চার

জয়ন্ত দে

‘প্লিজ তোমরা বিশ্বাস করো আমায়, আমাদের কোনও ঝগড়া হয়নি, কোনও কথা কাটাকাটি হয়নি। তোমাকে যে বলেছে, সে সব বাজে কথা বলেছে। সব বাজে কথা। গল্প বলছে।’

আর্যনীল অস্থিরভাবে একই কথা বলে যাচ্ছে।

অমিত্রসূদন বলল, ‘রাজীব কিছু বলেনি—যা বলেছে পুলিশই বলেছে। একজন সাসপেক্টেড।’

‘কে?’ আর্যনীল অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।

‘জানি না।’

‘কে, বাবি? কে? না, না, এটাও ভুল কথা।’ আর্যনীল অস্থির হয়ে মাথা নাড়ায়।

শকুন্তলা মাথায় হাত দিয়ে বসে। ওর দু’চোখ বন্ধ। বন্ধ চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে আকাশ পাতাল ভাবছিল। ওরা সবাই ড্রিঙ্ক করেছে? মদ খেয়ে মোচ্ছব করেছে?

অমিত্রসূদন ভাবছিল কাকে ফোন করা যায়? কে ঠিক ঠিক কথা বলবে। রাজীব তার খবরের অ্যাঙ্গেল থেকে কথাগুলো বলল। তাকে বাস্তবটা জানতে হবে। কাকে? ঠিক কাকে ফোন করা যায়?

মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফোন করল অবিনাশকে।

অবিনাশও একটা বড় চ্যানেলের ক্রাইম রিপোর্টার। আগে তাদের কাগজেই ছিল। খুব কায়দার মানুষ। নিজের বিজ্ঞাপন ও বিপণনে সর্বদা ব্যস্ত। অমিত্রসূদনের ফোন বাজার আগেই যেন ধরে ফেলল, ‘বল কী খবর তোর? তোর নতুন নাটকের বিজ্ঞাপন দেখলাম। দারুণ বিষয়—’

‘অবিনাশ একটা দরকারে তোকে ফোন করলাম।’

‘দরকার ছাড়া যে তুই ফোন করবি না সে আমি জানি। বল?’

‘গল্ফগ্রিনের ঘটনায় শুনলাম একজনকে সাসপেক্ট করেছে—ছেলেটার নাম কী জানিস?’

অবিনাশ হালকা গলা খাকারি দিল, ‘সবাই আন্ডার এইটটিন। কারো নামই লেখা যাবে না ভাই।’

‘জানি, আমি শুধু সাসপেক্টের নামটা জানতে চাইছি।’

অবিনাশ হাসল, ‘আরে শুধু সাসপেক্ট কেন, আমি সতেরোজন ছেলেমেয়ের নাম, বার্থ সার্টিফিকেট, বাবার নাম, বাড়ির অ্যাড্রেস সব জোগাড় করে ফেলেছি। তোদের যে ক্রাইম দেখে, রাজীব; ওকে ফোন করে জিজ্ঞেস কর তো, ওর কাছে সতেরোজনের নাম আছে কি না?’

‘শুনলাম একজন সাসপেক্টেড!’ অমিত্রসূদন এবারও মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘হ্যাঁ, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে—। রোহিত পল। আসলে পাল। বাঙালি। ব্যবসায়ী পুত্র। বাবার ফার্নিচারের ব্যবসা। সিনেমা সিরিয়ালের সেটে যে সব ফার্নিচার লাগে—সাপ্লাই দেয়। বাড়ি টালিগঞ্জ।’

‘রোহিত পাল!’

‘কেন তুই চিনিস?’ অবিনাশ বাঁকা গলায় প্রশ্ন করে।

‘না।’

‘তোর ছেলের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। তোর ছেলে নিশ্চিত চিনবে। ত্রিকোণ প্রেমের কেস মনে হচ্ছে। এক ফুল দো মালি!’

‘পুলিশ কী বলছে রে—? রোহিতকে কি অ্যারেস্ট করেছে—?’

‘পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করেনি। আন্ডার এইটটিন, নাবালক, একটু এদিক ওদিক হলে পুলিশ কেস খেয়ে যাবে। সব কোটি-কোটিপতি ঘরের সন্তান। হাইপ্রোফাইল কেস। পুলিশ খুব ধীরে সুস্থে এগোচ্ছে। রোহিতকে যে জিজ্ঞাসাবাদ করছে, পুলিশ তা স্বীকারই করেনি—। আমি কিন্তু একটা সূত্র থেকে জানতে পেরেছি, এই রোহিত কেসটা ঘটিয়েই একটা বন্ধুকে নিয়ে পালিয়েছে। পুলিশ পরে গিয়ে বাড়ি থেকে রোহিতকে তুলে নিয়ে এসেছে। তেমন হলে সারারাত ধরপাকড় চলবে। পুলিশ দেখছে, একজন, দু’জন, না কি দল বেঁধে ক্রাইমটা করেছে? মারপিট ধাক্কাধাক্কি থেকে হয়েছে, না প্ল্যানফুলি মার্ডার করা হয়েছে—।’

‘অবিনাশ পরে তোকে আমি ফোন করব। আমার হয়তো তোকে একটু দরকার পড়বে।’

‘করিস। কী হয়েছে রে, হঠাৎ এটা নিয়ে তুই আমাকে ফোন করলি?’

‘কিছু না, আমাদের টিভিটা খারাপ, শকুন্তলা জানতে চাইছিল, তাই।’

‘হ্যাঁ, বললাম তো তোর ছেলের স্কুলের দু-একজন আছে। যে ছেলেটা মারা গেছে, আবির, সে তোর ছেলের স্কুলের। ছেলেটাকে যদি আর্য চেনে, তাহলে পরে আমি আর্যর সঙ্গে কথা বলব—। অন্য কোনও অ্যাঙ্গেল—। আবির কেমন ছেলে ছিল, না ছিল...দেখা যাক।’

‘অবিনাশ আমি রাখি।’

‘ফোন করিস। তোর নাটক দেখতে যাব।’

‘হ্যাঁ, আসিস। আমাকে বলিস, টিকিট রেখে দেব।’

‘শুভরাত্রি। ভালো লাগল তুই ফোন করলি। তোর মতো একজন নামী নাট্যকারের ফোন, অন্য দিন হলে উপভোগ করতাম। কিন্তু আজ এই আন্ডার এইটটিনগুলোকে নিয়ে পড়ে থাকতে হবে। তবে বস, কাল থেকে চ্যানেল পেপার কিছুদিন মার মার কাট কাট হবে—কেসটা জমবে। দেখ না কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। টিভিটা ঠিক করে নিস। তোর জন্য না, বউদির জন্য। এখন এটাই টি-টোয়েন্টি ম্যাচ!’

ফোনটা ছেড়ে অমিত্রসূদন চুপ করে বসে থাকল কিছুক্ষণ।

আর্যনীল আধশোয়া হয়ে, বিড়বিড় করছে, ‘রোহিতের কী হয়েছে বাবি?’

‘পুলিশ বাড়ি থেকে রোহিতকে তুলে নিয়ে গেছে—জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’

‘ওকে কেন নিয়ে গেছে—?’

‘আপাতত জিজ্ঞাসাবাদ করছে। হয়তো ওকে সন্দেহ করছে। কিছু প্রমাণ পেলে অ্যারেস্ট করবে।’

‘কী পাবে ওর কাছ থেকে?’

‘পুলিশ বলছে, রোহিতই খুন করেছে। করে একজন বন্ধুকে নিয়ে পালিয়ে যায়।’

‘ও তো আমাকে নিয়ে চলে এসেছে—। পালাবে কেন?’

‘তুই এলি কেন ওর সঙ্গে?’ শকুন্তলা হিসহিস করে ওঠে। ‘ও তোকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে।’

‘আবিরকে নিয়ে অনুষ্কা আর সবুজ গাড়ি করে চলে যায়। তারপর রোহিত গাড়ি নিয়ে আসে, ও বলেছিল, “হসপিটাল যাব, চল—।” গাড়িতে উঠতে দেখলাম গাড়িটা অন্যদিকে যাচ্ছে। আমি ওকে বললাম, “হসপিটাল তো রাইটসাইডে।” রোহিত বলল, “আমি মাকে দেখতে হসপিটাল যাব। বাবা এক্ষুনি মায়ের কাছে যেতে বলেছে।”’

‘রোহিতের মা কোথায় আছে?’ অমিত্রসূদন বলল।

‘বেলভিউতে। আন্টির ক্যানসার। থার্ড স্টেজ।’

‘ওখান থেকে তোরা কি ওর মাকে দেখতে গেলি?’

‘না, ও মায়ের সঙ্গে দেখা করল না। গাড়িটা হসপিটালে ঢুকতে যাবে তখন আবার ওর বাবার ফোন এল। আঙ্কেল বলল, বাড়ি চলে আয়। রোহিত গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি চলে এল। ও আমাকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিল। আমি রিকশ নিয়ে চলে এসেছি।’

শকুন্তলা আবার বলল, ‘তুই ওর গাড়িতে এলি কেন?’

‘মা, আমি সব জায়গায় ওর সঙ্গে যাই, ওর সঙ্গেই ফিরি। আমাকে কি তোমরা গাড়ি দাও? না, আমার কাছে ট্যাক্সি করে আসার টাকা থাকে?’

‘কেন? গাড়ি ট্যাক্সি ছাড়া চলা যায় না? তুই বড়লোকিচালের জন্য আজ এই সর্বনাশটা ঘটালি। বাস, অটো, মেট্রো নেই—?’

অমিত্রসূদন খুব নিচু স্বরে বলল ‘এখন এসব কথা বন্ধ করো।’

শকুন্তলা বলল, ‘হ্যাঁ, আমি চুপ করে যাচ্ছি। তবে আমার কথা মিলিয়ে নেবে, আজ রাতেই পুলিশ আসবে, রোহিতকে যখন অ্যারেস্ট করেছে, এদেরও একে একে নিয়ে যাবে।’

অমিত্রসূদন বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে। অবিনাশও বলছিল আজ রাতেই ধরপাকড় শুরু হয়ে যাবে। রোহিতের সঙ্গে আর্যই এসেছে। নেক্সট তাহলে আর্যই। কথাটা ভেবেই অমিত্রসূদনের কেমন অস্থির অস্থির লাগে।

‘যখন ঘটনাটা ঘটল—তুই কোথায় ছিলিস?’

‘আমি দু’জন বন্ধুর সঙ্গে দূরে গল্প করছিলাম। খবর পেয়ে দৌড়ে এসে দেখলাম, আবির দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে। ওর হাত কেটে খুব রক্ত বেরুচ্ছে।’

‘রোহিত কোথায় ছিল?’

‘আমি জানি না। তারপর সবুজ এল। আমি তখন রোহিতকে খুঁজছিলাম, ওকে দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি গাড়ি আনতে বললাম। ও ফোন করছিল।’

‘রোহিত আর আবিরের মধ্যে কি কোনও গোলমাল বা ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল?’

‘না। কোনও কিচ্ছু হয়নি। কেন হবে?’

শকুন্তলা বলল, ‘হলেও ও বলবে না। তুমি নিশ্চিত থাকো। ওর খুব বন্ধুপ্রীতি—। সত্যি বল কী হয়েছিল?’

আর্য বিমর্ষ চোখে মায়ের দিকে তাকায়, ‘কিছু হয়নি তো আমি কী বলব?’

অমিত্রসূদন ঘড়ির দিকে তাকাল। প্রায় বারোটা বাজে। বাইরে একটা গাড়ির শব্দ হল। যেন এই বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। ধড়াস করে উঠে পড়ল শকুন্তলা। ‘গাড়ি এল একটা—।’ সে ছুটে গিয়ে দাঁড়াল জানলার সামনে। ‘পুলিশ নয়, ট্যাক্সি।’

অমিত্রসূদন বলল, ‘কাল তিনটের সময় আমাদের থানায় যেতে হবে। শোন, যা জানিস সত্যি কথা বলবি। কোনও কথা লুকাবি না। কোনও গোপন কথাই চাপা থাকবে না। পুলিশ সব টেনে বের করবে। কোনও কথাই চেপে রাখতে পারবি না, সেই চেষ্টাও করবি না।’

‘রোহিত কিছু করেনি। ওকে ফালতু ব্লেম দিচ্ছে।’ আর্য বলল।

‘সেটা পুলিশ দেখবে। আগে তুই নিজে বাঁচ।’ শকুন্তলা জানলার দিকে তাকিয়ে বলল। আর তারপরেই চাপা গলায় বলল, ‘পুলিশের গাড়ি—।’

অমিত্রসূদন উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ ওর মনে হল। প্রেক্ষাগৃহে আলো নিভে গিয়েছে, পর্দা উঠছে। শকুন্তলা ফিসফিস করল, ‘জিপ!’

ঘরের ভেতর কেউই কথা বলল না। শকুন্তলা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে, বলল, ‘জিপটা দাঁড়াল না কিন্তু, চলে গেল। ওরা কি আমাদের বাড়ির ওপর নজর রাখছে?’

অমিত্রসূদন বলল, ‘আর্য তুই ঘুমিয়ে পড়। তুমি ওকে ঘুমাতে দাও।’

আর্যনীল বলল, ‘মা তুমি আমার কাছে শোবে?’

শকুন্তলা জানলা ছেড়ে এগিয়ে এল, বলল, ‘হ্যাঁ, শোব।’

অমিত্রসূদন ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। ওর পড়ার ঘরে ওষুধের বাক্স। বাক্স হাতড়ে ঘুমের ওষুধ পেল। খুব কম ডোজের। মাঝে রাতে একদম ঘুম হচ্ছিল না বলে এক ডাক্তার বন্ধু দিয়েছিল। সে একটা ট্যাবলেট আর জলের বোতল নিয়ে আর্যর ঘরে গেল। বলল, ‘এটা খেয়ে নে।’

আর্য ওষুধ নেওয়ার জন্য এগিয়ে এসে হাত বাড়াল। আর্যর দু’চোখ বড় শুষ্ক, কোটরে ঢুকে রয়েছে। গালগুলোও ভেঙে গিয়েছে। শকুন্তলা বলল, ‘কাল সকালে উঠে আগে গিয়ে চুল কাটবি। বড় বড় চুল দেখলেই মানুষের কেমন সন্দেহ হয়।’

আর্য একটা বালিশ নিয়ে মুখ চাপা দিল। ফিসফিস করে বলল, ‘মা রোহিত কিছু করেনি।’

‘আমি জানি রোহিত কিছু করেনি, রোহিত ভালো ছেলে। তোর থেকেও ভালো ছেলে। শান্ত, ভদ্র। কিন্তু একজন তো মরে গেল? সে কীভাবে মারা গেল? সে কথা তো জানতে হবে। কী সত্যি, কী মিথ্যে পুলিশ জানবে না? তার বাড়ির লোক জানবে না? আজ তার মায়ের কী অবস্থা হচ্ছে বলতো—?’ শেষের কথাগুলো শকুন্তলা বলতে পারল না, হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল।

অমিত্রসূদন দেখছিল, আর্যর খুব কষ্ট হচ্ছে। ও বোঝার চেষ্টা করছিল, ঠিক এই মুহূর্তে আর্যর কার জন্য বেশি কষ্ট হচ্ছে—আবির, না রোহিত? মৃত বন্ধুর জন্য, না অভিযুক্ত জীবিত বন্ধুর জন্য? কার জন্যে?

হঠাৎ অমিত্রসূদনের মনে হল, রাজীব বা অবিনাশের কথামতো যদি পুলিশের কথাই সত্যি হয় তাহলে কোনওভাবে আর্য এর সঙ্গে জড়িত নয়তো? আর্য কোনও কিছু গোপন করছে না তো?

অমিত্রসূদন ধীর পায়ে পড়ার ঘরে এসে বসল। চুপ করে বসেই থাকল। তারপর সারারাতে যতবার গাড়ির শব্দ হল ততবার সে জানলার সামনে দাঁড়াল। মনে হল, শকুন্তলাও অন্যঘরে জেগে। আর সে-ও প্রতিবার গাড়ির আওয়াজ শুনে জানলার সামনে দাঁড়াচ্ছে। একটা বিনিদ্র রাত কেটে গেল এ বাড়িতে।

শকুন্তলা দেখল, অকাতরে ঘুমাচ্ছে আর্যনীল। শকুন্তলার চোখে জল। আর্যর জন্য শুধু নয়। আবিরের জন্য, আবিরের বাবা মায়ের জন্য। রোহিতের জন্য। রোহিতের ক্যানসারে আক্রান্ত অসুস্থ মায়ের জন্য। তার কাছে নিশ্চয়ই ছেলের খবর যাবে। যতই অসুস্থ হোক পুলিশ ঠিক তাকে জানিয়ে দেবে। রোহিত তো মায়ের কাছে হাসপাতালে যাচ্ছে বলে চলে এসেছিল। কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে জানতে হবে তো!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%