দুলেন্দ্র ভৌমিক

বেলমুড়ি গ্রামের সোনাদা এক অতি বিখ্যাত মানুষ। আসল নাম সনাতন মুখার্জি। কিন্তু সে নাম গ্রামের লোকজন কবেই ভুলে গেছে। পুরনো যে ক’জন এখনও বেঁচে আছেন, তাঁদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা চট করে স্মরণে আনতে পারেন না। একটু ভেবে বলতে হয়। অন্য লোকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, সোনাদার পিতৃদেব স্বর্গত গোরাচাঁদ মুখার্জিও ছেলেকে আমৃত্যু ডেকে এসেছেন ‘সোনাদা’ বলে। সোনা নামের সঙ্গে ‘দাদা’র ‘দা’-টা এমনভাবে জুড়ে গিয়েছিল যে, ওটাকে আর কেউ আলাদা ভাবতে পারত না। সেইজন্য সকলে মনে করে সোনার সঙ্গে ‘দা’ অক্ষরটা কেউ যেন ফেভিকল দিয়ে নামকরণের সময় লাগিয়ে দিয়েছিল। সেই যে লাগল আর তাকে ছাড়ানো গেল না। সোনাদার পিতৃদেব গোরাবাবুও বাড়িতে এসে স্ত্রীকে মাঝেমধ্যে বলতেন, ‘কী গো, সোনাদা ফেরেনি?'
স্ত্রীও নির্বিকার মুখে উত্তর দিতেন, ‘সোনাদা তো টিম নিয়ে এঁড়েদা গেছে।’ এখন তো সোনাদার আসল নাম কী তাই নিয়ে অল্পবয়সিদের মধ্যে রীতিমতো কুইজ হয়।
সোনাদা বাল্যকাল থেকেই ক্রীড়াপ্রেমিক। ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন ছাড়াও ডাংগুলি, হা-ডু-ডু সবরকম খেলার প্রতিই তার নজর। সোনাদার ক্লাবের নাম জাগরণ সংঘ। এই ক্লাবের ফুটবল বা ক্রিকেট দল নিয়ে সোনাদা নানা জায়গায় খেলতে যায়। নিজে খেলে না, কিন্তু অন্যদের খেলার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়। জাগরণ সংঘের একজন সদস্যের নাম বিষ্টু। সারাদিন ক্লাবেই থাকে। ওর ভাই তুষ্টু দুপুর আর রাতের খাবার টিফিন ক্যারিয়ারে করে ক্লাবে দিয়ে যায়। বিষ্টুর বাবা মাঝেমধ্যেই ভুলে যান যে, বিষ্টু বলে তাঁর একটা ছেলে আছে। বিষ্টু আবার সোনাদার বেজায় ভক্ত। বিষ্টুর দোষ বলতে একটা। সময় পেলেই ঘুমিয়ে পড়ে। গাড়ির ড্রাইভারদের মে কেউ কেউ থাকে না, গাড়ি পার্ক করিয়েই সিটে ঘুমিয়ে পড়ে। বিষ্টুও সেইরকম। সোনাদার আবার এটা পছন্দ নয়। বিষ্টুকে ডেকে মাঝেমধ্যে বলে, ‘বিষ্টু, ক্লাবটার নাম জাগরণ সংঘ। অথচ এই ক্লাবের এক সদস্য সবসময় যদি ক্লাবের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে, তা হলে লোকে কী ভাববে বল তো!’
বিষ্টু চটপট জবাব দেয়, ‘কিছু ভারবে না। ঘুমন্ত লোককে ক্ষমা করাই ধর্ম। কে সাধ করে অধর্ম করবে?’
ভাল ছেলে হিসেবে সোনাদার খ্যাতি যেমন পাড়ায়, তেমনই অফিসে। সোনাদা অফিসে যায়। এক গ্লাস জল খায়, তার একটু পরে এক কাপ চা। তারপর আর তাকে অফিসে দেখা যায় না। কিন্তু এ নিয়ে কারও অভিযোগ নেই। কেউ বা অভিযোগ করবে? অফিসের কাজ না করলেও অফিসের সকলের কাজ সোনাদা করে বেড়ায়। কার ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে হবে, কার রেশন কার্ড করাতে হবে, কার হাসপাতালে বেডের ব্যবস্থা করতে হবে, এরকম নানা কাজে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয় বলে অফিসের কাজটা আর করা হয়ে ওঠে না। সোনাদার সহকর্মীদের বাড়ির লোকরা তাকে চাক্ষুষ না করলেও তার নাম এবং গুণের কথা জানে।
কয়েকদিন আগে সোনাদার ব্রাঞ্চে বদলি হয়ে এলেন গদাপদ শিকদার। বেশ রাশভারী মানুষ। দিনতিনেকের মধ্যে রটে গেল, শিকদারসাহেব খুব কড়া ধাতের মানুষ। সোনাদার শূন্য চেয়ারটার দিকে আঙুল তুলে শিকদারসাহেব একদিন প্রশ্ন করলেন, “‘মি. অধিকারী, এই চেয়ারে কে বসেন?’
অধিকারী সোনাদার ‘বস’। তিনি বললেন, ‘সোনাদা।’
শিকদার বললেন, ‘আপনার কেমন দাদা?
অধিকারী উত্তর দিলেন, 'আপনি যা ভাবছেন তা নয়। এই অফিসের ছোট-বড় সকলে ওকে সোনাদা বলে ডাকে।'
শিকদার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘তা আপনাদের সোনাদা কোথায়? তাকে তো সিটে দেখি না। কোথায় থাকেন উনি?’
কেউ কোনও উত্তর দেয় না। সকলে জানে, সোনাদা এই অফিসেরই কারও না কারও কাজে বেরিয়েছে। কোনও উত্তর না পেয়ে শিকদার বললেন, 'আপনাদের সোনাদা এলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবেন।'
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে হনহন করে ঘরে ঢুকল সোনাদা। অধিকারী বললেন, ‘সোনাদা, স্যার আপনাকে খুঁজছেন।'
সোনাদা শিকদারের দিকে তাকিয়ে পালটা প্রশ্ন করল, ‘আশ্চর্য, নিজের চেম্বার ছেড়ে কোথায় থাকেন স্যার? নিজের মোবাইল থেকে থ্রি টাইম ফোন করলাম। রিং হল, আপনি ধরলেন না।'
শিকদার এবার গম্ভীর গলায় বললেন, 'আমি আপনাকে খুঁজছি। আপনি সিটে ছিলেন না কেন?’
অফিসের সবাই চুপ। কিন্তু সোনাদা চুপ করার লোক নয়। সে বলল, ‘আমিও তো আপনাকে খুঁজছি। আপনিও তো সিটে ছিলেন না।'
শিকদার একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘আমি সিটে থাকি বা না থাকি সেটা দেখার দায়িত্ব বা অধিকার আপনার নেই। কোথায় ছিলেন আপনি? অফিসের বাইরে কী করছিলেন?’
সোনাদা শান্ত গলায় জবাব দিল, 'স্যার, আপনি এতবড় ডিপার্টমেন্টের কর্তা। লাইক আওয়ার ফাদার। আমরা আপনার সন্তান। লাইক সন। সন কি ফাদারের খোঁজ করতে পারে না। তার জন্য অধিকার দরকার হয়।'
শিকদার গলাটা একটু নামিয়ে বললেন, 'আমার কাছে খবর আছে অফিসে আপনাকে খুঁজে পাওয়া যায় না।'
সোনাদা উত্তর দিল, ‘এসব একদম বাজে কথা। আমি তো স্যার লাদেন নই যে, আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অফিসের বাইরে আমি কী কাজ করছিলাম, সেটা কি শুনবেন?’
শিকদার মুখটা বিকৃত করে বললেন, ‘কী এমন কাজ করছিলেন? নিশ্চয়ই কোথাও বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন?'
সোনাদা যথোচিত বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিল, 'স্যার, বারো বছর বয়সের পর থেকে আর আড্ডা দেওয়ার অবকাশ পাইনি। অফিসে এসে জল খেয়ে বেরোতে হয়েছিল। আপনাকে বদলি করার যিনি কর্তা, হেড অফিসের গোস্বামীবাবুর বাবার অপারেশন হবে। রক্ত চাই। যে সে রক্ত চলবে না, ও নেগেটিভ। তার ব্যবস্থা করে অফিসের কাছে আসতেই অন্য কাজে ফেঁসে গেলাম। ওই কাজটি না করলে এতক্ষণে আপনাকে লালবাজারে দৌড়তে হত?’
শিকদারসাহেবের ভ্রূ কুঁচকে গেল। শিকদারসাহেব সোনাদার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কাজটা কী?
সোনাদা নিজের টেবিলের ওপর থেকে জলের বোতল নিয়ে জল খেল। তারপর বলল, ‘আপনার ড্রাইভার নো পার্কিং জোনে গাড়ি রেখেছিল। গাড়িতে ড্রাইভার নেই। প্রথমে কাঁটা লাগিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল। ঘণ্টা দেড়েক পরে এসে যখন হুক লাগিয়ে গাড়ি তুলছিল তখন আমি এসে গেছি। ওদের থামিয়ে লালবাজারে ফোন ঝাড়লাম। লালবাজার থেকে ফোনেই অর্ডার এল। আপনার গাড়ি খালাস করে, ড্রাইভারকে খুঁজে ঠিক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে পরে এলাম।'
শিকদার অবাক গলায় বললেন, ‘এতসব কাণ্ড, অথচ আমি কিছুই জানি না?'
সোনাদা বলল, ‘জানবেন কেমন করে। আপনার ড্রাইভারই তো জানে না। সে তো কোন একটা গলিতে বসে তাস খেলছিল। হুকে ঝুলিয়ে ওই গাড়ি নিয়ে গেলে কী অবস্থায় ফেরত পেতেন তা জানেন?
শিকদার এবার বললেন, ‘থ্যাংক ইউ সোনাদা।’
সোনাদা বলল, ‘না, না স্যার, ওসবের দরকার নেই। আপনারা সবাই মিলে অফিসের ভেতরটা দেখুন, আমি যেমন বাইরেটা দেখছি তেমনই দেখে যাব। আপনারা অফিসকে সার্ভ করুন, আমি একা আপনাদের সার্ভ করব। এই সার্ভিসের তো কোনও ডিউটি আওয়ার্স নেই। গোস্বামী স্যারের বাবার অপারেশনের দিন বেলা এগারোটা থেকে হোল নাইট আমার ডিউটি নার্সিংহোমে।'
শিকদারের চোখে-মুখে এখন আর রাগ নেই। তিনি চলে যাচ্ছিলেন। সোনাদা ডাকল, ‘স্যার, আপনার ড্রাইভারকে আমি যথেষ্ট বকাঝকা করেছি। আপনি আর বেশি কিছু বলবেন না। একদিনে বেশি বকলে লোকটা যদি রাগ করে কাজ ছেড়ে দেয় তা হলে তো আমাকেই ড্রাইভার খুঁজতে বেরুতে হবে।
শিকদারবাবু একটু হেসে চলে গেলেন। অফিসের অন্য সহকর্মীরা বলে উঠল, ‘সোনাদা, তুমি জিনিয়াস। শিকদারবাবু আর তোমাকে খুঁজবে না।'
সোনাদা চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘খুঁজবে রে, খুঁজবে। সদ্য সদ্য মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। সামনে ক্রিকেট খেলা। আমি ছাড়া ওঁর মেয়ে-জামাইকে ক্লাব হাউসের টিকিট দেবে কে?’

এই হল সোনাদার অফিসের চিত্র। পাড়ায় এবং জাগরণ সংঘের চিত্রটা আবার অন্যরকম। বীরপাড়ার শিল্ড ফাইনাল খেলতে যাওয়ার দিন সকালে সোনাদা একটা পাঁঠা কিনে এনে জাগরণ সংঘের বারান্দার থামের সঙ্গে বাঁধতে বাঁধতে বলল, ‘শিল্ড ক্লাবে এলে পাঁঠা বলি হবে। শিল্ড না এলে তোদের পিঠে লাঠি পড়বে।'
কিন্তু সব খেলায় তো জাগরণ সংঘ জিততে পারত না। না জিতলেই বিষম কাণ্ড। সোনাদা একগাছা দড়ি নিয়ে ক্লাবের বারান্দার হুকে বেঁধে বলত, ‘গুড বাই। তোরা আমাকে বাঁচতে দিলি না, তোরা থাক। তোদের সোনাদা গলায় দড়ি দিয়ে আজই চলে যাচ্ছে। ওপরে গিয়ে গোষ্ঠকাকুকে জিজ্ঞেস করব, ফুটবলের গৌরব আর নেই। কাকু, তোমার বাঙালিরা এখন কিলো কিলো চাউ আর রোল খায়। গোল করতে পারে না। এই পুওর ফুটবল দেখার চেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করা অনেক পুণ্যের।'
খেলোয়াড়রা গিয়ে সোনাদার হাতে-পায়ে ধরে। সোনাদা বলে, ‘প্রতিজ্ঞা কর। পরশুর ম্যাচটা জিতে আসবি। যদি হারিস তা হলে আমাকে চিরতরে হারাবি।'
এই হই-হাঙ্গামার কিছু পরে বিষ্টু জেগে ওঠে। ওপরে ফাঁসির দড়ি ঝুলছে দেখে বিষ্টু কেঁদে উঠে বলে, ‘আমাদের সোনাদা গন। কিন্তু বডি কোথায়? শেষযাত্রায় একবার দেখতে পেলুম না!’
কেউ একজন বলে, ‘বডি বাড়িতে।’
দড়ি থেকে গামছা নিয়ে বিষ্টু ছোটে সোনাদার বাড়িতে। বাড়ির দরজায় গিয়ে ধাক্কা দিতে থাকে। সোনাদার বাবা-মা দু'জনে বেরিয়ে আসে। বিষ্টু গামছা দিয়ে চোখের জল মুছে বলে, ‘জেঠু, বডি কোথায়?’
সোনাদার বাবা গোরাবাবু অবাক গলায় বলেন, ‘বডি! কীসের বডি?’
বিষ্টু চোখ মুছে আবার বলে, ‘আমার গুরু সোনাদার বডি। বড়ি নিয়ে মিছিল বার করব। বডিটা দিন।'
‘বডিটা দিন’ বলে বিষ্টু এমনভাবে হাত পাতে, যেন একটা আধুলি ভিক্ষে চাইছে। গোরাবাবু রেগে গিয়ে বলেন, ‘তুমি কি গাঁজা খাও নাকি? সোনাদা তো খেতে বসেছে।'
বিষ্টু একটু লজ্জিতভাবে বলেন, ‘গুরুজনদের সামনে মিথ্যে বলতে নেই। দু’-চার ছিলিম টেনেছিলুম সন্ধেবেলা। এতক্ষণ তো তার অ্যাকশন থাকার কথা নয়। ক্লাব ঘরে ফাঁসির দড়িটা ঝুলছে অথচ বডি নেই। কে যেন বলল, বড়ি বাড়ি গেছে, তাই বাড়িতে এলুম।'
এইসময় সোনাদা উঠে এসে বলে, ‘বিষ্টু, তুই না আমার ভাবশিষ্য। তুই এত বোকা কেন? যা, ক্লাবে গিয়ে দড়িটা খুলে রেখে দে। ওটা কাজে লাগবে।'
বিষ্টু চলে যাওয়ার পর সোনাদার মা বলেন, “হ্যাঁ রে বাবা সোনাদা, তুই কি চিরকাল এইরকম থাকবি! বদলাবি না?’
সোনাদা মাকে একহাতে জড়িয়ে ঘরে যেতে যেতে বলে, ‘কেন ছেলেকে অভিশাপ দিচ্ছ? আমি কি গিরগিটি যে, ঘন ঘন বদলাব। বদলাবার লোক অনেক আছে। তারা স্বার্থের জন্য বদলে বদলে যায়। আমি তা পারব না।'
সোনাদা প্রায় সাত ফুটের কাছাকাছি লম্বা। রোগা লিকলিকে শরীর। মাথার চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা। গায়ের রং ঈষৎ তামাটে। সোনাদা যখন মাঠের মধ্য দিয়ে হেঁটে যায় তখন মনে হয় কেউ যেন রনপায়ে হাঁটছে।
সোনাদার বোনের বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামেই। এককালে এসব জায়গাকে গ্রামই বলা হত। এখন গ্রাম বললে এখানকার মানুষ রাগ করে। সোনাদার বোনের নাম রূপা। বড় আদরের বোন। কিন্তু বিয়ের পর এই তিন বছরে একদিনও বোনের বাড়ি যায়নি। অভিমান বা রাগটা বিয়ের আগে থেকে। বোনের বরের নাম গৌতম। সোনাদা ভাবতেই পারে না, কোনও ছেলে ছেলেবেলাতেও ফুটবল খেলেনি, ক্রিকেট খেলেনি। পড়াশোনা করে খালি বড় বড় পরীক্ষায় পাশ দিয়ে বড় চাকরি করছে। সোনার চোখে গৌতম হচ্ছে বিটকেল ছেলে। বোনটার জন্য মন কেমন করে। তাই কখনও কখনও সাইকেল করে বোনের বাড়ির দরজায় গিয়ে বেল বাজায়। জোরে জোরে ডাকে, ‘রূপা, রূপা।’
রূপা বেরিয়ে এসে রাস্তায় কথা বলে। রূপা জানে, দাদা তার বাড়ির ভেতরে ঢুকবে না। একদিন রূপার শ্বশুর বেরিয়ে এসে বলেছিলেন, ‘তোমার অভিমানটা আমার কাছে দুর্বোধ্য। এখনও অভিমান আছে? এখনও বাড়ির ভেতর ঢুকতে মানা?’
সোনাদা চোখ তুলে রূপার শ্বশুরমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘মেসোমশাই, যে মন্দিরে বিগ্রহ নেই, সেই মন্দিরে পুজো হয় না। সন্ধ্যাবাতিও হয়তো পড়ে না। যে বাড়িতে খেলাধুলো ব্রাত্য, সেই বাড়িতে সোনাদা যায় না।'
সোনাদা নিজেকেও ‘সোনাদা’ বলে। বোনের শ্বশুরমশাই ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘সোনাদা, তোমায় ঠিক বুঝতে পারি না।'
সোনাদা উত্তর দেয়, ‘আমি গোদারের ফিল্ম নই। আমাকে বুঝতে কষ্ট হবে কেন?’ এহেন সোনাদা আজ বেজায় খুশি। ভগ্নিপতি এসে সোনাকে বলেছে, ‘সোনাদা, নিজে যা পারিনি, আমার ছেলে যেন তা পারে। তাই আমার ছেলের মুখেভাতের দিন থেকেই তোমার কেয়ারে থাকবে। ওকে তুমি খেলা শেখাও।'
মুখেভাতের দিন সোনাদা ভাগ্নের ডাকনাম রাখলেন, ‘সামাদ’। আত্মীয়রা বলল, ‘সে কী, বামুনের ঘরের ছেলের অমন নাম কেন?’
সোনাদা সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ও ফুটবলার হবে। ফুটবলারের কোনও জাত-ধর্ম নেই। আমি ওইসব ব্যাপার মানি না। ওর ধর্ম খেলা, ওর গোত্র ফুটবল, ওর জাত ভারতীয়। মানুষ হলে তার আর জাতের দরকার হয় না।’
সামাদের পাঁচ বছর বয়স থেকে তাকে নিয়ে লড়ে যাচ্ছে সোনাদা। সোনাদার মা বলেন, ‘সোনাদা, ছেলেটাকে কি তুই মেরে ফেলতে চাস! কাজ নেই ফুটবল খেলে। ওকে ওর বাবা-মা’র কাছে দিয়ে আয়।'
রূপার স্বামী সোনাদাকে বলে, ‘যে যাই বলুক, ফুটবলার না হওয়ার আগে ওকে আমি
ঘরে নেব না। ও ওর সোনামামার কাছে থাক। রূপা তো রোজই আসছে। থেকেও যাচ্ছে।' সোনাদার জেদটা দৃঢ় হতে থাকে। পাঁচ বছরের সামাদের মধ্যে আগামী দিনের এক ফুটবলারের ছাপ খুঁজে বেড়ায়। ভাগ্নেকে গল্প শোনায়। পুসকাস, পেলে, বেকেনবাওয়ার, মারাদোনা, শৈলেন মান্না, চুনি গোস্বামী, প্রদীপ ব্যানার্জিদের। কখনও বা মেওয়ালাল, আমেদ খান, আপ্পারাও, বেঙ্কটেশ, থঙ্গরাজ আর সনৎ শেঠদের। জাগরণ সংঘের মাঠে রোজ বিকেলে ভাগ্নেকে নিয়ে মেতে থাকে সোনাদা। ক্লাবের ছেলেরা যখন খেলে ভাগ্নেকে সেই খেলা দেখায়।
দিন এগিয়ে চলে। সোনাদার বয়স বাড়তে থাকে। সামাদও একটু একটু করে বড় হয়ে এগারো বছরে পা দেয়। ক্লাবে তখন অনেক নতুন ছেলে খেলছে। জাগরণ সংঘের ক্যাপ্টেন শৈবাল এসে সোনাদাকে বলে, ‘সোনাদা, সামাদ কিন্তু আমাদের সঙ্গে প্র্যাকটিস করে। ওকে এবার চান্স দাও। আজ তো বেলডাঙা ইউনাইটেডের সঙ্গে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ। আজ ওকে নামাও।'
সোনাদার মাথার চুলে পাক ধরেছে। সোনাদা সেই চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘না। আজ নয়। তোদের সঙ্গে তো অনেক খেলেছে। আমি ভাবছি আগামী শনিবার ফ্রেন্ডস ইউনিয়নের বিপক্ষে ওকে নামাব।'
শৈবালকে চিন্তিত দেখাল। ও এমনিতে কলকাতার প্রথম ডিভিশনে খেলে। জাগরণ সংঘের অনেকেই আগে কলকাতার প্রথম ডিভিশনে খেলেছে, এখনও কয়েকজন খেলে। সবই সোনাদার চেষ্টায়। তবুও আমতা আমতা করে বলল, ‘সোনাদা, ওটা আমাদের সেমিফাইনাল খেলা। জিতলে ফাইনালে যাব। তুমি এতটা রিস্ক নেবে?’
সোনাদা আগের মতোই নিজের । আঙুল দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে বলল, ‘প্রথমে নামাব। পারফরম্যান্স খারাপ থাকলে তুলে নিয়ে কার্তিককে নামাব।'
শৈবাল চুপ করে গেল। সোনাদার মুখের ওপর কথা বলার সাহস তার নেই। সে এটাও জানে, সোনাদার ডিসিশনে বড়রকমের ভুল বিশেষ একটা হয় না। শৈবাল উঠতে যাচ্ছিল। সোনাদা বলল, ‘আজকের খেলার পর তোর সঙ্গে কথা আছে।'
শৈবাল বলল, ‘কী কথা সোনাদা।’
সোনাদা একটু কাশলেন। কাশি থামার পর বললেন, ‘খেলাটা তো ফ্রেন্ডস ইউনিয়নের মাঠে হবে। চল কাল গিয়ে একবার মাঠটা দেখে আসি।'
সোনাদা খেলার শেষে ভাগ্নে সামাদকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। সোনাদার মা বললেন, ‘ছেলেটা তো সারাদিন খেলা নিয়ে থাকে। পড়াশোনা করবে কখন? অতবড় বিদ্বান বাপের ছেলে কি মূর্খ হয়ে থাকবে? তোর আর তোর ভাগ্নের প্র্যাকটিসের জ্বালায় ঘরের কাচের জানালা একটাও আস্ত নেই। আজই ঘোষগিন্নি নালিশ করে গেলেন, তাঁদের জানালার কাচও নাকি ভেঙেছে।'
সোনাদা বোতল থেকে জল খেয়ে নিয়ে বলে, ‘ওসব কথায় কান দিয়ো না। দরকার হয় ওদের জানালা সারিয়ে দেওয়ার পয়সা দেব।'
মা অভিমানের গলায় বলেন, 'প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে মায়ের অসুখ বলে টাকা তুলে ফুটবলে দিলি। অফিসের কো-অপারেটিভের থেকেও ধার করেছিস। রিটায়ার করলে তোর চলবে কেমন করে?
সোনাদা ম্লান হেসে জবাব দেয়, ‘কিছু ভেবো না। ঠিক চলবে। সরকারের কাছে মিথ্যে বলিনি। বলেছি মায়ের অসুখ। ফুটবল যে আমার কাছে তোমারই মতো মা। শেষ বয়সে কাউকে আমাকে দেখতে হবে না। গ্রামগঞ্জের ফুটবলকে দেখার জন্য যদি হাজার হাজার মানুষ থাকে, তা হলেই আমি ভাল থাকব।'
রাত্রে ভাগ্নেকে নিয়ে ঘুমোয় সোনাদা। সামাদও তাকে মামা বলে না। সেও বলে ‘সোনাদা’। সোনাদা বলে, ‘আগামী শনিবার তোকে একটা বড় ম্যাচে নামাব। মনে রাখবি আমি থাকব তোর বিপক্ষের গোলপোস্টের জালের পেছনে। তোর পা থেকে বলটা যখন গোলে ঢুকে জালটাকে নাড়িয়ে দেবে তখনই জানবি আমি খুশি হয়ে আনন্দে নাচছি।'
সামাদ তার মামা, যদিও সকলের মতো সেও ডাকে সোনাদা, তার বুকের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে বলে, ‘যদি গোল করতে না পারি?’
সোনাদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘তা হলে আমার পরাজয়।'
সামাদ চুপ করে থাকে। তার বুকের মধ্যে একটা আবেগ তোলপাড় করতে থাকে। সে বালিশে মুখ গুঁজে দিয়ে টের পায়, তার চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে।
সামাদ এখন কুড়ি বছরের ডাকাবুকো যুবক। সোনাদার বয়স পঞ্চান্ন ছাড়াচ্ছে। কলকাতার প্রথম ডিভিশনে সামাদের অনেক নাম। তাকে নিয়ে বিভিন্ন দলে টানাটানি, দরাদরি। কিন্তু সোনাদার কথা ছাড়া সামাদ কিছুই করে না। সামাদ প্রথম ডিভিশনে খেলার পরেই মা-বাবার কাছে থাকে। মাঠে সোনাদার সঙ্গে দেখা হয়। সোনাদা সামাদকে বলে, ‘টাকার দরকার তা মানি, কিন্তু টাকার কাছে খেলাটাকে বেচে দিস না। আমাদের দেশের ফুটবলাররা আজও অবহেলিত। ক্লাবগুলো ট্রফি চায়, ফুটবল চায় না। দল হারলেই কোচ বদল। কিন্তু কর্তারা বদল হয় না। ক'টা ক্লাবের কর্তা ক’দিন ফুটবলে পা ছুঁইয়েছে। যতদিন খেলবি, ফুটবলের জন্য খেলবি৷'
সোনাদা এরপর আক্ষেপের গলায় বলে, ‘আমিও একসময় খেলবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কিছু হয়নি। আমার এই ল্যাকপেকে শরীরে ফুটবল হয় না। হয়ওনি। মনে রাখিস, মাঠ তোর কাছে মন্দির। কলকাতার মাঠে, তার ঘাসে ঘাসে যাঁদের পায়ের স্পর্শ আছে, তাঁরা আমার কাছে ভগবান।'
জাতীয় দলে সিলেকশনের খবরটা সোনাদা আগেই জেনে গিয়েছিল। কাগজে বেরোবার আগের দিন নীলমণি এসে বলল, ‘সোনাদা, তোমার ভাগ্নে সামাদ জাতীয় দলের প্রথম লিস্টে আছে।'
সোনাদার গায়ে তখন প্রবল জ্বর। সেই সঙ্গে কাশি। কাশির দমক কমার পর সোনাদা বলল, ‘আমি জানতাম। তুমি বলার আগেও জেনেছি। ওকে বাদ দিয়ে জাতীয় দল হবে কেমন করে। কিন্তু দুঃখটা কী জানো, এই বাড়িটাতে আমি একা। বাবা তো কবেই চলে গেছেন। বছর দেড়েক আগে মা-ও চলে গেলেন। ভাগনেটাকে নিয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম। বড় অদ্ভুত লাগে, সামাদ আমাকে খবরটা দিল না। বোনও কোনও ফোন করেনি। কতটুকু পথ, বড়জোর চার কিলোমিটার।'
সোনাদার চোখটা ছলছল করছিল। নীলমণি বলল, ‘দুঃখ কোরো না সোনাদা। এগুলোকে প্রাপ্য বলে ভাবতে শেখো।'
সোনাদা চোখের জলটা বাঁ হাত দিয়ে মুছে বলল, ‘আমার কোনও দুঃখ নেই। অভিমানও নেই। সামাদ আমাকে খবর দেয়নি তো কী হয়েছে। আমি কাল যাব ওর কাছে। ওকে একটু কোচ করতে হবে না? দেশের মান রাখতে হবে না?’
নীলমণি সোনাদার হাতটা ধরে বলে, ‘সোনাদা, তোমার গায়ে অনেক জ্বর। ক্লাবের ছেলেরা ডাক্তার নিয়ে আসছে। তোমাকে সামাদের কাছে যেতে হবে না। আমি গিয়ে খবর দেব।'
দরজার কড়া নাড়ার আওয়াজে সোনাদা বলল, ‘নীলমণি দেখ তো কে? মনে হচ্ছে আমার ভাগনে সামাদ।'
নীলমণি দরজা খুলে দিল। ঘরে ঢুকল গভীর কালো রঙের একজন মহিলা। তার সঙ্গে একটি ছেলে। ছেলেটির বয়স পনেরো কিংবা ষোলো। সোনাদা ওদের দিকে তাকাল। কৃষ্ণবর্ণা মহিলাটি বলল, ‘বাবু, তুই আমারে চিনতে পারছিস? আমি বরখা। লুকের বাড়ির কাজ করি। তুয়াদের বাড়িতেও কাম করেছি।'
সোনাদা ঘাড় নেড়ে বলল, 'অনেকদিন আগের কথা। তবে আমার মনে পড়েছে।' এবার বরখা ছেলেটাকে ঠেলা দিয়ে বলল, ‘যা না কেনে, সুনাদাকে পেন্নাম কর।'
ছেলেটা প্রণাম করার পর বরখা বলল, ‘তুই আমার ছেলেটাকে ফুটবল খেলা শিখাইবি? বড় সাধ করে তুর কাছে নিয়ে এলাম।'
সোনাদা ছেলেটার দিকে একদৃষ্টে তাকাল। ছেলেটার পায়ের দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘তোমাকে আমার চেনা চেনা লাগছে। কী নাম তোমার?’
ছেলেটা বলল, ‘সার, আমার নাম গোপাল মাণ্ডি।'
সোনাদা শরীরের অসুখ অগ্রাহ্য করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'আজ থেকে তিন বছর আগে
কালীঘাট মাঠে তুমি জাগরণ সংঘকে দুর্দান্ত হেড করে একটা গোল দিয়েছিলে না!’
গোপাল মাথা নাড়ল। সোনাদার শরীর টলছিল। সে গোপালের দিকে এগিয়ে যেতে গিয়ে টাল খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। গোপাল মাণ্ডি তাকে দু’ হাতে ধরে ফেলে বিছানায় বসিয়ে দিল। সোনাদা নীলমণির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওর অ্যান্টিসিপেশন এবং পজিশন জ্ঞান চমৎকার। অনিবার্য পতনের হাত থেকে ঠিক আমাকে ধরে ফেলেছে।’ এরপর বরখার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাল থেকে গোপাল মাণ্ডি আমার কাছে থাকবে। নীলমণি আমি বোধহয় আবার একটা ছেলে পেলাম।'
অনেক পরে সোনাদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর নীলমণি মনে মনে ভাবল, সোনাদাকে অনেকেই পাগল ভাবে। কিন্তু এই দেশে এইরকম হাজারটা পাগল থাকলে বাংলার ফুটবলকে কেউ রুখতে পারত না। নীলমণি তার মানসচক্ষে যেন দেখতে পাচ্ছে, ভোরের নরম ঘাসের ওপর দিয়ে সোনাদা বল নিয়ে ছুটছে, তার সঙ্গে গোপাল মাণ্ডি।
.
আনন্দমেলা, মার্চ ২০০২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন