জয়ন্ত দে

ব্রেকফাস্টে লুচি আলুভাজা! মুখ বেজার করে বসে ছিল আর্য। খাবে না। আমাকে ব্রেড বাটার দাও। এগপোচ দাও। শনিবার স্কুল ছুটি থাকে। ছুটির দিনেও ব্রেড বাটার! রোজই সাতসকালে মাখন-পাউরুটি, ডিমসেদ্ধ আর দুধ খেয়ে স্কুলে যায় আর্য। আজ ওকে লুচি আলুভাজা খেতে হবে। হবে মানে হবেই। এই নিয়ে মা ছেলের টানাপোড়েন চলছিল। শেষে রফা হয়—শকুন্তলা খাইয়ে দেবে। শকুন্তলা খাওয়াচ্ছিল। গত তিনদিন ধরে এই বাড়ির পরিবেশ ভারী ছিল। একটা ঘড়ি হারানো এবং একটি মোবাইল ফোন ভাঙা নিয়ে। সে পর্ব মিটে গেছে। আজ স্বাভাবিক। শকুন্তলা খাওয়াচ্ছিল। এমন সময় ফোন বেজে উঠল। শকুন্তলা বলল, ‘রোহিত।’ আর্য লাফিয়ে উঠে সে ফোন ধরল।
‘ভাই তোর সঙ্গে একটা কথা ছিল।’
‘বল।’
‘আমাদের সঙ্গে আবির যেতে চাইছে।’
‘কোথায় যাবে?’
‘শ্রীদের বাড়ি।’
‘আবির? আবির কেন?’
‘না, ও যাবে বলছে।’
‘ও কি শ্রীর বন্ধু? আমরা সারপ্রাইজ দেব—এটা শ্রী জানে। আর এই সারপ্রাইজ পার্টিতে ওর বন্ধুরাই থাকবে। আবির তো ওর বন্ধু নয় ভাই।’
‘শোন না ও যাক। শ্রী যদি কিছু বলে তুই একটু ম্যানেজ করিস।’
‘আমি কী করে ম্যানেজ করব? শ্রী কেমন মুডি তুই তো জানিস—’
‘নে, তুই একটু আবিরের সঙ্গে কথা বল—।’
আর্যনীল কিছু বলার আগেই রোহিত ফোন ধরিয়ে দিল আবিরকে।
‘ভাই আমি গেলে কি তোর কোনও প্রবলেম আছে?’ আবির নরম গলায় বলল।
‘আমার কী প্রবলেম?’ আর্য ফোনের এপারেই কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে।
‘তাহলে?’
‘শ্রীর ঠাকুমা মারা গেছে বলে ওর বার্থ ডে হবে না। ও খুব আপসেট। আমরা তাই শ্রীকে বার্থ ডে সারপ্রাইজ দেব ওর বাড়ি গিয়ে। সব ওর স্কুলের বন্ধু, আর আমরা ক’জন।’
‘ভাই শোন, আমি তোকে একটা সত্যি কথা বলি—শ্রীর বার্থ ডে আমার কাছে ব্যাপার নয়। আমি আসলে অগ্নিমিত্রার জন্য যাচ্ছি। রোহিত জানে, তোর কোনও প্রবলেম হবে না।’
‘আমি বললাম তো আমার কোনও প্রবলেম নেই।’
‘ওকে।’
ফোন ছেড়ে আর্য হাসছিল। ‘মা আমাদের সঙ্গে আবির যাবে! কী ছেলে দেখো ও শ্রীর বন্ধু নয়, দু’একবার হাই হ্যালো হয়েছে—তবু ও যাবে।’
শকুন্তলা অবাক হয়ে বলেছিল, ‘তো কী হয়েছে গেলে?’
‘আরে আবির তো শ্রীর বন্ধু সার্কেলে আসে না। একদিন দেখেছে কি দেখেনি, হাই হ্যালো—জাস্ট এটুকুই।’
শকুন্তলা বুঝল, ‘তাহলে ও যাবে কেন?’
‘অগ্নিমিত্রার জন্য।’
‘অগ্নিমিত্রা—সে কে?’
‘অগ্নিমিত্রা, অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। এই কিছুদিন হল এসেছে। আবির ওর ফোটো দেখেছে আমাদের সঙ্গে—ব্যস, ও অগ্নিমিত্রার জন্য শ্রীর বার্থ ডে-তে যাবে।’
‘হ্যাঁ রে ওর লজ্জা করবে না?’
‘মা তুমি আবিরকে চেনো না—ও যেখানে যাবে সেখানেই ম্যানেজ করে নেবে। এত ফানি, এমন মজা করবে, পুরো জমিয়ে দেবে। দেখবে সবাই ওকে নিয়ে মেতে গেছে—। দারুণ ছেলে।’
‘ও আগে তোদের স্কুলে পড়ত না?’
‘হ্যাঁ, পড়ত। নাইন থেকেই তো ও আমাদের স্কুলে নেই—’
‘নাইনে স্কুল চেঞ্জ করল? কেন?’
‘কী জানি? জানি না। স্কুলের সঙ্গে কী যেন একটা প্রবলেম হয়েছিল।’
‘এখন কোথায় পড়ে?’
‘এখন একটা নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ওর আর স্কুল! সারাদিন ঘুরে বেড়ায়।’
‘তোর সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব আছে?’
‘আছে, তবে তেমন নয়।’
‘আর্য তুই কাদের সঙ্গে মেলামেশা করিস! এরা তোর বন্ধু? এদের ভবিষ্যৎ কী? এরা কী করবে?’
শকুন্তলার কথায় আর্য ঠিকরে ওঠে, ‘ওদেরটা ওদেরকেই ভাবতে দাও। ওদের ভবিষ্যৎ ভাবার অন্য অনেক লোক আছে। ওদের টাকা আছে, টাকা। যা তোমাদের নেই। ওরা টাকা দিয়ে ভবিষ্যৎ তৈরি করে নেবে। তুমি কোনও কথা হজম করতে পারো না, না? এইজন্য তোমাকে কোনও কথা আমি বলি না। বললেই—“তুই কাদের সঙ্গে মিশিস?” ব্যস, তারপরই শুরু হবে ভবিষ্যৎ—; তুমি নিজের ভব্যিষৎ ভাবোনি কেন? ঘরের বসে বসে রান্না করো—। চাকরি তো করতে পারতে? নাটকের দলেও তো ভিড়তে পারতে? কিছুই করোনি, শুধু ঘরে বসে বসে ঝামেলা পাকাও।’
সেদিনের সকালটা বার বার শকুন্তলার কাছে ফিরে ফিরে আসে। সে কতদিন কত জায়গায় যাওয়ার আবদার এক কথায় নাকচ করে দিয়েছে। আর্য জানে তার মায়ের ‘না’ মানে না। ‘হ্যাঁ’ করানো যাবে না। আর্য তাই কোনও কথা কায়দা করে লুকাতে পারলে লুকিয়ে যায়। নইলে আগেভাগেই মায়ের কাছে পারমিশন নিয়ে নেয়। বন্ধুদের মায়ের কথা বলা যাবে না। অন্য কথা বলে কাটিয়ে দেয়। শকুন্তলা সেদিন কেন পারমিশন দিল? এতদিন কত কত ‘না’ বলেছে। আর একবার নয় ‘না’ বলত। ঘড়ি নিয়ে, মোবাইল নিয়ে, অশান্তি তো চলছিলই, সেই অশান্তির জের টেনেই ‘না’ বলতে পারত। কিন্তু সে বাড়ির চাপা অশান্তি, মানসিক চাপ কাটানোর জন্য ‘হ্যাঁ’ বলেছিল। যা আজ সেই ‘হ্যাঁ’ তাকে খাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন