ষোলো

জয়ন্ত দে

শকুন্তলা বলল, ‘আমাকে সোহমের মা এসএমএস করল—টিভিটা খুলতে বলছে—।’

অমিত্রসূদন নির্বিকার গলায় বলল, ‘টিভি খোলো। টিভি না খোলার কী আছে? আমি বারণ করিনি।’

‘না, লালবাজারের ওরা বলছিল, একদম টিভি দেখবেন না, খবরের কাগজ পড়বেন না। আপাতত এই দুটো জিনিস থেকে দূরে থাকুন, ভালো থাকবেন। নইলে টেনশনে শেষ হয়ে যাবেন।’

‘ঠিকই বলেছে। ওরা বারণ করেছে আমাদের জন্য। টিভির খবর দেখলে আমাদেরই মনে চাপ পড়বে।’ অমিত্রসূদন টিভি চালাল, এবিসি-উল্লাস। চ্যানেল জুড়ে বিরাট হল্লা। আবিরের প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ড ইন্টারভিউ দিচ্ছে। এখন যে কোনও পরিবারেই টিভি অন্যতম প্রধান সদস্য। তার নিশ্চুপ হয়ে থাকা একরকম ছিল। তার আগমন বার্তা রটে গেল দিকে দিকে। ঘর থেকে বেরিয়ে এল আর্য। এসে সোফায় বসল। অমিত্রসূদন এক পা এক পা করে বারান্দায় চলে গেল।

হা-হা করে হাসছে আর্য। ‘আরে প্রত্যুষার মুখ দেখাচ্ছে না। কিন্তু আমি এসেই চিনতে পারছি। মা তোমাকে বলেছিলাম না, এটা একদম ফালতু মেয়ে, রোহিতদের বাড়ির উলটো দিকে থাকে। রোহিতের সঙ্গে চেনাজানা, সেই সূত্র ধরে আবিরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিল। আবিরের সঙ্গে এখানে ওখানে যাচ্ছিল। আঙ্কেল জানতে পেরে সোজা আবিরের মাকে গিয়ে বলে এসেছে। আবিরের মা আন্টিও আবিরকে বলেছে, “ওই মেয়েটার সঙ্গে মিশবি না।” ও এখন আবিরের গার্লফ্রেন্ড সেজে রোহিত আর আঙ্কেল-এর ওপর বিষ ঝাড়ছে। এই দেখো মা শোনো শোনো, ও কী বলছে।

প্রত্যুষা বলছে—

‘আমাদের বাড়ি রোহিতদের বাড়ির তিন চারটে বাড়ির পরে। রোহিত আমার পাড়ার বন্ধু। রোহিতের সঙ্গে আমার খুব ভালো ফ্রেন্ডশিপ ছিল, আবিরের সঙ্গেও ছিল। রোহিতের বাবা অত্যন্ত বাজে লোক। তিনি আমাকে সহ্য করতে পারতেন না। তিনি চাইতেন না রোহিতের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব থাকুক। কিন্তু আমরা এক পাড়ার তাই বন্ধুত্বটা ছিল। এবার উনি যখন জানলেন আমার সঙ্গে আবিরের বন্ধুত্ব হয়েছে, হয়তো রোহিতের কাছ থেকেই সব শুনেছিলেন; শুনে উনি সোজা চলে গেলেন আবিরের মায়ের কাছে। আবিরের মাকে আমার নামে বলে এলেন আমি খারাপ মেয়ে। এদিকে আবার আমার মাকেও ডেকে পাঠালেন ওনার অফিসে। বললেন, “আবির খুব খারাপ ছেলে। আমি একটা খারাপ ছেলের সঙ্গে মিশছি। আমি পাড়ার মেয়ে তাই সাবধান করে দিচ্ছেন।” আমাদের মেলামেশা নিয়ে আমাদের আর আবিরের পরিবারে গোলমাল লাগিয়ে দিয়েছিলেন। শুনেছি এই ঘটনা নিয়ে রোহিত ওর বাবার এগেনস্টে প্রটেস্ট করে। ঝামেলা করে। তাই, পরে উনি বাধ্য হয়ে আবিরের মায়ের কাছে ক্ষমা চান। তারপর রোহিত আর আবিরের মধ্যেও বন্ধুত্বে চিড় ধরে। তবে কিছু দিন হল ঠিক হয়ে গিয়েছিল। ওরা সেদিন দু’জনে আবার কী করে একসঙ্গে হল, কে কাকে ডাকল জানি না। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না আবির নেই। আমি ভাবতেই পারছি না—সকালে ঘুম থেকে উঠে ওর মেসেজ পাব না—।’

সোফায় বসে আর্য হাসে। ‘ঠিক আছে, ও যা বলছে এটার মধ্যে কোনও ভুল নেই। আঙ্কেল এই কাজটা করেছিল। তারপর রোহিত ওর বাবাকে খুব বকেছে। আঙ্কেল আবিরের মায়ের সঙ্গে কথাও বলে নিয়েছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, এই ঘটনার সঙ্গে এগুলোর কথা কেন এল? প্রত্যুষা কী চায়? ও দেখাতে চাইছে আঙ্কেল কতটা খারাপ? আঙ্কেল খারাপ তো রোহিত কী করবে?’

শকুন্তলা বলল, ‘তুই এই মেয়েটাকেও চিনিস? কই আগে তো এর কথা শুনিনি, এসব কথা কখনও শুনিনি।’

আর্য হাসল, ‘সবটা বলিনি, তবে বলেছি। বাবা বলে এগুলো পুকুরঘাটের গপ্প। আমি তোমার সঙ্গে কি পুকুরঘাটের গপ্প করব? এই চ্যানেলগুলো করছে বলে আমি আজ বললাম। এরা কিছু পায় না, এমন বোকা বোকা বিষয় নিয়ে পড়ে থাকে—প্যানপ্যানানি বাংলা সিনেমার থেকেও খারাপ।’

শকুন্তলা আর্যর দিকে তাকিয়ে থাকে। আর্য কবে এত বড় হয়ে গেল। এখনও তো শকুন্তলাকে দেখলে বলে, ‘আমি জগন্নাথ। আমার হাত নেই, খাইয়ে দাও।’ এখনও তো বাইরে থেকে ঘরে এসে কত কত কথা বলে— কিন্তু এই ক’দিনে যা শুনছে তা আগে কোনওদিন শোনেনি। এত কথা ও পেটের ভেতর চেপে রেখে দিত, যার একটুও জানতে পারেনি শকুন্তলা। আর্য ভেতর ভেতর এত বড় হয়ে গেছে!

শকুন্তলা বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

অমিত্রসূদন ফোনে কথা বলছিল। গ্রুপের কেউ হবে। শকুন্তলা বারান্দায় দাঁড়িয়েই মনে হল, পাশের ফ্ল্যাট বাড়ির থেকে সেবন্তীর বাবা যেন ওদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছেন। অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছেন। শকুন্তলা মনে হল, অমিত্রসূদনের গলার স্বর কি ওই বাড়ির বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে? ওরা কি অমিত্রসূদনের ফোনালাপের কোনও কথা শুনেছে? নাহলে অমন করে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে কেন? শকুন্তলা ওদিকে না তাকিয়ে বেতের চেয়ারে বসে পড়ল। চেয়ারে বসে মনে হল, তার শরীরটা যেন কদিনে বড্ড ভারী হয়ে গেছে। এই যে বসল, আগের মতো করে সে বসতে পারল না। শরীরটা যেন চেয়ারের কাছে এসে ঝুপ করে পড়ল। চুপ করে বসে থাকল সে কিছুক্ষণ। অমিত্রসূদন রিহার্সাল নিয়ে কথা বলে যাচ্ছে। কী শান্ত ওর গলার স্বর। মানুষটা এত শান্ত থাকে কী করে? শকুন্তলার তো সর্বক্ষণ বুকের ভেতর উথালপাথাল হচ্ছে—আর্য ঠিক কথা বলছে তো, মিথ্যে বলছে না? এই ছেলে অনেক কথাই পেটে চেপে রাখে। শকুন্তলা তো ডে টু ডে, টাইম টু টাইম সব কথাই জানে বলে মনে করত। এখন বুঝতে পারছে আর্য তাকে কত বড় বুদ্ধু বানিয়েছে।

ছোটবেলায় একবার রীতার ছেলের সঙ্গে খেলতে খেলতে বলেছিল, ‘মাকে আমি বুদ্ধু বানিয়ে দেব।’ আর্যর কথা শুনে রীতা বলেছিল, ‘দেখ শকুন্তলা তোর ছেলে কী বলছে!’ শকুন্তলা হাসছিল, ‘হ্যাঁ, ও আমাকে বোকা বানাবে—কী কনফিডেন্স দেখেছিস? ও বুদ্ধু বানাবে আর আমি বুদ্ধু হয়ে যাব! তবে কনফিডেন্স থাকা ভালো।’ অনেকদিন পরে শকুন্তলার মনে হল, আর্য তাকে বুদ্ধুই বানিয়েছে। সে ঘুণাক্ষরে আর্যর চেপে রাখা কথার সামান্য হদিশ পায়নি।

শকুন্তলা বারান্দায় টবের দিকে তাকাল। ইশ! কতদিন টবগুলোতে জল দেওয়া হয়নি। সে উঠে পড়ল। মগে করে জল এনে টবে জল দেওয়া শুরু করল। অমিত্রসূদন তখনও কথা বলে যাচ্ছে। সব কথা নাটকের গ্রুপ সংক্রান্ত। হঠাৎ অমিত্রসূদন বলল, ‘একটু রাখো—একটা ফোন আসছে।’

শকুন্তলা টবে জল না ঢেলে স্থির হয়ে দাঁড়াল।

‘হ্যাঁ বলছি, বলুন।’

‘চারটে। ঠিক আছে।’

শকুন্তলা তাকাল। অমিত্রসূদন ম্লান স্বরে বলল, ‘কাল চারটে।’

‘কালও? আচ্ছা। আমরা ট্যাক্সিতে যাব। ড্রাইভার বলতে হবে না।’

‘ঠিক আছে। আমি অফিস থেকে চলে যাব।’

‘তুমি তো ক’দিন ছুটি নিতে পারো।’

‘আমি অফিসে ছুটির কথা বলেছিলাম। কিন্তু সহকর্মীরা অফিস করতেই বলল। বেরিয়ে আসায় কোনও সমস্যা হচ্ছে না। আর ছুটি নিলে ক’দিন ছুটি নেব বলো? একদিন, দু’দিন, একসপ্তাহ—ক’দিন আমি জানি না।’ অমিত্রসূদনের শেষের কথাগুলো তার গলার ভেতর ডুবে গেল। রিহার্সালে হলে, স্টেজে হলে অমিত্রসূদন চিৎকার করত—গলার স্বর এত ডুবে গেলে হবে না। ডায়লগে আবেগ অনুভূতি চাপা কান্না সব রাখো, তা সত্ত্বেও কথাগুলো কিন্তু স্পষ্ট শোনাতে হবে। শুনতে না-পেলে অডিয়েন্স ফিল করবে কী করে? নাটক নয়, বাস্তবে তার গলার স্বর সত্যি সত্যি প্রচণ্ড ডুবে গেল হতাশায়।

এমনিতে বেশ সকালেই শকুন্তলার ঘুম ভাঙে। কিন্তু ক’দিন হল সারা শরীরের ভেতর এত জ্বালাপোড়া, দিনের আলো ফুটলেই সে আর বিছানায় থাকতে পারছে না, উঠে পড়ছে। সকালে শকুন্তলা গিয়েছিল সামনের দোকান থেকে দুধ নিতে। ফিরে আসার সময় উলটো দিকের বাড়ির মাসিমা তাকে হাতের ইশারায় দাঁড়াতে বলল। মাসিমা এগিয়ে এল ধীর পায়ে। বলল, ‘তোমাদের কি কোনও কিছু হয়েছে?’

শকুন্তলা না বলতে গিয়ে বলল, ‘কেন বলুন তো মাসিমা, কী হবে?’

‘না, রোজ রোজ দেখছি দুপুরবেলায় বেরিয়ে যাচ্ছ—।’

শকুন্তলা একটু থামল, বলল, ‘আর্যর নতুন কোচিং ক্লাস—।’

‘ও তাই! কিন্তু কাল একটা প্যান্ট পরা মেয়ে এসে খুব তোমাদের খোঁজ নিচ্ছিল।’

শকুন্তলা ঢোঁক গিলল। ‘তাহলে কোর্ট থেকে এসেছিল, আর্য তো ল’ পড়বে, তাই।’

‘তালে তাই হবে। সত্যি সত্যি মেয়েটা উকিলই হবে গো। দুপুরবেলা তোমরা কেউ বাড়িতে ছিলে না, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেরা করছিল, কত কথা। তা আর্য ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং কিছু পড়বে না?’

‘না, ওর ইচ্ছে উকিল হবে।’

‘উকিল ভালো? কিন্তু ডাক্তার হলেই ভালো হত।’

দুধের প্যাকেটটা বড় ঠান্ডা, সেই ঠান্ডা যেন এই মধ্য জুলাইয়ের ভ্যাপসা গরমকে হার মানিয়ে তার মাংস চামড়া ফুঁড়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। শকুন্তলা বিড় বিড় করে, ‘আমি যাই মাসিমা।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%