জোড়া ভূতের কান্না

দুলেন্দ্র ভৌমিক

দখনোর দিকে একটা গ্রাম আছে, তার নাম ভুতুড়িয়া। এরকম নাম কেন তা জানি না। নানা জায়গার নাম এবং তার উৎপত্তি নিয়ে সুকুমার সেন মহাশয়ের একখানা বই আছে। সেই চটি বইটি বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করে ভুতুড়িয়া গ্রামের রহস্য উদ্ধার করতে পারিনি। গ্রামখানার নাম ভুতুড়িয়া কী করে হল তা নিয়ে ভুতুড়িয়া গ্রামবাসীদের মধ্যে কোনও কৌতূহল নেই। নব্বইয়ের ঘরে পা রেখেছেন এমন জনাদুয়েক লোক বলেন, ‘একদা এই গ্রামের সদাশয় এবং দানশীল জমিদার ভূতনাথ চৌধুরী নাকি এক অমাবস্যার রাতে নিজের ঘরে খুন হন। কে বা কারা তাঁকে খুন করেছিল এবং কেন খুন করেছিল, তার কোনও হদিশ হয়নি। পুলিশ বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেছিল তদন্তের নামে জমিদারবাড়ির কাজের লোক মায় তাদের দুধওলাকে পর্যন্ত যৎপরোনাস্তি নাস্তানাবুদ করেছিল, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ভূতনাথ চৌধুরীর মৃত্যু বা খুনের ঘটনা আজও তেমন রহস্যে ঢাকা। যদিও এসব কথা গ্রামের শতকরা নব্বইজন মানুষই ভুলে গেছেন। ভুলে গেছেন না বলে ভুলে ছিলেন বলাই ভাল। ভূতনাথ থেকেই হয়তো ভুতুড়িয়া হয়েছে।

কিন্তু সম্প্রতি এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ভূতনাথ চৌধুরীর রহস্যজনক মৃত্যুটা কিছু লোকের মধ্যে আবার নতুন করে চর্চা হতে শুরু করেছে। প্রথম ঘটনা ঘটে এক শীতের রাতে। গ্রামখানা ঘন কুয়াশায় ঢাকা। আকাশে আলো নেই, কারণ, সেইদিন অমাবস্যা। এই গ্রামের কিছু অংশে বিজলিবাতি আছে বটে, তবে তা না থাকার মতোই। রোজই সন্ধের পর হুশ করে আলো চলে যায়। কখনও মধ্যরাতে আলো আসে, কখনও বা সকালের আগে আসেই না। এই গ্রামের মানুষ এতেই অভ্যস্ত। মানুষ একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে কর্তাব্যক্তিদের দায় বাঁচে। কারণ, মানুষ তখন অভিযোগ করতে ভুলে যায়। তা সেই প্রথম ঘটনার দিন পুব পাড়ার হরিপদ স্কুলের মাঠ থেকে যাত্রা শুনে একা একা নিজের বাড়িতে ফিরে আসছিল। জমিদারি উঠে গেলেও জমিদারবাড়িটা এখনও আছে। অত বড় বাড়িতে গুটিকয়েক লোক থাকে। যে ঘরে ভূতনাথবাবু খুন হয়েছিলেন, সেই ঘরটা দোতলায়। গয়ার প্রেতশিলায় গিয়ে পিণ্ডি দেওয়ার পরেও নাকি দোতলার ঘরগুলোতে ভূতের দৌরাত্ম্য কমেনি। ওই বাড়িতে যে কয়েকজন লোক এখনও থাকে, তারা সবাই একতলাতেই থাকে। রাতেরবেলা ভুলেও দোতলায় যায় না। কিন্তু বাইরের লোক যারা ওই বাড়ির সামনে দিয়ে প্রায়ই যাতায়াত করেন, তারা কেউ কখনও ভূতটুত দেখেনি। গ্রামের বহু লোক ভূত বিশ্বাসই করে না। হরিপদও করত না। কিন্তু ওই রাতে, মানে হরিপদ যে রাতে যাত্রা শুনে একা একা জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে ফিরছিল, সেই রাতেই তার মনে হল, কে যেন তাকে পিছন থেকে ডাকছে, ‘হরে, এই হরে!’

হরিপদকে খুব চেনা লোকেরাই ‘হরে হরে’ বলে ডাকে। আজ এত রাতে জমিদারবাড়ির অন্ধকার ফটকের সামনে কে তাকে হরে হরে বলে ডাকবে! প্রথমবার পিছন ফিরে কাউকে দেখতে না পেয়ে শোনার ভুল মনে করে আবার এগিয়ে যেতেই পিছন থেকে ডাক এল, ‘হরে, এই হরে!’

হরিপদ দাঁড়িয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে পিছন ফিরে তাকাল। এমন থকথকে অন্ধকার যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হরিপদ সাহসে ভর করে ডাকল, যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হরিপদ সাহসে ভর করে ডাকল, ‘কে? আমারে কে ডাকে?’

অন্ধকার থেকে উত্তর এল, 'বদমাশ, নিজের বাপের গলা চিনতে পারিস না! আমি তোর বাপ!’

হরিপদ চমকাল। তার বাবা তো কবেই মারা গেছেন। এই মধ্যরাতে আবার তার বাবা আসবেন কেমন করে। এবার মনে হল, গলার ভঙ্গিটা তার বাবার মতোই বটে! হরিপদ বলল, ‘বাবা, তুমি কি তবে মরোনি।'

হরিপদর বাবা উত্তর দিলেন, “মরেছি বই কী। নিশ্চয়ই মরেছি। কিন্তু আত্মার মুক্তি ঘটেনি বলে এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছি।'

হরিপদ অবাক গলায় প্রশ্ন করল, ‘কেন বাবা, আমি তো গয়ায় গিয়ে তোমার পিণ্ডদান করেছি।'

হরিপদর বাবা খেপে গিয়ে বললেন, ‘ছাই করেছ! একজন জলতোলা বামুনকে দিয়ে ভুলভাল মন্ত্র পড়িয়ে তড়িঘড়ি পিণ্ডদান করেছিস। তার যে ট্রেন ধরার তাড়া ছিল। ওতে কি আত্মার মুক্তি হয়? তাই তো বৈতরণী পেরোবার আগেই যমের একখানা ব্যাকভলিতে আবার গ্রামে ফিরে এলুম। ভাগ্যিস, জমিদারবাবু ছিলেন তাই এই বাড়িতে, বাগানে, গাছে গাছে আমার মতো কত অতৃপ্ত আত্মা মুক্তি না পেয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।'

হরিপদর এবার গা ছমছম করতে লাগল। সে বলল, ‘জমিদারবাবুর আত্মাও কি এই বাড়িতে ঘুরছেন?’

হরিপদর বাবা বললেন, ‘ঘুরছে কিনা দেখ। ওই যে তিনি।'

হরিপদ বিশাল জমিদারবাড়িটার দিকে তাকাল। অন্ধকারের মধ্যে সাদা রঙের বড় বাড়িটা দিব্যি দেখা যাচ্ছিল। হরিপদ দেখল, দোতলার সানসেটের ওপর দাঁড়িয়ে জমিদারবাবু গড়গড়া টানছেন। গড়গড়া টানার শব্দ এবং সুগন্ধি তামাকের গন্ধটা দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মধ্যে ছোট্ট একটা হাইফেনের মতো তার মনটা দুলছিল। হঠাৎ জমিদারবাবুর গম্ভীর গলা বলে উঠল, ‘নিরাপদ, কার সঙ্গে কথা কইছ? ওই লোকটা কে?’

হরিপদর বাবা নিরাপদ উত্তর দিলেন, 'আজ্ঞে, আমার ছেলে হরিপদ।'

জমিদারবাবু বললেন, ‘তা বেশ! বাবাকে দেখতে এয়েছে বুঝি?’

নিরাপদ এবার অভিমানের গলায় বললেন, ‘দেখতে এয়েছে না ছাই! আমিই তো ডেকে দেখা দিলুম। এখানকার ছেলেদের মধ্যে পিতৃভক্তির বড়ই অভাব।' জমিদারবাবু বললেন, ‘কী করবে নিরাপদ! এ হচ্ছে যুগের হাওয়া। আমার দোতলায় রাখালবাবুদের পরিবার রয়েছেন। রাখালবাবু, তাঁর স্ত্রী আর মা। রাখালবাবুর ছেলেই বাবা-মা আর ঠাকুরমাকে ভিটেছাড়া করে উদ্বাস্তু করে দিল।'

নিরাপদর গলায় যেন অপার বিস্ময়। তিনি বললেন, ‘সেটা কেমন করে ঘটল?’

জমিদারবাবু গড়গড়ায় টান দিয়ে বললেন, ‘সে এক কাণ্ড। রাখালবাবুর ছেলে প্রোমোটার হয়েছে। জলাজমি বুজিয়ে বড় বড় ফ্ল্যাটবাড়ি তুলছে। মৃত্যুর পর রাখালবাবু আর তাঁর স্ত্রী মোষডোবা খালের পাশে জলাজমিতে থাকতেন। ওখানেই মা'র সঙ্গে দেখা। তিনটি আত্মা বেশ সুখেই ছিলেন। কিন্তু থাকতে কি পারলেন! ওই জলাজমিতে রাখালবাবুর ছেলের নজর পড়ল। ব্যস, জমি ভরাট করে, তরতর গতিতে ফ্ল্যাটবাড়ি উঠে গেল। ফলে রাখালবাবু মা-বউ নিয়ে এখন উদ্বাস্তু। বাধ্য হয়ে আমার দোতলায় থাকতে দিতে হল। জলার ভূত, এই প্রজাতির ভূত প্রায় লুপ্ত হতে বসেছে!’

হরিপদর শরীর কাঁপছিল। সে কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছে না তো? নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখল, না সে জেগেই আছে। ভয় তাকে এমনই আড়ষ্ট করে ফেলল যে, সে দৌড়তে গিয়ে পায়ে পা জড়িয়ে রাস্তাতেই পড়ে গেল।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটল এর কয়েকদিন পর। ঠিক সন্ধের মুখে। মাঠ থেকে গোরু নিয়ে ফিরছিল কানাই দুধওয়ালা। সে হঠাৎ দেখল, একটা জ্বলন্ত সিগারেট তার দিকে এগিয়ে আসছে। ওটা সে সিগারেট, সেটা প্রথমে বোঝা যায়নি। কাছে আসতে কানাই দুধওয়ালা দেখল, সিগারেটটা যেন শূন্যে ঝুলছে। কেউ একজন সেটা যে টানছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। ফুক-ফুক করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। অথচ সামনে কেউ নেই। কানাই ভয় পেল, তবু বলল, ‘তুমি কে গা? মুখের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকছ অথচ শরীরখানা দেখা যাচ্ছে না?’

এবার ফ্যাক ফ্যাক করে একটু হাসি শোনা গেল। পরে বলল, ‘বড় যে দেখার শখ! বেঁচে থাকতে একবারও দেখতে গিয়েছ?’

কানাই বলল, ‘তুমি কে বটে গো? যারে দেখা যায় না, তারে দেখতে যাব কেমন করে?' এবার উত্তর এল, ‘আমি তোমার শ্বশুর। বিয়ের সময় কুড়ি ভরি সোনার সঙ্গে দশ হাজার টাকা নগদ নিয়ে আমাকে ফতুর করেছ। বেঁচে থাকতে কিছু করতে পারিনি। এবার তার শোধ তুলব৷'

এই পর্যন্ত বলে যেই না কানাইয়ের হাত থেকে গোরুর দড়িটা টান মেরে নিয়ে নিল, অমনি কানাই ‘ওরে বাবা রে, বাঁচা রে’ বলে ছুটতে ছুটতে গ্রামের মধ্যিখানে হেলাবটতলায় এসে ক্লাবঘরের দরজায় উপুড় হয়ে পড়ল। নিরাপদ তারপর কানাই, এই দু’জনের ঘটনার পর থেকে ভুতুড়িয়া গ্রামে ভূতের ভয়টা আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সন্ধ্যের পর কেউ আর একা একা কোথাও যায় না। জমিদারবাড়ির সামনের রাস্তাটা ভূতুড়ে রাস্তা বলে চিহ্নিত হয়ে যাওয়ায় ওই রাস্তা দিয়ে লোক চলাচল কমে আসতে লাগল। গ্রামের সবাই ভয়ে কাবু। সন্ধে নামার পর থেকেই যেন আতঙ্ক ছড়াতে থাকে। কিন্তু এভাবে তো বেশিদিন কাটানো যায় না। অতএব পঞ্চায়েতে খবর গেল। পঞ্চায়েত খবর দিল থানায়। থানা খবর পাঠাল এস পি-কে। এস পি থেকে ডি এম আর দমকল হয়ে গ্রামের কাছে দু’ মাস পরে যে খবরটি এল, তার সারমর্ম হল, ‘ভূত ধরা আমাদের কাজ নয়। নিজেরা সতর্ক থাকুন। সংঘবদ্ধভাবে ভূতেদের মোকাবিলা করুন। আবেদন করলে সরকারি সহযোগিতা পাবেন।'

এইরকম খবরে মুষড়ে পড়ারই কথা। গ্রামের সবাই মুষড়ে পড়লেন। এরই মধ্যে কোদালিয়া গ্রাম থেকে দু'জন ভূত তাড়ানোর ওঝা নিয়ে আসা হল। ওঝা দু'জন এলেন। পেটপুরে সিধু ময়রার দোকান থেকে কচুরি, অমৃতি আর জিবেগজা খেয়ে বললেন, ‘একটা-দুটো ভূত হলে চেষ্টা করা যেত। এ যে দেখছি গোটা গ্রামেই ভূত থইথই করছে। ভুতুড়িয়া তো এখন ভূতেদের নিজস্ব কলোনি। ক’টাকে তাড়াব? তাড়িয়ে দিলে এত ভূত যাবেই বা কোথায়? ভূত-পেতনি যাইহোক, মানবিকতার ব্যাপারটাও তো দেখতে হবে! পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করাটা অমানবিক। ওঝা দু’জন সাত টাকা করে চোদ্দো টাকা গাড়ি ভাড়া নিয়ে চলে গেলেন। এর ঠিক তিনদিন পর ঘটল আর এক কাণ্ড। রাতের দিকে তো জমিদারবাড়িতে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। কেউই যেতে চায় না। একবার কথা হয়েছিল, সবাই যদি দল বেঁধে যাই এবং আমাদের সঙ্গে যদি পুলিশ থাকে, তা হলে? কিন্তু থানার দারোগা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, ‘চোর, ডাকাত, খুনি ধরার ট্রেনিং আমাদের আছে। কিন্তু ভূত ধরার কোনও ট্রেনিং আমাদের দেওয়া হয়নি। অতএব, আমাদের দ্বারা ওসব কাজ হবে না।'

দমকল তো আগেই জানিয়ে দিয়েছে, ‘ভূত যদি কোথাও আগুন ধরিয়ে দেয়, তা হলে সেই আগুন নেভাতে আমরা যাব। আমাদের কাজ আগুন নেভানো।'

ভুতুড়িয়া গ্রামের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ভুতুড়িয়া সমাচার’ তার সম্পাদকীয় নিবন্ধে সরকার আর প্রশাসনের সমালোচনা করে লিখল, ‘এ কেমন সরকার, কেমন প্রশাসন? যে সরকারের ভূত ধরার কোনও পরিকাঠামোই নেই। পলাশির যুদ্ধের পরই এই গ্রাম ভূত-কবলিত হয়। তখন এর নাম হয় ভুতুড়িয়া। ক্রমে ক্রমে ভূত লুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ করে আবার এত ভূত আমদানি হল কোত্থেকে। ভূতেদের এই অবৈধ অনুপ্রবেশ আটকানোর কি কোনও উপায় নেই!’

যখন ভুতুড়িয়া গ্রামে ভূতের উৎপাত নিয়ে এই ধরনের আলোচনা চলছে, তখনই জমিদারবাড়ির একজন কর্মচারী এসে হেলাবটতলার ক্লাবঘরে একটি আশ্চর্যের খবর দিল। হেলাবটতলার ক্লাবঘরে আপাতত ভূত প্রতিরোধ কমিটির অস্থায়ী অফিস করা হয়েছে। সেই প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি গিরিধারী হালদার যখন ক্লাবঘরে ভূতেদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষণ দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এক জঙ্গী ভূত সবার দৃষ্টির আড়ালে এসে গিরিধারী হালদারের গালে এমন একটি চড় কষাল যে, তার শব্দ ক্লাবঘরের বাইরে সিধু ময়রার দোকান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। গিরিধারীবাবুর সেটাই শেষ ভাষণ। তারপর তিনি দু’খানি কষের দাঁত খুইয়ে বাড়িতেই শয্যা নিয়েছেন। ভূত বিষয়ে কোনও মতামতই দিচ্ছেন না।

হেলাবটতলার ক্লাবঘরের সামনে জমিদারবাড়ির জনৈক কর্মচারীকে দেখে সবাই অবাক হয়ে তাকাল। কেউ কেউ একটু দূরে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, 'কী ব্যাপার? নতুন কিছু ঘটেছে নাকি?’

কর্মচারীটি বলল, ‘নতুন মানে, তাজ্জব ব্যাপার। দোতলায় ভূতেদের মধ্যে কী ঘটেছে জানি না। কিন্তু দু’টি ভূত বেজায় কাঁদছে। কেঁদেই চলেছে। মানুষ অথবা ভূত যেই হোক, কেউ যদি ওপরে কেবল কেঁদে চলে, তা হলে নীচে আমরা থাকি কেমন করে?’

‘খুবই খাঁটি কথা। ভূত বলে কি তাদের দুঃখ-কষ্ট নেই। কিন্তু কাঁদছে কেন? ভূতই যে কাঁদছে সেটা কিসে বোঝা গেল?’

ওই কর্মচারী বলল, ‘তা ছাড়া কে কাঁদবে! দোতলার বারোখানা ঘরে তেনারা ছাড়া আর আছেটা কে?’

মধু বড়াল গ্রামের প্রধান মানুষ। তিনি বললেন, ‘বারোখানা ঘরে বারোখানা ভূত?’ কর্মচারী বলল, ‘বারোখানা ঘরে বারোজন নাকি বত্রিশজন তা তো গুনে দেখিনি! তবে সব ঘরেই তেনারা আছেন।'

মধু বড়াল বললেন, ‘বাংলায় বারো ভূঁইয়ার কথা জানি। এ যে দেখছি ভূতেদের মধ্যে আবার সেই বারো ভূঁইয়া।

পঞ্চানন সাঁতরা পঞ্চায়েতের সদস্য। তিনি বললেন, ‘ব্যাপারটা সোজা নয়। কথায় বলে না, সবকিছু বারোভূতে খাবে। অতএব, বারোভূত মানেই খুব বিপজ্জনক ব্যাপার। যাই করবেন, খুব সাবধানে।'

জমিদারবাড়ির কর্মচারীকে বসিয়ে রেখে সবাই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিল, জমিদারবাড়িতে ভূতেদের কান্নাটা শুনতে আমাদের যাওয়া উচিত। যদি ওদের কান্নার উপশম করা যায় তা হলে হয়তো বুঝিয়েসুজিয়ে ওদের গ্রামছাড়া করা যাবে। কিন্তু যাবে কে? সবাই প্রস্তাব করল, হরিপদই যাক। কেননা, ওখানে ওর বাবা নিরাপদ আছেন। তিনি ছেলের বড় রকমের কোনও অকল্যাণ করবেন না। বরং রক্ষা করবেন। কানাই দুধওয়ালার যাওয়া বোধহয় ঠিক হবে না। ওখানে কানাইয়ের শ্বশুর আছেন। জামাই-শ্বশুরের সম্পর্ক একেবারেই ভাল না। অতএব, হরিপদই যাক। অন্যরা জমিদারবাড়ির বাইরে থাকবে। আর কান্না যখন দিনেও শোনা যাচ্ছে, তখন রাতে যাওয়ার দরকার নেই। হরিপদ দিনেই যাবে। অন্যরা পশ্চাতে থাকবে। হরিপদ যে এককথায় রাজি হয়ে গেল, তা নয়। অনেক খোশামোদের পর তাকে রাজি করানো গেল।

একদিন বেলা এগারোটা নাগাদ দশ-বারোজনের একটা ছোট দল জমিদারবাড়ির দিকে রওনা দিল। সেদিন আকাশটা একটু মেঘলা মেঘলা ছিল। অন্যদিনের মতো ঝকঝকে রোদ নেই। পথ চলতে চলতে সেই দলের মধ্যে থেকে কে যেন একজন বলে উঠল, 'আজকের আবহাওয়া খারাপ। মেঘলা দিনের আর বাদলা দিনের ভূতেরা বদমেজাজি হয়। সবকিছু বুঝেশুনে কথা বলতে হবে। হরিপদকে সেটা বলে দেওয়া দরকার।'

হরিপদ কথাটা শুনল। মুখে কিছু বলল না বটে, কিন্তু ভিতরে গজগজ করতে করতে বলল, ‘সবজান্তা সর্বেশ্বর। এ যেন ভূতের মামা!’

জমিদারবাড়ির দু’জন কর্মচারী গেটের সামনেই অপেক্ষা করছিল। সবাই বাড়ির ভিতরে ঢুকল না। হরিপদকে নিয়ে মাত্র তিনজন জমিদারবাড়ির একতলায় এসে শুনল, দোতলায় দু’টি দুঃখী ভূতের কান্না। ভূতেরা কাঁদে কিনা তাই তার জানা ছিল না। জোড়া ভূতের এই করুণ কান্না শুনে হরিপদর হঠাৎ মনে হল, তার বাবা কাঁদছেন না তো? যে কোনও কারণেই হোক, আজ না হয় বাবা ভূত হয়েছেন, কিন্তু বাবা তো বটে! হরিপদর মনখারাপ হয়ে গেল। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির কাছে গিয়ে হরিপদ বিষণ্ণ গলায় ডাকল, ‘বাবা, বাবা গো? তোমার কী হয়েছে?’

একটু পরে ওপর থেকে উত্তর এল, ‘কে? হরিপদ? আমার হরে! তা কী মনে করে এলি বাবা!’

হরিপদ বলল, ‘তোমাদের মধ্যে কারা কাঁদছে? কী হয়েছে?’

হরিপদর বাবা নিরাপদ উত্তর দিলেন, ‘দাঁড়া, আমি নীচে গিয়ে বলছি।'

হরিপদ ছাড়া অন্যরা হরিপদকে বলল, ‘হরিপদ, বাবাকে নীচে নামতে বারণ কর। যা বলার ওপর থেকেই বলুন।'

ভূতেদের মতিগতি সম্বন্ধে হরিপদ মোটেও ওয়াকিবহাল নয়। বাবা বেঁচে থাকতে তাঁর মতিগতিই বুঝতে পারত না। এখন সেই বাবা ভূত হয়ে গিয়ে কেমন মতি হয়েছে সেটা জানার উপায় নেই। তাই হরিপদ বলল, ‘বাবা, তুমি সিঁড়ির ওপর থেকেই বলো। কষ্ট করে নীচে নামার দরকার নেই।'

ওপরের ঘরে জোড়া ভূতের কান্নাটা তেমনই চলছিল। ভূতবাবা নিষেধ শুনলেন না। সিঁড়িতে খটাখট শব্দ করে নীচে নেমে এসে বললেন, 'আমি এসেছি, দেখা পাচ্ছিস না বলে মনে করিস না আমি আসিনি। এবার বল, দলবল নিয়ে কেমন এসেছিস?’

হরিপদ একবার ঢোক গিলে বলল, ‘বাবা, জন্ম অবধি শুনে আসছি ভূত নাকিসুরে কথা কয়, নাকিসুরে কাঁদে। কিন্তু তোমরা তো তা করছ না।'

হরিপদর ভূতবাবা নিরাপদ বললেন, ‘ভুল শুনে এসেছিস। তোদের মানুষদের মধ্যেও তো অনেকে নাকিসুরে কথা কয়, নাকিসুরে গান গায়, এমনকী, রবি ঠাকুরের গানও নাকের ন্যাকামি দিয়ে গায়, তার বেলা? আমি মানছি, মানুষের মতো ভূতেদের মধ্যেও কারও কারও নাসিকা সমস্যা আছে। এটা কোনও দোষের নয়।'

হরিপদ বলল, ‘ওপরে কাঁদে কারা? ওদের কষ্টটা কীসের?’

নিরাপদ জবাব দেওয়ার আগেই গম্ভীর গলায় জমিদারবাবু বললেন, “তোমরা কি কেউ ওর কষ্টটা দুর করতে পারবে? কান্না থামাতে পারবে?’

হরিপদ খুব বিনীতভাবে বলল, ‘কান্নার কারণ জানা গেলে চেষ্টা করতে পারি।'

জমিদারবাবু এবার বললেন, ‘ওদের একজন আমার নিষেধ অমান্য করে একা গঞ্জের হাটে বেড়াতে গিয়েছিল। ভূত হয়েই যদি যেত তা হলে অঘটনটা ঘটত না। বাহাদুরি দেখিয়ে গেল মানুষের রূপ ধরে। ব্যস, ওখানে ওকে মানুষে ধরল। হরিপদ অবাক গলায় বলল, 'কীসে ধরল?’

জমিদারবাবু বললেন, ‘মানুষে। ভূত যেমন মানুষের ঘাড়ে চাপে অর্থাৎ ভূত মানুষকে ধরে, এখানে তার উলটোটা ঘটল। মানুষ ভূতকে ধরল। এখনও ধরেই আছে!’ হরিপদ বলল, ‘তাড়াতে পারছেন না?’

এবার জমিদারবাবুর ভূত নয়, হরিপদর বাবার ভূত বললেন, ‘কী করে তাড়াব? আমরা কী মানুষ তাড়াবার মন্ত্র জানি! তিব্বতে খবর গেছে। ওখান থেকে দু’জন লোক আসবে।

তারা নাকি মানুষের ওঝা। ভূতকে মানুষ ধরলে একমাত্র ওরাই ছাড়াতে পারে। ওদের ভরসাতেই আছি। তোরা তো জানিস না, জমিদারবাবুর ভাগনে জমিদারবাবুকে খুন করে গা ঢাকা দিয়েছিল। সেই জমিদারবাবুই ভূত হয়ে এক দিন মোষডোবা খালের ধারে ভাগনেকে খুন করেন। এমনই কপাল, সেই ভাগনের ভূত এখন আশ্রয়ের জন্য জমিদারবাবুর পা ধরে কান্নাকাটি করে। জোড়া ভূতের কান্নার মধ্যে ওই ভাগনের ভূতের কান্নাও আছে। আমরা বাপু আমাদের নিয়ে আছি। তোরা তোদের নিয়ে থাক না। আমাদের টানাটানি কেন? আমাদের নিয়ে এত রঙ্গ-তামাশাই বা কেন? ভূতুড়ে ব্যাপার, ভূতুড়ে ভোটার, ভূতুড়ে বেগার, বারোভূতে খাবে, এই ভূত নিয়ে কথা কেন? ভূতের কান্না শুনে ছুটে এলি? তোরা কি মানুষের কান্না শুনতে পাস না? ভূতের ওঝা না খুঁজে দুঃখের ওঝা খোঁজ।'

জমিদারবাবুর ভূত বললেন, ‘চলে এসো নিরাপদ। এসব কথা কাকে বলছ? আজ শুনবে কাল ভুলে যাবে। চলো, ওদের পাশে গিয়ে বসি। ওদের দুঃখের ভাগ নিই। ভূতের দুঃখ ভূত না বুঝলে কে বুঝবে! চলো এসো।'

সিঁড়িতে শব্দ করে ওঁরা উঠে গেলেন। বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় হরিপদর মনে হল, সেও যেন ভূত হয়ে যাচ্ছে। সত্যিকারের মানুষ না হতে পারার চেয়ে ভূত হওয়া বোধহয় খারাপ নয়!

.

আনন্দমেলা, মে ২০০৫

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%