ছাব্বিশ

জয়ন্ত দে

বাইরে এসে আর্য বলল, ‘আমি কি কাল থেকে স্কুলে যেতে পারব?’

অমিত্রসূদন ট্যাক্সি ডাকল। ট্যাক্সিতে বসেই শকুন্তলা ঘুমিয়ে পড়ল।

বাড়ি ঢুকে অমিত্রসূদন ফোনের সুইচ অফ করে দিল। মিসড কল আর এসএমএসের জঞ্জালে ফোন ভরে যাচ্ছে।

শকুন্তলা টিভি খুলল। ওর গায়ে ঠেসে আর্য।

সিসি টিভির ফুটেজ—

...আবির পড়ে গেল...উঠে হাঁটছে...একটা ছেলে লম্বা লম্বা পায়ে দৌড়ে যাচ্ছে...।

আর্য বলল, ‘এটা আমি। ওই যে অনুষ্কা!’

এক এক করে পর পর চিনে ফেলেছে আর্য। শোনা কথাগুলো এখন টিভির স্ক্রিনে ছবি হয়ে উঠছে শকুন্তলার সামনে।

রাত বাড়ছে।

বারান্দায় আর্য আর অমিত্রসূদন। ঘরে শকুন্তলা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। কাল থেকে আর লালবাজারে যেতে হবে না।

আর্য আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। একসময় শান্ত গলায় বলল, ‘বুঝলে বাবি। এই ক’দিন লালবাজারে আমরা একটা গেম খেলতাম। হয়তো আমরা খেলতাম না। আমাদের খেলানো হত। তুমি ভেবো না, এই গেমটা আমরা শুরু করেছি। এই গেমটার কথা আমাদের বিনিতা শ্রীবাস্তব ম্যাম প্রথম বলেছিল টাইম পাস করার জন্য। আবির ফানি ছিল, তাই ফানি গেম।’

আর্য চুপ করে থাকল। অমিত্রসূদন ওর দিকে তাকাল না।

আর্য বলল, ‘গেমটায় আমাদের সঙ্গে আবিরও খেলত। আসলে এই ক’দিন যেন আমাদের সঙ্গে আবিরও ছিল। বাড়ি থেকে লালবাজার পর্যন্ত। লালবাজারে সর্বক্ষণ আবির যেন আমাদের পাশে পাশে ঘুরত। আমাদের অবস্থা দেখে মজা করত, নানা জোকস বলত। আমরাও ওখানে সব কথাই আবিরকে নিয়ে বলতাম। এটাই একটা গেম হয়ে গিয়েছিল। টাইম পাস গেম। ওকে নিয়ে মজাও করতাম। আবির খুব ফানি ছিল। আমরা ভাবতাম, এখন ও আমাদের সঙ্গে থাকলে কী করত, কী বলত? এখন ওপর থেকে আমাদের দেখে কী বলছে? অগ্নিমিত্রাকে কেমন করে দেখছে? আমাদের জন্য ক’টা মদের বোতল কিনবে বলছে? বা আমাকে বলছে—তুই সেদিন বারণ করেছিল আমাকে না নিতে। যদি স্টিক করে যেতিস, তাহলে আমি যেতাম না, বেঁচে যেতাম। এইরকম সব নানা মজা করা, মজার কথা বলা।’

আর্য থামল। একটু বিরতি দিয়ে, দূরে তাকিয়ে থাকল, খুব আস্তে বলল—

‘সেদিন লালবাজারের একটা ঘরে আমরা আবিরকে নিয়ে ওই গেমটা খেলছিলাম। অনুষ্কা সেজেছিল আবির।

আবির-সাজা-অনুষ্কাকে ঊষসী বলল, ‘এই আবির অত মদ খেলি কেন?’

আবির-সাজা-অনুষ্কা উত্তর দিল, ‘বেশ করেছি, আমি আমার মায়ের পয়সায় খেয়েছি। আর্যর বাপের কী?’

এই পর্যন্ত বলে আর্য থামল, একটু শুকনো হাসল। বলল, ‘আর্যর বাপ, মানে কে বলো তো?’

আর্য প্রশ্ন করল। তারপর নিজেই উত্তর দিল। ‘আর্যর বাপ, মানে মিডিয়া! মিডিয়া আমাদের মদ খাওয়া নিয়ে চেঁচাচ্ছে, তাই—’

কথাটা বলে আর্য বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। তারপর আরও আস্তে আস্তে বলল, ‘পরের দিন আমি আবির সেজেছিলাম।

আমি সেদিন আবির সেজে রোহিতকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেন সেদিন তোদের গাড়িতে তুলে তাড়াতাড়ি আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলি না ভাই? তুই যদি আমাকে ফার্স্ট টাইম নিয়ে যেতিস আমি বেঁচে যেতাম।’

আবির-সাজা-আমি এই কথাটাই প্রশ্ন করলাম রোহিতকে।

আমার, মানে আবিরের প্রশ্নের উত্তরে রোহিত বলল, ‘আমাদের অডি গাড়ির সিটটা অরিজিনাল লেদারের। ওখানে রক্ত পড়লে দাগ ধরে যাবে ভাই। রক্তের দাগ বড় বিচ্ছিরি, কালো!’

বুঝলে বাবি—‘অরিজিনাল লেদারে রক্তের দাগ ধরবে বলে রোহিত সেদিন আবিরকে গাড়িতে তুলে নিয়ে হাসপাতালে যায়নি। সরে গিয়েছিল। এটাই সত্যি!’

আর্য রাস্তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে কান্না ঠেকাল।

বিড়বিড় করে বলল, ‘আমরা বিনিতা ম্যামকে বললাম—“ম্যাম এখন তো সব মিটে গেছে। এখন আমরা কি আবিরের মা আন্টির সঙ্গে একবার দেখা করতে পারি?” ম্যাম বলল, “এখন না। পুলিশের কাজ, মানে ইনভেস্টিগেশনের কাজ মিটে গেছে। এরপর আছে আইন আদালত। আসলে, ওনার মনে তো কোনও সন্দেহ বা প্রশ্ন থাকতেই পারে। যতদিন না উনি পুলিশ রিপোর্ট মেনে নিচ্ছেন ততদিন তোরা যাস না। আমি বলি কি, তোরা বড় হ, তারপর কখনও যদি পারিস, তখন যদি যেতে ইচ্ছে করে, তখন আবিরের মায়ের সঙ্গে দেখা করিস। এখন না, এখন দেখা করার ঠিক সময় নয়।” ’

অধ্যায় ২৭ / ২৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%