জয়ন্ত দে

বিনিতা শ্রীবাস্তব এসে একবার ঘুরে গেলেন।
ভাঙা মোবাইলটা টেবিলে নিয়ে গোয়েন্দা অফিসার আরশাদ বসেছিল।
‘মোবাইলটা কী করে ভাঙল?’
‘ছুড়ে ভেঙেছি।’
‘ছুড়ে ভেঙেছিস? কেন?’
‘রেগে গিয়েছিলাম।’
‘রেগে গিয়েছিলিস কেন?’
‘আঙ্কেল, এটা ভেঙেছি একটা কারণে নয়। অনেকগুলো কারণ ছিল— জমে গিয়েছিল। রাগ ক্লিয়ার করে দিলাম।’
গোয়েন্দা অফিসার আরশাদ শীতল চোখে আর্যনীল দাশগুপ্তের দিকে তাকাল—। ‘তুই কি আমার ওপর রেগে উত্তর দিচ্ছিস?’
—‘একদম নয়। বাবা বলেছে, “সব সত্যি কথা বলবি।” তাই সত্যি বলছি।’
‘তোর সিম কার্ড?’
‘সঙ্গে আছে, দিয়ে দিয়েছি। দেখে নাও।’
‘এত রাগ তোর?’
‘শুধু আমার না আমাদের সবার, আমরা প্রায় সবাই মোবাইল ভেঙেছি—খোঁজ নিয়ে দেখো। এটা আমার থার্ড টাইম।’
‘তোদের সবারই এত রাগ?’
‘সবার রাগ নয়, অনেক সময় ফলস—নতুন কেনার জন্য।’
‘ও।’
গোয়েন্দা অফিসার আরশাদ একবার ওর মুখের দিকে তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। ঢোঁক গিলল যেন। বাইরে প্রভাবশালী আর বড়লোকের বখাটে ছেলেমেয়েদের তত্ত্ব চলছে—। এসব কথা ওরা একবার শুনলে আর দেখতে হবে না। নতুন ফোন কেনার জন্য এরা বাবা মাকে ফলস দিয়ে ফোন ভাঙে! এটাই দারুণ খবর হয়ে যাবে।
‘আঙ্কেল টিভিতে দেখছ না—? আমরা সব বড়লোক বাপের বখে যাওয়া সন্তান!’
‘কাল বাড়ি গিয়ে টিভি দেখেছিস? টিভি দেখিস না। এখন মিডিয়া ট্রায়াল চলছে। সবার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে, তোদেরও মাথা খারাপ করে দেবে।’
‘না, ঘুমিয়েছি। আমার বাবারা সবাই তো এখন প্রভাবশালী!’
‘গুড। আমি তোর এই ভাঙা মোবাইলটা জমা করছি। কেস মিটে গেলে ফেরত পেয়ে যাবি।’
‘এটা কিন্তু ইনসিডেন্টের পাঁচদিন আগে ভাঙা হয়ে গেছে। তোমার কোনও কাজে লাগবে না।’
‘হোক। তোরও তো কোনও কাজে লাগবে না। তুই তোর ফেসবুক, হোয়াসঅ্যাপ, ইন্সটাগ্রামের পাসওয়ার্ড দিবি। ওই খাতার ওপরে লিখে দিবি।’
আর্যনীল দাশগুপ্ত।
ফেসবুক...পাসওয়ার্ড...
হোয়াটসঅ্যাপ...পাসওয়ার্ড...
‘সেদিন আমার হোয়াটসঅ্যাপে কেউ ফোটো পাঠায়নি। সবাই জানত, আমার বাড়িতে ঝামেলা হয়েছে, আমি রাগ করে মোবাইল ভেঙেছি। দু’দিন আগে আমার মায়ের মোবাইলে রোহিত ফোন করেছিল। মা ধরেনি। সেদিন সকালে মায়ের সঙ্গে ঝামেলাটা মিটে গিয়েছিল বলে মায়ের ফোনে হাত দিলাম। নইলে ল্যাপটপ থেকে মেসেঞ্জারে কথা হচ্ছিল। ল্যাপটপ থেকে যে কথা হচ্ছিল, এটা বাড়িতে বলিনি। বললে ল্যাপটপটাই নিয়ে নেবে। বাপরে!
শ্রীর বাড়িতে আমরা হইচই করছিলাম না। কিন্তু সবাই মিলে কথা বলছিলাম, গল্প করছিলাম, আড্ডা মারছিলাম। শ্রীর মা এসে বলল, শ্রাদ্ধের কাজের লিস্ট বানানোর জন্য পণ্ডিতমশাই এসেছেন। আমরা এমন করলে—তিনি আমাদের খুব খারাপ ভাববেন। ভাববেন, শ্রীর ঠাকুমা মারা গেছেন, আর দেখো এরা শোকের বাড়িতে কেমন মজা করছে।
সত্যি কথা বলতে মজা তো আমরা করছিলামই। আমরা তো বুড়োদের মতো গালে হাত দিয়ে বসে থাকব না!
শ্রী বলল, “চল এখান থেকে আমরা বেরিয়ে যাই।”
“কোথায় যাবি?” শ্রীর মা বলল।
“আমি বাবার থেকে কার্ড নিচ্ছি—সবাইকে নিয়ে টলি ক্লাবে চলে যাচ্ছি। ওখানে সবাই লাঞ্চ করব।”
শ্রীর মা রাজি হয়ে গেল। বলল, “ঠিক আছে তাই যা, ওখানে সবাই লাঞ্চ করে নিবি।”
শ্রী ওর বাবার থেকে ক্লাবের কার্ড নিয়ে এল। চারটে গাড়ি করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমি উঠেছিলাম রোহিতের গাড়িতে। আমাদের গাড়িতে ছিল রোহিত, আমি, শ্রী, অগ্নিমিত্রা আর আবির।
রোহিতদের ড্রাইভার আঙ্কেলকে আবির বলে রেখেছিল। গাড়ি এসে সাউদার্ন অ্যাভিনিউর একটা লিকার শপের সামনে এসে দাঁড়ালে আবির নেমে গেল। ওর সঙ্গে সঙ্গে আমি আর রোহিতও নেমেছিলাম। পিছনের গাড়ি থেকে সবুজও নেমে এসেছিল। আবির দোকানের সামনে গিয়ে ডাকল, “আঙ্কেল—।”
দোকানদার ওকে চেনে। আবির বলল, একটা অ্যাবসিলিউট দাও।
দোকানদার ওকে একটা অ্যাবসিলিউটের বোতল দিয়ে দিল। ভদকা! আবির টাকা দিল না। বলল, “মা দেবে।” আবির আমাকে বলেছিল, “এখানে আমাদের খাতা আছে, আমার মা দিয়ে দেয়।”
আমি অবাক হয়ে আবিরের দিকে তাকিয়েছিলাম। ওর মা ছেলের মদের পেমেন্ট করে দেবে! ওদের বাড়ির লোকজন সবাই আলাদা! আলাদা জগৎ! আমাদের বাড়ির মতো নয়। কিছুদিন আগে, ছ’মাস হবে—আবিরের বাবা মারা গেছেন। শুনেছিলাম, সেদিন রাতেও আবির বন্ধুদের সঙ্গে ড্রিঙ্ক করেছিল। এটা ভুলও হতে পারে। কিন্তু আবির বলেছিল আমাকে আর রোহিতকে। রোহিত বলেছিল, “হিরো সাজার জন্য ও ঢপ দিচ্ছে। বাবা মারা গেছে ও দারু খেতে পারে? ওর সবকিছুতেই হিরোগিরি!”
আমার কিন্তু অস্বাভাবিক লাগলেও একটু সন্দেহ ছিল। আমি তো জানি প্রচুর মানুষ শ্মশানে গিয়ে মদ খায়। এরাও শ্মশানযাত্রী! সেই হিসেবে সবাই হয়তো খাচ্ছিল, আবিরও এক সিপ নিয়েছিল। পরে সেটাই গল্প করেছিল।
আবির শ্রীর জন্মদিনের আগের রাতে বন্ধুদের সঙ্গে একটা নতুন ক্লাবে গিয়েছিল। সেখানে অনেক রাত পর্যন্ত পার্টি করেছে। ড্রিঙ্ক করেছে। ও খুব মদ খেতে পারে। ওর মতো এই গ্রুপের কেউ মদ খেতে পারে না। ও প্রায় রোজই পার্টি করে। অনেক রাত পর্যন্ত ক্লাবে থাকে। ওর মা কোনও ঝামেলা করে না। ওর মায়ের একটা বিউটি পার্লার আছে। আন্টি খুব ভালো। আমি দু’বার আন্টির সঙ্গে কথা বলেছি, খুব ফ্রেন্ডলি। আবির পড়াশোনা করতে চায় না, সারাদিন পার্টি করে বেড়ায়। আন্টি ওকে খুব বোঝায়। কম কম পার্টি করতে বলে। আমাদের সামনেই বকে। আবিরের মা-আন্টির সঙ্গে রোহিতের মা-আন্টির ফ্রেন্ডশিপ ছিল। এখনও আছে। ওরা ওদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। এটা শোনা কথা, আবির বলেছিল, কোন একটা বারে নাকি আবিরের মা-আন্টি আর রোহিতের মা-আন্টি দু’জনে মিলে দু’দিক থেকে সাজানো টাকিলার শর্ট নিয়েছিল। তবে রোহিত শুনে বলেছিল, “আমি কখনও শুনিনি, আবির গুল দিয়েছে।” ওই যে হিরো সাজা! ও অবাক করা সব কথা বলত। এখন রোহিতের মা খুব অসুস্থ। ক্যানসার হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি। জাস্ট জানিয়ে রাখলাম। রোহিতের মা-আন্টি নিশ্চয়ই এই কেসে জড়াবে না।
আবির আগে আমাদের স্কুলে পড়ত। ক্লাস নাইনে ওকে স্কুল থেকে টিসি দিয়ে দেয়। কী একটা ঝামেলা হয়েছিল। ঝামেলাটা কী সেটা জানতে হলে স্কুলে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে। আমি একদম অন্যরকম একটা কথা শুনেছিলাম। সে সব কথা এই কেসের সঙ্গে যায় না, তাই লিখছি না। শুনতে হলে স্কুলে যেতে হবে। তবে ফাদার বলবেন না। তাহলে স্কুলের বদনাম হবে। কিন্তু অন্য স্যারেরা বলে দেবে।
যাই হোক, আমাদের স্কুলে রোহিত এসে ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়। ক্লাস নাইন থেকে রোহিতের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। রোহিতের থেকে আমার সঙ্গে আবিরের চেনা জানা হয়। আবিরকে সবার ভালো লাগে। ও খুব মজা করে। হাসে আর হাসাতে পারে। আমাদের গ্রুপের ছেলেদের মধ্যে ও-ই সবার থেকে ফানি আর ড্রামাবাজ। শ্রুতিও খুব মজা করে। ও একবার কাজল দিয়ে লিপস্টিক বানিয়েছিল।
শ্রী খুব চুপচাপ, লাজুক, ইন্ট্রোভার্ট। অনেকটা আমার মতো।
অনুষ্কা-ঊষসীও খুব হুল্লোড়বাজ। লাউড। সব সময় হাসে আর চিৎকার চেঁচামেচি করে।
রোহিত ধীর স্থির, খুব ভালো কথা বলে। ওর মধ্যে একটা বস বস ভাব আছে। রোহিত চায় সবাই ওর কথা শুনে চলবে। ও টিমটাকে লিড করবে।
সবুজ খুব বুঝদার। হেল্পফুল।
অন্য গাড়িতে ছিল সবুজ। আবিরকে একটা সেভেন ফিফটি বোতল কিনতে দেখে সবুজ আমাকে বলল, “ভাই দেখিস। ও সকালে কী খেয়ে বেরিয়েছে?” আমি আবিরকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী খেয়ে এসেছিস?” ও বলল, “এক গ্লাস দুধ।” সবুজ বলল, “দেখিস বেশি বাড়াবাড়ি যেন না করে। তাহলে গাড়িতেই উলটি করে ভাসাবে।” ইস, এমন যদি হত, অ্যাবসিলিউটটা কিছুটা খেয়েই ও বমি করত, গাড়ির মধ্যে পড়ে পড়ে ঘুমাত, তাহলে আবির বেঁচে যেত।
অ্যাবসিলিউটটা ও কয়েক ঢোঁক খেয়ে আমাদের মুখেও একটু একটু করে দিল। ‘না’ বললে ও শুনবে না। আর সত্যি বলতে দু’-একজন ছাড়া ‘না’ কেউ বলবেও না। পেলে কে ছাড়ে? তবে সময়টা নিয়ে সবারই একটু আপত্তি ছিল। আমি বললাম, এখন থাক, পরে খাওয়া হবে। এই করতে করতে আমরা টলি ক্লাবে চলে গেলাম। এইখানে আমরা লাঞ্চ করব। কিন্তু টলি ক্লাব আপত্তি করল, বলল, “হবে না এতজন!” তাই যার কার্ড তাকে থাকতে হবে। অরিজিনাল কার্ড মেম্বার না থাকলে হবে না। মুখ চুন করে দাঁড়িয়েছিল শ্রী। আমরা যে যার মতো তালে গোলে পাক খাচ্ছি। মজা করছি। তাহলে ফিরে যাব। কিন্তু কোথায় ফিরব? তখন একজনও যদি বাড়ি চলে যেতে চাইত তাহলেই গ্রুপ ভেঙে যেত, পার্টি শেষ হয়ে যেত। কিন্তু কেউ যেতে চাইছে না, খাবার নাহলে কী হবে, বন্ধুরা তো আছে, আড্ডা হবে। খাওয়া নিয়ে কেউ ভাবে না।
অগ্নিমিত্রার সঙ্গে সঙ্গেই ছিল আবির। আবির ওকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছে আর অগ্নিমিত্রা কেমন যেন পিছলে পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে। আবির আর অগ্নিমিত্রার মজা দেখছি।
সেদিন যদি অগ্নিমিত্রা টলি ক্লাব থেকে বাড়ি চলে যেত। তাহলে আবিরও নির্ঘাত শ্রীর বার্থডের পার্টিতে আর সময় নষ্ট করত না। হয়তো আমাদের সারপ্রাইজ পার্টি শেষ হয়ে যেত। সন্ধেবেলা সবার দেখা হত হায়াতে—সূর্যর প্রোগ্রামে। কিন্তু কেউ গেল না। খাবার না পেয়ে আমরা ওখান থেকে রওনা দিলাম। খাবারের জন্য নয়, টলি ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন