জয়ন্ত দে

‘আবির মারা গেছে!’
ফোনটা আসার পর, পড়ার ঘর থেকে প্রায় হতবাক অমিত্রসূদন বেরিয়ে এসেছিল। ডাইনিং স্পেসে শকুন্তলা তখন খাবার টেবিলে প্লেট রাখছিল। ওর চোখে পড়েছিল অমিত্রসূদনের এই উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসা। প্লেট মুছতে-মুছতেই বলল, ‘ওদিকে যাচ্ছ কোথায়, খেতে বসে যাও।’
অনেক সময় খেতে বসার আগে অমিত্রসূদন টিভি চালিয়ে দেয়, কোনও নিউজ চ্যানেল। খবর দেখতে দেখতে খাওয়া হয়ে যায়। শকুন্তলা তেমনটাই ভেবেছিল। কিন্তু অমিত্রসূদন কোনও উত্তর দেয়নি। আলতো হাতে সে আর্যর ঘরের দরজা ঠেলল।
আর্যনীল অদ্ভুতভাবে বিছানায় শুয়ে। সে ঘরে ঢুকতেও তাকাল না। ওর দৃষ্টি সিলিংয়ের দিকে। অমিত্রসূদন বলল, ‘আজ কোথায় গিয়েছিলি?’
আর্য জড়ানো গলায় বলল, ‘কেন? মা তো জানে, শ্রীর বার্থডে ছিল। আমি অনেকক্ষণ চলে এসেছি।’
অমিত্রসূদন কিছু বলার আগেই শকুন্তলা ডাকল, ‘আর্য খেতে আয়।’
অমিত্রসূদন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত। সে কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। আর্য বলল, ‘আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। না খেলে হয় না? আমি শুয়ে পড়তাম।’
অমিত্রসূদন দেখল আর্য শুয়ে, বারান্দার দিকের দরজা বন্ধ, জানলাটাও বন্ধ। সারাঘর যেন দমবন্ধ করে আছে। না কি ফোনটা পাওয়ার পর তারই এমন মনে হচ্ছে! সে আর্যর দিকে তাকাল, এখন কি খবরটা দেবে? এই খবরটা দিলে আজ রাতে আর কারও খাওয়া হবে না। সত্যিই তার দম বন্ধ লাগছে। কী করবে সে?
‘মা ডাকছে, খেয়ে নে।’
‘সত্যি আমার শরীরটা খুব খারাপ।’ আর্যনীল কোনওরকমে বিছানা থেকে উঠল। খুব কষ্ট করে যেন বিছানা থেকে নামল। প্রবল এক অনিচ্ছা নিয়ে খাবার টেবিলে এসে বসল। অন্যদিন খেতে অনিচ্ছা থাকলে, ওকে পাঁচবার ডাকার পর উত্তর দেয়। আর পঁচিশবার ডাকার পর খাবার টেবিলে আসে। কিন্তু আজ প্রবল অনিচ্ছা নিয়েও ও খাবার টেবিলে এসে বসল। ওর চোখ দুটো কেমন যেন লাল হয়ে আছে।
‘বসে পড়লি যে বড়, হাত ধুলি না?’ শকুন্তলা বলল।
‘আমি খাব না। আমার কেমন বমি বমি পাচ্ছে।’
‘ন্যাকামি করিস না। আগে খা, তারপর বমি করলে করবি।’
‘প্লিস মা!’
‘কেন কত কী ভালো মন্দ খেয়েছিস—যে এখনও তা পেটে আছে?’
আর্যনীল টেবিলের ওপর দুটো হাত রেখে হাতের তালুর উপরে মাথা রেখে বসল। অমিত্রসূদন কিন্তু খাবার টেবিলে ধারে কাছেও এল না। সোফায় গিয়ে বসল।
‘তোমার আবার কী হল? বসে পড়লে কেন, খেতে এসো।’
অমিত্রসূদন একবার বলার চেষ্টা করল, খাব না। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল, সোজা এসে বসল খাবার টেবিলে। শকুন্তলা খাবার দিল। দুটো রুটি কোনওরকমে খেল অমিত্রসূদন। কিছুটা জোর করেই। ওর মনে পড়ে যাচ্ছিল, একবার তিনজন বন্ধুকে নিয়ে সন্ধেবেলা গিয়েছিল মামার বাড়ি। অজপাড়াগাঁয়ে তার মামারবাড়ি। সে সময় হারিকেন, কুপির আলোই ভরসা। দিদিমা ওদের চারজনকে খেতে দিয়েছিল। খুব সামান্য আয়োজন। ভাত, ডাল, আলুভাতে আর ডিমের ঝোল। অসীম ভাত ডাল আলুভাতে খেয়ে, ডিমের ঝোল ঢালল পাতে। তারপর কী যেন একটা বলে পাত থেকে কিছু একটা নিয়ে সোজা চালান করে দিল থালার নীচে। অন্য কেউ দেখেনি, কেবল অমিত্রসূদন খেয়াল করেছিল, অসীমের থালার একদিক উঁচু হয়ে আছে। পরেরদিন অসীম অমিত্রসূদনকে বলেছিল, ‘ডিমের ঝোলে এত্ত বড় একটা ফড়িং ছিল। গোটা। আমি যদি বলতাম, সবার খাওয়া নষ্ট হত। ওই বুড়ি মানুষ, রাতের বেলায় আবার রান্না করতে বসত। টিকটিকি হলে বলতাম। ফড়িং তো! থালার নীচে চালান করে খেয়েই নিলাম। বমি আসছিল, কিন্তু পারলাম—।’
অমিত্রসূদনও আজ খেতে পারল। খুব শান্তভাবে। কেউ কি বুঝতে পারছে তার খাবারের থালার নীচে ভয়ঙ্কর একটা কষ্ট চাপা পড়ে আছে? কষ্টে থালার একদিক উঁচু হয়ে আছে! অমিত্রসূদনের মনে হচ্ছিল, আজ শুধু তার থালা উঁচু নয়, হয়তো আর্যনীলের থালাও চাপা দেওয়া কষ্টে একদিক উঁচু হয়ে আছে। যা তারা কেউ দেখতে পাচ্ছে না।
আর্যনীল দেড়-দু’খানা রুটি খেল, সত্যি বলতে খেল না, গিলল। তারপর কিছুক্ষণ খাবার নিয়ে নেড়েচেড়ে উঠে গেল। ও উঠে যেতেই শকুন্তলা কিছু বলতে যাচ্ছিল, অমিত্রসূদন হাত তুলে বারণ করল।
অন্যসময় হলে হয়তো অমিত্রসূদনের ‘এই বারণ’ শুনত না শকুন্তলা। আর্যর ব্যাপারে শকুন্তলার মতামতই প্রাধান্য পায়। কিন্তু আজ যে কোনও কারণেই হোক চুপ করে গেল। হয়তো অমিত্রসূদনের মুখের ভাব ওকে থামিয়ে দিল।
তিনজনের খাওয়া শেষ। শকুন্তলা রান্নাঘরে। অমিত্রসূদন আবার এসে দাঁড়াল আর্যনীলের ঘরে।
আর্যনীল বিছানায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে।
অমিত্রসূদন ঘরে ঢুকে খুব শান্তভাবে বলল, ‘কাল আমাদের দুপুর তিনটের সময় থানায় যেতে হবে।’
‘থানায়, কেন?’
‘তোর এক বন্ধু মারা গেছে।’
‘কী? আবির মারা গেছে?’
বিস্ফারিত চোখে আর্যনীল তাকিয়েছিল। ওর দৃষ্টি ফ্যাকাসে। চোখের পাতা যেন পড়ছে না, থমকে গেছে। ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে অমিত্রসূদন, কখন এসে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছে শকুন্তলা। ‘কে মারা গেছে?’
‘আর্যর বন্ধু—আবির!’
‘আবির, মানে?’ শকুন্তলা আঁতকে উঠে বলল, ‘কী হয়েছে? অ্যাক্সিডেন্ট? হ্যাঁ রে, ও তো আজই সকালে আমার ফোনে তোকে ফোন করেছিল!’
আর্যনীল রক্তশূন্য মুখে তাকিয়ে আছে। আবার ও বিড়বিড় করল, ‘বাবি, তুমি ঠিক শুনেছ?’
‘হ্যাঁ, একটু আগে আমাকে থানা থেকে ফোন করেছিল। পুলিশই বলল।’
‘কখন?’ শকুন্তলা গলা ফেটে যাচ্ছে উদ্বেগে।
‘খেতে বসার আগে।’
‘তোমাকে কেন? ওরা তোমার নম্বর পেল কোথা থেকে?’ ফ্যাসফেসে গলায় শকুন্তলা বলল।
‘ওরা আর্যর নম্বরে ফোন করেছিল, পায়নি। ওর স্কুল থেকে আমার নম্বর পেয়েছে।’
‘স্কুল থেকে—!’ আর্য বিড়বিড় করল।
‘কী হয়েছিল আবিরের—।’ শকুন্তলা কান্না চেপে ধরা গলায় আবারও জিজ্ঞাসা করল। ‘সকালেই তো ফোন করেছিল তোকে—।’
আর্যনীল কাঠ হয়ে বসে।
অমিত্রসূদন বলল, ‘টিভিতে দেখাচ্ছে—। দাঁড়াও, আমি অফিসে ফোন করছি, কী যে হয়েছে সেটা আমাদের পুলিশ রিপোর্টার রাজীব বলতে পারবে। আমি ওর কাছ থেকে জানছি।’
শকুন্তলা বলল, ‘তোদের সঙ্গে তো ও যেতে চাইছিল—’
আর্যনীল বিড়বিড় করল, ‘বাবি, তোমাকে কী বলল—আবির মারা গেছে, আবির!’
‘কাল তোকে থানায় যেতে হবে।’
‘ওকে কেন থানায় যেতে হবে—?’ চাপা গলায় শকুন্তলা বলল।
‘জানি না। নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক মৃত্যু, তাই।’
‘ও কি সুইসাইড করেছে? তার জন্য ওকে কেন থানায় যেতে হবে? তুমি কিছু বললে না—’ শকুন্তলা আবার বলল।
‘আমি জানতে চেয়েছিলাম, বলল, আপনার ছেলে সব জানে, ওর কাছ থেকে জেনে নিন—।’
‘আর্য জানে?’ আঁতকে উঠল শকুন্তলা। ‘আর্য তো সন্ধেবেলা ফিরেছে, কই আমাকে কিছু তো বলেনি—! ও জানে আবির মারা গেছে—?’
আর্য পাথর হয়ে বসে। ওর দু’চোখ ভরা জল।
শকুন্তলা আবারও বলল, ‘কী হয়েছে—? তুই তো কিছুই আমাকে বলিসনি?’
আর্য বোবা চোখে অদ্ভুতভাবে থাকিয়ে থাকে।
অমিত্রসূদন বলল, ‘কী হয়েছিল, তুই ঘটনা ঘটার সময়ে ছিলি?’
আর্য জড়ানো গলায় বলল, ‘ও পড়ে গিয়েছিল। আমি ওকে ধরে বসেছিলাম।’
‘তোর টি-শার্ট প্যান্ট কোথায়?’ শকুন্তলা চাপা গলায় বলে।
আর্য শান্ত গলায় বলে, ‘টি-শার্টে ব্লাড লেগেছিল। আমি ধুয়েছিলাম, তেমন পরিষ্কার হয়নি। টি-শার্ট আর প্যান্ট ওয়াশিং মেশিনে ঢুকিয়ে দিয়েছি।’
শকুন্তলা চট করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ওর চোখ মুখ দিয়ে আগুন ছুটছে। ফিরে আসে দু’হাতে টি-শার্ট আর প্যান্ট নিয়ে। ‘এই তো রক্ত! রক্তের দাগ ধরে আছে। ও যখন এসেছে তখন আমি ঘরে ছিলাম, এমন শয়তান ছেলে, দরজা খুলে দিতেই সাঁ করে বাথরুমে ঢুকে গেল। আমি ভাবলাম টয়লেটে যাবে। ও তখন এই রক্তের জামা কাপড় লুকাতে গিয়েছিল। ও কখন বাথরুম থেকে বেরিয়েছে তা আর আমি দেখিনি। আমি ঘরে ছিলাম, দরজাও খুললাম; ও কত বড় ধাপ্পাবাজ হয়েছে, আমাকে ধাপ্পা দিয়ে বেরিয়ে গেল।’
আর্য ভয় পাওয়া গলায় বলল, ‘আমি ভয় পাচ্ছিলাম, টি-শার্টে প্যান্টে ব্লাড লেগে। তুমি তো বকবে, চিৎকার করবে, ভাববে আমি মারপিট করে এসেছি।’
‘যাই ভাবি ভাবব, এত বড় ঘটনা তুই আমাকে লুকাবি কেন?’
অমিত্রসূদন খুব শান্ত গলায় বলল, ‘ঠিক আছে। ওর সঙ্গে পরে কথা বলবে। আমি আগে অফিসে ফোন করে খবর নিই।’
ওর মাথা ক্রমশ ঠান্ডা হচ্ছিল। এখন সবার আগে তার কী করা উচিত? অফিসে কি ফোন করবে? পুলিশ রিপোর্টার রাজীবকে ফোন করে সব জানবে—? কী করবে? কী করা উচিত?
এখন আর্যর কাছে কোনও কিছু না জানতে চাওয়াই ভালো। আগে পুলিশ কী বলছে—সেটা শুনে নেওয়া প্রয়োজন। তারপর অন্য কথা—
অমিত্রসূদন ফোন করল রাজীবকে।
‘হ্যাঁ দাদা বলো।’
‘রাজীব, একটা বাচ্চা ছেলে মারা গেছে—এমন কোনও ঘটনা পেয়েছ?’
‘পেয়েছ কি দাদা, মারাত্মক খবর! ওটাই লিড হচ্ছে। কাল সব কাগজে ওটাই মেন স্টোরি।’
‘কী হয়েছে ভাই?’
‘আরে দাদা টিভি খুলে দেখো একবার—সবক’টা মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়েছে—।’
‘আমাদের বাড়ির টিভিটা আজ থেকেই খারাপ হয়েছে—।’ অমিত্রসূদনের বুক কাঁপছে।
‘আর্টিস্ট সৌরীন মুখার্জির মেয়ের বার্থ ডে পার্টি ছিল, সে উপলক্ষ্যে সব বড়লোক বাপের লাডলারা জড়ো হয়ে একটা মাল্টিস্টোরিডের বেসমেন্টে মাল খেয়ে বাওয়ালি করছিল—। সেখানেই বচসা, বোতল ভাঙাভাঙি, মারপিট, একটা ছেলে মারা গেছে।’
‘মারপিট করেছে?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ড্রিঙ্ক করে এসব করেছে।’
‘কী বলছ তুমি?’
‘হ্যাঁ, মদের বোতল ভেঙে পেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে। বিকেলের কেস, ছ’টা নাগাদ। ছেলেটাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল, হেভি ব্লিডিং হয়েছে। ডেড। ছেলেমেয়েগুলো সব আন্ডার এইটটিন। নাবালক।’
‘রাজীব, কী হবে রাজীব?’
‘মিডিয়া খোরাক পেয়ে গেছে দাদা। ছেলে-মেয়ে-মদ-খুন সব আছে—পাবলিক টিভির সামনে বসে পড়েছে, কাল সকালে থেকে কাগজের ওপর হুমড়ি খাবে।’
‘রাজীব ওরা সবাই বাচ্চা ছেলে মেয়ে!’
‘বাচ্চা নয় দাদা, চৌবাচ্চা! সব মাল খেয়ে হল্লা করছিল। এই ক্লাব, ওই ক্লাব করে সব ঘুরেছে, অ্যাবসিলিউট ভদকা গিলেছে। প্রায় দু’হাজার টাকার ওপর দাম। তারপর এই ঘটনা—। আরে দাদা, তুমি চ্যানেলগুলো দেখো, কী সব গপ্প ফেঁদেছে—পাল্লা দিতে হবে তো না কি!’
‘রাখি রাজীব। তোমাকে আমার দরকার পড়তে পারে। তেমন হলে ফোন করব।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, করো দাদা কোনও চাপ নেই।’
‘আচ্ছা রাজীব, তুমি খুন বলছ?’
‘আমি কি আর বলছি দাদা? পুলিশ বলছে। ড্রিঙ্ক করেছে সবগুলো। সেখানেই বচসা। তারপর রক্তারক্তি। খুন কিন্তু প্রাথমিকভাবে পুলিশসূত্রের খবর। বড়জোর একটা কোয়েশ্চেন মার্ক লাগানো হবে—। চ্যানেলগুলো ওভাবেই সাজাচ্ছে। আর সেই খুনের তত্ত্বই কিন্তু এসেছে দাদা, একটা ছেলেকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে—সাসপেক্টেড!’
‘কী বলছ তুমি?’
‘দাদা, আমাকে একটু লালবাজারের আপডেট নিতে হবে, রাখি। পরে করছি।’
ফোনটা ছেড়ে অমিত্রসূদন জানলার ধারে এসে ধপ করে বসে পড়ল।
মদ! বচসা! মারপিট! খুন! আর্য ওখানে ছিল! আর্য এসব তো কিছুই বলছে না!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন