জয়ন্ত দে

যাদবপুর থানা থেকে দুটো নাগাদ আবার ফোন এল।
যাদবপুর থানা নয়, যেতে হবে গড়িয়াহাট থানায়। কারণ মিডিয়া নাকি জেনে গেছে। ‘আপনাদের মধ্যে কেউ যাদবপুর থানার কথা প্রেসকে জানিয়ে দিয়েছেন। যাদবপুর থানার সামনে মিডিয়ার প্রচণ্ড ভিড়। তাই আমরা জায়গা বদল করছি। যাদবপুর থানার বদলে হবে গড়িয়াহাট থানা। প্লিজ প্লিজ, আপনাদের ছেলেমেয়েদের কথা ভেবেই আমরা বলছি, কাউকে কোথায় যাচ্ছেন জানাবেন না। আমরা জানি আপনি একজন মিডিয়া পার্সন, কিন্তু মনে রাখবেন, আপনাদের ছেলেমেয়েরা সবাই নাবালক। আপনাদের ভুল— ওদের ক্ষতি করবে।’
অমিত্রসূদন চুপ করে শুনছে। মিডিয়া পার্সন! তার কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে।
‘আর তিনটে মানে তিনটে। বাইরে আমাদের লোক থাকবে। কিছু বলতে হবে না। তারাই আপনাদের ঠিক জায়গায় নিয়ে যাবে। আবারও বলছি, সময় এবং জায়গা কাউকে জানাবেন না। আপনার অফিসকেও নয়।’
অমিত্রসূদন খুব ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ।’
শকুন্তলা পাশে এসে দাঁড়াল। ‘কোথা থেকে ড্রাইভার নেবে? যদি তুমি সাহস করে গাড়িটা চালাতে পারতে তাহলে আজ এত হাঙ্গামা পোহাতে হত না।’
অমিত্রসূদনরা সেন্টার থেকে ড্রাইভার নেয়। তাদের ফোন করলেই ড্রাইভার পাঠিয়ে দেয়। আজ সেই পরিচিত সেন্টার থেকে ড্রাইভার নেয়নি অমিত্রসূদন। শকুন্তলাই বারণ করেছে। ওরই এক বন্ধু মলির সূত্রে পরিচিত এই ড্রাইভার ছেলেটি আসবে। যেতে মিনিট পনেরো কুড়ি লাগবে। দুটো নাগাদ ড্রাইভারটিকে আসতে বলা হয়েছিল। সে এসে গেছে, নীচে অপেক্ষা করছে।
গাড়িতে ওঠার ঠিক আগেই ফোন করল অবিনাশ। ফোন ধরতেই বলল, ‘তিনটে, যাদবপুর থানা। আমাদের সুদেব ঘোষ কভার করছে। বাচ্চা ছেলে, ভালো, আমার ওবিডিয়েন্ট। কিন্তু আমিও যাচ্ছি, বুঝেছিস। তোর যদি কোনওরকম দরকার পড়ে আমাকে বলিস ভাই, আমি আছি।’
অমিত্রসূদন ম্লান হাসল, ‘নিশ্চয়ই।’
‘হ্যাঁ রে, তোদের কাগজ কি তোর কাছ থেকে এ ব্যাপারে কিছু জানতে টানতে চাইছে?’
‘কে জানতে চাইবে?’
‘রাজীব আর অতীন শুনলাম নিউজটা দেখছে—ওরা তোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে না?’
‘আমি রাজীবকে একবার ফোন করেছিলাম, ব্যস! তেমন কিছু না।’
‘ঠিক আছে, তুই কাজ মিটিয়ে নে; আমি পরে ফোন করে জানব, কী হল না হল।’
গাড়ি নিয়ে বের হলেই আর্য গিয়ে প্রথমেই সামনের সিট দখল করে। আজ ও নিশ্চুপে গাড়ির দরজা খুলে পিছনে বসে পড়ল। পাশে শকুন্তলা। সামনে অমিত্রসূদন। ‘দাদা কোন দিকে যাব?
‘চলো বলছি—।’
গাড়িতে বসে শকুন্তলা উশখুশ করছে, যাবে যাদবপুর, কেন আনোয়ার শা রোডে ঢুকেও বামদিক নিয়ে লেকের পাশ দিয়ে গড়িয়াহাটের দিকে চলেছে। একবার ও আলতো গলায় বলল, ‘কোন দিকে যাচ্ছ?’ অমিত্রসূদন শুধু তার ডান হাতটা তুলল। এটা একজন নাট্যকর্মীর হাত, এই হাতে চোখের তারার মতো ইশারা থাকে। যা এত বছর একসঙ্গে থেকে শকুন্তলা জানে।
এসে থামল গড়িয়াহাট থানার সামনে। থানার গেটে নেমে পড়ল ওরা।
‘ধারে কাছে একটু অপেক্ষা করুন, সময় লাগবে। বের হওয়ার সময় আমি আপনাকে ফোন করে নেব।’
‘এখানে পার্কিং লাগবে।’
অমিত্রসূদন দুশো টাকা বের করে দিল, ‘এটা রাখুন।’
ওদের জন্য বাইরে একজন অপেক্ষা করেই ছিল। যেন ওদের দেখেই চিনতে পেরেছেন। কাছে যেতেই বললেন, ‘দোতলায় চলে যান।’
দোতলার সিঁড়িতে পা দিয়ে দেখল, তাদের মতো জোড়া জোড়া বাবা মা হাজির। শকুন্তলা ফিসফিস করে বলল, ‘ওই হল রোহিতের বাবা।’
রোহিতের বাবা আর্যকে দু’-তিনদিন বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে গিয়েছে। তাই শকুন্তলা তাঁকে চেনে, আরও কাউকে কাউকে হয়তো চেনে।
একজন আর্যকে বলল, ‘তোমার নাম কী?’
আর্য নাম বলল।
‘তুমি ওই ঘরে চলে যাও। ওখানে তোমার বন্ধুরা সব আছে।’
বন্ধুদের কথা শুনেই আর্য দ্রুত ভেতরে চলে গেল। আর্য যেতেই ভেতর থেকে কিছু কচি গলা কলকল করে উঠল। কেউ তাদের থামতেও বলল।
সিঁড়িতেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল অমিত্রসূদন। অভিভাবকরা নিজেদের মধ্যে আলাপ পরিচয় করছে। কেউ কেউ পরস্পরের চেনা। তারা নিজেদের মধ্যে সন্তানদের নিয়ে গল্পও শুরু করে দিল। কার সন্তান কত ভালো, তারা কত কথা শোনে, কিচ্ছু বোঝে না, নাদান।
একজন এসে খুব শান্ত গলায় বলে গেল। ‘প্লিজ ভেতরে কাজ চলছে—এখানে কেউ ফোন করবেন না, বা গল্প করবেন না।’
অমিত্রসূদন দেখল অবিনাশের মিসড কল, সাতটা। রোহিতের বাবার কানে ফোন। মাঝে মাঝে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে যাচ্ছেন, আবার উঠে আসছেন। আর সবাই প্রায় স্থবির। শকুন্তলার সঙ্গে অমিত্রসূদনের চোখচোখি হতে, সে নিচু গলায় বলল কোথাও বসতে। বসার জায়গা কই!
ঘণ্টা তিনেক পরে আর্য পাশের একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এল, ‘বাবি তোমাকে ভেতরে ডাকছে।’
অমিত্রসূদন ভেতর ঢুকতে ঢুকতে দেখল একটা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছেলেমেয়েরা বসে। এক নজরে অমিত্রসূদন যা দেখল, ছেলে তিনচারজন আর সবই মেয়ে। ঘরে ঢুকতেই আর্যকে একজন বলল, ‘তুমি পাশের ঘরে চলে যাও। তোমাকে পরে ডাকছি। আপনি বসুন স্যার।’
অমিত্রসূদন বসল। কাঠের চেয়ার বেশ ছোট ঘর। ওর মুখোমুখি তিনজন।
একজন বললেন, ‘আর্যনীল দাশগুপ্ত আপনার ছেলে? আন্ডার এইট্টিন। আইসিএসসি সার্টিফিকেট বা বার্থ সার্টিফিকেট রেডি রাখবেন। তিনকপি জেরক্স করে রাখবেন। আচ্ছা, কাল একটা ইনসিডেন্ট হয়েছে—সেটা নিয়ে আমরা কিছু বলছি না। ইনভেস্টিগেশন চলছে। ওখানে আপনারা কেউই ছিলেন না, তাই ও ব্যাপারে আপনাদের কাছে কিছু জানার নেই। তবে, এখন যে কোনও সময় আমরা আপনাদের ডেকে পাঠাতে পারি। সবক্ষেত্রেই যে আপনাদের দু’জনকেই আসতে হবে—এমন নয়। তবে বলব, বাবা বা মা কেউ একজন সঙ্গে থাকবেন। আর্যর মোবাইল নেই। শুনলাম ক’দিন আগেই ভেঙে গেছে। সেই ভাঙা মোবাইলটা আমাদের লাগবে, উইথ সিম কার্ড। গুছিয়ে রাখবেন। আমরা চেয়ে নেব। আরও একটা কথা। আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, টিভি, খবরের কাগজ, মিডিয়া বিষয়টাকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আপনারা কতখানি খবরের কাগজ পড়বেন, কতক্ষণ টিভি দেখবেন, সেটা আপনাদের ব্যাপার; কিন্তু দয়া করে ঘরে বাইরে কারও কাছে মুখ খুলবেন না। খবরের কাগজ, টিভিকে কোনও কথা বলবেন না। যদি কিছু বলেন, তার দায়িত্ব আমরা নেব না।’
পাশ থেকে একজন বললেন, ‘আপনার পরিচয় আমরা জানি। এই ক’টা দিনের জন্য দয়া করে সন্তানকে সাহায্য করুন। ওর পাশে থাকুন। কী ভুল, কী ঠিক, কে সত্যি, কে মিথ্যে আমরা খুঁজে বের করব। সে দায়িত্ব আমাদের। কিন্তু আপনাদের কাছ থেকে যেন কোনও গল্প না পল্লবিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টা ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, এটা দিন দিন বাড়বে। পারিবারিকভাবে আপনাদের শক্ত হতে হবে।’
আর একজন বললেন, ‘আমরা এখানে সব বাচ্চাদের ডেকে প্রথম যে কথাটা জিজ্ঞাসা করেছি, তা হল, এই সব ঘটনা শুনে তোর বাবা মা কী বলেছেন—বেশির ভাগ বাচ্চাই বলেছে, সত্যি কথা বলতে। আমরাও চাই সত্যি বেরিয়ে আসুক। দায়িত্ব আমাদের, সত্যি আমরা বের করবই। শুধু ক’দিন আপনারা মুখ বন্ধ রাখবেন। আর টেনশন করবেন না। নরমাল থাকুন। পারলে অফিস থেকে ক’দিন ছুটি নিন—।’
‘কাল ওর স্কুল আছে। কী করব?’ অমিত্রসূদন বলল।
‘দেখুন, আমরা বলব, নরমাল লাইফে থাকুন। কিন্তু বাস্তবে সেটা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। আগামী দিনগুলো আরও কঠিন। ওর স্কুলে গিয়ে কথা বলে নিন। বলে দিন ক’দিন অ্যাবসেন্ট হবে। অন্তত ওয়ান উইক—বেশিও হতে পারে। ততদিনে আমাদের কাজ অনেক এগিয়ে যাবে। আর এই ফোন নম্বরটা রাখুন। তেমন কোনও কথা ছেলে বললে—লুকাবেন না, আমাদের জানাবেন। তাতে বিপদ বাড়বে না, বিপদ কমবে। আর বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবেন না। ফোন বন্ধ রাখবেন না। যে কোনও সময় আমরা আবার ডেকে পাঠাব। পাশের ঘরে আপনার ছেলে আছে তাকে ডেকে নিয়ে সোজা বাড়ি চলে যাবেন। কারও সঙ্গে কোনও কথা বলবেন না। মনে রাখবেন, একটি বাচ্চা ছেলে মারা গেছে। অ্যাক্সিডেন্ট, না খুন—সারা শহর কিন্তু সত্যি জানতে চাইছে।’
পাশ থেকে একজন খুব ঠান্ডা গলায় বলল, ‘যে ছেলেটি মারা গেছে—তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু রোহিতের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। আর রোহিতের সবচেয়ে কাছের বন্ধু আপনার ছেলে আর্যনীল। রোহিত আর আর্যনীলই ঘটনা ঘটার পর ওখান থেকে বেরিয়ে আসে। কিছু প্রশ্ন, কিছু জট আছে—যদি কেউ কোনও অপরাধ করে থাকে সে তার শাস্তি পাবে। আমরা ছাড়ব না। ছেলে কিছু বললেই, আমাদের জানাবেন।’
‘যান ছেলেকে নিয়ে বাড়ি চলে যান।’
অমিত্রসূদন উঠল। কাগজে লেখা মোবাইল নম্বরটি নিয়ে বোবার মতো পাশে ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। আর্য উঠে এল। বলল, ‘কথা হয়ে গেছে, চ।’
আর্য পিছন দিকে তাকাল। একজন বলল, ‘রাতে আন্টির নম্বরে তোকে ফোন করব।’
আর্য বলল, ‘বাবি ও রোহিত।’
‘হাই আঙ্কেল!’
‘ও সবুজ—। ও অনুষ্কা।’
‘এখানে দাঁড়াবেন না। চলে যান।’
ওরা বেরিয়ে এল। শকুন্তলা বলল, ‘কী হল?’
‘সব ঠিক আছে, চল। বাড়ি যাব।’
শকুন্তলা যেন স্বস্তির শ্বাস ফেলল, পাশ ফিরে পর পর দু’জনকে বলল, ‘আসি। বাব্বা বাঁচলাম! টা টা।’
সিঁড়ি দিয়ে একটু নামতেই এগিয়ে এল রোহিতের বাবা।
‘মিঃ দাশগুপ্ত আমি রোহিতের বাবা। আর কে পল। এই আমার কার্ড। আপনার ফোন নম্বরটা একটু পেতে পারি?’
‘নিশ্চয়ই। এই নিন।’ অমিত্রসূদনও তার কার্ড এগিয়ে দেয়।
‘ইনি হলেন সবুজের বাবা—।’
‘আমার নাম সন্দীপন বসাক।’
‘আচ্ছা, আমি অমিত্রসূদন দাশগুপ্ত।’
‘আপনি আমার ফোন নম্বরটা রাখুন—।’ সন্দীপন বসাক কার্ড এগিয়ে দেয়।
অমিত্রসূদনও কার্ড দেয় সন্দীপনকে।
রোহিতের বাবা বলে, ‘আমাদের নিজেদের মধ্যে একটু কথা বলে নিতে হবে। আমি চেষ্টা করছি সব পেরেন্টসদের একসঙ্গে করার।’
‘আপনারা সিঁড়িতে দাঁড়াবেন না। প্লিজ, যাঁদের কথা হয়ে গেছে, তাঁরা চলে যান—। প্লিজ মিস্টার পল, আমাদের কাজ করতে দিন—।’
‘ওহ সরি। নো প্রবলেম!’ আর কে পল সিঁড়ির মুখ ছেড়ে দাঁড়ায়।
অমিত্রসূদনরা বেরিয়ে আসে। গাড়ি চলতে শুরু করলেই শকুন্তলা বলল, ‘কী রে তোকে কী বলল?’
অমিত্রসূদন বলল, ‘তোমরা কি কিছু খাবে?’
‘না। আগে বাড়ি যাব।’ আর্য বলল।
শকুন্তলা বলল, ‘তোকে কী জিজ্ঞাসা করল?’
‘যদি কিছু খেতে চাও, গাড়ি থামিয়ে কিনে নাও’, অমিত্রসূদন খুব জোরে বলল। এই ধরনের জোরে কথায় অন্যের গলা থেমে যায়। অন্যের কথা চাপা দেওয়ার জন্যই এত জোরে বলা।
আবার ফোন এল অবিনাশের। অবিনাশ বলল, ‘মনে হচ্ছে গাড়িতে আছিস, এখন যাচ্ছিস তাহলে? শুনলাম টাইমটা পালটেছে। রাত আটটা, যাদবপুর।’
‘অবিনাশ আমি তোর সঙ্গে পরে কথা বলি?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওক্কে ওক্কে। পারলে বেরিয়ে আমাকে একটা ফোন করিস, টেনশনে থাকব।’
বাড়ি ফিরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শকুন্তলা বলল, ‘কী বলল তোকে? সব মিটে গেছে? আর যেতে হবে না তো?’
‘কাল কেবল লাইনের প্রবলেম ছিল—এখন নিশ্চয়ই টিভিটা চলবে—।’ আর্য বলল।
আর্য সাধারণত টিভি খুলে স্পোর্টস চ্যানেলে ঢুকে পড়ে। আজ অদ্ভুতভাবে বাংলা নিউজ চ্যানেল খুঁজে নিল। বিখ্যাত চ্যানেল এবিসি-উল্লাসে একজন প্রাক্তন পুলিশকর্তা আর মনোবিদ এসেছেন। দু’জনেই গম্ভীরমুখে বলছেন— সমাজের কতখানি অবক্ষয় হলে একজন নাবালক মদের বোতল ভেঙে আর এক বন্ধুর ওপর চড়াও হয়।
চ্যানেল পাল্টালো আর্য। এবার ৫৬ ঘণ্টা। একজন নিউজ অ্যাঙ্কর বগলে একটা বোতল নিয়ে স্ক্রিনে হাজির। সে অভিনয় করে দেখাচ্ছে, বগলে মদের বোতল নিয়ে পড়ে গেলে কী হতে পারে—? বোতল ভেঙে হাতে ঢুকে মৃত্যু, কখনও নয়। খুন! খুন! নিশ্চিত খুন।
‘বাস্টার্ড!’ দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে উঠল আর্যনীল।
অমিত্রসূদনকে দেখেই আর্য বলল, ‘বাবি তোমাকে যে ফোন করছিল, অবিনাশ—সে তো এবিসি-উল্লাসে আছে না? তাকে ফোন করে আমাকে একটু ধরিয়ে দাও তো—কী হয়েছিল আমি সব বলব—।’
অমিত্রসূদন ঘাড় নাড়ল। ‘টিভিটা বন্ধ রাখ, সমস্যা কমে যাবে।’
‘কেন টিভি বন্ধ করব কেন?’
‘যত ওসব শুনবি তত সমস্যা হবে।’
‘তোমার নাটকে একটা ডায়লগ ছিল না—অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে!’
‘ওটা একজন বিখ্যাত কবির কবিতার লাইন, হ্যাঁ আমি ব্যবহার করেছি মাত্র।’
‘তাহলে আমিও আজ এটা ব্যবহার করছি—কেন অন্ধ সেজে থাকব?’
‘পুলিশ তাই বলেছে—এখন সত্যি মিথ্যেতে কিছু যায় আসে না। একটি বাচ্চা ছেলে, একজন মানুষ মারা গেছে। সে কেন ও কীভাবে মারা গেল সেটা নিয়ে অনেক প্রশ্নচিহ্ন আছে। তার মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয়। তোদের সবার কথার উত্তর তোরা সৎভাবে পুলিশকে দিবি। সত্যিটা পুলিশ সবাইকে জানাবে। এই ইনভেস্টিগেশনকে তুই, তোরা বন্ধুরা সঠিক উত্তর দিয়ে সত্যে পৌঁছাতে সাহায্য কর। আর কিছু না। সেখানে অন্ধ হয়ে থাকিস না, তাহলেই হবে।’
আর্য উঠে দাঁড়ায়, ফুঁসতে ফুঁসতে ঘরে চলে যায়।
শকুন্তলা নিজের হাতে হাত বোলাচ্ছে। হঠাৎ কী যে হল এত জ্বালা পোড়া কেন? কী হল?
ফোন বাজছে। অমিত্রসূদন দেখল অফিস থেকে—রাজীব।
‘হ্যাঁ রাজীব বলো—।’
‘দাদা আজ আপনাদের ডেকে পাঠিয়েছিল শুনলাম।’
‘হ্যাঁ।’
‘কোথায় দাদা, কখন? সবাই এসেছিল? সতেরোজনই?’
‘আমি গুনিনি, হয়তো সবাই এসেছিল।’
‘দাদা কী হল ওখানে? কী প্রশ্ন করল?
‘কী হল, কী প্রশ্ন করল—ওরা বলতে নিষেধ করেছে। তাতে ইনভেস্টিগেশনের অসুবিধে হবে। আমি ওদের কথা দিয়েছি।’
‘আমি এসব লিখব না দাদা, জাস্ট জানতে চাইছি। বলতে পারেন দুশ্চিন্তা থেকেই জানছি।’
‘প্রেসকে ওরা নিশ্চয়ই আজ কিছু জানিয়েছে—।’
‘হ্যাঁ, হোঁচট খাওয়ার একটা তত্ত্ব খাড়া করছে—।’
‘আচ্ছা।’
‘দাদা আপনার ছেলের সঙ্গে একবার কথা বলা যায়—? আমি ওর মুখে পুরো ঘটনাটা একবার শুনতে চাই। ব্যস, এটুকুই। ওর প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। আমি এক ফোঁটা অতিরঞ্জন করব না। কী হয়েছিল—এভাবেই দেব। এতে মনে হয় ওদের ভালোই হবে।’
‘আপাতত ইনভেস্টিগেশনের অসুবিধে হয় এমন কাজ আমি করব না। সেক্ষেত্রে ওকে কী করে বলি?’
‘ঠিক আছে, দাদা, ভালো থাকবেন। চিন্তা করবেন না।’
‘না, চিন্তা করছি না।’
‘আজ তো আপনার ছুটি দাদা, কাল অফিস আসছেন তো—? সামনাসামনি কথা হবে।’
‘নিশ্চয়ই রাজীব।’
রাতের খাবার নিয়ে শকুন্তলা বসে আছে। দু’-দু’বার সে আর্যর ঘরে ধাক্কা দিয়ে বলে এসেছে—‘খেতে আয়।’ সেই দুপুরে খেয়েছে, একটা নাগাদ। তারপর কেউই কিছু খায়নি। শকুন্তলার মনে হচ্ছিল, আজ বিকেল বা সন্ধেবেলায় চা খায়নি অমিত্রসূদন। ফিরেও সে চা করেনি।
বাবা ছেলে একসঙ্গেই খেতে এল। খেতে খেতে টিভি দেখা অমিত্রসূদনের অভ্যাস। শকুন্তলা ভাবছিল টিভিটা কি চালাবে? কিন্তু এ সময় তো সাধারণত বাংলা খবরের কোনও চ্যানেলই চলে। না, না! এখন কী দেখাবে কে জানে! হয়তো খাওয়াটাই নষ্ট হবে। ওখানে ওরা যা সব বলছিল—টিভিতে কী না কী দেখাচ্ছে। হয়তো নোংরা ছেলেমেয়েদের মতো করে এদের ট্রিট করছে। কেউ ভাবছে না এরা বাচ্চা ছেলে মেয়ে। এরা কত ছোট। কেউ কেউ তো এখনও নিজেরা হাত দিয়ে খায় না। হ্যাঁ, অন্যায় করেছে, খুব অন্যায় করেছে। কিন্তু ওরা মারামারি ধাক্কাধাক্কি করেনি। আর খুনখারাপি? অথচ টিভি নাকি ওদের খুনি সাজিয়ে দিয়েছে—কাল রাতেই।
খাওয়া শেষ করে শকুন্তলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আকাশপাতাল ভাবছিল। কখন আর্য এসে তার কাছে দাঁড়িয়েছে। বলল, ‘তুমি যে দু’জন আন্টির সঙ্গে কথা বলছিলে তাদের চেনো?’
‘হ্যাঁ একজন তো অনুষ্কার মা। উনি বলছিলেন, মেয়েকে আর সামলাতে পারছি না। আর দু’-চার বছর যাক, ওকে বিয়ে দিয়ে দেব।’
‘ওকে কে বিয়ে করবে? যে বিয়ে করবে তাকে ও পুরো ম্যাড বানিয়ে ছেড়ে দেব। ওইটুকুনি সাইজ হলে কী হবে—ও একটা জিনিস! জানো তো ওর বাবার এ দেশে চারটে শহরে ফ্ল্যাট আছে। আর এখানে বিশাল বাড়ি। এছাড়াও আমেরিকা, লন্ডনেও বাড়ি আছে।’
‘তাই!’
‘হ্যাঁ, তাই। ওর বাবা কোন একটা কোম্পানির জিএম। কিন্তু খুব সিম্পল। ওই যে ফরসা, খুব সুন্দর দেখতে, প্রচণ্ড ভদ্র একজন সবাইকে জলের বটল দিচ্ছিল, উনি। অনুষ্কার মা-ও খুব ভালো। কিন্তু অনুষ্কাকে কিছুতেই সামলাতে পারে না। অনুষ্কা একটু সুযোগ পেলেই বাবা মাকে বুদ্ধু বানিয়ে দেয়।’
‘ও। ভালো কাজ বাবা মাকে বুদ্ধু বানানো?’
‘আর একজন যার সঙ্গে কথা বলছিলে, ও তো সবুজের বাবার গার্লফ্রেন্ড।’
‘মানে? কী যা তা বলছিস?’
‘থোড়ি আমি বলছি—? এটা সবুজ বলে। ওই মহিলাই এখন সবুজের বাবার গার্লফ্রেন্ড। সবুজের বাবার সঙ্গে এসেছে। আর সবুজের মাকে দেখলে না? ফরসা, সুন্দর দেখতে, গোলমতো মুখ, চুপ করে বসে ছিল, ওই আন্টি। আন্টির মেন্টাল প্রবলেম হয়ে গেছে। সবুজের বাবা ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছে। সবুজ ওর বাবার গার্লফ্রেন্ডকে একদম সহ্য করতে পারে না। অথচ ওই মহিলা সবুজকে ম্যানেজ করার জন্য দেখা হলেই দু’হাজার, পাঁচ হাজার, দশ হাজার টাকা দিয়ে দেয়। বলে, “যাও বন্ধুদের নিয়ে খেয়ে এসো।” সবুজ বলে, “আমার বাবার টাকা আমাকে দিচ্ছে!” ওর বাবার প্রচুর টাকা। বিজনেসম্যান। বুঝলে, সবুজ আর ওর বোনকে ওর বাবা, ওর মা, আর গার্লফ্রেন্ড—সবাই নিজেদের দলে আনার জন্য টাকা দেয়। ওরা দু’ভাই বোন বিন্দাস আছে। ওদের পকেটমানি শেষ হওয়ার আগেই রিফিলিং করে নেয়। যার কাছেই ওরা দাঁড়াবে সেই আগে টাকা দেবে। সবুজ আর সবুজের বোনকে ওরা সবাই বোকা ভাবে, কিন্তু আসলে ওরা নিজেরাই বোকা। সবুজ কিন্তু খুব চেষ্টা করেছে মা আবিরকে বাঁচানোর। ও আজও বলছিল, “ভাই এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না ও মরে গেছে। এখুনি হয়তো উঠে এসে ড্রামা করবে—দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে বলবে— আমি তো এরকমই।” বলো কাল আবির ফোনে কেমন ড্রামা করছিল—’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন