সোনার মেডেল

ভারতী গুহ

‘শূলপাণি’। নিজেদের গ্রামের এই নামটা পানুর বেশ পছন্দ। কাল বিকেলে এখানে এসে যখন পৌঁছোল, মণিদাদুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করেই পানু এই প্রশ্নটাই প্রথম করেছিল।

“মণিদাদু, আমাদের গাঁয়ের নাম শূলপাণি কেন?” দাদু ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে হেসে উঠে বলেছিল, “আমার দাদুভাই এবার সত্যিই বড়ো হয়ে গেছে। বাবা-মাকে ছেড়ে কেমন একা একা নিজের দেশের বাড়িতে চলে এল! এসেই প্রশ্ন। মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করা ছেলে, যে সে মানুষ তো নয়।”

ততক্ষণে বাড়ির ভেতর থেকে বলাইদা হইহই করে ছুটে এসে পানুর কাঁধ থেকে ওর ব্যাগটা নামিয়ে নিয়েছে। রতনকাকা-কাকীমা, এবাড়ির আরও কাজের মানুষজন হাসিমুখে এসে দাঁড়াল। রতনকাকা একগাল হেসে বলল,

“আমাদের সোনাভাই কত্তটা লম্বা হয়ে গেছে, দেখেছেন কত্তাবাবা।”

সন্ধ্যে থেকে গ্রামের কিছু লোকজন, পাড়ার ছেলেরা বাড়িতে প্রায় ভিড় জমিয়ে দিল। ছেলেবেলা থেকেই পানু এদের দেখে আসছে। সবাইকেই চেনে। এদের অনেক আদর ভালোবাসা পেয়েছে। কিন্তু এবার এদের উচ্ছ্বাস দেখে বেশ লজ্জা পাচ্ছিল। পানুকে নাকি এখানকার বয়েজ স্কুল থেকে বিশেষ সম্বর্ধনা দেয়া হবে, এবং তারই আয়োজন চলছে।

রাতের দিকে সবাই চলে যেতে বাড়ি ফাঁকা হল। খাওয়া-দাওয়ার পরে ভিতর বাড়িতে, বাইরের দিকের লম্বা টানা খোলা বারান্দায় মাদুরের ওপর শুয়ে বসে পানু দাদুর সঙ্গে গল্প করছিল। মণিদাদু বাবাদের কাকা। তিনভাইয়ের মধ্যে এই একজনই শুধু বেঁচে আছেন। বাবাদের কাকামণি, আর পানুর মণিদাদু। বিয়ে করেননি। এই গ্রাম, এখানকার মানুষজন, এই বাড়িঘর নিয়েই তাঁর সংসার। আজীবন এখানেই আছেন। অনেক বছর ধরে সদর কাছারিতে ওকালতি করেছেন, এখন আর পারেননা। বয়স হয়েছে। মজুমদার বংশের বাকি যারা, তারা সবাই দেশে-বিদেশের নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। দেশের সঙ্গে এদের সম্পর্ক প্রায় নেই বললেই চলে। একমাত্র পানুর বাবা ছাড়া। কাকাও বিদেশে পড়তে গিয়ে আর ফেরেনি। পানুর বাবা বছরে অন্তত বার দুয়েক নিজের পরিবার নিয়ে দেশের বাড়িতে কিছুদিন এসে থেকে যায়। কলেজে চাকরি করার জন্য এই সুবিধেটা তার আছে।

এখন গ্রামের মধ্যে এই মজুমদারদের বাড়িই সব থেকে পুরোনো। এই বংশের প্রাচীন ঐতিহ্য আজও বহন করে নিয়ে চলেছে। অর্ধগোলাকৃতি একতলা প্রাসাদের মতো মস্ত বড়ো বাড়িটা। সদরের বড়ো লোহার গেট পেরিয়ে, সুরকি ঢালা সরু পথটার দু-ধারে ফুলের বাগান। তারপরেই কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে বড়ো হলঘর। সামনে রেলিং ঘেরা বারান্দা। এই হলঘরটাই এবাড়ির বৈঠকখানা। পুরোনো আসবাব দিয়ে সাজানো বসার ঘর। এই ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে একটা প্যাসেজ পেরিয়ে এসে চারদিক ঢাকা চওড়া এবং লম্বা ভেতরের বারান্দা। এই বারান্দার গায়েই সব ঘরগুলো। বেশির ভাগই তালা বন্ধ। এই বারান্দা ডাইনে বাঁয়ে দুদিকে আবার ঘুরে গিয়ে বাড়ির পেছনের বাঁধানো বিশাল উঠোনটাকে তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে। উঠোনের উল্টোদিকে ছোটো ছোটো বেশ কয়েকখানা ঘর, বারান্দা। এবাড়ির সব কাজের লোকদের থাকার জায়গা। তারপর পেছনের খিড়কির দরজা খুললেই একটা বড়ো পুকুর যেটা ঘিরে বড়ো বড়ো ফলের গাছের বাগান। ফলের বাগানের একধারে গোরুর গোয়াল, ঘোড়ার আস্তাবল, যা বহুবছর ধরে খালি পড়ে আছে।

উঠোনের ওপাশের ছোটো ঘরগুলোতেই কানাই কাকা, কাকীমা বলাইদা থাকে। পাশের ঘরগুলোতে বুড়ো মালী দাদা, রান্নার লোক, ঘর ঝাড়পোঁছের লোক তাছাড়া মজুমদারদের যে সামান্য জমি জায়গা এখনও আছে সেখানে চাষবাস করার জন্য দুজন মানুষ এইসব ঘরেই থাকে। তবে এরা সবাই অনেক পুরোনো লোক, বলতে গেলে এই পরিবারেরই সদস্য। এদের বাপ ঠাকুরদাদের রেখে যাওয়া কাজই এরা করে।

সামনেই পূর্ণিমা। ঝকঝকে আকাশে চাঁদ আলো ছড়িয়ে চারদিকটা উজ্জ্বল করে রেখেছে। এই বারান্দাটা বলতে গেলে প্রায় আকাশের নীচে বাঁধানো উঠোনের গায়ে, লম্বাটানা বারান্দাটার মাথার ওপরের ছাদটা সরু। বারান্দার মাঝখানের সিঁড়িটা দিয়ে উঠোনে নামা যায়। বাড়ির সামনের হলঘরের দরজা ছাড়াও, ফুলের বাগানের পাশ দিয়েও এই উঠোনে আসার রাস্তা আছে। পেছনের খিড়কির দরজা এবাড়ির কাজের মানুষদের যাতায়াতের পথ। এই খোলা বারান্দাতেই পানু মণিদাদুর পাশে মাদুরের ওপর বালিশ নিয়ে শুয়ে গল্প করছে। ঝিরঝিরে হাওয়ায় পানুর ঘুম পাচ্ছে। সারাদিন বাসে করে অনেকটা পথ আসতে হয়েছে। মণিদাদু কথা শুরু করতেই ঘুম ঘুম ভাবটা কেটে গেল।

“আমাদেরই এক পূর্বপুরুষ কেদারনাথ মজুমদার। শুনেছি এই গ্রামে শূলপাণি মহাদেবের মন্দির তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে, শিলাবতী নদীর ধারে। এই মন্দিরের নামেই গ্রামের নাম। বহুকাল ধরে সংস্কারের অভাবে মন্দিরটা এখন ধ্বংসস্তুপ। শোনা যায়, এই মন্দিরকে ঘিরে আগে শিবরাত্রির মেলা বসত। তিনদিন ধরে এই মেলায় নানারকম উৎসব, অনুষ্ঠান চলত। তখন গ্রামের প্রধান আকর্ষণ ছিল শিবরাত্রির এই মেলা।

‘শূলপাণি বয়েজ হাই স্কুল’। বিকেল চারটে থেকে অনুষ্ঠান। এবার এই স্কুলের মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেশ ভালো। সাতজন স্টার পেয়েছে। পঞ্চাশজনের মধ্যে পঁয়ত্রিশজন ফাস্ট ডিভিশন। ফেল করেনি একজনও। প্রতিবছরের মতো এবারও স্টার পাওয়া ছেলেদের প্রাইজ দেয়া হবে। অনেক কাল ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। এবার একটু অন্যরকম। যদিও এই স্কুলের ছাত্র নয়, তবু এই গ্রামেরই তো ছেলে, যে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েছে। তাই আজ স্কুলের ছাত্রদের পুরস্কারের সঙ্গে তাকেও সম্বর্ধনা দেবার আয়োজন হয়েছে।

অনেকটা জায়গা জুড়ে ইংরেজ আমলের বিশাল স্কুল বিল্ডিং। মস্ত বড়ো খেলার মাঠ। বড়োসড়ো অডিটরিয়াম।

আজ এখানে স্কুলের প্রাক্তন, বর্তমান সব ছাত্র নতুন পুরোনো সব মাস্টারমশাই, অন্যান্য কর্মচারীরা, ছাত্রদের যত অভিভাবক এবং গ্রামের সব লোকই প্রায় আমন্ত্রিত।

পানুর মণিদাদু, শিবনাথ মজুমদার কিছুদিন আগে পর্যন্ত এই স্কুলের সেক্রেটারি ছিলেন, এখন অবসর নিয়েছেন।

দুপুর তিনটের পরই স্কুলের একদল ছাত্র পানুকে নিয়ে যাবার জন্য এসে উপস্থিত। পানুর ইচ্ছে ছিল মণিদাদুর সঙ্গেই যাবে, ছেলেরা কিছুতেই শুনবে না। ওদের এক কথা, “তোমাকে সবাই দেখতে চায়, কথা বলতে চায়, দেরিতে গেলে কি করে হবে।”

স্কুলে যাবার পথেই সতুদার সঙ্গে দেখা। হন্তদন্ত হয়ে কোথায় চলেছে। ওদের দেখেই দাঁড়িয়ে গেল। এগিয়ে এসে পানুর হাত ধরে বলল, “আরে তোর সঙ্গেই তো দেখা করতে যাচ্ছিলাম। কাল রাতে এসেছি তো তাই দেখা করতে পারিনি।” পানু হেসে বলল “চল স্কুলে যাবে তো!” সতু হেসে বলল, “যাব না মানে? তোর সম্বর্ধনা বলে কথা। অবিশ্যি লেখাপড়ার আমি কিই বা বুঝি! তবে তোদের দেখলেও পুণ্য হয়।”

পানু দলের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বলে উঠল, “তুমি তো শুনলাম দীঘায় হোটেল খুলেছ। বিরাট ব্যাপার।”

বাকি ছেলেরা কথা না বলে চুপচাপ হাঁটছিল। সতু একটু যেন অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে বলেছে তোকে? হোটেল! ছোট্ট একটা খাবারের দোকান কোনো রকমে চলে।” তার পর দুই আঙুল দিয়ে টস্ করার ভঙ্গি করে বলল, “হোটেল চালাতে পয়সা লাগে না? কে দেবে?” হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে একটু ব্যস্ত হয়ে বলল, “তোরা এগো, আমি একটা কাজ সেরে আসছি।”

আজ ‘শূলপাণি হাইস্কুল’কে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। ফুল, মালা দিয়ে সাজানো তোরণ। সেখানে ছোটো ক্লাসের ছেলেরা লাল গোলাপ হাতে দিয়ে অতিথিদের অভ্যর্থনা করছে। পানুর হাতেও গোলাপ দিয়ে ছোটো ছোটো দুটি ছেলে ওকে হাত ধরে স্কুলের ভেতরে নিয়ে গেল। সব ছাত্ররাই আজ স্কুলের ইউনিফর্ম পরে এসেছে। অডিটরিয়ামের দেয়ালে মহাপুরুষদের ছবি, তাঁদের বাণী। স্কুলের করিডরে ছাত্রদের আঁকা ছবি, লেখা। স্কুল জুড়ে উৎসবের আবহাওয়া। পানুর সব কিছু খুব ভাল লাগছে।

দেখতে দেখতে হল ভর্তি হয়ে গেল। ফুল আর আলো দিয়ে সাজানো স্টেজ। স্টেজে সারি সারি চেয়ারে, একে একে বিশেষ ভাবে আমন্ত্রিত অতিথিরা এসে বসলেন। স্কুলের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারী, হেডমাস্টার মশাইয়ের পাশে মণিদাদু বসেছেন। একটু পরেই প্রধান অতিথির আগমন মাইকে ঘোষণা করা হল। এঁর কথা মণিদাদুর কাছে পানু আগেই শুনেছে। গড়বেতা কলেজের প্রিন্সিপাল। হেমকান্ত জানা। বিদ্বান, পণ্ডিত এবং সুবক্তা। সবথেকে বড়ো কথা তিনি এই স্কুলেরই প্রাক্তন ছাত্র। তিনি আসার পরেই সমস্ত মান্য অতিথিদের ফুলের তোড়া আর উত্তরীয় দিয়ে সম্মান জানানো হল।

একদল ছাত্র স্টেজের উপর সমবেত কন্ঠে সুরের মধ্য দিয়ে, উপনিষদের মন্ত্র উচ্চারণ করে অনুষ্ঠানের সূচনা করল।

স্কুলের প্রধানশিক্ষক, প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারী, তাঁরা স্কুলের পঠন-পাঠন, পরিচালনা, এবং আরও কিছু প্রয়োজনীয় কথায় তাঁদের বক্তৃতা শেষ করলেন। আরও দুজন আমন্ত্রিত অতিথি এই স্কুলের শিক্ষক, ছাত্র এবং পরিচালনার অনেক প্রশংসা করে বক্তৃতা দিলেন। তবে সবার বক্তৃতাই সংক্ষিপ্ত ছিল। মণিদাদুকেও অনুরোধ করা হল কিছু বলার জন্য। কিন্তু তিনি সহাস্যে, হাতজোড় করে তাঁর আপত্তি জানালেন। এরপর প্রধান অতিথিকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করা হল। হলে ভিড় উপচে পড়ছে। যারা বসার জায়গা পায়নি, দুদিকের দেয়াল ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও তিল ধারনের জায়গা নেই। প্রধান অতিথি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর ভাষণ শুরু করলেন। আশ্চর্য তাঁর বলার ভঙ্গী। কোনো বক্তৃতা নয়। মুখে হাসি নিয়ে, সহজ সরল অন্তরঙ্গ হয়ে তিনি যেন নিজের অত্যন্ত আপনজনদের সঙ্গে গল্প করছেন। এতক্ষণ এই ভিড়ে হলের মধ্যে একটা গুঞ্জন ছড়িয়ে ছিল। দেখতে দেখতে সব থেমে গিয়ে নিস্তব্ধতা নেমে এল। সবকটি মানুষ উৎগ্রীব হয়ে তাঁর কথা শুনছে। এমনকি ছোটোরাও। এই স্কুলেরই ছাত্র তিনি। তাঁর এই ছাত্র জীবনের কথা এত ভালোবাসা নিয়ে, এত ছোটো ছোটো মজার গল্প দিয়ে তিনি অল্প কথায় বলে গেলেন, যে সমস্ত শ্রোতাদের সঙ্গে পানুও মুগ্ধ হয়ে গেল। এরপর খুব সংক্ষেপে স্কুলের ইতিহাস বর্ণনা করলেন। মাঝখানে মণিদাদুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আমাদের সবার প্রিয় শিবনাথদা এখানে উপস্থিত আছেন। তিনি আমার থেকে স্কুলের কথা অনেক বেশি এবং অনেক ভালো করে জানেন। ওঁরা তিনভাই, হরনাথদা, কাশীনাথদা, এবং শিবনাথদা এঁরা তিনজনেই এই স্কুলের কৃতি ছাত্র ছিলেন। বড়ো দুই ভাই পরবর্তী কালে গ্রাম ছেড়ে চলে যান। তাঁরা কেউ আর এখন বেঁচে নাই। তবে কাশীনাথদার ছেলেরা শঙ্কর আর সোমনাথ এরাও যথেষ্ট মেধাবী। মজুমদার পরিবার আমাদের এই স্কুলকে বার বার গর্বিত করেছে। শূলপাণি স্কুলে এদের অবদানের কথা গ্রামের সবাই জানে। এই বংশের এখন প্রায় সবাই দেশে-বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। শুধু শিবনাথদা রয়ে গেছেন আমাদের সবার সঙ্গে।”

স্কুলের ইতিহাস বলতে গিয়ে উল্লেখ করলেন পরাধীন ভারতে ইংরেজ শাসকদের কথা। তাঁদের মধ্যেও যেসব উদার, কল্যাণকামী মানুষ ছিলেন তাঁরা এখানে শিক্ষা বিস্তারের কাজে মন দিয়েছিলেন। শহরে, গ্রাম-গঞ্জে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে দেশের মানুষদের ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এই ভাবেই এই গ্রামেও একজন ইংরেজ সাহেব প্রতিষ্ঠা করলেন স্কুল। নাম দিলেন ‘ওরিয়েন্টাল অ্যাকাডেমি’। এখানকারই জমিদার, তাঁর জমি দান করেছিলেন। যার ওপরে এই স্কুল গড়ে ওঠে। তবে পরবর্তী কালে এই জমিদারের বংশ নাকি লুপ্ত হয়ে যায়, এবং তাঁর নামটিও মুছে যায়। শুধু গ্রামের একপ্রান্তে জঙ্গলে ঢাকা একটা পোড়ো বাড়ি তাঁর অস্তিত্ব বহন করছে।

আরও অনেক বছর পরের ইতিহাস আলাদা। ইংরেজদের অমানুষিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে সারা দেশে যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল, সে আগুনের আঁচ এসে লাগল এখানেও। এই স্কুলেরই ছাত্ররা দলে দলে বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে তাদের সাহস, দেশভক্তি আর, আত্মত্যাগের আরেক ইতিহাস রচনা করল। এই বিদ্রোহীদের প্রধান ঘাঁটি এই স্কুল, ইংরেজ সরকারের ক্রোধের শিকার হল। যে স্কুল তাদেরই সৃষ্টি, সেই স্কুলকেই আগুনে পুড়িয়ে প্রায় ধ্বংস করে দিল। স্কুলের সমস্ত কাগজপত্র, প্রয়োজনীয় আসবাব যা কিছু ছিল তার সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে গেল স্কুলের অনেক পুরোনো ইতিহাস।

কিন্তু দেশ স্বাধীন হবার পর, আবার ধীরে ধীরে গড়ে উঠল এই স্কুল। গ্রামের মানুষদের অক্লান্ত চেষ্টায় ও উদ্যোগে। পুরোনো স্কুল বিল্ডিংএর কাঠামোটা শুধু বেঁচে ছিল। ভেতরের সব কিছুই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এবার নতুন করে জেগে উঠল সবার ভালোবাসার স্কুল। “শূলপাণি বয়েজ হাইস্কুল’।

প্রধান অতিথির বক্তৃতা শেষ হবার পর পুরস্কার দেবার পালা, মাঝখানে কিছু সময়, স্কুলের ছাত্ররা গান গেয়ে, কবিতা আবৃত্তি করে দর্শকদের হাততালি পেল।

এরপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল মাধ্যমিকে ভালো ফল করা ছেলেদের পুরস্কার দেওয়া। মাইকে নাম ঘোষণা করে, এক একজন ছাত্রর হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন স্টেজে বসা অতিথিরা।

সব শেষে পানুকে সম্বর্ধনা দিতে উঠে দাঁড়ালেন, প্রধান অতিথি হেমকান্ত জানা। এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে পানু। তার হাতে একটি ট্রফি তুলে দিলেন এই স্কুলেরই প্রাক্তন ছাত্র, আজকের প্রধান অতিথি, গড়বেতা কলেজের অধ্যক্ষ। পানু নীচু হয়ে তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেই তিনি ডান হাত বাড়িয়ে পানুকে নিজের কাছে টেনে নিলেন। ভিড় ঠাসা হল হাততালিতে ফেটে পড়ল।

প্রধান অতিথি, হাত তুলে সবাইকে থামতে বললেন। একহাতে পানুর কাঁধ জড়িয়ে ধরে মুখে হাসি নিয়ে বললেন, “আমাদের এই গ্রামেরই একটি ছেলের এই সাফল্যের জন্য তাকে অভিনন্দন জানাতে পেরে আমরা সবাই গর্বিত আনন্দিত। কিন্তু আজ এখানে সবাই যখন উপস্থিত আছেন, তখন আমি একটি গল্প শোনাতে চাই। এই গল্পটি একটি অসাধারণ সাফল্যের গল্প। এই গ্রামের অনেকেই নিশ্চয় এই গল্প জানেন। তবু আজ কেন জানি না আর একবার সেই গল্পটাই শোনাবার খুব ইচ্ছে জাগছে আমার মনের মধ্যে তবে এটাকি নিছক গল্প, নাকি সত্যি! তা কিন্তু আমরা কেউই জানি না। এই স্কুলের প্রাচীন ইতিহাস তো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে কি করে যে এই গল্প লোকের মুখে আর শূলপাণি গ্রামের হাওয়ায় মিশে আছে তা বলতে পারব না।”

এতটুকু বলেই তিনি এবার মণিদাদুর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “শিবনাথ দা, আপনি কি কিছু বলতে পারেন? কারণ শোনা যায় এই গল্পের সঙ্গে আপনাদের পরিবারের একটা সম্পর্ক আছে” মণিদাদু চেয়ারে বসে মুখটা সামান্য নীচু করে প্রধান অতিথির কথা শুনছিলেন মনোযোগ দিয়ে। এবার মুখ তুলে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে না বললেন।

প্রধান অতিথি এবার সামনের দর্শকদের দিকে তাকিয়ে আবার তাঁর কথা শুরু করলেন,

“বৃটিশ শাসকের উদ্যোগে, পরাধীন ভারতে, এই অখ্যাত গ্রামে ‘ওরিয়েন্টাল অ্যাকাডেমি’ নামে যে স্কুল একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে একটি অতি আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। তখন স্কুলের যে শেষ পরীক্ষা মানে এখনকার মাধ্যমিক। তার নাম ছিল এন্ট্রেন্স পরীক্ষা। ম্যাট্রিকুলেশনেরও আগে ছিল এই এন্ট্রেন্স পরীক্ষা। তখন দেশভাগ হয়নি। এর অনেক বছর পরে দেশ স্বাধীন হয় এবং ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু সেই সময়ের যে অখন্ড বাংলা, অর্থাৎ পূর্ব পশ্চিম দুই বাংলা চট্টগ্রাম, ঢাকা, কলকাতা এবং আরও যত শহর গ্রাম সব মিলিয়ে এই এন্ট্রান্স পরীক্ষা হত। তার মানে বিশাল এক এলাকার সমস্ত স্কুল এই পরীক্ষায় অংশ নিত।

ওরিয়েন্টাল অ্যাকাডেমি প্রথম যেবার এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিল, সেবার এক পরমাশ্চর্য ঘটনা ঘটল। অখ্যাত এই গ্রামের এই স্কুল থেকেই একটি ছাত্র এই এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করল। সারা দেশে এই নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল।

শোনা যায়, এখানকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী এক বৃটিশ সাহেব, এই স্কুলে নিজে উপস্থিত হয়ে, সেই অসাধারণ মেধাবী ছাত্রটির গলায় নিজের হাতে একটি ‘সোনার মেডেল’ পরিয়ে দিয়েছিলেন। প্রধান অতিথি এইটুকু বলে থামতেই স্তব্ধ হয়ে এতক্ষণ যারা শুনছিল সবাই একসঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠল। এবার তিনি বললেন, “কিন্তু এরপরের ইতিহাস তো বিপ্লবের ইতিহাস। ইংরেজ শাসকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ইতিহাস, এবং ধ্বংসের ইতিহাস। ধ্বংসের আগুনে ‘ওরিয়েন্টাল অ্যাকাডেমি’ স্কুলের সব ইতিহাস হারিয়ে গেল অতীতের অন্ধকারে।” এটুকু বলে একটু থামলেন তিনি। তারপর বেদনার্ত কন্ঠে বলে উঠলেন, “এমনকি আমাদের এই গ্রামের এই স্কুলেরই সেই অসাধারণ মেধাবী ছাত্রটির নামটাও হারিয়ে গেল চিরদিনের মতো অজানার অন্ধকারে।”

প্রধান অতিথি এবার নিজের আসনে গিয়ে বসলেন। স্কুলের দুজন ছাত্র স্টেজে উঠে এসে পানুকে কিছু বলবার জন্য অনুরোধ করে, মাইকে পানুর নাম ঘোষণা করল। পানু সামান্য অপ্রস্তুত হয়েই নিজেকে সামলে নিল। হাতের ট্রফি সামনের টেবিলের ওপর রেখে, দুইহাত জোড় করে সামনের দর্শকদের প্রণাম জানাল। তারপর মাইকের সামনে উদাত্ত কন্ঠে, পরিষ্কার উচ্চারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করল, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির…।’

বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে গড়িয়ে গেল। রাতের খাওয়া শেষ করে, মণিদাদুর সঙ্গে পানু বাইরের খোলা বারান্দায় এসে বসল। উঠোনের ওপাশের ছোটো ছোটো ঘর গুলোর আলোও একসময় নিভে গেল। জ্যোৎস্না চারধারে কেমন একটা মায়াবী আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। কোথায় যেন রাতচরা পাখী ডেকে উঠল কর্কশ স্বরে।

মণিদাদুকে আজ বেশ ক্লান্ত লাগছে। মাদুরের ওপর একটা বালিশে মাথা দিয়ে, কপালে আড়াআড়ি হাত রেখে, চোখ বুজে চুপচাপ শুয়ে আছে। পানুরও আজ কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা। স্কুলের অনুষ্ঠানে শোনা কথাগুলো কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছে না। রাত বাড়ছে। হালকা একখন্ড মেঘ এসে চাঁদকে হঠাৎ ঢেকে ফেলতেই চারপাশে গাঢ় অন্ধকার নেমে এল। এতক্ষণ বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছিল হাওয়াটাও বন্ধ হয়ে গেল। পাণু মণিদাদুর গা ঘেঁষে উপুর হয়ে শুয়ে, মুখতুলে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল, “এসব কথা কি সত্যি?”

মণিদাদু কপালের ওপর থেকে হাত না সরিয়েই খুব আস্তে করে বলল, “সত্যি”

পানুর সারা শরীরে কেমন একটা শিহরণ বয়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে এবার জিজ্ঞেস করল,

“তুমি কি করে জানলে?”

ঠিক তেমনি ভাবে শুয়েই মণিদাদু একই ভঙ্গিতে মৃদুস্বরে উত্তর দিল,

“সোনার মেডেলটা যে এবাড়িতেই আছে।”

পানু এবার উঠে বসল। মেঘটা সরে গেছে। নিস্তব্ধ চরাচরে শুধু ঝিঁ ঝিঁ পোকার অবিশ্রান্ত কলরব। একটা দমকা হাওয়ার সঙ্গে রাত পাখিটার কর্কশ স্বর ভেসে এল।

পানু দাদুর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে জিজ্জেস করল,

“কোথায়?”

“ঠাকুর ঘরের সিন্দুকে।”

বাইরের বারান্দার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে পানু মণিদাদুর সঙ্গে বাড়ির লম্বা চওড়া বিরাট ঢাকা বারান্দা দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। বারান্দার বাঁদিকের সব ঘরের দরজাই তালা বন্ধ। ডানদিকে সার দিয়ে বড়ো বড়ো জানালা সবই বন্ধ। সব জানালার মাথাতেই নানারঙের কাঁচ দিয়ে সাজানো আর্চ। ভেতর বাড়ির এই বারান্দা সোজা গিয়ে তারপর ডাইনে বাঁয়ে দুদিকে ঘুরে গেছে। মজুমদার বাড়িকে তাই অর্ধগোলাকৃতি একতলা একটা প্রাসাদ বলা যায়।

ভিতরবাড়ির এই বারান্দা ধরে বেশ অনেকটা হেঁটে গিয়ে ছাদে ওঠার সিঁড়ি। তার পরেই বারান্দা ডান দিকে বাঁক নিয়েছে, যেদিকে আছে রান্নাঘর খাবারঘর। সিঁড়ি দিয়ে ছাদে ওঠার মাঝপথে ডান পাশেই একটা বড়ো চাতাল। সেখানেই ঠাকুর ঘর। মণিদাদু পানুকে নিয়ে ঠাকুর ঘরের সামনে এসে চাবি দিয়ে তালা খুললেন। আগেও পানু অনেকবার এই ঠাকুর ঘরে এসেছে। মাঝারি সাইজের ঠাকুরঘর। দেয়াল এবং মেঝে পুরোটাই শ্বেত পাথরের। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, মাথার ওপর ঝাড়বাতি, যেটা বিশেষ পুজো পার্বণে জ্বালানো হয়। তাছাড়া দেয়ালে কাঁচের শেড দিয়ে ঢাকা বাল্ব। মণিদাদু ঘরে ঢুকেই সুইচ টিপে আলো জ্বালাতেই ঠাকুরঘর উজ্জ্বল আলোতে ঝলমল করে উঠল। সামনের দেয়ালের কাছাকাছি শ্বেতপাথরের উঁচু বেদি। তার ওপরে কালো কষ্টিপাথরের বেশ বড়ো শিবলিঙ্গ। এখনও তার মাথায় ও পায়ের কাছে বেলপাতা আর আকন্দ ফুল। এই বংশে বহুকাল ধরে শিবের উপাসনা চলে আসছে। পূর্বপুরুষরা ছিলেন শৈব। তাই বংশ পরম্পরায় মহাদেবের নামকে অনুসরণ করেই, পরিবারের সব পুত্রসন্তানদেরই নামকরণে এই রীতিকেই মানা হয়। যা আজও চলে আসছে।

মজুমদার পরিবারের নিজেদের পুরোহিত রোজ ভোরবেলা এসে এখানে পুজো করে যান, আবার সন্ধ্যাবেলা এসে সন্ধ্যাপ্রদীপ দেখিয়ে, আরতি করে চলে যান। বহুকাল ধরে এই নিয়মই চলে আসছে। এই বাড়ির পুরোহিতও তাঁর বংশপরম্পরাতেই এই কাজে নিযুক্ত। তিনিও এবাড়ির একজন। পানু ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছে, গ্রামের প্রায় সব মানুষজনের সঙ্গেই এই পরিবারের একটা আত্মীয়তার বন্ধন রয়েছে। এখানকার সবাই যেন নিজের লোক।

শিবলিঙ্গর সামনে, বেদির ওপরে পেতলের বড়ো প্রদীপ, পঞ্চ প্রদীপ, কোশাকুশি বড়ো একটা ঘণ্টা সব গুছোনো রয়েছে।

ঠাকুর ঘরের বাঁদিকের কোণায়, দেয়াল ঘেঁষে বেশ বড়ো একটা সিন্দুক। লাল শালু দিয়ে ঢাকা। ওর মধ্যে পুজোর বাসনকোসন ও দরকারি সব জিনিসপত্র থাকে। সিন্দুকের ওপর থেকে লাল শালুটা তুলে দিয়েই মণিদাদু স্থির হয়ে গেলেন। পানু উৎসুক হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শিবনাথ মজুমদার অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন, “সিন্দুকের তালা নেই কেন?”

তিনি হাতে ধরা চাবিটা পানুর হাতে দিয়েই সিন্দুকের ভারি ডালাটা নিজেই টেনে তুললেন। দাদুর সঙ্গে পানুও ঝুঁকে পড়ল সিন্দুকের সামনে, ঘরের আলো যথেষ্ট উজ্জ্বল। ভেতরে ভর্তি পুজোর বাসন ও অন্যান্য সামগ্রী। শিবনাথবাবু ঝুঁকে পড়ে, নির্দিষ্ট কোণে হাত ঢুকিয়ে তুলে আনলেন প্রায় চার ইঞ্চির মতো চৌকো একটি ভেলভেটে মোড়া বাক্স। কালচে হয়ে যাওয়া গাঢ় নীল রঙের বহু পুরোনো। বাক্সের ঢাকনাটা খুলতেই, পানু দেখতে পেল বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সাদা সার্টিনের ঠিক মাঝখানে চুড়ির মতো গোল একটা গর্ত। ফাঁকা। বাক্সের মধ্যে কিছু নেই। মণিদাদু বাক্সটা হাতে নিয়ে অপলক তাকিয়ে আছেন। হাতটা অল্প অল্প কাঁপছে। হঠাৎ নিঃশব্দ রাত্রি ঢং ঢং করে বেজে ওঠা একটানা শব্দে চমকে কেঁপে উঠল। শিবনাথ মজুমদার নিজেকে সামলে নিয়ে, বাক্সটা জায়গা মতো রেখে সিন্দুক বন্ধ করে মৃদুস্বরে বললেন, “চল দাদুভাই, অনেক রাত হল।”

মজুমদার বাড়ির বসার হলঘরের দেয়ালের প্রাচীন মস্তবড়ো ঘড়িটা বারোটার ঘণ্টা বাজিয়ে থেমে গেল। নেমে এল গভীর নৈঃশব্দ।

মণিদাদুর ঘরে একটা নীলাভ আলো সারারাত জ্বলে। শিবনাথ মজুমদার নিজের বুকের ওপর হাত দু-খানা রেখে স্থির হয়ে সোজা শুয়ে আছেন। চোখবন্ধ। পানু মণিদাদুর পাশেই শুয়ে আছে। ঘুম আসছে না। সে এবার পাশ ফিরে মণিদাদুর বুকের ওপর রাখা হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখতেই শিবনাথবাবু বড়ো করে নিশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে বলে উঠলেন “সোনার মেডেল এবাড়ি থেকে আবার চুরি হল। পানুর প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে জিজ্ঞেস করল, “আগেও চুরি হয়েছিল?”

“হ্যাঁ! আমি বিশ্বাস করি আবার কেউ খুঁজে পাবে।” খুব শান্ত স্বরে বললেন মণিদাদু।

পানু এবার বালিশ থেকে মাথা তুলে বলল, “তুমি জানলে কি করে?”

“আমার বড়দাদুর কাছ থেকেই আমি ‘সোনার মেডেলের’ কথা শুনেছি। চন্দ্রশেখর মজুমদার। আমার বাবার বড়ো জ্যাঠামশাই। প্রায় একশো বছর বেঁচে ছিলেন। আমাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। তিনিও ছিলেন চিরকুমার। এই গ্রামের মাথা। খুব ছেলেবেলায়, আমি তখন স্কুলের নীচু ক্লাসে পড়ি। সেই সময় থেকেই তার কাছেই আমার পড়াশোনা, তারসঙ্গেই আমার শোওয়া বসা। বুকের কাছে আগলে রাখতেন সব সময়। আমার সব শিক্ষা তাঁর কাছেই। বিদ্বান, পণ্ডিত, ধর্মপ্রাণ মানুষ। সেই বাল্যকালেই তিনি আমাকে এই পরিবারের এই গ্রামের, এই দেশের সব গল্প বলতেন। এখানে আর কেউ এতসব কথা জানত কিনা সন্দেহ। আমিই ছিলাম তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী। ‘সোনার মেডেলের’ গল্প আর কারও মুখে শুনিনি। তিনি আমাকে নিষেধও করে দিয়েছিলেন এই বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে”।

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলতে শুরু করলেন। পানু এবার উঠে বসল। নীলাভ আলোয় মণিদাদুর মুখটা অন্যরকম লাগছিল। চোখ তখনও বুজেই আছেন। পানু তাঁর একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে মুঠো করে ধরে রাখল।

“চন্দ্রশেখর মজুমদার আমার বড়দাদু বলেছিলেন, তাঁর জন্মের কয়েকবছর আগে তাঁরই পিতামহ শম্ভুচন্দ্র মজুমদার, শিলাবতী নদীর বালির চরে খুঁজে পেয়েছিলেন এই সোনার মেডেল। সেকালের খাঁটি সোনার। বেশ বড়ো আর ভারি। ঠাকুর ঘরের সিন্দুকে নীলরঙের ভেলভেটের একটা চৌকো খালি বাক্স তিনিই আবিস্কার করেছিলেন। তার মধ্যেই সযত্নে রেখে দেন এই সোনার মেডেল। একথা কাউকে তিনি জানাননি। এই মেডেলের অস্তিত্ব সম্বন্ধে মজুমদার পরিবারের কোনো ধারণাই ছিল না। তবে শূলপাণি গ্রামে বহুবছর আগে থেকেই এই প্রাইজ পাওয়া এবং সোনার মেডেলের গল্পটা প্রচলিত ছিল। রূপকথার গল্পের মতোই। এই নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি।

শম্ভুচন্দ্র মজুমদার তাঁর মৃত্যুর আগে তাঁর বড়ো নাতি অর্থাৎ আমার বড়দাদু চন্দ্রশেখর মজুমদারকে এই ‘সোনার মেডেলের’ কথা বলে গিয়েছিলেন। তাঁরও নিষেধ ছিল এই বিষয় নিয়ে কাউকে কিছু বলার।”

পানু তার মণিদাদুর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তবে চুরি গেল কি করে? আবার পেলেই বা কোথায়?”

‘আমাদের মজুমদার বংশে পুত্রসন্তানই বেশি। কন্যাসন্তান খুব কম। আমাদের মা, কাকীমা, ঠাকুমা এঁরা তো সবাই অন্য পরিবার থেকে এই বাড়িতে বউ হয়ে এসে ছিলেন। আমরা তিনভাই, কোনো বোন নেই। একমাত্র আমার বাবা জ্যাঠাদের একবোন ছিলেন। আমাদের পিসিমা। যে কোনো কারণেই হোক, তিনি তাঁর স্বামীকে নিয়ে আমাদের সংসারেই থাকতেন। তবে তিনি বেশি দিন বাঁচেননি, অল্প বয়সেই মারা গেছেন। তাঁর কোনো সন্তানও ছিল না। আমরা তখন খুবই ছোটো। আমাদের পিসির স্বামী, অর্থাৎ আমাদের পিসেমশাই হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যান, সঙ্গে সোনার মেডেলটাও। সেই পিসেমশাই আর কোনোদিনই ফিরে আসেননি। আমার বড়দাদু তখন বেঁচে আছেন। এবং পরিবারের কর্তাও তিনিই। পিসেমশাই না ফিরলেও ‘সোনার মেডেলটা’ ফিরে এসেছে”। পানু উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেমন করে?” মণিদাদু এতক্ষণ চোখ বুজেই কথা বলছিলেন। এবার চোখ মেলে পানুর মুখের দিকে তাকালেন। বাইরে থেকে একটানা ঝিঁঝিঁর ডাক শুধু ভেসে আসছে। মণিদাদুর মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল। নীলাভ আলো ঘরটাকে কেমন যেন মায়াবী করে রেখেছে।

“এই সবকিছুই আমার বড়দাদুর মুখ থেকেই শোনা। তিনি ছাড়া এই মেডেলের খবর আর কেউই জানত না। কিন্তু তবু মেডেল চুরি গেল। আশ্চর্যের ব্যাপার তার ক-দিন পরেই সেই মেডেল আবার খুঁজে পেল আমাদের ভোলাকাকু। আমার বাবার ছোটোকাকার ছেলে। ভোলানাথ মজুমদার। নামের মতোই মানুষ তিনি। সোজা সরল হাসিখুশি আমুদে মানুষ। স্কুলের পড়াশেষ করে তিনি তাঁর অন্যসব ভাইদের মতো কলেজে পড়তে বাইরে যাননি। বরাবর গ্রামেই ছিলেন। গ্রাম শুদ্ধু লোকের বড়ো ভালোবাসার মানুষ ছিলেন তিনি। সবার উপকার করে বেড়াতেন। গ্রামের সবরকম মানুষের বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। পড়াশোনা চাকরি-বাকরি এসব দিকে কোনো মনই ছিল না। আমাদের জমি জায়গা বাগান যেটুকু যা ছিল, সময় পেলেই দেখা শোনা করতেন। চাষি মজুরদের সঙ্গে মাঠে নেমে, হাতে কোদাল লাঙ্গল তুলে নিতেন।

তবে ভালো মানুষ হলেও বোকা ছিলেন না। হয়তো ব্যাপারটা খানিকটা বুঝেছিলেন। তাই ‘সোনার মেডেলটা’ পেয়ে, তিনি কাউকে কিছু না বলে, গোপনে বড়দাদুর হাতেই তুলে দিয়েছিলেন”। পানু উতলা হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তোমাদের ভোলাকাকু ‘সোনার মেডেল’ পেলেন কোথায়?”

“শিলাবতী নদীর চরে… এবার ঘুমিয়ে পড়। রাত শেষ হয়ে আসছে দাদুভাই, আমাকে ভোরে উঠতে হয়। কাল তোমার কোলকাতায় ফেরার দিন। বাসে অনেকটা পথ যেতে হবে।” মণিদাদু এবার ওপাশে ফিরে শুলেন। পানু শুতে পারছে না। অস্থির হয়ে দাদুর গায়ে হাত রেখে বলল, “মণিদাদু, শুধু একটা কথা জানতে খুব ইচ্ছে করছে, মেডেলটা তো তুমি দেখেছ। তার গায়ে কারুর নাম লেখা ছিল না?”

ওপাশ ফেরা অবস্থাতেই শিবনাথ বাবু মৃদু কন্ঠে বললেন, “না! শুধু ‘মজুমদার’ কথাটা খোদাই করা ছিল ওপরের দিকে। তার নীচে এন্ট্রেন্স পরীক্ষায় প্রথম, আর তার নীচে সেই সালটা। আর কিছু না।”

পানু এবার ঝুঁকে পড়ে দাদুর মুখটা দেখতে চাইল আর ফিস্ ফিস্ করে জিজ্ঞেস করল, “তুমি শেষ কবে দেখেছ ‘সোনার মেডেল?”

শিবনাথ মজুমদার একটুও নড়লেন না। ওপাশ ফেরা এবং চোখ বন্ধ করা অবস্থাতেই ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, “তুমি এখানে আসার ঠিক আগের দিন। কারণ আমার মনে অনেক দিনের একটা আকাঙ্খা ছিল তাই; যাক্ এসব বলে এখন আর কোনো লাভ নেই…। তুমি ঘুমিয়ে পড়। আর কথা বলার দরকার নেই।”

হলঘরের বড়ো ঘড়িটা ঢং ঢং করে দুটোর ঘণ্টা বাজিয়ে থেমে যেতেই, খুব কাছেই কোনো একটা দলছুট শেয়াল তারস্বরে ডেকে উঠেই হঠাৎ চুপ করে গেল। মধ্যরাত্রি জুড়ে নেমে এল গভীর নৈঃশব্দ।

শেষ রাতের এলমেলো ঘুম দূর থেকে ভেসে আসা মোরগের ডাকে ভেঙে গেল। মণিদাদু স্নানের ঘরে। পানু ধড়মড় করে উঠে বসল। চটপট চোখ মুখ ধুয়ে, পাশের প্যাসেজটা দিয়ে গিয়ে বাড়ির সামনের হলঘরে ঢুকল। দেয়ালের বড়ো ঘড়িতে ভোর ছটা বাজতে চলেছে। রতনকাকা কখন এসে মজুমদার বাড়ির এই বড়ো বৈঠকখানার কাঠের খড়খড়ি দেয়া বড়ো বড়ো জানালা, দরজা সব খুলে দিয়ে গেছে। ভোরের নরম আলো, মোজাইক করা ঘরের লাল মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। সামনের মস্ত বড়ো, দরজা দিয়ে পানু বাইরের লম্বা রোয়াকে এসে দাঁড়াল। দুপাশে টানা লম্বা রোয়াক, মাঝখানে নীচে নামার কয়েক ধাপ সিঁড়ি। মাঝখানে লম্বা লাল সুরকি ঢালা পথের শেষে লোহার বড়ো গেট। সুরকি পথের দু-ধারে নানা রঙের ফুলের বাহার। মালীদাদা একটা ঝারি দিয়ে ফুল গাছে জল দিচ্ছে। ভোরের ফুরফুরে ঠান্ডা বাতাস পানুর চোখে মুখে স্নিগ্ধ হাত বুলিয়ে দিল। খুব ভালো লাগছে। রাতের সব গ্লানি যেন মুছে গেল। নানারঙের ফুলের ওপর ভোরের গোলাপী আলো ছড়িয়ে পড়েছে। হাওয়ায় দুলে দুলে ফুলগুলো পানুকে যেন সুপ্রভাত জানাচ্ছে। পানু চোখ তুলে সামনে তাকাতেই সবুজ গাছপালা, খোলা মাঠ, আর একটু দূরে ছোটো ছোটো বাড়ি দেখতে পেল। প্রথম সূর্যের আলোয় অপার শান্তি যেন নেমে এসেছে। কি শান্ত কি সুন্দর পানুদের এই শূলপাণি গ্রাম। ওর বুকের মধ্যে একটা ভীষণ ভালো লাগার আবেগ উথলে উঠল। নানা সুরে পাখি ডাকছে। আর কোনো শব্দ নেই।

পানুর সম্বিৎ ফিরল মালীদাদার ডাকে, “আমাদের সোনাভাইয়ের এরই মধ্যে ঘুম ভেঙে গেল?” হাতে জলের ঝারি, ফোগলা দাঁতে একমুখ হাসি নিয়ে সামান্য ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে মালীদাদা। সাদা চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো উড়ছে। পানু ওর জ্ঞান হওয়া বয়স থেকে মালীদাদাকে এবাড়ির ফুলগাছের এভাবেই যত্ন নিতে দেখে আসছে। পানুর বাবারও মালীদাদা। পানুরও মালীদাদা।

পানু হেসে একটু এগিয়ে এসে বলল, “হ্যাঁ গো, ঘুম ভেঙে গেল! তুমিও তো এরই মধ্যে তোমার কাজ শুরু করে দিয়েছ।”

“সেই ছেলেবেলা থেকে যে অভ্যেস। কত্তাবাবা ওঠেন সব্বার আগে, তারপরে আমরা সবাই। তাকে কেউ হারাতে পারিনি আজ অবধি।”

পানু হাসিমুখে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল লাল সুরকি বিছানো সরু পথটাতে। এগিয়ে গেল সামনের বড়ো লোহার গেটের দিকে। এই অর্ধ গোলাকার বড়ো বাড়িটাকে ঘিরে রেখেছে পানুর প্রায় মাথা সমান উঁচু পাঁচিল। ফুলে ছাওয়া মাধবীলতা ছড়িয়ে আছে পাঁচিলের ওপরে, পাঁচিলের গায়ে।

লোহার গেট খুলতেই ডানদিকে চোখ পড়ল। সতুদা ব্যাগ কাঁধে হন্হন্ করে হেঁটে আসছে। পানু হেসে চেঁচিয়ে ডাকল, “আরে সতুদা? সাত সকালে চললে কোথায়?”

সতু এগিয়ে আসতে আসতে বলল, “আর বলিস না ভাই, দুটো দিনও কি বেশি থাকার উপায় আছে? করে খেতে হয় যে। অনেক হাঙ্গামা করে তবে আসতে হয়েছে এই একটা দিনের জন্য। শুধু তোর জন্য।” খোলা গেটের সামনে পানুর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। “আমাদের স্কুল তোকে সম্বর্ধনা দেবে, আর আর আমি তা দেখব না। আমাদের শঙ্কর কাকার ছেলে বলে কথা! কতদিন পরে তোকে দেখলাম বলত? এর মধ্যেই কতটা বড়ো হয়ে গেছিস। কি দারুণ একখানা রেজাল্ট করেছিস।” তারপরেই ব্যস্ত হয়ে বলল “চলিরে! সকালের বাসটা ধরতে হবে,” বলতে বলতে সতু পা চালাল। পানু তাড়াতাড়ি বলে উঠল “বিকেলের বাসে তো আমিও ফিরছি, একসঙ্গেই তো বেরোতে পারতাম।”

সতু যেতে যেতে পেছন ফিরে বলল, “তুই ধরবি কলকাতার বাস আর আমি যাব দীঘা। পানু দুপা সতুর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল “তবু তো একসঙ্গে বাসস্ট্যান্ড অবধি গল্প করতে করতে যাওয়া হত” সতু ডানহাতটা মাথার ওপরে তুলে হেসে বলল, “চলিরে, কলকাতায় গেলে যাব তোদের বাড়ি, শঙ্কর কাকার সঙ্গে দেখা করে আসব।” পথটা এবার ডানদিকে বাঁক নিয়েছে। হাতটা নাড়তে নাড়তে চেঁচিয়ে উঠল, “দেখা হবে। ভালো থাকিস্ …” মিলিয়ে গেল সতু পথের বাঁকে।

মণিদাদুর মতো হাসিখুশি মানুষ হঠাৎ কেমন চুপ হয়ে গেছেন। সারাদিন দরকারি ক-টা কথা ছাড়া আর বিশেষ কথা বার্তা বললেন না। একটা রাত্তিরেই যেন একটু বেশি বুড়িয়ে গেছেন। সারারাত ভালো ঘুম হয়নি। তাই পানুকে তিনি দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পরে একটু ঘুমিয়ে নিতে বললেন। বিকেল চারটের মধ্যে বেরোতে হবে মনে করিয়ে দিলেন। সারা দুপুর পানুর খাটের পাশে, নিজের ইজিচেয়ারটায় হেলান দিয়ে, একটা বই হাতে নিয়ে বসে রইলেন।

বলাইদা পানুকে বাসে তুলতে যাবে সেটাই ঠিক ছিল। কিন্তু তার দেখা নেই। রতনকাকা নিজের ছেলের উদ্দেশ্যে চেঁচামেচি বকাবকি শুরু করে দিয়েছে। কাকীমা এসে জানাল, পাড়ার একটা ছেলে এসে খবর দিয়ে গেছে, বলাইদার নাকি আজ ফুটবল-ম্যাচ আছে। তাই সে দুপুরেই বেরিয়ে গেছে। বলাইদার ফুটবল খেলার নেশার কথা এখানে সবাই জানে। যার জন্য কাজ কর্ম ভুলে যায়। তাছাড়া বাড়িতে কাউকে বলে যেতে সাহসও পায়নি।

রতনকাকা ছেলেকে একপ্রস্থ গালাগাল দিয়ে, নিজেই পানুর সঙ্গে যাবে বলে রেডি হল। পানু প্রবল আপত্তি জানিয়ে বলল “আমি একাই তো চলে এলাম। যাবার সময়ও একাই যাব। আমি কি এখনও বাচ্চা আছি? তোমরা এমন কোরো না।”

শিবনাথবাবু একটু চিন্তিত মুখে বললেন, “তুমি ক’টার বাসে আসবে শঙ্কর তো আমাকে জানায়নি। তাই বাসস্ট্যান্ডে কাউকে পাঠাতেও পারিনি। এখন বাড়ি থেকে যাচ্ছ, এরকম একা যাবে কেন? এখানে তো সঙ্গে যাবার লোকের অভাব নেই। তাছাড়া তুমি যতক্ষণ না বাসে উঠে বসছ, ততক্ষণ আমার তো চিন্তাটাও থেকে যাবে।”

পানু রতনকাকার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে দাদুর চোখে চোখ রেখে হেসে বলল, “আমার ওপর একটু ভরসা কর না মণিদাদু। আমাকে একটু বড়ো হতে দাও।” বলেই নীচু হয়ে দাদুর দুপা ছুঁয়ে প্রণাম করেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি একটুও চিন্তা করবে না। আমি বাসে উঠেই তোমাকে ফোন করব। মিনিট পনেরোর তো পথ। বাসের এখনও তো অনেক দেরি আছে। দিনের আলোও এখন অনেকক্ষণ থাকে। আমার কোনো অসুবিধা হবে না, দেখতে দেখতে পৌঁছে যাব।”

শিবনাথ মজুমদার পানুর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেই নিজের বুকের কাছে ওকে টেনে নিলেন তারপর একটু ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ঠাকুর ঘরে প্রণাম করে এসেছ?” পানু হেসে বলল, “সে তো প্রত্যেকবারই করি। আমার মনে থাকে।” রতনকাকা, কাকীমার দিকে ফিরে হাসিমুখে বলল, “আসি রতনকাকা, তোমরা সবাই ভালো থেকো। আমি আবার এসে দেখা করে যাব।”

গেট থেকে বেরোবার সময় মণিদাদু আবার মনে করিয়ে দিলেন, “বাসে উঠে বসার জায়গা পেয়েই আমাকে ফোন কোরো।” রতনকাকার সঙ্গে আরও দুজন কাজের মানুষ ওর সঙ্গে আসছিল, পানু ডানদিকে বাঁক নেবার আগে সবাইকে ফিরে যেতে বলে একটুক্ষণ দাঁড়াল। মণিদাদুর উদ্দেশে ডানহাত খানা ওপরে তুলে অস্ফুটে উচ্চারণ করল “আসি মণিদাদু, তুমি ভালো থেকো। আমি আবার আসব!” পানুর মনটা ভার হয়ে আছে, ও আজ দাদুর চোখে জল দেখেছে।

মজুমদার বংশের পিতৃপুরুষের ভিটে মাটি, জমি জায়গা বিষয় সম্পত্তি, বংশ মর্যাদা, ঐতিহ্য ইতিহাস, এসব কিছুই বহন করে নিয়ে চলেছেন একা মণিদাদু। এই শিবনাথ মজুমদার। বাকি সবাই ধীরে ধীরে, এক এক করে সব কিছু ছেড়ে চলে গেছে। দেশে, দেশান্তরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, স্থায়ী আস্তানা গড়ে তুলেছে। বদলে গেছে বাকি সবার ঠিকানা। শুধু মণিদাদুর ঠিকানা রয়ে গেছে এই শূলপাণি গ্রামে, এখানকার মানুষজনদের মধ্যে। তাঁর জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত।

হাঁটতে হাঁটতে পানু আনমনা হয়ে পড়েছিল। দেখতে পায়নি আকাশের কোণে কখন একখানা, কালো মেঘ এসে জমেছে, হঠাৎ ধুলোর ঝড় উঠতেই, একহাতে কাঁধের ব্যাগটা সামলে অন্যহাতে চোখ ঢেকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মূহুর্তের মধ্যে ধুলো এসে চারপাশের উজ্জ্বল দিনের আলোকে ঘিরে ফেলল। সব কিছু ঝাপসা। পথটা আর দেখা যাচ্ছেনা। কাঁধের ব্যাগটা দুইহাতে চেপে ধরে মুখ নীচু করে হাঁটার চেষ্টা করল, কোনদিকে যাচ্ছে জানে না। ঝলমলে বিকেল হঠাৎ ধূসর হয়ে গেল।

বেশ খানিকটা হাঁটার পর মনে হল ধূলোর ঝড় একটু কমেছে। মুখে তুলে, চোখ থেকে হাত সরিয়ে জায়গাটা পানু চিনতে পারল না। দু-ধারে জংলা ঝোপঝাড়। বোঝাই যাচ্ছে, এদিকে মানুষের যাতায়াত নেই। তাই কোনো পায়ে-চলা সরু পথও তৈরি হয়নি। জংলা জায়গাটা পেরোতেই, চারধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা, শ্যাওলা ধরা, কালচে হয়ে যাওয়া প্রচুর ইঁট পড়ে আছে দেখতে পেল। বাঁদিকে তাকাতেই বহু পুরোনো একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ল। মন্দিরের মাথায় চোখ যেতেই দেখল, মন্দির চূড়া এখনও মোটামুটি অটুট আছে। আর চূড়ার ঠিক মাঝখানে বসানো একটা লোহার ত্রিশূল সোজা হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। যদিও মন্দিরটার একটা ভাঙাচোড়া কাঠামো ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বট অশ্বত্থের চারা আর বুনো লতা পাতা মন্দিরকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে।

পানুর ভীষণ দিশেহারা আর অসহায় লাগছে, এ কোথায় এসে পড়ল ও?

