জয়ন্ত দে

আর্য বেরিয়ে এসে বলল, ‘আন্টির অবস্থা খুব খারাপ। আজ রোহিতের সঙ্গে আঙ্কেল আসেনি। আঙ্কেল রোহিতের জন্য একজন বডিগার্ড রেখেছে, আজ সেই বডিগার্ড আর ড্রাইভার আঙ্কেল এসেছিল। রোহিত হসপিটালে যাওয়ার জন্য বলছিল। কিন্তু পুলিশ রোহিতকে যেতে দিল না।’
‘যেতে দিল না!’ শকুন্তলা বলল।
‘বলল, ‘কাল সকালে মায়ের সঙ্গে দেখা করে এখানে চলে আসবি।’ একজন পুলিশ অফিসারকে রোহিতের বাবা ফোন করেছিল। ডক্টররা নাকি বলেছে, ‘হসপিটালে না রেখে এবার বাড়ি নিয়ে যান। আর কোনও চিকিৎসা নেই, এখন বাড়িতেই থাকুক’; তাতে আন্টি ভালো থাকবে। কিন্তু রোহিতের বাবা আনতে পারছে না। বাড়ির সামনে দিন রাত টিভি ক্যামেরা ঘুরছে, বাড়ির দরজায় এসে নক করছে। আঙ্কেলও মেজাজ কন্ট্রোলে রাখতে পারছে না।’
শকুন্তলা বলল, ‘হ্যাঁ মা বাবা আর কী করবে—তাদের দগ্ধে দগ্ধে মরতে হবে?’
‘আন্টি বাঁচবে না, ডক্টররা বলেই দিয়েছে। ইস রোহিত কী করবে?’
‘কী আবার করবে? সারারাত পার্টি করবে—বন্ধুবান্ধব নিয়ে আরও উচ্ছন্নে যাবে—।’
‘তোমার যত ফালতু কথা।’
আর্য উঠে নিজের ঘরে যায়, একটু পরে গিটার বাজাতে বসে। শকুন্তলা আয়নার সামনে দাঁড়ায়। মাথার চাঁদিটা কি ফাঁকা হয়ে গেল—? কী হারে চুল উঠছে। এসব ঝামেলা মিটলেই ডাক্তারের কাছে যাবে। ফোন নম্বরটা আছে।
শকুন্তলার ফোন বাজে। দেখল, দেবাংশুর নাম। মানে দেবাংশুর মা।
‘কী রে সব ঠিক আছে?’
‘আজ কি লালবাজারে গিয়েছিলি?’
‘না, আজ বাড়িতেই।’
‘আর্য কোথায়?’
‘ওই যে গিটার বাজচ্ছে—শুনতে পাচ্ছিস না?’
‘আর্য তাহলে ঠিক আছে।’
‘হ্যাঁ, ঠিকই আছে। কাল আমার বরং শরীরটা খারাপ হয়েছিল। গ্যাস অম্বল—।’
‘সাবধানে থাকিস। তুই আজ টিভি দেখেছিস?’
‘না তো। কেন রে?’
‘ছেলেটার মা আর দিদাকে দেখাচ্ছিল। বাপ রে! দিদা তো আল্ট্রা মর্ডান, হাতে ট্যাটু! মা-টাকে দেখলাম। আমার এক আত্মীয় থাকে ওই বিউটিপার্লারের কাছাকাছি। সে বলছিল মা-টা সুবিধের নয়। ওই বিউটিপার্লারটার বদনাম আছে।’
‘বাদ দে। ভদ্রমহিলার ছ’মাস আগে হ্যাজবেন্ড মারা গেছেন, এখন ছেলে। কী অবস্থায় আছে বলতো?’
‘শোন আমার হলে আমি মরেই যেতাম। আর ওই মহিলা টিভির সামনে কেমন রংঢং করে কথা বলছে দেখেছিস?’
‘পুষ্পা, এসব কথা ভালো লাগছে না রে।’
‘মনে রাখিস, ওই মহিলা কিন্তু সব জানে নিজের ছেলের গুণপনা। তবু দেখ জাস্টিস ফর আবির, জাস্টিস ফর আবির করে এমন হল্লা মাচাচ্ছে। আমরা জানি না আবিরকে কেন স্কুল টিসি দিয়েছিল? আমাকে দেবাংশু সব বলেছে। ওরা স্কুলে গাঁজার র্যাকে-এ ছিল। কেউ কিছু বললে তাদের ওয়াটার বটলে ভদকা ঢেলে দিয়ে ফাদারের কাছে টেনে নিয়ে যেত। সব ছেলে ভয়ে ওদের হয়ে সাক্ষী দিত। যে না দিত তাকে ফেলে পেটাত। ওদের গ্রুপটা স্কুলে টেরর ছিল। কেন আর্য তোকে কিছু বলেনি?’
‘না, আর্য আমাকে কিছু বলেনি।’
‘শকুন্তলা ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কর, নইলে অন্ধকারে থেকে যাবি। ওদের কথা জানতে পারবি না। আমাকে তো দেবাংশু সব বলে। ওদের সঙ্গে আর্য ছিল শুনে দেবাংশু অবাক হয়ে বলল, আর্য কী করে ওদের পাল্লায় পড়ল?’
গিটার বন্ধ হয়ে গেছে। ঘরের দরজার সামনে এসে আর্য দাঁড়াল। চোখে মুখে জিজ্ঞাসা, আবার কে ফোন করল? শকুন্তলা বলল, ‘আমি রাখি রে পুষ্পা। আর্য এসেছে, খেতে দেব।’
‘ঠিক আছে খেতে দে। তবু একবার টিভিটা খুলে দেখ—দিদার ট্যাটুটা অন্তত দেখ। কেমন টাটকা খবর দিলাম। আমাকে তো কত লোক ফোন করে ছ্যা ছ্যা করছে।’
‘দেখ, ওদের সোসাইটি আলাদা, তোর আমার মতো নয়। বাদ দে। ওদের খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। সন্তান শোক মারাত্মক। শত্রুরও যেন না হয়। ওদের নিয়ে আর কথা বলিস না।’
আর্য বলল, ‘ফোনটা রাখো। অনেক হয়েছে।’
শকুন্তলা ফোনটা রাখতে আর্য বলল, ‘পুষ্প আন্টি কী বলছিল?’
‘টিভিতে আবিরের মা আর দিদাকে দেখাচ্ছে—।’
‘তো—? দেখাচ্ছে তো কী হয়েছে?’
‘পুষ্পা দেখেছে—আবিরের দিদার হাতে ট্যাটু।’
‘ট্যাটু দেখে কি পুষ্পা আন্টি ভড়কে গেছে? বলো, আর্য বলল, দিদার হাতে ট্যাটু আছে—তাই দেখাচ্ছে। দেবাংশুর বাবাও তো দেখায়—। ওনার ব্যাগের দিকে কখনও তাকিয়ে দেখছো—ফ্লাইটের ট্যাগগুলো ব্যাগে ঝোলে। ঝল ঝল করে ঝোলে। উনি এয়ারে কত দেশ বিদেশ গিয়েছেন ওগুলো দেখান।’
‘ওর কোন আত্মীয় নাকি আবিরের মায়ের পার্লারের কথাও বলেছে— বলেছে পার্লারটার বদনাম আছে।’
আর্য সোজা হয়ে দাঁড়াল। বলল, ‘মা তোমাকে পরিষ্কার একটা কথা বলে দিচ্ছি—আবিরের মা আন্টিকে নিয়ে কোনও খারাপ কথা যেন না হয়। তুমি কোনও খারাপ কথা বলবে না, শুনবেও না। আন্টি আমার বন্ধুর মা। আমি তাঁকে রেসপেক্ট করি।’
‘আমি কিছু বলিনি রে আর্য। ও বলছিল—।’
‘তুমি শুনবে না। তুমি কি আবিরের মাকে শত্রু মনে করছ? আন্টির খুঁত খুঁজছ, ভুল দেখতে চাইছ? শোনো, আমরা জানি আন্টি আমাদের সন্দেহ করছে—সত্যিটা কী জানতে চাইছে। আন্টির মনে হয়েছে, আবিরের সবচেয়ে ক্লোজ ফ্রেন্ড রোহিত কেন ওকে ফেলে চলে এল? আন্টি কি ভুল প্রশ্ন করেছে? রোহিত ওর ছোটবেলার বন্ধু মা। রোহিতের কি আসা উচিত হয়েছে? রোহিতের সঙ্গে গাড়ি ছিল—কাছেই ড্রাইভার ছিল, রোহিতের কি দায়িত্ব ছিল না, আবিরকে তুলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া? ও করেনি। বন্ধুর মতো কাজ করেনি। সরে থেকেছে। ভেবেছে আবির ড্রামা করছে। বাবাকে ফোন করে পারমিশন চেয়েছে—রোহিত অন্যায় করেছে। জ্বলতে তো ওকে হবেই। আবিরের প্রাণ চলে গেছে। আবির মরে গেছে। আর ফিরবে না। আমরা সবাই কিন্তু বেঁচে আছি। শোনো এই কথাটা আমি শুধু তোমাকে বলছি না, আমরা সবাই বলছি, এমনকী রোহিতও বলছে। রোহিতও বার বার বলছে, “বড় ভুল হয়ে গেল ভাই— বড় ভুল হয়ে গেল—আবিরটা চলে গেল।”’
আর্য খেয়ে আবার গিটার বাজাচ্ছে। অমিত্রসূদনের খাবারে চুল। লম্বা একটা চুল! শকুন্তলা বলল—‘ইস! তরকারির বাটিটা সরিয়ে দাও। আমি অন্য বাটিতে দিচ্ছি।’
অমিত্রসূদন বলল, ‘ঠিক আছে—আমার খাওয়া হয়ে গেছে। আর কিছু লাগবে না।’
একটু পরে একটা ফোন এল, গ্রুপের একটা মেয়ে।
‘দাদা কেমন আছেন?’
‘ঠিক আছি।’
‘আজ টিভি দেখেছেন—ছেলেটির মা আর দিদা ইন্টারভিউ দিল। ওদের বাড়িতে পলিটিক্যাল লোকজন গেছে।’
‘আচ্ছা।’
‘একটা কথা বলব দাদা? মা-টাকে দেখলাম, শোকটোক তো কিছু মালুম পেলাম না। কেমন যেন, সুবিধের নয়। আর দিদার হাতে ট্যাটু...ইস, এরা কারা?’
‘শোনো এই ধরনের কথা আমার সঙ্গে বলবে না। আমার রুচিতে বাধে। আজ ওই জায়গায় আমি থাকলে, তোমাদের মতোই কিছু মানুষ বলত—দেখো নাটক করছে!’
অমিত্রসূদন গ্রুপের মেয়েটিকে থামল।
কিন্তু অফিসের ঘনিষ্ঠ দু’তিনজন গতকালের টিভি দেখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে-কথাই বলে গেল তাকে। এবার প্রতিবাদহীনভাবে অমিত্রসূদনকে শুনতে হল। প্রথমদিকে একজনকে থামানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে থামল না, বলল, ‘ছাড়, ছাড়! ভালোমানুষীর দিন শেষ হয়ে গেছে। তোদের কী ভাবে হ্যারাস করছে ওই মহিলা, তারপরেও বলবি! পালটা প্রশ্ন কেউ তুলবে না। দেখ ভাই পাবলিক মারাত্মক জিনিস! গত ছ’-সাতদিন তারা টিভির সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে, তারা সব দেখছে। নানা কথা বলছে। প্রাইম স্লটের সিরিয়ালগুলো ঝাড় খাচ্ছে জানিস তো।
অমিত্রসূদন কিছু জানতে চায় না। একটু ঘুমাতে চায়। নিশ্ছিদ্র ঘুম চাই। এক ঘুমে একটা সুন্দর সকাল চাই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন