ভারতী গুহ
এক যে ছিল টিয়া। পার্কের ভেতর ডালপালা ছড়ানো তেঁতুল গাছটার কোটরে তার বাসা। অ-নে-ক দিন ধরে সে এখানে আছে। বাবা, মা, ভাই, বোন কিচ্ছুটি নেই। গাছে গাছে আছে শুধু তার সঙ্গীসাথীরা। ময়না, চন্দনা, বুলবুলি, দোয়েল, পাপিয়া আরও কত। পুব দিক রাঙা হয়ে ওঠার আগেই তারা বাসা ছেড়ে উড়ে যায় খাবারের খোঁজে। টিয়াও যায় ওদের সঙ্গে। আর পশ্চিমের আকাশ লাল হলে ওরা ঘরে ফিরে কিচিরমিচির লাগিয়ে দেয়।
তেঁতুল গাছের তলায় যে বড়ো পাথরটা তার ওপরে ভুতোর বাসা। কতদিন হয়ে গেল সে এখানে আছে। বাবা, মা, ভাই, বোন কিছু নেই। আছে শুধু একজন, মাথার ওপরে পাতার ফাঁকে। তার বন্ধু টিয়া। ভুতো তাকে ডাকে ‘টিটি, টিটি’। ভুতোর একটা পা ভাল আর একটা পা লিকলিকে সরু, মাটি ছোঁয় না। সে এক পায়ে অনেক কষ্টে ছোটে, রোগা শরীরটাকে হেঁচড়ে নিয়ে চলে। ফুটপাথের ওপর রংচটা পুরোনো একটা কৌটো নিয়ে বসে থাকে। পথ চলতি মানুষের কাছে পয়সা চায়। কেউ দু-একটা পয়সা ছুঁড়ে দেয়, কেউ মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। সামনের চওড়া পীচের রাস্তা দিয়ে বিকট শব্দ করতে করতে অনবরত গাড়ি ছুটে যায়। দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ যখন ফুটপাত জুড়ে বসে, তখন ভুতো তার বাসায় ফেরে। তেঁতুল গাছের তলায় পাথরের ওপরে গুটি শুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ে। মাথার ওপরে ডালপালা হাওয়ায় দোলে, পাতাগুলো নেচে নেচে ঝিরঝির শব্দ তোলে।
পুবের আকাশ ফর্সা হবার আগেই রোজ ঘুম ভেঙে যায় টিয়ার। তখনও পাতার ফাঁকে ফাঁকে গাছের কোটরে পাখিরা সব ঘুমিয়ে থাকে। টিয়া ভুতোর মাথার ওপরের ডালটাতে এসে বসে। ধীরে ধীরে শিস্ দিয়ে ডাকতে সুরু করে। ভুতোও সঙ্গে সঙ্গে চোখ রগড়ে উঠে বসে। টিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসে, সরু গলায় সুর করে ডাকে “টিটি, টিটি, টিটি, টিটি।” কৌটো থেকে বের করে বিস্কুট, পাঁউরুটি, মুড়ি। নিজে খানিক খায় আর খানিক পাথরের ওপর ছড়িয়ে দেয়। টিয়া ঝুপ করে নেমে আসে, খুঁটে খুঁটে খাবার খায়। খেতে খেতে দুজনে মাথা নেড়ে, লেজ নাচিয়ে গল্প করে।
গাড়িগুলো জেগে ওঠার আগেই, ভুতো তার কৌটোখানা বুকে চেপে একপায়ে শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে ওপারের ফুটপাথে টিউবওয়েলের কাছে পৌঁছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে উড়তে থাকে টিয়া, শিস্ দিয়ে বলতে থাকে ‘খুব সাবধান ভুতো, গাড়িগুলো জেগে উঠলে রক্ষে নেই।’ কলের ধারে তখন মানুষ থাকে না। ভুতো তার কৌটোয় জল ভরে নেয়। ভুতোকে এপারের ফুটপাথে ফিরিয়ে এনে তবে টিয়ার ছুটি। তারপর সে উড়ে যায় তার সঙ্গীদের কাছে। ডানা ভাসিয়ে দেয় ভোরের আকাশে।
আবার রাত যখন নিঝুম হয়ে আসে, পথ ঘাট শুনশান গাড়িগুলো সারাদিন ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে যায়, সব পাখিরা তাদের কোটরে ঘুমে অচেতন, টিয়া শুধু জেগে থাকে। তেঁতুল পাতায় হেলান দিয়ে সে চুপটি করে বসে থাকে। ভুতো তখনও ফেরে না। ভাল পা খানা ছড়িয়ে রেলিঙে হেলান দিয়ে নির্জন ফুটপাথে বসে ঘুমে ঢুলতে থাকে। রাস্তার ওপারে ঝন্টুদার চা, বিস্কুট, পাঁউরুটির দোকান। সারাদিনের বেচাকেনা শেষ করে, দোকানে বড়ো বড়ো দুটো তালা লাগিয়ে, হাতে পলিথিনের ঠোঙা দোলাতে দোলাতে ঝন্টুদা এপারে আসে। ভুতোর কোলের ওপর ঠোঙাটা ফেলে হন হন করে হেঁটে চলে যায়। একবারও পেছন ফিরে তাকায় না। ভুতো ঠোঙাটা কৌটোয় ভরে রেলিং ধরে উঠে দাঁড়ায়। খোঁড়া পা টেনে টেনে তেঁতুলতলায় পাথরের ওপরে এসে বসে, অমনি টিয়া সাড়া দেয়—“আমি জেগে আছি ভুতো, এবার তুই ঘুমো।” ভুতোও ঘুম ঘুম চোখে হাত নাড়ে, ‘টিটি, তুইও এবার ঘুমিয়ে পড়’। রাত থম থম করে আর চাঁদের গা বেয়ে আলো ঠিকরে পড়ে।
প্রতি বছর পাখিরা দল বেঁধে উড়ে যায় এক স্বপ্নের দেশে। নীল আকাশ যেখানে সবুজ দিগন্ত ছুঁয়ে থাকে, তার কোলে টলটলে এক মস্ত দিঘি। দিঘির বুকে নীল আকাশের ছায়া, পদ্ম শালুকের মেলা। গোল গোল বড়ো বড়ো পাতার ওপরে পাখিরা এসে বসে, ঢেউয়ের দোলায় দোলে।
দিঘির ধারের সবুজ বন থেকে শনশন করে ছুটে আসে হাওয়া। টুপ টুপ করে শিশির পড়ে। পাখিরা সেই শিশিরের জলে তাদের ডানা ধুয়ে নেয়। আকাশজোড়া রামধনুর রং মেখে নেয় তাদের পালকে। খুশিতে গান গেয়ে ওঠে। সারাদিন কলরব করে দেশ-বিদেশের গল্প শোনায়। সে হল পাখিদের এক স্বর্গ রাজ্য।
দলে দলে পাখিরা যাবার বেলায় গাছে গাছে ডাক দিয়ে যায়। চোখফোটার দিন থেকে টিয়া সে ডাক শুনে আসছে। তার বুকের ভেতরটা আনচান করে। ভোরের ঝিরঝিরে হাওয়ায় ডানা মেলে উড়ে যেতে ইচ্ছে করে অনেক অনেক দূরে, স্বপ্নের দেশে; নীল আকাশ যেখানে সবুজ মাটিতে মেশে, আর দিঘির জলে মেঘের ছায়া খেলা করে। সেখানে ধুলো নেই, ধোঁয়া নেই, নেই গাড়ির কানফাটানো শব্দ। মানুষের কর্কশ চিৎকার চেঁচামেচি কিছু নেই। এই ধুলো, ধোঁয়া আর কোলাহলে টিয়ার দম যেন আটকে আসে। তবু টিয়া কোথাও যেতে পারে না। পার্কের এই তেঁতুল গাছ ছেড়ে সে কী করে যাবে? ভুতোর যে কেউ নেই। তার একটা পা খোঁড়া, হাড়-জিরজিরে শরীরটা নিয়ে সে কোনোরকমে টেনে হিঁচড়ে চলে। ফুটপাথে কৌটো পেতে ভিক্ষে করে।
কিন্তু টিয়া আর পারছে না। তার শরীর শীর্ণ হয়ে গেছে, ডানার জোর কমে আসছে, পালকের রং বিবর্ণ। এই ধুলো ধোঁয়া আর বিকট শব্দ থেকে এবার সে পালিয়ে যাবে। উড়ে চলে যাবে পাখিদের দলে মিলে, ঝকঝকে নীল আকাশে, ফুরফুরে মুক্ত বাতাসে এবার সে তার ডানা দুটো ছড়িয়ে দেবে, শিশিরের জলে ধুয়ে নেবে তার পালক।
সেদিন, রাত তখনও শেষ হয়নি। শুকতারাটা পুব আকাশে জ্বলজ্বল করছে। টিয়া ঘুমের ঘোরে শুনতে পেল তার সঙ্গী, দূরযাত্রী পাখিদের ডাক। ডানার শন্ শন্ শব্দ। ধড়মড় করে উঠে বসে টিয়া দুবার ডানা ঝাপটায়। গাছের নীচে একবারটি তাকায়, চাঁদের ম্লান আলো এসে পড়েছে গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকা ভুতোর ছোট্ট ঘুমন্ত শরীরে। সেদিক থেকে টিয়া মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারপর ঝাঁপ দিয়ে পড়ে শূন্যে। রাত শেষের হিমেল হাওয়ায় সবুজ পাখা দুটো ছড়িয়ে দেয়। পাখির দলকে লক্ষ্য করে খুব তাড়াতাড়ি উড়ে যায় পুবদিকে। এতদিনে টিয়া পাড়ি দেয় তার স্বপ্নের রাজ্যে। বিশাল এই শহর ছাড়িয়ে, পাখিদের দলে মিশে, খাল, বিল, মাঠঘাট নদীনালা পেরিয়ে উড়ে চলা। …… এই বার পুবের আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে গেল। শুকতারাটাও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। হঠাৎ ভোরের বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের সঙ্গে যেন ভেসে এল সরুগলার তীক্ষ্ণ ডাক ‘টিটি, টিটি, টিটি। পালকে ঢাকা টিয়ার ছোট্ট বুকখানা কেঁপে উঠল। ডানা দুটো অবশ হয়ে এল। মাটির বুক থেকে সরু গলার ডাক উঠে আসছে, ভাসছে বাতাসে। সঙ্গী পাখিরা কত তাড়াতাড়ি উড়ে চলেছে, তাদের পেছন ফিরে তাকাবার সময় নেই। টিয়া তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তীক্ষ্ণ শিস্ দিয়ে উঠল ‘ভুতো আমি আসছি ……’। পার্কের কাছাকাছি এসে টিয়া অবাক হয়ে গেল আশ্চর্য এক দৃশ্য দেখে। ভুতোর টিনের রংচটা কৌটোটা ফুটপাথে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ছোটো ছোটো দুটি ছেলে ভুতোর হাত ধরে সাবধানে নিয়ে চলেছে। তারা তাকে পার্কের বড়ো অশ্বত্থ গাছটার তলায় এনে বসিয়ে দিল। ভোরের নরম আলোয় কত ছেলে-মেয়ে এসে জুটেছে। হাসছে, খেলছে, ঘাসের ওপর ডিগবাজি খাচ্ছে। ‘উদ্ভাসে’র মাসিমা বললেন ‘আর খেলা নয়, এবার পড়তে হবে। তোমাদের নতুন বন্ধু ‘ভূতনাথ’ আজ থেকে তোমাদের সঙ্গে পড়বে’। টিয়া অশ্বত্থের ডালে এসে বসল। ভুতো তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সবার চোখ এড়িয়ে হাতের বিস্কুট ভেঙে ঘাসের ওপর ছড়িয়ে দিল। মাসিমা সব ছেলে-মেয়েদের হাতে বিস্কুট দিয়ে বললেন, ‘ভূতনাথ কে জান? মহাদেব, শিব।’ সবাই ভুতোর দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। ভুতো তার লাজুক মুখখানা তুলে একবার টিয়াকে দেখে নিল। মাসিমা বললেন, ‘আজ থেকে ভূতনাথ লাল্টু, রতন আর মিলনের সঙ্গে থাকবে। ওদের সঙ্গে কাজ করবে, খাবে, ঘুমাবে আর রোজ উদ্ভাসে পড়তে আসবে।’ তারপর মাসিমা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা কালো বোর্ডের ওপরে বড়ো বড়ো করে লিখে দিলেন। ভুতো তার নতুন শ্লেটখানা বুকে আঁকড়ে, দুই আঙুলে পেন্সিল চেপে ধরে দেখে দেখে লিখতে শুরু করল ‘অ – আ……’। টিয়া তার ডানা ঝাপটে আনন্দে শিস্ দিয়ে উঠল, আর তার কোনো ভাবনা নেই। ভোর হবার আগেই সে পথ চিনে চিনে ঠিক পৌছে যাবে তার স্বপ্নের রাজ্যে। আর ফিরবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন