মাইকেল স্যার

ভারতী গুহ

কাল থেকে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়ে চলেছে, তার সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। আমাদের কাজকর্ম সব বন্ধ। উত্তর কাশীর নওগাঁর এই পাহাড়ি অঞ্চলে সেপ্টেম্বর মাসের গোড়াতেই আমরা এসেছি, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের পাঁচজন ছাত্র-ছাত্রী। পাহাড়ের কোলে কাঠ আর পাথরের ছোটো ছোটো কুটিরে গরিব মানুষের বসতি। এইসব মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের লেখাপড়া, রুজিরোজগার, জীবনযাত্রার খবর নেওয়াই আমাদের কাজ। পাহাড়ের চড়াই উৎরাই ভেঙে, সারাদিন আমরা ঘুরে ঘুরে কাজ করি। সরল হাসিখুশি মানুষগুলো এখন আমাদের পরম বন্ধু। কাজের শেষে ওদেরই ঘরের উঠোনে হাত পা ছড়িয়ে বিশ্রাম করি। গল্প করতে করতে ওদেরই সঙ্গে ভাগ করে মকাইয়ের রুটি খাই সবজি আর আচার দিয়ে। পাহাড়ের ঢালে বাজার বসে। সেখান থেকে টুকিটাকি কেনাকাটা সেরে পাঁচবন্ধু সন্ধ্যের পর কোয়ার্টারে ফিরে আসি।

লোকালয় থেকে বেশ একটু দূরে আমাদের দুই কামরার ছোট্ট কোয়ার্টার। সামনে বারান্দা, তারপর অনেকটা খোলা জমি, তারকাঁটার বেড়া দিয়ে ঘেরা, বাইরে বেরোবার কাঠের গেট। পেছনে কাঁকর বেছানো ঢালু পথ দিয়ে নেমে গিয়ে হাজির হওয়া যায় পাহাড়ি নদী সিমলির কাছে। শীতকালে শুকনো থাকে বর্ষায় খরস্রোতা হয়ে যায়। কোয়ার্টার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে তেখলা পাহাড়। পাহাড়চূড়ায় পুরানো গির্জা, সেখানে আছেন ফাদার জোসেফ।

সেপ্টেম্বরের গোড়ায় আমরা এখানে এসেছি। আজ সতেরোই অক্টোবর। পরশু দেওয়ালি। দেওয়ালির দিন কাজ থেকে ছুটি। সারাটা দিন গাঁয়ের মানুষের সঙ্গে থেকে ওদের আনন্দ উৎসবে যোগ দেব। সবাই আমাদের নেমন্তন্ন করেছে। খুব হৈহুল্লোড় হবে। খাওয়া-দাওয়া, সারারাত বাজি পোড়ানো এইসব। কিন্তু কাল থেকে শুরু হয়েছে মুষলধারে বৃষ্টি। সিমলি নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে, তার গর্জন শোনা যাচ্ছে।

কাল থেকে ঘরে বন্দি। খাবারদাবারও ফুরিয়ে এসেছে। বাজার যাবার প্রশ্নই নেই। এই দুদিন ধরে আমরা পাঁচবন্ধু ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছি, আর নানারকম জল্পনা-কল্পনা করে চলেছি দেওয়ালির উৎসব নিয়ে। নতুন নতুন কী মজা করা যায়, কতখানি হইহুল্লোড়, কী কী খাওয়া-দাওয়া। দিনটা কত সুন্দর, কত আনন্দ করে কাটানো হবে তারই আলোচনা চলছে। ঝড় আর বৃষ্টির দাপটে মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছে আমাদের ছোটো বাড়িটা বুঝি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে।

সোনালি বলে উঠল, “আমরা এবার ঠিক বাড়ি চাপা পড়ে মরে যাব, কেউ জানতেও পারবে না।” পূজা বলল, “যদি কালও বৃষ্টি না থামে, আমরা না খেয়েই মরে যাব, ঘরে খাবার কিন্তু সব শেষ।”

সুনীল আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “রিনির অসুবিধে নেই, এক চিমটে খাবার খেলেই ওর হয়ে যায়।”

আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, “মাইকেল স্যার কি বলেন? যারা কম খায় তাদের বুদ্ধি বেশি হয়।”

রাজেশটা পেটুক, সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, “আমি বাজারে চললাম, না খেয়ে মরতেও চাইনা, বুদ্ধি বাড়াতেও চাই না। যাই মুরগি কিনে আনি, আজ রাতে ফিস্ট হবে”। তাই শুনে আমরা সবাই হেসে উঠলাম, “হ্যাঁ এই দুর্যোগে বাজারে মুরগিওলা তোর জন্য মুরগি নিয়ে বসে আছে।”

বিকেল তিনটের কাছাকাছি ঝড়বৃষ্টির দাপট একটু কমে আসতেই আমার চারবন্ধু বর্ষাতি আর টুপি পরে নিয়ে বেরোবার জন্য চটপট তৈরি। আমি আমার ক্যাম্পখাটে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে বললাম, “আমি যাচ্ছি না। কাল সারারাত বৃষ্টির শব্দে আমার একটুও ঘুম হয়নি। তোরা বেরিয়ে গেলেই আমি আরামসে ঘুমোব।” পূজা দরজাটা টেনে দিয়ে বলল, “একা একা ভয় পাস না। আমরা এক ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসছি।”

ওরা চারজন হইহই করতে করতে বেরিয়ে গেল। পেছনে সিমলি নদী গর্জন করে উঠল। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এসে চুপচাপ শুয়ে থেকেও আমার কিন্তু ঘুম এল না। ঘড়িতে এখন সওয়া তিনটে। আমিও বর্ষাতি গায়ে চাপিয়ে ঘরে তালা লাগিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের কম্পাউন্ড থেকে বেরোবার কাঠের গেটটার একটা পাল্লা দেখছি ভেঙে পড়েছে। আকাশে জমাট বাঁধা কালো মেঘ। শোঁ শোঁ হাওয়ার সঙ্গে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। একবার ভাবলাম বাজারের দিকেই যাই বন্ধুদের কাছে, আবার ভাবলাম যোগিন্দর ভাইয়ার ছেলেটার জ্বর ছিল, একবার দেখে আসি। এই দুর্যোগে ওরা সব কেমন আছে কে জানে? এখানে আসার ঠিক আগে মাইকেল স্যার একদিন বলেছিলেন, “তোমরা একটু সাবধানে থেকো, উত্তর কাশীতে বর্ষায় পাহাড়ে ধস নামে।”

কনকনে ঠান্ডা। হাওয়ার ঝাপটা এসে মুখে লাগছে। এবড়ো খেবড়ো, উঁচু-নীচু পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। হঠাৎ বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের সঙ্গে ভেসে এল ঘণ্টার মিষ্টি আওয়াজ। তেখলা পাহাড়ের চূড়ায় পুরোনো গির্জার ঘড়িতে বিকেল চারটের ঘণ্টা বাজছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম, তেখলা পাহাড়ের প্রায় পায়ের কাছে চলে এসেছি আর আমার আগে আগে হেঁটে চলেছেন এক ভদ্রলোক। লম্বা চেহারা পরনে সাদা ফুলপ্যান্ট আর ছাইরঙা পুলওভার। ঠিক এই ধরনের লোক এখানে এসে অবধি আমাদের চোখে পড়েনি। ভদ্রলোক পাহাড়ে ওঠার খাঁজকাটা সিঁড়িতে একটা পা রাখতেই আমি আর থাকতে না পেরে পেছন থেকে চেঁচিয়ে ডেকে উঠলাম,

“শুনছেন, আপনি কি গির্জায় যাবেন?” ভদ্রলোক ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমি বিস্ময়ে হতবাক।

“স্যার আপনি?”

মাইকেল স্যার তাঁর সেই বিখ্যাত মিষ্টি হাসিটি হাসলেন। হেসে বললেন, “ফাদারের সঙ্গে আমার একটু দরকার আছে।”

আমি তাঁর কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছবার জন্য জোরে হাঁটা লাগালাম আর চেঁচিয়ে প্রশ্ন করলাম,

-“আপনি কখন এলেন? আমরা খবর পাইনি তো? আপনার সঙ্গে আর কেউ আসেননি? আমাদের কোয়ার্টারে যাবেন না?”

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আমাদের সবার প্রিয় মাইকেল রবি হাসিমুখে বললেন, “খবর পাঠিয়েছিলাম, তোমরা পাওনি। আমার সঙ্গে অধ্যাপক শর্মা, মুখার্জি আর ভেঙ্কটগিরি এসেছেন, ড্রাইভার লছমন গাড়ি চালিয়ে এনেছে। তোমাদের কোয়ার্টারেই তো যাব।”

“ওঁরা সব কোথায় গেলেন?”

মাইকেল স্যারের হাসিটা কেমন বিষণ্ন দেখাল,

“ওঁরা পথের মাঝে একটু আটকে পড়েছেন। এবার মুখ ফিরিয়ে তিনি পাহাড়ে উঠতে উঠতে বললেন, “রিনি, এই বৃষ্টিতে বাইরে থেকো না, ঘরে যাও, আমি আসছি।”

আমি তাড়াতাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। আমার বন্ধুরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বাজার থেকে ফিরে এসেছে। এক্ষুণি ওদের খবরটা দিতে হবে। আমার চারপাশে হঠাৎ ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল। কালো মেঘ আকাশের শেষ আলোটুকু মুছে নিয়েছে। গভীর অন্ধকারে আমাদের সাদা রঙের ছোট্ট কোয়ার্টার ঝাপসা দেখাচ্ছে। কোথাও কোনো আলো নেই, তার মানে ওরা এখনো ফেরেনি। টর্চের আলো ফেলে ফেলে এগোতে হচ্ছিল। ভাঙা গেটের কাছে পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গে নামল মুষলধারে বৃষ্টি। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালালাম, আলোটা ফ্যাকাসে, সন্ধ্যের দিকে এখানে ভোলটেজ কমে যায়। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে, ঘুমে দু-চোখ জুড়ে আসছে। ভেজা বর্ষাতি ছেড়ে, কম্বলটা টেনে নিয়ে ক্যাম্পখাটে শুতে না শুতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুমের মধ্যে মনে হল ওরা বুঝি ফিরে এসেছে, আমার নাম ধরে ডাকছে, দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। আবার মনে হল মাইকেল স্যারের গলা,

“রিনি, আমি এসেছি দরজা খোল।” সবই যেন স্বপ্নের মধ্যে। আমি সাড়া দিলাম, গলায় স্বর ফুটল না, ওঠার চেষ্টা করলাম। নড়তে পারলাম না। মাথার মধ্যে শুধু সিমলি নদী একটানা গর্জন করে চলেছে।–

যখন ঘুম ভাঙল তখন আমার হাতঘড়িতে সকাল দশটা। সর্বনাশ? এতক্ষণ ঘুমিয়েছি? আমার বন্ধুরা কোথায়? দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ? ওরা বাজার থেকে ফেরেনি? নাকি ডেকে ডেকে চলে গেছে? কোথায় যাবে ওরা আমাকে এখানে একা রেখে? আমার খুব অভিমান হল, দু-চোখ জলে ভরে গেল। পূজা বলেছিল, ‘একঘণ্টার’ মধ্যে ফিরে আসছি।’ চব্বিশ ঘণ্টা হতে চলেছে। - খাট থেকে নামতে গিয়ে টের পেলাম আমার খুব জ্বর, মাথা ভার হয়ে আছে, ভীষণ দুর্বল লাগছে। কষ্ট করে উঠে, মুখ ধুয়ে দুটো বিস্কুট আর একটা জ্বরের বড়ি খেয়ে নিলাম। বৃষ্টির বিরাম নেই। এই তুমুল বৃষ্টির মধ্যে অসুস্থ শরীর নিয়ে ওদের আমি কোথায় খুঁজব? ভয়ে ভাবনায় বুকের ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠল, হাত পা অবশ লাগছে। মাইকেল স্যার বলেছিলেন বর্ষায় এখানে পাহাড়ে ধস নামে। ঘরের আলোটা তেমনি ফ্যাকাসে। সন্ধ্যের দিকে বৃষ্টিটা কমে এল, বাতাসের শনশন শব্দ তখনও আছে। দুর্বল শরীরে দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালাম যদি কোনো মানুষজন চোখে পড়ে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া, কোথাও কোনো প্রাণের সাড়া নেই। দমকা হাওয়ার সঙ্গে হঠাৎ একটা পচা গন্ধ এসে নাকে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে চোখ পড়ল আমাদের কম্পাউন্ডের মধ্যে ভাঙা গেটের পাশে, আবছা অন্ধকারে চাদর মুড়ি দিয়ে কে যেন শুয়ে আছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজছে। এবার পচা গন্ধটা বেশ তীব্র হয়ে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। অভুক্ত, অসুস্থ শরীরে, দুশ্চিন্তা আর আতঙ্কে সারাটা রাত কী ভাবে কাটিয়েছি জানি না।

ভোরের দিকে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কারা যেন দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকাডাকি করছে। আমার জ্বরটা মনে হয় ছেড়ে গেছে, ঘামে সারা শরীর ভেজা। দরজা খুলতেই ঝকঝকে সকালের একরাশ আলো। বৃষ্টিধোয়া নরম রোদে আমাদের বারান্দায় সামনে অনেক লোক ভিড় করে আছে। যোগিন্দর ভাইয়া ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে উত্তেজিত গলায় বলল,

“বহিনজী শিগগির আসুন, থানা থেকে বড়ো সাহেব এসেছেন।”

গেটের বাইরে দেখলাম পুলিশের জিপ দাঁড়িয়ে আছে। নওগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার আমাকে দেখে বারান্দায় উঠে এলেন, বললেন,

“যা দুর্যোগ গেল। ধস নেমেছে পাহাড়ে।” উৎকন্ঠায় আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এবার তিনি আমার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বললেন,

“আপনাদের কাজ দেখতে দিল্লি থেকে চারজন নওগাঁ আসছিলেন টাটা সুমো গাড়িতে। প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টিতে পাহাড়ে ধস নামে। বারকটের কাছে দুপুর আড়াইটে নাগাদ গাড়ি উল্টে যায়। স্থানীয় লোকেরা দেখতে পেয়ে সেই ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই নওগাঁ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আহতদের নিয়ে আসে। থানায় খবর দেয়। ড্রাইভারকে নিয়ে ওঁরা পাঁচজন ছিলেন।” আমি হঠাৎ বলে উঠি, “ড্রাইভারের নাম লছমন।” থানার অফিসার একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলেন, “আপনাকে খবর দিতে লোক পাঠানো হয়েছিল। তালাবন্ধ দেখে ফিরে গেছে।” এবার আমি অনেক কষ্টে জিগ্যেস করতে পারলাম, “আমরা বন্ধুরা কোথায়?”

“বাজারেই আপনার চারবন্ধু দুর্ঘটনার খবর জানতে পারেন। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চলে আসেন। আমরা একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিই। প্রাথমিক চিকিৎসার পর একজন ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে ওরা আহতদের নিয়ে অন্যপথ দিয়ে দেরাদুন চলে গেছেন। ওখানকার বড়ো হাসপাতালে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের ভর্তি করা দরকার।” তিনি আরও বললেন, “আপনার বন্ধুরা আমাকে অনুরোধ করে গেছেন, আমি যেন আপনাকে দিল্লি পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করি। আমি আপনার জন্য একটা গাড়ি ঠিক করেছি, ইচ্ছে হলে আপনি আজই রওনা দিতে পারেন।”

একটু থেমে নওগাঁ থানার অফিসার এবার বললেন, “ওঁদের মধ্যে একজনকে বাঁচানো যায়নি। বাইরে কোনো আঘাত ছিল না, মনে হয় মাথার ভেতরে বড়ো রকম চোট পেয়েছেন। লাশ মর্গে পড়েছিল। কাল ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই স্থানীয় লোকেরা নিয়ে এসে আপনাদের এখানে রেখে গেছে। অনেক ডাকাডাকি করেও ওরা আপনার সাড়া পায়নি।”

ঢাকা দেওয়া মৃতদেহটির চারপাশে অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে। একটু ভেবে নিয়ে অফিসার বললেন, “মৃতদেহ তো পোড়াবার ব্যবস্থা করতে হবে। এদিকের সব কাঠ বর্ষায় ভিজে গেছে।” তারপর কি যেন একটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “ওঁর পকেটেই পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে, আপনি হয়তো চিনবেন।” একটু তাকিয়েই আমার সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল, রুদ্ধ কন্ঠে জিগ্যেস করলাম, “উনি কবে, কটার সময় মারা গেছেন?”

অফিসার বললেন, “পরশুদিন সতেরোই অক্টোবর বিকেল চারটে।” আমি চিৎকার করে উঠলাম, “কাঠ লাগবে না, মাইকেল স্যার ক্রিশ্চান। ফাদার জোসেফকে এক্ষুণি খবর দিন, তেখলা পাহাড়ের গির্জার পাশে ওঁকে কবর দিতে হবে।”

মাইকেল স্যারকে নিয়ে আমরা যখন তেখলা পাহাড়ের গির্জায় পৌঁছলাম, তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আমি ফাদারকে বলেছিলাম, “পরশু বিকেলে গির্জার ঘড়িতে যখন চারটের ঘণ্টা বাজল, মাইকেল স্যার আপনার কাছে আসার জন্য পাহাড়ে উঠছিলেন, তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।” ফাদার কি বুঝলেন জানি না, তাঁর একখানা হাত আমার মাথায় রাখলেন। -

মাইকেল স্যারের কবরে আমরা যখন মাটি দিচ্ছি, তখন পাহাড়ের কোলে কোলে অনেক আলোর মালা। আজ দেওয়ালির উৎসব।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%