দুলেন্দ্র ভৌমিক

গোবিন্দপুরে এখন উৎসবের আমেজ। পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে সেসব নিয়ে গোবিন্দপুরের মানুষরা এখন আর বিশেষ আলোচনা করে না। এখন সবার মুখে মুখে শুধু একটা কথা। আর সেই কথাটা হল বনবিহারী মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে। বনবিহারী মুখোপাধ্যায়কে সবাই চেনেন মুখুজ্যেবাবু বলে। তাঁর নামের পদবিতে মুখোপাধ্যায়ের চাইতে মুখুজ্যেটাই বেশি চলে। গোবিন্দপুর কলকাতা থেকে অনেকটা দূর হলেও বেশ বর্ধিষ্ণু জায়গা। গ্রাম না বলে আধা শহর বলাই সংগত। তা সেই আধা শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সবাই যে বনবিহারীবাবুকে নিয়ে মেতে উঠেছেন তার একটা সংগত কারণ আছে। এ বছরের জানুয়ারিতে বনবিহারীবাবু একশো বছরে পদার্পণ করলেন। এই গোবিন্দপুরে আজ পর্যন্ত কেউ একশো বছর বেঁচে থাকেনি। বনবিহারীবাবুর বাবা বেঁচে ছিলেন বিরাশি বছর পর্যন্ত। আর ওদিকে, মানে গোবিন্দপুরের মহেশতলার পাঁচু মণ্ডল বেঁচে ছিলেন একাশি বছর। একশো পর্যন্ত কারও বেঁচে থাকার রেকর্ড নেই। অতএব, গোবিন্দপুরের মানুষজনদের কাছে এটা একটা বিরাট ঘটনা বইকী!
বনবিহারীবাবুর একশো বছরের জীবনটাও কম বর্ণময় নয়। এই জীবনে তিনি কত বিখ্যাত মনীষীদের দেখেছেন। কত ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। বিয়াল্লিশের ‘ভারত ছাড়ো' আন্দোলনে জেলও খেটেছেন। স্থানীয় স্কুলের প্রধানশিক্ষক, গোবিন্দপুর মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, গোবিন্দপুর ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক এরকম নানা কাজের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। গোবিন্দপুরের একমাত্র সংবাদ সাপ্তাহিক ‘গোবিন্দপুর বার্তা’-র প্রতিষ্ঠাতাও এই বনবিহারীবাবু। অতএব, এমন মানুষকে নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে শ্রদ্ধা এবং আবেগ থাকা খুবই স্বাভাবিক। সেই কারণে গোবিন্দপুর মিউনিসিপ্যালিটির বর্তমান চেয়ারম্যান হলধর হালদারের নেতৃত্বে বনবিহারী মুখোপাধ্যায়ের শতবর্ষ উদযাপন কমিটি তৈরি হয়ে গেছে। টানা সাতদিন ধরে চলবে নানা অনুষ্ঠান। উদযাপন কমিটির দুটো মিটিং হয়ে গেছে। চারপাশে এটা নিয়ে প্রচারও চলেছে। গোবিন্দপুরের ছেলেমেয়েরা, দুর্গাপুজো, কালীপুজো, রবীন্দ্রজয়ন্তী, রাসের মেলা আর গোবিন্দপুর ক্লাবের বার্ষিক অনুষ্ঠান দেখতেই অভ্যস্ত। এই প্রথম একটা নতুন ধরনের ব্যাপার হতে যাচ্ছে। এই উপলক্ষে যেসব কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে তার তালিকা বেশ লম্বা। যেহেতু যৌবনে ক্লাবের বার্ষিক অনুষ্ঠানে বনবিহারীবাবু নাটকে অভিনয় করতেন সেই কারণে একদিন নাট্যানুষ্ঠান হবে। সেই সময় পাড়ার ক্লাবে মেয়েদের চরিত্রে ছেলেরাই অভিনয় করতেন। সেটাই রেওয়াজ ছিল। বনবিহারীবাবু বরাবরই স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি পেয়েছেন। তাঁর সেই যৌবনকালের অভিনয় যাঁরা দেখেছিলেন এবং যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছিলেন তাঁরা অবশ্য এখন আর কেউ বেঁচে নেই।
তবে শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে গোবিন্দপুর বার্তার পক্ষ থেকে বনবিহারীবাবুর যে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে তার থেকেই দেখা যাচ্ছে ‘সীতাহরণ’ পালায় সীতা, ‘চন্দ্রগুপ্ত’ পালায় মুরা এবং ‘পাষাণী অহল্যা’-য় অহল্যা হচ্ছে তাঁর শ্রেষ্ঠ অভিনয়। উৎসব কমিটির ইচ্ছে ছিল ওই তিনটি নাটকের যে কোনও একটি অভিনয় করার। কিন্তু কলকাতায় লোক পাঠিয়ে কলেজ স্ট্রিট পাড়া চষে ফেলেও ‘সীতাহরণ’ আর ‘পাষাণী অহল্যা’ পাওয়া গেল না। অতএব, ঠিক হয়েছে ‘চন্দ্রগুপ্ত’ হবে।
কমবয়েসি ছেলে-ছোকরাদের মধ্যে অবশ্য নাটক, হাডুডু, কবিগান এসব নিয়ে তেমন উৎসাহ নেই ওদের উৎসাহ ক্রিকেট খেলা নিয়ে। গোবিন্দপুরের সব ক'টা ক্লাব থেকে ছেলে নিয়ে ক্রিকেট দল তৈরি হয়েছে। সীমায়িত ওভারের একদিনের খেলা। গোবিন্দপুর একাদশ বনাম বনবিহারী মুখুজ্যে একাদশ। দল তৈরি করার চেয়ারম্যান হলধর হালদার সিলেকশন কমিটির লোকদের ডেকে চুপি চুপি বললেন, ‘বনবিহারী মুখুজ্যে একাদশটাকে স্ট্রং রাখবেন। ওই একাদশ হেরে গেলে বনবিহারী জ্যাঠা মাঠেই চোখ বুজবেন। ওঁর একাদশকে হারানো চলবে না।'
সিলেকশন কমিটির সুদাম সেন বললেন, ‘দাদুর শরীর ভাল তো? কে যেন বলছিল, দাদুর জ্বর হয়েছে।'
হলধর বললেন, ‘দুটো ডাক্তার ওর সঙ্গে লাগিয়ে দিয়েছি। সাতদিনের উৎসব না-কাটা পর্যন্ত অসুস্থ হওয়া চলবে না। কিছু গণ্ডগোল হলেই ডাক্তার দু'জনকে গণধোলাই দেব। আমাদের এত পরিশ্রম মাঠে মারা যাবে। পৌরসভার পক্ষ থেকে নাগরিক সংবর্ধনা এবং ক্রিকেট খেলার মাঠে যদি উনি হাজির না থাকতে পারেন তা হলে তো গোটাটাই পণ্ডশ্রম হয়ে যাবে।'
সুদাম প্রশ্ন করলেন, ‘দুটো ডাক্তারই কি যথেষ্ট মনে করছেন?’
হলধরবাবু একটু উষ্ণ গলায় উত্তর দিলেন, ‘তবে কি ডাক্তারদের মেলা বসিয়ে দেব? যা করবার ওঁরা দু’জনেই করবেন।'
উৎসব উদযাপন কমিটির মাত্র কয়েকজন জানেন, মুখুজ্যেবাবুর শরীর খুব সুস্থ নয়। সাতদিনের উৎসবের ধকল সইতে গিয়ে যদি মাঝপথেই কিছু ঘটে যায় তবে খুব বিশ্রী ব্যাপার হবে। অতএব, ওই কয়েকজনের মধ্যে একটা আশঙ্কা চোরাস্রোতের মতো কাজ করছে কিন্তু মুখে কেউ কিছু প্রকাশ করছেন না। অন্যদিকে উৎসব কমিটির নানা শাখার সম্পাদকরা রোজই নানারকম সমস্যায় পড়ছেন। সাংস্কৃতিক শাখার সম্পাদকের কাছে খোদ বনবিহারীবাবুর চিঠি নিয়ে রোজই ছেলেমেয়েরা আসছে। বনবিহারীবাবু কাউকে পাঠাচ্ছেন গান গাইতে, কাউকে আবৃত্তি করতে, কাউকে বা নাচতে। তিতিবিরক্ত হয়ে সাংস্কৃতিক শাখার সম্পাদক প্রদীপ গুহ হলধরবাবুকে অভিযোগের সুরে বললেন, ‘হলধরদা, এ তো আর পারা যায় না। উনি রোজই দু’-তিনজন করে ছেলেমেয়ে পাঠাচ্ছেন প্রোগ্রাম দেওয়ার জন্য। সবাইকে সুযোগ দিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই করতে হবে সাতদিন।
হলধরবাবু চিন্তিত মুখে বললেন, ‘ওঁর চিঠি ডিসঅনার করলে উনি আবার খেপে যাবেন। বয়স তো একশো হল। মেজাজ একটু খিটখিটে। '
প্রদীপ বললেন, ‘তা আমি কী করব! কত লোককে চান্স দেব।'
হলধরবাবু বললেন, ‘আগে ওঁর গণসংবর্ধনা আর ক্রিকেট খেলা মিটে যাক।'
দু’জনের কথা শেষ হওয়ার আগেই গলায় খোল ঝুলিয়ে সুজন কীর্তনিয়া এসে হাজির। প্রদীপকে দেখে একখানা চিঠি প্রদীপের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘একেবারে দাদুর চিঠি নিয়ে এসেছি। আমাকে কেত্তন গাইতে দিতে হবে।'
প্রদীপ খেপে উঠে বললেন, ‘দাদুর তো ঘাটে যাওয়ার উৎসব নয়। এখানে কীর্তন দিয়ে কী হবে।'
সুজন কীর্তনিয়া বেজায় খেপে গিয়ে বললেন, ‘কী হবে মানে? কেত্তন কি ফালতু জিনিস? কেত্তন বাদ দিয়ে বদ সংস্কৃতি হয়। আমি যাচ্ছি দাদুর কাছে।'
রাগের বশে খোলেই চাটি মেরে সুজন কীর্তনীয়া চলে যাচ্ছিলেন। হলধরবাবু তাঁকে দু’হাত আগলে আটকালেন। শক্ত গলায় বললেন, 'তোমার তো দাদুর কাছ থেকে সুপারিশপত্র আনার দরকার ছিল না। আমাদের বললেই তো হত।'
সুজন কীর্তনীয়া বললেন, ‘আমি যাইনি। দাদুই আমাকে ডেকে বললেন, আমি মরে গেলে তোকেই কেত্তন করে ঘাটে নিয়ে যেতে হবে।'

হলধর বললেন, ‘সে তো বেশ ভাল কথা। কিন্তু দাদু তো এখনও মরেননি।'
সুজন কীর্তনীয়া গলা তুলে বললেন, ‘সে তো আমিও জানি। দাদুই তো বললেন, 'সুজন, আমি মরে গেলে তুই কী গাইবি তা তো আর স্বকর্ণে শুনতে পাব না। তাই তুই আমার নাগরিক সংবর্ধনায় খোল বাজিয়ে কেত্তন গেয়ে শোনাস।'
প্রদীপ ঘর ছেড়ে চলে যেতে যেতে বললেন, 'আপনার ওই কেত্তন গানের জন্যই আপনাকে কেউ বাড়িভাড়া দিতে চাইছিল না।'
প্রদীপ ঘর ছেড়ে বাইরে পা রেখেছিলেন কিন্তু বাইরে যেতে পারলেন না। ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকলেন সুদাম সেন। তাঁর উত্তেজিত চোখ-মুখ দেখে হলধরবাবু বললেন, 'কী হল সুদাম?’
সুদাম ধপাস করে সোফার ওপর বসে পড়ে বললেন, 'আমাকে অব্যাহতি দিন। আমি ক্রিকেট টিম তৈরি করতে পারছি না।'
হলধরবাবু বললেন, ‘কেন, তোমার আবার কী হল?’
সুদাম বললেন, ‘দাদু রোজ চিঠি লিখে ছেলে পাঠাচ্ছে আর বলছে বি বি এম একাদশে ওকে নিয়ে নাও। দাদুর অনুরোধ রাখতে হলে বনবিহারী একাদশ আর স্ট্রং হবে না। দশ-বিশ রানে সব আউট হয়ে যাবে।
সুদাম সেনের কথা শুনে হলধর হালদারকে কিছুটা চিন্তিত দেখাল। কিন্তু মুখে কিছু না বললেও মনে মনে বললেন, ‘কেন যে ঘটা করে বনবিহারীবাবুর শতবর্ষ করতে গিয়েছিলাম। কথায় কথায় চোখ রাঙাচ্ছেন আর হুমকি দিচ্ছেন, ‘আমাকে বাদ দাও। শতবর্ষ উৎসবে আমি নেই।’ যাঁর শতবর্ষ তিনিই যদি না থাকেন তা হলে লোকে কী বলবে!’
সুদাম তখনও গম্ভীর মুখে বসে। সুজন কীর্তনীয়াও বুকে খোল ঝুলিয়ে দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে। একেও চিঠি লিখে পাঠিয়েছেন বনবিহারীবাবু। হলধর খাটো গলায় ডাকলেন, ‘সুদাম।'
সুদাম উত্তর দিলেন, ‘বলুন।’
হলধরবাবু সুজন কীর্তনীয়ার দিকে একবার আড়চোখে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘ভাই সুজন, তুমি এখন খোল নিয়ে বাড়ি যাও। যথাসময়ে খবর দেব।'
সুজনও গোবিন্দপুরের লোক। সে জানে যথাসময়ে খবর দেব এ-কথাটা স্রেফ ভাঁওতা। গোবিন্দপুরের অনেক অনুষ্ঠানেই এই ‘যথাসময়ে খবর দেব’ বলে কেউ খবর দেয়নি। অতএব, সুজন বললেন, ‘হলধরদা, আমার তাড়া নেই। আমি এখানেই অপেক্ষা করছি। আপনারা কথা সেরে নিন।'
হলধরবাবু এবার কুপিত গলায় বললেন, ‘তোমার না থাকলেও আমার তাড়া আছে। তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব। এখন বিদায় হও।'
সুজনও খেপে গেলেন। খোলে চাঁটি মেরে বললেন, ‘বিদায় হও মানে? আমি কি ভিখিরি নাকি। বেশ, আমি যাচ্ছি বনদাদুর কাছে।'
হলধরবাবুও রাগের গলায় বললেন, 'তাই যাও। ওখানে গিয়ে খোল বাজিয়ে কেত্তন শোনাও।'
হলধরবাবুর কথায় সুজন এমনই রেগে গেলেন যে, দু’হাতে খোলে চাঁটি মারতে মারতেই রওনা হলেন বনবিহারীবাবুর বাড়ির দিকে।
সুজন চলে যাওয়ার পর হলধরবাবু বললেন, ‘সুদাম, বি বি এম একাদশ তো ফাইনাল হয়ে গেছে?'
সুদাম উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ।'
হলধরবাবু বললেন, ‘ওদের নিয়ে প্র্যাকটিস চালিয়ে যাও। বনবিহারীবাবু যাদের পাঠাচ্ছেন তারাও প্র্যাকটিস করুক। যদি দ্যাখো কেউ একটু চলনসই তা হলে...”
হলধরবাবুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সুদাম বলে উঠলেন, 'আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? উনি যাদের পাঠাচ্ছেন তারা কেউ খেলোয়াড় নয়। কেউ ওঁর চেনা রিকশাচালক, কেউ মুদি দোকানের কর্মচারী, কেউ বা জারে পলতা পাতা বিক্রি করে। ব্যাটই ধরতে জানে না। চলনসই তো অনেক দূরের ব্যাপার।'
হলধর ব্যাজার মুখে একবার দরজার দিকে তাকালেন। পরে বললেন, 'ওদেরও প্র্যাকটিস করাও। খেলার দিন তোমার বাছাই করা এগারোজনই নামবে বি বি এম একাদশের হয়ে। বি বি এম না জিতলে বুড়ো মাঠেই হার্টফেল করবে।'
খেলার দিন যত এগিয়ে আসছিল সুদাম সেনের উৎকণ্ঠাও তত বাড়ছিল। তাঁর ভয় বনজেঠু মাঠের মধ্যেই না গণ্ডগোল শুরু করে দেন। হলধরবাবু বললেন, ‘এত ভেবো না। বয়সটা তো একশো। চোখের জোর আর নেই। সাদা পোশাকে মাঠের মধ্যে যারা থাকবে তার মধ্যে কে কে ওঁর পাঠানো লোক সেটা চেনাই কঠিন হবে ওঁর পক্ষে।' সুদাম প্রশ্ন করলেন, ‘যদি জিজ্ঞেস করেন?
হলধরবাবু উত্তর দিলেন, ‘বি বি এম ব্যাটিং করলে বলব পরে আসবে ব্যাট করতে। আর ফিল্ডিং করলে উলটো দিকের বাউন্ডারি লাইনের দিকে দেখিয়ে বলব, ওখানে ফিল্ডিং করছে।' সুদাম সেন মনে মনে আশ্বস্ত হলেও শেষ রক্ষা হল না। খেলা শুরু হওয়ার আগে দু’পক্ষের বাইশ জন খেলোয়াড় আর দুই আম্পায়ার যখন মাঠের মধ্যে দাঁড়াল তখন অনুষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় বিধায়ক চিন্তামণি চক্রবর্তী আর বনবিহারীবাবুকে নিয়ে মাঠে ঢুকলেন হলধর হালদার। প্রথমে গোবিন্দপুর একাদশ। তারপর বি বি এম একাদশ অর্থাৎ বনবিহারী মুখোপাধ্যায় একাদশের সঙ্গে করমর্দন করতে এসে বনবিহারীবাবু বললেন, ‘আমার একাদশের মধ্যে মন্টু, বিল্টে, ভোঁদা এরা নেই কেন? ওরা কোথায়?’
হলধরবাবু অসহায় চোখে সুদামের দিকে তাকালেন। সুদাম তখন ঢোক গিলছেন। আর বনবিহারীবাবু ক্ষোভের গলায় বলে চলেছেন, ‘এ কী অন্যায় বলো তো চিন্তামণি। আমার একাদশে আমার পাঠানো লোক নেই। ভোটের দিন পোলিং বুথে যদি তোমার এজেন্ট না থাকে তা হলে কেমন হয়! ভাল হয় কি!’
চিন্তামণিবাবু অতশত ব্যাপার জানেন না। তিনি বনবিহারীবাবুর কথায় সায় দিয়ে বলে উঠলেন, ‘মোটেই ভাল হয় না। এটা অন্যায়।'
একশো বছরের বনবিহারীবাবু গর্জন করার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, ‘এই অন্যায়ের প্রতিবাদ হওয়া উচিত। আমি প্রতিবাদে মাঠ ত্যাগ করছি। আমি একাই চলে যাচ্ছি বাড়িতে।
বনবিহারীবাবু প্রায় হনহন করে মাঠ ছাড়ার ভঙ্গিতে হেঁটে যেতে লাগলেন। পেছন থেকে বাইশ জন খেলোয়াড়, আম্পায়ার আর অন্যরা, ‘ও দাদু যাবেন না।’ ‘ও জেঠু যাবেন না।’ এইরকম নানা অনুরোধ আসতে লাগল কিন্তু দাদু ফিরেও তাকালেন না। মাঠভর্তি লোক। সকলেই বুঝতে পারছে মাঠের মধ্যে অপ্রীতিকর কিছু একটা ঘটেছে। মাইক হাতে ঘোষণা করছিল তমালতরু কাঞ্জিলাল। সে ব্যাপারটা কিছু না বুঝেই বলে যাচ্ছে, ‘দাদু মাঠ ছেড়ে চলে আসছেন। এখনই টস হবে। এই বয়সেও কী দৃপ্ত হাঁটা। আমার মনে হচ্ছে যেন ফ্রাঙ্ক ওরেল হেঁটে আসছেন। একশো বছর বয়সেও কি নিখুঁত তাঁর পদক্ষেপ। আমার মনে হচ্ছে, কিন্তু তার আগে দাদু এসে গেছেন। দাদু কিছু বলবেন। ‘দাদু প্লিজ কিছু বলুন।'
দাদু কিছু বলার আগে মাইকে একটি চড়ের শব্দ শোনা গেল। অনেকেই দেখলেন, দাদু মাইক কেড়ে নিয়ে তমালতরুর গালে একটি চড় কষিয়ে দিলেন। সেই চড়ের শব্দ এবং সঙ্গে সঙ্গে তমালতরুর আর্তনাদ ‘ওরে, বাপ রে!’ দাদুর হাতে যে মাইক সেটা দাদুর খেয়াল নেই। রাগের বশে দাদু বলে যাচ্ছেন, ‘হলধর আর সুদাম দুটোই হতচ্ছাড়া। আমার একাদশে আমার লোক নেই। এটা কি আমার শতবর্ষ উৎসব হচ্ছে না কি হলধরের বাঁদরামো? আর এই তুই ছোঁড়া, তোর বাপকে আমি জন্মাতে দেখলাম আর তুই কিনা বলছিল ফ্রাঙ্ক ওরেলের মতো আমি হাঁটছি। তুই কি ওর সঙ্গে রোজ মর্নিং ওয়াক করতিস। তোকে খড়মপেটা করা উচিত। আমি হাঁটুর ব্যথায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি আর তুই ছোঁড়া ওই খোঁড়ানোর মধ্যে আমার দৃপ্ত ভঙ্গি দেখছিস।'
তখনই বনদাদুর সুপারিশ করা ছেলেরা এসে দাদুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, 'দাদু আমাদের প্র্যাকটিস করিয়ে বাদ দিয়ে দিয়েছে। আমরা এর প্রতিকার চাই।'
দাদু মাইক হাতে নিয়েই ছিলেন। সেই অবস্থাতেই বললেন, ‘চলো আমরা ওয়াকআউট করি।
বাজারের বাইরে বসে রোজ সকালে পলতা পাতা, হেলেঞ্চা, মেথিশাক, থানকুনি পাতা এইসব বিক্রি করে মন্টু। দাদুর কথা শুনে মন্টু বলল, ‘ওয়াক আউটা সেটা আবার কী! আমাদের তো দলেই নিল না। আমরা আউট হলাম কেমন করে।
দাদু বললেন, ‘ওয়াক আউট মানে কোনও কিছুর প্রতিবাদে একযোগে স্থান ত্যাগ করা। আমরাও তাই করবঃ।
শেষপর্যন্ত দাদুকে থামালেন চিন্তামণি 'চক্রবর্তী, হলধরবাবু আর দুই আম্পায়ারা প্রায় হাতে-পায়ে ধরে দাদুকে ফেরানো হল। শর্ত হল, আমার পাঠানো পাঁচজন মা হোক অন্তত তিনজনকে নিতে হবে। শুরু হল ফুটপাথের জিনিস কেনার মতো দরাদরি। দাদু তিনের নীচে কিছুতেই নামবেন না। এদিকে সময় চলে যাচ্ছে। শেষপর্যন্ত দাদু তিন থেকে দুইয়ে নামলেন। এই দু’জনের একজন হল মন্টু, অন্য জন বিল্টের ছোটভাই লাল্টু। লাল্টুকে দেখে সুদাম বললেন, ‘ও তো একদিনও প্র্যাকটিস করেনি। ও কী করবে??”
দাদু দাবড়ানি দিয়ে বললেন, ‘বিল্টের পরিবর্তে লাল্টু খেলবে। তাতে যদি আমার একাদশ হারে তো হারবে। ভারত হেরে মরছে সেখানে বি বি এম একাদশ হারলে এমনকী অঘটন হবে। বনবিহারীর চাইতে গোবিন্দপুর অনেক বড়। গোবিন্দপুরই জিতুক। ওটা হবে আমাদের সবার জয়। দলবাজি ছেড়ে নিজের দেশটাকে আগে দেখ।
বনবিহারীবাবুর কথা বলার ভঙ্গি কণ্ঠস্বরের ওঠা-নামা আর আবেগ সবাইকে ছুঁয়ে গেল। হলধরবারু সুদামকে বললেন, ওদের দু'জনকে নিয়ে খেলা শুরু কর।
“গোবিন্দপুর একাদশ টসে জিতে ব্যাট করতে নামল। বি বি এম একাদশের ক্যাপ্টেন শান্তনু ফিল্ডিং সাজাবার আগে মন্টু' আর লাল্টকে বলল, “তোমরা ক্যাচ উঠলে ধরতে পারবে? অভ্যেস আছে?
শান্তনু বিরক্ত মুখে দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমাদের যেখানে যখন দাঁড়াতে বলব যেখানে দাঁড়াবে। বল যেন তোমাদের পাশ দিয়ে যেতে না পারে। বলের পেছনে ছুটে গিয়ে বাউন্ডারিগুলো বাঁচিয়ো।
লাল্টু শুধু ঘাড় নাড়ল। মন্টু বলল, 'আগে উঠুক তারপর তো ধরব।
খেলার শুরুতেই গোবিন্দপুর একাদশ হাত খুলে মারতে লাগল। ওয়ান ডে যে; মেজাজে খেলে আর কি! শান্তনু একটা ব্যাপার লক্ষ করল, মন্টু আর লাল্টু দারুণ ছুটতে পারে। অনেক বাউন্ডারি বাঁচিয়ে দিয়েছে। বল ধরে ছুড়ে মারে খুব জৌরে। হাতের-জোর আছে অনেকই, তবে 'থ্রোটা হয় আনাড়ির মতো। ঠিকমতো থ্রো হলে এতক্ষণে দুটো রান আউট হয়ে যেত। শান্তমু মনে মনে বিরক্ত হচ্ছিল আর ভাবছিল; তার দল থৈকে শৈষপর্যন্ত দু’জনকে দাদুর জেদের জন্য বাঁদ দিতে হল। তারা থাকলে গোবিন্দপুর একাদশকে আরও আগে আউট করা যেত। শান্তনু চেয়েছিল দেড়শো রানের মধ্যৌগোবিন্দপুরকে ফেলে দিতে। কিন্তু গোবিন্দপুর খেলা শেষ করল সাত উইকেট শেষে একশো আশি রানে। এবার বি বি এম একাদশকে জিততে হলে চল্লিশ ওভারে একশো একাশি করতে হবে। অথচ তার দলের এগারো জনের মধ্যে দু'জন তো খেলতেই জানে না। মন্টুর থ্রো এমনই যে, তার থেকে গোবিন্দপুর একাদশ পেয়েছে ষোলোটা ফালতু রান। নিজের দল নিয়ে মাঠ থেকে ফেরার সময় বনবিহারীরাবু শান্তনুকে ডেকে বললেন, ‘শোন, মন্টুকে থ্রি ডাউন পাঠাবি আর লাল্টুকে ওয়ান ডাউন। একশো আশি তুলতে তোদের বেগ পেতে হবে না।'
নিজে মাঠে নামবার সময়েও দাদু একই কথা বললেন কিন্তু শান্তনু কথাটা গায়েই মাখল না। আগে থেকে যেমন ভেবে রেখেছিল ব্যাটিং অর্ডার তেমনই রইল। মন্টু আর লাল্টু রয়েছে সবার শেষে। অর্থাৎ নয় আর দশ। শান্তনু জানে, ওরা যাবে আর ফেরত আসবে। আগে পাঠালে প্রতিপক্ষ সহজেই দুটো উইকেট পেয়ে বাড়তি মনোবল পেয়ে যাবে। অতএব, পরে পাঠানোই ভাল। চোদ্দো রানের মাথায় বি.বি এমের প্রথম উইকেট পড়ল। চল্লিশের আগে আরও একটা। শান্তনু দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাট করে যাচ্ছে। একশো আশি ছুঁতে এখনও আরও অনেক বাকি। তার দলের ব্যাটসম্যান বা খেলোয়াড় বলতে তো ন’জন। রাকি দু’জন তো ফালতু। অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো অবস্থা। ষাট রানের মাথায় চতুর্থ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর শান্তনু বুঝল তার দল একশো পর্যন্তও পৌঁছতে পারবে না। দলে এখন একমাত্র ভরসা সন্দীপ। কিন্তু সে আর সন্দীপ মিলে কি একশো একুশ করতে পারবে ? জেতাটা অসম্ভব মনে হচ্ছে শান্তনুর। দলে ভরসা করার মতো আরও দু’জন ব্যাটসম্যান থাকলে লড়াই করা যেত। মাথার মধ্যে চিন্তাটা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়ই আপাত নিরীহ একটা বল ছুটে আসছিল উইকেটের দিকে। বলের ফ্লাইট বুঝতে পারল না। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাট চালাল শান্তনু। দল ব্যাটে লাগল না। ব্ল্যাটের তলা দিয়ে গিয়ে উইকেটে লাগল। মাঠ ছেড়ে চলে আসার সময় দেখল রান মোটে সত্তর। নব্বই রানের মাথায় উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হল সন্দীপ। ছয় উইকেটে নব্বই। জিততে হলে এখন দরকার একানব্বই রান। এখনও যে চারজন ব্যাট করবে তারা কেউই এই রান তুলতে পারবে না। যতই ফ্রেন্ডলি ম্যাচ হোক, খেলতে নেমে কেউই হারতে চায় না। শান্তনুও চায়নি। শান্তনু টেন্টে এসে প্যাড খুলতে খুলতে ক্ষোভের গলায় বলল, ‘স্রেফ বুড়ো দাদুটার জন্য হেরে যাচ্ছি। অখিল আর সুনীলকে বাদ দিয়ে যাদের নিতে হল তারা তো আয়ারাম-গ্যারাম। যাবে আর আসবে। দু’বলে দু’জন। অখিল আর সুনীল অন্তত দশ-বিশ করে করতে পারত। গো-হারান হারতে হবে।
মাঠের সবাই সেইরকমই ভেবে রেখেছিল। একশো রানের মাথায় আট উইকেট পড়ে যাওয়ার পর লাল্টুকে নামানো হল। এর পর নামবে মন্টু। লাল্টু যখন ব্ল্যাট নিয়ে যাচ্ছে তখন শান্তনু প্রায় ধমকের সুরে মন্টুকে বলল, ‘রেডি হয়ে নে। লাল্টু তো এখনই চলে আসবে। তমালতরু যথারীতি ঘোষণা করে যাচ্ছিল। এবার দাদু তার হাত থেকে মাইক্রোফোনটা ছিনিয়ে বলতে লাগলেন, লাল্টু লড়ে যা। একাশি রান এমন কিছু কঠিন নয়। ওভারে ছয় রান দরকার। বলে বলে রান নে।
শান্তনু আর সুদাম সেন সেই ঘোষণা শুনলেন। সুদাম বললেন, মনে হচ্ছে মাঠে যেন লারা বা শচীন যাচ্ছে।
শান্তনু বলল, ‘বলে বলে রান আসবে না। উইকেট যাবে।'
লাল্টুর উইকেটে প্রথম যে বলটা এল সেটা মাটিতে পড়ে অফের দিকে চলে গেল। লাল্টু ব্যাট ওপরে তুলে বলটার দিকে চোখ রেখে বলটা ছেড়ে দিল। লাল্টুর বল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গি দেখেই সুদাম শান্তনুকে প্রশ্ন করলেন, ‘ছেলেটা কোন পাড়ার রে? আগে তো দেখিনি।' শান্তনু কিছু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উত্তর দিল, 'ও তো বিল্টের ভাই। কলকাতার হস্টেলে থাকে শুনেছি।'
সুদাম সেন বললেন, 'মনে হচ্ছে ছেলেটা জানে।'
শান্তনু অবাক গলায় বলল, ‘মোটে তো একটা বল হয়েছে। তাও ব্যাটে না লাগিয়ে ব্যাট তুলে নিল।'
সুদাম বললেন, ‘বল খেলার মতো বল ছাড়ার মধ্যে ব্যাটসম্যানের বাহাদুরি টের পাওয়া যায়।'
শান্তনু যদিও সুদামদার কথার সঙ্গে একমত হতে পারল না। যখন বলে বলে রান দরকার তখন বল ছাড়তে যাবে কেন। যদিও কথাগুলো মনে মনেই আওড়াল, মুখে কিছু বলল না।
দ্বিতীয় বল আসবার আগে দাদু মাইকে বলে উঠলেন, ‘এবার পাঁচ বলে ছয় দরকার।' তমাল মাইক নেওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু দাদুর হাত থেকে নেওয়ার সাধ্য কোথায়। দ্বিতীয় বলটা ফরওয়ার্ড খেলল। এগিয়ে গিয়ে ব্যাটে ব্লক করল। বলটা ব্যাট থেকে দেড় বিঘত দূরে গিয়ে থামল। সুদাম সেন হাততালি দিয়ে উঠতেই শান্তনু সুদামদার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘এটা কি পাঁচদিনের টেস্ট হচ্ছে! দুটো বলে একটাও রান নেই।'
সুদাম বললেন, ‘বলটা যদি বুঝে থাকিস তা হলে বুঝবি আমি কেন হাততালি দিলাম। এই বলে শচীন, লারা, গাওস্কর সবাই এটা করত।'
তৃতীয় বলটা মাটিতে পড়ার আগে লাল্টু এগিয়ে গিয়ে বলটাকে ফুলটস করে নিয়ে ব্যাট চালাল। ব্যাটে বল লাগার একটা শব্দ তারপরই বলটা বোলারের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে সীমানার বাইরে পড়তেই মাঠ জুড়ে হাততালির শব্দ উঠল। তারই মধ্যে মাইকে দাদুর গলা, ‘শাবাশ লাল্টু এই প্রথম মাঠে একটা ছক্কা দেখা গেল। এই ওভারে আরও রান করে রান রেট কমিয়ে আন।’
সুদাম হাততালি দিচ্ছিলেন। শান্তনুও তালি বাজাতে বাজাতে ভাবল, ‘ছেলেটাকে চার নম্বরে পাঠালে ভাল হত। কিন্তু ওকে তো কখনও দেখেইনি শান্তনু।'
প্রথম ওভারে এগারো রান করল লাল্টু। শেষ বলে একরান নিয়ে আবার ব্যাট করতে এল। বি বি এম একাদশের পরাজয় সম্পর্কে যাঁরা নিশ্চিত ছিলেন পাঁচ ওভার শেষ হওয়ার পর তাঁরা ভাবতে লাগলেন, লাল্টু উইকেটে টিকে গেলে খেলার ফল উলটোও হতে পারে। এখন দশ ওভারে অর্থাৎ ষাট বলে দরকার সাতচল্লিশ রান। সুদাম বললেন, ‘খেলাটা ঘুরে গেছে। ওই লাল্টুই ঘুরিয়ে দিল। তোর হাতে যদি আর একটা ডিপেন্ডেবল ব্যাটসম্যান থাকত তা হলে খেলাটাকে দিব্যি বার করে আনা যেত।'
শান্তনু কোনও কথা বলল না। তার এখন বেজায় আফশোস হচ্ছে লাল্টুকে আগে না নামানোর জন্য। এর জন্য মনে মনে সে নিজেকে দায়ী করছিল। কিন্তু সেই-বা জানবে কেমন করে যে, বিল্টের ভাই লাল্টু এতটা ভাল খেলে। জয়ের জন্য যখন সাঁইত্রিশ রান দরকার তখন বিমল স্কোয়ার লেগে ক্যাচ দিয়ে আউট হতেই শান্তনু আক্ষেপের গলায় বলে উঠল, ‘হয়ে গেল। এবার লাস্ট ব্যাটসম্যান মন্টু। ক্রিজে এসেই ফেস করবে সুমনের বল। ফার্স্ট বলেই খেলা শেষ। সাঁইত্রিশ রানে আমরা হারছি।'
মাইকে আবার দাদুর গলা, ‘মন্টে, ব্যাট তুলবি না। লাল্টুকে খেলতে দে। এখন আউট হলে তোর শাক-পাতার দোকান তুলে দেব।'
হঠাৎ হলধর হালদার চিন্তামণিবাবুকে বললেন, ‘চিন্তাদা, আর কিন্তু দাদুর লক্ষণ ভাল মনে হচ্ছে না।'
চিন্তামণিবাবু বললেন, ‘কেন? কী হয়েছে?’
হলধর বললেন, ‘এই বয়সে মাইক নিয়ে চ্যাঁচাচ্ছেন। সারা শরীর ঘামছে। কিছু অঘটন না ঘটে যায়!’
চিন্তামণিবাবু বললেন, ‘মাঠে কোনও ডাক্তার আছে?'
হলধরবাবু উত্তর দিলেন, ‘দু’জন ডাক্তার তো দু’পাশে বসানো আছে।'
চিন্তামণিবাবু বললেন, ‘কোনও রিস্ক নেওয়ার দরকার নেই। ডাক্তারদের কাজ শুরু করতে বলুন।'
হলধরবাবু বললেন, ‘এই মাঠের মধ্যেই?’
চিন্তামণিবাবু বললেন, ‘টেন্টে নিয়ে চলুন।’
কিন্তু বনবিহারীবাবু কোনও কথা শুনলেন না। ডাক্তারবাবুদের বললেন, ‘আমি খেলা দেখছি, তোমরা আমাকে ওয়াচ করো। গেলবার কিছু থাকলে গিলিয়ে দাও। খেলা ছেড়ে উঠব না। পলতা পাতার মন্টুও চার হেঁকেছে। এখন মাঠ ছাড়া যায়!’
দু’জন ডাক্তারই মনে মনে বিরক্ত হলেন কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারলেন না। একজন কিছু একটা বলতে গিয়েছিল। দাদু তাকে ধমকে দিয়ে বলেছেন, ‘চিত করে খাটে না শোয়ালে বুঝি চিকিৎসা হয় না। আমি বসে আছি, দেখতে হলে এভাবেই আমাকে দেখো।'
গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে দুই ডাক্তারবাবু তাঁকে দেখে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে লাল্টু একস্ট্রা কভার দিয়ে আরও একটা বাউন্ডারি মেরে দলের রান একশো একাত্তরে নিয়ে যাওয়ার পরই দাদু এমনভাবে দু’দিকে হাত ছুড়লেন যে গার্ডেন চেয়ারে বসা দু’পাশের দুই জোয়ান ডাক্তার হাতের স্টেথোসমেত পাশের চেয়ারে টাল খেয়ে পড়লেন। দাদুর গলার স্বর যেন সপ্তমে। দাদু বললেন, ‘লাস্ট ওভার। ছয় বলে দশ রান। হয়ে যাবে লাল্টু। শারজায় মিয়াঁদাদ লাস্ট বলে ছক্কা মেরেছিল। ছয় বলে দশ হয়ে যাবে।'
সুদাম তখন গোবিন্দপুর একাদশের টিম ম্যানেজারকে বললেন, 'দাদুর অবস্থা ভাল না। আপনি ক্যাপ্টেনকে বলে পাঠান, লাল্টুকে যেন মারবার বল দেয়। দাদুর দল হারলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।'
গোবিন্দপুরের টিম ম্যানেজার বলাই পাল বললেন, ‘আমি গণাকে দিয়ে মাঠে মেসেজ পাঠাচ্ছি।'
কথা শেষ করে গণাকে কাছে ডাকার আগেই শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে লাল্টু আবার একটা ওভার বাউন্ডারি মারতেই সারা মাঠ উত্তেজনায় কেঁপে গেল। মাঠের এদিকে-ওদিকে পটকা ফাটতে লাগল। দাদুর তখন কথা বলার অবস্থা নেই। শরীর ঘেমে যাচ্ছে। মাঠ ছাড়বেন না বলে মাঠেই আরামকেদারা এনে তাতে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করছে ছেলেরা। দাদুর জিভের তলায় রাখা হয়েছে ট্যাবলেট। প্রেশার মাপছেন একজন ডাক্তার। দাদু ক্লান্ত চোখের পাতা খুলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কটা বল বাকি? রান কত?’
ডাক্তারবাবু সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘ভয় নেই দাদু, আপনার দল জিতে যাবে।' দাদু হাসলেন। বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে দাদুকে। চোখ খুললেন না। চোখ বন্ধ রেখেই বললেন, ‘আমার কোনও দল নেই। তোমরা, এই গোবিন্দপুরের সবাই আমার একাদশের সদস্য। একশো বছরের জীবনে জয়-পরাজয় কম দেখিনি। আমি চাই আজকের ছেলেরা জিতুক। লাল্টুরা জিতুক। বাবা-মা মরা ছেলে। একমাত্র দাদা বিল্টে মুদি দোকানে কাজ করে। লাল্টুকে আমিই পয়সা দিয়ে লেখাপড়া শিখতে হস্টেলে পাঠিয়েছি। এই পিছিয়ে-পড়া ছেলেরা এগিয়ে গেলেই আমার জয়। এই জয়ের আনন্দ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও খুব বেশি আসেনি। আমরা কেউ তো কথা রাখতে পারিনি।'
দাদুর বন্ধ চোখের পাতা দিয়ে জল গড়িয়ে আসছিল।
গোটা মাঠ জুড়ে তখন প্রবল চিৎকার। দাদু অস্ফুটে বললেন, ‘কী হল?’
হলধর বললেন, ‘শেষ বলে লাল্টু ছয় মারতে চেয়েছিল। কিন্তু চার হয়ে গেছে। খেলা ড্র। অদ্ভুত ব্যাপার। লাল্টু ম্যান অব দ্য ম্যাচ।'
হলধরবাবু এগিয়ে এসে দাদুর চোখের জল মুছিয়ে দিতে হাত বাড়ালেন। বনবিহারীবাবু তাঁর হাতটা ধরে বললেন, ‘হলধর, শতায়ু বৃদ্ধের চোখের জল নাই বা মোছালে। শুধু দ্যাখো, যারা রইল, যারা থাকবে, তাদের চোখে যেন জল না আসে। তা ছাড়া এ তো আনন্দের অশ্রু। এর স্বাদ আলাদা।'
দাদু আস্তে আস্তে মাথা তুললেন। তাঁর সামনে খেলোয়াড়রা সার-বেঁধে দাঁড়িয়ে। দাদু হাসিমুখে সবার দিকে তাকালেন। লাল্টু এগিয়ে এসে দাদুর চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘তোমার চোখে জল দেখলে আমাদের চোখও ঝাপসা হয়ে যায়। ঝাপসা চোখে ব্যাট করা যায় না।'
দাদু হাসতে হাসতে বললেন, ‘রাইট। জীবনের সঙ্গে লড়াই করতে হলে কঠিন সমস্যা আর মুহূর্তগুলো জীবনের বাইরে ফেলে দিতে হয়। যেমন করে বাউন্ডারি মারে। সেটা ঝাপসা চোখে হয় না।'
দাদু দু'চোখ মেলে ছেলেদের দিকে তাকালেন। শুধু গোবিন্দপুর নয়। যেন ভারতের ম্যাপের মতো এই তাজা ছেলেগুলো তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। দাদু হাসলেন। তাঁর চোখ আবার ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল।
.
আনন্দমেলা, এপ্রিল ১৯৯৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন