বনের অতিথি

ভারতী গুহ

পাশাখেলায় হেরে পঞ্চপান্ডব বারো বছরের জন্য বনে গেলেন দ্রৌপদীকে সঙ্গে নিয়ে। দ্রৌপদীর আরেক নাম কৃষ্ণা। বনের মধ্যে একদিন…

তখন দুপুর, ঝাঁ ঝাঁ করে রোদ্দুর

খাঁ খাঁ করে বন-পথ দেখা যায় যদ্দুর।

খেয়ে দেয়ে পাঁচভাই দিয়েছেন ঘুম,

দ্রৌপদীরও খাওয়া সারা, কুটির নিঝুম।

দরজায় ঘন ঘন কড়া নাড়ে কারা?

হইচই শোরগোল পড়ে গেছে সাড়া।

দরজাটা খুলে দিয়ে দ্রৌপদী অবাক,

গেরুয়া জটাধারী সাধু ঝাঁকে ঝাঁক।

সামনেই দাঁড়িয়ে যে মুনি দুর্বাসা,

মেজাজ তিরিক্ষি যার রাগ সর্বনাশা।

দ্রৌপদী প্রণাম করে, ‘আসুন আসুন,

দয়া করে ঘরে এসে সবাই বসুন’।

দুর্বাসা বলেন, ‘মোট দশহাজার গেস্ট

তোমার রান্না খেয়ে তারপর রেস্ট।

‘রন্ধনে-দ্রৌপদী’ বলে তো সবাই,

তারিফটা পরে হবে, আগে রান্না খাই।

শুক্তো, চচ্চড়ি, শাক-ভাজা, ডালনা,

ছ্যাঁচড়া, দমকারি, খুব বেশি ঝালনা।

ডাল, ঝোল,ভাজা-ভুজি, পটলের দোরমা,

ফ্রাইড-রাইস, ফিসফ্রাই, কালিয়া ও কোরমা।

এর বেশি লাগবে না, শেষ পাতে চাটনি

মিষ্টিটা কিনে নিও, কম হবে খাটনি।

স্নান করে আসি, নিয়ে দশ হাজার শিষ্য,

নদীতো কাছেই, দেরি হবে না অবশ্য।’

দুর্বাসা স্নানে যান শিষ্যের দঙ্গল

তোলপাড় বনভূমি গাছপালা জঙ্গল।

দ্রৌপদী বসে পড়ে, মস্তকে হাত,

বিনা মেঘে হল দেখি একি বজ্রপাত।

‘বনের মধ্যে নেই, হাট বা বাজার,

পাশা খেলে রাজ্য গেছে পান্ডব রাজার।

ফল মূল শাক সবজি এই তো খাবার,

কোনো মতে জুটে যায় দুবেলা আহার।

ডালভাত আলুভাতে, উচ্ছে বা নিম

বাঁচে যদি কিছু, তাও খেয়ে নেয় ভীম।

অতিথি বিমুখ হবে সে তো মহাপাপ,

সবার ওপরে আছে দুর্বাসার শাপ।

প্রাণ মান গেল সব, কার কাছে যাই,

মুনির শাপেতে পুড়ে হবো আজ ছাই।

বুদ্ধিটা দিতে পারে শুধু একজন,

কী করে খবর পাবে বন্ধু সুজন?

মন থেকে মনে যায় কি যে টেলিপ্যাথি

দ্রৌপদীর পরে যার খুবই সিমপ্যাথি।

কৃষ্ণ এসে বলে হেসে- ‘ঘাবড়াও মৎ,

দুর্বাসা পালাতে পাবে না যে পথ।

হাঁড়ি, কড়া খুঁজে দেখো কী আছে বাকি,

ছিটে ফোঁটা থাকবেই, সব শেষ নাকি?’

পড়ে আছে এক কণা শাক আর ভাত,

তুলে আনে দ্রৌপদী, কৃষ্ণ পাতে হাত।

শাক ভাত চেটে খায় কৃষ্ণ ঠাকুর,

জল খেয়ে আরামেতে তোলেন ঢেঁকুর।

‘শাক ভাত খেয়ে আজ মেটে ক্ষুধা তৃষ্ণা,

রান্নাটা বড়ো ভালো করেছো তো কৃষ্ণা!’

স্নান করে তীরে উঠে দুর্বাসা ঠাকুর,

দশহাজার শিষ্য সহ তোলেন ঢেঁকুর।

‘একি কান্ড, সবার যে ভরে গেছে পেট,

দ্রৌপদীর কাছে আজ মাথা হবে হেঁট?

বত্রিশ ব্যঞ্জনে সে যে সাজিয়েছে পাতা,

অতিথিরা না খেলে মনে পাবে ব্যথা।

শিষ্যরা বলে, ‘গুরু, পেট আইঢাই

এক কণা খাবারেরও জায়গা যে নাই।

দুর্বাসা বলেন, ‘চল শিগগিরি যাই,

চুপি চুপি বন ছেড়ে এখুনি পালাই।

টের পাবে দ্রৌপদী, কোরনাকো শব্দ,

লজ্জা পেলাম বড়ো, হলাম যে জব্দ।’

হাঁপ ছাড়ে দ্রৌপদী, ‘কৃষ্ণ তুমি দেখালে ম্যাজিক,

নাহলে ঘটনাটা হত আজ দারুণ ট্র্যাজিক।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%