এগারো

জয়ন্ত দে

আমরা বড় হয়ে গিয়েছি। আমাদের বাড়ির লোকেরা আর আমাদের ধুমধাম করে বার্থ ডে করে না। যেটুকু করে তা নতুন জামা প্যান্ট কিনে দেয়। বাড়িতে ভালো রান্না করে খেতে দেয়। আসলে বার্থ ডে-টা বন্ধুদের সঙ্গেই জমে ভালো। দারুণ মজা হয়। হুল্লোড় হয়। বার্থ ডে-তে বাবা মা যদি কিছু টাকা দেয় তবে সেটা বেশি ভালো হয়। বন্ধুদের জন্য খরচ করতে পারি। বেশি মজা হয়।

আমি বাড়ি থেকে তেমন টাকা পাই না। আর যেটুকু পাই তার জন্য বাবা মা অনেক কথা শোনায়। আমি সব কিছুতেই কম টাকা শেয়ার করি। সবাই জানে আমি বাড়ি থেকে তেমন টাকা পাই না। আমার কোনও বন্ধুই সেটা নিয়ে মাথা ঘামায় না। কেননা ওদের পকেটে প্রচুর টাকা থাকে। ওরা বাড়ি থেকে অনেক অনেক টাকা, পকেটমানি পায়। না চাইতেই ওদের বাবা মায়েরা অনেক পকেট মানি দিয়ে দেয়। তাই আমাদের বন্ধুত্বে টাকার ব্যাপারটা আসে না।

আমার প্রিয় বন্ধু রোহিত। রোহিত অনেক কিছুতেই আমাকে ম্যানেজ করে দেয়। যেখানে যাই আমি ওর গাড়িতেই যাই। ওর সঙ্গেই ফিরে আসি। ওর সঙ্গে ফেরার জন্য আমার অনেক সময়ই দেরি হয়ে যায়। তার জন্যে মা অনেক কথাও শোনায়। বাবা টেনশন করে। তবে ওদের ড্রাইভার আমাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যায়। কোনও কোনও সময় রোহিতের বাবা আঙ্কেলও আমাকে পৌঁছে দিয়ে যান। রোহিত, আঙ্কেল, আন্টি খুব ভালো। আমাকে কোনওদিন একা আসতে দেয় না। ওদের একটা অডি গাড়ি আছে। সেই গাড়ি করেই আমি আর রোহিত সব জায়গায় যাই।

নাইন টেন-এর সময় আমার বার্থ ডে হয়েছে বাড়িতে। রোহিত ও কয়েকজন বন্ধু এসেছিল, তারা খেয়ে গেছে। আমার মা রান্না করেছে। পাড়ায় আমার তেমন কোনও বন্ধু নেই। একটাও না। যারা আছে তারা মায়ের বন্ধুর ছেলে মেয়ে। তাদের সঙ্গে আমার জমে না। সব বোকা বোকা। আমার জন্মদিনে মা এত্ত এত্ত রান্না করে সবাইকে ডেকে খাওয়ায়। আমার মা এমনই করতে চায়। কিন্তু আমি চাই না। আমার বোরিং লাগে। আমার জন্মদিন, কিন্তু আমার কোনও আনন্দ হয় না।

তাই এবার আমার বার্থ ডে-তেও সারপ্রাইজ পার্টি হয়েছে। আমি জানতাম, ওরা সবাই আমাদের বাড়িতে আসবে, কেক কাটা হবে। ক্যান্ডেল জ্বালানো হবে। তারপর ওদের সঙ্গে আমি বেরিয়ে যাব। সবাই মিলে টাকা দিয়ে কিছু খাওয়া হবে। এবার বার্থ ডে-র জন্য আমি বাবার কাছ থেকে দু’হাজার টাকা নিয়েছিলাম। এটা আমার বাবা মায়ের কাছে অনেক টাকা। অনেক। কিন্তু সবাই মিলে কোথাও খাওয়ার জন্য কিচ্ছু না। আমার দু’হাজারের সঙ্গে বাদবাকি টাকা সবাই মিলে দিয়ে আমরা অনেক কিছু খেয়েছিলাম। এটা ছিল আমার বার্থ ডে পার্টি। সারপ্রাইজ পার্টি।

সিক্সটিন ছিল শ্রীর বার্থ ডে। আগের বছর ওর বার্থ ডে হয়নি। এ বছর ওর বার্থ ডে পার্টি বড় করে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক’দিন আগে ওর ঠাকুমা মারা যান। এখনও তাঁর শ্রাদ্ধ হয়নি। এরমধ্যেই ওর জন্মদিন পড়ে গেছে, তাই ওর বাড়িতে জন্মদিনের পার্টি হবে না। ওর খুব মন খারাপ ছিল। তখনই আমরা কয়েকজন মিলে ঠিক করি—সারপ্রাইজ পার্টি করব।

শ্রীর দুই বন্ধু ঊষসী আর অনুষ্কা শ্রীর মা, আন্টিকে ফোন করে। আন্টি রাজি হয়ে যান। কিন্তু বলে দেন, শ্রীর ঠাকুমা মারা গেছেন, তাই বাড়িতে বেশি হইচই করা যাবে না, লোকে কী বলবে—। তাই যা করবে কম হল্লাগুল্লা করে। তবে ওইদিন আমরা যেতেই পারি, এতে শ্রীর ভালো লাগবে। আন্টিকে আমরা বলি, ওর খুব ক্লোজ বন্ধুরাই যাব। খুব বেশিজন নয়।

তখন ঊষসী-অনুষ্কা-আমি-বেদ প্রোগ্রামটা সেট করি। বার্থ ডে’র সকালে ঊষসী আর বেদ ওর বাড়ি যাবে। ওকে ডেকে নিয়ে আড্ডা দিতে চলে যাবে প্যারিস কাফেতে। সেখানে ওরা আড্ডা দেবে। সেই সময় আমরা ওর বাড়িতে এন্ট্রি নেব। আমরা গিয়ে ওর ঘর সাজাব। আলাদা কিছু নয়, জাস্ট সাদা আর কালো বেলুন ফুলিয়ে ঘরের মেঝে ভর্তি করে দেব। সারা ঘরে এত এত বেলুন থাকবে যে হাঁটার জায়গা থাকবে না। আর একটা বড় রেড ভেলভেট কেক আনব। ব্যস। আমাদের মাথায় ছিল, খুব বেশি চিৎকার চেঁচামেচি করা যাবে না। কিন্তু ঘর সাজানো হবে, কেক কাটা হবে, এই হবে আয়োজন। আমাদের সারপ্রাইজ পার্টি।

প্রথমে ঠিক ছিল আট-ন’জন। কিন্তু আমাদের প্রোগ্রাম জানতে পেরে, শ্রীর গার্লগ্যাং-এর অনেকেই বলল—আমরাও যাব। কে কাকে বারণ করবে? এটা তো বার্থ ডে—উইশ সবাই করতে পারে। আর ওরাও শ্রীর বন্ধু। শ্রীদের গার্লস স্কুলে অনেক বন্ধু।

আমাদের স্কুল কো-এড নয়। শ্রীদের স্কুলও নয়। আমাদের স্কুলের একটা ফেস্টে ওরা এসেছিল, সেখান থেকে ওদের সঙ্গে আমাদের ফ্রেন্ডশিপ। সেই ক্লাস নাইন থেকে।

আমি যাওয়ার সময়ে প্রথমে মেট্রো, তারপর অটো করে শ্রীদের বাড়ি গিয়েছিলাম। ততক্ষণে অনুষ্কা-ঝিলমিল-শ্রুতি আরও কেউ কেউ মিলে ওর ঘর সাজিয়ে ফেলেছে। প্ল্যান মতো ওর ঘরের মেঝে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে সাদা কালো বেলুনে। রেড ভেলভেট কেক নিয়ে এসেছে অনুষ্কা। এবার আমরা ফোন করে দিলাম ঊষসীকে। ‘চলে আয়।’ ওরা তিনজনে চলে এল শ্রীদের ফ্ল্যাটে। শ্রী এসে দেখল, আমরা কয়েকজন এসেছি। আমাদের দেখে নাচতে শুরু করল। ঘর দেখে ফুল ম্যাড! শুনল, আরও সবাই আসছে। সবাই এলেই কেক কাটা হবে।

একটু পরে রোহিত এল, ওর গাড়িতে অগ্নিমিত্রাকে তুলে আনার কথা ছিল। অগ্নিমিত্রা অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। কিছুদিনের জন্য মায়ের সঙ্গে ইন্ডিয়ায় এসেছে। ও শ্রীর খুব কাছের বন্ধু। রোহিতকে শ্রী বলেছিল, তুই আসার সময় অগ্নিমিত্রাকে তুলে আনবি।

রোহিতের গাড়িতেই এসেছে আবির। আবিরকে শ্রী চেনে, কিন্তু বন্ধুত্ব নেই।

আসলে হয়েছে কী, সেদিন সকালে আবির ফোন করেছিল রোহিতকে। ‘ভাই ইভনিং-এ তো সূর্যর হায়াতের পার্টি আছে। তা তোর সারাদিনে কী প্রোগ্রাম?’

রোহিত বলেছিল, ‘ইভনিং-এ হায়াত। তার আগে সকালে আমার এক বন্ধুর বার্থ ডে, তার বাড়ি যাব সারপ্রাইজ পার্টি আছে।’

‘কোন বন্ধু?’

‘শ্রী।’

তখনই রোহিত জানায়, ও শ্রীদের বাড়ি যাওয়ার সময় অগ্নিমিত্রাকে তুলবে।

‘কে অগ্নিমিত্রা?’

‘অস্ট্রেলিয়ায় থাকে, শ্রীর বন্ধু।’

আবির এফবি বা ইন্সট্রাগ্রাম থেকে অগ্নিমিত্রাকে দেখেছে। কোনও না কোনওভাবে অগ্নিমিত্রাকে চিনত। কিন্তু অগ্নিমিত্রা ওকে ঠিক পাত্তা দেয়নি। এখন আবির সুযোগ পেয়ে বলে, ‘ভাই আমিও তোদের সঙ্গে যাব।’ ও পরিষ্কার জানায়—ওর অগ্নিমিত্রার ওপর টান আছে।

রোহিত বলে, ‘আমি কী বলব? তুই একবার আর্যকে জিজ্ঞাসা কর।’

আমি তখন খাচ্ছিলাম, ও আমাকে ফোন করে। আমি প্রথমে আবিরকে নিতে চাইনি। কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে রাজি হয়ে যাই। রোহিত আমার কথা বলল কেন? আমার সঙ্গে শ্রীয়ের বেশি ভাব। শ্রী আমাকে নিজের ভাইয়ের মতো দেখে। আমি রাজি হয়েছিলাম, কারণ, আবির আমাকে স্পষ্ট বলেছিল, ও অগ্নিমিত্রার জন্য যাচ্ছে। আবির খুব মজার ছেলে, ও যেখানে যায় দারুণ জমিয়ে দেয়। হেভি ফানি। ও গেলে খুব আনন্দ হয়। তাইজন্যে হ্যাঁ বলেছিলাম। আর না বললে ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে যেত।

তবে সেদিন না বললেই ভালো হত। আমার মা এই কথাগুলো শুনে বলেছে, ‘নিয়তিই ওকে টেনে নিয়ে গেছে—ওকে মৃত্যু টেনেছে।’ আমি সেদিন ‘না’ বললে রোহিত ওকে নিত না। শ্রীও ওকে অ্যালাউ করত না। কিন্তু বার্থ ডে-তে সবাই উইশ করে—আমি না বললেও হয়তো ও যেত। উইশ করতে গেলে কেউ তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিত পারে? তাই আমি হ্যাঁ বা না বলি আবির যেতই। ও যখন যাবে মনে করেছিল— ঠিকই যেত।

সত্যিই যেন মৃত্যু ওকে টেনেছিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%