দুলেন্দ্র ভৌমিক

বর্ধমান থেকে রেলে কাটোয়া যাওয়ার পথেই ‘বলগোনা’ বলে একটা স্টেশন আছে। খুবই ছন্নছাড়া গ্রাম। বাংলা সিনেমায় যেমন নিটোল গ্রাম দেখা যায় তেমনধারা গ্রাম এটা নয়। এখন বলগোনার চেহারা কেমন হয়েছে বলতে পারব না। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন দু'পাশে ধানখেতের মধ্যে একটা রেলস্টেশন। মাটির প্ল্যাটফর্ম। তার ওপর ছোট ছোট কিছু গাছ। প্ল্যাটফর্মের ওপর দোকানপাট বিশেষ নেই। উঁচু প্ল্যাটফর্ম থেকে তরতরিয়ে নীচে নামতে হয়। সেখানে কিছু দোকানপাট আছে। গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে প্ল্যাটফর্মে আর দু’দিকের ধানকাটা মাঠের আল ধরে মাথায় টিনের বাক্স, সুটকেস, এসব নিয়ে ছুটে আসে নানা বয়সি পুরুষ আর বউরা। ওরা ট্রেন ধরবে। ট্রেনখানারও যেমন যাওয়ার তাড়া নেই, যারা আসছে তাদের মধ্যেও যেন ট্রেন ধরার তাড়ার ভাবটা কম।
অনেকেই ট্রেন থেকে নেমে যাচ্ছে এবং কিছু-না-কিছু একটু কিনে আবার ট্রেনে উঠছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে রসগোল্লা। আমি পাশের এক যাত্রীকে জিজ্ঞেস করলুম, ‘দাদা, ব্যাপারটা কী? সবাই রসগোল্লা কিনছে কেন? এখানকার রসগোল্লা কি ভাল?’
যাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কি কলকাতায় থাকা হয়?’
আমি বললাম, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।'
ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনার প্রশ্ন শুনেই বুঝতে পেরেছি। কলকাতার রসগোল্লা খেয়েছি। ছানার গোল্লা পাকিয়ে রসের কড়াইতে ভিজিয়ে রাখলে যে রসগোল্লা হয় সেটা কলকাতার রসগোল্লা। আর-একরকম হচ্ছে ছানার ছিবড়ে শুধু চিবিয়ে যাও। বলগোনা তেমন রসগোল্লা তৈরি করে না। ঘুমন্ত শিশুর গায়ে মা যেমন করে হাত বুলোন, বলগোনার রসগোল্লাও তেমনই দু’ আঙুলে তুলে মুখে ফেলুন। আর কিছু করতে হবে না। চিবনোর দরকার নেই। মায়ের হাতের মতো করে জিভ দিয়ে তালুতে একটুখানি চাপ আহা, পূর্ণশশী যেন গলে মুখের মধ্যে কল্লোলিত মিষ্টান্নরসের প্রবাহিত ধারা। আমার ঠাকুরদার শ্রাদ্ধে ঘোষপাড়ার গোপাল ঘোষ সব খাবার পর একশো বারোখানা রাজভোগের সাইজের রসগোল্লা খেয়ে সেই যে খাওয়ার আসনেই টলে পড়ল, ওঠার আর ক্ষমতা রইল না। শেষে আসানসোলের সেই বিখ্যাত ম্যাকমিলান কোম্পানি থেকে একখানা ক্রেন এনে গোপালকে ভূমিশয্যা থেকে তুলতে হল। তোলা তো হল কিন্তু ফেলবে কোথায়? শেষমেশ বাড়ির বারান্দাতেই শুইয়ে দিয়ে গেল। কত লোক যে ভুল করে এক আনা, দু’ আনা করে পয়সা সব গোপালকে দিয়ে যেতে লাগল।'
আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কেন? পয়সা ছুড়ে ছুড়ে দিতে লাগল কেন?’
সেই ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, ‘দেবে না? তখনও তো দেশে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালবাসা ছিল। ভেবেছিল, আহা, বেচারি অকালে মারা গিয়েছে। ঘাটকাজের জন্য কিছু দিলে পুণ্য হবে।'
আমি বললাম, ‘এসব কি সত্যি?’
ভদ্রলোক খেঁকিয়ে উঠে বললেন, 'তবে কি মিথ্যে? এখন আমার বয়স পঞ্চান্ন। গত হপ্তায় হরিসভায় ডাবু হাতা, ডাবু হাতা বোঝেন তো, সেই ডাবু হাতার পাঁচ ডাবু হাতা খিচুড়ি খেয়েছি। পাঁচ ডাবু হাতা মানে আড়াই বালতি। আর শুকনো বোঁদে...।'
এই সময় কে একজন এক হাঁড়ি রসগোল্লা নিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, ‘এবার গাড়ি ছাড়বে। ইঞ্জিন এসে গিয়েছে।'
আমি চমকে উঠলাম। ইঞ্জিন এসে গিয়েছে মানে? বর্ধমান থেকে এতক্ষণ যে গাড়িখানা এল সে কি ইঞ্জিন ছাড়া? আমি কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই ভদ্রলোক আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলে উঠলেন, ‘ব্যাপারটা অদ্ভুত শোনালেও এ লাইনে এটা মাঝে মাঝে হয়। কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ করে মূল গাড়ি থেকে ইঞ্জিনটা খুলে যায়।'
আমি বললাম, 'তারপর?’
ভদ্রলোক বললেন, ‘তারপর আর কি! ইঞ্জিন তার মতো সিটি বাজাতে বাজাতে এগিয়ে চলে। এতক্ষণ যে গতিতে এসেছে সেই গতির রেশ থাকাতে গাড়িটাও এগিয়ে চলে। তারপর রেশ কমে গেলে গাড়িটা থেমে যায়। তারপর ইঞ্জিনটা থামে। এবার ইঞ্জিনটা ব্যাক করতে করতে এসে মূল গাড়ির সঙ্গে আবার যোগ হয়।'
এই সময়েই গাড়িতে একটা ছোট্ট ধাক্কা লাগল। ভদ্রলোক বললেন, ‘ইঞ্জিন লাগল। এবার আবার চলতে শুরু করবে।'
আমি কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে অনেক কিছু জানতে পারলাম। আপনার নামটা যদি বলেন...।'
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই উনি বললেন, 'আমিও ঘোষপাড়ার লোক। আমার নাম নেপাল ঘোষ। নামটা নেপাল বলে গোপালের সঙ্গে গোলাবেন না। তবে গোপালদাকে আমি শ্রদ্ধা করতাম। আমি ডাকতাম ‘বড়দা' বলে। বড়দা যদি একবার খাব মনে করতেন, তা হলে তাঁকে রোখে এমন সাধ্য কার? একবার বর্ধমানের মহারাজা তার খাওয়ার খ্যাতি শুনে নিমন্ত্রণ করে খাইয়েছিলেন। সে এক দেখবার মতো ব্যাপার। ভাত, ডাল, ভাজা, মুড়োঘণ্ট খাওয়ার পর দেড় বিঘত লম্বা তিরিশখানা পাবদা, রুইমাছের পিস কুড়িখানা সাবাড় করার পর ছোট একটা ঢেকুর তুলে মহারাজের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দই-মিষ্টির কিছু ব্যবস্থা আছে?’
কেউ একজন ঠাট্টার সুরে গোপাল ঘোষকে বললেন, ‘এখনই দই-মিষ্টির খোঁজ করছেন। এখনও তো মাংস দেওয়া হয়নি। কচি পাঁঠার মাংস।'
গোপাল ঘোষ হাসতে হাসতে বললেন, ‘তা মাংস হাঁড়িতে না রেখে আমার পাতে দিতে আজ্ঞা হোক।'
মহারাজা তখন ঘামছেন। একজনকে ফিসফিস করে বললেন, ‘আবারও ক্রেন আনতে হবে নাকি?’
সেই একজন ফিসফিসিয়ে উত্তর দিল, ‘খাটিয়া রেডি করা আছে। খাটিয়ায় শুইয়ে কাঁধে করে বাড়ি পৌঁছে দেব।'
ইতিমধ্যে গোপাল ঘোষের পাতে মাংস দেওয়া শুরু হয়েছে। তখন তো কিলোর মাপ ছিল না। সেদিনকার মাপে আমার বড়দা মাংস খেয়েছিলেন আড়াই সের। তারপর এল দই আর মিহিদানা। গোপাল ঘোষ দইয়ের হাঁড়ি থেকে খাবলা দিয়ে হাঁড়ির মাঝখান থেকে দই তুলে মুখে দিয়ে ওই খাবলা মারা জায়গায় মিহিদানা ফেলে এমন করে মেখে খেতে লাগলেন যে, যেন ডাল দিয়ে ভাত মেখে খাচ্ছেন। এই খাওয়ার দৃশ্য দেখে মহারাজা নাকি সংজ্ঞা হারান। জ্ঞান ফেরার পর বলেছিলেন, ‘শুনেছি গোরুর নাকি চারটি পাকস্থলি থাকে। জানতে ইচ্ছে করছে গোপাল ঘোষের ক’টি পাকস্থলি।'
কেউ একজন বলেছিলেন, ‘একটিতেই যদি এমন হয় তা হলে চারটি থাকলে গোপাল বোধহয় গোটা বর্ধমান জেলাটাই খেয়ে নিত।'
নেপাল ঘোষ রেলের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। দূরে দূরে ছাড়া ছাড়া কয়েকটি তালগাছ দাঁড়িয়ে আছে। ফসল কাটা মাঠের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বাতাস। লাইনের পাশে নানারকম গাছ। কোনও কোনও গাছের পাতাগুলো গাড়ির গায়ে লাগছে। কেমন একটা শব্দ উঠছে। এইসময় নেপাল ঘোষ বললেন, 'আপনি নিশ্চয়ই কাটোয়া যাচ্ছেন? কোথায় উঠবেন?’
আমি বললাম, ‘স্টেশনে আমার লোক থাকবে। বন্ধু। তার বাড়িতেই থাকব।'
নেপাল ঘোষ পকেট থেকে একখানা কার্ড বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই কার্ডখানা সঙ্গে রাখুন। বর্ধমান, কাটোয়া দু’ জায়গাতেই এটা আপনার কাজে লাগতে পারে। এমনকী বলগোনাতেও কাজ দেবে। একসময় ওই গ্রামে কিছুদিন ছিলাম তো! বর্ধমানের বাসিন্দা হলাম অনেক পরে। পরে কখনও দেখা হলে আরও কথা হবে।'
আমরা দু'জনেই কাটোয়ায় নেমে গেলাম। স্টেশনে নামার পর বিশেষ কথা হল না। দু’জন দু’দিকে চলে গেলাম। আমারও মনে মনে ইচ্ছে ছিল নেপাল ঘোষের সঙ্গে আবার দেখা হোক। দেখা হওয়াটা অসম্ভব কিছু ব্যাপার নয়। দু'জনেই কাটোয়া শহরে রয়েছি। তা ছাড়া ওঁর দেওয়া কার্ডে কাটোয়ার ঠিকানাও রয়েছে। মনে মনে ভাবলাম, বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একদিন কাটোয়ার ঠিকানাতেই খোঁজ করে দেখি। উনি তো দিন দশেক থাকবেন বলেছিলেন, সেই হিসেবে ওঁর এখনও কাটোয়াতেই থাকার কথা। দ্বিতীয়বার দেখা হওয়ার আগে বুঝিনি যে, তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়াটা কতখানি সাংঘাতিক আর আমার পক্ষে কতদূর বিপজ্জনক। এবার সরাসরি ওই ঘটনার দিকে যাওয়া যাক।
আমি আর বন্ধু দু'জনে মিলে একদিন বেরিয়ে পড়লাম নেপাল ঘোষের খোঁজে। ঠিকানামতো গিয়ে দেখলাম, একখানা সাদা রঙের দোতলা বাড়ি। বাড়ির নীচে দাঁততোলা ডাক্তারের চেম্বার। দাঁত তোলার জন্য কয়েকজন লোক বসে আছে, আর যাদের দাঁত তোলা হয়ে গিয়েছে তারা ডাক্তারবাবুর চেম্বারের বারান্দায় দেওয়ালে হেলান দিয়ে গালে হাত চাপা দিয়ে বিরক্ত মুখে বসে। আমাকে আর বন্ধুকে দেখে ডাক্তারবাবু বললেন, ‘দাঁত তোলাবেন?’ আমি বললাম, ‘না। আমি এসেছি নেপাল ঘোষের খোঁজে।'
ডাক্তারবাবু অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অনেকেই তাঁর খোঁজে আসেন কিন্তু কেউই নাকি তাঁর সন্ধান পান না। আমি তাঁর নাম শুনেছি কিন্তু কখনও চোখে দেখিনি। কাটোয়ার কেউ দেখেছেন কি না তা বলতে পারব না।'
আমি অবাক হয়ে বললাম, 'বলেন কী মশাই! বর্ধমান থেকে ট্রেনে করে আসার পথে আমার সঙ্গে আলাপ হল। তিনি নিজে এই কার্ডখানা দিয়ে বললেন, 'আবার দেখা হবে।”
দাঁতের ডাক্তার বললেন, ‘অমন কার্ড অনেককেই দিয়েছেন। এই বাড়িখানা তো তাঁরই। ঠিক মাসের পাঁচ তারিখের মধ্যে ঘরভাড়া নেওয়ার জন্যে তাঁর ভাগনে চলে আসেন। ওপরে
যান, দেখুন ভাগনে কিছু বলেন কি না। আমি যতদূর শুনেছি।...।' আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী শুনেছেন?’
দাঁতের ডাক্তার মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন, 'না না, আমার বলা ঠিক হবে না। উপরে গেলে ভাগনের কাছ থেকে শুনবেন। অবশ্য তিনি যদি বলেন।'
ডাক্তার আমাদের নমস্কার জানিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, এবার যেন আমরা বিদেয় হই। আমরা যদি তখনই নিজেদের ঘরে ফিরে আসতাম তা হলে কোনও ঝামেলায় জড়াতে হত না। আমরা নেপালবাবুর সন্ধানে দোতলায় উঠে দরজায় ধাক্কা দিতেই বছর চল্লিশের একজন লোক বললেন, ‘কী চাই? কোত্থেকে আসছেন? কাকে চাই?’
যেন বন্দুকের নলে প্রশ্নগুলো ভরা ছিল। এবার নল থেকে গুলির মতো প্রশ্নগুলো আমাদের দিকে ছুটে এল। আমরা যথাযথ উত্তর দেওয়ার পর ভাগনে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘কার্ড দিয়েছেন? কই দেখি দেখি কার্ডখানা?’
কার্ডখানা উলটেপালটে কয়েকবার দেখে বললেন, ‘আশ্চর্য! ভারী আশ্চর্যের ব্যাপার! এ জিনিসের ব্যাখ্যা তো সাধারণ বুদ্ধিতে হয় না। আচ্ছা বলুন তো, আমার মেজোমামা অর্থাৎ নেপাল ঘোষ, যিনি আপনাকে এই কার্ড দিয়েছেন, তিনি দেখতে কেমন?’
আমার বন্ধু আমার চেয়েও অবাক হয়ে তাকাল। আমি যতটা পারলাম নেপাল ঘোষের চেহারার বর্ণনা দিলাম। তাঁর গোটা চেহারার একটাই বৈশিষ্ট্য, তা হল বাঁ চোখের ভ্রূ-র ওপরে একটা জডুল। আমার বর্ণনা শুনে ভাগনে বললেন, ‘অবাক ব্যাপার কী জানেন? আমার মেজোমামা আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে মারা গিয়েছেন। আমি তখন কলকাতায় পিসির বাড়িতে। এই দুঃসংবাদ পেলাম চিঠির মাধ্যমে। এত খেতে পারতেন বলে মামার বিয়ের পাত্রী জুটল না। কেউ ভরসা করে নেপালমামার হাতে মেয়ে দিতে চাইল না। মেজমামার দূরসম্পর্কের জ্ঞাতিদাদা গোপাল ঘোষেরও খাওয়ার খুব নামডাক ছিল। বিয়ের পর একবার জামাইষষ্ঠীতে এমন খেয়েছিলেন যে সেই খাওয়া দেখে গোপাল ঘোষের শ্বশুর দ্বিতীয়বার জামাইষষ্ঠী পর্যন্ত বাঁচেননি। তার আগেই দেহে রেখেছিলেন। আর আমার মেজমামার মৃত্যু হয়েছিল কিন্তু খেতে খেতে। একেবারে অনস্পট।'
আমি বললাম, ‘সেটা কেমন?’
ভাগনে বললেন, ‘নিজের চোখে দেখার তো সুযোগ হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী শক্তিগড়ের এক ধনী ব্যক্তি ল্যাংচা খাওয়ার প্রতিযোগিতার একটি আসর করেছিলেন। খাইয়ে হিসেবে যাঁদের নাম ছিল তাঁদের নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিল। তা ছাড়া অনেক লোক এসেছিলেন। কয়েকজন প্রতিযোগী তো ল্যাংচার সাইজ দেখেই প্রতিযোগিতা থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। শিলনোড়ার নোড়াটা থাকে, যা দিয়ে বেটে মশলা গুঁড়ো করা হয়, সেই বৃহৎ নোড়ার মতো মোটা এবং অনেকটা লম্বা। এমন ল্যাংচা দেখা যায় বীরভূমে জয়দেবের মেলায় কেন্দুবিল্বতে। সেই ল্যাংচা বত্রিশটা খেয়ে তেত্রিশটা তুললেন কিন্তু মুখে দেওয়ার আগেই তিনি ঢলে পড়লেন ল্যাংচার থালায়। বত্রিশখানা ল্যাংচা খেয়ে প্রথম হলেন বটে কিন্তু প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটা সোনার ল্যাংচা তিনি আর হাতে করে নিতে পারলেন না। সেই মেজমামার সঙ্গে আপনার দেখা হল, ভাবা যায়!’
ভাগনে চুপ করে একটু ভাবলেন। বললেন, 'আপনারা থাকেন কোথায়?’
আমি বললাম, ‘আপাতত দিনকয়েক বন্ধুর বাড়িতে আছি। আমার স্থায়ী বাসস্থান কলকাতার কাছে লেকটাউনে।'
ভাগনে বললেন, ‘ঠিক আছে। তাতেই হবে।'
আমরা চলে এলাম। শেষ দুপুরে গাড়ি করে অনেক পুলিশসহ একজন অফিসার এলেন। আমরা তো অবাক। সেই অফিসার দু'জন পুলিশ নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের নাম জিজ্ঞেস করলেন। আমাদের নাম জানার পর বললেন, 'আমার সঙ্গে থানায় চলুন।'
এবার আমি একটু কর্কশ গলায় বললেন, ‘থানায় যাব মানে? আমাদের থানায় নিয়ে যাওয়ার কোনও বৈধ কারণ কি আপনার আছে?’
পুলিশ অফিসার বললেন, ‘সবসময় তা হলে থাকে না। আপনারা কিন্তু খুব বিপদের মধ্যে আছেন আমাদের ভুল বুঝবেন না। আমরা আপনাদের সাহায্য করতে চাই।'
আমি আর বন্ধু দু’জনেই দু’জনের দিকে তাকালাম। তারপর থানায় গিয়ে যা শুনলাম, তা অতি ভয়ংকর। ট্রেনের কামরায় যে নেপাল ঘোষের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল, সে আসলে নেপাল ঘোষ নয়। নেপাল ঘোষের যমজ ভাই কিষান ঘোষ। ছেলেবেলা থেকেই কুসঙ্গে মিশে ছেলেটা বিগড়ে গিয়েছিল। একসময় বাবা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। সে তখন একে-ওকে ধরে এদেশ থেকে ছোট ছোট ছেলেদের বাইরে পাঠাবার কাজ করে। সমস্ত ব্যাপারটাই করে নেপাল ঘোষের নামে। সত্যিকারের নেপাল ল্যাংচা খাওয়ার আসরে মারা যাওয়ার পর কিছুদিন গা-ঢাকা দেয়। পরে অন্য দলের হয়ে পুরাতত্ত্বের জিনিসপত্র চুরি করে বিদেশে পাচার করার ব্যাবসা শুরু করে। বর্ধমান থেকে সোনার বিষ্ণুমূর্তি, কাটোয়া থেকে অষ্টধাতুর শিবলিঙ্গ এবং আরও অনেক জিনিস সে পাচার করেছে। এবার কাটোয়ায় এসেছে এখানকার চৌধুরীবাড়িতে, বাড়ি তো নয়, প্রাসাদ। সেই প্রাসাদ থেকে নবরত্নে শোভিত দুর্গামূর্তি চুরি করার জন্য। দুর্গার শরীরে যা অলংকার আছে, অসুরের গায়েও কম কিছু নেই। দুর্গার গোটা শরীরটাই রুপো আর সোনায় তৈরি। এ ছাড়া হিরে, মুক্তো, প্ল্যাটিনাম প্রভৃতি যা যা আছে বাজারে তার দাম কয়েক কোটি টাকা। চৌধুরীবাড়ির পিছনে একটি খাল আছে। ওই খাল দিয়ে ডিঙি করে সহজেই পালানো যায়। কিন্তু মুশকিল হয়েছে দুর্গামূর্তি তো ছোট্টটি নয়। তাকে পকেটে করে নিয়ে যাওয়া যাবে না। দশ হাতের অস্ত্রগুলোও খোলা যাবে না।
আমি বললাম, ‘এই ব্যাপারে আমরা কী করতে পারি?’
পুলিশ অফিসার বললেন, ‘সাহায্য। কিষান ঘোষ জানে, আপনারা তার আসল পরিচয় জানেন না। আপনি আজ রাতে চৌধুরীবাড়ির অতিথি হবেন। সব আমরা ঠিক করে রাখব। কিষান জানবে আপনি রাতে চৌধুরীবাড়ির দুর্গা মন্দিরে থাকবেন। সে অবশ্যই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। মধ্যরাতের আরতি দেখবার অছিলায় সে আপনার সঙ্গে থেকে যেতে চাইবে। আপনি আপত্তি করবেন না। ওর অন্য লোকগুলো থাকবে ডিঙিতে। আমার ফোর্স ওখানে গা-ঢাকা দিয়ে থাকবে। আপাতত এই পর্যন্ত। পরের ব্যাপার অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।'

আমি বললাম, ‘নকল নেপাল ঘোষ অর্থাৎ কিষানকে কোথায় পাব?
পুলিশ অফিসার বললেন, ‘সেও একটু পরে আপনাকে খুঁজবে। আপনি এখন থেকেই খোঁজ শুরু করুন।'
থানা থেকে বেরিয়ে আসার সময় বন্ধু বলল, ‘মনে হচ্ছে লোকটা চৌধুরীবাড়ির আশপাশেই থাকবে। আমরা ওই অঞ্চলেই ঘোরাফেরা করি।'
বন্ধুর কথামতো চৌধুরীবাড়ির প্রধান ফটকের কাছে এসে দেখা গেল একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। মন্দিরের মাথায় জ্বলছে আলো। চায়ের দোকানের ভিতরটা ভাল করে দেখবার জন্য ঢোকার পরই যে ঘোলাটে অন্ধকার ছিল তার ভিতর থেকে কেউ বলে উঠল, ‘কাউকে খুঁজছেন নাকি?’
আমরা দু'জনেই তাকালাম। অস্পষ্ট আলোয় আমার চিনতে অসুবিধে হল না। আমি বললাম, আপনাকেই তো খুঁজছি। বিশেষ কথা আছে।'
এবার কিষান ঘোষ উঠে সামনে এল। দু'জনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এনি প্রবলেম?’
আমি বললাম, ‘তেমন প্রবলেম কিছু নয়। এসব জায়গায় তো নতুন আসা। বন্ধুর মুখে শুনেছি এখানকার নবরত্ন দুর্গামূর্তি নাকি দারুণ দেখতে। মধ্যরাতের আরতিও দেখবার মতো।'
কিষান ঘোষ বলল, ‘সবই সত্যি। কিন্তু দেখবার অনুমতি পাওয়াই তো কঠিন।'
বন্ধুটি বলল, ‘অনুমতির ব্যবস্থা আমি করব। কিন্তু আপনাকে কোথায় পাব?’
কিষান বলল, ‘আপনারা রাত আটটার মধ্যে এলে এই চায়ের দোকানে পাবেন। দোকান বন্ধ থাকবে। কিন্তু ঝাঁপে পরপর তিনটে টোকা দিলে আমি বেরিয়ে আসব। ঠিক আটটায়।’
আমরা এই খবরটা থানায় অফিসারকে জানিয়েছিলাম। ভাগ্যিস জানিয়েছিলাম! না হলে তিনটে ঢোকার পর দুটি গুলিতে দু’জনে খতম হয়ে যেতাম। আমরা ঠিক আটটায় পরপর তিনটে টোকা দেওয়ার পর দরজা খুলে কিষান ঘোষ এবং আরও কয়েকজন আমাদের দিকে গুলি চালাবার আগেই আমাদের পিছন থেকে পুলিশ গুলি চালাল। গুলি খেয়ে কিষান পালাবার চেষ্টা করছিল। পুলিশের আর-একটা গুলি তার ডান পায়ে লাগতেই কিষান হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। অন্যরা গুলি খেয়ে কাতরাচ্ছে।
ঠিক সেই সময় চৌধুরীবাড়ির দুর্গামন্দিরে শঙ্খ বাজছে!
.
আনন্দমেলা, ২০ মে ২০০৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন