দুলেন্দ্র ভৌমিক

গ্রামের নাম গঙ্গাপুর হলেও এই গ্রামের সঙ্গে গঙ্গার কোনও সম্পর্ক নেই। সম্ভবত কোনওকালে ছিলও না। শোনা যায় একদা এখানে একটা হাজামজা খাল ছিল। তার সম্পর্ক ছিল জলঙ্গী নদীর সঙ্গে। সেও অনেককাল আগের কথা। সেই হাজামজা খাল চিরতরে বুজে গিয়ে কিছুকাল কাঁচা রাস্তার মতো পড়েছিল। বছর কয়েক আগে সেই জমিতে পিচঢালা পাকা রাস্তা হয়েছে। বিজলিবাতির পোস্ট বসেছে। তবে ওই পোস্টগুলোর যে কী কাজ তা বোঝা যায় না। প্রায়ই বাতি জ্বলে না। জ্বললেও বেশিক্ষণ থাকে না। সন্ধে থেকে বাতি জ্বালল না তো জ্বলল না। কিন্তু জ্বলে আধঘণ্টা পর নিবে গেলে তখন যেন অন্ধকারটা বড্ড ঘন মনে হয়। এই ব্যবস্থা চলছে অনেকদিন থেকে। বোজা খালের ওপর দিয়ে যে পাকা রাস্তা গিয়েছে বল্লভপুর পর্যন্ত তার অবস্থাও খারাপ। বাসে উঠলে বাসখানা রাস্তার ওপর দিয়ে এমন ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বল্লভপুর পর্যন্ত যায় যে, এ পর্যন্ত বেসরকারি হিসেবে এগারোজন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মারা গিয়েছেন। অথচ বল্লভপুর না গিয়েও তো পারা যায় না। ওটা যে একটা বড় গ্রাম, তাই শুধু নয়। বল্লভপুর হল ঠাকুর রাধাবল্লভের মন্দির। প্রতি বছর মাঘী পূর্ণিমায় আর দোলে এখানে মেলা হয়। খুব ঘটা করে পুজো, উৎসব তারপর নানাবিধ খেলার আসর। যেমন, দড়ি টানাটানি, চোখ বন্ধ করে মাটির হাঁড়ি ফাটানো আর দৌড় প্রতিযোগিতা, কুস্তির প্রতিযোগিতা।
বল্লভপুর গ্রামে নানাবিধ সমস্যা। বিডিও, এসডিপিও, দারোগা, পঞ্চায়েতপ্রধান, কাউকে বলেও কিছু হয়নি। তবে একেবারেই যে হয়নি এমন অপবাদ দেওয়া যাবে না। গত বছর মাঘী পূর্ণিমার আগেই পাকা রাস্তার শুরু আর শেষ দু’জায়গাতেই পুলিশ চৌকির মতো দু’দিকে দু’জন ডাক্তার বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাসে ওঠার আগে আবার ওদিকে বাস থেকে নামার পর তাদের হৃদযন্ত্র পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। দরকারে ওষুধও দেওয়া হবে। গত বছরই এই ব্যবস্থার সুফল টের পাওয়া গিয়েছে। পঞ্চায়েত প্রধানকেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে অক্সিজেন দিতে হয়েছিল। কিন্তু সেও বড় সহজ কাজ নয়। গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অক্সিজেন সিলিন্ডার বলে যে বস্তুটি রাখা ছিল, ডাক্তার বললেন, ‘এর মধ্যে কোনও অক্সিজেন নেই। দিন দশেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। নতুন সিলিন্ডার এখনও আসেনি।'
কেউ একজন বললেন, ‘আপনি যদি জানেনই অক্সিজেন নেই, তা হলে লাগালেন কেন?’ ডাক্তার বললেন, 'আমরা জানলেও রোগী নিজে তো জানে না। সে তো ভাবছে সে ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে। এই বিশ্বাস থেকেই সেরে উঠবে। যদিও আমি লোক পাঠিয়েছি রাধাবল্লভের মন্দিরে। যদি কিছুক্ষণের জন্য একটা সিলিন্ডার ধার পাওয়া যায়।
সকলেই অবাক হয়ে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রাধাবল্লভের মন্দিরে! রাধাবল্লভকেও কি অক্সিজেন দিতে হয়?
ডাক্তার বললেন, ‘না না, মন্দিরের রাধাবল্লভের নয়। ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যান গণেশবাবু আর প্রধান পুরোহিত গোবিন্দরাম চক্রবর্তী। অনেক বছর ধরে পুজো করছেন। পেরে ওঠেন না, কিন্তু কী একটা সংস্কারবশে ওঁরা পুরোহিতকে ছাড়তে চান না। আর পুরোহিতমশাই মুখে যাই বলুন তাঁরও লোভ আছে। নিত্যপুজো ছাড়া বিশেষ দিনের পুজোতে মোটা প্রাপ্তি ঘটে। তাই অক্সিজেনের নল রেডি করে উনি পুজোয় বসেন।'
এবার অন্য একজন প্রশ্ন করলেন, ‘যদি ওই মন্দির থেকেও না পাওয়া যায়?’
ডাক্তার খুব সহজ ভঙ্গিতে বললেন, ‘অত ঘাবড়াচ্ছেন কেন? শূন্য গ্যাস সিলিন্ডারের ফাঁকা গ্যাস থেকেই কত লোক ভাল হয়ে গেল। শুধু বিশ্বাস। বিশ্বাসের জোরে অনেক কিছু হয়।'
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এক কর্মী এসে বললেন, 'স্যার, একটা কথা বলব?’
ডাক্তার বললেন, ‘বলুন।'
সেই কর্মীটি বললেন, 'আমাদের কিচেনে গ্যাসের একটা সিলিন্ডার আজই দিয়ে গিয়েছে। রান্নার গ্যাস দিয়ে কি ম্যানেজ করা যাবে?’
ডাক্তারবাবু এমনভাবে তাকালেন যে, স্বাস্থ্যকর্মীটি দ্রুত ঘর থেকে চলে যেতে বাধ্য হলেন। ওই বাস রাস্তার উন্নতি না হলেও এই উপলক্ষে রাস্তার দু’ প্রান্তে যে ডাক্তার বসার ব্যাবসা চালু হয়েছিল সেটা কালক্রমে বাসযাত্রীদের দাবিতে অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রান্তেই ওষুধের দোকান আর সেইসব দোকানে অক্সিজেন রাখার ব্যবস্থা চালু হয়ে গিয়েছে। অতএব, গঙ্গাপুর ডাক্তার আর ওষুধের দোকানের দিক থেকে রীতিমতো সমৃদ্ধ। কিন্তু গণ্ডগোলটা অন্য জায়গায়। প্রায় বছরখানেক হল, গঙ্গাপুরে চোরের খুব উপদ্রব বেড়েছে। শুধু রাতে নয়, দিনেও চোরের উৎপাত। সব যেন অদ্ভুত রকমের চোর। বিনয়বাবুর বিধবা পিসিমা দুপুরে খেতে বসেছেন। রান্নাঘরে উঁচু কাঠের পিঁড়িতে বসে খেতে খেতে একটু আচার আনবেন বলে উঠলেন। এঁটো হাতে তো আচারের বয়াম ধরা যায় না! তাই হাত ধুয়ে বয়াম থেকে আচার নিয়ে ঘরে এসে দেখলেন, ভাতের থালা, কাঠের পিঁড়ি, এমনকী কাঁসার গেলাস, সব নিয়ে চলে গিয়েছে। গেলাসের জলটুকু শুধু ঢেলে দিয়ে গিয়েছে। গেলাস আর কাঁসার থালার সঙ্গে আধখাওয়া ভাতের থালাটাও নিয়ে গেল। এমনধারা চোরের কথা বাবার জন্মেও শুনিনি।
তার পরদিনই খবর পাওয়া গেল, দারোগাসাহেবের বউয়ের ভিজে কাপড় শুকোচ্ছিল সামনের উঠোনে। একটু পরে বাইরে বেরিয়ে দেখেন, তারের ওপর থেকে শাড়ি উধাও। শুধু কি ছিঁচকে চোর, পাল্লা দিয়ে ডাকাতিও বাড়ছে। পুলিশ কিছু করতে পারছে না। কাউকে ধরা তো দূরের কথা, কাউকে সন্দেহ পর্যন্ত করা যাচ্ছে না। কারণ, রাস্তা দিয়ে অন্ধকারে গঙ্গাপুরে এসে আবার ফিরে যাওয়ার সাধ্য কারও নেই। বাসে করে তো নয়ই, রাতের অন্ধকারে হেঁটে যাওয়াও নিরাপদ নয়। বিশেষ করে নতুন লোকের পক্ষে। এ যেন পাঙ্খাবাড়ি দিয়ে রাত্তিরে হেঁটে দার্জিলিং যাওয়া। অতএব এইসব ব্যাপারে দিস্তা দিস্তা কাগজ নষ্ট হচ্ছে শুধু রিপোর্ট লিখে সদরে পাঠাতে। সদরের কর্তারা সাত মাস ধরে বিষয়টা খতিয়ে দেখে চলেছেন। ইতিমধ্যে দু'টি দু’ রকমের ডাকাতি হল। একজনের নাম অবনী সাহা। অন্যজনের নাম নিমাই সাঁপুই। তাঁর আবার চালের আড়ত। অবনীবাবু কালী মায়ের ভক্ত, তাঁর একটা সোনার দোকান আছে, সঙ্গে বন্ধকি কারবার। সেদিন বিকেলবেলা বেশ ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। তখন রাত বারোটা হবে। অবনীবাবু ঘরের সিন্দুকের চাবি বালিশের নীচে রেখে ঘুমোচ্ছিলেন। গভীর রাতে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি স্পষ্ট শুনলেন, কে যেন তাঁকে ডাকছে। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। পরে কানখাড়া করে শুনলেন, কে যেন ডাকছে, ‘অবনী, অবনী ঘুমিয়েছিস? অবনী...।'
অবনীবাবু ভেবে পেলেন না এত রাত্রে নারী কণ্ঠে কে তাঁকে ডাকছে। দরজার সামনে এসেও দরজা খুললেন না। আবার সেই নারীকণ্ঠ বলল, ‘ওরে নির্বোধ, দরজা খুলে দেখ কে তোর দরজায় দাঁড়িয়ে। তোর ডাক যে আমার কানে পৌঁছেছে। আমি দরজা বন্ধ থাকলেও তোর ঘরে বায়ুরূপ ধরে প্রবেশ করতে পারি। সেক্ষেত্রে তোর চরম সর্বনাশ।
অবনী সাহা দরজা খুলে দিয়েই দেখলেন, তাঁর দরজায় স্বয়ং মা কালী। অবনীবাবু চমকিত, শিহরিত, পুলকিত এবং শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে গদগদ। শুধু বললেন, ‘মা, মা গো। এতদিনে তোমার কৃপা পেলাম।'

মা বললেন, ‘তোকে কৃপা করতেই তো আসা। তুই দেখ, আমি তোকে কতটা কৃপা করি।’ মা বারান্দার দিকে তাকিয়ে সস্নেহে ডাকলেন, ‘বাবা বামা, রামাকে নিয়ে ঘরে আয়। বাইরে কেন?’
মা ঘরে ঢোকার সময় একটা চন্দনের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। এবার ধূপের গন্ধ পাওয়া গেল। মা বামা আর রামার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমার ভক্ত অবনীর প্রসাদ দাও। আমার হাতে দাও।'
দু’জনেই দুটো করে দরবেশ জাতীয় মিষ্টি মা’র হাতে দিল। মা বললেন, ‘তোর বাড়িতে আর কে কে আছে?
অবনীবাবু ভক্তিভরে বললেন, ‘আপাতত আমি আর আমার স্ত্রী। দুই ছেলে গিয়েছে কলকাতা। ওই ঘরটা খালি থাকবে বলে আমার স্ত্রী ছেলেদের ঘরেই শুয়েছে।' মা আদেশ দিলেন, ‘তোর স্ত্রীকে ডাক। এত নিদ্ৰা ভাল নয়।'
অবনীবাবু ডাকতে যাওয়ার আগেই স্ত্রী এসে ড়য়েছিলেন স্বামীর ঘরের দরজায়। ঘরের মধ্যে মা কালীকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। বিস্ময় আর মাত্রাতিরিক্ত আনন্দে প্রণাম করার জন্য জন্টি রোডসের মতো মায়ের পায়ের ওপর ‘মা গো’ বলে এমন একটা ড্রাইভ দিলেন যে, মা কালী আগেই অনুমান করে খাটের একটা ডান্ডা ধরে রেখেছিলেন।
মা বললেন, ‘অত ঝাঁপ দিয়ে ভক্তি দেখাতে হবে না। তোদের আমি কৃপা করতে এসেছি, এই নে অমৃত প্রসাদ। মুখে দিয়েই গিলে ফেলবি। ভক্তিভরে দু’জনে গ্রহণ কর।'
অবনীবাবু আর তাঁর স্ত্রী মায়ের দেওয়া প্রসাদ কপালে ঠেকিয়ে মা’র নির্দেশমতো মুখে দিয়েই গিলে ফেললেন। দু'জনেই প্রসাদের মাহাত্ম্য টের পেতে সবে শুরু করেছেন। দু’জনের কেউ আর কিছু বুঝতেই পারলেন না। শুধু মনে হল, মা’র সঙ্গে বড়সড় চেহারার যে শিষ্যটি ছিল, যার নাম বামা, সে শুধু বলল, ‘চাবি বের কর।’
অবনীবাবু ওদের চাবি দিয়ে শুতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় বামা পিছনে এমন একটা লাথি কষাল যে, অবনীবাবু হুমড়ি খেয়ে বিছানায় পড়েই ঘুমিয়ে পড়লেন।
ঘুম ভাঙল পরের দিন বেলা বারোটার পর। ঘুম ভাঙল বটে কিন্তু চোখ থেকে ঘুমের জড়তা কাটল না। দু’জনে অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী বিছানার ওপর বসে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ‘মা গো’ বলেই আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। বেলা তিনটে নাগাদ তাঁর দু’ ছেলে কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরে এসে ঘরের দরজা খোলা এবং বাবা-মা তখনও ঘুমোচ্ছেন দেখে অবাক হয়ে গেল। ঘরে ঢুকে রীতিমতো ধাক্কা দিয়ে বাবা আর মায়ের ঘুম ভাঙাতে হল। ছেলেরা লক্ষ করল, বাবা-মা দু'জনের মধ্যেই কেমন যেন বিহ্বল ভাব। ঘরের সিন্দুক খোলা। বাক্স, ট্রাঙ্ক সব ফাকা। খোলা সিন্দুকের মধ্যে একটা ছোট্ট টিকটিকি ছিল, এইমাত্র চলে গেল। দু’ ছেলে কেউই কিছু বুঝতে না পেরে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল।
অবনীবাবুর দু’ ছেলের ভাল নাম অরুণ আর বরুণ। তবে দু’জনের জব্বর দুটো ডাকনাম আছে। ওই নামেই ওদের গঙ্গাপুর থেকে রাধাবল্লভের মন্দির পর্যন্ত সকলেই চেনে। বড় ছেলে অরুণের ডাক নাম ‘দলাই’ আর ছোট ছেলে বরুণের নাম ‘মলাই’। এই দলাই মলাই দু’জনেই ক্ষিপ্ত হয়ে বাবা-মাকে বলল, ‘একটা রাত বাড়িতে ছিলাম না। তার মধ্যেই এত কাণ্ড। দু’জনে এমন ঘুমোলে যে, ঘরের সিন্দুকের জিনিসপত্র ধুয়ে-পুছে নিয়ে গেল। ও ঘরে ট্রাঙ্ক, বাক্স সব ক’টার তালা ভেঙে সব নিয়ে গিয়েছে। তোমরা কেউ টের পেলে না? এত ঘুম তোমাদের হল কিসে? কেউ বাড়ি জ্বালিয়ে দিলেও তো টের পেতে না।'
এইসময় ফাঁকা সিন্দুকের দিকে তাকিয়ে অবনীবাবু হঠাৎ কেঁদে উঠে বললেন, ‘এখন আমার কী হবে? মায়ের কৃপা যে এমন কঠোর তা কি জানতাম?’
এইসময় অবনীবাবুর স্ত্রী হঠাৎ বললেন, ‘হ্যাঁ গো, মা কি বুটজুতো পরেন?
অবনীবাবু বললেন, ‘কেন? এ কথা বলছ কেন?’
অবনীবাবুর স্ত্রী বললেন, ‘আমি যখন মায়ের রাঙা চরণে হুমড়ি খেয়ে প্রণাম করছি, তখন হাত দিয়ে চরণের স্পর্শ পেলাম না। মনে হল, ফিতে বাঁধা বুটজুতো। মানুষের চামড়ার স্পর্শ আর জুতোর স্পর্শ কি একরকম হয়?’
অবনীবাবু কিছু একটা মনে করবার চেষ্টা করতে করতে বললেন, ‘এখন আমারও মনে পড়ছে, ওই বামা নামে মা’র শিষ্যটিই তার গোদা পায়ে বুটজুতো সমেত লাথি মেরেছে। লাথি তো নয় মারাদোনার ফ্রি-কিক। এক লাথিতেই হুমড়ি খেয়ে পড়লুম। টানা পড়ে রইলুম বারো ঘণ্টা। মিনিটখানেক বিরতি দিয়ে তিনটে পর্যন্ত ঘুম। ছেলেরা না ডাকলে বাকি জীবনটা হয়তো ঘুমিয়েই কাটাতুম।'
নিমাই সাঁপুইয়ের চালের আড়তে ডাকাতিটা অবনী সাহার বাড়িতে ডাকাতির তুলনায় তেমন কিছু নয়। গঙ্গাপুরে আগে অনেকরকম ক্রীড়াচর্চা ছিল। ইদানীং তাও নেই। বাৎসরিক ক্রীড়া উৎসব একে একে সব উঠে গেল। সবার আগে উঠল চোখে কাপড় বেঁধে হাঁড়ি ফাটানোর খেলা। নিমাই সাঁপুইয়ের দুই ছেলে বরাবর হাঁড়ি ফাটানোতে প্রথম হয়। কোনওবার এ, নয়তো কোনওবার ও। একবার মোটা লাঠি নিয়ে একজন মোটামুটি ঠিকই এসেছিল। হঠাৎ মাঠের মধ্যে শৃঙ্খলারক্ষাকারী পুলিশদের মধ্যে এক কনস্টেবল শৃঙ্খলারক্ষায় দায় মেটাতে মাঠে ঢুকে হাঁড়ির দিকে এগোতেই আর-একজনের লাঠি গিয়ে পড়ল পুলিশের মাথায়। হাঁড়ি ফাটল না বটে কিন্তু পুলিশের মাথা ফাটল। এই বিষয় নিয়ে তর্ক, বিচার, আইনি বিতর্ক ও ব্যাখ্যা চলল প্রায় ছ' মাস। তারপর থেকে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ‘হাঁড়ি ফাটানো’ আইটেমটি বাদ গেল। এইভাবেই একদিন বাদ হয়ে গেল মহিলাদের ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’। অভিযোগ, বিডিওসাহেবের বউ নাকি দারোগাসাহেবের বউকে অবৈধভাবে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছেন। একদিকে বিডিও, অন্যদিকে দারোগা। জোর কাজিয়া। সদর থেকে এসডিও এসে ঝগড়া সামাল দিলেন। সেই থেকে মিউজিক্যাল চেয়ার বন্ধ। এইভাবেই এক-একটা ঘটনা বা দুর্ঘটনার জেরে ক্রীড়াসূচি থেকে এক-একটা করে আইটেম বাদ যেতে যেতে এখন টিকে আছে দৌড়, দড়ি টানাটানি আর কুস্তি। এই তিনটেতে কোনও গণ্ডগোল এখনও পর্যন্ত হয়নি। গ্রামের প্রবীণরা যে বলেন, ‘গঙ্গাপুরের সুদিন চলে গিয়ে দুর্দিন এসেছে।’ আসবে না-ই বা কেন। যেদিন রাধাবল্লভের মন্দির থেকে তাঁর ভোগের থালা চুরি গেল, সেদিন থেকেই শনির কুদৃষ্টি পড়েছে এই গ্রামের ওপর। তাই এত অঘটন আর ঝগড়া। কোনওবার না ঘটলেও এবার কুস্তিতেও অঘটন ঘটে গেল। ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’ বন্ধ হয়েছিল নিমাই সাঁপুইয়ের ভাগনে গদাইয়ের জন্য। সে সেজেছিল দাঁতের ডাক্তার। দাঁত তোলার একটা চকচকে সাঁড়াশি হাতে নিয়ে মাথার চুল রং দিয়ে সাদা করে, গায়ে অ্যাপ্রন চাপিয়েছিল, ঠিক ডাক্তারদের মতো। দিব্যি মানিয়েছিল। কিন্তু মানালে কী হবে! অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণ করতে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন সদর থেকে মাননীয় ডি এম সাহেব ডি এল খান্ডেওয়ালা। গদাই দাঁত তোলার যন্ত্র নিয়ে ডাক্তারের মতো খান্ডেওয়ালার কাছে গিয়ে বলল, 'স্যার, ওপেন ইয়োর মাউথ।'
খান্ডেওয়ালা ভাবলেন, এটাও বুঝি পার্ট অফ দ্য স্পোর্টস। তিনি হাঁ করা মাত্র গদাই তাঁর মুখের মধ্যে কী একটা জিনিস ঢুকিয়ে দিতেই মুখটা আরও বড় হয়ে হাঁ হয়ে গেল। চেষ্টা করেও হাঁ-মুখ বন্ধ করা যাচ্ছে না। গদাই তারই মধ্যে সাঁড়াশি দিয়ে একখানা দাঁত কড়মড়িয়ে তুলে ফেলতেই খান্ডেওয়ালার মুখ দিলে গলগলিয়ে রক্ত পড়তে লাগল। গদাই ডাক্তারের ভঙ্গিতে বলল, ‘ডায়াবেটিস ছিল নাকি? কুইক রিমুভ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, আই মিন হেল্থ সেন্টার।'
কাঁচা দাঁত তুলে ফেলার জন্য গদাইয়ের ওপর ডি এম সাহেব বেজায় চটেছিলেন, কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থা আর ব্যবস্থা দেখে তার চেয়েও বেশি চটে গিয়েছিলেন। শোনা যায়, গদাই সেদিনই গঙ্গাপুর ছেড়েছিল। আর ফিরেছিল অনেকদিন পর খান্ডেওয়ালার বদলি হওয়ার খবর পেয়ে। তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান ডাক্তারের চাকরিটি গিয়েছিল। সেই থেকে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ আইটেমটাও বাদ।
কুস্তিটা চলছিল সোহাপট্টির রামুর সঙ্গে গোয়ালপাড়ার বলবীরের। হঠাৎ একজন সিপাই বলল, ‘স্যার, ওই হচ্ছে বলবীর। থানার লকআপ থেকে ভেগে গিয়েছিল।' দারোগাসাহেব বললেন, ‘ধরো।’
সিপাই এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়াতেই বলবীর সিপাইয়ের হাত ধরে মারল টান। সেই টানে সিপাই পড়ল কুস্তির আসরে। দু'জনেই তাকে মারছে আর সিপাই ‘স্যার, স্যার’ বলে চেঁচাচ্ছে।
দারোগাসাহেব তাঁর পিস্তল বের করবার জন্য কোমরের চামড়ার খাপের দিকে হাত বাড়াতেই চিতাবাঘের মতো ক্ষিপ্র গতিতে সোহাপট্টির রামু দারোগাসাহেবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কাদামাটিতে কুস্তি, তার ওপর বালি। যে থামাতে যাচ্ছে তাকেই কুস্তির আখড়ায় টেনে নিচ্ছে ওরা। কুস্তি প্রতিযোগিতা অচিরেই গণকুস্তির আখড়া হয়ে গেল। ধুতি পরা যাঁদের, টেনে কুস্তির আখড়ায় ফেলে কুস্তি করতে বাধ্য করা হয়েছে, তাঁদের অবস্থা শোচনীয়। ধুতি, পাঞ্জাবি কোনও পোশাকই যথাস্থানে নেই। সর্বাঙ্গে কাদা মাখামাখি হয়ে যাওয়ায় কাউকেই আর চেনার উপায়ও নেই। কে দারোগা আর কে বলবীর সেটা বোঝে কার সাধ্যি! ওই জাপটাজাপটির মধ্যে কে একজন বলছে, ‘আমার চশমা কোথায়?’ কেউ বলছে, ‘আমার ব্যাগ কোন ব্যাটা নিয়েছে! দারোগাসাহেব, অ্যারেস্ট হিম।' মিনিট পনেরো এই কাণ্ড চলার পর সকলেই যে যার মতো বাড়ি চলে গেল বটে, কিন্তু ক্রীড়াসূচি থেকে কুস্তি আইটেমটিও চিরতরে বাদ পড়ল। কেউ একজন বললেন, ‘ছেলে-ছোকরারা যে যেমন খেলাধুলো করে তাই করুক। বাৎসরিক ক্রীড়া উৎসবের আর দরকার নেই!’
গঙ্গাপুরের একদিকে যখন এইসব কাণ্ড তখন বল্লভপুরে নিত্যানন্দ ঘোষালদের বাড়িতে আর বল্লভপুরের খড়গাছি গ্রামে তখন মনখারাপ করা অবস্থা। খড়গাছি বরাবরই খুব শান্ত গ্রাম। নিত্যানন্দ ঘোষালের আট বছরের ছেলে বিলুর গলায় ক্যানসার। কথা বলা বারণ। অথচ এই ছেলেই কী সুন্দর গান করত! দিব্যি হাসিখুশি ছেলে, কিন্তু কেন যে এমন হল কে জানে! সন্ধ্যারতির সময় রোজ একবার করে বিলু মন্দিরে আসে। গান গায় না, কারণ, পারে না। মনে মনে শুধু আওড়ায়। সকলেরই মায়া হয়, কিন্তু কেউ কিছু করতে পারে না। অপারেশনের টাকা না হয় গ্রামের মাতব্বররা চেয়েচিন্তে জোগাড় করে দিতে পারেন। কিন্তু ডাক্তার তো কোনও পাকা কথা দেননি। বলেছেন, ‘ভাল হয়ে উঠবে এমন গ্যারান্টি দিতে পারছি না। তবে টাকা খরচ করে একটা চান্স নেওয়া যেতে পারে।'
বিলু তো চিরকাল বাঁচবে না। একদিন সকলকেই ছেড়ে যাবে। কিন্তু যাওয়ার আগে যে কষ্টটা বিলু পাচ্ছে তা বাড়ির কেউ সহ্য করতে পারছেন না। নিজের টাকা থাকলে একবার অপারেশন করে দেখতে পারতেন, কিন্তু এত টাকা তিনি পাবেন কোথায়? বউয়ের যে সামান্য গয়না ছিল তা তো বিলুর চিকিৎসার জন্য আগেই খরচ হয়ে গিয়েছে। শুধু চিন্তা, চিন্তা ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। যেন অন্ধকার সমুদ্রে তিনি একা একা পার খোঁজার চেষ্টা করছেন।
বিলুকে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, কথা বলতে গেলে তার কষ্ট হয়। ক’দিন থেকে স্লেটে লিখে সে বাবাকে দেখিয়েছে, ‘বাবা, আমি অনেক রাতে বাঁশির আওয়াজ শুনি। মন্দিরের দিক থেকে আওয়াজটা আসে। তুমি একদিন আমায় মন্দিরে নিয়ে যাবে? যখন রাধাবল্লভের মন্দির থেকে অনেকবার বাঁশি বাজবে।'
নিত্যানন্দ বললেন, ‘নিয়ে যাব।’ মুখে বললেও তিনি মনে মনে বললেন, ‘এও কি সম্ভব! রাত আটটায় মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়। তারপর নৈশ আহার, তারপর শয়ন দেওয়া হয়। সকালে প্রথমে মিছরি আর মাখন। দুপুরে পঞ্চদশ ব্যঞ্জনে আহার। বিকেলে লুচি, মাখাছানা আর মালপোয়া। কে কোথায় বাঁশি বাজাচ্ছে। রাধাবল্লভের কী দায় পড়েছে মাঝ রাত্তিরে বাঁশি বাজাবার।’
কিন্তু বিলু এসব বোঝে না। একদিন কষ্ট করে হলেও কথা বলল। গলার কষ্টে দু’ চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এল। বিলুর এই কষ্ট, চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল নিত্যানন্দ আর তাঁর স্ত্রীর চোখকেও ভিজিয়ে দিল, ‘ছেলেটা এত করে বলছে, ওকে একদিন নিয়ে যাও না। তোমার-আমার কাছে মিথ্যে হলেও ওর ভাবনায় তো সত্যি। ওর কাছে এই সত্যিটুকুর মূল্য আছে।'
একদিন মাঝরাত্তিরে বিলু তার বাবাকে ধাক্কা দিয়ে জাগাল। ধাক্কা দেওয়ার কোনও দরকার ছিল না। নিত্যানন্দ জেগেই ছিলেন। তিনি বললেন, 'আজ আমিও শুনতে পাচ্ছি। চল, আজ যাব।'
নিত্যানন্দ তৈরি হয়ে বিলুকে নিয়ে যখন বাইরে এলেন, তখন ঘন অন্ধকার। মেঘে ঢাকা আকাশ, এমন আঁধার রাত বড় একটা দেখা যায় না। বাঁশিটা বেজেই চলেছে। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি শুনে শুধু রাধা নন, রাধার সখীরাও বিভোর হয়ে যেতেন। কেমন' সে বাঁশি? এখন যা বাজছে তার মতো কি? একটা আচ্ছন্নের মতো ঘোরের মধ্য দিয়ে ওঁরা দু’জন মন্দিরের সামনে এলেন। বন্ধ দরজার ভিতর থেকে বাঁশিটা বাজছে। ওঁরা দু’জন দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই মোটা দুটো পাল্লা আপনিই খুলে গেল। একসময় বাঁশি থেমে গেল। নিত্যানন্দ ঠাকুরের বেদির ওপর মাথা রেখে মনে মনে বললেন, ‘হে ঠাকুর, আমাকে তুমি ছাড়া কেউ সংকট থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। ঠাকুর, তুমি তো দীনের বান্ধব। আমাকে, আমার এই সন্তানকে কৃপা করো।'
রোজ রাতেই বাঁশি ওঁদের ডাকে। নিত্যানন্দ আর বিলু রোজই যান। ঠাকুরের বেদিতে মাথা ঠেকিয়ে একই প্রার্থনা করেন আর বলেন, ‘অপারেশন করার টাকা নেই। তুমিই তো পারো ছেলেটার রোগমুক্তি ঘটাতে।'
রাধাবল্লভের থালা চুরি যাওয়ার পর থেকে মন্দিরে পাহারা বসানো হয়েছিল। রাত এগারোটার পর সে জেগে থাকতে পারত না। ঘুমিয়ে পড়ত। ইতিমধ্যে মন্দির চাতালের পিতলের ঘণ্টা চুরি হয়ে গেল। জোর তোলপাড়। মন্দিরের পাহারাদার ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যানকে বলল, ‘খড়গাছি গ্রামের নিত্যানন্দ ঘোষালকে চেনেন তো, যার ছেলেটার ক্যানসার হয়েছে। সাধে কী হয়েছে, পাপে হয়েছে।'
চেয়ারম্যান গণেশবাবু একটা ধমক দিয়ে বললেন, ‘চুপ করো, নিত্যানন্দ অতি সজ্জন লোক। তিনি মরছেন তাঁর ছেলেকে নিয়ে। তিনি আসবেন মন্দিরের ঘণ্টা চুরি করতে?’ পাহারাদার বলল, ‘আমি নিজে দেখেছি স্যার।'
গণেশবাবু ধমকের সুরে বললেন, ‘কী দেখেছ? ঘণ্টা চুরি করতে?’
পাহারাদার বলল, ‘না, ঘণ্টা নিতে দেখিনি। কিন্তু অনেক রাতে মন্দিরের দরজার সামনে দেখেছি। সঙ্গে ছেলেটাও। এখন তো তিনদিন ধরে রোজ দেখছি।'
গণেশবাবু বললেন, ‘বেশ, আজ আমি দেখব। তুমি কথাটা গোপন রাখবে।' গণেশবাবু চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, 'তুমি এখন যেতে পার।'
গণেশবাবু কথাটা শুধু ছেলেকে বললেন, ছেলে সৌম্য বলল, ‘গভীর রাতের ব্যাপার, সঙ্গে রিভলভারটা নিয়ে নেব?’
গণেশবাবু একটু ভেবে বললেন, ‘দেবস্থানে ওসব অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। পাহারাদার তো থাকবেই।'
রাত বারোটার পর গণেশবাবু বেরোলেন। যেতে যেতে বললেন, ‘পাহারাদারের কথা যদি ঠিক হয় তবে তো খুব ভাববার কথা। রোজ গভীর রাতে মন্দিরে আসার দরকার কী? নিত্যানন্দকে তো সজ্জন বলেই জানতাম।'
সৌম্য বলল, ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট বলে একটা কথা আছে। নিত্যানন্দবাবুর তাই হয়েছে।' আরও একটু যাওয়ার পর বাঁশির শব্দ কানে এল। গণেশবাবু বললেন, ‘এত রাতে বাঁশি বাজায় কে?’
সৌম্য বাবার কথার উত্তর দিল না। মন্দিরের কাছাকাছি আসতেই বোঝা গেল, বাঁশির শব্দটা মন্দিরের ভিতর থেকেই আসছে। ওঁরা পায়ের জুতো খুলে মন্দিরের চাতালে উঠলেন। পাহারাদার চাতালের এক কোণে বসে ঘুমোচ্ছে। সৌম্য ডাকতে যাচ্ছিল। গণেশবাবু বাধা দিলেন। চাতাল পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই রাধাবল্লভের দরজা আস্তে আস্তে খুলে গেল। মন্দিরের ভিতরে কোনও আলো না জ্বললেও মন্দিরের ভিতরটা অপরূপ আলোয় ভরে উঠল। বাঁশি থামল। রাধাবল্লভ নিজের শরীর থেকে একটি একটি করে গয়না খুলে বিলুকে পরিয়ে দিচ্ছেন। বিলুর মুখে হাসি কিন্তু চোখ ছাপিয়ে নামছে জলের ধারা। রাধাবল্লভ তাঁর উত্তরীয় দিয়ে বিলুর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে যেন শঙ্খধ্বনির মতো প্রসারিত, অগ্রজের মতো দয়ালু স্বরে বললেন, ‘দুঃখের মধ্য দিয়েই আমি তোদের কাছে আসি। কষ্ট দিয়েই আমাকে পেতে হয়। চোখের জলেই তো মোহমুক্তি।'
রাধাবল্লভ বিলুর গলায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবার মন্দিরের বেদিতে উঠে গেলেন। যেন দৈববাণীর মতো ঘরের মধ্যে ঘুরতে লাগল, ‘আমি মানুষের জন্য ধরায় আসি। কিন্তু মানুষ কই?’
ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। দরজা আপনিই খুলে গেল। মন্দিরের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতেই গণেশবাবুকে দেখে নিত্যানন্দ বললেন, ‘স্যার, আপনি?’
গণেশবাবু নিত্যানন্দর হাত দু’টি জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘চোর ধরতে এসে দেবদর্শন হল। তুমি ধন্য নিত্যানন্দ। ধন্য তোমার ছেলে। দেবতার স্পর্শ যে পেয়েছে তাকে মৃত্যু ছুঁতে পারে না। আজ থেকে বিলুর নাম হল ‘মৃত্যুঞ্জয়’!’
.
আনন্দমেলা, ২ নভেম্বর ২০০৭
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন