চব্বিশ

জয়ন্ত দে

অন্যান্য দিনের মতো আজও চারটের অনেকটা আগেই লালবাজারে পৌঁছে গিয়েছিল অমিত্রসূদনরা। তবে আজও তারা তিনজনে একসঙ্গে নয়। যে যার মতো আলাদাভাবে ঢুকেছে। আর্য ঢুকতেই ওকে ডেকে নিয়ে চলে গেল আরশাদ। একটু পরেই বিনিতা শ্রীবাস্তব ঘুরে গেল। আজ শ্রীকে দেখল অমিত্রসূদন। কিন্তু সৌরীন মুখার্জিকে দেখল না। প্রায় সব অভিভাবকরাই এসেছে। অমিত্রসূদন পর পর বারো তেরোজন ছেলে মেয়েকে আসতেও দেখল। এর আগে এখানে একসঙ্গে সবাই আসেনি। অভিভাবকদের জন্য বাড়তি চেয়ার দেওয়া হয়েছে।

মাঝে একবার বাঘা এসে কর্কশ গলায় বলে গেল, ‘কেউ হল্লা মাচাবেন না। মোবাইলে কথা বলতে চাইলে সিঁড়িতে গিয়ে বলবেন। ম্যাডামের মাথা গরম আছে।’

সবাই বড্ড বেশি চুপচাপ।

বাঘা এসে জিজ্ঞেস করল, ‘সবাই চা খাবেন তো?’

কেউই গলা তুলে হ্যাঁ বলল না। কিন্তু বাঘা একটু পরেই চা নিয়ে এল। খসখসে গলায় বলল, ‘লালবাজারের চা—খেয়ে নিন, খেয়ে নিন। আপনারা লকআপের ভাত খাচ্ছেন না।’

কেউ কেউ চা নিল। এতগুলো মানুষ কিন্তু নিঃস্তব্ধতা বেশ কঠিন। অমিত্রসূদনের মনে হল, সবার ফোনই মিউট করা। কারও ফোন আসছে না। মাঝে একবার ফোন নিয়ে দেখল, রাজীবের তিনটে, অবিনাশের দুটো মিসড কল। অফিসের দু’জনের আরও দুটি কল। গ্রুপের দু’জন। এসএমএসও এসেছে বেশ ক’টা। কিন্তু অমিত্রসূদনের পড়ার ইচ্ছে হল না। ফোনটা নিয়ে সে পাঞ্জাবির পকেটে রেখে দিল।

আরও কিছুটা সময় অতিবাহিত হল। হঠাৎ একটা হল্লা শুনল ভেতরে। যেন উচ্ছ্বাস। কিন্তু পরক্ষণেই পিন পতনের শব্দ শোনা যাবে এমন স্তব্ধতা।

বেশ কিছুক্ষণ একটা দরজা দিয়ে আরশাদ বেরিয়ে এল। ওর পিছনে পর পর চোদ্দোজন ছেলে মেয়ে। আর্যর পাশে রোহিত, সবুজ, ঊষসী, অনুষ্কা...। ওদের সবার পিছনে শ্রী আর অগ্নিমিত্রা।

আরশাদ বলল, ‘তোরা সবাই এখানে বোস। শোন, বেশি চিৎকার চেঁচামেচি করবি না। মিডিয়া যদি জানতে পারে, তোদের আবার বাঁদর নাচন নাচাবে।’

ওরা হই হই করে উঠল, ‘ঠিক আছে আঙ্কেল। এখানেই বসছি।’

ওরা লম্বা টানা একটা বাক্সের ওপর পর পর সবাই বসে গেল। সবাই ভীষণ রকম চুপ। কয়েক মিনিট পরেই বাঘা এল। ওদের এভাবে বসে থাকতে দেখে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল, ‘বলল, ‘তোরা কোথায় বসেছিস জানিস?’

‘কোথায় বাঘাদা?’

‘এটা একটা বাক্স। কিন্তু এই বাক্সটা যে সে বাক্স নয়। এটা একটা ম্যাজিক বক্স! এখানে যা আছে তা ভগবানের সন্ধান দিতে পারে।’

‘ঈশ্বর! গড!’

সবাই তাদের বসে থাকা বাক্সটার দিকে তাকাল। কেউ কেউ হাতও রাখল।

বাঘা বলল, ‘ওর মধ্যে কী আছে শুনবি? যে গলায় ফাঁস দিয়েছে মরেছে, তার সেই ফাঁস দেওয়া দড়ি আছে। এখানে খুন করা খুনির ছুরি আছে, গুলি চালিয়ে মার্ডার করার রিভলভার আছে, মাথা থেঁতলে দেওয়া পাথর আছে, মানুষের মাথা ভাঙা হাতুড়ি আছে—। গলায় কোপ মারা বঁটি আছে। মৃত্যু-হাতিয়ার ভরা বাক্স এটা।’

বাঘার কথা শেষ হওয়ার আগে বসে থাকা সবাই ছিটকে নেমে এল।

বাঘা বলল, ‘ডরো মাত! ভয় পেয়ে গেলি! বস, এখানেই বস। এত ভিতু হলে চলবে। বাঘের বাচ্চা হ। বাঘের বাচ্চা! রোজ ঘুম ভাঙলে বাঘকে স্মরণ করবি। ঘুমাতে যাওয়ার আগে বাঘকে প্রণাম করবি। কোনও ভয় থাকবে না। বস সবাই, এই বাক্সের বুকের ওপর চেপে বস।’

ক’জন ছেলে টপাটপ উঠে বসে পড়ল। দু’চারজন মেয়েও বসল। কিন্তু অনেকেই দাঁড়িয়ে থাকল। বাঘা বলল, ‘এখানে না বসলে লকআপে ঢুকিয়ে দেব। বস সবাই। ডরো মাত!’

এবার ওদের সামনে বিনিতা শ্রীবাস্তব এসে সামনে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘আপনারা আসুন আমার সঙ্গে।’

তিনি হাজির থাকা সব অভিভাবকদের ডেকে নিয়ে গেলেন একটা ঘরে। বললেন,—

‘সবাই বসুন এখানে।’

সবাই চুপচাপ বসে পড়ল।

সবাই বসতে বিনিতা বললেন, ‘একটু পরেই গোয়েন্দা প্রধান প্রেস মিট করবেন। তার আগেই আমরা আপনাদের জানিয়ে দিই। আমাদের ইনভেস্টিগেশন শেষ হয়ে গেছে। আমরা রয়্যাল গার্ডেন থেকে সিসি ক্যামেরার একটা ফুটেজ পেয়েছি। সেই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে সেদিন কী হয়েছে সেটা পরিষ্কার।’

বিনিতা থামলেন একটু। বললেন, ‘আবির ছোট একটা গার্ড ওয়াল টপকাতে গিয়ে পড়ে যায়। এটা স্পষ্ট দেখা গেছে। তারপর কুড়ি সেকেন্ড ফুটেজে কিছু পাওয়া যাইনি। তারপরেই দেখা গেছে আবির নিজে নিজে উঠে হেঁটে যাচ্ছে। যে কুড়ি সেকেন্ড মিসিং সেটা আমরা প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে নিয়েছি। আমাদের হিসেব মিলে গেছে। আপনাদের ছেলেমেয়েরাও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেছে। সেখানে নিজেদের চিনতে পেরেছে। তারা যা বলছিল, আমরা তা মিলিয়ে নিয়েছি। আপনাদের ছেলে মেয়েরা কেউ মিথ্যে কথা বলেনি। তাদের কাছ থেকে আমরা যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছি। আপাতত আপনাদের আর ডাকা হবে না। কেন না আমরা সরকারকে আমাদের তরফে যা জানানোর তা আজই জানিয়ে দিয়েছি। মোট কথা আমাদের এদিকের কাজ শেষ।’

বিনিতা থেমে রইলেন কিছুক্ষণ। বললেন, ‘তবে আরও দু’একদিন হয়তো বিষয়টা নিয়ে বাইরে, মানে মিডিয়া কাটা ছেঁড়া করবে। তারপর আশা করি সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কদিন দেখে নিন, তারপর ওরা আবার স্কুল শুরু করতে পারবে। কোনও অসুবিধে হবে না। আর আমাদের তরফ থেকে আপনাদের একটা কথা বলব—এই বিষয়ে ওদের আর কোনও কথা জিজ্ঞাসা করবেন না, সেদিন ঠিক কী হয়েছিল—সেটা ওরা আমাদের বার বার বলেছে। ওদেরকে দিয়ে আর বলাবার চেষ্টা করবেন না। আপনারা সবাই শান্তিতে বাড়ি যান। কোনও টেনশন করবেন না। খুব সাবধানে ওদের ওপর নজর রাখবেন। বাইরে থেকে ওদের যতই স্বাভাবিক দেখুন, ওরা কিন্তু ভেতরে ভেতরে থেঁতলে গেছে, আপনারা না দেখতে পেলেও ওরা রক্তাক্ত, ছিন্নভিন্ন। আপনাদের বার বার বলছি, এরা প্রতিটা রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে। আমি অবাক হব না, এরা যদি নেশাসক্ত হয়ে পড়ে। এদিকে নজর রাখবেন। প্রয়োজন হলে কিছুদিন যাওয়ার পরে সাইকোলজিস্ট দেখিয়ে নিতে পারেন। চাপটা প্রচণ্ড! গুড লাক। আপনারা সবাই আসুন। এতক্ষণে গোয়েন্দা প্রধানের প্রেসমিট শুরু হয়ে গেছে। আমরা সব চ্যানেলকে সিসি টিভির ফুটেজ দিয়ে দিয়েছি।

আর একটা খবর—এবার থেকে কোনও মদের দোকান আঠেরো বছরের কম বয়েসিদের মদ বিক্রি করতে পারবে না। যদি কেউ বিক্রি করে তার লাইসেন্স ক্যানসেল হয়ে যাবে।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%