অপরাধী

ভারতী গুহ

একজন অপরাধী, যে কিনা নিজের পরিবারকে ধ্বংস আর অপমানের মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়ে গেছে চিরদিনের মতো।

সেই অপরাধের বোঝা এই দীর্ঘ দশবছর ধরে সায়নের মাথায়ও চেপে বসে আছে। ওর মাত্র আট বছর বয়স তখন। তখনকার, সেই ঘটনা কেন আজও ভুলতে পারে না! তবে ও জানে, ওদের পরিবারের কেউই ভোলেনি, ভুলতে পারবেও না। ওদের কলকাতার এই ফ্ল্যাটের বাবা-মাও পারবে না, আর গ্রামের বাড়িতে জ্যেঠু, জ্যেঠিমণি, রাঙাদাদুও না। এমনকি গ্রামের লোকজনও না।

সায়নদের বসার ঘরে দেয়ালে একটি ছবি ছিল। আটবছরের সায়ন, আর ওর থেকে দশবছরের বড়ো অয়ন, সায়নের দাদাভাই। দু-ভাই পাশাপাশি বসে আছে। ছোটোভাইকে একহাতে জড়িয়ে ধরে মুখভরা হাসি নিয়ে। এই ছবিটা বাবার তোলা। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েই দাদাভাই এসেছিল ওদের বাড়িতে, বেশ কিছুদিন ছিল। বিকেলে রোজ দাদাভাইয়ের হাত ধরে পার্কে যেত। দাদাভাইয়ের কাছেই ওর ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট খেলা শেখা। আর ঘরে বসে ক্যারাম, দাবা এই সব। রাত্তিরে দুইভাই একসঙ্গে ঘুমোত। কত গল্প যে শুনেছে রাত পর্যন্ত জেগে। এখনও সায়নের মনে আছে। গল্পের বই পড়ার অভ্যেসও দাদাভাইয়ের কাছে গল্পশুনেই হয়েছে। সেবারই বাবার শখ হল, দুইভাইকে একসঙ্গে বসিয়ে ছবি তোলার। দাদাভাই চলে যাবার আগেই, বাবা ছবিটা বড়ো করে বাঁধিয়ে বসার ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে দিয়েছিল।

জঘন্য সেই ঘটনার পরেই বাবা ছবিটা দেয়াল থেকে সরিয়ে নিয়েছিল। সায়ন একদিন ছবিটা খুঁজে পেয়ে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখল। আজও ওর কাছে আছে সেই ছবি। সাংঘাতিক সেই খবর কি করে ওদের কলকাতার ফ্ল্যাটে এসে পৌঁছেছিল, সে কথা আজ সায়নের আর মনে নেই। শুধু মনে আছে ওদের সংসারটা কেমন যেন বদলে গেল। মূহুর্তে সব হাসি আনন্দ মুছে গেল। বাবাকে অনেক থানা পুলিশ এইসব করতে হয়েছে। বাবা বারে বারে ছুটে গেছে গ্রামের বাড়িতে। আট বছরের সায়ন অনেক কিছু বুঝতে পারলেও সব কিছু বোঝেনি।

কিন্তু কি করে যেন খবরটা সায়নের স্কুলেও পৌঁছে গিয়েছিল। বন্ধুরা এবং দুয়েকজন টিচারও এই বিষয়ে ওকে প্রশ্ন করেছিল। আট বছরের সায়ন লজ্জায় অপমানে, কষ্টে, কেমন দিশেহারা হয়ে কেঁদে ফেলেছিল। বাড়ি ফিরে বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে সারাদিন শুধু কেঁদেছিল। কিছুতেই আর ঐ স্কুলে যেতে রাজি হয়নি। বাধ্য হয়ে বাবা তাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করেছিল।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবার দুদিন পরেই দাদাভাই আবার এল। সায়নের স্পষ্ট মনে আছে। বাবাকে প্রণাম করতেই বাবা বুকে জড়িয়ে ধরেছিল দাদাভাইকে আর সায়নের দিকে তাকিয়ে বলেছিল “দেখেছ, তোমার দাদাভাই কত ভালো রেজাল্ট করেছে? তোমাকেও দাদাভাইয়ের মতো হতে হবে কিন্তু।” দাদাভাই তাড়াতাড়ি এসে সায়নকে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিল “আমার ভাই আমার থেকেও অনেক ভালো রেজাল্ট করবে, তুমি দেখে নিও কাকুমণি”।

অয়ন সবথেকে বেশি নম্বর পেয়ে ওদের জেলার মধ্যে প্রথম হয়েছিল উচ্চমাধ্যমিকে। দাদাভাই সেদিন এসে রাঙাদাদুর লেখা একটা চিঠি বাবার হাতে দিয়েছিল। তারপর তো সারাদিন হইচই আর আনন্দ।

এই দীর্ঘ দশবছর পরে এখনও সায়নের সব কিছু মনে আছে। চলে যাবার সময় দাদাভাইয়ের হাত ধরে সায়ন বাবা-মার সঙ্গে নীচে গেট পর্যন্ত এসেছিল। বাবা দাদাভাইকে একহাতে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “তোকে নিয়ে আমাদের সবার অনেক আশা। আমি জানি, একদিন অনেক বড়ো হবি তুই।” মা দাদাভাইয়ের পিঠে হাত দিয়ে আদর মাখা গলায় বলেছিল, “আমাদের সেই ছোট্ট অয়ন দেখতে দেখতে কত বড়ো হয়ে গেল”।

সায়নকে কোলে তুলে নিয়ে অনেক আদর করে দাদাভাই বলেছিল, “আবার যখন আসব, আমাকে দাবা খেলায় হারাতে হবে কিন্তু।” কোল থেকে সায়নকে নামিয়ে এবার বাবা-মাকে প্রণাম করে গেটের দিকে এগিয়ে গেল। বাবা শেষ কথা বলেছিল, “টাকাটা সাবধানে রাখিস।” অয়ন মাথা নেড়ে পথে পা রেখে, একমুখ হাসি নিয়ে সবার দিকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

বাবা ওপরে এসে মাকে বলেছিল, “অফিস থেকে দুদিনের ছুটি নিয়ে একবার বাড়ি যেতে হবে। দাদার শরীরটা ভালো যাচ্ছেনা। রাঙাকাকুরও বয়স হয়েছে । এতদিনের পুরোনো বাড়িঘর ভেঙে পড়ছে, সারানো দরকার। সামনেই অয়নের কলেজে ভর্তির ব্যাপার। তারও খরচ আছে। রাঙাকাকা অনেকদিন পরে চিঠি লিখল। আমারও যাওয়া হয়ে ওঠে না। অয়নের হাতে তাই হাজার কুড়ি টাকা দিয়ে দিলাম। রাঙাকাকার হাতে দেবার জন্য। আমারও তো তেমন সামর্থ নেই। যতদিন না ছেলেটা দাঁড়ায়, আমাদের সবাইকেই একটু কষ্ট করতে হবে। ওর মুখ চেয়েই তো আছি সবাই। আমার ছেলেটা তো অনেক ছোটো।

পরের দিনই সেই ভয়ঙ্কর খবরটা কে যে ওদের বাড়িতে বয়ে নিয়ে এল, আজ আর সায়নের তা মনে নেই। শুধু মনে আছে তারপর থেকেই ওদের সংসারটা কেমন বদলে গেল। মূহুর্তে সব হাসি আনন্দ হারিয়ে গেল। অনেক থানা পুলিশ করা হয়েছে, কোনো লাভ হয়নি। বাবার মাকে বলা কথাগুলো সায়নের আজও মনে আছে। “ছেলেবেলাই তো আমরা আমাদের বাবাকে হারিয়েছি তারপর মাও একদিন চলে গেল। ছেলেবেলা থেকেই দাদা আর আমি রাঙাকাকার কাছেই মানুষ। সারাজীবন নিজে বিয়ে করেননি। গ্রামের মাস্টারমশাই হয়েই জীবন কাটিয়েছেন। স্কুলের আদর্শ শিক্ষক। গ্রামের সবারই শ্রদ্ধার মানুষ। নিজের মন প্রাণ সব ঢেলে দিয়ে ছিলেন ঐ হতভাগাটাকে আদর্শ এক মানুষ করে গড়ে তুলতে। তার প্রতিদানে এই! সমস্ত ব্যাপারটাই কেমন যেন অবিশ্বাস্য।”

স্কুলের গর্ব, গ্রামের সবার প্রিয় অয়ন, সব বিশ্বাস সব আদর্শ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে, নিজের পরিবারের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে, কুড়ি হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। আর কোনোদিন গ্রামে ফিরে আসেনি। সে চোর, জঘন্য এক অপরাধী।

সায়নের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা যখন চলছিল, তখনই গ্রামের বাড়ি থেকে জ্যেঠুমণির মারা যাবার খবর এসে পৌঁছোয়। দীর্ঘ দশবছর ধরে নিজের একমাত্র সন্তানের অপরাধের বোঝা আর বইতে পারছিলেন না। শরীরে মনে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া এক মানুষ হয়ে এতদিন বেঁচেছিলেন।

খবর পেয়েই বাবা গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। দিন তিনেক পরে ফিরে এসে সায়নকে ডেকে বলেছিল, তুই তো এখন বড়ো হয়েছিস, পরীক্ষাটা শেষ হলেই তুই চলে যাস। অফিস থেকে বেশ কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে, তোর মা আর আমি তারপর চলে যাব। দাদার শ্রাদ্ধের দু-তিন দিন আগেই পৌঁছে যাব।

আজ সায়ন অনেকদিন পরে ওদের গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে। দশবছর পার হয়ে গেছে। আসলে, দাদাভাইয়ের ঐ ঘটনার পরে ওর গ্রামে যাবার ইচ্ছাই হয়নি। এরমধ্যে বাবা কয়েকবার ঘুরে এসেছে।

এই প্রথম ও একা যাচ্ছে। বাবা সব কিছু ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে। পৌঁছোতে অসুবিধে হবে না। বেশ কিছু টাকাও ওর সঙ্গে দিয়েছে, জ্যেঠুমণির কাজের জোগাড়যন্ত্র করতে লাগবে। গ্রামের লোকজন রাঙাদাদুকে সাহায্য করবে। জ্যেঠিমণির শরীরও নাকি একদম ভালো নেই।

বাসে করে অনেকটা পথ। তারপর সাইকেল রিক্সা। ভোরবেলা রওনা দিলেও, পৌঁছাতে দিন গড়িয়ে যাবে। সায়নের যাবার খবর বাবা রাঙাদাদুকে আগেই জানিয়ে দিয়েছে। সায়ন বাসের জানালার পাশেই সিট পেয়ে গেল। আস্তে আস্তে বাসে ভিড় বাড়ছে। ওর এই আঠেরো বছরের জীবনে এই প্রথম একা এতখানি পথ যাওয়া। উত্তেজনা আর ভালোলাগার সঙ্গে চাপা একটা কষ্ট বুকের মধ্যে জমে উঠেছে। এই কষ্ট ওর নিজের, কাউকে বোঝাতে পারবে না। দু-ধারে বাড়ি ঘর, বাজার দোকান, গাছপালা, খেলার মাঠ, চাষের জমি, গ্রাম গঞ্জ পেরিয়ে, ভর্তি-বাস, কালো পিচের রাস্তা ধরে হু হু করে এগিয়ে ছুটে চলেছে।

ঘন্টা দুয়েক যেতে না যেতেই, বাইরের ঝলমলে রোদ কেমন যেন ম্লান হয়ে এল। সায়ন জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখতে পেল, দিগন্ত বিস্তৃত আকাশের ঢাল বেয়ে কালো মেঘ উঠে আসছে। একসময় বিকট এক ঝাঁকুনি দিয়ে বাসটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল রাস্তার একদম বাঁদিক ঘেঁসে। আর একটু হলেই পাশের খালটার মধ্যে গড়িয়ে পড়ত। বাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে, বসে থাকা মানুষগুলো এর ওর গায়ে হুম্‌ড়ি খেয়ে পড়ল। সায়নের মাথার বাঁদিকটা বাসের জানালার গায়ে জোরে ঠুকে গিয়ে, ঝিমঝিম করে উঠল মাথা। কন্ডাক্টারর, ড্রাইভার সঙ্গে কৌতূহলী সব যাত্রীরা চটপট নেমে পড়ল বাস থেকে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে যন্ত্রপাতি নিয়ে ঠোকাঠুকি করার পর ড্রাইভার ঘোষণা করল, বাস আর যাবে না। বড়োরকম ঝামেলা হয়েছে। কাছাকাছি কোথাও গাড়ী সারাবার গ্যারেজ বা মেকানিক নেই। মেকানিকের খোঁজ করতে অনেক দূরে যেতে হবে। তাই বাস ছাড়ার কোনো ঠিক নেই।

মাথার ওপর গুড়গুড় করে মেঘ ডেকে উঠল। কখন যেন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে চারিদিকে ছায়ার পর্দা নেমে এসেছে। এরমধ্যে অনেকেই সামনের পথ ধরে হাঁটা লাগিয়েছে। বাকিরা বাসের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে জল্পনা কল্পনা করছে। সায়ন এবার বড়ো ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নেমে পড়ল বাস থেকে। সরুখাল পেরিয়ে পিচের রাস্তার দু-ধারের ঢালুতেই চাষের জমি। অনেক দূরে গাছপালা আর ছোটো ছোটো ঘরবাড়ি চোখে পড়ছে। সায়ন বিপন্ন মুখে, এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছুই ঠিক করতে পারছিল না। ঠিক তক্ষুনি, আধময়লা ধুতি আর হাফসার্ট পরা একজন মানুষ ওর দিকে এগিয়ে এল। দেখে মনে হয় এখানেই কাছাকাছি কোনো গ্রামে থাকে। সায়নের সামনে এসে গ্রাম্য টানে জিগ্যেস করল, “কতদূর তক যাওয়া হবে ভাই? কোন্‌ গেরাম?” সায়ন নিজেকে সামলে নিয়ে চট্‌পট্‌ নিজের গ্রামের নামটা বলতেই লোকটিকে সামান্য চিন্তিত দেখাল। একটু ভেবে বলল, “সে তো এইখান থেকে অনেক খানি পথ। ভারি মুইশকিলে পইড়ে গেলে দেখছি। ওইদিকে আকাশও কালো কইরে এল। ঝড় বিষ্টি এইসে পড়বে। কলকাতা শহরের ছেলে তোমরা। এতখান পথ!” খানিকটা ভেবে নিয়ে মানুষটি এবার বলল। “ভাই একটা কাজ কর দিকিন। ঐ বাঁহাতের সরু পথটা ধরে পা চালিয়ে সোজা হাঁটা লাগাও। পেরায় আধাঘন্টা একঘন্টা পরে; গাছগাছালির মধ্য দিয়ে একটা সরু মেঠো পথ দেখবে ডান হাতে বাঁক নিয়েছে। ঐ রাস্তা ধরে এগুলেই একটা জঙ্গল পড়বে। আগে ওইখানটা ঘন বন ছিল। এখন গাছগাছালি অনেক কাটা পড়তে, একটু হালকা হয়েছে। এই জঙ্গলটা পেরুতে পারলেই তোমাদের গেরামের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। সেখান থেকে বড়ো রাস্তা অবধি হেঁটে গিয়ে রিক্সা-ভ্যান পেয়ে যাবে”। এবার গ্রামের সেই মাঝবয়সী মানুষটি সায়নের পিঠে হাত রেখে বলল, “যাও, আর দেরি করোনি, ঝড়-বৃষ্টি এল বলে।” সায়ন একটু হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করল। পেছনে একবার তাকিয়ে দেখল, উপকারী সেই গ্রাম্য মানুষটি, ডান দিকের ঢালু জমিতে নেমে, চাষের আলপথ দিয়ে জোরে পা চালিয়ে হেঁটে চলেছে। কোথাও কোনো মানুষ আর চোখে পড়ছে না। চারিদিক নিস্তব্ধ।

ভারি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এতটা পথ হাঁটতে হাঁটতে সায়ন খুব হাঁপিয়ে পড়ছে, কিন্তু থামা চলবে না। হঠাৎ সমস্ত নৈঃশব্দ ভেঙে দিয়ে, গাছের ডালপালা উত্তাল করে ঝড় এল। ওইতো, রাস্তার বাঁদিকে একটু নেমেই একটা মেঠো পথ। সায়ন ব্যাগটা চেপে ধরে পায়ে চলা মেঠো পথে নেমে এল। চারিদিকের ঝোপঝাড়ের গাছপালা ঘন হতে শুরু করেছে। চড়্‌বড়্‌ করে বড়ো বড়ো বৃষ্টির ফোঁটা নেমে এল। সামনেই বড়ো বড়ো গাছপালার জঙ্গলে ছায়া ছায়া অন্ধকার। হঠাৎ বন জঙ্গল আলো করে আকাশে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠতেই কানফাটানো বিকট গর্জনে কাছেই কোথাও বাজ পড়ল। সায়নের মাথার ভেতরটা ঝন্‌ঝন্‌ করে কানে তালা লেগে গেল। ও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নিজেকে সামলে নিতেই মনে পড়ল বিদ্যুৎতের চোখ ঝল্‌সানো আলোতে সামনেই যেন একটা ভাঙা মন্দিরের মতো কিছু চোখে পড়েছে। নিজেকে শান্ত করে মনে জোর এনে পা বাড়াল সামনের দিকে। আবছা অন্ধকার চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা ইঁট দেখতে পেয়ে সাবধানে ইঁটে পা রেখে রেখে মন্দিরে উঠে পড়ল। আরও প্রবল বেগে বৃষ্টি নামল। মন্দিরের এধারের মতো ওধারের দেয়ালও ভাঙা। ভেতরটা তাই পুরো অন্ধকার হয়ে যায়নি। বৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাতে তাড়াতাড়ি মন্দিরের ভেতর ঢুকতে গিয়েই ভাঙা ইটের টুকরোয় পা লেগে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। ইঁটে খুব জোরে কপাল ঠুকে যেতেই অসহ্য ব্যাথায় সায়নের দুইচোখে অন্ধকার নেমে এল।

কতক্ষণ পড়েছিল ও জানে না। একসময় মনে হল কে যেন ওকে খুব আলতো করে ধরে ইঁটের পাঁজার ওপর বসিয়ে দিয়েছে। কপালের কাছটায় খুব জ্বালা করছে। বৃষ্টির শব্দ আর নেই। চারিদিক নিস্তব্ধ, নিশ্চুপ। চোখ মেলে তাকাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। সেই গভীর নৈঃশব্দের মধ্যে, একটা কোমল স্বর যেন দূর থেকে প্রতিধ্বনির মতো ভেসে এল!- ‘বেশি লাগেনি তো?’ মনে জোর এনে, দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে সায়ন উঠে দাঁড়াতেই, সামনের ভাঙা দেয়ালের বাইরের আকাশে ঝল্‌সে উঠল বিদ্যুৎ। ভাঙা মন্দিরের ভেতরটা পলকের জন্য আলোকিত হয়েই গভীর অন্ধকারে ঢেকে গেল। সেই একপলকই সায়নের পক্ষে যথেষ্ট মাথার চুল থেকে পায়ের নোখ পর্যন্ত চমকে উঠল। দশবছরের পরেও সায়নের চিনতে একটুও ভুল হয়নি। সেই ছবির ‘দাদাভাই’। দুই ভাইকে পাশাপাশি বসিয়ে দশবছর আগে বাবা যেই ছবিটা তুলেছিল। এতবছর ধরে সায়ন যেটা নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছে। কতসময় ঘর বন্ধ করে একা বসে সেই ছবি যে কতবার দেখেছে তার ঠিক নেই।

কিন্তু এই দীর্ঘ দশ বছরেও দাদাভাই কিন্তু একটুও পালটায়নি। ঠিক সেরকমই আঠারো বছরের তরুণ। ভাঙা মন্দিরের আবছা অন্ধকারে মুখোমুখি দুইভাই দাঁড়িয়ে। মাথায়ও দু-জনেই সমান সমান। যারা ছিল দশ বছরের ছোটো বড়ো। প্রতিধ্বনির মতো কন্ঠ স্বর দূর থেকে ভেসে এল, “একটা কাজ তোকে করতে হবে ভাই। আয় আমার সঙ্গে।” কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনে অন্ধকারে দাঁড়ানো দাদাভাই, একটু পেছনে ঘুরে হাঁটতে শুরু করেছে। মন্ত্রমুগ্ধ সায়নও তার পেছন পেছন হেঁটে চলল। কয়েক পা এগিয়েই সায়ন দাঁড়িয়ে পড়ল কারণ সামনের জনও দাঁড়িয়ে পড়েছে। পেছন ফেরা শরীরটা একহাত দূরে দাঁড়িয়ে তার ডান হাতখানা তুলে সামনের দিকে কিছু নির্দেশ করছে। প্রতিধ্বনি স্বর আবার ভেসে এল-“ওই যে সামনের বেদি। অনেককাল আগে যেখানে দেবতার মূর্তি ছিল আজ আর নেই, ভেঙে গেছে।” সেই আশ্চর্য স্বর একটু থেমে, আবার যেন দূর থেকে শোনা গেল, “ঐ ভাঙা বেদির ওপাশটায় তোকে একটু যেতে হবে ভাই। বেদির ঠিক গা ঘেঁসে, দেবতার ভেঙে যাওয়া মুর্তির একটা বড়ো খন্ড পড়ে আছে। ওটা ঠেলে সরিয়ে দিলেই চাপা পড়া একটা ছোট্ট জিনিস চোখে পড়বে। সেটা তোকে তুলে আনতে হবে।” সেই স্বর মূহুর্তকাল স্তব্ধ হয়েই আবার ভেসে এল। সেই প্রতিধ্বনির মধ্যে যেন ব্যাকুল, কোমল সেই কন্ঠস্বর বলে উঠল “যা ভাই তুলে নিয়ে আয়, তুই পারবি।”

সায়ন খুব সাবধানে, ইটঁ পাথরের টুকরো থেকে পা বাঁচিয়ে, ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। বাঁ পাশ দিয়ে ঘুরে বেদির উল্টো দিকে পৌঁছে গেল। বেদির গা ঘেঁসে মাটিতে পড়ে থাকা সাদা পাথরের বড়ো একটা খন্ড আবছা অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে। সায়ন এবার বাঁ-কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে একটু ঝুঁকে পড়ে, দুই হাতের শক্তি দিয়ে পাথরটা ঠেলে একটু সরিয়ে দিতেই, ছোটো মতো কিছু একটা চোখে পড়ল মন্দিরের মেঝেতে যেন মিশে আছে। সাবধানে হাত বাড়িয়ে তুলে নিয়ে মনে হল কাগজের মতো কিছু। ব্যাগ কাঁধে তুলে কাগজটা হাতে নিয়ে আবার উল্টোদিকে এগিয়ে এল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াছায়া মূর্তির কাছে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সায়ন ওর হাতের কাগজটা এগিয়ে ধরতেই বেজে উঠল প্রতিধ্বনি স্বর,-“না না ওটা তোর কাছেই থাকবে।” এবার সে সামনের ভাঙা দেয়ালটার দিকে চলতে শুরু করেছে। সায়নও তার পাশে এগিয়ে এসে এই প্রথম কথা বলল। রূদ্ধস্বরে জিগ্যেস করল “এটা কি?” দূর থেকে প্রতিধ্বনি ভেসে এল, “ওটা একটা খাম”। প্রতিধ্বনি স্তব্ধ হয়েই, আবার কন্ঠস্বর বেজে উঠল “ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেছে, আকাশ পরিষ্কার, চাঁদ উঠবে একটু পরেই”। সায়ন এবার নিজের হাতে ধরে সাদা জিনিসটার দিকে তাকাল, অনেক পুরোনো কাল্‌চে হয়ে চেপ্‌টে যাওয়া একটা খামের মতোই কিছু। আবার ভেসে আসে আশ্চর্য সেই কন্ঠস্বর, “ভেতরের টাকাটা গুনে নে, ঠিক কুড়ি হাজার আছে”। সায়ন এবার মুখ তুলে সামনে তাকাল। গলার কাছে উঠে আসা কান্না ওকে কথা বলতে দিচ্ছে না, অনেক কষ্টে প্রায় ফিস্‌ফিস্‌ করে উচ্চারন করতে পারল “তুমি?”

কখন যেন মেঘ মুছে গেছে আকাশ থেকে। দিন শেষের আলো এসে পড়েছে তার মুখের ওপরে। মুখের রেখাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। দুইভাইয়ের একসঙ্গে বসে তোলা ছবির সেই চেনা মুখ। সায়নের দাদাভাই। কিন্তু দাদাভাইয়ের হাসিখুশি সেই চেনা মুখটা বড়ো ম্লান। দু-জনের মাঝখানে আলো অন্ধকারের মধ্যে আশ্চর্য এক নীরবতা। এই ভাঙা মন্দির, বাইরের পৃথিবী, যেন হারিয়ে গেছে। দমবন্ধ-করা গভীর সেই নৈঃশব্দ্যের মধ্যে হঠাৎ একসময় চারধারে কিছু কথা প্রতিধ্বনি হয়ে ভেসে বেড়াতে লাগল।

“সেই দিনও ঠিক এই রকমই ঝড়-বৃষ্টি! পথের মাঝে খারাপ হয়ে যাওয়া, বাস থেকে নেমে, জঙ্গলের পথটা ধরতে হল। আকাশ জোড়া কালো মেঘ। তুমুল বৃষ্টিতে চারপাশটা ঝাপসা হয়ে গেছে, পথ দেখা যায় না। বিদ্যুতের আলোয় মন্দিরটা চোখে পড়ল। বৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাতে এই ভাঙা মন্দিরে উঠে এলাম। নজরে পড়ল ওপাশের ভাঙা দেয়ালটার কোণ ঘেঁসে ছোটো একটা আগুন জ্বলছে। মানুষের গলার আওয়াজ। কারা যেন নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। কেন জানি না আমার বুকের ভেতরে একটা ভয় ঢুকে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল যে করেই হোক সঙ্গের টাকাটা বাঁচাতে হবে। মন্দিরের বেদিতে কোনো মূর্তি নেই। কিছু ভাঙা পাথরের অংশ ছড়িয়ে পড়ে আছে বেদির আশেপাশে। যতটা সম্ভব নিজেকে আড়াল করে, নীচু হয়ে নিঃশব্দে বেদির ওপাশে গিয়ে লুকিয়ে একটুক্ষণ বসে থাকলাম। তারপর কাঁধের ব্যাগটা থেকে কাকুমণির দেয়া টাকার খামটা বের করে ভাঙা মূর্তির একটা পাথরের খন্ড অনেক কষ্টে ঠেলে সরিয়ে টাকাটা তার নীচে চাপা দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। একটু এগিয়ে আসতেই ওরা আমাকে দেখে ফেলল। দেয়ালে আমার ছায়া পড়েছিল। বাতাসে ভেসে আসা কন্ঠস্বর হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। সায়নের অজান্তেই ওর নিজের গলায় উৎকন্ঠা-ফিস্‌ফিস্‌ করে জিগ্যেস করল “তারপর”? একটুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাওয়া প্রতিধ্বনি, চারপাশের বাতাসের সঙ্গে মিশে যেন এই ভাঙা মন্দিরের অবশিষ্ট দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে ফিরতে লাগল।

“আমি ওদের চিনতে পেরেছিলাম। দু-জনেই আমাদের গ্রামের, একসময় আমাদের স্কুলেই পড়ত। অন্য দু-জনকে কখনও দেখিনি। ওরা মাঝখানে ছোটো একটা আগুন জ্বালিয়ে, ঘিরে বসে নেশা করছে আর নিজেদের মধ্যে নীচুস্বরে কথা বলতে বলতে হাসাহাসি করছে।

আমাকে দেখতে পেয়েই লাফ দিয়ে উঠে ছুটে এল। আমি বাধা দেবার আগেই ওরা হিড়্‌ হিড়্‌ করে আমাকে টেনে এনে, আগুনের সামনে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। অন্য দু-জন, যারা একসময় আমাদের স্কুলে পড়ত, আমার খুব চেনা, বিশ্রি ভাবে হেসে উঠে বলল, “ওরে এ যে আমাদের গাঁয়ের সেই সুবোধ বালক! ইস্কুলের মাস্টারগুলোর আদুরে গোপাল। তারপর কুৎসিত একটা গালাগাল দিয়ে হুকুম করল, ওর কাছে টাকাকড়ি কি আছে দ্যাখ। কেড়ে নে সব।”

যারা আমাকে টেনে এনেছে, তারা জোর করে ধরে আমার জামা প্যান্ট ছিঁড়ে, বাসভাড়া আর রিক্সাভাড়ার টাকাকটা ছিনিয়ে নিল। আমার চেনা ছেলেদের মধ্যে একজনের চোখদুটো, সেই নিভু নিভু আগুনের আভায় আমি যেন হিংস্রজন্তুর মতো জ্বলতে দেখলাম। সে হঠাৎ কর্কশ কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, “এক্ষুনি এটাকে শেষ করে দে; নয়তো গাঁয়ে ফিরে সবাইকে জানিয়ে দেবে। ভাঙা মন্দির হঠাৎ স্তব্ধ নিশ্চুপ হয়ে গেল। বাতাস নেই, কন্ঠস্বর নেই। আসন্ন সন্ধ্যার আলোটুকুও আকাশ থেকে মুছে গেছে। দম-চাপা একটা অন্ধকার যেন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। সায়নের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। কাঁধের ব্যাগটা দুইহাতে চেপে ধরে সে প্রাণপণ চেষ্টায় নিজের গলায় স্বর ফুটিয়ে ফিসফিস করে জিগ্যেস করল, “তারপর”?

সেই দমবন্ধ অন্ধকারের মধ্য দিয়ে অনেক দূর থেকে কথা ভেসে এল হাওয়ার সঙ্গে। “ওরা সবাই মিলে ভাঙা ইঁট কুড়িয়ে নিয়ে আমার মাথায় সজোরে মারতে শুরু করল। আচ্ছন্ন চেতনার মধ্যেও বুঝতে পারলাম ওরা আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে পেছনের ওই কচুরিপানায় ঢাকা ডোবাটার মধ্যে নিয়ে ফেলল। পানায় ঢাকা ডোবাটার মাঝে গর্ত খুঁড়ে, পাঁকের মধ্যে পুঁতে দিল শরীরটাকে”। সায়নের শ্বাস বন্ধহয়ে আসছে। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত থরথর করে কেঁপে উঠল। নড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ঠিক ওর সামনেই স্পষ্ট পরিষ্কার কন্ঠস্বর এবার কথা বলল।

“আর দেরি করিস না ভাই, রাত নেমে আসার আগেই তোকে বাড়ি পৌঁছেতে হবে। একটু এগিয়ে গেলেই ভালো রাস্তা, রিক্সা পেয়ে যাবি। বাড়ি গিয়েই আগে রাঙাদাদুর হাতে খামটা দিয়ে বলবি, বাবার কাজ যেন এই টাকা দিয়েই করিয়ে নেয়। কাকুমণি তোকে যে টাকা দিয়েছে সে টাকা তুই কাকুমনিকেই ফেরৎ দিয়ে দিস। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরলেই তোকে কলেজে ভর্তি হতে হবে। অনেক টাকা লাগবে”। কথা থেমে গিয়ে, নেমে এল গভীর নৈঃশব্দ্য। সায়নের গলা কান্নায় আটকে গেছে, দু-চোখ বেয়ে শুধু অঝোরে জল নেমে ওর বুকের কাছটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। কান্না ঠেলে ওর গলা থেকে ব্যাকুল জড়ানো স্বর এবার ছিটকে বেরোল, “আর তুমি?”। মেঘমুক্ত স্বচ্ছ আকাশে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো এসে পড়েছে এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরটার ভেতরে—আর সেই আলো সারা গায়ে মেখে, ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে অয়ন। সায়নের দাদাভাই! যাকে দশবছর আগে সায়ন সবথেকে বেশি ভালোবেসেছিল। যে আজও একটুও বদলায়নি। সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট কন্ঠস্বরে বলল, “আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে। এবার আমাকে যেতে হবে”। দমকা একটা হাওয়া সেই কথাকে যেন উড়িয়ে নিয়ে গেল চাঁদের আলোর ঠিকানায়। জ্যোৎস্নায় মিশে হারিয়ে গেল সায়নের দাদাভাই।

রিক্সা পেতে দেরি হয়নি। আকাশে একটুও মেঘ নেই। জ্যোৎস্নায় চারপাশটা উজ্জ্বল হয়ে আছে। ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। বিদ্যুৎ এখন ওদের গ্রামেও এসে গেছে। পিচের রাস্তায় উঠেই দেখতে পেল ল্যাম্পপোষ্টের আলো।

অনেকদিনের পুরোনো, মরচে ধরা লোহার বড়ো গেটটার সামনে রিক্সা থেকে নেমেই ছেলেবেলায় দেখা সেই দোতলা বড়ো বাড়িটা চোখে পড়ল। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ধ্বংস স্তুপের মতো আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। লোহার গেটের একটা পাল্লা কব্জা ভেঙে হেলে পড়েছে। গেটের ভেতরে এবড়োখেবড়ো ইঁট বাঁধানো সরু পথটা বাড়ির সদর গেটে গিয়ে শেষ হয়েছে। পথের দুইপাশে যে ফুলের বাগান নানা রঙের ফুলে ঝকমক করত। সেখানে শুধু আগাছার জঙ্গল। ফাটল ধরা, জীর্ণ হয়ে যাওয়া, বাড়িটার গায়ের এখানে সেখানে অনেক অশ্বথের চারা গজিয়ে উঠেছে। বাড়ির ভেতরে ঢোকার সামনের বড়ো দরজাটা ভেজানো। একতলার একটা খোলা জানালা দিয়ে টিম্‌টিমে আলো চোখে পড়ছে।

সায়ন ওর দুই হাতের জোর দিয়ে অনেক দিনের পুরোনো, লোহার গেটের পাল্লা দুটো সরিয়ে দিতেই বেশ জোরে ক্যাঁচ-চ্‌ করে একটা অদ্ভুত আওয়াজ উঠল। এক মূহুর্ত পরেই বাড়ির সদর দরজাটা খুলে হাতের টর্চটা জ্বালিয়ে একজন এসে বাইরে দাঁড়ালেন। সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়া, সাদা চুলের ম্লান চেহারার এক বৃদ্ধ। অন্ধকারে মুখের অর্ধেক ঢাকা পড়েছে। সায়ন আন্দাজে রাঙা দাদুকে চিনতে পারল। লম্বা টান-টান-চেহারার, কাঁচাপাকা চুলের, স্বাস্থ্যবান রাশভারি সেই মানুষটিই। গ্রামশুদ্ধু লোক যাকে ‘মাস্টারমশাই’ বললেই একডাকে চিনতো। ছেলেবেলার চেনা, সেই ওর প্রিয় রাঙাদাদুকে আজ আর চিনতে পারছে না সায়ন।

রাঙা দাদুর পেছন পেছন, হাতে একটা হ্যারিকেন নিয়ে সাদা থান কাপড়ে মোড়া জীর্ণ শীর্ণ রুগ্ন চেহারার এক মহিলা এসে দাঁড়ালেন। জেঠিমণি। দাদাভাইয়ের মা। সায়ন মরচে পড়া, কব্জা ভাঙা লোহার বড়ো গেটটার পাল্লাদুটো দুহাতে, দুদিকে ঠেলে সরিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল।

“কে রে? সায়ন এলি? এত দেরি হল কেন?” ভাঙা ভাঙা দুর্বল গলায় কথা বলতে বলতে টর্চের আলো ফেলে রাঙাদাদু এগিয়ে আসছেন। সায়নের গলা দিয়ে, কান্না জড়ানো, বুকফাটা একটা চিৎকার ছিট্‌কে বেরিয়ে এল, “দাদাভাই অপরাধী নয়! আমার দাদাভাই অপরাধ করেনি...।

জ্যোৎস্না মাখানো গ্রামখানার নিস্তব্ধতাকে চমকে দিয়ে, সায়নের গলার সেই তীব্র স্বর, বাতাসে ভেসে ভেসে দূরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

অধ্যায় ২৬ / ২৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%