ফুলমণি

ভারতী গুহ

ফুলমণি ওর ছোটো হাতে ভেজা ন্যাতা দিয়ে ঘর মোছে। সকাল দশটায় সে মুছতে শুরু করে, শেষ হতে দুপুর বারোটা বেজে যায়। এলোমেলো রুক্ষ চুলে ঢাকা মাথাটা আজ অনেকখানি ঝুঁকে পড়েছে। ঘরের চকচকে মেঝের ওপর টপটপ করে পড়ছে চোখের জল। খাঁ খাঁ করে সারা বাড়ি। বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে রোজ ওরা বেরিয়ে যায়, রাতে ফিরে আসে। রাত যত বাড়ে নানা লোকের আসা-যাওয়া শুরু হয়। খাওয়া-দাওয়া, হাসি, হুল্লা, ঝগড়া, তর্ক, টাকাপয়সার হিসেব চলতে থাকে অনেক রাত অবধি। রান্নাঘরের লাগোয়া একফালি জায়গাটুকুতে ফুলমণি গুটিশুটি মেরে ঘুমোয়।

আজ কতদিন হয়ে গেল ফুলডিঙি গ্রাম ছেড়ে ফুলমণি এখানে এসেছে। তার মামা এই রাগী লোকগুলোর কাছে তাকে বিক্রি করে দিয়েছে। এখানে সে ঘর মোছে, বাসন মাজে, কাপড় ধোয়, আর সবাই বেরিয়ে গেলে বন্ধ জানলার কাঁচ দিয়ে অচেনা শহরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এখানে রান্না করতে আসে যে কাজের মাসি সে লোকগুলোর চোখ এড়িয়ে ফুলমণির সঙ্গে চুপি চুপি কথা বলে। তার কাছ থেকেই ফুলমণি আজ জানতে পেরেছে কাল ভোর হবার আগেই তাকে অনেক দূরের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তার মতো আরও অনেক ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েকে ওরা পাঠিয়ে দিয়েছে। সে দেশ বালির দেশ, পাহাড়ের দেশ, দৈত্যের দেশ। ছোটো ছেলে-মেয়েদের দিয়ে উটের খেলা খেলে, আর পয়সা ছুঁড়ে দিয়ে হা হা করে হাসে। উটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে ছুটতে একসময় তারা মুখ থুবড়ে পড়ে যায়, আর ওঠে না। ফুলমণির গালের ওপর ছোট্ট একটা কালো জড়ুল, টানা টানা দুইচোখ তার রোগা মুখখানার দিকে তাকিয়ে রান্নার মাসি বলে ওঠে, “ফুলমণি, তুই কি আর জম্মে হরিণ ছিলি? ঠিক হরিণের মতো চোখ।

একদিন বিশাল চেহারার লোকটা, যার চোখ দুটো করমচার মতো লাল, দাঁতগুলো বড়ো বড়ো, সে ফুলমণির সঙ্গে কথা বলতে দেখে রান্নার মাসিকে প্রচন্ড ধমক দিয়েছে। ফুলমণির চুলের গোছা ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ঘরের কোণায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। সেদিনও কিন্তু ফুলমণি একটুও কাঁদেনি। আজ তার গালের কালো জড়ুল বেয়ে চোখের জল ঝরে পড়ছে।

বাড়ি এখন শুনশান। দরজায় তালা দিয়ে ওরা বেরিয়ে গেছে। আজ ফুলমণি কিছু খায়নি। ভাত তরকারি রান্নাঘরের কোণায় ঢাকা দেওয়া পড়ে আছে।

মামার ছেলেপুলে নেই। ফুলমণি তার মামির কোলে বড়ো হয়েছে। বাবা-মা কবে মরে গেছে ফুলমণির কিচ্ছুটি মনে নেই। মামার ঘরে বড়ো অভাব, বড়ো কষ্ট। মামা কুঁড়ে, সারাদিন শুয়ে, বসে, আর আড্ডা দিয়ে বেড়ায়। মামি সারাদিন খাটে। পরের খেতে কাজ করে, বাড়ি বাড়ি ধান ভানে, ধামাকুলো বুনে বাজারে বিক্রি করে। দুপুরে একথালা ভাত খেয়ে মামা যখন পড়ে পড়ে ঘুমোয়, মামি তখন সব কাজ সেরে ফুলমণির হাত ধরে চলে যায় ফুলেশ্বরী নদীর ধারে। বুড়ো বটগাছের ছায়ায় দু-জনে এসে বসে। মামি আঁচলের তলা থেকে বের করে পুরোনো হয়ে যাওয়া রঙিন ছবির বই। মামি যখন বাপের ঘরে ছিল সেই ছেলেবেলা এই বই নিয়ে ইস্কুলে পড়তে যেত। যত্ন করে রেখে দিয়েছে, টিনের হাতেবাক্সে। ফুরফুরে হাওয়া, নদীর বুকে পালতোলা নৌকো, নিরালা দুপুরে কুবো পাখি কুব্কুব্ করে ডাকে। ফুলমণি মামির কোল ঘেঁসে বসে বইয়ের ছবি দেখে। উট, ময়ূর, হরিণ, চিতা, কুমির, সব সে চিনে গেছে। মামি তাকে পড়তে শেখায়, মুখে মুখে ছড়া বলে, গান গায়। ফুলেশ্বরী নদীর তীরের নির্জন দুপুর যেন স্বপ্নের মতো। সংসারের নিত্য অভাব, খিদের কষ্ট, মামার গালাগাল, সব কিছু হারিয়ে যায়। থাকে শুধু নদীর স্রোত, ওপারের সবুজ গাছপালা, পাখির ডাক। আর থাকে ফুলমণি, ফুলমণির মামি।

ক’দিন ধরে দুটো বিচ্ছিরি লোক তাদের ফুলডিঙি গাঁয়ের আনাচেকানাচে উঁকিঝুঁকি মারছে। গাঁয়ের লোক ফুলমণির মামাকে তাদের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছে। এই নিয়ে মামির সঙ্গে অশান্তি। মামা একদিন নেশা করে এসে মামিকে ধরে খুব করে মারল। মামি কাঁদেনি, টু শব্দটি করেনি। পরদিন সব কাজ সেরে দুপুরবেলা ফুলেশ্বরী নদীর ধারে ফুলমণিকে নিয়ে বটের ছায়ায় অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকল। মামি সেদিন গান গায়নি, ছড়া বলেনি, ছবি দেখিয়ে পড়তে শেখায়নি। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে আপন মনে বলেছিল, “যার কেউ নেই তার আকাশের দেবতা আছে”। নদীর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “নদীর দেবতা আছে, জলের দেবতা আছে, গাছপালা, পশুপাখির দেবতা আছে। মানুষ যাকে বাঁচতে দেয় না, দেবতা তাকে আশ্রয় দেয়”। মামির চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল, আর তার কোলে মুখ গুঁজে ফুলমণি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মামি আঁচল দিয়ে ফুলমণির চোখের জল মুছিয়ে গালে চুমো খেয়ে বলল, “মণি, যখন দেখবি মানুষ নেকড়ে হয়ে হায়না হয়ে তোকে তাড়া করছে, তখন মাটির বুকে, নদীর স্রোতে, গাছপালা পশুপাখির মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে দিবি। মনপ্রাণ দিয়ে যদি ডাকিস, দেবতা তোর ডাক শুনবে”।

সেদিন ফুলমণি মামির হাত ধরে সন্ধ্যেবেলা ঘরে ফিরল। মামি ভাত রেঁধে নিজের হাতে তাকে খাইয়ে দিল। মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে তাকে ঘুম পাড়াল।

মামির বুকের কাছটিতে ফুলমণি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল। সেই শেষ। সে আর কোনোদিন মামিকে দেখেনি। গাঁয়ের সবাই বলাবলি করে, মামি নদীতে ভেসে গেছে। ফুলমণি কিন্তু কাঁদেনি। সে জানে, নদীর দেবতা মামিকে সাগরে নিয়ে গেছে। সাগরের নীল জলে স্নান করে মামি আরও সুন্দর দেখতে হয়েছে, তার আর কোনো কষ্ট নেই, দুঃখ নেই।

মামি চলে যাবার ক-দিন পরেই মামা অনেক টাকা গুনে নিয়ে ফুলমণিকে বিক্রি করে দিল।

আজ লোকগুলো তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরেছে। হায়নার মতো যার চোখ, সেই লোকটা ফুলমণিকে ডেকে কর্কশ স্বরে বলল,-

“এই খুকি, চটপট খেয়ে শুয়ে পড়। কাল অনেক সকালে যেতে হবে, দূরের রাস্তা, জামাকাপড় গুছিয়ে নে……।”

ফুলমণি খায়নি। জামাকাপড় ওমনি পড়ে আছে। সেই সন্ধ্যে থেকে দেয়াল ঘেঁষে অন্ধকারে বসে আছে। এই পৃথিবীতে ফুলমণির শুধু মামি ছিল, নদীর দেবতা তাকে বুকে করে নিয়ে গেছে। আজ ফুলমণি একা।

লোকগুলো যখন ফুলমণিকে ডেকে তুলল তখন ভোরের আলো ফোটেনি। ফুলমণি পরিষ্কার করে মুখচোখ ধুয়ে নিয়েছে। মামির নিজের হাতে সেলাই করা, হলদের ওপর কালো ফুটিফুটি জামাটা পরেছে। গালের ওপর চোখের জলের দাগ আর নেই, শুধু কালো জড়ুলটা আছে।

শহরের ঘুম তখনও ভাঙেনি। চারধারে জাল দিয়ে ঢাকা কালো বড়ো গাড়িটা ফুলমণিকে নিয়ে ছুটে চলল অজানা দেশের দিকে। সঙ্গের লোক দুটো গাড়ির বেঞ্চিতে পা ছড়িয়ে, বসে বসে ঢুলছে। সারাদিন ধরে শুধু চলা। সূর্য এবার পশ্চিমে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি থেমে পড়ল। সামনে চওড়া, কালো পিচের রাস্তা সোজা চলে গেছে। দু-ধারে ছড়িয়ে থাকা বুনো গাছের ঝোপ। পাহাড়ের কোলে হারিয়ে গেছে।

টালির চাল আর দরমার বেড়া, পথের ধারে খাবার দোকান। দু-চারটে ট্রাক, লরি দাঁড়িয়ে। কয়েকজন লোক চা খাচ্ছে, খাবার খাচ্ছে, লোকদুটোর সঙ্গে ফুলমণি গাড়ি থেকে নামতেই সবাই একবার ফিরে তাকিয়ে আবার খাবার খেতে লাগল। গাড়ির ড্রাইভারও নেমে এসেছে। কচুরি, জিলিপি এইসব একটা শালপাতার ঠোঙায় করে ওরা ফুলমণির হাতে ধরিয়ে দিয়ে দোকানের বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। ফুলমণি দোকান ঘরের পেছনে চলে এসে বুনো ঝোপের মধ্যে খাবারের ঠোঙাটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। আকাশ লাল করে সূর্য এবার পাহাড়ের মাথায় অস্ত যাবে। দূর আকাশে একঝাঁক পাখি ডানা মেলে ঊড়ে চলেছে। ফুলমণিও নেমে পড়ল বুক সমান উঁচু বুনো গাছের জঙ্গলে। তার রুক্ষ চুল উড়িয়ে দিয়ে এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল। কানে কানে যেন ফিসফিস করে বলে গেল,-

“পালা ফুলমণি, পালিয়ে যা, নেকড়ে আর হায়নার হাত থেকে পালিয়ে যা।” বহুদূর ছড়িয়ে থাকা বুনোঝোপের ভেতর দিয়ে ফুলমণি হাওয়ার সঙ্গে শনশন করে ছুটতে শুরু করেছে। লোকগুলো পথের ধারের দোকানে বসে তখনও খাচ্ছে, গল্প করছে।

আকাশে আবির ছড়িয়ে সূর্য ডুব দিল পাহাড়ের ঐ ধারে। ওরা এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফুলমণিকে যখন খুঁজতে শুরু করেছে তখন অন্ধকারের হাল্কা একটা পর্দা চারধারে নেমে এসেছে। হায়না আর নেকড়ের চোখ জ্বলে ঊঠল। দূরের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা লক্ষ্য করে ওরা নেমে পড়ল বুনো ঝোপের জঙ্গলে, তারপর পাগলের মতো দৌড়তে থাকল। হলদের ওপর কালো ফোঁটা জামা কখনও একটু চোখে পড়ছে, আবার হারিয়ে যাচ্ছে ঝোপের আড়ালে। আকাশের সব রঙ এবার মুছে গেল। রোগা ছোটো শরীর এবার ভেঙে আসছে। ফুলমণি আর ছুটতে পারছে না। পেছনে তাড়া করে আসছে হায়না আর নেকড়ে। অন্ধকারে জ্বলছে ওদের হিংস্র চোখ। কাছে, আরও কাছে ওরা এগিয়ে আসছে। এক্ষুণি ওরা ফুলমণিকে ধরে ফেলবে। ফুলমণি এবার থরথর করে কেঁপে উঠল। ঘন ঝোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে কালো হয়ে আসা আকাশের শেষ আলোটুকুর দিকে একবার তাকাল। তারপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে ছোটো ছোটো দুই হাতে আঁকড়ে ধরল পৃথিবীর মাটি। আকাশে বিদ্যুৎ খেলে গেল। বুনো গাছের জঙ্গল কাঁপিয়ে এল দমকা হাওয়া। পাহাড় চূড়ায় মেঘ গুম গুম করে ডেকে উঠল।

একটু দূরে এসে দাঁড়িয়েছে একপাল হরিণ। বিচিত্র সুরের মিলিত ডাক ভেসে এল বাতাসে।

হালকা শরীর হাওয়ায় ভাসিয়ে ছুটে চলেছে হরিণের পাল। তাদের দলে আছে ছোট্ট এক হরিণছানা। ঝকঝকে হলদে শরীরে কালো কালো ফোঁটা। টানাটানা কালো চোখের নীচে গালের ওপরের ফোঁটাটা একটু বুঝি বড়ো। হরিণের দল এবার পাহাড় ডিঙিয়ে পৌঁছে যাবে ওপারে, যেখানে সূর্যদেব অস্ত গেছেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%