পঁচিশ

জয়ন্ত দে

বিনিতা শ্রীবাস্তব অভিভাবকদের নিয়ে যখন অন্যঘরে চলে গেলেন তখন এ ঘরে এল আরশাদ।

চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘এত দিন তোরা আমাকে নানা গল্প বলেছিস, আজ আমি তোদের একটা গল্প বলব।’

সবাই বেশ নড়ে বসল, গল্প শুনতে কে না ভালোবাসে। রোহিত বলল, ‘এটা কি ডে ফিনালের গিফট?’ সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ আঙ্কেল।’

আরশাদ বলল, ‘হ্যাঁ, এটা আমার তরফ থেকে তোদের ফাইনাল ডে- গিফট। শুরু করা যাক—। গল্পটা পুরাণের—তোদের আঠেরো বছর হয়নি, তোরা নাবালক। তোরা নাবালক হওয়ার জন্য আইনের চোখে কিছুটা ছাড় পেলি। ন্যায় অন্যায়ের পাশে সরিয়ে আগেই তোদের বয়েসের দেওয়াল তুলে তোদের রক্ষা করা হল। তোরা বলবি এটা আইন। তা তো বটেই— আইন। কিন্তু এই আইনটা এল কোথা থেকে? আমি তোদের সেই গল্পই বলব। অথবা আরও একটু এগিয়ে গিয়ে থামব।

পুরাকালে এক ঋষি ছিলেন, তাঁর নাম মাণ্ডব্য। তিনি রোজ নিজের আশ্রমের বাইরে বসে যোগাভ্যাস করতেন, ধ্যান করতেন, তিনি ছিলেন মৌন। একদিন সেই ঋষি যখন আশ্রমের দ্বারে যোগাভ্যাস করছিলেন তখন একদল চোর আশ্রমে প্রবেশ করে। যথাসময়ে নগরপালরা চোর ধরতে সেই আশ্রমে এসে উপস্থিত হয়। তাঁরা ঋষিকে চোরদের আসার কথা জিজ্ঞাসা করতে, উত্তরে তিনি মৌন থাকেন। কোনও উত্তর না পেয়ে নগরপালরা আশ্রমে প্রবেশ করে। সেখানে তারা ঢুকতে চোর পালিয়ে যায়, যাওয়ার সময় আশ্রমে তারা চোরাই মাল সব রেখে যায়। নগরপালরা এসে সেই চোরাই মাল উদ্ধার করে মাণ্ডব্যকে রাজার কাছে ধরে নিয়ে যায়। রাজা তাঁর বিচার করেন। মাণ্ডব্য ঋষি তখনও ধ্যানমগ্ন আর মৌন। বিচারে রাজা ঋষির প্রাণদণ্ড দেন। ঋষিকে শূলে চড়ান হয়। ঋষি তখনও ধ্যানমগ্ন ও মৌন। এই শূল গাঁথা অবস্থায় বহুকাল ঋষি মাণ্ডব্য বেঁচে থাকেন।

একদিন এই খবর যায় রাজার কাছে। তখন রাজা নিজের ভুল বুঝতে পারেন। তিনি নিজে এসে ঋষি মাণ্ডব্যের কাছে ক্ষমা চান। মাণ্ডব্য রাজাকে ক্ষমা করে দেন। রাজা তখন ঋষির শরীর থেকে শূল বের করার চেষ্টা করেন। কিছুতেই সেই শূল বের হয় না। রাজা তখন মাণ্ডব্যের শরীরের বাইরে শূলের অংশ কেটে দেন। এরপর শরীরের ভেতর শূল নিয়ে ঋষি মাণ্ডব্য তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়ান। একদিন তিনি যমের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন পাপে আমার এমন শাস্তি হল? যম বললেন, আপনি ছোটবেলায় এক পতঙ্গের পায়ুদ্বারে কাঠি ঢুকিয়েছিলেন। সেই পাপের ফল এখন আপনাকে ভোগ করতে হচ্ছে। যমের কথা শুনে ঋষি বলেন, বাল্যকালে কারও ন্যায় অন্যায় পাপের বোধ থাকে না। আপনি লঘু পাপে গুরুদণ্ড দিয়েছেন। আমি আপনাকে অভিশাপ দিচ্ছি—আপনি শূদ্রের ঘরে জন্মগ্রহণ করবেন। সেই সঙ্গে ঋষি মাণ্ডব্য নিয়ম করেন—চোদ্দো বছর বয়েসের আগে কোনও পাপের জন্য কাউকে দণ্ডভোগ করতে হবে না। অর্থাৎ এই নাবালকদের রক্ষা করার আইনটা সেই পুরাণের কাল থেকেই চলছে। এই সময়ের মানুষের সৃষ্টি করা নয়।’

আরশাদ থামল, সবার মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল, তোরা নিশ্চয়ই আমার এই গল্প থেকে শুধু নাবালকদের রক্ষা কবচ করা আইনটাই দেখলি। শুধু এটা কিন্তু দেখিস না। ওটা তো আছে। আরও একটা জিনিস আমি তোদের দেখাতে চাই—সেটা হল শূল। মাণ্ডব্যের মতো তোদের পিছনেও একটা শূল ঢুকেছে। আমরা তোদের পিছনে ঢোকা শূলের বাইরের অংশ কেটে বাদ দিয়ে দিলাম। কিন্তু পুরোটা খুলতে পারলাম না। এটা নিয়েই তোদের সারা জীবন বাঁচতে হবে—এটা মনে রাখিস। এবার এই শূলটা শরীরে নিয়ে ঋষি মাণ্ডব্যের মতো মাথা উঁচু করে তীর্থে তীর্থে ঘুরবি, না সেপটিক হয়ে মরবি—সেটা বাদবাকি জীবনে তোরা ঠিক করবি। আমি শুধু তোদের সর্তক করে দিলাম।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%