“এখানে এসো”।

খুব কাছ থেকেই পরিষ্কার কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই দারুণ চমকে উঠল পানু। ডান দিকে মুখ ফেরাতেই দেখতে পেল বেশ বড়োসড়ো ভাঙা একখন্ড শ্বেতপাথরের ওপরে পা ঝুলিয়ে বসে আছে প্রায় ওরই বয়সী একটি ছেলে। এরকম একটা জায়গায় ছেলেটিকে দেখতে পেয়ে পানু যেমন অবাক হল তেমনি ভালোও লাগল। তবু তো একজন মানুষের দেখা পেয়েছে। মন থেকে প্রচন্ড ভয়টাও আস্তে আস্তে কেটে গেল। ধুলোর ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া পথটা এবার খুঁজে পাওয়া যাবে। বাসস্ট্যান্ডে যাবার পথটা ও অন্তত দেখিয়ে দিতে পারবে। পানুর ভয় পাওয়া মুখটা এবার স্বাভাবিক হয়ে, ঠোঁটে প্রসন্ন হাসি ফুটে উঠল।

পানু তাড়াতাড়ি ইঁটের পাঁজার পাশ কাটিয়ে, বুনো ঝোপ ডিঙিয়ে, ছেলেটার কাছাকাছি পৌঁছে যেতেই একটা চমক লাগল। ছেলেটি তো ওর ভীষণ চেনা। কিন্তু এক্ষুণি মনে করতে পারল না কোথায় দেখেছে ওকে! তবে এরকম কালো পেড়ে ধুতি আর ফতুয়ার মতো জামা পরা, ওরই বয়সী কোনো ছেলেকে এর আগে দেখেছে বলে মনে পড়ল না। ফরসা রঙ, মাথাভর্তি কালো কোঁকড়া চুল এলোমেলো হয়ে আছে। উজ্জ্বল ঝক্ঝকে চোখ দুটো হাসিমাখা। পানুর ভীষণ ভালো লেগে গেল ওকে।

পানু ওর সামনে দাঁড়িয়েই একটু বিপন্ন মুখে বলে উঠল, “দেখো না আমি রাস্তাটা হারিয়ে ফেলেছি। এমন ধুলোর ঝড় উঠল! কোলকাতায় যাব, বাস রাস্তাটা একটু দেখিয়ে দেবে।”

ছেলেটি একটু হেসে, নিজের পাশে পাথরের খালি জায়গাটুকু হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল,

“একটু বসো না ভাই, বাসের তো এখনও দেরি আছে।”

এত আন্তরিক ওর গলার স্বর, যে পানু ঠিক আপত্তি করতে পারল না। একটু ইতস্তত করে, খানিকটা অনিচ্ছা নিয়েই ছেলেটির পাশে এসে বসল।

পানু নিজের ব্যাগটাকে অন্যপাশে রেখে, ছেলেটির দিকে একটু ঘুরে বসে জিজ্ঞেস করল, “তোমাকে আগে কখনও আমাদের এই গ্রামে দেখিনি তো? কোথায় থাক তুমি?” ছেলেটি মৃদু হেসে বলল, “কাছেই”।

“এই ভাঙা মন্দিরটাও আগে কখনও দেখিনি। আসলে এদিকে কোনোদিন আসা হয়নি তো!”

“শূলপাণি দেবের মন্দির। প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো! এরকম হবার তো কথা ছিল না। ইংরেজের সৈন্য, বিপ্লবীদের ধরতে এসে মন্দিরটা ধ্বংস করে দিয়ে গেছে।”

“এটাই শূলপাণি মন্দির? এর নামেই গ্রামের নাম?”

“হ্যাঁ কেদারনাথ মজুমদার এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”

পানু কৌতূহলী হয়ে তাকাল ওর দিকে। ছেলেটি একটুক্ষণের জন্য আনমনা হয়ে গিয়েছিল, পরক্ষণেই বলে উঠল,

“টমাস্ সাহেবের উদ্যোগে শূলপাণি গ্রামে যখন ‘ওরিয়েন্টাল অ্যাকাডেমির’ প্রতিষ্ঠা হল, তখন এই কেদারনাথেরই ছেলে কৈলাশনাথ মজুমদার খুব সাহায্য করেছিলেন সাহেবকে।

স্কুলের জন্য জমি দিয়েছিলেন গ্রামের জমিদার প্রতাপচন্দ্র, যিনি ইংরেজ সাহেবেরদের কাছ থেকে ‘রাজা বাহাদুর’ খেতাব পেয়ে ছিলেন।”

পানু এবার জিজ্ঞেস করল, “এতদিন আগেকার এসব পুরোনো কথা তুমি জানলে কি করে?”

ছেলেটির মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। ওর হাসিটা এত সুন্দর, দেখলেই ভালোলাগে, ওর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। ছেলেটি হেসে বলল, “চেষ্টা করলেই সব কিছু জানা যায়।”

পানু একটু ভেবে নিয়ে, খানিকটা দ্বিধার সঙ্গে প্রশ্ন করল, “তুমি কি তবে ‘সোনার-মেডেলে’র কথাও জানো?” পানুর প্রশ্ন শুনে সে তক্ষুণি কোনো উত্তর না দিয়ে, শূলপাণি মন্দিরের ধ্বংস স্তুপের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর আত্মগত ভাবে, ভাঙা মন্দির থেকে চোখ না সরিয়ে বলতে শুরু করল,

“জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব এসে পৌঁছলেন ঠিক সকাল দশটার সময়। সঙ্গে আরও কয়েকজন বৃটিশ সাহেব। কোলকাতা থেকে গণ্যমান্য কিছু মানুষজনও এসেছিলেন। অনেকগুলো ফিটন গাড়ি এসে দাঁড়াল স্কুলের সামনে।

শুধু গ্রাম নয়, পুরো জেলা জুড়ে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। শূলপাণি গ্রামে যেন লোকের মেলা বসেছে।

রাজাবাহাদুর প্রতাপচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর নিজস্ব পারিষদবর্গ, গ্রামের অন্যান্য মানী লোকজন, স্কুলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব মাস্টারমশাইরা এবং কৈলাশনাথ মজুমদার তো আছেনই।

সবাই এগিয়ে গিয়ে, দেশের ইংরেজ সাহেবদের সাদরে অভ্যর্থনা করে স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করলেন।

এইটুকু বলে সে থামতেই পানু ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলে, “কিন্তু সোনার মেডেল?”

মুখে তার বিষণ্নতা ফুটে উঠল। পানু ওর পাশে বসে বুক ঠেলে বেরিয়ে আসা ওর দীর্ঘনিশ্বাসটাও যেন শুনতে পেল। একটু অনুযোগের ভঙ্গিতে ছেলেটি এবার বলে উঠল,

“ঠিক কুড়িজন ‘ওরিয়েন্টাল-অ্যাকাডেমি’ থেকে সেই প্রথমবার এন্ট্রেন্স পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু শুধু একজনের গলাতেই ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব নিজের হাতে ‘সোনার মেডেল’ ঝুলিয়ে দিলেন।

রাজবাহাদুর প্রতাপচন্দ্র রায়ের একমাত্র ছেলে জগৎচন্দ্রও তো স্কুলের জন্মকাল থেকে একই সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত। বছরের পর বছর একই বেঞ্চে দু-জনে পাশাপাশি বসেছে। সেই ছেলেবেলা থেকে দুজন দু-জনের অন্তরঙ্গ বন্ধু তবু সে সোনার মেডেলটা পেল না।”

ছেলেটা এটুকু বলেই চুপ করল। উৎগ্রীব হয়ে উঠল পানু,

“কে পেল তবে?”

পানুর প্রশ্ন যেন ওর কানেই যায়নি। ভাঙ্গা মন্দিরের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে বলতে লাগল, “অনুষ্ঠান শেষ হতে বেলা দুপুর। বিকেল হতে না হতে, গ্রামের জমিদার রাজাবাহাদুর প্রতাপচন্দ্রের একমাত্র সন্তান, জগৎচন্দ্র ওর প্রাণের বন্ধুর বাড়িতে এসে হাজির। এসেই হাসতে হাসতে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরল, “সত্যি ভাই, তুই আমাদের স্কুলের, আমাদের গ্রামের গর্ব। যা একখানা খেল্ দেখালি না। আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে, তোকে বলে বোঝাতে পারব না”। কিছুক্ষণ বসে গল্প করে, মিষ্টি খেয়ে উঠে পড়ল। দু-জনে একসঙ্গে গেট পর্যন্ত এল। বাইরে বেরোতে গিয়ে জগৎচন্দ্র এবার একটু অভিমানের স্বরে বলল, “এত ভিড় যে, তোর মেডেলটা একটু ভালো করে দেখতেও পেলাম না! তুইও কখন বাড়ি চলে এলি। একবার দেখা না ভাই, দেখলেও চোখ সার্থক। আচ্ছা একটা কাজ কর, তুই মেডেলটা নিয়ে আয়। আমি এগোচ্ছি। কতদিন হয়ে গেল মন্দিরের চাতালে বসে গল্প করি না বলত? পরীক্ষা, রেজাল্ট, এইসব করতে করতে ওদিকে আর যাওয়াই হয়নি। আমাদের সেই প্রিয় জায়গা। ওখানে ছেলেবেলা একসঙ্গে কত খেলেছি, আড্ডা মেরেছি।”

ছেলেবেলা থেকেই দুই বন্ধু গলায় গলায়। একসঙ্গে পড়াশোনা খেলাধূলো সব কিছু। খুশি মনে, বাড়ির ভেতরে গিয়ে ভেলভেটের সুন্দর কেসটা যথাস্থানে রেখে মেডেলটা, বের করে জামার পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে, পা চালিয়ে চলল মন্দিরের পথে।” একটানা কথাগুলো বলে হঠাৎ থেমে গেল সে। পানু খুব মনোযোগ দিয়ে গল্পটা শুনছিল, হঠাৎ থেমে যেতেই ব্যস্ত হয়ে বলল “তারপর? তারপর কি হল।”

কালো মেঘটা তখনও আকাশ ছেড়ে যায়নি। মন্দিরের চারপাশটা মলিন আর গুমোট হয়ে আছে। গাছের একটা পাতাও নড়ছে না।

ছেলেটি আবার কথা বলে উঠল,

“মন্দিরে পৌঁছতেই প্রাণের বন্ধু জগৎ বলল, ‘চল না নদীর ধারে হাঁটি। সেই কতদিন আগে ক্লাসের সব বন্ধুরা মিলে শিলাবতীর তীরে চড়ুইভাতি করেছিলাম। মনে আছে? কি মজাই না করেছিলাম”।

শিলাবতীর জল তখন অনেক নীচে। দু-ধারের পার অনেকটাই উঁচু। শিলাবতী বর্ষাকালে ফুলে ফেঁপে উঠে দু-ধারের বালির চর ডুবিয়ে দেয়। অন্যসময় জল অনেক কমে গিয়ে দুধারে ধূধূ করে বালির চর। লোকজন মাথায় বোঁচকা নিয়ে, কখনও বা গরু-মোষ নিয়ে, হেঁটেই নদী পার হয়ে ওপারে গিয়ে ওঠে। উঁচু পাড় অনেকটা ঢালু হয়ে নদীকে ছুঁয়ে থাকে।

প্রিয় বন্ধু দুজন, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গল্প করতে করতে নদীর উঁচু পাড় ধরে হেঁটে চলেছে। ওধারের উঁচু পাড়ের শান্ত সবুজ গ্রামের ছায়া শিলাবতীর বুকে ঢেউয়ের দোলায় কেঁপে কেঁপে উঠছে।

খানিকটা হেঁটেই, রাজাবাহাদুর প্রতাপচন্দ্রর একমাত্র সন্তান জগৎচন্দ্র হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, “কই দেখালি না সোনার মেডেলটা? এনেছিস তো?”

জামার বুক পকেট থেকে সাবধানে মেডেলটা বের করে ওর হাতে দিতেই, জগৎ উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল, ‘মারভেলাস’ কথাটা শেষ না করেই, শিলাবতীর দিকে পেছন ফেরা আর ওর নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয় বন্ধুর বুকে সজোরে ধাক্কা মারল। পায়ের তলার মাটি হারিয়ে যেতেই, চোখের পলকে হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরল জগতের জামার বুকের কাছটা। দু-জনেই একসঙ্গে উঁচু ঢালু পাড় দিয়ে গড়াতে গড়াতে গিয়ে পড়ল শিলাবতীর বুকের মাঝে জেগে থাকা একটা বালির চরে। যেটা চোরাবালি। গ্রামের কেউ কেউ এই চোরাবালির সন্ধান জানে, তবে বেশির ভাগই জানে না। জগৎচন্দ্র জানত।

পানু স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল, ওর পাশে বসা ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে প্রায় ফিস্ফিস্ করে জিজ্ঞেস করল, “আর সোনার মেডেল?”

সে ঘোলাটে আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস স্বরে উত্তর দিল, “সব কিছু হারিয়ে গেল শিলাবতীর চোরাবালিতে।”

পানু অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “কিন্তু আমাদেরই এক পূর্বপুরুষ তো খুঁজে পেয়েছিলেন সেই ‘সোনার মেডেল!”

ছেলেটি মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ শম্ভুচন্দ্র মজুমদার।”

একমুহুর্ত চুপ করে থেকে বলল “কিন্তু আবার তো চুরি গেল। চোর নটবর নন্দী।” পানু সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল “আবার খুঁজে পাওয়া গেছে।”

ছেলেটিও বলে উঠল “ভোলানাথ মজুমদার। ত্রিশূলপাণি মহাদেবেরই আরেক নাম। মহাদেবের সন্তান ছাড়া আর তো কারও অধিকার নেই এই ‘সোনার মেডেল’ পাবার।”

পানু অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আর নটবর নন্দী? যে চুরি করে পালিয়ে ছিল?”

সে নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিল, “শিলাবতীর চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে।”

পানু ছেলেটির গল্পের মধ্যে কখন যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। তাই সে উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “কিন্তু ‘সোনার মেডেল’ তো আর নেই, আবার হারিয়ে গেছে।”

শান্ত স্বরে সে উত্তর দিলে, “হ্যাঁ সতু চুরি করে পালাচ্ছিল।” চমকে উঠল পানু, “সতুদা? কি করে জানলে তুমি? কোথায় সতুদা?” উত্তেজনায় পানু প্রায় লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল।”

তেমনিই শান্ত স্বর তার, “শিলাবতীর চোরাবালিতে!”

নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে পানুর। বুকের মধ্যে হাতুড়ির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে, নড়াচড়ার ক্ষমতাও যেন আর নেই। মেঘটা কখন যেন কেটে গিয়ে, হালকা কমলা রঙের নরম আলোয় চারপাশটা ভারি সুন্দর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কাছেই কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। চমৎকার ঝির্ঝিরে হাওয়া আশেপাশের যত সব গাছের পাতাগুলো নাড়িয়ে দিয়ে, পানুর সারা শরীরে স্নিগ্ধ কোমল হাত যেন বুলিয়ে দিয়ে গেল।

পানুর ঘোরটা কেটে যেতেই, নিজেকে সামলে নিয়ে এবার ব্যস্ত হয়ে বলল, “অনেক দেরি হয়ে গেছে, আমাকে এবার যেতে হবে; নয়তো বাস পাব না।” তাড়াতাড়ি ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিতেই, ছেলেটিও সঙ্গে সঙ্গে পানুর মুখোমুখি উঠে দাঁড়াল। দু-জনে একদম মাথায় মাথায়। সমান লম্বা। পানুর চোখের দিকে পরিষ্কার দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে, প্রসন্ন কন্ঠে বলল, “আমাকেও এবার যেতে হবে। তোমার জন্যই বসেছিলাম।” পানুকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে পরক্ষণেই বলে উঠল, “তোমার নামটা তো জানলাম না!”

“পিনাকি। পিনাকি মজুমদার”

ওর সারামুখে উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে পড়ল। পানুর ভারি সুন্দর লাগল ওর এই হাসিটা, বুকের মধ্যে কেমন একটা ভালোবাসা যেন ছড়িয়ে পড়ল।

ছেলেটি হেসে বলল, “পিনাক পাণিতে যাঁর সেই তো পিনাকি। দেবাদিদেব মহাদেব।” পরক্ষণেই বলল “তোমার হাতটা দেখি।”

পানু একটু অবাক হয়ে, ওর ডানহাতটা বাড়িয়ে দিয়ে ওর সামনে হাতের পাতাটা মেলে ধরল।

গাছের ডালপালা আর পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্য ওর হাতের পাতার ওপর উজ্জ্বল একটুকরো আলো ঢেলে দিয়েছে। ঝলমল করে উঠল ওর হাতের তালু জুড়ে সোনার মেডেল। একটু ভারি আর ঠাণ্ডা। পানুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত শিহরণ খেলে গেল। বিস্ফারিত দুই চোখ মেলে নিজের হাতের পাতার দিকে তাকিয়ে ওর সব কথা যেন বন্ধ হয়ে গেছে। নড়াচড়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছে।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির গলার স্বরে চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল। হাসিমাখা মুখখানা ওর। শান্ত স্বরে বলছে, “এটা তোমার। যত্ন করে রাখবে, হারিয়ে যেতে দেবে না কোনোদিন।”

এবার যেন সামান্য একটু ব্যস্ত হবার ভঙ্গিতে বলে উঠল, “সামনের এই পথটা ধরে এগিয়ে যাও। কিছুটা এগোলেই বাসের রাস্তা।”

পানু কাঁপা হাতে সোনার মেডেল নিজের ব্যাগে ভরে নিল। বুক ঠেলে ওর কান্না উঠে এল। গলার কাছে কান্নাটাকে প্রাণপণে আটকে রেখে, সামনের মেঠো পথটায় পা বাড়াল। পানু দুপা এগোতেই পেছন থেকে ও বলে উঠল।

“পথে থামবে না কোথাও। সোজা এগিয়ে যাবে। থেমে গেলেই অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। পৃথিবী তোমাকে ভুলে যাবে।”

পানু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। রূদ্ধ কন্ঠে বলল, “তোমার নামটা তো আমাকে বললে না।” সে একটু হেসে উত্তর দিল,

“নীলকণ্ঠ! নীলকণ্ঠ মজুমদার!”

পানু কান্না জড়ানো গলায় ওর মুখের দিকে তাকিয়ে উচ্চারণ করল, “সব বিষ নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছেন যিনি, তিনিই নীলকণ্ঠ দেবাদিদেব মহাদেব।” আর এক মূহুর্ত না থেমে পানু মুখ ফিরিয়ে নিল। ব্যাগটা চেপে ধরে প্রায় ছুটে চলল, সামনের পথ ধরে। দুই চোখের নেমে আসা জল ওর গাল বেয়ে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে। দূরে বাসের হর্ণ শোনা গেল। কান্নায় ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখ হাত দিয়ে মুছে নিতেই, সামনেই বাসস্ট্যান্ড দেখা গেল। বাসে উঠেই মণিদাদুকে আগে ফোন করতে হবে। বাসের সিটে বসতে গিয়েই জানালার কাঁচে নিজের মুখটা দেখতে পেল। ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। দমকা ঝড়ে মাথার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে। হাত দিয়ে নিজের চুলটা ঠিক করতে গিয়েই, থমকে গেল। মাথায় বিদ্যুৎ চমকে উঠল। ওর অন্তর আত্মাকে সজোরে ঝাঁকুনি দিতেই পানু কেমন অবশ হয়ে নিজের সিটে ধপ্‌ করে বসে পড়ল হেলান দিয়ে চোখ বুঝল।

বুকের মধ্যে উথালপাথাল আবেগের ঢেউ, কি এক অব্যক্ত বিস্ময় আর বেদনা ওর মনটাকে ছেয়ে ফেলল। তাই প্রথম দেখাতেই এত চেনা? এত আপন লেগেছে। এত সাদৃশ্য! আয়নায় দেখা ওর নিজের মুখ।

বাস ছেড়ে দিয়েছে। পানু পাশে রাখা ব্যাগটা থেকে ওর মোবাইল বের করে বোতাম টিপে কানের কাছে ধরে পরিষ্কার উচ্চারণে বলল,

“মণিদাদু, আমি মেডেলটার সঙ্গে তাঁর নামটাও জানতে পেরেছি।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%