পাখির ডাক

দুলেন্দ্র ভৌমিক

সেই একটা কথা আছে না, বিপদ কখনও জানান দিয়ে আসে না। কিন্তু হঠাৎ করে যখন এসে পড়ে তখন সেই বিপদের ঠ্যালা সামলাতে প্রাণ যায় আর কি। স্কুলের ছুটি পড়ার পর মন্টু, যার ভাল নাম সায়ন্তন, সে এসেছিল জেঠুর বাড়িতে কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে। জেঠুদের ফ্ল্যাটবাড়ি কলকাতায়। সায়ন্তনদের বাড়ি কল্যাণীতে। সায়ন্তনের বাবা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন এবং সেই সুবাদেই ওখানে একতলা একখানি বাড়ি করেছেন বছর দুয়েক আগে। একতলা হলেও বাড়িটা বেশ বড়সড়। সামনে-পিছনে অনেকটা জমি থাকায় বাড়িতে নানারকম গাছগাছালি। আর তাতে সকাল হলেই নানারঙের পাখিদের কিচিরমিচির আর দিনভর থেকে থেকে ওদের আড্ডা।

কলকাতায় জেঠুদের তিনতলার ফ্ল্যাটের সামনে কোনও গাছ নেই। ফ্ল্যাটের সীমানার মধ্যে খানকয়েক বাহারি গাছ আর মাথাছাঁটা দুটো দেবদারু গাছ। তবুও জেঠুর বাড়িতে আসতে সায়ন্তনের ভাল লাগে। সকালবেলা জেঠু আর জ্যাঠতুতো দাদা অফিসে চলে যান। বাড়িতে জেঠিমা একা। একা থাকতে বোধহয় জেঠিমার এখন আর খারাপ লাগে না। জেঠিমাকে মন্টু ‘বড়মা' বলে ডাকে। সায়ন্তন পোশাকি নাম, তাই সবাই মন্টু বলেই ওকে ডাকে। দুপুরের খাওয়া মিটে গেলে বড়মা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েন। দুপুরে ঘুমনো তাঁর নাকি অনেকদিনের অভ্যেস। দুপুরে শুতে যাওয়ার আগে বড়মা বলে যান, ‘মন্টু ঘরের বাইরে যাবি না। নীচে নামবি না, ছাদেও যাবি না। কলকাতায় এখন ছেলেধরার উৎপাত।'

জেঠুর এই ফ্ল্যাটবাড়িটা ছ'তলা। এই কমপ্লেক্সের মধ্যে এরকম আরও দুটো ছ'তলা বাড়ি আছে। তিনখানা বাড়ির খোপে খোপে অনেক লোক। কত লোক তা মন্টু জানে না।

বড়মা’র সব বারণ মন্টু শোনে, শুধু ছাদে যাওয়ার ব্যাপারটা ছাড়া। ছ'তলার ছাদ থেকে কলকাতাকে দেখতে তার খুব ভাল লাগে। কাছেই রেল স্টেশন। সেখান দিয়ে অনবরত ট্রেন যাতায়াত করে। কোনও কোনও ট্রেন এই স্টেশনটার গা থেকে ফুঁ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে গড়গড় করে চলে যায়, থামে না। অনেক দূরে যাওয়ার ট্রেনগুলো দেখতে দেখতে তার মন উদাস হয়ে দূরের দিকে ছুটে যায়। এই চোদ্দো বছর বয়স পর্যন্ত ট্রেনে চেপে দুর্গাপুরে পিসির বাড়ি ছাড়া আর কোথাও সে যায়নি। অথচ এই ট্রেন কত দূরে দূরে মানুষকে নিয়ে ছুটে যায়। এখানে এই ছাদে দাঁড়িয়ে কলকাতার আকাশটাকে দেখে। কল্যাণীর মতো একইরকম দেখতে। কাছে আর দূরে বড় বড় বাড়ির মাথা। কলকারখানার চিমনি, গলগল করে ধোঁয়া বেরিয়ে আকাশটাকে নোংরা করে গড়িয়ে গড়িয়ে ভেসে যাচ্ছে উত্তরের দিকে। কল্যাণীর আকাশে এমন ধোঁয়া নেই। মন্টু ছাদে যায় বটে, কিন্তু বড়মা ঘুম থেকে ওঠার আগেই নেমে আসে। অত উঁচু থেকে নীচের রাস্তা দিয়ে যাওয়া নানারকমের গাড়িগুলোকে দেখতে তার বেশ লাগে। যখনই জেঠুর বাড়িতে আসে, তখনই সে লুকিয়ে লুকিয়ে ছাদে গিয়ে চারপাশে তাকায়। নীচের গাড়িগুলো দেখে। যখন জ্যামে গাড়িগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে তখন মনে হয়, নীচে যেন সবকিছু ছবির মতো থেমে আছে, আর সেই থেমে থাকা গাড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে চলে যাচ্ছে মানুষ, মুটে আর সাইকেল।

জেঠুর বাড়িতে এলে এইরকমই হয়। এগুলো নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার একটা অঘটন ঘটল। সেদিন ছিল শনিবার। জেঠুর অফিস ছুটি। জ্যাঠতুতো দাদা সন্তুদার অফিস খোলা। সেদিন বিকেলটা ছিল কেমন ঘোলাটে ঘোলাটে। সন্তুদা বাড়ি ফিরে এসে মন্টুকে বলল, ‘আজ পূর্ণিমা, চল, ছাদে গিয়ে চাঁদ দেখি।'

বড়মা চিনেমাটির কেটলি থেকে চা ঢালতে ঢালতে বললেন, ‘আহা, তুই এমন একটা কথা বললি যেন কল্যাণীর আকাশে চাঁদ দেখা যায় না।'

জেঠু চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘কলকাতার চাঁদটাও বুঝি পলিউটেড। তার চেয়ে ওদের কল্যাণীর চাঁদ অনেক ভাল।'

বড়মা হেসে ফেলে বললেন, ‘এমনভাবে বলছ যে, আকাশে যেন একটা নয়, বিশটা চাঁদ ওঠে। কলকাতার চাঁদ, কল্যাণীর চাঁদ, বর্ধমানের চাঁদ, তোমরা কীসব যে বলো।'

চা খাওয়া শেষ করে সন্তুদা মন্টুকে নিয়ে ছাদে চলে গেল। ছাদে পা দিয়েই সন্তুদা পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বার করে সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে বলল, ‘চাঁদফাঁদ সব বাজে কথা। ছাদে আসার আসল কারণ এইটা।

সন্তুদা হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা দেখাল। মন্টু ছাদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে পূর্ণিমার চাঁদ, কলকাতার মলিন আকাশ আর দূরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ির মাথার লাল আলোগুলো দেখছিল। একটু ঘুরে দাঁড়িয়ে সে এয়ারপোর্টের আলোটাও দেখতে পেল। দূর আকাশ দিয়ে পিছনে আলো জ্বেলে একটা উড়োজাহাজ নিঃশব্দে উড়ে যাচ্ছিল গঙ্গার দিকে। সন্তুদার সিগারেট খাওয়া তখনও শেষ হয়নি। ছাদের চারদিকে কোমরসমান পাঁচিল। তার ওপর পরপর তিনটে স্টিলের রড দিয়ে গোটা ছাদটা ঘেরা। সন্তুদা সেই রডের ওপর হাত রেখে সিগারেট টানছিল। তার চোখ দূর আকাশের দিকে ছড়ানো। ঠিক তখনই সন্তুর মনে হল, নীচে থেকে একটা অস্পষ্ট কোলাহল ওপরের দিকে উঠে আসছে। সন্তু এগিয়ে গিয়ে নীচের দিকে তাকাল। তেমন করে কিছুই দেখা গেল না। কিন্তু অস্পষ্ট কোলাহলটা টের পাওয়া গেল। মন্টু কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সন্তু বলল, ‘নীচে কীসের একটা চেঁচামেচি হচ্ছে না?’

মন্টু মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। চলো, নীচে যাই।'

ওরা দু’জন সিঁড়ির দরজার দিকে এগোতে যাওয়ার আগেই সন্তুর পকেটের ভিতর থেকে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। সন্তু দাঁড়িয়ে পড়ে ফোনটা কানের কাছে তোলবার আগে মোবাইল স্ক্রিনে নম্বরটা দেখল। মন্টু টের পেল, সিঁড়ি দিয়ে কতকগুলো পায়ের শব্দ নেমে যাচ্ছে। কান থেকে মোবাইল নামিয়ে সন্তু মন্টুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'সব্বোনাশ! আমাদের এই বিল্ডিংয়ের মধ্যে টাইমবোমা রাখা আছে। যে কোনও সময় ফেটে যেতে পারে।'

মন্টু আঁতকে উঠে বলল, ‘টাইমবোমা? কোথায় রাখা আছে?’

সন্তু কোনও জবাব না দিয়ে বলল, ‘চলে আয়।'

ছ’তলার ছাদ থেকে কয়েকটা সিঁড়ি নামলে ছ'তলা। সেখানেই লিফ্‌ফ্ট। প্রত্যেক তলাতেই চারটে করে ফ্ল্যাট। এই বাড়িটা হল ‘বি’। অর্থাৎ এই অট্টালিকায় মোট চব্বিশটা পরিবার। সবই দু’ কামরার ফ্ল্যাট। সন্তু এসে লিফ্‌টের বোতাম টিপল। পাশাপাশি দুটো লিফ্ট। ওরা দু’জনে বারকয়েক বোতাম টিপলেও লিফ্ট ওপরে এল না। সন্তু বলল, ‘চল, হেঁটেই নামি।’ তিনতলায় এসে দরজার বোতাম টিপতে হল না। দরজা খোলাই ছিল। জেঠুর মুখ একেবারে শুকিয়ে গেছে। কেউ কেউ সুটকেস, ব্যাগ, ট্রাঙ্ক নিয়ে নীচে নেমে যাচ্ছে। জেঠু বললেন, ‘এখন কী হবে সন্তু?

সন্তু বাবা আর মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, টাইমবোমা রাখা আছে এটা কে বলল?’ জেঠু উত্তর দিলেন, ‘চারতলায় সমাদ্দারবাবু থাকেন, তাঁর কাছে উড়ো ফোন এসেছিল। তিনি খুব একটা পাত্তা দেননি। তার দশ মিনিট পরেই থানা থেকে ফোন এল, এই ‘বি’ বিল্ডিংয়ের মধ্যেই শক্তিশালী টাইমবোমা রাখা আছে।'

সন্তুর গলায় উদ্বেগ আর বিরক্তি। সে বলল, ‘পুলিশ কী করছে? তারা কি খবর দিয়েই খালাস!’

জেঠু বললেন, ‘পুলিশ আসছে। তারপর তল্লাশি হবে। পুলিশ একতলার দরোয়ানদের ঘরে সিকিউরিটির লোকদের ফোন করে খবর দিয়েছে। ওরা বলেছে, গোটা বাড়িটা তল্লাশি করতে হবে। তাই ঘর খালি করে দিয়ে সবাইকে একেবারে নীচে যেতে অর্ডার দিয়েছে। তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। অনেকেই নেমে গেছে, আমরাও যাই।'

জেঠিমা কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, ‘মন্টু ভাল খায় বলে তেলকই রান্না করছিলাম। এখনও গ্যাসে চাপানো আছে।'

জেঠু ধমক দিয়ে বললেন, ‘গ্যাস বন্ধ করে দিয়ে নীচে এসো। আগে বাঁচি, তারপর তেলকই হবে। সন্তু, পয়সাকড়ি যা আছে সঙ্গে নিয়ে চল।'

ঝড়ের গতিতে সব গুছিয়ে নিয়ে যখন সিঁড়ির সামনে এল, তখন সিঁড়ির মুখে যেন গঙ্গাসাগরের মেলা। সবাই মালপত্র নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে ব্যস্ত। যেহেতু লিফ্ট চালানো নিষেধ, তাই সিঁড়িতে বেজায় ভিড়। লিফ্ট চালানো কেন নিষেধ, কে নিষেধ করেছে, সেটা কেউই ঠিকঠাক জানে না। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে জেঠু বললেন, ‘দেখলি তো, মুহূর্তে সব কেমন বদলে গেল। চেনা লোক হলেও যেন এখন আর চেনা নয়। মৃত্যুভয় প্রত্যেককে কেমন স্বার্থপর করে দিয়েছে।'

জেঠিমা ধমক দিয়ে উঠে বললেন, ‘ওসব ফালতু জ্ঞানের কথা রাখো তো। সবাই বাঁচতে চায়, এখন সেই বাঁচার লড়াই। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলো।'

তাড়াতাড়ি বললেই তাড়াতাড়ি নামা যাচ্ছে না। সামনে সিঁড়িভর্তি লোক, পিছনে লোকের ধাক্কা। হয়তো নামার আগে সিঁড়ির মুখেই ঘটে যেতে পারে কোনও দুর্ঘটনা। বড়মা নামতে নামতে বলছেন, ‘বলেছিলাম একতলায় ফ্ল্যাট নাও। মাটির কাছাকাছি থাকা যাবে। তা তখন শুনলে আমার কথা! তিনতলার ব্যালকনিতে বসে হাওয়া খাবে। তা গেল এখন হাওয়া। একতলা হলে কখন নেমে যেতে পারতাম।'

এবার সিঁড়ির ওপরের ধাপ থেকে কাতর আবেদন এল, ‘প্লিজ একটু জায়গা দিন, প্লিজ আমার বাবা অসুস্থ, তদুপরি পায়ে প্লাস্টার...’

সবাই মুখ ঘুরিয়ে ওপরের দিকে তাকালেন। একজন প্রৌঢ়কে তিনজন কাঁধে করে নামাচ্ছেন। কেউ কেউ কোনওরকমে সরে দাঁড়িয়ে জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কেউ কেউ সরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, 'আপনাদের তো আরও আগে নামার চেষ্টা করা উচিত ছিল।'

যাঁরা বললেন, তাঁদের গলায় ক্ষোভটা বড় স্পষ্ট। মন্টু দেখল, পায়ে প্লাস্টার করা অসুস্থ লোকটি তার জেঠুর খুবই পরিচিত। বয়সে কয়েক বছরের বড় হলেও বন্ধুর মতো সম্পর্ক। গতবার মন্টু যখন এসেছিল, তখন এই ভদ্রলোক মন্টুকে আদর করে তাঁর ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে পায়েস খাইয়েছিলেন। ভদ্রলোকের নাম সত্যেশ্বর লাহিড়ী। একদা কলকাতা মাঠে প্রথম ডিভিশন ফুটবল খেলতেন। খেলার জগতের কত গল্প জানতেন। লাহিড়ীজেঠু বলেছিলেন, ‘আমি গোলে খেলি। ফুটবলের লাস্ট ডিফেন্স। আমাকে হারালেই দল হারে। গোল করার যে আনন্দ, গোল রুখে দেওয়ার আনন্দও কিন্তু তার চেয়ে কম নয়। একা গোলে দাঁড়িয়ে আছি। সারামাঠ আমার দিকে তাকিয়ে। পেনাল্টি পয়েন্টে বল বসানো। কিক নেবেন শৈলেন মান্না। রেফারির বাঁশি বাজতেই বন্দুকের গুলির মতো মান্নাদার পা থেকে বলটা ছুটে এল আমার ডানদিকে। আমি ঝাঁপালাম। হাতে বল লাগল। গোটা মাঠে করতালি। মাঠ থেকে মুখ তুলে দেখি বল চলে গেছে সাইড লাইনের দিকে। আমার সতীর্থরা আমার দিকে ছুটে আসছে।'

সেদিনও সতীর্থদের কাঁধে চেপে মাঠ ছেড়েছিলেন গোলকিপার সতু লাহিড়ী। এখনও তিনি আত্মীয়দের কাঁধে চেপে নীচে নামছেন। মৃত্যু কোথায় কীভাবে ওত পেতে আছে, আমাদের মতো সতু লাহিড়ীও তা জানেন না। মৃত্যু ফাঁকি দিতে সিঁড়ি দিয়ে বিপন্ন উদ্বিগ্ন মানুষের দল নেমে যাচ্ছে জীবনের সন্ধানে।

মন্টু জেঠুর কানের কাছে মুখটা এনে বলল, ‘জেঠু, সতুজেঠুর পা ভাঙল কেমন করে?’ জেঠু বললেন, ‘আগে নীচে নাম, সেকথা পরে হবে।'

ওরা নীচে নেমে আসতেই হর্ন বাজিয়ে দুটো পুলিশের জিপ কমপ্লেক্সের মধ্যে ঢুকে গেল। ঝপাঝপ করে পুলিশের দল গাড়ি থেকে নেমে এল। এব জন পুলিশ অফিসারের হাতে একটা মাইক। তিনি মাইকের সুইচটা অন করে বলতে লাগলেন, ‘এখনও যারা নীচে নামেননি তাঁরা নীচে নেমে আসুন। কেউ দরজায় বা বাথরুমে তালা দেবেন না। দরজা খোলা রাখুন। প্রত্যেকটা ঘরে তল্লাশি করতে হবে।'

বড়মা বললেন, ‘সন্তু, আমি তো আলমারিতে চাবি দিয়ে চাবি নিয়ে এসেছি। ওরা যদি আলমারি ভেঙে ফেলে?’

সন্তুর মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল। বলল, ‘সব ব্যাপারে তুমি একটা গন্ডগোল করবে। এখন চুপ করে থাকো, সময়মতো ওরা হয়তো মাইকে অ্যানাউন্স করবে।'

কী ভয়ংকর প্রতীক্ষা! টাইমবোমা কখন, কোন মুহূর্তে ফাটবে তা কেউ জানে না। কিন্তু সবাই বুঝতে পারছে, ওই বোমা এই কমপ্লেক্সের মধ্যেই রাখা আছে। যে কোনও মুহূর্তে ফেটে গিয়ে আমাদের জীবন শেষ করে দিতে পারে। ‘বি’ ফ্ল্যাটের মতো ‘এ’ এবং ‘সি’ থেকেও লোক নেমে আসছে। কেউ কেউ জানতে চাইছে, ক'টা বোমা রাখা আছে? শুধু ‘বি’ ফ্ল্যাটটাই ধ্বংস হবে, নাকি অন্য দুটোও যাবে?

এই প্রশ্নের কেউ জবাব দিলেন না। কেউ কেউ গ্যারাজ থেকে গাড়ি বার করে এই কমপ্লেক্স থেকে দূরে কোথাও কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গেলেন। মৃত্যুর সীমানা থেকে সবাই ছুটে পালাতে চাইছে, কিন্তু সবাই তা পারছে না। নীচে দেদার লোক, অনেক জিনিসপত্র। ওই কমপ্লেক্সের মধ্যেই ছোট এক চিলতে একটা চিলড্রেন পার্ক। এখন সেটা লোকে লোকে ঠাসা। এক ভদ্রলোক একটা টিফিন কৌটো বার করে পরোটা খাচ্ছিলেন। ভাবখানা এমন যেন মরবার আগে খালি পেটে থাকতে নেই। এই যেন তাঁর শেষ খাওয়া। বড়মা’র পাশে বড়মারই বয়সি এক মহিলা বসেছিলেন। তিনি চোখের জল মুছতে মুছতে বড়মাকে বলেছিলেন, ‘আলমারি-ভর্তি দামি দামি শাড়ি। ভাগ্যিস গয়নাগুলো ব্যাংকের লকারে। ওই শাড়িগুলোর কী হাল হবে গো দিদি!’

অন্যদের মতো মন্টু এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। সে এদিক ওদিক ঘুরছিল। যদিও জেঠু আর বড়মা থেকে থেকে সাবধান করছিলেন, ‘মন্টু, কোথাও যাসনি। যখন তখন বোমা ফেটে যেতে পারে।'

পুলিশের লোকজন ধীরে ধীরে ফ্ল্যাটের ওপর উঠছিলেন, আবার কেউ কেউ নীচে নেমে আসছিলেন। বোমার তল্লাশি চলছিল। কিন্তু এতক্ষণের তল্লাশিতেও বোমা পাওয়া গেল না। তবুও তল্লাশি চলছিল। কেউ একজন পুলিশকে বললেন, ‘দমকলকে খবর দেওয়া দরকার। আপনারা খবর দিন। বোমা ফাটার সঙ্গে সঙ্গে জল দিতে শুরু করলে আগুন ছড়াবে না।'

কর্তব্যরত অফিসারটি বললেন, ‘আগুন লাগলে দমকল আসবে। আগুন লাগার আগে আসবে না। আগে বোমা ফাটুক। আগুন লাগুক।'

যিনি দমকলের কথা বলেছিলেন তিনি তাজ্জব হয়ে পুলিশ অফিসারটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। পুলিশের জিপগাড়িতে ওয়্যারলেস লাগানো ছিল বলে গাড়ির মধ্যে সবসময় কীসব যেন খবরাখবর চালাচালি হচ্ছিল। ইতিমধ্যে আরও একটা গাড়ি এল। তার মাথায় লালবাতি লাগানো। একজন গাড়ি থেকে নামলেন। বেশ রাশভারী চেহারা। নাকের নীচে পাকানো গোঁফ। দেখলেই বোঝা যায়, গোঁফটির নিয়মিত যত্ন নেওয়া হয়। অন্যান্য পুলিশ, যাঁরা নীচে ছিলেন, তাঁরা এগিয়ে এসে স্যালুট করলেন। পায়ের জুতোতে জুতোতে গোত্তা দিয়ে শব্দ তুললেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, 'সার্চ চলছে?’

অন্য একজন বললেন, ‘চলছে।'

জাঁদরেল অফিসার বললেন, ‘ছাদের ওয়াটার ট্যাঙ্কের নীচে দেখুন। প্রত্যেকটা ফ্ল্যাটের টয়লেটের ভিতরে, রান্নাঘরের পাশে স্টোর রুমে। আমি তো একবার বোমা খুঁজে পেয়েছিলাম কমোডের পিছন থেকে।'

কথা শেষ হওয়ার আগেই কমপ্লেক্সের গেটের সামনে একটা বিকট শব্দ হতেই ওই জাঁদরেল অফিসার ‘ওরে বাবা রে,’ বলে এক বিকট আর্তনাদ করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সতু লাহিড়ীর চেয়ারের ওপর। সতু লাহিড়ী চিৎকার করে কঁকিয়ে উঠে বললেন, ‘ডেঞ্জারাস ফাউল। রেড কার্ড দেখান। রেড কার্ড দেখান। মহিষের মতো শরীরটা দিয়া আমারে চাপা দিয়া ফালাইছে।'

অন্যদিকে সবাই নিজেদের মধ্যে হুড়োহুড়ি করছে বাঁচার জন্য। সবাই ফ্ল্যাটবাড়ির দিকে তাকিয়ে। সবাই ভেবেছিল এখনই দাউ দাউ করে জ্বলতে জ্বলতে বিশাল ফ্ল্যাটবাড়িটা ভেঙে পড়বে। কিন্তু তা হচ্ছে না দেখে বড়মা বললেন, 'হ্যাঁ গো, বাড়ি তো ভাঙল না?’

জেঠু উত্তর দেওয়ার আগে সতু লাহিড়ী কাতর গলায় বলে উঠলেন, ‘বউঠান, ওই লোকটা আমার পাঁজর ভাইঙ্গা দিছে। ওর গোঁফের গুতোয় আমার গালের চামড়া উইঠা গেছে। গোঁফ তো নয়, যেন নাকের নীচে দুই সারি তারকাঁটা সেট করা। এমন ইতর গোঁফ মাইনসে রাখে!’ সতুজেঠু যখন এমনি কথা বলেন, তখন বোঝা যায় না যে, তিনি ওপার বাংলার মানুষ। কিন্তু রেগে গেলেই ওপার বাংলার ভাষা বেরিয়ে আসে। তবে ওই শব্দটা কীসের? বোমা ফাটার শব্দ বলে তো মনে হল না। মন্টু কখনও টাইমবোমা দেখেনি এবং ফাটতেও শোনেনি। একটু পরেই বোঝা গেল শব্দটা কীসের? একটা চলন্ত লরির টায়ার ফেটে গিয়েই এই শব্দ। আর এইটা জানতে পেরে গোঁফওলা অফিসারটি গিয়ে লরির চালককে অ্যায়সা ধমকালেন যে, বেচারা কোনও উত্তরই দিতে পারল না। কমপ্লেক্সের ভিতর দিয়ে আসতে আসতে বললেন, ‘যত বেওকুফ আর দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ। এখন আমরা প্রত্যেকটা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শব্দের চরিত্র বিশ্লেষণ করছি। এইরকম সময় লরির টায়ার ফেটে যাওয়া জামিন অযোগ্য অপরাধ। এদিকে টাইমবোমা নিয়ে ব্যস্ততায় আজকের মতো পার পেয়ে গেল।'

বাইরে রাত বাড়ছিল। টাইমবোমা আর মৃত্যুভয় যে মানুষকে ক্ষুধা ভুলিয়ে দিতে পারে না, সেটা মন্টু টের পেল। যদিও এইরকম টানটান উত্তেজনার মধ্যে মন্টুর খিদে পাচ্ছিল না। কেউ কেউ বাইরে থেকে প্যাকেট বের করে চাউমিন, মশলা ধোসা, পরোটা, তরকারি, এসব এনে খেতে শুরু করে দিয়েছে। রাস্তার ওপাশে যে ফাস্টফুডের দোকান, সেই দোকানদার কমপ্লেক্সের গেটের সামনে টেবিল পেতে ফাস্টফুডের প্যাকেট সাজিয়ে বসে আছে। চটাপট বিক্রিও হচ্ছে। পাশেই বসিয়ে দিয়েছে কফি মেশিন। মিনারেল ওয়াটারের বোতল বিক্রির জন্য লোকনাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ছেলেটা কমপ্লেক্সের মধ্যেই বোতল নিয়ে ঘুরছে। এরই মধ্যে একজন পুলিশ এসে বললেন, 'স্যার, সিঁড়ির নীচে একটা ঘর। তার থেকে টিকটিক করে একটা আওয়াজ আসছে।'

গুঁফো অফিসার লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘খুব সাবধান। টাইমবোমা পাওয়া গেছে। কিন্তু আপনারা কমপ্লেক্সের ভিতর থেকে দূরে দূরে সরে যান।'

সরে যাওয়ার জন্য আবার হুড়োহুড়ি। তারই মধ্যে সতু লাহিড়ীর কাতর চিৎকার, ‘ওরে আমাকে ফেলে সবাই কোথায় যাচ্ছে। আমায় নিয়ে চল।'

চারজন পুলিশ নিয়ে গুঁফো অফিসার ধীরে ধীরে এগোলেন। বন্ধ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হাঁক দিলেন, ‘এটা কার ঘর?’

কেউ একজন বলল, ‘এখানে হরিপদ থাকে। ও আমাদের কমপ্লেক্সের একজন কর্মচারী। জলের পাম্প খারাপ হয়ে গেলে, প্লাম্বিং-এর সমস্যা হলে, লাইটের ছোটখাটো সমস্যা ওই দেখে, মিস্ত্রি ডেকে আনে।'

অফিসার গম্ভীর গলায় বললেন, ‘হোয়ার ইজ হরিপদ?’

এই কমপ্লেক্সের যে কমিটি আছে তার সম্পাদকের নাম অসিত গুপ্তভায়া। ততক্ষণে তিনি এসে গেছেন। তিনিই জবাব দিলেন, ‘হরিপদ প্রত্যেক শনিবার সকালে তার দেশে যায়। সোমবার বেলা দশটা নাগাদ ফিরে আসে।'

অফিসার বললেন, ‘আপনি?’

অসিতবাবু উত্তর দিলেন, 'আমি এই কমপ্লেক্সের সম্পাদক। আমার নাম অসিত গুপ্তভায়া।'

অফিসার বললেন, ‘ওয়েল মি. ভায়া...’

অসিতবাবু বললেন, ‘এক্সকিউজ মি, আই অ্যাম নট ওনলি ভায়া, আই অ্যাম গুপ্তভায়া।' অফিসার হাত নেড়ে বললেন, ‘ওকে, ওকে। হরিপদর ঘর তালাবন্ধ। এর চাবি কোথায়?’ অসিতবাবু বললেন, ‘নিশ্চয়ই দরোয়ানদের কাছে।'

দরোয়ানদের ডাকা হল। তিনজন দরোয়ানের মধ্যে দু'জন তাদের পোশাক খুলে বোঁচকা বেঁধে যাওয়ার জন্য তৈরি। অফিসার হুকুমের গলায় বললেন, ‘কারও এই কমপ্লেক্স ছেড়ে যাওয়া চলবে না। সবাই দরোয়ানের ইউনিফর্ম পরে এসো। তাতে ডিজাস্টারের পর বড়ি আইডেন্টিফাই করতে সুবিধে হবে। এখন বলো এই ঘরের চাবি কার কাছে?’

দরোয়ানদের একজন বলল, ‘প্রতিবারই বাড়ি যাওয়ার সময় আমাদের কাছে দিয়ে যায়। কিন্তু এবার খুব তাড়াহুড়ো করে গেল বলে চাবি দিয়ে যেতে ভুলে গেছে।

অফিসার ভদ্রলোক গোঁফের তলা দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, 'আমি ঠিকই অনুমান করেছি। ওই হরিপদ এই ঘটনায় যুক্ত। আমার কোনও ভুল নেই মি. গুপ্ত।'

অসিতবাবু বললেন, ‘আবার ভুল হল। আমি শুধু গুপ্ত নই, গুপ্তভায়া।'

অফিসারের নির্দেশে হরিপদর ঘরের তালা ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হল। ঠিক এই সময় ‘এ’ ব্লকের কামাক্ষ্যাবাবু বললেন, ‘মি. অফিসার, আমি আলিপুর হাওয়া অফিসে কাজ করি। তাই বলছি, তালা ভাঙতে গেলে যে ভাইব্রেশন সৃষ্টি হবে, তাতে বোমাটা ফেটে যেতে পারে। আমার মনে হয়, আমাদের কমিউনিটি রুমে ওই ঘরের ডুপ্লিকেট চাবি আছে।'

ডুপ্লিকেট চাবি পাওয়া গেল। চাবি হাতে অফিসার একজনকে বললেন, ‘নিন, আস্তে আস্তে তালা খুলে ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলুন।'

পুলিশ চাবিটি হাতে নিয়ে বলল, 'স্যার, আমাকে কেন, এসব তো দরোয়ানদের করার কথা।’

দরোয়ানদের ডাক পড়ল। একজন দরোয়ান গিয়ে তালা খুলে ঘরের আলো জ্বালাল। ঘরের মধ্যে হরিপদর চৌকি আর বিছানা ছাড়া কিছু নেই। ঘরের মধ্যে একটা দড়ি টাঙানো। তাতে ঝুলছে আধময়লা একটা পাজামা আর একখানা গামছা কিন্তু ঘরের মধ্যে একটা টিকটিক শব্দ উঠছে। দরোয়ান চলে যেতে গুঁফো অফিসার দু’জন পুলিশকে নিয়ে ঢুকলেন। কোথা থেকে শব্দটা আসছে? ঘরে আলো ছিল তবু টর্চ জ্বেলে গুঁফো অফিসার খুঁজতে খুঁজতে বললেন, ‘ইউরেকা, পেয়ে গেছি। খুব সাবধান।

হরিপদর চৌকির তলায় চটে ঢাকা একটা কিছু পড়ে আছে। শব্দটা ওইখান থেকে আসছে। এবং ওটাই যে টাইমবোমা তাতে কারওরই কোনও সন্দেহ নেই। গুঁফো অফিসারটি বললেন, ‘চক নিয়ে আসুন। তাড়াতাড়ি।'

করা যায়। মন্টুও জানে না। সে তার দাদা সন্তুকে বলল, ‘দাদা, চক দিয়ে কী হবে? উনি কী আমাদের অঙ্ক শেখাবেন?’ সন্তু মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, জানি না।'

সবাই ভাবল চক দিয়ে বুঝি বোমা অকেজো

অনেকেই ছুটে গিয়েছিল চক আনতে। একসঙ্গে চারজন ফিরে এল চার বাক্স চক নিয়ে। অফিসার একটি চক তুলে নিয়ে হরিপদর চৌকির দিকে তাকিয়ে হুকুম দিলেন, ‘রিমুভ দিস চৌকি। একেবারে বাইরে নিয়ে যান। খুব আস্তে আস্তে।'

দরোয়ানরা ধরাধরি করে চৌকি বাইরে আনতেই অফিসার উবু হয়ে বসে শব্দটা শুনলেন। তারপর চক দিয়ে গোটা জায়গা গোল করে দাগ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। চকের গণ্ডির মধ্যে চটে ঢাকা একটা কিছু পড়ে। অফিসার এবার বাইরে এসে বললেন, ‘ব্যস, আমার কাজ শেষ।'

অসিতবাবু হামলে উঠে বললেন, ‘শেষ মানে? টাইমবোমাটা ওইভাবে ওখানে পড়ে থাকবে?’

অফিসার বললেন, 'আমি কী করব? বোমা খোঁজা আমার কাজ। ওই টাইমবোমা অকেজো করে দেওয়ার ক্ষমতা বা বিদ্যা আমার জানা নেই। ওটা বম্বস্কোয়াডের কাজ। ওঁরাই ওসব করেন।'

অসিতবাবুর মতো আরও অনেকেই অফিসারকে ঘিরে ধরলেন। অফিসার বললেন, ‘আমি লালবাজারে ফোন করে বলে দিচ্ছি।'

সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন, ‘ফোন করে কেটে গেলে হবে না। শেষ ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে ছাড়ব না। ঘেরাও করে রাখব।'

ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলে উঠল, ‘মরলে আপনাদের নিয়েই মরব। কাউকে যেতে দেব না।'

লালবাজারে ফোনাফুনি চলল। বম্বস্কোয়াডের লোক নাকি আসছেন। কিন্তু কোথায় তাঁরা? মন্টু তার দাদা সন্তুকে বলল, 'টাইমবোমা অকেজো করে কেমন করে?’ সন্তু বলল, 'আমি জানি না।'

মন্টু বলল, ‘আমি জানি।'

সন্তু এবার মন্টুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই জানিস? কিন্তু

কেমন করে?’ মন্টু বলল, ‘টিভিতে একটা হিন্দি ছবিতে দেখেছিলাম। ওই টিকটিক করে চলা যন্ত্রটা খুলে নিয়ে ওটা বন্ধ করে দিলেই টাইমবোমা আর ফাটবে না।'

সন্তু বলল, ‘ওসব সিনেমার ব্যাপার। বাস্তবে তেমন হয় না। অত সহজ ব্যাপার নয়।'

দাদার কথাটা মন্টুর পছন্দ হল না। সে ঘুরে ফিরে হরিপদর খোলা দরজার সামনে গিয়ে ঘোরাঘুরি করতে লাগল। পুলিশ নিষেধ করলে চলে আসে, কিন্তু আবার যায়। আরও অনেক ফোনাফুনির পর জানা গেল, বম্বস্কোয়াডের লোকদের ছুটি হয়ে গেছে এবং তাঁরা বাড়ি চলে গেছেন। তাঁদের দু’জন থাকেন গড়িয়া আর সোনারপুরে। বাকি দু’জনের একজন বউবাজার, অন্যজন কাশীপুরে। তাঁদের আনতে গাড়ি গেছে। মন্টু পুলিশের চোখ বাঁচিয়ে হরিপদর দরজার সামনে গেল। চকের গণ্ডির মধ্যে চটে ঢাকা বোমা। সেখান থেকে টিকটিক শব্দ আসছে। একসময় এই শব্দ তার অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছবে আর তখনই বিশাল বিস্ফোরণে কেঁপে উঠে ভেঙে পড়বে এই কমপ্লেক্সের বড় বড় বাড়িগুলো। রাত এখন ক'টা কে জানে। কিছু আগে সন্তুদার ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা বেজেছিল। এখন সময় কত? রাত ক'টায় বোমাটা ফেটে যাবে। হঠাৎ টিকটিক শব্দটা থেমে গিয়ে চটের ভিতর থেকে এমন একটা শব্দ এল, যাতে চমকে গিয়ে মন্টু একছুটে সন্তুদার কাছে গিয়ে বলতে চাইল... না, বলতে পারল না। বম্বস্কোয়াডের লোকদের লালবাজারের গাড়ি তুলে এনেছে। কারও পরনে পাজামা আর হাওয়াই শার্ট, কারও পরনে ফুলপ্যান্ট আর পাঞ্জাবি। যে যেমনভাবে পেরেছেন ছুটে এসেছেন। ওঁরা খুব সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছেন হরিপদর দরজার দিকে। হঠাৎ একছুটে মন্টু এগিয়ে এল হরিপদর দরজার কাছে। বম্বস্কোয়াডের লোকেরা হইহই করে উঠলেন। মন্টুর চোখে-মুখে কোনও ভয় নেই। সে বলল, ‘ওই টিকটিক শব্দটা একটা ঘড়ির। এই ঘড়িতে বারোটা বাজলেই তিনবার পাখির ডাক হয়। টাইমবোমায় এসব হওয়ার কথা নয়। আমি একটু আগে ওই টিকটিক শব্দের বদলে পাখির ডাক শুনেছি। এখন ক'টা বাজে?’

সবাই নিজের নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে, কেউ বললেন, ‘বারোটা তিন, কেউ বা বললেন বারোটা দুই।'

বম্বস্কোয়াডের লোকেরা চটের ঢাকনা সরিয়ে দেখলেন, একটা খারাপ হয়ে যাওয়া ভ্যাকুয়াম ক্লিনার আর তার পাশে একটা ছোট সাইজের দেওয়ালঘড়ি।

সতুজ্যাঠার ছেলে বলল, ‘ভ্যাকুয়াম ক্লিনারটা আমরা আজ সকালেই ওকে সারাতে দিয়েছি। বলেছে সোমবার এসে দোকানে নিয়ে যাবে।'

বম্বস্কোয়াডের লোক জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর ঘড়িটা?’

জেঠু এগিয়ে এসে বললেন, ‘ওটা আমার ঘড়ি। এইরকম ঘড়ি আমার ছোটভাইয়ের বাড়ি কল্যাণীতেও আছে। আমার ভাইপো মন্টু ঘড়িটা পছন্দ করে। ওর ইচ্ছে, বড় হয়ে ফেলুদার মতো প্রাইভেট গোয়েন্দা হবে। তাই আমিই হরিপদকে ঘড়িটা দিয়ে লুকিয়ে রাখতে বলেছিলাম। ভাইপোকে বলব ভেবেছিলাম, তুই তোর গোয়েন্দা বুদ্ধি দিয়ে খুঁজে বার কর। কিন্তু বলা হয়নি আজ রাতেই বলতাম। যখন বারোটার সময় পাখির ডাকটা শোনা যেত না। কিন্তু তার আগেই তো বোমাতঙ্ক এসে সব গোলমাল করে দিল। ঘড়ির কথাটাও ভুলে গিয়েছিলাম।'

বম্বস্কোয়াডের লোকেরা মন্টুর দিকে তাকালেন। একজন এগিয়ে এসে পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘ওয়েল ডান। চেষ্টা করলে গল্পের গোয়েন্দাদের চেয়েও তুমি বড় গোয়েন্দা হতে পারবে।'

গুঁফো অফিসার একগাল হেসে বললেন, ‘ওই টিকটিক শব্দটা আমারও মনে সন্দেহ জাগিয়েছিল। যাইহোক, ছেলেটি খুব বুদ্ধিমান।

এরপর মন্টুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ছুটিছাটায় এদিকে এলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো।'

সবাই যে-যার ফ্ল্যাটের দিকে যেতে লাগলেন। সতুজ্যাঠাও যাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর জন্য কাউকে পথ ছেড়ে দেওয়ার আবেদন করতে হচ্ছে না। বড়মা লিফটে গেলেন, যদি এখনও তেলকইটাকে খাওয়ার যোগ্য করা যায়।! ওপরে ওঠার জন্য এখন আর আগের মতো ব্যস্ততা নেই। মৃত্যুর তাড়া নেই। কেনই বা থাকবে! সবাই তো জীবনের দিকে হাঁটছে! এই হাঁটার ভাষা অন্যরকম। মন্টু দেখল, পূর্ণিমার চাঁদটা আকাশের মাঝখানে উঠে এসেছে। এখন সে অনেক বেশি উজ্জ্বল!

.

আনন্দমেলা, মার্চ ২০০৫

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%