঠল। আকাশ ফাটানো ‘ওয়াক’ শব্দ তুলে খুব জোরে বমি করে ফেলল আর হারাধনও বাঘের পেটের ভেতর থেকে সড়াৎ করে ছিটকে বেরিয়ে দশহাত দূরে ঘাসের ওপর গড়িয়ে পড়ল।
আর কি বাঘ সেখানে থাকে? সে তিনলাফে পগার পার। গ্রাম ছেড়ে, বন ছেড়ে, দেশ ছেড়ে কোথায় যে চলে গেল, তাকে আর কেউ কোনোদিন দেখেনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন