জয়ন্ত দে

‘লালবাজার!
লালবাজার দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। একদিন গিটার কিনতে এখানে এসেছিলাম। তখনই প্রথম লালবাজার দেখেছিলাম। বাইরে থেকে। অনেক পুলিশের গাড়ি। মা বলল, এটা কলকাতা পুলিশের হেড কোয়ার্টাস। সেদিন থেকে আমার ভেতরে ঢুকে লালবাজার দেখার ইচ্ছে ছিল। খুব ইচ্ছে ছিল। মাকে বলেছিলাম। মা বলেছিল, “ভেতরে ঢোকা যায় না।” আজ ভেতরে ঢুকলাম। কিন্তু এখানে এমনভাবে এসে লালবাজার দেখব ভাবিনি।’
আর্যনীলের কথাগুলো শুনছিল গোয়েন্দা অফিসার বিনিতা শ্রীবাস্তব।
গোয়েন্দা অফিসার বিনিতা শ্রীবাস্তব সবাইকেই লালবাজারে আসার অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছিলেন। তিনি চুপ করে বসে আছেন টেবিলের এক ধারে। আর্যনীলের মুখোমুখি আর এক গোয়েন্দ অফিসার আরশাদ।
‘কেন এসেছি তা তো তোমরা জানো আঙ্কেল। কিন্তু কীভাবে এসেছি জানো? পুরো লুকোচুরি খেলে। আমরা বেশ অনেকটা আগে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছি। লালবাজারের সামনে গাড়ি থেকে নামলে আমাদের গাড়ির ড্রাইভার জেনে যাবে। জেনে গেলে পাড়ায় গিয়ে বলবে। আমার বাবা মায়ের সম্মান যাবে। আরও অনেক কিছু হতে পারে। কী হতে পারে আমি জানি না। বাবার কাছে কেউ খবর দিয়েছিল, তোমাদের গেটের সামনে রিপোর্টার-ফোটোগ্রাফারদের ভিড়। তারা আমাদের ছবি নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে। আমাদের ছবি টিভিতে দেখাবে, খবরের কাগজে বের হবে। আমার মনে হয়, ওরা রোহিতের ফোটো পাওয়ার জন্যই সবচেয়ে বেশি ইন্টারেস্টেড। তারপর আমার। আর সৌরীন চৌধুরী ও তার মেয়ে শ্রীর ছবি। আমি বেশ বুঝতে পারছি—সব আগ্রহ কিন্তু আমাদের নিয়ে। কিন্তু অন্যদের পেলেও ছাড়বে না। জানো আঙ্কেল, একটু আগে শ্রী, অনুষ্কা বলছিল, এতদিন কেউ আমাদের একটা ফোটো তুলতে চাইত না। কিন্তু এখন দেখ আমাদের ফোটো তুলতে চাইছে, আর আমরা চোরের মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছি। জানো আঙ্কেল আমার কেমন চোর চোর ফিলিং হচ্ছে। “তুই সব কথা বলবি—কোনও কথা গোপন করবি না।” মা আমার দিকে এমন করে তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে ওদের কাছে অনেক কথা আমি চুরি করে লুকিয়ে রেখেছি। বাবা আমাকে যা প্রশ্ন করেছে—আমি তার জবাব দিয়েছি। মা যা বলেছে, তার অর্ধেকটা বলেছি। তুমি আমার লালবাজার সম্পর্কে ফার্স্ট ফিলিং জানতে চাইলে তাই এগুলো বললাম। আমরা, আমাদের বাবা মা-রা সবাই আজ নানারকম করে লুকিয়ে লুকিয়ে লালবাজারে এসেছি। রোহিত বলছিল, ভাই তোরা ভালো আছিস—আমাদের বাড়ির সামনে সারাদিন ক্যামেরা নিয়ে লোকজন দাঁড়িয়ে। বাড়ির সব দরজা জানলা বন্ধ। বাবা পাগলের মতো করছে। মা হাসপাতালে, বাবাকে তো সেখানে যেতেই হবে। মা-ও এসব কথা জেনে গেছে। বাড়ির বাইরে সিকিউরিটি গার্ড দাঁড় করাতে হয়েছে। কিন্তু তারাও ঠিক সামলাতে পারছে না। আমাদের মধ্যে রোহিতের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। ওকে তোমরা সন্দেহ করছ—।’
আরশাদ ঠান্ডা গলায় বলল, ‘শোন, আমরা কাউকে আলাদা করে সন্দেহ করছি না। তোরা সবাই আমাদের কাছে সমান। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। আমরা আসলে সত্যিটা জানতে চাইছি। কিছু প্রশ্ন উঠছে, প্রশ্নের উত্তর চাই। আবিরের মা তার ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চান। আবির না হয়ে যদি তোরা কেউ এমনভাবে মারা যেতিস, তোদের বাবা মা-রাও তার সন্তানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চাইত। আমাদের কাছেই জানতে চাইত। আর আজ তোদেরকে যেমন প্রশ্ন করছি সেখানে আবিরকেও প্রশ্ন করতাম। এখন তোর কাছে যেমন জানতে চাইছি, তেমন রোহিত, অনুষ্কা, অগ্নিমিত্রা, সবুজ, শ্রী, শ্রীর বাবা—, আর নাম বল—, কারা কারা ছিলি—?’
‘আবিরকে নিয়ে আমরা সতেরোজন ছিলাম।’
‘শোন, তোদের সবাইকেই আমরা কাগজ পেন দিচ্ছি। সবার আলাদা আলাদা বসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তোরা সবটা, পুরো ঘটনাটা যা যা হয়েছে সব আমাদের লিখে দে—। কী লিখবি, কীভাবে লিখবি—তাই তো—? আমি বলে দিচ্ছি—।
শুরু করবি তোদের এই সারপ্রাইজ পার্টির প্ল্যান কার? কীভাবে সারপ্রাইজ পার্টি হয়? তোদের জন্মদিনে এমন পার্টি হয়েছে কি না? তাতে কারা কারা এসেছিল? কী হয়েছিল!
এরপর, শ্রীর জন্মদিনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত লিখবি। সকাল থেকে কে কী করেছিস? ওদের বাড়িতে কীভাবে গেলি—কী কী খেলি, কতটা মদ খেয়েছিস? অথবা খাসনি।
এবার লিখবি আবিরের বোতল ভাঙা কেসটা। তখন তোরা কে কোথায় ছিলি? তোদের পজিশন। যে যারা নিজের পজিশন লিখবি। অন্যদেরটা মনে থাকলে লিখবি।
তারপর, হসপিটালে যাওয়া, তোরা কে কীভাবে বাড়ি ফিরলি। মোটকথা সেদিন রাত বারোটা পর্যন্ত ছবির মতো আমাদের চাই। মনে কর সিসি টিভির ক্যামেরায় আমরা তোদের দেখছি।
যেটা জরুরি কথা, মিথ্যে কথা লিখবি না। ভুল ইনফরমেশন দিবি না। নিজেকে সাধু বানাবি না। মিথ্যে কথা বা ভুল ইনফরমেশন দিলে অন্যদের সঙ্গে মিলবে না। ধরা পড়ে যাবি। আর যা লিখবি তা আমাদের কাছে থাকবে—বাবা মা জানবে না। কিন্তু প্রয়োজন পড়লে তোদের লেখা এই কাগজগুলো আমরা কোর্টে জমা দেব। তোদের এই লেখা থেকে দুধ কা দুধ, পানি কা পানি বেরিয়ে আসবে। সবাই খুব সর্তকভাবে লিখবি। তোদেরকে আমরা এই বিল্ডিংয়ের ষোলোটা জায়গায় ছড়িয়ে দিচ্ছি। ডিসকাস করার কোনও সুযোগ থাকছে না। যত খুশি কাগজ নে, সব কিছু লিখবি। সামান্য কোনও কথাও বাদ দিবি না। যা তুই বাদ দিবি তা অন্যরা লিখবে। তখন তোর মুশকিল। বরং যে যত পরিষ্কার করে লিখবে, সে তত পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে আসতে পারবে। আমাদের স্ক্রুটিনিতে সামান্যতম ফাঁকও ধরা পড়ে যাবে। আমরা সেদিনের ঘটনার বর্ণনা মিনিট টু মিনিট নয়—সেকেন্ড টু সেকেন্ড চাই।
আর একটা কথা—যদি কারও কোনও সন্দেহ থাকে সেটাও লিখবি। তোর সন্দেহের কথা কেউ জানবে না। সম্পূর্ণ গোপন থাকবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবিরের মৃত্যুর জন্য কোনও কারণে কাউকে যদি সামান্যতমও দোষী মনে হয় সেটা সৎভাবে জানাস। সেটা যদি ডাইরেক্ট না হয়ে ইনডাইরেক্ট হয়, বা নেগলিজেন্সি হয়, সেটাও আমরা জানতে চাই। মোটকথা আমরা তোদের মনের সব কথাগুলো জানতে চাই—। তোদের একজন বন্ধু মারা গেছে। তার বাবা মায়ের সঙ্গে তোদেরও সত্যিটা জানতে হবে। জানাতে হবে। নইলে এই দাগ তোদের মনের মধ্যে থেকে যাবে। আমরা তোদেরকে যেমন দোষী ভাবছি, আবার নির্দোষও ভাবছি। তোরাও হয়তো একবার একবার নিজেদের দোষী ভেবেছিস। ভেবেছিস—এটা করলে, এমন হলে আবির মরত না, বেঁচে যেত। সেটাও লিখিস। আর, যা মনে হয়, যা যা মনে হয় সব লিখবি। এই লেখাই তোদের বাঁচাতে পারে, সেটা শুধু বাইরের লোক, থানা পুলিশের থেকে নয়, নিজেদের থেকেও—। তোরা যথেষ্ট বড় হয়েছিস, আমরা তোদের নাবালক হিসেবে ভাবছি না। তাই বড়দের মতো করে উত্তর দে।
শুরু করবি নিজেকে দিয়ে—প্রথমে নিজের নাম লিখবি, বয়েস, ক্লাস। তারপর বাবা মায়ের নাম। তারপর...
আমি আর্যনীল দাশগুপ্ত। বয়েস সতেরো। ক্লাস ইলেভেন।
আমার বাবার নাম অমিত্রসূদন দাশগুপ্ত। মায়ের নাম শকুন্তলা দাশগুপ্ত...।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন