তেইশ

জয়ন্ত দে

দুপুরে ফোন করল অবিনাশ।

‘কী রে তুই নিশ্চয়ই একটু হলেও রিল্যাক্সড!’

কথাটা শুনেই অমিত্রসূদনের বুকের ভেতর হঠাৎ যেন হাওয়া ভরে গেল। সে ঠিকমতো জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারল না, ‘কেন? পুলিশ কি প্রেসকে কিছু বলেছে?’ অমিত্রসূদন চুপ করে থাকল।

‘হ্যালো শুনতে পাচ্ছিস?’

‘হ্যাঁ, বল।’

‘তুই বোবা মেরে গেলি? নিশ্চয়ই আমার কথা বুঝতে পারলি না? তুই এতদিন খবরের কাগজে চাকরি করে নিউজের ঢ্যামনামিগুলো ধরতে পারিস না।’

অমিত্রসূদন চুপ করে থাকল।

অবিনাশ হাসল, ‘কেসটা অন্যদিকে ঘুরছে বুঝতে পারছিস?’ আবার হাসল অবিনাশ, ‘দেখ একটা কথা বলি—আসলে তো বিক্রি হয়, সেল। একটা ঘটনা ঘটেছে সেটাকে আমরা পাবলিককে খাওয়াব। মানে সেল করব। প্রথমে খেপে আবিরের দিকে সহানুভূতি টেনে বাদ বাকিদের মিডিয়া ট্রায়াল করে আমরা সেল করলাম। কিন্তু তোরা কেউ, মানে অভিভাবকদের কাউকে কোনও চ্যানেলই বসাতে পারল না। এদিকে গুচ্ছের নাবালক, আইনের গাড্ডায় পড়ে তাদেরও বেশি টানা হ্যাঁচড়া করা যাচ্ছে না, দেখ তবু টানা পাঁচদিন নিউজের অ্যাঙ্গেল ছিল আর্যরা। কিন্তু ওদের পালা শেষ। তারপর আস্তে আস্তে করে নিউজের বদল হয়ে এসেছে, মুখ এখন আবিরের দিকে—। আমাদের চ্যানেল আবিরের থেকে সহানুভূতির হাওয়া কেড়ে নিয়েছে। আবির যে অল্প বয়েসে একটা বখে যাওয়া ছেলে, ওর স্কুল থেকে টিসি পাওয়া, পুলিশের হাতে ধরা পড়া, নাইট পার্টি,—সব ওপেন করে দিয়েছি। পাবলিক কিন্তু এখন রোহিত আর্যদের ছেড়ে আবিরকে নিয়ে পড়েছে। শোন, কোনও বাড়ির বড়রা ছোটদের নেশা, নাইট পার্টি, গার্লফ্রেন্ড ভালো চোখে দেখে না। তারা আবিরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এবার আমাদের তাস হল আবিরের মা। গতকাল আমাদের চ্যানেল ওর মা আর দিদাকে আমরা আমাদের মতো ওপেন করে দিয়েছে। আর পাবলিক মনে করছে—এই ছেলে তার পরিবারের জন্য বখে গেছে। আজ রাতে আমাদের চ্যানেলে ডিসকাশন হবে—আবিরদের মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? অ্যাঙ্গেল হবে—পরিবার? সব মনোবিদ, প্রাক্তন পুলিশকর্তা, শিক্ষকরা থাকবেন। ওরা মৃত আবিরকে, ওর মাকে ধুইয়ে দেবে। দেখিস। আর চাপ নিস না। এবার কেস হালকা হয়ে যাবে।’

অমিত্রসূদন বলল, ‘হ্যাঁ আর্যকেও লালবাজারের অফিসাররা বলেছে— তোরা ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা কর—তোর মিডিয়ার বাবারা যেন তাড়াতাড়ি নতুন কোনও ইস্যু পায়।’

কথা শুনে হা হা করে হাসল অবিনাশ। বলল, ‘তোকে একটা কথা বলব অমিত্র—? অনেকদিন পরে লালবাজার খুব দৃঢ়তার সঙ্গে একটা কেস হ্যান্ডেল করল। আরে পুলিশের ঘরেও তো ছেলে মেয়ে আছে। সত্যি সত্যি ওরা সত্যিটা খুঁজেছে শুনলাম। একটা ক্ষীণ খবরও পেলাম, আজকালের মধ্যে হয়তো ওরা কেসটা নিয়ে প্রেস মিট করবে। কী পেয়েছে, না-পেয়েছে জানিয়ে দেবে। তারপর সেটা নিয়ে বড়জোর দু’দিন। শকুন্তলাকে বলিস, আর দিন চারেক—ঝামেলা মিটে যাবে।’ অবিনাশ হাসল।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল অমিত্রসূদন।

‘হ্যাঁ রে বাঘাকে দেখেছিস? আলাপ হয়েছে—? ওর গল্প শুনেছিস—? ও কিন্তু দুর্দান্ত চরিত্র, জমাটি নাটক হবে। অসীম সাহস ওর। ওর ঈশ্বর বাঘ! যমও ওকে ভয় পায়।’

অমিত্রসূদন ফোন করল শকুন্তলাকে। ‘আর্য কী করছে?’

শকুন্তলা বলল, ‘কেন লালবাজার যেতে হবে?’

‘না, না।’

‘ও! তাই বলো, আমি ভাবলাম আবার ডেকে পাঠাল বুঝি।’

‘অবিনাশ ফোন করেছিল—।’

‘তুমি ওর ফোন ধরলে কেন?’

‘ও বলল—পুলিশ আর দু’চারদিনের মধ্যে সব জানিয়ে দেবে।’

‘কী জানাবে?’

‘কী আবার জানাবে, জানাবে সত্যিটা কী—।’

‘শোনো, আজ তোমার বোন ফোন করেছিল—তুমি কি ওদের কিছু বলেছ?’

‘না, কী বলব?’

‘না, হঠাৎ আর্যদের স্কুল তুলে কথা বলল। বলল, “যত বড় স্কুল, তত বড় বাঁদর! সব নোংরা, অসভ্য!”’

‘ও আর্যকে কিছু বলেনি। ওদের স্কুলের নামটা খবরের কাগজে বেরিয়েছে—সেই সূত্র ধরেই বলেছে।’

‘ও আর্যকেই বলল—। নাহলে হঠাৎ স্কুলের কথা তুলল কেন? শোনো, একটা কথা বলি—’ শকুন্তলা থামল। ‘সারা পাড়া কিন্তু জেনে গেছে। ওই টেকো রিপোর্টারটা না এলে কেউ জানতে পারত না। সেদিনের সেই ড্রাইভারটা দেখলাম আজ সকালে আমাদের বাড়িটা দেখিয়ে দেখিয়ে একজনকে কী সব বলছে। ওই তো আমাদের লালবাজারে নিয়ে গিয়েছিল। সেই যে গাড়িতে হঠাৎ এফএম চালিয়ে দিল—।’

‘হ্যাঁ, বুঝেছি।’

‘যে যতই বলুক—বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া বখে যাওয়া ছেলে, আর্য কিন্তু তেমন নয়। এ পাড়ার কেউ ওর নামে কোনও বাজে কথা বলতে পারবে না।’

অমিত্রসূদন বলল, ‘রাখি, তুমি ঘুমাও।’

সে ছাদ থেকে নেমে আসছিল। সামনে এসে দাঁড়াল রাজীব। ওর গলায় উচ্ছ্বাস।

‘দাদা, খেলা তো ঘুরে গেছে! কাল সন্ধেবেলা বিরোধী পার্টির মহিলা টিমের সদস্যরা, সব সিনেমার লোকজনদের নিয়ে আবিরের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। ওখানে গিয়ে সব নাটকবাজি করেছে। যে মহিলারা গিয়েছিল—তারা নিজেরা বলেছে ওরা নাকি আবিরের মায়ের ঘনিষ্ঠ। ব্যস! সিএম মারাত্মক রেগে গেছেন। আজ আবার বিরোধী পার্টির দু’জন নেতা বিকেলবেলা যাচ্ছে। সিএম পুলিশকে বলে দিয়েছেন, ‘কাউকে নাটক করতে দেবেন না। ওই বাড়ির কাছে যেন কেউ না যায়।’ বিরোধীদের হল্লাবাজি দেখে সিএম পুলিশকে আচ্ছা সে কড়কেছে। ওনার মাথায় ঢুকে গেছে— বিষয়টা নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। সঠিক তথ্য পাবলিককে জানাতে হবে। উনি এটা নিয়ে বিরোধীদের রাজনীতি করতে দেবেন না।’

অমিত্রসূদন চুপ করে শুনল।

রাজীব বলল, ‘আমার যা মনে হয় দাদা—, কাল পরশু পুলিশ কেসটা ওপেন করে দেবে।’

‘কী হতে পারে রাজীব?’

‘দুর দুর কিচ্ছু না। অ্যাক্সিডেন্ট। বগলে মদের বোতল ছিল, পড়ে গিয়ে ঢুকেছে। অ্যাক্সিলারি আর্টারিতে ক্ষত। হেভি ব্লিডিং। ডেথ। নেগলিজেন্সি আছে, আর কিছু নেই। টেনশন করো না দাদা।’

অমিত্রসূদন দু’হাতে মুখ মুছল। সন্ধের মুখে ফোন এল—

‘কাল চারটের সময় লালবাজার আসতে হবে। মিস্টার দাশগুপ্ত, কাল পারলে ম্যাডামকে নিয়ে আসবেন। আশা করি উনি ঠিক আছেন।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%