জয়ন্ত দে

আমি আর্যনীল দাশগুপ্ত—
কাউকে যদি দোষী মনে হয় তার কথাও আমাকে লিখতে বলেছ।
দোষ কার?
প্রথম যেদিন লালবাজারে আসি ইনকোয়ারি অফিসের এক আন্টি আমাকে বলেছিল—‘তোমাদের এখনও নেশা করার বয়স হয়নি বাবু—ভেরি ব্যাড।’
আমি সেই আন্টিকে বলেছিলাম, ‘আমার বাবার সেলার নেই। আমি বাবার সেলার থেকে মদ চুরি করে খাইনি। দোকান থেকে কিনে খেয়েছি। দোকানদার আমাদের বিক্রি করেছে। বাচ্চাদের কেন মদ বিক্রি করল? ভেরি ব্যাড!’
দোষ কি তাহলে দোকানদারের? তাহলে দোকানদার দোষী!
এখন দোকানদার বলতে পারে, ‘আমাকে কেউ ছোটদের মদ বিক্রি করতে নিষেধ করেনি। বলেনি আঠেরো বছরের কম বয়েসিদের মদ বিক্রি করবে না। এই নিষেধ করার দায়িত্ব সরকারের। প্রশাসনের। তাহলে দোষ প্রশাসনের।
আমি এখন দোষ খুঁজতে বসেছি।
আমার বাবার সঙ্গে আমি ভুটান গিয়েছিলাম। জয়গাঁও—ফুন্টসোলিং—থিম্পু। থিম্পু থেকে পারো। পারোতে থার্টি ফার্স্টের রাত কাটাব। আমাদের হোটেলেই ছিল অন্য একটা ট্যুর কোম্পানি ট্যুরিস্ট। সেই ট্যুর কোম্পানির ম্যানেজার এসে বলল, ‘আমরা আজ রাতে পার্টি করব। আপনারা আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন।’ আমরা রাজি। পার্টি চলছে। তিনতলার একটা হল ঘরে। জন কুড়ি লোকজন—ড্রিঙ্কস, খাবার, নাচ, গান। আমার বাবা নীচে এসে ভুটানি বাচ্চাগুলোর সঙ্গে গল্প করছিল। আমিও ছিলাম সেখানে। হঠাৎ বাবার পায়ের কাছে থপ করে এসে পড়ল সেই ট্যুর কোম্পানির ম্যানেজার। প্রচণ্ড মদ খেয়ে মাতাল অবস্থা। কিন্তু তাকে তুলতে গিয়ে দেখা গেল তার থুতনি আর চোখের পাশে কপাল কেটে গেছে। গল গল করে রক্ত বেরুচ্ছে। একটা হইহই ব্যাপার। বরফ দেওয়া হল। কিছুতেই রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। রক্তাক্ত ম্যানেজার নেশায় অচেতন। সেই ট্যুর কোম্পানির সঙ্গে ঘুরতে এসেছিলেন একজন ডাক্তার। তিনি বললেন, এখুনি সেলাই করে রক্ত বন্ধ করতে হবে, নাহলে বিপদ। জানা গেল কাছাকাছি সরকারি হসপিটাল আছে। কিন্তু নিয়ে যাবে কে? ড্রাইভাররা সকলেই থার্টি ফার্স্টের রাতে পার্টি করতে চলে গেছে। কিছুতেই কোনও ড্রাইভারকে পাওয়া গেল না।
তখন আমার বাবা অল্প অল্প গাড়ি চালাতে পারে। হাত সেট নয়। তবে হ্যাঁ, দু’চারবার গাড়ি নিয়ে অফিস গিয়েছিল। টুকটাক গাড়ি চালিয়ে বিয়েবাড়ি গিয়েছিল। একদমই স্বচ্ছন্দ নয়, কিন্তু বাবা বলল, এদিকে তো সমতল। পাহাড়ি পথ নয়। কেউ একজন রাস্তা দেখাক আমি গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাব। শেষে অবশ্য একজন ড্রাইভার পাওয়া গেল। আমার বাবা আর সেই ডাক্তারবাবু দু’জনে মিলে ট্যুর কোম্পানির রক্তাক্ত ম্যানেজারকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। শুনেছিলাম, নিউ ইয়ার্সের জন্য সেদিন রাতে হাসপাতালে কোনও ডাক্তার ছিল না। ট্যুরের সেই ডাক্তারবাবুই সেদিন ম্যানেজারের থুতনি আর চোখের ওপর সেলাই করেছিলেন। পা ধরেছিল আমার বাবা। আর ড্রাইভার চেপে ধরেছিল ম্যানেজারের দু’হাত। আমার মনে আছে—সেই ট্যুর কোম্পানির ম্যানেজার একটা কালো টিশার্ট পরেছিল। তার বুকে লেখা ছিল—‘যাও পাখি’। ওরা এসেছিল আনোয়ার শাহ রোড থেকে। আমার বাবা আর সেই ডাক্তার কিন্তু সেদিন ম্যানেজারকে ‘যাও পাখি’ হতে দেয়নি। তাকে বিদেশ বিভুঁইয়ে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে এনেছিল।
অথচ এখানে শ্রীয়ের বাবা বিখ্যাত শিল্পী সৌরীন মুখার্জি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন। কী হচ্ছে? কী হল? কেন হল? অনেক কিছু বুঝলেন। তিনি ভাবলেন, বুঝলেন, ওপরে চলে গেলেন। আবার ফিরে এলেন। অনেক সময় নষ্ট করলেন। ছোটদের ব্যাপারে তিনি থাকবেন কি না, বিচার বিবেচনা করলেন। গুরুত্ব বুঝলেন। শুধু বুঝলেন না বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে। ব্লিডিং, রক্তক্ষরণ। তারপর বাধ্য হয়ে গেলেন। উনি কি পারতেন না দ্রুত ব্যবস্থা নিতে? কিন্তু উনি নেননি।
সৌরীন মুখার্জি ছাড়াও অনেক বড়, সিনিয়র মানুষজনই ওখানে ছিলেন। তাঁরা ওই কমপ্লেক্সের বাসিন্দা, তাঁদের একজনও এগিয়ে আসেননি। কেউ একজনও আমাদের সাহায্য করেননি। ওখানে অনেকগুলো গাড়ি ছিল, তার যেকোনও একটা গাড়িতে তুলে আবিরকে হাসপাতালে সময়মতো নিয়ে গেলে ও বেঁচে যেত। সেটাও কেউ করেনি। এঁদের কি দোষ দেওয়া যাবে? ওঁদের নিশ্চয়ই দোষী করা যাবে না।
সিকিউরিটি চিৎকার করছিল ‘খুন’ ‘খুন’ বলে। সেও আমাদের কোনও সাহায্য করেনি। তাকেও বাদ দিলাম।
আমার কেউ দু’ঢোক, কেউ চার ঢোক, কেউ হয়তো অনেকটা বেশিই ভদকা খেয়েছি। কিন্তু তারপরেও আমরা সজ্ঞানে দৌড়াদৌড়ি করেছি। আবিরকে ধরেছি। ওর রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করেছি।
সবুজ নিজের গায়ের টিশার্ট খুলে ওর কাটা জায়গায় চেপে ধরেছিল। আবিরকে আমরাই একটা গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছি। অথচ আমরা দোষী হয়ে গিয়েছি।
যদি ওর মৃত্যুর জন্য কেউ সামান্যতম দোষী হয়—তারা হল ওখানে হাজির হয়ে রগড় দেখা বড়রা। নিস্পৃহ বড়রা। দায়িত্বজ্ঞানহীন বড়রা।
আবিরের মৃত্যুর জন্য যদি বড়রা দায়ী হয়, তবে আমাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী হবে মিডিয়া। সত্যের সন্ধান করা অসৎ ব্যবসায়ী মিডিয়া। সেই মিডিয়ার একজন প্রতিনিধি আমার বাবা। আমার বাবা পারলে আমাকে লুকিয়ে রাখে। সন্তান বলে অস্বীকার করে। আমার মা আমাকে নিয়ে কাঁদছে—বিশ্বাস করতে পারছে না।
আজ বাবিকে বিনিতা শ্রীবাস্তব ডাকলেন। বাবিকে নিয়ে এসে আমার সামনে বসানো হল।
বিনিতা শ্রীবাস্তব বললেন, ‘মিস্টার দাশগুপ্ত আমরা ইনভেস্টিগেশন প্রায় শেষ করে ফেলেছি। কাল আমরা রয়্যাল গার্ডেনে গিয়েছিলাম। আসলে আমরা অনেক আগেই রয়্যাল গার্ডেনে বার বার গিয়েছি। কাল গেলাম মিডিয়াকে দেখিয়ে। এবার আমরা যে কোনওদিন কেসটা ওপেন করে দেব। আসলে আমাদের এই ওপেন করাটা কিন্তু কোর্টের কাছে। আমরা সেখানেই দায়িত্ববদ্ধ। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে মিডিয়াই এখন কোর্ট। মিডিয়া ট্রায়ালে আছি আমরা।’
কথা বলতে বলতে বিনিতা শ্রীবাস্তব হাসলেন, বললেন। ‘আসলে কী জানেন, পুড়েছে, জ্বালা যন্ত্রণা হচ্ছে, কিন্তু পোড়া ঘা শুকানোর সময় ইনফেকশনের ভয়। আমরা সেই ভয়টাই পাচ্ছি। আচ্ছা মিস্টার দাশগুপ্ত আপনার কাছে পুলিশের তরফ থেকে বা অভিভাবকদের তরফ থেকে কোনও ফোন এসেছিল?’
বাবি একটু চিন্তা করল। ‘কী ফোন বলুন তো?’
‘এই আপনাদের কিছু টাকা দিতে হবে। দশ লাখ—বিশ লাখ। পুলিশ চাইছে। তাহলে কেসটা পুলিশ সালটে দেবে। ম্যানেজ করে দেবে। মানে কেসটা হালকা হয়ে যাবে। আর্যরা বেঁচে যাবে।’
‘না, এমন কোনও ফোন আসেনি।’
‘তাহলে আসবে। আপনাদের দু’-একজন অভিভাবক এ রকম ফোন পেয়েছেন। আমরা নাকি কোনও একজন অভিভাবককে দায়িত্ব দিয়েছি—তিনি কেসটা নেগোশিয়েট করছেন। মোদ্দা কথা হল, আপনারা তাকে টাকা দেবেন। তিনি আপনাদের হয়ে পুলিশের সঙ্গে ডিল করবেন।’
‘আমি এমন কোনও কথা শুনিনি।’
‘না, শুনে থাকলেও শুনবেন। অনেক দালাল ফড়ে ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে গেছে। এরা পুলিশ পলিটিশিয়ান অনেকের নাম বলবে। হয়তো প্রমাণও দেবে। হয়তো প্রমাণ স্বরূপ কিছু প্রেডিকশনও করবে—আর তা আশ্চর্যজনকভাবে মিলেও যাবে। এরা অনেক গভীর জলের মাছ। ওরা একবার কাউকে ফাঁদে ফেলতে পারলে লক্ষ লক্ষ টাকা লুটে নেবে। এটা একটা চক্র। একটা র্যাকে কাজ করছে। সাবধান। আমরা আগেভাগে সাবধান করছি। আমরা অনেক কিছুই জানি, কিন্তু অবস্থার পাকে পড়ে চুপ করে আছি। আমরা এদের পিছনে দৌড়াচ্ছি না, ওদের ধরার চেষ্টাও করছি না। আগে আমরা মিডিয়াকে সামলে উঠি, তারপর ওদিকে তাকাব। কেননা বিষয়টা খুব সাবধানে ডিল করতে হচ্ছে। টাকা পয়সার গল্প একবার যদি মিডিয়া জানতে পারে, তাহলে তিলকে তাল করবে, আবার অন্য খেলা তৈরি হবে। মিডিয়া জনমত তৈরি করে দেবে, তাতে আপনাদের ছেলেমেয়েরা আরও হ্যারাস হবে। আরও কিছুদিন লালবাজারে চক্কর কাটতে হবে।’
অমিত্রসূদন শান্ত, স্তব্ধ।
বিনিতা শ্রীবাস্তব বললেন, ‘এমনিতে প্রভাবশালী কথাটা পাবলিক মারাত্মক খেয়েছে। টিভি খুলুন, ভোরের কাগজ দেখুন—শুধু প্রভাবশালী, আর প্রভাবশালী! মিডিয়া অলরেডি আপনাদের ছেলেমেয়েদের বাবাদের টাকা আর ক্ষমতার গল্প শোনাচ্ছে। মনে রাখবেন সরকার চুপ করে আছে। কারণ, ওরা নাবালক। কিন্তু জনমত যে খাতে বইছে তাতে সরকার বেশিদিন চুপ করে বসে থাকবে না। আবিরের মা সিএম-এর কাছে গিয়েছিলেন। সিএম তাঁকে সহানুভূতি দেখিয়েছেন, আইন আইনের মতো চলবে এ কথা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। ব্যস, এর বেশি কিছু নয়। তাই আপনাদের বলব, দয়া করে ধৈর্য ধরুন। টাকা পয়সা, বা প্রভাব কিছু খাটানোর চেষ্টা করবেন না। আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন, ভরসা করুন। আমরা সত্যের পথেই থাকব।’
অমিত্রসূদন বলল, ‘একটা কথা বলব?’
‘বলুন।’
‘এই কথাগুলো কি আপনি সব অভিভাবকদেরই বলছেন?’
‘না।’ বিনিতা শ্রীবাস্তব একটু থামেন। ‘সবাইকে বলার প্রয়োজন মনে করছি না। আসলে আমরা তদন্তটা দুটো ভাগে করছি। যাদের আবিরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক আছে। আর কিছু আছে যারা শ্রীয়ের বন্ধু—বার্থডে উপলক্ষ্যে এসেছিল। আর—।’ বিনিতা শ্রীবাস্তব থামেন। বলেন, ‘আর আপনাদের মতো কিছু অভিভাবক—যারা সত্যি সত্যি প্রভাবশালী, কম বেশি কিছু ক্ষমতা, ব্যক্তিগত সোর্স, কিংবা টাকার জোর আছে। তাঁরা ডাইরেক্টলি বা ইনডাইরেক্টলি কেসটা থেকে চটজলদি বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। আমরা এইসব অভিভাবকদেরও চিহ্নিত করেছি। তাঁদেরই বলছি।’
‘তার মধ্যে কি আমি আছি?’
বিনিতা শ্রীবাস্তব হাসেন। আর ঠিক তখনই একজন দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। ‘মিস্টার দাশগুপ্ত, ম্যাডাম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আপনারা একটু আসুন।’
অমিত্রসূদন ও আর্যনীল দু’জনেই উঠে দাঁড়ায়।
বিনিতা শ্রীবাস্তব বলেন, ‘কী হয়েছে দাস?’
‘ম্যাডাম বসেছিলেন, তারপর ফোন এসেছিল সিঁড়ির ওদিকে গিয়ে কথাও বলে এলেন। তারপর এসে বসেই পড়ে গেলেন। অজ্ঞান মতো হয়ে গিয়েছিলেন। আমরা শুইয়ে চোখে জলের ঝাপটা দিতে জ্ঞান ফিরেছে। শুয়ে আছেন। আপনাকে ডাকছেন। বললেন, ‘চোখ-মুখ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। আপনারা আসুন প্লিজ।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন