আট

জয়ন্ত দে

রাতের দিকে অবিনাশ ফের ফোন করেছিল। অমিত্রসূদন সে ফোন ধরেনি। বরং সে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে চেয়েছিল, কাল সে কী করবে? ডাকার আগেই একবার তার নিজের আর্যের স্কুলে যাওয়া উচিত? পুলিশ ফোন নম্বর জোগাড় করার সময় স্কুলে নিশ্চয়ই সব খবর দিয়েছে। আর স্কুলও জানে, যে মারা গেছে সেই আবির তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র। আর এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও দু’জন। রোহিত এই স্কুলের ছাত্র ছিল ক’দিন আগে। আর্য এখনও আছে।

এছাড়াও এতক্ষণে স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে খবর রটে গিয়েছে। আর্য এসব বুঝবে না। এখন সে স্কুলে গেলেই অনেক অনেক প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। তার কিছুদিন ছুটি নেওয়া উচিত। ক’দিন ছুটি নেবে? কিন্তু কী বলে নেবে, সেটা আর্য কি গুছিয়ে বলতে পারবে? অন্য সময় স্কুলের যে কোনও ব্যাপারে শকুন্তলা যায়, সে-ই আর্যর স্কুলের যাবতীয় বিষয় দেখাশোনা করে। কিন্তু কাল শকুন্তলাকে পাঠানোর থেকে তার নিজেরই যাওয়া ভালো।

শকুন্তলা বলল, ‘ফুল স্কুল ড্রেসে যা আর্য।’

‘মায়ের বেশি বেশি—আমি তো স্কুল যাব না, তবে স্কুল ড্রেস পরব কেন? আমি জিনস আর হোয়াইট টিশার্ট পরে যাব।’

অমিত্রসূদন সাধারণত এধরনের কথায় ঢোকে না। কিন্তু আজ ঢুকল। ‘না, তুই স্কুল ড্রেসেই যাবি।’

ঠিক ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়ার পরই অমিত্রসূদন আর আর্য ঢুকল স্কুলে। ততক্ষণে ফাদার এবং হেডস্যার ঘুরে গেছেন আর্যনীল দাশগুপ্তের ক্লাস থেকে। আর্যনীলের দু’-একজন বন্ধুর কাছ থেকে জানতে চেয়েছেন তারা আর্যর কোনও খবর জানে কি না? আর্য তাদের ফোন করেছিল কি না? বা কে কে আর্যনীল দাশগুপ্তের বাড়ির কাছে থাকে? এসব কথা অমিত্রসূদন স্কুলে গিয়ে স্বয়ং হেডস্যারের মুখ থেকেই শুনল। ফাদার থেকে হেডস্যার, ক্লাস টিচার থেকে এডুকেশন কোঅর্ডিনেটর, সবাই যেন আর্যনীল দাশগুপ্তের জন্যই অপেক্ষা করেছিলেন।

স্কুলে যেতেই হেডস্যারের সঙ্গে দেখা করার কথা জানাতেই মুহূর্তেই তাদের ডেকে পাঠানো হল। হেডস্যার বললেন, ‘প্লিজ মিঃ দাশগুপ্ত আপনি একটু বসুন। আমি ফাদারকে খবর পাঠাচ্ছি—উনিও খুব চিন্তা করছিলেন। উনি নিজে ক্লাসে গিয়ে আর্যনীলের খোঁজ নিয়েছেন। আর ওর ক্লাস টিচারেরও এখানে থাকা দরকার। কেন না, আমার মনে হয় আমাদের স্কুলের সঙ্গেও ঘটনাটির বেশ কিছু যোগসূত্র আছে। যে ছেলেটি মারা গেছে—সে আমাদের প্রাক্তন ছাত্র। যে কোনও কারণেই হোক ক্লাস নাইনে তাকে আমরা টিসি দিয়ে দিই। এই ঘটনার জন্য যার দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে, সেই রোহিত পল আমাদের স্কুল থেকে আইসিএসই পাস করেছে। আর রোহিত পলের সঙ্গে ছিল আর্যনীল। আর্যনীল দাশগুপ্ত এখনও আমাদের স্কুলের ছাত্র। সব মিলিয়ে আমাদের স্কুল এখন আতশ কাচের নীচে। আপনি জানেন না, অলরেডি দু’-দুটো মিডিয়া— টিভি চ্যানেল আমার কাছে অ্যাপ্রোচ করেছে বিষয়টা নিয়ে কথা বলার জন্য। আমরা তাদের এন্টারটেইন করিনি।’

এসব কথার মাঝেই এসে পড়লেন, ফাদার, ক্লাস টিচার ও স্কুল কোঅর্ডিনেটর। তাঁরা ঘরে এসে বসতেই হেডস্যার বললেন, ‘মিঃ দাশগুপ্ত আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আমরা আর্যনীলের সঙ্গে একটু একান্তে কথা বলতে চাই। আমার মনে হয়, আপনি থাকলে ওর বা আমাদের অসুবিধে হবে। আপনি যদি বাইরে একটু অপেক্ষা করেন—।’

অমিত্রসূদন এসে বাইরে বসে। এটা অফিসঘর। একটু পরে ভেতরে চা যায়। অমিত্রসূদনের জন্য চা আসে, তবে সেটা বাইরে। বেশ কিছুক্ষণ পরে আর্যনীল বেরিয়ে আসে। এসে অমিত্রসূদনের পাশে বসে। ‘আমাকে বাইরে বসতে বলল।’ আরও কিছুক্ষণ পরে স্কুল কোঅর্ডিনেটর বেরিয়ে আসেন, ‘আপনি আসুন মিস্টার দাশগুপ্ত।’

অমিত্রসূদন হেডস্যারের ঘরে ঢোকে।

হেডস্যার বলেন, ‘মিস্টার দাশগুপ্ত আমরা আর্যনীলের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের যেটুকু শোনার বা বোঝার সে কাজটুকু হয়ে গেছে। স্কুল আর্যনীলের পাশে আছে। ও এখনও পর্যন্ত যা বলেছে, আমরা তা বিশ্বাস করছি। আমরা আমাদের স্টুডেন্টদের চিনি। এবার, আপনি বলুন, আপনি কী চান?’

‘আর্যনীল কিছুদিন স্কুলে আসতে পারবে না। সেটা এই সপ্তাহ, বা পরের সপ্তাহও হতে পারে। পরিস্থিতি যতদিন না স্বাভাবিক হচ্ছে ততদিন আমি সময় চাইছি।’

‘মিস্টার দাশগুপ্ত আপনি তো মিডিয়ায় আছেন, আপনার কী মনে হয়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কতদিন লাগবে?’ হেডস্যার বললেন।

ক্লাসটিচার বললেন, ‘স্যার, আজ পেপার দেখেছেন—সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল খুনি ধরা পড়ল কি না? লালবাজারের গোয়েন্দাকর্তা উত্তর দিয়েছেন, “খুনই তো হয়নি! খুনির কথা আসছে কেন?” ওই গোয়েন্দাকর্তা পরিষ্কার বলেছেন, মদের বোতলের উপরে পড়ে গিয়ে বোতল ভেঙে ছেলেটি মারা গিয়েছে।’ এখন সাংবাদিকদের বক্তব্য—পুলিশ খুন ছেড়ে হোঁচটের তত্ত্ব দিচ্ছে। তাদের মতে পুলিশ রাত পেরোতেই মত বদলেছে। আজ বেঙ্গলের বড় মেজ সেজ সব কাগজই পুলিশের সেই কথাকে ক্রিটিসাইজ করেছে।’

হেড স্যার বললেন, ‘পুলিশ তো বিষয়টা দেখছে—ওদের তাই-ই মনে হয়েছে।’

ক্লাসটিচার বললেন, ‘না, স্যার এখানে আর একটা কথা এসে পড়েছে— প্রভাবশালী!’

‘ও মাই গড!’ হেডস্যার বললেন। তারপর অমিত্রসূদনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মিস্টার দাশগুপ্ত—আপাতত আর্যনীলকে স্কুলে আসতে হবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, যেদিন আপনি বুঝবেন, ওকে স্কুলে পাঠানো যায়, সে দিন পাঠাবেন।’

‘কেউ একজন আর্যনীলকে ডাকুন।’ এতক্ষণ পরে ফাদার কথা বললেন। স্কুল কোঅর্ডিনেটর ঘরের বাইরে গিয়ে আর্যনীলকে ডেকে আনলেন। আর্যনীল এসে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল। ফাদার বললেন, ‘স্কুলের আমরা সবাই তোমার সঙ্গে আছি। তোমাকে কিছুদিন ছুটি দেওয়া হল। সব স্বাভাবিক হলে স্কুল চলে আসবে। এসে প্রথমদিন হেডস্যারের সঙ্গে দেখা করে নেবে। আজ তুমি আমাদের যা যা বলেছ, সে সব কথা স্কুলের কাউকে আর বলবে না। এ বিষয়ে কোনও কথা আমি যেন তোমার মুখ থেকে না শুনি। বাড়িতে পড়াশোনা করবে। আর একটা কথা—তোমার বাবা এই স্কুলে আমাদের স্পেশাল গেস্ট হয়ে এসেছিলেন। ড্রামা ওয়ার্কশপ করিয়ে গিয়েছিলেন। আজ তোমার জন্য তোমার বাবার মাথা নিচু হল—একথা সারা জীবন ধরে মনে রেখো। গড ব্লেস ইউ।’

ফাদারের কথা শেষ হওয়ার আগে থেকেই নাগাড়ে ফোন বাজছে। অফিস থেকে বেরুতেই আবার ফোন—ফোন ধরল অমিত্রসূদন। ওপর থেকে শীতল একটা গলা, ‘লালবাজার হোমিসাইড ডিপার্টমেন্ট থেকে বলছি—অমিত্রসূদন দাশগুপ্ত?’

‘হ্যাঁ, বলুন।’

‘আপনার ছেলে আর্যনীল দাশগুপ্ত—’

‘হ্যাঁ।’

‘আর্যনীলকে আজ আড়াইটের সময় লালবাজারে আসতে হবে।’

‘কাল আমরা গড়িয়াহাট থানায় গিয়েছিলাম। সেখানে ওর সঙ্গে কথা হয়েছে।’

‘ঠিক আছে, কেসটা এখন থেকে লালবাজার হোমিসাইড ডিপার্টমেন্ট দেখবে। ইনকোয়ারিতে বলবেন ছেড়ে দেবে।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%