জয়ন্ত দে

বাড়ি ফিরে অমিত্রসূদন বলল, ‘আমি অফিস যাব না। আমাদের আড়াইটের সময় লালবাজার যেতে হবে।’
‘আবার লালবাজার—কেন? আবার যেতে হবে কেন?’ ভ্রু কুঁচকে শকুন্তলা জিজ্ঞেস করল।
‘ডাকছে, হয়তো ওদের কিছু জানার আছে।’ অমিত্রসূদন খুব সংক্ষেপে উত্তর দিল।
‘আবার কী জানবে? কাল তো কতক্ষণ ধরে জানল।’
আর্যনীল থম মেরে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে ছিল। অন্যদিন বাড়ি ঢুকে ও খুব দ্রুত স্কুলের ড্রেস খুলে ফেলে। আজ শকুন্তলা বলল, ‘ড্রেস চেঞ্জ কর—।’ আর্যনীল খুব বিষণ্ণ গলায় বলল, ‘মা আমি ওদের সব বলেছি, ওরা আমার কথা বিশ্বাসও করেছে, কিন্তু—।’
‘কিন্তু কী?’ উদ্বেগের স্বরে শকুন্তলা বলল।
‘ফাদার আমাকে এখন স্কুল যেতে বারণ করলেন।’
অমিত্রসূদন বলল, ‘এই বারণটা ওঁরা করেননি, ওঁরা কিছুই বলেননি। আমিই বলেছি—আর্য কিছুদিন স্কুল যাবে না।’
আর্য বলল, ‘কেন আমি স্কুল যাব না? আমাকে নিয়ে তোমাদের কী প্রবলেম? আমি স্কুল গেলে কার কী প্রবলেম হত বুঝতে পারছি না!’
‘হত।’ অমিত্রসূদন মাথা নাড়ায়। ‘এই যে আজ হুট করে তোকে লালবাজার ডেকে পাঠাল আড়াইটের সময় আজ স্কুল গেলে কী করে লালবাজার যেতিস? যেতে পারতিস না, সেটা তোর পক্ষে খারাপ হত।’
‘তুমি কী আগে থেকে জানতে আজ আমাকে লালবাজার ডেকে পাঠাতে পারে, সেজন্যে তুমি আমাকে একা একা স্কুল যেতে দিলে না?’
‘না, আমি জানতাম না। দেখলি তো তোর সামনেই ফোন এল—। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হোক নিশ্চয়ই যাবি। ফাদার তো বললেন—কোনও প্রবলেম নেই।’
আর্যনীল ডাইনিং টেবিলের ওপর মাথা রাখল।
‘নে, স্কুলের ড্রেস চেঞ্জ কর।’ আর্য তবু উঠল না, ওই স্কুলড্রেস পরেই বসে থাকল। সে বিড়বিড় ককরে কিছু বলল, কিন্তু ওর কথা শোনা গেল না। একদিন স্কুলে অ্যাবসেন্ট হলে কত কথা শুনতে হয়, আজ স্কুল তাকে যেতে বারণ করছে! অথচ সবাই বললেন, তার কথা বিশ্বাস করছে। সবাই আর্যর সঙ্গে আছে। অনেকদিন পরে স্কুল ড্রেসটা যেন আর্যর কাছে দামি হয়ে উঠেছে।
অমিত্রসূদন গত কালের সেই ড্রাইভারটিকে ফোন করল। সে বলল, ‘আমি অন্য গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছি স্যার, আমি একটার সময় অন্য ড্রাইভার পাঠিয়ে দেব। আমাকে আগের দিন বলবেন, দিনের দিন বললে আমার অসুবিধে হয়।’
শকুন্তলা বলল, ‘তোমরা যে কাল থানা থেকে বেরিয়ে বললে সব মিটে গেছে—? কী জানি বাবা, টিভিতে কী না কী বলছে। শুনে কান মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে।’
অমিত্রসূদন টিভির দিকে তাকাল। এখন বন্ধ। কিন্তু ওরা যখন বাড়ি ছিল না তখন টিভিটা নিশ্চয়ই চলছিল। অমিত্রসূদন বলল, ‘আমি একটু আসছি।’ সে নীচে নেমে গেল। নীচের ঘরে গিয়ে ধীরেসুস্থে অফিসকে জানাবে আজ সে যেতে পারবে না।
অমিত্রসূদন নীচে নেমে যেতেই হঠাৎ আর্য গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল—সোফার সামনের টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নিউজ পেপারগুলো কোথায়?’
শকুন্তলা নির্লিপ্ত গলা বলল, ‘কোথায় আছে দেখ—তোর বাবার পড়ার ঘরে হবে—।’ আর্য দ্রুত পায়ে পড়ার ঘর থেকে ঘুরে এসে মায়ের মুখোমুখি দাঁড়াল, ‘তুমি কি খবরের কাগজগুলো লুকিয়ে রাখছ?’
‘ও মা, খবরের কাগজ লুকাব কেন!’
‘না, না, তোমাকে আমি বিশ্বাস করি না। যে যা বলে তুমি কান পেতে শুনে নিয়ে অ্যাপ্লাই করো।’
শকুন্তলা গম্ভীর মুখে আর্যর সামনে দাঁড়াল।
আর্য বলল, ‘কাল থানায় একজন জ্ঞান দিয়ে বলেছিল, টিভি নিউজ পেপার থেকে দূরে থাকবেন—; তুমিই সেটাই অ্যাপ্লাই করছ, তাই তো?’
শকুন্তলা কিছু বলতে যাচ্ছিল—তার আগে আর্য বলল, ‘এর আগেও তুমি এটা করেছ—তুমি ফার্নান্ডেজ স্যারের কথা শুনে আমার ঘরের লক ভেঙে দিয়েছিলে, ভেতরের ছিটকিনি খুলে দিয়েছিলে—কেন? যাতে আমি রাগ করে ঘরে ঢুকে দরজা না বন্ধ করতে পারি, তাই এই ব্যবস্থা করেছিলে। হেডস্যারের এই কথাটা তুমি শুনেছিলে। আর আনঅফিসিয়ালি হেডস্যার যখন বলল—ওকে একটা দামি মোবাইল ফোন কিনে দিন—তোমরা তখন কত টাকার মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছিলে—?’
‘আমাদের যা সামর্থ্য আমরা তাই কিনে দিয়েছি।’ শকুন্তলা স্পষ্ট গলায় উত্তর দেয়।
‘না, না, তোমাদের ভালো ফোন কিনে দেওয়ার যথেষ্ট সামর্থ্য আছে, কিন্তু তোমাদের মেন্টালিটিটাই পুওর।’
শকুন্তলা দীঘশ্বাস ফেলল, কিন্তু কিছু বলল না।
‘আমার খবরের কাগজগুলো চাই। আমি দেখব কে কী লিখছে—এটা আমাকে জানতে হবে। আর টিভিও দেখব—।’
শকুন্তলা খুব শান্ত গলায় বলল, ‘দেখ না! কে আপত্তি করেছে? আসলে কী জানিস, টিভিতে খবরের কাগজে একটাই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আসছে—তোরা সব বড়লোকের সন্তান।’
‘হ্যাঁ, তাতে হয়েছে কী? তারাও বড়লোকের সন্তান হতে পারত, কার বাপের কী প্রবলেম? আসলে তোমার সমস্যা হচ্ছে—কারণ, আমি বড়লোকের সন্তান নই, তাই। আমি ভিখিরির বাচ্চা! তাই তোমাদের মনে হচ্ছে কেন বড়লোক লিখছে, তাই তো?’
‘আর্য! ভালোভাবে কথা বল।’
‘না, কোনও আর্য টার্য নয়, এটাই সত্যি।’
‘সবাই বলছে—সব বড়লোকের বখে যাওয়া বাচ্চা। তোরা মদ খেয়েছিস—’
‘যারা বলছে, তারা সব হিংসেয় বলছে। আসলে তারা খুব বড়লোক হওয়ার চেষ্টা করছে, পারছে না। তারা বড়লোক হলে তাদের বাচ্চাগুলোকেও বড়লোকের বাচ্চাদের মতো করেই মানুষ করবে।’
‘এত রাগ করছিস কেন?’
‘একদম রাগ করছি না, পুরো ঠিক কথাই বলছে—ওখানে সব বড়লোকের বাচ্চারাই ছিল। আর সবগুলো বখে যাওয়া—। কিন্তু তাতে কী হল? তারা খুন করেছে? ওটা অ্যাক্সিডেন্ট। বড়লোক আর বখে যাওয়া ছেলেমেয়ের দল বলে সেটা খুন হয়ে যাবে! এইসব রিপোর্টারদের অনেক গল্পই আমি এতদিনে জেনে গেছি মা—এরা প্রেস কনফারেন্সে গিফট নেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি করে। এই গিফটগুলোকে কী যেন বলে—পোস্ত। বার ওপেন হলেই মদ খাওয়ার জন্য হামলে পড়ে। আরও বলব—? টাকা খেয়ে খবর করে। পেইড নিউজ? আরও বলব—? এক একটা রিপোর্টার এক একটা পলিটিক্যাল পার্টির পোষা।’
শকুন্তলা চুপ করে আর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। ‘তুই মাথা ঠান্ডা কর। তুই শুধু খারাপগুলোর খবর রাখিস। তোর বাবার কাছে যা, একশোজন ভালো আর সৎ রিপোর্টারের কথা বলবে। যারা নিজেদের প্রাণ হাতে নিয়ে খবর করে।’
‘তারা কোথায় মা? একজনকেও তো দেখতে পাচ্ছি না। নাকি আমরা বড়লোকের ছেলে বলে পাপ করেছি!’
‘আমিও আজ তোর সঙ্গে লালবাজার যাব।’
‘লালবাজার—কী করতে—ধ্রুবর চা কিনতে? হ্যাঁ, ভালো চা পাওয়া যায়। মার্কেটিং করবে তো?’ আর্য তীক্ষ্ণ গলায় বলে। আর্যর কথা নীচে থেকেই শুনেছে অমিত্রসূদন। সে নীচে থেকে উঠে এল, তার হাতে ধরা খবরের কাগজগুলো। চোখের ইশারায় শকুন্তলাকে শান্ত থাকতে বলল।
‘বাবি, আমাকে একটু নিউজপেপারগুলো দাও তো।’ অমিত্রসূদন বাড়িয়ে দিল। কাগজ নিয়ে আর্য ডাইনিং টেবিলেই বসে পড়ল। দুটো কাগজই ঝড়ের মতো পড়ল।
‘দেড়টার সময় ড্রাইভার আসবে।’
‘আমিও যাব, তোমাদের সঙ্গে।’ শকুন্তলা বলল।
অন্যসময় হলে অমিত্রসূদন বলত, কী করতে যাবে, যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু আর্যর মুখ দেখে মনে হল আজ শকুন্তলার থাকা প্রয়োজন।
আর্য বলল, ‘উফ! ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম! মা কাগজের এই খবরটা পড়েছ—? রোহিতদের বাড়ির উলটোদিকে প্রত্যুষারা থাকে। প্রত্যুষা একদম বাজে মেয়ে। শুধু ঝেড়ে খাওয়ার ধান্দা। সে আবিরের সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ পাতিয়েছিল বলে রোহিতের বাবা একদিন আবিরদের বাড়ি গিয়ে আন্টিকে সাবধান করে এসেছিল। আঙ্কেল হয়তো ছেলের বন্ধুর ব্যাপারে ইন্টারফেয়ার করে ঠিক করেননি, এজন্যে রোহিত ওর বাবাকে অনেক কথাই বলেছে। কিন্তু দেখবে, এটা অনেক বাবা মা-ই করে। রোহিতের বাবার যুক্তি ছিল, “প্রত্যুষা আমাদের উলটো দিকের বাড়ির মেয়ে, আবিরের সঙ্গে কোনও গোলমাল হলে ওর মা আমাদের দোষ দেবে।” আবিরের মা আন্টিও কিন্তু আঙ্কেলের কথা শুনে আবিরকে সাবধান করেছে—এখন দেখো, সেই কথাগুলো কেমন করে লিখেছে। যেন প্রত্যুষাকে নিয়ে টানাটানি করে ওরা মারপিট করে মরেছে। একদম ত্রিকোণ প্রেম। এত গল্প!’
আর্য খবরের কাগজগুলো হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
অমিত্রসূদন ও শকুন্তলা চুপ করে আর্যর দিকে তাকিয়ে আছে।
অমিত্রসূদন বলল, ‘কী রান্না করছ?’
‘যা হোক কিছু করব।’
‘না, চিকেন করো। খুব ভালো করে চিকেন করো, ও শান্তিতে একটু খাক।’
কিন্তু শান্তিতে থাকা গেল না দেড়টার সময়। যে ড্রাইভার ছেলেটি এল সে অমিত্রসূদনদের বাড়ির পিছনের গলিতেই থাকে। এসে বলল—‘আপনারা যাকে বলেছেন, সে আমাকে আসতে বলেছে। আমি আপনাদের বাড়ির পিছনেই থাকি।’
ঢোক গিলল অমিত্রসূদন।
‘দাদা কোথায় যাবেন?’
‘যাব লালবাজারের কাছাকাছি।’
‘কতক্ষণ লাগবে?’
‘বলতে পারব না। দেরি একটু হবেই। আপনি কোনও পার্কিংয়ে গাড়ি রাখবেন।’
‘আমাকে পার্কিংয়ের টাকাটা আগে দিয়ে দেবেন।’
লালবাজারের ঠিক কাছাকাছি এসে ওরা নেমে পড়ল। অমিত্রসূদন ছেলেটিকে বলল, ‘আপনি ম্যাঙ্গো লেনের দিকে গাড়ি পার্কিং করুন।’
গাড়ি থেকে নেমে শকুন্তলা বলল, ‘গেটের সামনে নামলে না কেন?’
অমিত্রসূদন বলল, ‘শোনো, লালবাজার থেকে একটু আগে ফোন এসেছিল, ওদের মেন গেটের কাছে মিডিয়ার ভিড়। ঘাবড়াবার কিছু নেই। আমাদের আলাদা আলাদা ভাবে ইনকোয়ারির ভেতর ঢুকে যেতে হবে। একজন একজন করে গেলে কেউ বুঝতে পারবে না। কিন্তু তিনজনকে একসঙ্গে দেখলে টিভি ক্যামেরা ছবি তুলবে। শোনো, আমি আগে যাব, আমার ঠিক পিছন দিকে আর্য থাকবি। এমনভাবে আমাকে ফলো করবি, যেন তুই আমার সঙ্গে নেই। আর তোর মা বেশ কিছুটা তফাতে আমাদের দেখে ঢুকবে। আবারও বলছি, ঘাবড়াবার কিছু নেই। আমরা তিনজন আলাদা থাকলে ওদের ফাঁকি দিয়ে ঢুকে যেতে পারব। ওরা বুঝতে পারবে না।’
‘গাড়ি নিয়ে ঢোকা যেত না? গাড়ির কাচ তুলে।’
‘পারত। সেক্ষেত্রে আমরা যদি নিজেরা ড্রাইভ করতাম, বা আমাদের নিজস্ব যদি ড্রাইভার থাকত, জানাজানির ভয় থাকত না। কিন্তু ওরা যা বলছে, সব গেটেই ক্যামেরা নিয়ে রিপোর্টার-ফোটোগ্রাফারদের ভিড়।’
‘মানে?’ আর্য বিহ্বল হয়ে বলল।
‘ওরা খবর করতে এসেছে—এটা ওদের কাজ। রিপোর্টার-ফোটোগ্রাফাররা এভাবেই কাজ করে। একটা ফোটোর জন্য সারাদিন ধরে পরিশ্রম করে। শোন, ওরা ভাববে আমরা গাড়ি করে মেন গেট দিয়ে ঢুকব। আমরা ইনকোয়ারির মধ্যে ঢুকে যাব। পর পর তিনজন।’ অমিত্রসূদন হাসল, ‘কী রে তুই নার্ভাস হচ্ছিস—? একটু লুকোচুরি খেলতেই হবে। পারবি না? কিচ্ছু করার নেই। নাহলে পাড়া প্রতিবেশীর কাছে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।’
আর্য বলল, ‘ঠিক আছে তুমি চলো, আমাকে কেউ বুঝতে পারবে না। আমি ঠিক তোমার আড়ালে ঢুকে যাব।’
‘যদি ছবি তোলে তাহলেও কোনও সিনক্রিয়েট করবি না। পাঁচজনের যেমন ছবি ওঠে তেমন ভাবেই যাবি। তার বেশি কিছু নয়। মনে রাখবি ওই ধরনের সাধারণ ছবির কোনও দাম নেই। সামান্য কোনও সিনক্রিয়েটই কিন্তু খবর হয়, সেই ছবির দাম থাকে, সেটাই বার বার চ্যানেলে দেখানো হয়। নিজেকে একদম শান্ত কর। মনে কর তুই একা। একা এসেছিস। সেভাবেই আমাকে ফলো করে ঢুকে যাবি।’
‘ওরা কি আমাদের ছবি তুলবে?’ শকুন্তলা জড়ানো গলায় বলল।
‘দুর্গাপুজোর সময় টিভি চ্যানেলে রত্না আন্টি, পাপিয়া আন্টিদের ছবি ছিল। ওরা তোমাকে মিস করে গিয়েছিল। ভেবে দেখো—আজ ফুল চান্স আছে। একবার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বলো—আমি আর্যনীল দাশগুপ্তের মা। দেখবে ছবিতে ছবিতে ভরে যাবে।’ আর্য হাসতে হাসতে বলল।
অমিত্রসূদন বলল, ‘আমাদের বুঝতে পারবে না। গাড়ি থেকে মেন গেটে নামলে বুঝতে পারত। ওরা সবাইকেই বিভিন্নভাবে আসার কথা বলেছে।’
অমিত্রসূদন ফুটপাত ধরে একটু এগিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল, এতদিন খবরের মধ্যে থেকে আজ সে নিজেই খবরের আড়ালে যেতে চাইছে। গেটের দূর থেকেই সে দেখতে পেলে চারদিকে ফোটোগ্রাফাররা দাঁড়িয়ে। একটু এগোতেই দেখল, ক্যামেরা ধরে দাঁড়িয়ে তাদের অফিসেরই গজেন দাস। অমিত্রসূদন ভাবল গজেনদা কি ওর দিকে এগিয়ে আসবে—কী বলবে? ওর সঙ্গে কথা বলতে চাইবে? কী করবে গজেনদা? অমিত্রসূদনের হঠাৎ একটু নার্ভাস লাগল। কিন্তু গজেন দাস ওকে দেখেই অচেনার মতো অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে কয়েকজন ফোটোগ্রাফারকে ফুটপাতের ওদিকে কী দেখাল, সবাই ওদিকে দেখছে। বুঝল গজেনদা ওদের আড়াল করল। ধন্যবাদ গজেনদা! অমিত্রসূদন খুব নিশ্চিন্তে ইনকোয়ারির মধ্যে ঢুকে গেল। ভেতরে ঢুকেই দেখল তার প্রায় গায়ে গায়ে এসে পড়েছে আর্য। আর একটু পরে হাঁফাতে হাঁফাতে শকুন্তলা। আর্য খুব ভয়ের সঙ্গে মজা মেশানো গলায় বলল, ‘সবাই আমার দিকে তাকাল—কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি বাবি।’
শকুন্তলা বলল, ‘আমি তোকে বুঝতে পারছিলাম। তোর বাবা হাঁটছে, আর তুই দৌড়াচ্ছিলি—।’
‘আমরা হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টে যাব’ অমিত্রসূদন ইনকোয়ারির ভদ্রমহিলাকে বলল।
‘রয়্যাল গার্ডেন? সঙ্গে বাচ্চা আছে তো—? বাইরে মিডিয়ার খুব ভিড়, ওরা আপনাদের বুঝতে পারেনি?’
‘জানি না।’ অমিত্রসূদন নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল।
আর্য ফিসফিস করে শকুন্তলাকে বলল, ‘বাচ্চা! কী বলছে—? আমি বাচ্চা!’
ভদ্রমহিলা বললেন, ‘শুনুন, রোজ রোজ আপনাদের গেটপাস নিতে হবে না। আমি নোট রাখছি, যেদিন আসবেন সরাসরি ভেতরে ঢুকে যাবেন। ওখানে আপনাদের কথা বলা আছে। আপনারা ঢুকে যাবেন। আমি একটা গেটপাস বানিয়ে দিচ্ছি।’
‘বাচ্চা কোথায় দেখি—।’
আর্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবার নাম বলো—, অ্যাড্রেস—, ফোন নম্বর বলো—’
আর্য বাবার নাম, অ্যাড্রেস, ফোন নম্বর বলল। অমিত্রসূদনের ছবি উঠল। ভদ্রমহিলা আর্যের হাতে স্লিপ দিয়ে বলল, ‘এখনও তোমাদের নেশা করার বয়েস হয়নি বাবু—ভেরি ব্যাড।’
‘সে কী করে জানব অ্যান্টি? আমরা কেউ বাবার সেলার থেকে চুরি করে খাইনি, দোকান থেকে কিনে খেয়েছি। দোকানদার বিক্রি করেছে— বাচ্চাদের কেন বিক্রি করল আন্টি? ভেরি ব্যাড।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন