চোদ্দো

জয়ন্ত দে

আজও গাড়িতে উঠেই আর্য ঘুমিয়ে পড়ল...।

‘আজ আমাদের বন্ধুদের সবাইকে পুলিশ একসঙ্গে বসতে দিল। রবিবার গড়িয়াহাট থানায় দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল। কালও দেখা হয়েছে, কিন্তু কথা হওয়ার উপায় নেই। যে যার মতো আসছি, তারপর আলাদা আলাদা ঘরে চলে যাচ্ছি। আজ আবার আমরা আটজন একসঙ্গে। প্রথমে সবাই চুপচাপ। তারপর কে কীভাবে এসেছে বলতে শুরু করলাম।

আমাদের মধ্যে রোহিত চুপচাপ, ওকে লালবাজারের গেট নয়, বাড়ির সামনেও ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। ওর বাড়ির সামনে টিভি ক্যামেরাম্যান, স্টিল ফোটোগ্রাফাররা মাচা বেঁধে বসে আছে। ওদের বাড়ির সামনে চায়ের দোকানের সেল বেড়ে গেছে। এ রাস্তায় যে ঢুকছে সে-ই ওদের বাড়িটার দিকে একবার তাকাচ্ছে। দু’জন সিকিউরিটি গার্ড, একজন বাউন্সার। দরজা জানলা বন্ধ। আজ রোহিতের বাবা আলাদা এসেছে। রোহিত এসেছে পুলিশ জিপে। কেউ ওকে দেখতে পায়নি। কিন্তু কতদিন এইভাবে সবাই লুকিয়ে আসব? কী করেছি আমরা?’

আর্যর ভেতর ভেতর অভিমান জমছে। অভিমান জমলে বেশি বেশি ঘুম পায় কি? কে জানে।

ড্রাইভার ছেলেটা বলল, ‘এদিককার পার্কিংগুলো বহুত ফালতু। আটটার সময় পার্কিং-এর ছেলেটা ডিউটি শেষ করে চলে গেছে। বলছে আমাদের গাড়ি নাকি বারোটার সময় লাগিয়েছি। আমাকে চমকে তিন ঘণ্টার ষাট টাকা বেশি নিল।’

‘তুমি তো লালবাজারের সামনে আমাকে ছাড়লে পৌনে তিনটের সময়। তাহলে ওখানে বারোটা লিখে রাখল কী করে, চালাকি!’ শকুন্তলা বলল।

অমিত্রসূদন বলল, ‘ঠিক আছে। চলুন সব হিসেব করে দিয়ে দেব।’

‘এরা এরকম বউদি, খুব ঝামেলাবাজ! সব অবাঙালি—।’

‘ঠিক আছে।’ অমিত্রসূদন কথা থামানোর জন্য একটু জোরেই কথাটা বলল।

আজ অমিত্রসূদন ওদের সঙ্গে আসেনি। আজ অফিস গিয়েছিল। আর্য আর শকুন্তলা গাড়িতে এসেছে। অমিত্রসূদন ঠিক করে দিয়েছিল, শকুন্তলা লালবাজারের গেটের সামনেই নামবে। একটু আগে নেমে যাবে আর্য। তারপর প্রথম দিনের মতো ইনকোয়ারির গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকবে। অমিত্রসূদন ওকে বুঝিয়েছিল খুব শান্ত হয়ে যাবি, আর পিছন ফিরে তাকাবি না। আর্যর কোনও অসুবিধে হয়নি। কিন্তু থিতিয়ে গিয়েছিল শকুন্তলা, সে ঠিক কোনদিক দিয়ে ঢুকবে বুঝতে পারছিল না। সরাসরি মেন গেট দিয়ে ঢুকেছিল। তেমন করে কেউ বুঝতে পারেনি।

সকালবেলা দশটা নাগাদ আর্যদের তিনটে বন্ধু একসঙ্গে লালবাজারে আসছিল। রিপোর্টাররা নাকি ওদের ঘিরে ফেলেছিল। ফোটোগ্রাফাররা ওদের ছবি তুলেছে। ওদের ছবি দেখাচ্ছে টিভিতে। শুধু মুখের কাছে ঘষা ঘষা মতো, নাবালক বলে মুখ দেখাচ্ছে না। আইন বাঁচাচ্ছে। কিন্তু খবরের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকটি বলে চলেছে, ‘গল্পে মজায় তিন নাবালিকা কন্যে, টিনএজার গার্ল লালবাজারের পথে। ওদের একজন বন্ধু মারা গেছে— অথচ এদের দেখুন। এদের দেখে কে বলবে এরা একটা নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী! হয়তো এরা সব জানে প্ল্যান কী? কেন খুন হল আবির? কে খুন করল? জাস্টিস ফর আবির!’

অমিত্রসূদন অফিসে গিয়ে সরাসরি মালিকের সঙ্গে দেখা করল। স্পষ্ট করে বলে দিল, ‘আমি অফিসে ক’দিন একটু অনিয়মিত হব। আসা যাওয়ার সময় ঠিক থাকবে না। যদি বলেন তো দিন সাতেকের ছুটি নিয়ে নিচ্ছি।’

পুরো বিষয়টাই তারা অমিত্রসূদনের ওপর ছেড়ে দিল। যা ভালো বুঝবেন করবেন।

অমিত্রসূদন এ-ও শুনল, মালিকপক্ষ নাকি মৌখিকভাবে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে—বিষয়টি নিয়ে কেউ কোনও কথা ওঁকে জিজ্ঞাসা করে বিব্রত করবেন না। ব্যক্তিগতভাবে কেউ কথা বলতেই পারেন, কিন্তু খবরের সোর্স হিসেবে যেন তাঁর কাছ থেকে কোনওকিছু জানতে চাওয়া না হয়।

কথাটা শুনে অমিত্রসূদন নিজেকে স্থির করল। খুব স্বাভাবিক থাকতে হবে। সে একা। এ লড়াই তার একার। ভেবেছিল ক’দিন ছুটি নেবে। এখন ঠিক করল অফিস করবে, যতটা পারবে।

আজ তিনটের সময় আর্যদের লালবাজার যাওয়ার কথা। অমিত্রসূদন চলে এসেছিল পৌনে তিনটে নাগাদ। ওর পর পরই আর্য আর শকুন্তলা ঢুকল। আর্য ওকে দেখে হাসল, আর্যর হাসির মধ্যে এখনও কিছু সরলতা অবশিষ্ট আছে। ‘বাবি তুমি কখন এসেছ?’

‘এই এখুনি।’

‘আমার কোনও অসুবিধে হয়নি—ঠিক ঢুকে গেছি।’ অমিত্রসূদনের মনে হল, আর্যর গলায় টেনশন ছাপিয়ে একটা খেলার আভাস। ‘ধুস, এরা সব ফালতু—আমি ওদের চোখের সামনে দিয়ে নেক্সট ডে তে ঢুকব, ওরা কিচ্ছু বুঝতে পারবে না।’

অমিত্রসূদনের মনে হল, আর্য এটা তাকে বলল।

আর্যনীল দাশগুপ্তের আগাগোড়াই তার বাবা অমিত্রসূদন দাশগুপ্তের চাকরিজীবনের সঙ্গে টক্কর দেয়। আজও দিচ্ছে।

কারণটা অদ্ভুত—

অনেকদিন আগের কথা অফিসের এক বার্ষিক অনুষ্ঠানে আর্য গিয়েছিল ওর মায়ের সঙ্গে। সেখানে অমিত্রসূদনের এক বুদ্ধিজীবী সহকর্মী এগিয়ে এসে আর্যনীলের হাত ধরে আদর করে। তারপর গলগলে গলায় বলে, ‘কী রে তুই তো তোর বাবার মতো দেখতে হোসনি! মায়ের মুখটা পেলেও হতো, তাও পাসনি। মায়ের গায়ের রংটা পেয়েছিস। একটু বেশিই পেয়েছিস— পুরো কাকের বাচ্চা!’

অমিত্রসূদন কিছু বলার আগেই জবাব দিয়ে দেয় আর্য, হাতের সিঙারাটা সপাটে ছুড়ে মারে অমিত্রসূদনের সেই সহকর্মীর গায়ে। তারপর চোখ মুখ ফাটা গনগনে রাগ নিয়ে চলে যায় শকুন্তলার কাছে। চিৎকার করে, ‘আমি বাড়ি যাব, বাড়ি চলো, এটা বাজে জায়গা।’

বাড়ি ফেরার সময় আর্য খুব কেঁদেছিল। সেদিন থেকেই এই বাড়িতে দুটো দল, একটা আর্যনীল-শকুন্তলার, আর একটি অমিত্রসূদনের। এই ফাটল অমিত্রসূদন দীর্ঘ চেষ্টাতেও মেটাতে পারেনি, সময় সুযোগ হলেই চড়চড় করে বেরিয়ে পড়ে। এই এখন যেমন, আর্য লালবাজারের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিককুলকে তুচ্ছ করল। তাচ্ছিল্যের হাসি ওর মুখে।

আর্য বলে, ‘বাবি লালুপ্রসাদ যাদব নাকি জার্নালিস্টদের বলে যে দুধ দোয়াতে পারবে তাকে ইন্টারভিউ দেব। তার কথা শুনে জার্নালিস্টরা নাকি গোরুর লাথি খেতে খেতে দুধ দোয়ায়!’

আর্য বলে, ‘বাবি শুনেছ—? মিলিন্দ সুমন এক প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের বলেছে—যে এখানে দশটা পুশআপ দেবে, তাকে ইন্টারভিউ দেবে। ব্যস, সেই কথা শুনে সব সাংবাদিকরা নাকি পুশআপ দিতে শুরু করেছিল। ভাবা যায়!’

অমিত্রসূদন জানে, আর্য খুঁজে খুঁজে এইসব কথাগুলো সংগ্রহ করে এনে তাকে বলে।

আর্যর এই মূর্খামি ক্ষমার চোখে দেখে অমিত্রসূদন। কী জানে ও সারা পৃথিবী জুড়ে সাংবাদিকদের কাজকর্ম সম্পর্কে। সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে খবর সংগ্রহের ইতিহাস জুড়ে আছে। সাংবাদিকতা শুধুমাত্র একটা কাজ নয়, প্রফেশন নয়, একটি ব্রত। এই ব্রত যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, তাঁরা ভয় পান না। তাঁদের ওপর মাঝেমাঝেই কী তীব্র, কী ভয়ঙ্কর আঘাত আসে, তার খবর ক’জন রাখে? প্রতি বছর কতজন সাংবাদিক খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে মারা যান, কতজনকে খুন করা হয়, তার খোঁজ কেউ রাখে না। বিরুদ্ধ খবর করার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতাবান ব্যক্তি কত সাংবাদিকের জীবন দুর্বিষহ করে দেয় তা কেউ জানে না। আর্য তো নাদান!

টিফিন করতে বেরিয়ে আর্য থমথমে মুখে বলল, ‘ঝিলম, নেহা আর শ্রুতিকে নাকি আজ গেটের সামনে মিডিয়া ঘিরে ধরেছিল। ওরা বোকার মতো একসঙ্গে আসছিল। ঝিলম খুব কাঁদছিল, নেহার নার্ভ ব্রেক ডাউন করেছে—ও আজ কিছুই লিখতে পারেনি। সব প্রশ্নের উত্তরে সাদা খাতা জমা দিয়েছে। ওর না কি সব ঠিক ঠিক মনে পড়ছে না। বাবি এটা ঠিক হচ্ছে না—। ওরা আমাদের নিয়ে বিজনেস করছে।’

‘ওরা খবর করছে, আরও দু-একদিন এমন চলবে, তার মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।’

‘মিডিয়ার কাজ সত্যি কথা বলা—। সত্যমেব জয়তে টয়তে কীসব জ্ঞানের কথা লেখা থাকে না!’ আর্য ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে।

অমিত্রসূদন আজ বাড়ি ফিরে গ্রুপের সব ছেলেমেয়েকে জানিয়ে দিল, সে এই ক’দিন অনিয়মিত হয়ে পড়বে, আর কেন অনিয়মিত হয়ে পড়বে সেটাও জানাল। তারা বলল, ‘যদি কোনও সাহায্য লাগে—।’ অমিত্রসূদন হাসল। ‘না, কোনও সাহায্য লাগবে না। সময়ই সাহায্য করবে—।’

রাতে ফোন করল অবিনাশ। প্রথম দু’বার অমিত্রসূদন ধরেনি। কিন্তু তৃতীয়বারে ফোনটা ধরল।

‘শোন না, তোর সঙ্গে আমার একটু কথা ছিল।’

‘বল।’

‘খুব ঠান্ডা মাথায় কথাটা শুনবি। ডিসিশন তোর।’

‘সে তো সব সময়ই।’

‘দেখ, চারদিকে লোকে খুব খারাপ খারাপ কথা বলছে। প্রথমেই একটা তত্ত্ব উঠছে সেটা প্রভাবশালী। দেখ, এটা সাধারণ মানুষ বলতেই পারে, বা ভাবতেই পারে, সত্যি সত্যি সেদিনের ঘটনায় যারা জড়িত তারা কেউই সাধারণ ঘরের ছেলে মেয়ে নয়। সাধারণ ঘরের সতেরো বছরের ছেলেমেয়েরা মদ খায় না, বা পার্টি করে না, ক্লাবে ক্লাবে ঘোরে না। এটা তো মানিস?’

‘তোকে কি আমি তোর প্রশ্নের উত্তর এখনই দেব?’

‘না, বল—’

‘আমি ক্লাস টেনে উঠে সরস্বতী পুজোর রাতে মদ খেয়েছিলাম। দুর্গাপুজোর নবমীতে বিয়ার খেয়েছিলাম। আমাদের ছেলেমেয়েদের থেকে আমি অন্তত খুব সাধারণ ঘরের সন্তান ছিলাম। আর সেটা আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে। তোর একটা কথা আমার মনে পড়ছে—ক্লাস ইলেভেনে তুই মাসতুতো বউদির সঙ্গে—’

অবিনাশ হাসল।

‘শালা তোর মনে আছে? কোন আদ্যিকালের কথা। শোন না, আমরা যে যুক্তিই দিই, তা কিন্তু ধোপে টিকবে না। নাবালক একদল ছেলেমেয়ে মদ খেয়েছে, তাদের মধ্যেই একজনের সন্দেহজনক ভাবে মারা গেছে। ডেথ! তুই তো জানিস মিডিয়া ট্রায়াল কী মারাত্মক জিনিস। আজ ফোর্থ ডে। মিডিয়া ট্রায়াল কিন্তু এখনও পিকে ওঠেনি। দু-একদিনের মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর জায়গায় নিয়ে যাবে। আমি বলছি, তার আগেই সবার মুখ বন্ধ করতে হবে। পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিতে হবে।’

অবিনাশ থামে। আলতো গলায় বলে—

‘আমার মনে হয়, তোদের মধ্যে যে ভালো কথা বলতে পারে, এমন কোনও বাবা বা মায়ের চ্যানেলে বসা দরকার। পালটা যুক্তি দিতে হবে। সবাইকে জানাতে হবে, সেখানে সত্যি সত্যি কী হয়েছিল—ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে যা শুনেছিস তাই জানাবি।’

অবিনাশ আবার থামে। দীর্ঘ বিরতি। বলে,

‘আমার তো মনে হয় তোরই এই গুরু দায়িত্ব নেওয়া উচিত। অন্য কেউ বসলে ঘাবড়ে যাবে। তোর এসব ভয় নেই। আর তোর মতো সাজিয়ে গুজিয়ে কথা কে বলতে পারবে? পুরো হাওয়াটা নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে হবে। শোন, আমি জানি, তোদের অফিসের নিষেধ আছে কোনও চ্যানেলে বসা। কিন্তু এটা তোর একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, কেউ আপত্তি করবে না। এ ব্যাপারে আমি রাজীবের সঙ্গে কথা বলছিলাম। ও বলল, “দাদার পিছনে আমাদের কাগজের মালিক আছেন। দাদার কোনও অসুবিধে হবে না।” আত্মপক্ষ সমর্থন না করলে, বিনা দোষে—’

‘তুই আর কিছু বলবি?’

‘হ্যাঁ বলব, তোর ছেলেদের কোনও এক বন্ধু ওদেরই এগনেস্টে চ্যানেলে আসবে। আমার মনে হয়, তোদের কোনও প্রতিনিধি পাঠানো উচিত। নইলে ওরা ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে যাবে।’

‘কারা ফাঁকা মাঠে গোল দিচ্ছে অবিনাশ? পাবলিক?’

‘আমি পাবলিকের কথা বলছি না। আমি আবিরের বাড়ির লোকের কথা বলছি। ওদের পরিবার।’

‘ওরা কী করছে?’

‘জাস্টিস ফর আবির—জাস্টিস ফর আবির করে একটা মুভমেন্ট তৈরি করছে—। সরকার এবার নড়ে বসতে বাধ্য হবে। তুই কি জানিস, কাল শহরের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মহিলা আবিরের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। কী ঘোঁট পাকাবে ভেবে দেখেছিস?’

‘ঠিক করছে। এদেশে বিচারটা অধিকার নয়। জোরে জোরে চাইতে হয়। উনি একদম ঠিক কাজ করছেন। ওনার বিচার চাওয়ার হক আছে। ওনার সন্তান মারা গেছে। আমি হলেও এই কাজ করতাম।’

‘ওনার যদি হক থাকে, তাহলে তোদেরও হক আছে। উনি টিভি ক্যামেরার সামনে এসে বিচার চাইছেন। তোরা টিভি ক্যামেরার মুখোমুখি হয়ে সত্যিটা জানিয়ে দে। বলে দে, “আপনার ছেলে মাল খেয়ে টাল রাখতে পারেনি।”

‘ছেলেটা যে মদ খেয়ে টাল রাখতে পারেনি, পড়ে গেছে। ঘটনাটা অ্যাক্সিডেন্ট—এটা তোরা জানিস? এটা সত্য, এটা কি তুই জানিস? বা তুই বিশ্বাস করিস? তাহলে তুই অন ক্যামেরা বল, ষোলোজন ছেলেমেয়েদের হয়ে বল। বার বার করে যে খুনের কথা বলছিস, সেটা না বলে অ্যাক্সিডেন্টের কথা বল। তাহলেই তো হয়। তোকে কারও পক্ষে দাঁড়াতে হবে না। সত্যের পক্ষে দাঁড়া।’

অমিত্রসূদনের কথা শুনে কাশল অবিনাশ।

‘মারাত্মক হাইপ! টিআরপি হাই। সারাদেশের সব মিডিয়া কভারেজ দিচ্ছে। এমনকী বিবিসিও। তুই ভাবিস না, আমি গেম খেলছি। আমি চাই তোরা নীরবতা ভেঙে মুখ খোল।’

‘ইনভেস্টিগেশন চলছে। আমরা পুলিশের ওপর ভরসা রাখছি, যা সত্য তা নির্মম হলেও মেনে নেব।’

‘অমিত্র জীবনটা নাটক নয়, ওখানে তোর সন্তান আছে।’

‘অবিনাশ সব কিছু বিজনেস আর টিআরপিতে গুলিয়ে ফেলিস না। এথিক্স বলে একটা কথা আছে। সত্য বলেও একটা বস্তু আছে। তোরা মানুষকে বিভ্রান্ত করছিস। এটা সাংবাদিকতা নয়।’

‘তুই ভুল বুঝছিস।’

‘ঠিক এখনই আমার সঠিক পথে যাওয়ার সময়। এতদিন ভুল বুঝেছি।’

‘তুই সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়ছিস। আর্য আমার সন্তানের মতো।’

‘শুধু আর্য কেন? আবিরও।’

‘রাখলাম রে। ভালো থাকিস। মাথা শান্ত রাখিস।’

শকুন্তলা কখন ঘরে এসেছিল। ‘তুমি আর ওই অবিনাশের ফোন ধরো না। আর একটা কথা, রোজই কি যেতে হবে?’

‘কেন?’

‘তোমার মোবাইল বিজি পেয়ে পুলিশ আমাকে ফোন করেছিল। কাল তিনটের সময় যেতে হবে। আর যেন পারছি না—। সারা গায়ে কেমন একটা জ্বালা পোড়া ভাব।’

‘সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করো, যতদিন না কেস মিটছে রোজই আমাদের ডাকবে।’

‘তাহলে আসার সময় বলছে না কেন?’

‘তাতে আলাদা করে কী লাভ হত? বিষয়টা তো এক। নিয়ম করে আমাদের ওখানে হাজিরা দিতে হবে।’

‘আর্য ওখান থেকে বেরিয়ে ঠিক কথাই বলেছে—কালও আসতে হবে। বরং আমিই ওকে উলটে বললাম, পর পর চারদিন হল, আর ডাকবে না। আর কী জানবে? সব তো জেনেছে। লিখিয়েছে। বার বার লিখিয়েছে।’ শকুন্তলার গলাটা ভাঙা ভাঙা। ‘আর একটা কথা বলব, সত্যি কথা বলবে?’

‘বলো?’

‘আমাকে তীর্থঙ্করের মা, সৌর্যেন্দ্রর মা ফোন করেছিল—। ওরা সব জানে। সারা স্কুলই জানে।’

অমিত্রসূদন চুপ করে তাকিয়ে থাকে শকুন্তলার দিকে।

শকুন্তলা ঢোঁক গিলে বলল, ‘ওরা বলছিল—স্কুলে নাকি খুব খারাপ রিপারকেশন হয়েছে—?’

‘হ্যাঁ, তাই তো হবারই কথা।’

শকুন্তলা গলার ভেতর দলা পাকানো কান্না চেপে বলে, ‘আর্য কী করল? ও কি খুন করেছে, যে ওকে স্কুল থেকে টিসি দিয়ে দেবে?’

‘টিসি দেওয়ার কথাটা বাজে—কোনও ভিত্তি নেই। তুমি তোমার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করো। ফাদার থেকে হেডমাস্টার, ক্লাস টিচার, স্কুল কোঅর্ডিনেটররা আর্যর কাছ থেকে সব শুনেছেন। ওঁরা কোনও বিরূপ মন্তব্য করেননি। উলটে আমাদের সাহস দিয়েছেন। ওদের স্কুলে সামান্যতম গোলমাল নেই। আর্য এখন স্কুল যাবে না, আমি বলে এসেছি, লালবাজারের ইনভেস্টিগেশনের পার্ট মিটলেই ও স্বাভাবিকভাবে স্কুল যাবে। আমাদের ফাদার নিজে বলেছেন। তোমাকে যে যা বলেছে, সব ভুল। এখন এমন অনেক কথা শুনবে। মাথা ঠান্ডা রাখো, চুপ করে থাকো।’

‘এখন আবির কত ভালো ছেলে হয়ে যাচ্ছে—ওকে স্কুল থেকে টিসি দিয়েছিল—কেন? সবাই জানে? আমি জানতামই না এই আবিরই সেই আবির—।’

‘যে নেই তার কথা ছেড়ে দাও!’

শকুন্তলা গুমরে ওঠে, ‘এ পাড়ার অনেকেই কিছু একটা সন্দেহ করছে— পাশের বাড়ির মাসিমা জবাকে বলেছে, “ওরা রোজ কোথায় যাচ্ছে রে? কিছু কী হয়েছে?”’

‘দেখো, কোনও কথাই চেপে রাখা যায় না, কেউ না কেউ জানবেই। আমাদের এখন একটাই কাজ, আর্যকে সঙ্গ দেওয়া, ইনভেস্টিগেশনে যথাযথ সাহায্য করা। তাহলেই খুব দ্রুত সব মিটে যাবে।’

শকুন্তলা বিবর্ণ গলায় বলল, ‘আজ লালবাজারের গেটের সামনে এসে বুকের ভেতরটা কেমন করছিল—। তোমাকে ওখানে অনেকেই চেনে, তাইজন্যে আমাদের ছেড়ে দিচ্ছে—।’

‘দু’-একজন চিনতে পারে। সে আর কী করা যাবে। পালিয়ে আসতে তো পারি না। কাল আর্য ওর মতো ঢুকে যাবে। আমি তোমার সঙ্গেই ঢুকব।’

‘না, না, একসঙ্গে দেখলে ওরা বুঝে ফেলবে—কারও বাবা মা। ঠিক ছবি তুলে টিভিতে দেখাবে। আমরা তো নাবালক নই।’ শকুন্তলা ভয়ার্ত গলায় বলল।

‘ঠিক আছে, তাহলে আলাদা আলাদা হয়েই যাব।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি পারব। কোনও অসুবিধে হবে না। তোমার অফিসে কিছু বলছিল—?’

‘না, ঠিক আছে। ওরা সত্যিটা জানে।’

‘সত্যিটা কি—অ্যাক্সিডেন্ট। আবির পড়ে গিয়ে মারা গেছে?’

‘হ্যাঁ, খুন নয়। এটা পুলিশই বলছে।’

‘তাহলে এই কথাটা ওরা লিখছে না কেন? একটা কাগজ তো লিখতে পারত—’

অমিত্রসূদন চুপ করে ভাবল। শান্ত গলায় বলল, ‘হয়তো মিডিয়ার মনে এখনও কিছু প্রশ্ন আছে। তারা সেটা পরিষ্কার করে জানতে চায়।’

শকুন্তলা বলল, ‘কেউ তো প্রশ্ন করছে না, বরং সবাই উত্তর দিচ্ছে। সন্দেহ করছে—ওটা খুন। আর খুন যদি হয়, তাহলে খুনি থাকবে। ওরা কি মনে করছে এটা খুন?’

শকুন্তলার প্রশ্নে অমিত্রসূদন চুপ করে ভাবছিল ঠিক কী বললে শকুন্তলা শান্ত হবে।

শকুন্তলা বলল, ‘আর্য বলছিল—এখন নাকি তোমরা বিজনেস করছ— সব জেনেশুনে—নিজেদের বিজনেস করার জন্য আবিরের সঙ্গে সঙ্গে এদেরকেও মারতে চাইছ। আজ লালবাজারে আর্যদের একজন বন্ধু তোমাদের রিপোর্টার ফটোগ্রাফারদের বাস্টার্ড বলে গালাগালি করছিল—। আর একজন চাপা গলায় বলল, “আর্যর বাবা, সৌমিলির বাবা আছে—।” সৌমিলির বাবাও নাকি কোন একটা ইংরেজি নিউজ পেপারে আছে।’

‘কে সৌমিলি? ওর বাবা কোন কাগজে আছে? আর্য তো আমাকে কিছু বলেনি—’

‘ওদের সঙ্গেই ছিল, ওদের সকালের দিকে ডাকছে। শোনো, তোমাকে একটা কথা বলব?’

অমিত্রসূদন মুখ তুলে তাকাল।

‘তুমি অবিনাশ বা তোমাদের অফিসের কারও সঙ্গে লালবাজারের কোনও কথা আলোচনা করবে না। কাল আমাদের চা খাইয়েছিল, চায়ের সঙ্গে বিস্কুট ছিল—এটা কাগজের লোকেরা কীভাবে জানল? একটা কাগজ লিখেছে—লালবাজারে নাকি বাপ মায়েদের টি পার্টি হচ্ছে। এটা আমাদের মধ্যে থেকেই কেউ খবরটা দিয়েছে। আজ চা দিতে এসে বাঘা খুব করে কথাগুলো শোনাল।’

অমিত্রসূদনের মনে হল সে স্টেজের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তার মুখে আলো। এক্সপ্রেশন ছাড়া কোনও কিছু করার নেই। এই সিনে তার কোনও ডায়লগ নেই। শুধু শান্তভাবে শুনে যাওয়া। এখানে সে কোনও ব্যক্তিমানুষ নয়। শুধুমাত্র নাটকের একটি চরিত্র। ওদিকে তিরের মতো ডায়লগ আসবে, সে জানে, এর কোনও কথাই তার হৃদয়ে ধারণ করতে হবে না। শুধু শুনে যাওয়া।

শকুন্তলা বলল, ‘রিপোর্টার ফটোগ্রাফারদের বাস্টার্ড বলছে একটা দুধের ছেলে, ওরা কতটুকু জানে? কিন্তু সে খুব কষ্টে বলছিল, নেহার ওই পাগল পাগল অবস্থা দেখে। শুনে খুব খারাপ লাগছিল। তুমিও তো আছ—ওই টাকা আমাদের অন্ন দেয়—কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।’

অমিত্রসূদন বাইরে তাকাল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%