জয়ন্ত দে

রাজীব ফোন করেছিল।
‘দাদা আপনি লালবাজারে? কোনও আপডেট থাকলে একটু জানাবেন।’
‘নিশ্চয়ই জানাব।’
‘ওখানে সবাই এসেছে, সতেরোজনই।’
‘সতেরোজন কী করে আসবে রাজীব? সতেরোজনের মধ্যে একজন আবির।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক ঠিক, ষোলোজন তাহলে, সবাই এসেছে—?’
‘হ্যাঁ, তবে একসঙ্গে নয় মনে হয়। আমরা এখানে আটটি পরিবার আছি।’
‘দাদা, ওখানে কী হচ্ছে—? মানে জিজ্ঞাসাবাদ কীভাবে হচ্ছে—?’
‘সরি রাজীব, আমি একটু নীচে নেমেছিলাম। এখন ওপরে যাচ্ছি। কাল অফিসে তোমার সঙ্গে কথা হবে।’
ঘড়িতে প্রায় আটটা। ছ’টা নাগাদ আর্য একবার বেরিয়েছিল। ওর সঙ্গে সঙ্গে একজন এসে বলল, ‘আপনি ওকে নীচে আমাদের ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে কিছু খাইয়ে আনুন। গেটের বাইরে যাবেন না। মিনিট পনেরো কুড়ির মধ্যে আবার ঢুকে পড়বেন।’
নীচে নামতে নামতে আর্য বলল, ‘বাবি, বাথরুম কোথায় বলোতো—আগে বাথরুম যাব।’
বাথরুম থেকে আর্য এল। বোঝা যাচ্ছে, ও চোখে মুখে বেশ করে জল চাপড়েছে, ওর টিশার্টের অনেকটাই ভেজা।
আর্য ফিরতে শকুন্তলা বলল, ‘নীচে ক্যান্টিন। কী খাবি?’
আর্য বলল, ‘কিছু না খেলে হয় না? আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।’
‘ইচ্ছে করছে না বললে হবে—? দেখ অনেক কিছু আছে।’
‘আমার ভালো লাগছে না। ঠিক আছে স্যান্ডুইচ বলে দাও। আর কফি।’
অমিত্রসূদন আর শকুন্তলা শুধু কফি খেলো। খেতে খেতে আর্য সময় দেখল। বলল, ‘ফিফটিন মিনিটস—ব্রেক টাইম।’
‘তুই আগে শান্তিতে খা। কুড়ি মিনিট বলেছে। দু-পাঁচ মিনিট এদিক ওদিক হলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।’ শকুন্তলা বলল। ‘হ্যাঁ, সবাই এসেছে?’
‘হ্যাঁ, এখানে আমাদের ক্লোজ গ্রুপের আটজন আছে।’
‘কী জিজ্ঞাসা করল—?’
আর্য কফিতে চুমুক দিয়ে মাথা নিচু করে থাকল। বলল, ‘মা, গিটার কিনতে ওদিকে এসেছিলাম না? সেদিন আমার খুব ভেতরটা দেখার ইচ্ছে ছিল—। ভগবান খুব ঝটপট আমার ইচ্ছেপূরণ করে দিল।’ ম্লান হাসল আর্য। ‘ভগবানকে আমার একটা থ্যাঙ্কস দিতে হবে—।’
অমিত্রসূদন পকেট থেকে ফোন বের করল। প্রচুর লোকের মিসড কল।
আর্য ঝাড়া মেরে উঠে দাঁড়াল। ‘চলো। বাবি আমাকে একটা জলের বোতল কিনে দেবে—?’
অমিত্রসূদন দেখছিল আর্যর চোখদুটো কোটরে ঢুকে গেছে। অমিত্রসূদন দ্রুত একটা জলের বোতল এনে আর্যর হাতে দিল। ‘ওখানে জল নেই? তোকে জল খেতে দেয়নি?’
‘আমি চাইনি।’ খুব রুক্ষ্ম গলায় কথাটা বলল আর্য, এগিয়ে গেল খুব দ্রুত। ও লিফটের অপেক্ষা করল না। সিঁড়ি দিয়েই তরতর করে তিনতলা উঠে গেল। ওরা এসে লিফটের সামনেই দাঁড়াল। তিনতলায় উঠে শকুন্তলা বলল, ‘আর কতক্ষণ লাগবে বলোতো?’
‘এবার হয়ে যাবে। কতগুলো জরুরি ফোন এসেছিল, আমি একটু নীচে যাচ্ছি। যদি কোনও দরকার মনে করো ফোন করবে।’
তখনই আবার ফোনের আলো জ্বলে উঠল। রাজীব।
অবিনাশও ফোন করেছিল। অনেকবার।
সাড়ে আটটা নাগাত আর্য বেরিয়ে এল, ‘চলো।’
অমিত্রসূদন ভাবল, মেন গেট দিয়ে কি বেরোনো যাবে? সবাই কি চলে গেছে? হাতের ঘড়ি দেখল। আটটা কুড়ি। প্রিন্ট মিডিয়ার ফোটোগ্রাফাররা এতক্ষণে চলে গেলেও যেতে পারে। কিন্তু ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া...না! ওদের লড়াই প্রচণ্ড।
‘বাবি গাড়িটা ভেতরে ডাকবে—? তাহলে এখান থেকে বসে চলে যেতাম।’ আর্য কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। ধস্ত চেহারা। যেন আর পারছে না।
‘এখন গাড়িটা ভেতরে ঢোকানো হ্যাপা আছে।’
‘ভেতরে না ঢোকাও গেটের সামনে ডাকো—।’ ক্লান্ত গলায় শকুন্তলা বলল।
পিছন থেকে একজন পাশে এসে দাঁড়ালেন, বেশ লম্বা চওড়া এক ভদ্রলোক। বললেন, ‘শুনুন, আপনারা মেন গেট দিয়ে বেরুনোর চেষ্টা করবেন না। ওখানে ক্যামেরার ভিড় আছে। প্রচণ্ড মিডিয়ার চাপ। আপনারা এক কাজ করুন, গাড়িটাকে বলুন পোস্ট অফিসের সামনে আসতে—।’ ভদ্রলোক এবার সরাসরি আর্যকে বললেন, ‘এই বাবু শোন, তুই সবার আগে ওদিকে গেট দিয়ে একা বেরিয়ে যাবি। গিয়ে পোস্ট অফিসের সামনে দাঁড়াবি। পোস্ট অফিস চিনিস? তুই গেট থেকে বেরিয়েই বাঁ দিকে যাবি। না চিনতে পারলে কিছু দূরে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করে নিবি। আর আপনারা একটু আস্তে আস্তে যাবেন। ওকে আগে যেতে দিন। আপনি গাড়িকে ফোন করুন। জিজ্ঞাসা করে নিন কতক্ষণ লাগবে। পোস্ট অফিসের সামনে ড্রাইভারকে দাঁড়াতে বলুন—। একবার ও বেরিয়ে গেলে শকুনগুলো বুঝতে পারবে না।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ অমিত্রসূদন বলল।
ছবির মতো একটা প্ল্যান করে ভদ্রলোকটি চলে গেলেন। পুলিশের লোকই হবে। অমিত্রসূদন ড্রাইভারকে বলল, ‘লালবাজার পোস্ট অফিস চেনো—? না চিনলে কাউকে জিজ্ঞাসা করে চলে এসো।’
আর্য বলল, ‘কখন আসবে বলল—? কতক্ষণ লাগবে?’ ওর গলায় চাপা টেনশন।
‘একটু সময় লাগবে। ও পার্কিং থেকে গাড়ি নিয়ে আসবে।’
‘আমি কি তাহলে বেরিয়ে যাব? পোস্ট অফিসের সামনে গিয়ে দাঁড়াব।’
‘না, আগে তোর মা যাবে। তুমি আগে যাও। বেরিয়ে বাঁ দিকে।’
‘আমি আগে কেন?’ শকুন্তলা কেমন যেন ভীত গলায় বলল। ‘আর্যকে তো আগে যেতে বলল।’
‘আমার কথা শোনো, আমরা ওনার কথামতোই যাবে, শুধু তুমি আগে। কারণ তোমার যেতে একটু সময় লাগবে। তুমি যেতে যেতেই দেখবে আর্য চলে গেছে।’
শকুন্তলা যেন নড়তে পারছে না। বিধ্বস্ত গলায় বলল, ‘সকাল থেকে কী যে গা চুলকাচ্ছে, আর পারা যাচ্ছে না। এই শোন, তুই কিন্তু দুপুরের মতো দৌড়ে দৌড়ে আসবি না, গাড়ির রাস্তা। আমি যাচ্ছি। তোমরা বেশি দেরি করবে না।’
এক শরীর দ্বিধা নিয়ে শকুন্তলা বেরিয়ে গেল।
গেটের সামনে এসে শকুন্তলার বুকের ভেতর কেমন ঢিপঢিপ করছিল। এই গেটের পাশে ফুটপাতে একটা ছেলে ক্যামেরা নিয়ে বসে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে। শকুন্তলা ওদের দিকে দেখল। এই গেটে তো কেউ নেই বলল, এখানেও এরা আছে। কিন্তু ওরা শকুন্তলার দিকে তাকাল না। শকুন্তলা বেরিয়ে গিয়ে ফোন করল—‘গেটের সামনেই একটা ছেলে আর মেয়ে ক্যামেরা নিয়ে বসে। তোমরা সাবধানে এসো।’
ফোন রেখে অমিত্রসূদন বলল, ‘আর্য তোর মা চলে গেছে। তুই মনে রাখিস—গেট থেকে বেরিয়ে বাঁদিক, লেফট। সোজা হেঁটে গেলে মাকে দেখতে পেয়ে যাবি। হেঁটে যাবি, স্বাভাবিকভাবে। যেন কোনও তাড়া নেই।’
আর্য হাসল, ‘হ্যাঁ, মা যাব স্লো। আমি তাহলে যাই।’
‘শোন, স্বাভাবিকভাবে যাবি। কেউ যদি তোকে কিছু বলে—উত্তর না দিয়ে চলে যাবি। যা, আমি ঠিক তোর পিছনেই আছি। একবারও পিছন ফিরে তাকাবি না। লেফট মানে লেফট। আর পিছনে তাকাবি না।’
আর্য ফ্যাসফেসে গলায় বলল, ‘আমি যাই—বাবি। তুমি আমার পিছনে আসছ তো—?’ আর্যর গলার স্বর কেমন যেন ভেঙে গেল।
আর্য খুব দ্রুত হাঁটে।
আর্যর ঠিক পিছনেই অমিত্রসূদন। গেটের বাইরে ফোটোগ্রাফার ছেলেটি সিগারেট ধরাচ্ছে। আর্যর থেকে হাত পাঁচেক দূরে অমিত্রসূদন। আর্য গেটের কাছে আসতেই ওকে দেখেই মেয়েটা দৌড়ে গেলে ফোটোগ্রাফার ছেলেটার কাছে। ফোটোগ্রাফার ছেলেটা সিগারেট ফেলে লাফিয়ে উঠেছে। গেট পেরিয়ে আর্য চলে যাচ্ছে। ফোটোগ্রাফার ছেলেটা ডাকল—ও ভাই, ও ভাই—। এই ছেলে।
ফোটোগ্রাফার ছেলেটা ক্যামেরা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আর্যর সামনে। অমিত্রসূদন সম্পূর্ণ আড়াল করে গেটের সামনে এসে দাঁড়াল, অল্প ধাক্কাও লেগে গেল ফোটোগ্রাফার ছেলেটার সঙ্গে। অমিত্রসূদন ফোটোগ্রাফার ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘আরে আমাকে বেরুতে দিন।’
‘আরে মশাই সরুন না।’
‘আপনি ধাক্কা দিলেন—আবার আপনিই সরতে বলছেন।’
ফোটোগ্রাফার ছেলেটা ক্যামেরা ধরতে পারছে না। পুরো ফোকাস অমিত্রসূদনের বুকের কাছে। অমিত্রসূদন কিছু একটা বলতে বলতে পাশ ফিরে দেখল আর্য নেই, চলে গেছে। মেয়েটা বলল, ‘তোকে কিন্তু আমি অ্যালার্ট থাকতে বলেছিলাম—তোর এত সিগারেট খাওয়া!’
‘আরে ঠিকই নিতাম—ওই ক্যালানে লোকটা মাঝে এসে এমনভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঠিক আছে, এই গেট দিয়ে মাল পাচার করছে। একটা যখন বেরিয়েছে সেকেন্ডটাকে এখানেই পেয়ে যাব।’
অমিত্রসূদন আস্তে আস্তে হেঁটে এল পোস্ট অফিসের সামনে। এসে দেখল আর্য গাড়ির সামনে, শকুন্তলা পিছনের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে। আর্য বলল, ‘ঠিক আছে?’
ম্লান হাসল অমিত্রসূদন, ‘পারফেক্ট!’
‘আর আসতে হবে না তো—?’ শকুন্তলা বলল।
‘কিছু তো বলেনি। আমাকে যা বলেছে লিখে দিয়েছি।’
‘কী লিখে দিয়েছিস তুই—?’ শকুন্তলা কিছুটা আতঙ্কিত গলায় বলল।
‘ঠিক আছে—, এখন বাড়ি চলো। বাড়ি গিয়ে শুনব।’ অমিত্রসূদন বলল।
রাস্তা এখন বেশ ফাঁকা। গাড়ির মধ্যে প্রবল এক শূন্যতা! হঠাৎ ড্রাইভার ছেলেটি এফএম চালিয়ে দিল—গম গম করে বেজে উঠল—
এক মা তার সন্তান খুনের বিচার চাইছে—
জাস্টিস ফর আবির—
জাস্টিস ফর আবির—
অমিত্রসূদনের বুকের ভেতর রক্ত ছলাৎ করে উঠল। কিছু বলতে যাচ্ছিল—হয়তো না বলে এফএম চালানোর জন্য প্রচণ্ড জোরে ধমকাত, কিন্তু আর্য হাত বাড়িয়ে এফএম-এর সুইচটা বন্ধ করে দিল। খুব শান্ত গলায় ড্রাইভার ছেলেটিকে বলল, ‘সরি আঙ্কেল, বন্ধ করে দিলাম। চালিও না—আমার খুব ঘুম পাচ্ছে!’
অমিত্রসূদনের মনে হল আর্য খুব শান্ত। কয়েক মিনিটের মধ্যে অমিত্রসূদন বুঝল—আর্য ঘুমিয়ে পড়েছে। ও যেন ঘুমানোর জন্যই তৈরি হয়েই বসেছে। সামনের সিটটা পিছনদিকে একটু হেলিয়ে দিয়েছে। আর অমিত্রসূদন নিজে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছে না।
কাল অফিস যেতে হবে।
মিউটে রাখা মোবাইলে অসংখ্য মিসড কল। এসএমএস। বাড়ি গিয়ে গ্রুপের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। কিন্তু কী বলবে সে? আজ না হোক কাল ওরা সব জানবে, তার আগে কি তার জানিয়ে রাখা উচিত? অদ্ভুত একটা দ্বিধায় জড়িয়ে গেছে অমিত্রসূদন। এত লুকোছাপা, এত গোপনীয়তা কেন?
বাড়ির সামনে এসে আর্যকে ডাকল শকুন্তলা।
আর্য জড়ানো গলায় জিগ্যেস করল, ‘এসে গেছি মা?’
ড্রাইভার গ্যারাজে গাড়ি ঢোকাল।
রাতের রান্না করেই গিয়েছিল শকুন্তলা। কোনওরকমে গরম করেই খেতে দিল সবাইকে। খাওয়ার পাট শেষ হতে হতে এগারোটা। অমিত্রসূদনের মোবাইলে ফোন এল লালবাজার থেকে। দুপুরের সেই অফিসারটি। আরশাদ। জানাল,
‘কাল তিনটে। লালবাজার। মিডিয়ার ভিড় থাকবে—সাবধানে আসবেন। ওর ভাঙা মোবাইলটা সঙ্গে নিয়ে আসবেন।’
অমিত্রসূদন বলতে চেষ্টা করল ‘আচ্ছা!’ গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুল না।
শকুন্তলা গা চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘আবার! কাল!’
যেতে হবে শুনে সে আর্যকে বলতে গিয়েছিল। দেখল অকাতরে ঘুমাচ্ছে আর্য।
অমিত্রসূদন গ্রুপের কয়েকজনকে ফোন করল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন