সতেরো

জয়ন্ত দে

শ্রী হল বিখ্যাত শিল্পী সৌরীন মুখার্জির মেয়ে। ওর বাবার আঁকা ছবি দেশ বিদেশে বিক্রি হয়। প্যারিস, ইতালি ওর বাবার আর একটা ঘর-বাড়ি। ওরা থাকে রয়্যাল গার্ডেন। কলকাতার খুব পুরোনো আর বনেদি কমপ্লেক্স। ওই বাড়িতে আমাদের বন্ধুদের খুবই যাতায়াত। অনেক সময়ই ওর বাবা মা এই বাড়িতে থাকতেন না। বিদেশে চলে যেতেন। তখন শ্রী একা ওর ঠাকুমার সঙ্গে থাকত। এখানে আমাদের অবাধ যাতায়াত। ওর বাবা মা থাকলেও যেমন, না থাকলেও তেমন।

শ্রীর কথামতো, সেদিন দুপুরে পর পর তিনটে গাড়ি নিয়ে আমরা আবার হাজির হয়ে গেলাম রয়্যাল গার্ডেনে। শ্রী বলল, আমরা সোজা চলে যাব শ্রীয়ের ঘরে, সন্ধে পর্যন্ত সেখানেই থাকব। একটু পরেই শ্রীয়ের বেশিরভাগ বন্ধুই চলে যাবে। আমি, রোহিত, সবুজ, আবির, শ্রী, অনুষ্কা, ঊষসীরা সন্ধে পর্যন্ত থেকে সাতটা নাগাত হায়াতের পার্টিতে ঢুকব। তবে আর যদি কেউ যেতে চায় সে-ও যেতে পারে।

ওদিকে আবিরের গাড়িতে অর্ধেক খাওয়া ভদকার বোতলটা আছে। অনুষ্কা আর ঊষসী বলল, ‘আমরা ভদকা খাব।’ কিন্তু অত ভদকা তো নেই। রোহিত ঠিক করল, আমরা কেউ খাব না, তিনটে ব্রিজির বোতল আনা হবে। ড্রিঙ্কস আনতে গাড়ি নিয়ে চলে গেল আবির। আমরা তখন গল্প করছি। কিন্তু আবির ফিরল দুটো বড় বোতল নিয়ে। এত মদ কে খাবে? আবির বলল, সবাই মিলে খেয়ে নেবে। যাদের খাওয়ার ইচ্ছে তারা খেতে শুরু করল। আবিরই এর তার মুখে অল্প অল্প ঢেলে দিচ্ছিল।

কিন্তু শ্রীদের বাড়ি গিয়েও আমরা ওদের ফ্ল্যাটে গেলাম না। কেউ একজন বলল, ‘চল আমরা নীচেই আড্ডা মারি।’ নীচের জায়গাটা অনেকটা বড়, খোলামেলা। আমরা কেউ আর ওপরে গেলাম না। কখন যেন আমরা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে গেলাম। আমি আর দু’টি মেয়ে, শ্রুতি আর রূপকথা একটু দূরে সরে গেলাম। রোহিতকে বললাম, ‘হায়াতে কটায় যাবি?’

‘সাতটা?’

‘রোহিত সাতটায় গিয়ে চেষ্টা করব দশটার মধ্যে বাড়ি ঢুকে পড়তে।’

রোহিত বলল, ‘ঠিক আছে।’

‘আটটা থেকেই আমার মায়ের ফোন আসা শুরু হবে। দশটা মানে মারাত্মক চিৎকার চেঁচামেচি করবে।’

রোহিত বলল, ‘আমারও বেশিক্ষণ থাকার ইচ্ছে নেই। মা হসপিটালে। বাবা সন্ধেবেলা যাবে। আমি বাড়ি চলে আসব। আমারও ভালো লাগছে না। মা হসপিটাল থেকে ফোন করলে মুশকিলে পড়ে যাব ভাই।’

আমি ঠিক করেছিলাম সাড়ে ন’টার মধ্যে হায়াত থেকে বেরিয়ে আসব। কিন্তু রোহিত না বেরিয়ে এলে আমি আসতে পারব না। আমার কাছে অত টাকা নেই যে ট্যাক্সি ধরে চলে আসব। আমাকে রোহিতের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে। তাই রোহিতকে সিচ্যুয়েশনটা আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম। সকালে বেরিয়েছি, আটটা বেজে গেলেই মা চিল্লাবে। ফোনের পর ফোন করবে। আর এখানে কোনও রকম ড্রিঙ্ক করব না, ওখানেও করব না। ওখানে কেউ দেখার নেই—কে খেল কে না খেল। এখানে ড্রিঙ্ক না করার জন্য আমরা তিনজনে একটু সরে গেলাম ওদের চোখের সামনে থেকে।

তবে আবিরের হাত থেকে মুক্তি নেই। ও বগলে করে ওর সকালে কেনা অ্যাবসিলিউটের বোতলটা নিয়ে ঘুরছে। ঘুরে ঘুরে যারা যারা খাচ্ছে না তাদের মুখে একটু করে দিয়ে আসছে। এত মদ ও খাচ্ছে, আবার সন্ধেবেলা কী করে যে পার্টিতে যাবে কে জানে?

আমার শোনা কথা, মাস ছয়েক আগে ওর বাবা মারা গিয়েছিল। সেদিন রাতেও ও নাকি ওর বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ড্রিঙ্ক করেছে। এই কথাটা রোহিত আর আমি জানি। তবে কোনওদিন ওকে জিজ্ঞাসা করিনি। ওর বন্ধু বান্ধবদের সার্কেলটা একদম অন্য। ওদের সঙ্গে ঠিক আমাদের যায় না। ওরা সব খতরনাক ছেলে। রোহিতের সঙ্গে ও আগে একই স্কুলে পড়ত। বন্ধুত্বটা ছোটবেলার।

আমি ওদের দু’জনের ছোটবেলার অনেক কথাই জানি। ওকে আমি স্কুলে আগে দেখেছি। পরে রোহিত ওই স্কুলে ভর্তি হতে আমার সঙ্গে আবিরের বন্ধুত্ব হয়। তবে কোনও সময়ই তেমন বন্ধুত্ব ছিল না। কিন্তু ভালো সম্পর্ক ছিল। এই তো কিছুদিন আগে ওর এক মামাকে পাঠিয়ে আমার কাছ থেকে একটা বই নিয়ে গেল। ছেলেটা মজার কিন্তু বহুত নেশা করতে পারে। নেশা করে খুব হইহুল্লোড় করে।

আমরা তিনজনে একটা গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে গল্প করছিলাম।

হঠাৎ আমার কাছে অনুষ্কা আসে দৌড়ে দৌড়ে। বলে, ‘আবির পড়ে গেছে। ওর হাত কেটে গেছে।’

আমি সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে সেখানে যাই। গিয়ে দেখি ও একটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে। ওর হাতের ওপর দিকে বগলের কাছে কেটে গেছে। সেখান দিয়ে গল গল করে রক্ত বেরুচ্ছে। আমার সঙ্গে সঙ্গে সবুজও দৌড়ে এসেছে। ও এসে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করে। তখন খুব রক্ত বেরচ্ছে। সবুজ ওর গায়ের টিশার্ট খুলে কাটা জায়গায় চেপে ধরে।

গিয়ে শুনেছিলাম, গাড়িতে ওঠার জন্য সামান্য উঁচু জায়গার ধারে ছোট পাঁচিল দেওয়া থাকে সেই পাঁচিল টপকাতে গিয়ে আবির পড়ে গেছে। জায়গাটায় খুব শ্যাওলা ছিল। বৃষ্টি বা গাড়ি ধোয়ার জল ছিল। ওইটুকু উঁচু জায়গা থেকে নামতে গিয়ে কেউ পড়ে যায় না। আর পড়ে গেলেও ব্যালান্স রাখতে পারবে না এমন নয়। আসলে পড়েছে ওখানে শ্যাওলা আর জল থাকার জন্য। আর আবির তখন অনেকটা মদ খেয়ে টলমল করছিল।

ওই বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডরা দৌড়ে আসে।

আমাদের কেউ একজন বলে, ‘হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।’

কিন্তু কীভাবে নিয়ে যাব? ততক্ষণে রোহিত এসেছে। দাঁড়িয়ে আছে। ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি চাই। ‘রোহিতের গাড়ি করে নিয়ে চল’, একজন বলল। রোহিত কোনও কথা বলল না। একজন বলল, ‘অ্যাম্বুলেন্স চাই।’

খবর পেয়ে ওপর থেকে নেমে আসে শ্রীয়ের বাবা। সৌরীন মুখার্জি। তিনি দূরেই দাঁড়িয়ে থাকেন। এ বাড়ির বড়রা আরও কেউ কেউ এসে গেছে ততক্ষণে। তারা কিন্তু কেউ কিছু করছে না। সবাই-ই পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমরা তখন দৌড়াদৌড়ি করছি—কীভাবে নিয়ে যাব? অ্যাম্বুলেন্স চাই।

আমাকের সবুজ বলে, ‘ভাই অ্যাম্বুলেন্সের দরকার নেই—; রোহিতকে বল—ওর গাড়িতে করে নিয়ে চলে যাব।’

আমি রোহিতকে বলি, রোহিত ওর ড্রাইভার আঙ্কেলকে ফোন করে, সে ফোন ধরে না। আমরা তাকে খুঁজতে যাই। তাকে পাই। তখন শুনি একজন সিকিউরিটি চিৎকার করছে, ‘ওখানে খুন হয়েছে।’ এই সময়ে আমাদের কেউ একজন একটা ট্যাক্সিও ডাকে। কিন্তু সিকিউরিটির খুন খুন চিৎকার শুনে সে পালিয়ে যায়।

রোহিত ড্রাইভার আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলে। ড্রাইভার আঙ্কেল বলে, ‘দাঁড়াও তোমার বাবাকে আগে ফোন করি। সে একটু দূরে গিয়ে রোহিতের বাবাকে ফোন করে কথা বলে।’

তখন আমার মনে হয়েছিল, রোহিতের বাবা যেন বারণ করেছিলেন। বা ড্রাইভার আঙ্কেলও যেন গাড়িতে নিতে চাইছিল না। তারপরও আমরা যখন আগের জায়গায় আসি দেখি সবুজ আর অনুষ্কারা একটা গাড়িতে করে আবিরকে নিয়ে হাসপাতালে চলে গেছে।

শুনলাম পিছনের গাড়িতে শ্রীয়ের বাবাও গেছেন।

আমি একটু নিশ্চিন্ত হই। যাক! হাসপাতালে গেছে। হাত স্টিচ করে দেবে রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে। চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু টেনশন ছিল। সবুজ আর অনুষ্কা কি সামলাতে পারবে? তবে শ্রীয়ের বাবা আছেন। রোহিতকে বলি, ‘চল আমরাও হাসপাতালে যাই।’ রোহিতও যাবে বলে। ড্রাইভার আঙ্কেলকেও সেই কথা বলে। ড্রাইভার আঙ্কেল আবার ওর বাবাকে ফোন করে। তারপর সেই ফোনটা দেয় রোহিতকে। রোহিত ওর বাবার সঙ্গে কথা বলে।

আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করে। ওখান থেকে বেরিয়ে গাড়িটা হঠাৎ ডানদিকে না গিয়ে বাঁদিকে যায়। আমি রোহিতকে বলি, ‘হসপিটাল তো বাঁদিকে।’

রোহিত বলে, ‘বাবা বলেছে আমাকে মায়ের কাছে যেতে।’

আমি তখন ওকে বলি আমাকে নামিয়ে দে। আমি ওদের কাছে যাব। ওখান থেকে একা বাড়ি চলে যাব। আমি ড্রাইভার আঙ্কেলকেও বলি, কিন্তু গাড়ি থামায় না। উলটে গাড়ির দরজা লক করে দেয়। আমাদের সঙ্গে শ্রুতিও ছিল। শ্রুতি খুব নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল। কাঁদছিল, ভয় পাচ্ছিল। শ্রুতি একটু পরে নেমে যায়। আমি রোহিতের সঙ্গে ওর মা যেখানে আছে সেখানে আসি। কিন্তু হাসপাতালে ঢোকার পর গাড়িতেই ওর বাবার ফোন আসে। আঙ্কেল বলেন, মায়ের কাছে যেতে হবে না, বাড়ি চলে যেতে। সেখান থেকে আমি রোহিতদের বাড়ি আসি। তারপর অটো ধরে বাড়ি চলে আসি।

আমার কাছে কোনও ফোন নেই। তাই আবির কেমন আছে জানতে পারিনি।

আমাকে রাতে বাবা জানায় যে আবির মারা গেছে। পুলিশ জানিয়েছে। সাসপেক্ট হিসেবে রোহিতকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এ-ও শুনেছি, রোহিতের আচরণ সন্দেহজনক। সে আবিরের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অথচ ঘটনা ঘটার পর রোহিত একজন বন্ধুকে নিয়ে চলে গেছে। খবরের কাগজে লিখেছে পালিয়ে গেছে। আমরা কেউ পালাইনি। আর সেই বন্ধুটি আমি। আমি আর্যনীল দাশগুপ্ত। আমরা চলে এসেছি ঘটনা ঘটার পরে নয়, ওরা হসপিটালে যাওয়ার পর। আর কেন এসেছি সেটা রোহিত জানে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%