জয়ন্ত দে

টলি ক্লাবে লাঞ্চ হবে না।
লাঞ্চ হবে না কেন?
এতজনের জন্য অরিজিনাল মেম্বারকেই চাই।
শ্রী মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে। ওকে আমরা বুলি করছি। শ্রী বার বার ওর মা আর বাবাকে ফোন করছে। তাহলে কী করবে? ওর মা বাবা ফোনে কী বলছে জানি না। কিছু একটা বলছে। ক্লাবের ল’ তো মানতেই হবে। একজন দু’জন হলে শ্রী নিশ্চিত ওর বাবার কার্ডে লাঞ্চ করিয়ে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু আমরা এত জন। সঙ্গে ওর বাবা নেই, মা নেই, আসলে ছোটদের কেউ পাত্তা দেয় না।
শ্রী আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী করি বলত আর্য? এখানে হবে না বলছে। সবাই কেমন দেখছে—যেন বিনা পয়সায় খেতে এসেছি।’
আমি বললাম, ‘শোন এখানে আমাদের থাকা ভালো দেখাচ্ছে না। চল আমরা আগে এখান থেকে বেরিয়ে যাই। তারপর সাউথ সিটি মলের ফুডকোর্টে গিয়ে কিছু খেয়ে নেওয়া যাবে।’
আমরা হইহই করে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু সাউথ সিটি মলের ফুডকোর্ট নিয়ে অনেকেরই আপত্তি। ফুডকোর্টে অনেকেই খাবে না। তখনই রোহিত বলল, ‘এক কাজ কর—আমাদের ক্লাবে চল। আমি আছি কোনও অসুবিধে হবে না।’
শ্রী বলল, ‘ঠিক আছে যা বিল হবে আমি বাড়ি ফিরে তোকে পে করে দেব।’
আনোয়ারশাহ রোডে একটু এগলেই প্রিন্সটন ক্লাব। এই ক্লাবের মেম্বার রোহিতের বাবা। এখানে আমি আগেও গিয়েছি রোহিতের সঙ্গে। আঙ্কেল আন্টির সঙ্গে। ওরা সবাই রোহিতকে খুব ভালো করেই চেনে। এখানে রোহিতের কোনও অসুবিধে হবে না। আমরা যে যার মতো খাবার অর্ডার দিলাম। বাইরে একটা চেয়ার নিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে আবির বসে। আমি রোহিতকে বললাম, ‘দেখ, আবির না খেয়ে কেমন বসে আছে।’ তখন অ্যাবসিলিউটের বোতলটা অনেকটাই ও খেয়েছে, সেটা গাড়িতে আছে।
রোহিতের কাছ থেকে আগেই জেনেছিলাম, আবির আজ সকালে শুধু এক গ্লাস দুধ খেয়ে বেরিয়ে এসেছে। গত কাল প্রায় সারা রাত আবির একটা ক্লাবে পার্টি করেছে। নতুন ক্লাব। এই ক্লাবটায় একদম ভিড় হচ্ছে না। তেমন কেউ যায় না। এই ক্লাবগুলো আবিরের মতো পপুলার ছেলেদের ডাকে। আবিরের অনেক বন্ধু বান্ধব আছে, ওর বিরাট সার্কেল। আবিরের যাওয়া মানেই তার সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেকে যাবে। সেই বন্ধুদের সঙ্গে তাদের বন্ধুরাও আসবে, তাদের সঙ্গে তাদের বন্ধুরা। এইজন্যে সবাই আবির রোহিতদের ডাকে। ওরা কোথাও গিয়ে ইনস্টাগ্রামে ছবি দেয়। ব্যস তাহলে অনেকেই ইন্টারেস্টেড হয়। আবির সেখান থেকেই ফিরে ভোররাতে এসে ঘুমিয়েছে বাড়িতে, আবার সকালবেলা বেরিয়ে এসেছে।
আবির এক গ্লাস দুধ খেয়ে এসে এভাবে ভদকা খাচ্ছে!
রোহিত বলল, ‘ওকে বল—কিছু যদি খায়।’
আমি আর শ্রী এসে আবিরকে বললাম, ‘কিছু খেয়ে নে।’
আবির মাথা ঝাঁকাল, ‘আমি বিন্দাস আছি! আমার কোনও প্রবলেম নেই ভাই। খিদে পাচ্ছে না। আমার বোতলটা গাড়িতে আছে।’
আমরা দু’জনেই খুব জোর করলাম। কিন্তু ও খাবে না। রোহিতকে বললাম। রোহিত বলল, ‘ভাই ছেড়ে দে, ও খাবে না যখন বলছে তখন জোর করিস না। ও ঠিক আছে। খিদে পেলে খেয়ে নেবে।’
আমি বুঝতে পারছিলাম, আবির অগ্নিমিত্রার সঙ্গে ঠিক ভাব জমাতে পারছে না, তাই একটু আন্ডার—। তবে ও আবির সহজে সরে আসবে না। ট্রাই করেই যাবে।
আবির সেদিন খায়নি। ওর খেতে ইচ্ছে করছিল না বলেই খায়নি। ও হয়তো একটু ফ্রাস্টেটেড ছিল, অগ্নিমিত্রা ওকে ঠিক পাত্তা দিচ্ছে না। তা বলে এই নয় ও দেবদাস হয়ে বসেছিল। আমরা ওরকম নই। মন খারাপ লাগলে চুপ করে থাকি, একা থাকি। কেউ ওই বিষয়ে বলতে এলে তাকে থামিয়ে দিই, বিষয়টা নিয়ে প্যানপ্যান করি না। দুঃখের সাত পাঁচ কাহন গাই না। কিছুক্ষণ একা থেকে নিজেকে বোঝাই। তারপর ঝাড়া মেরে উঠে পড়ি। কী হয়েছিল, না হয়েছিল সব মনে থাকে কিন্তু সেটা নিয়ে পড়ে থাকি না। সেটা কাঁধে করে সঙ্গে নিয়ে চলি না। কারও সঙ্গে যদি কিছু হয়, সেটা যদি সহ্য করার ক্ষমতা থাকে তাহলে ঠিক আছে, বিষয়টা আর বাড়তে দিই না। সমস্যাটা ওখানেই শেষ করে আবার মিশে যাই। আর যদি বুঝি হবে না, তাহলে সরে আসি। এটা আমাদের জেনারেশনের সবাই করে। সে প্রেম হোক, বা বন্ধুত্ব হোক। ভালো না লাগলে টানার কোনও মানে হয় না। সেখানে আর থাকি না। আর একটা কথা, আমরা কারও পিছনে কাউকে নিয়ে গল্প করি না। যদি কাউকে নিয়ে গল্প করি, তবে সেটা মজার গল্প। সমালোচনা নয়। তেমন কেউ কিছু উলটোপালটা বললে কেউ না কেউ সেটা চেপে ধরবে। তাকে আচ্ছা সে পালিশ করে দেবে।
তেমনই আবিরকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে, না খেয়ে থাকতে দেখে তখন আর কেউ কিছু বলেনি। তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছিল ও অনেকটা ভদকা খেয়েছে, ওর নেশা হয়ে গিয়েছিল, থম মেরে গেছে। আমাদের গল্প মজা থেকে একটু সরে গিয়ে রেস্ট নিচ্ছে। যে কোনও সময় ঝটকা মেরে উঠবে। ও আবির!
আমি আর দেখিনি আবির কিছু খেয়েছে কি না। কিন্তু আমার মনে হয়, ও কিছু খায়নি। ওখানে আমরা সবাই আলাদা আলাদা হয়ে গল্প করছিলাম, মজা করছিলাম। এখানে আসা অনেক মেয়ের সঙ্গেই আমাদের তেমন বন্ধুত্ব নেই। তাই আমি, রোহিত, সবুজ প্রায় এক জায়গায়, আবির একটু দূরে, আর গার্লসগ্যাংরা নিজেদের মধ্যে। তবে ওদের মধ্যে থেকে অনুষ্কা ঊষসী আমাদের সঙ্গেই আছে। শ্রী এদিক ওদিক করছে। আমরা দু-একবার আবিরের কাছে গেলাম, ও থম মেরে আছে। ওর নেশা হয়ে গেছে। আমার আর সবুজের অন্তত তাই মনে হয়েছিল। রোহিত বলল, ‘ভাই তুই আবিরকে নিয়ে চিন্তা করিস না। ওর এত সহজে নেশা হয় না। ও অগ্নিমিত্রার জন্য ড্রামা করছে।’
রোহিত সেদিন সব টাকা নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে পেমেন্ট করেছে। অবশ্যই শ্রী দিয়ে দেবে। প্রিন্সটন ক্লাবে আমরা বেশিক্ষণ ছিলাম না। বেরিয়ে এলাম। এবার কোথায় যাব?
শ্রী বলল, ‘আমাদের বাড়ি চল।’
আমরা আবার সবাই শ্রীদের বাড়ি চললাম। আজ সন্ধেবেলা আমাদের একটা পার্টি আছে হায়াতে। অ্যারেঞ্জ করেছে আমাদেরই এক বন্ধু সেখানে আমি, রোহিত, সবুজ, আবির, শ্রী, অনুষ্কা, ঊষসীর যাওয়ার কথা। সেভাবেই আমরা তৈরি হয়ে বেরিয়েছি। শ্রীয়ের বাড়ি থেকে হায়াত চলে যাব।
কিন্তু সেদিন বিকেলে আর কোথাও যাওয়া হয়নি আমাদের।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন