একুশ

জয়ন্ত দে

শকুন্তলা একটু সুস্থ হতেই লালবাজারই একটা ট্যাক্সির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। জিপ দিতে চেয়েছিল। অমিত্রসূদন রাজি হয়নি। সারা রাস্তা প্রায় কেউ কোনও কথা বলেনি। আর্য দু’একবার জিজ্ঞাসা করেছিল—‘তুমি ঠিক আছো মা?’ শকুন্তলা মাথা নাড়িয়েছিল। ‘শরীর খারাপ লাগছে না তো?’ ‘না, না, ঠিক আছে।’ আর্য তার মায়ের গা ঘেঁষে বসেছিল। শকুন্তলা ফিরে এসে শুয়ে পড়েছিল। বলল, খাবে না। তবু অমিত্রসূদন ও আর্যর চাপাচাপিতে কোনওরকমে খেল। শকুন্তলা বলল, ‘আর্য কাল কি যেতে হবে?’

‘জানি না। ফোন করেছিল কি?’

অমিত্রসূদন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। এই সময়ে চিরুনিটার দিকে নজর পড়ল শকুন্তলার। আজ যাওয়ার সময় খুব তাড়াতাড়ি করে চুল আঁচড়ে চলে গিয়েছিল। চিরুনিটার দিকে তাকায়নি। এখন দেখল, ভর্তি চুল আটকে। কী হারে চুল উঠছে—সে মাথায় হাত দিল। মাথায় হাত দিয়ে বোঝা যায় না কতটা চুল উঠল। তবু আজ সকালে আয়নায় সামনে দাঁড়িয়ে সে চমকে উঠেছে, সিঁথির কাছে, মাথার মাঝখানটা যেন ফাঁকা হয়ে গেছে।

অমিত্রসূদন বলল, ‘তোমার শরীর কি এখন ভালো লাগছে? কাল কি একটু ডাক্তার দেখিয়ে নেবে?’

‘না, না, ডাক্তার দেখানোর মতো কিছু হয়নি।’

‘হঠাৎ কী হল? ঠিক করে কিছু খেয়ে যাওনি!’

শকুন্তলা চুপ করে থাকল। বলল, ‘একটা কথা বলব—?’ কথাটা বলে শকুন্তলা একটু থামল, তারপর খুব ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আমি একটা কথা শুনলাম, জানো—।’ এবারও অমিত্রসূদন কৌতূহল দেখাল না। শকুন্তলা নিজেই বলল, ‘আমার কাছে একটা ফোন এসেছিল। ফোন করেছিল আর্যদের স্কুলের এক স্টুডেন্টের মা। সে আমাকে চেনে। তার দিদির ছেলে আর্যদের সঙ্গে পড়ত। সে আর্যকেও চেনে। নিজের পরিচয়টা দিল না। বলল, পরে সব বলবে। তাকে দেখলে আমি চিনতে পারব। সে তার দিদির কাছ থেকে আমার ফোন নম্বর জোগাড় করেছে। তার জামাইবাবু পুলিশে আছে। এই লালবাজারেই। সে একটা অদ্ভুত কথা শুনেছে—।’ শকুন্তলা থামল, ওর গলা ভারী।

এখন খুব আগ্রহ নিয়ে অমিত্রসূদনের বলা উচিত, কী শুনেছে? কিন্তু সে কিছু বলল না।

একটু থেমে শকুন্তলা বলল, ‘সে শুনেছে আমাদের আড়ালে মারাত্মক একটা কনস্পিরেসি চলছে। পুলিশরা একজনকে বলির পাঁঠা করতে চাইছে। তার কোনও দোষ না থাকলেও তাকে ওরা ফাঁসাবে। আর এক্ষেত্রে ফাঁসবে কোনও গরিবলোকের ছেলে। বড়লোকের ছেলেরা যতই অন্যায় করুক তারা টাকা পয়সা খাইয়ে ঠিক পার পেয়ে যাবে। সে বলছিল, “আর্যর জন্য খুব ভয় করছে। পুলিশ ইচ্ছে করলে কী না পারে—ছয় কে নয় করতে পারে।” ও বলছিল, “তেমন হলে তার জামাইবাবু এই লালবাজারেই আছে। তিনি আমাদের হয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলবেন। কম সম করে একটা সেটেলমেন্ট করে দেবে।”’ শকুন্তলা থামে। ওর গলা বুজে এসেছে। ‘হ্যাঁ গো, ওরা আর্যকে ফাঁসাবে না তো? কথাটা শুনেই আমার বুকের ভেতর কেমন একটা করে উঠল। চোখ মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। মাথাটা ঘুরে গেল। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, আস্তে আস্তে এসে বসে পড়লাম। তারপর আর মনে নেই—।’

‘তুমি অহেতুক দুশ্চিন্তা করছ?’ অমিত্রসূদন বলল।

‘অহেতুক বলছ? পুলিশ কি নিরীহ লোককে ফাঁসায় না?’ ক্লান্ত গলায় বলল শকুন্তলা।

‘ফাঁসায়, কিন্তু তার জন্যে পিছনে বড় খেলা থাকে।’

‘বড় খেলা আবার কী? আসল খেলা তো টাকা। যদি টাকার জন্য কিছু করে?’

‘কে এসব তোমাকে বোঝাচ্ছে?’

‘পারে কি না বলো—?’ শকুন্তলা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে।

‘না, পারে না। আইন আছে, কোর্ট আছে—প্রমাণ করতে হবে।’ অমিত্রসূদন তীব্র গলায় বলে।

‘এরকম হয় কি, হয় না? বলো?’ শকুন্তলা চাপা গলা।

‘ওসব যা শোনো, সিনেমায় দেখো, সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বড় কোনও কেস থাকে—টেররিস্ট, পলিটিক্যাল ইস্যু, মাফিয়া, ড্রাগ—এই ধরনের ঘটনায় পুলিশ নিরীহ কাউকে ফাঁসাতে চায় না। আর ফাঁসালেও কোর্ট বলে একটা বস্তু আছে, মনে রেখো।’

‘যদি কেউ কোনও মিথ্যে সাক্ষী দেয়। ওরা সাক্ষী সাজায়?’

‘আবারও বলছি, সে সাক্ষী সাজানো। সবকিছু কোর্টে প্রমাণ করতে হবে, পুলিশ তেমন কিছু ভাবলে ওদের ছেড়ে কথা কেউ বলবে না। তুমি বাজে চিন্তা বন্ধ করো—ওসব মাথা থেকে হটাও, অহেতুক কেন শরীর খারাপ করছ?’

‘তুমি কি সত্যি কথা বলছ? নাকি আমাকে ভোলাচ্ছ? একবার তো ওর সঙ্গে তুমি কথা বলতে পারো। সে আমাদের সাহায্য করতে চায়। অনেকের বাড়ির লোক, বাবা মা নাকি তলে তলে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। পুলিশ স্বচ্ছ নয়। আচ্ছা, প্রথমদিন শ্রীয়ের বাবা আর মাকে দেখেছিলাম। তারপর থেকে আর সৌরীন মুখার্জিকে দেখছি না কেন? উনি নামী মানুষ, আন্তর্জাতিক শিল্পী বলে? ওনার অনেক নাম, টাকা আছে বলে, ওনার জন্য আলাদা ব্যবস্থা। অথচ ওনার বাড়িতেই তো কাণ্ডটা হয়েছে, তাহলে, উনি কই? কোথায় গেলেন? আমরা রোজ যাব—উনি কেন আসবেন না? আর তুমি বলছ পুলিশ স্বচ্ছ!’

‘হয়তো ওনাকে অন্য সময় ডাকছে।’

‘না, ওনাকে ডাকছে না। ডাকবে না। ওনার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে।’

অমিত্রসূদন মাথা ঝাঁকাল।

শকুন্তলা ফিসফিস করে বলল, ‘আমার গয়না আছে। গয়না কী কাজে লাগবে? পুলিশ কত নেবে? তুমি একবার যে ফোন করেছে তার সঙ্গে কথা বলো, কথা বললেই তো টাকা দিতে হবে না।’

‘না। আমি কোনও কথা বলব না। কোনও বাঁকা পথে হাঁটব না।’ খুব জোরেই অমিত্রসূদন বলল।

‘না’-টা হয়তো বড্ড বেশি জোরে হয়ে গিয়েছিল। তাই এবার অমিত্রসূদন খুব খুব নিচু গলায় বলল, ‘আর্য কি তোমার একার সন্তান, আমার নয়? ওর কিছু হলে, তোমার লাগবে—আমার লাগবে না? আমাকে ভরসা করো, তেমন কিছু হলে আমি ঠিক জানতে পারব বলে আমার বিশ্বাস। আর একটা কথা, ওরা আমার সঙ্গে এই খেলাটা খেলবে না। ওরা আমাকে জানে—। আজ পুলিশের বিনিতা শ্রীবাস্তব নিজে এই কথাটা বলে আমাকে সাবধান করেছেন।’

শকুন্তলা চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকল।

অমিত্রসূদনের মোবাইল ফোনে আলো জ্বলে উঠল। ফোন তুলে দেখল অবিনাশ। অমিত্রসূদন ঠিক করতে পারল না ধরবে, কি ধরবে না। সে ঘরের বাইরে এসে বারান্দায় দাঁড়াল। আবার ফোনের আলো জ্বলে উঠল। ফোন ধরল অমিত্রসূদন, ‘বল।’

‘কেমন আছিস?’

‘ঠিক আছি।’

‘বাড়ির সবাই?’

‘ভালো।’

‘আজ শুনলাম শকুন্তলা নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।’

‘হ্যাঁ, ওই একটু।’

‘হ্যাঁ, শুনলাম, মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। কাল একবার ডাক্তার দেখিয়ে নিস। তোর কি মনে হচ্ছে রে, কেসটা কোন দিকে যাচ্ছে?’

‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না। রোজই ডাকছে, ওদের সঙ্গে কথা বলছে।’

‘কথা বলছে, না জেরা করছে?’

‘জেরাই করছে।’

‘একসঙ্গে সবাইকে বসিয়ে, না আলাদা আলাদাভাবে?’

‘দেখ কী হচ্ছে, না হচ্ছে আমি আর্যকে কিছু জিজ্ঞাসা করি না। ওর মা কখনও কখনও জানতে চায়, তখন আর্য যদি কিছু বলে শুনি। আসলে এই জিজ্ঞাসা করা মানে ওর মনের ওপর চাপ দেওয়া। হয়তো আবার এক প্রস্থ জেরা!’

‘তোর কি মনে হয় আর্য সেফ তো?’

‘শুধু আর্য নয়, আর্যরা সবাই খুব কনফিডেন্ট।’

‘হ্যাঁ, আমিও তাই শুনলাম। যখনই ওদের নিজেদের মধ্যে দেখা হচ্ছে সবাই নাকি খুব বিন্দাস মেজাজে কথা বলছে, আড্ডা মারছে। কোনও একটা কাগজে তো লিখেই দিল, ওখানে ইনভেস্টিগেশন নামে চা চিপসের পার্টি হচ্ছে।’

‘হ্যাঁ, আমিও শুনেছি। তবে আমাদের কাগজ এমন কোনও রিপোর্ট করেনি।’

‘আরে ফালতু সব। খবর পাচ্ছে না, যা পারে তাই লিখছে। কোথাও চা বিস্কুট দেওয়াটা ভদ্রতা। বাঘা তোদের চা খাওয়াচ্ছে, বাঘা কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার।’

‘তাই।’

‘আরে আমি তো একজন রিপোর্টার, পাতি লোক। চাকরি করি। তুই একজন ক্রিয়েটিভ পার্সন। তুই নিশ্চয়ই বাঘাকে দেখেছিস, আমার কাছে চেপে যাচ্ছিস। আমি তোকে চিনি বস—তুই গিয়েছিস, অথচ চরিত্রের খোঁজ করবি না এমন হয়।’

অবিনাশ হাসে। ওর হাসির সঙ্গে গলা মিলিয়ে হাসে অমিত্রসূদন।

‘আমিই নিজেই এখন আজব এক চরিত্র রে অবিনাশ! আমাকে দেখ।’

‘তোকে দেখব।’

‘হ্যাঁ, আমাকে দেখ!’

ফোন রেখে অমিত্রসূদন বারান্দার টবে সার সার গাছ ফেলে দূরে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। সত্যিই সে এখন এক আজব চরিত্র। তার সন্তান তাকে বিশ্বাস করছে না। কেননা সে জানে, তার বাবার মতো খবর-খাওয়ানো আর খবর-বেচা কিছু মানুষের অহেতুক হইহই তাদের এমন খাদের সামনে অন্ধকারে এনে দাঁড় করিয়েছে। তার স্ত্রী মনে করে—সে ঠিক কথা বলছে না। সে তেমন বাবা নয়। আর পুলিশ মনে করছে, অমিত্রসূদন হয়তো ভেতরের খবর বাইরে বলছে। মিডিয়াকে নিজের হাতে রাখতে চাইছে, যে কোনও সময় সে মিডিয়ার সাহায্য নিতে পারে। আর বাকি পনেরোজন অভিভাবক—কোনও না কোনও সময় ভাবছে, আর্যনীলের বাবা কী করছেন? তাঁর তো উচিত মিডিয়ার সঙ্গে একটা লিঁয়াজো করা। প্রয়োজনে টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো। আর অসংখ্য মানুষের প্রশ্ন তোলা ‘প্রভাবশালী’ তত্ত্বেও সে একজন প্রভাবশালী! কেন না সে খবরের কাগজে কাজ করে। কেন না সে একজন নাট্যব্যক্তিত্ব!

হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে আর্য আর শকুন্তলার হাসির শব্দ শুনল অমিত্রসূদন। দু’জনেই হাসছে। অনেকদিন পরে—

অমিত্রসূদন একটু হাসি মাখবে বলে পায়ে পায়ে ওদের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল।

তাকে দেখে আর্য বলল, ‘বাবি তোমাদের যে চা খাওয়ায়, সেই বাঘাদার ঘটনাটা জানো?’

অমিত্রসূদন একটু আগেই বাঘার নাম শুনেছে অবিনাশের কাছে।

আর্য বলল, ‘মা জানে, তুমিও নিশ্চয়ই জানবে; অনেকদিন আগে নাকি আলিপুর চিড়িয়াখানায় বাঘকে মালা পরাতে গিয়েছিল দুটো ছেলে। ওই যে একটা জায়গায় বাঘ ছাড়া থাকে—সেখানেই পাঁচিল টপকে ঢুকেছিল দু’জনে। বাঘ একজনকে এক থাবায় মেরে ফেলে। আর দ্বিতীয়জনকে থাবা মেরে বুকের পাঁজর ফাটিয়ে দেয়। সেই দ্বিতীয়জন হল আমাদের লালবাজারে বাঘা। বাঘাদা। যে সবাইকে চা খাওয়ায়। কে কোথায় বসবে ঠিক করে দেয়।’

অমিত্রসূদন বলল, ‘যতদূর মনে পড়ছে বাঘটার নাম শিবা।’

আর্য হাসে। ‘বাঘাদার নাকি অসীম সাহস। জীবনে কোনও কিছুকে ভয় পায় না। ওর সাহসের জন্য ও পুলিশে চাকরি পেয়েছে।’

শকুন্তলা বলল, ‘ওর ঈশ্বর কে জানো? ওর উপাস্য দেবতা হল— বাঘ!’

অমিত্রসূদন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে শকুন্তলার দিকে। শকুন্তলা বলল, ‘কাল তোমাকে দেখাব—হোমিসাইডের বড়বাবু যেখানে বসেন, তাঁর চেয়ারের পিছন দিকে ওই বাঘাবাবু বিশাল একটা বাঘের ছবি টাঙিয়ে রেখেছেন। সেখানে ও নিত্য ধূপ ফুল দেয়। পুজো করে।’

আর্য বলল, ‘বাঘাদা বাঘ নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস। বাঘই ওর গড! জানো, আমাকে ওখানকার একজন অফিসার আঙ্কেল বলেছে—যেসব জায়গায় লালবাজারের আচ্ছা আচ্ছা অফিসার ঢুকতে ভয় পায়, সেসব জায়গায় বাঘাদা একটা রিভলভার নিয়ে ঢুকে যায়। কাল তুমি ওকে একবার বোলো—বাঘাদা টিশার্ট তুলে ওর বুক পেট দেখাবে, বাঘের থাবার দাগ!’

শকুন্তলা বলল, ‘বাঘা ছেলেটা খুব সরল। খুব ভালো।’

আর্য বলল, ‘বাঘাদা আমাদের খুব সাহস দেয়—বলে কাউকে ভয় পাবি না, বাঘের বাচ্চার মতো সামনে দাঁড়িয়ে লড়ে যাবি। লড়তে হবে।’

অমিত্রসূদন দেখছিল জানলা টপকে এক ফালি জ্যোৎস্না ঢুকছে ঘরে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%