এক

জয়ন্ত দে

আসলে কোনও কোনও দিন থাকে যে-দিন মাত্র একটা ফোন থাকে অচেনা। আর সেই অচেনা ফোনটি বাদবাকি সারাটা দিন, এমনকী পরবর্তী অসংখ্য দিন, কিংবা সারাটা জীবন দখল করে নেয়। আপনার শরীরের শিরা-উপশিরা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেয়। আপনার অনেক চেনা রাস্তা, চেনা মানুষকে অচেনা করে দেয়। আজ তেমনই একটি ফোন এল অমিত্রসূদনের কাছে।

ফোন বাজছে। একটা অচেনা নম্বর।

এখন রাত প্রায় দশটা। অমিত্রসূদন দ্বিধায়, মেজাজটা ভালো নেই, ফোনটা ধরবে কি না ভাবছিল। কাজের ফোন, না অ-কাজের, কে ফোন করেছে, কতক্ষণ কথা বলবে—এমনই বেশ কিছু কথা ভাবছিল অমিত্রসূদন। কেননা এক্ষুনি রাতের খাবার দিয়ে শকুন্তলা ডাকবে। তখন যদি দেখে সে ফোনে ব্যস্ত, তাহলে আজ আর দেখতে হবে না। তাছাড়া এখন তার একদমই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেল। যাক গে! কিন্তু ফোনটা থামল না, দ্বিতীয়বার বেজে উঠল। অমিত্রসূদন আবার ঘড়ির দিকে তাকাল। ফোনটা বাজছে—অচেনা নম্বর। হঠাৎ অমিত্রসূদনের মনে হল, এই ফোনটা তাকে ধরতেই হবে, না ধরলে থামবে না। যেন ফোনটা তাকে ধরিয়েই ছাড়বে।

ফোনটা তুলে সে মৃদু স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ, বলছি—।’

‘এর আগে আপনাকে আমরা তিনবার ফোন করেছি।’ ফোনের ওপর থেকে যিনি কথা শুরু করলেন, তাঁর গলা বেশ ভারী আর চাপা। সেই সঙ্গে তাঁর গলায় প্রচণ্ড দাপট।

অমিত্রসূদনের একবার মনে হল বলেন, তিনবার কোথায়, দু’বার তো। কিন্তু সে সংশোধন করার চেষ্টা করল না। বলল, হতে পারে—।

‘আপনি শোনেননি, না ইচ্ছে করে ধরেননি?’ লোকটা তাকে প্রশ্ন করে উত্তরের অপেক্ষা করছে। উত্তর পেলেই প্রবল একটা ধমক আছড়ে পড়বে বলে মনে হচ্ছে। এই প্রশ্নের উত্তরে অমিত্রসূদন হাসতে পারত, কিন্তু সে হাসল না। নির্ঘাত রং-নাম্বার হবে। তবু সে বলল, ‘দুঃখিত। বলুন, এখন তো আমি ফোনটা ধরেছি।’

‘আমরা অনেকক্ষণ ধরে আপনাকে ট্রাই করছি।’

‘হতে পারে, আমি মিস করে গেছি। দুঃখিত, এবার বলুন কেন আমাকে ফোন করছেন? আর কিছু যদি মনে না করেন, আচ্ছা আমি কার সঙ্গে কথা বলছি—।’

অমিত্রসূদনের কথা শুনে ফোনের ওপার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর খুব ঠান্ডা আর নিচু গলায় বলল, ‘আমি যাদবপুর থানা থেকে বলছি—।’

যাদবপুর থানা শুনে অমিত্রসূদন একটু থমকাল। থানা শুনলেই সবাই একটু চমকায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘ও আচ্ছা! হ্যাঁ বলুন—।’

‘আপনার নাম অমিত্রসূদন দাশগুপ্ত?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনার ছেলের নাম আর্যনীল দাশগুপ্ত?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনার ছেলের ফোনটা বন্ধ।’

‘হ্যাঁ, আমি জানি।’

‘কেন বন্ধ জানেন?’

‘জানি।’

‘জানেন—জানেন বলছেন, তাও আপনি ফোনটা ধরছেন না!’

লোকটা এবার সত্যি সত্যি ঠান্ডা গলায় ধমক দিল।

‘জানি বলতে—ওর ফোনটা গত তিনদিন ধরে বন্ধ। আসলে ফোনটা ভেঙে গেছে।’ খুব শান্ত গলায় অমিত্রসূদন কথাগুলো বলল।

‘আমরা আর্যনীলের ফোনে সন্ধে থেকে ফোন করছি, পাচ্ছি না। এখন ওর স্কুল থেকে আপনার ফোন নম্বরটা আমরা পেয়েছি। তারপরও আপনি ফোন ধরছেন না।’

‘আমি ঠিক আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আর্যনীলের স্কুল থেকে আমার ফোন নম্বর পেয়েছেন! কেন?’ অমিত্রসূদন বিষয়টা ঠিক কী তা বোঝার চেষ্টা করল। থানা থেকে ফোন, কিন্তু কী এমন দরকার যে আর্যনীলের স্কুল থেকে তার ফোন নম্বর জোগাড় করতে হয়েছে?

ফোনের ওপারের লোকটা এবার গলা ঝাড়া দিল। চাপা গলায় বলল, ‘বুঝতে পারছেন না! না বুঝতে চাইছেন না? আপনাদের বাড়িতে টিভি নেই? টিভি নিউজ দেখেন না?’

‘আছে, নিউজও শুনি, কিন্তু আজ দুপুর থেকে আমাদের টিভিটা খারাপ।’ কথাটা বলে অমিত্রসূদনের মনে হল সে বড্ড বেশি কৈফিয়ত দিচ্ছে। এবার সে স্পষ্ট গলায় জিগ্যেস করল, ‘হ্যাঁ কেন ফোন করেছিলেন?’

‘বাহ্! ছেলের ফোন খারাপ, বাড়ির টিভি খারাপ। তাহলে আপনাকে কেন ফোন করছি এক লাইনে বলে দিই, ‘সত্যিই কি আপনি কিছুই জানেন না? আপনি না খবরের কাগজে কাজ করেন!’

‘আমি হয়তো অনেক কিছুই জানি, কিন্তু আমাকে ফোনে আপনি কী বলতে চাইছেন সেটা আমি জানি না।’

‘আপনার ছেলের এক বন্ধু মারা গেছে। আনন্যাচারাল ডেথ। ব্যস, এটুকুই। এবার যে কারণে ফোন করা—আর্যনীলকে নিয়ে কাল আপনাকে থানায় আসতে হবে। তিনটের সময়। যাদবপুর থানা। আমার নাম সুবীর সরকার।’

অমিত্রসূদন বলল, ‘আমি এখনও ঠিক বুঝতে পারছি না।’

‘আপনার ছেলে কাছাকাছি আছে?’

অমিত্রসূদন দম আটকে যাওয়া গলায় বলল, ‘পাশের ঘরে আছে, ওকে আমি ডাকব?’

‘ডাকার দরকার নেই। আর্যনীল সব জানে—। আপনি ওর কাছে গিয়ে শুনে নিন, ও সব জানে। আর হ্যাঁ, কাল আসার সময়, ওর স্কুলের আইডেন্টিটি কার্ড আর বার্থ সার্টিফিকেট নিয়ে আসবেন। মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড হলেও চলবে। কাল তিনটে, যাদবপুর থানা। আর একটা কথা, আপনার ফোনটা খোলা রাখবেন। যে কোনও সময় আমাদের ফোন করার দরকার হতে পারে। ফোন বন্ধ থাকলে, আমাদের আবার রাতে-ভিতে আপনাদের বাড়ি গিয়ে ডাকাডাকি করতে হবে। বাড়ির দরজায় পুলিশ গেলে নিশ্চয়ই ভালো লাগবে না। বাড়ির অ্যাড্রেসও আমাদের কাছে আছে। ফোনটা খোলা রাখবেন।’

অমিত্রসূদনের মনে হল লোকটা ওকে ঠান্ডা গলায় হুমকি দিচ্ছি। তবু সে নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,

‘দেখুন, আমি সব কিছু ঠিক বুঝতে পারছি না। আর একটু কি পরিষ্কার করে বলা যায়?’

‘কী বলব বলুন? যা বললাম সেটা কি আপনার কাছে ক্লিয়ার হল না?’

‘আপনি বললেন—আমার ছেলের এক বন্ধু মারা গেছে, অস্বাভাবিক মৃত্যু। তাই তো?’

‘এই তো বেশ বুঝেছেন। কিন্তু একথাটা আপনাকে আমি একস্ট্রা বলেছি। আসল কথা হল—কাল তিনটের সময় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যাদবপুর থানায় আসবেন। ওক্কে!’

‘আমাকে যদি আর একটু বলতেন—এর সঙ্গে আমার ছেলের সম্পর্ক কী? সেখানে কি আর্যনীল ছিল?’ অসহায়ের মতো অমিত্রসূদন বলল।

‘যা জানার ছেলের কাছ থেকে জানুন। আপনার ছেলে সব জানে। ও মনে হয় আমার থেকে ভালো জানে। গুড নাইট।’

ফোনটা কেটে গেল।

অমিত্রসূদন ফোনটা হাতের মুঠোয় রেখে ধীর পায়ে উঠে গেল। কোথায় যাবে সে? আর্যনীলের ঘরে? নাকি আগে শকুন্তলাকে বলবে? তার সারা শরীর কাঁপছে। কিছুই বলেনি ফোনের লোকটা, কিন্তু অনেক কিছুই যে বলে গেল।

সে ডাইনিং স্পেসের দিকে তাকাল। শকুন্তলা রান্নাঘর আর খাবার টেবিলের মাঝে আসা যাওয়া করছে। অস্থির অমিত্রসূদন টিভির সামনে এসে পাওয়ারের সুইচ দিল। রিমোট টিপল। সেট-টপ বক্সের নীল আলো ওর চোখে জ্বলে উঠল। টিভির স্ক্রিনে অসংখ্য মৌমাছির গুনগুন। বার দুয়েক রিমোটটা হাতের তালুতে ঠুকল। টিভির সুইচ বন্ধ করে হাতের ফোনের দিকে তাকাল। এখন কে খবর শুনতে পারে? লোকটা টিভির খবরের ওপর জোর দিচ্ছিল। সে যদি ফোন করে গ্রুপের কাউকে বলে— খবরে কী দেখাচ্ছে জানতে চায়? পাল্টা সে যদি বলে, কোন খবরটা? তাহলে কী উত্তর দেবে সে?

অমিত্রসূদন বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সিগারেট মুখে গুঁজে দেখল আগুন নেই। লাইটারের থেকে তার হাতের মুঠোর ভেতর থাকা মোবাইল ফোনটা যেন অনেক বেশি অগ্নিবর্ষণ করে চুপ করে গেছে।

আচ্ছা, কেউ মজা করেনি তো? যাদবপুর থানা বলে? কে মজা করবে, কার সঙ্গে তার এমন মজা করার সম্পর্ক? তবু সে মোবাইলটার কল লিস্টে চোখ রাখল। হঠাৎ মনে হল, যেখান থেকে ফোন এল সেটা কতখানি ঠিক। ল্যান্ড লাইন নম্বর। নম্বরটা একবার চেক করে নিলে কেমন হয়! সে নম্বরটায় আঙুল ছোঁয়াল। বাজছে—

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%