দুলেন্দ্র ভৌমিক

ভানু আর কানুকে গৌরীপুরের সবাই মোটামুটি চিনে ফেলেছিল। এই চিনে ফেলাই ওদের দু’জনের পক্ষে বিপদের কারণ হয়ে উঠল। একদিন বিষাদমাখা গলায় কানু ভানুকে বলল, ‘বুঝলি ভানু, গৌরীপুরে আর থাকা চলে না। সবাই আমাদের মতলব বুঝে ফেলেছে।'
ভানু চোরকাঁটা গাছের সরু ডাঁটিটা দাঁতে চেপে ধরে চিন্তিতমুখে বলল, ‘বড্ড ভাবনায় পড়েছি। কী করা যায় তাই তো ভেবে পাচ্ছি না। তোর মাথায় কোনও বুদ্ধি আসছে?’
কানু একটু বেপরোয়া গলায় জবাব দিল, ‘বুদ্ধি তো একটাই। আর সেটা হচ্ছে গৌরীপুর ছেড়ে পালানো।’
ভানু আর কানু বসে ছিল বিলকান্দার জলার ধারে। এই জায়গাটা বেশ নির্জন। দিনদুপুরে লোকজন আসা-যাওয়া করলেও সন্ধের পর কেউ আসে না। গৌরীপুরের মানুষরা তো বটেই, এমনকী এই গ্রামের গোরু-ছাগলও বুঝি বিশ্বাস করে, বিলকান্দার ধারে ভূত-পেতনিরা কিলবিল করে। সন্ধ্যার পর অনেকেই নাকি তেনাদের দেখেছেন। সেইজন্যই সবাই এই জায়গাটা এড়িয়ে চলে আর সেই কারণেই ভানু আর কানুর এই জায়গাটা বিশেষ পছন্দ। বিলকান্দার ধারে খানকয়েক শ্যাওড়া গাছ আর দুটো তাল গাছ। ওইসব গাছে গাছেই নাকি ভূতেদের সংসার। সংসারে এক-আধটু ঝগড়াঝাটি তো হয়েই থাকে, অতএব ভূতেদের সংসারেও হত। তেনাদের নাকি সুরের ঝগড়াও কেউ কেউ শুনেছেন। ভানু আর কানু দু’জনেই সবচেয়ে বড় শ্যাওড়া গাছটার নীচে বসে ছিল। এবার গাছের গায়ে হেলান দিয়ে ভানু পা দুটো সামনের দিকে ছড়িয়ে দিতে দিতে বলল, ‘পালাব বললেই তো আর পালানো যায় না। পালিয়ে যাব কোথায়? নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন করে কাজকম্ম শুরু করতে অনেকদিন লেগে যাবে। তদ্দিন খাব কী?’
কানুও ভানুর মতো পা দুটো সামনের দিকে মেলে দিতে দিতে বলল, ‘তা হলে আর ভেবে লাভ কী! যেমন চলছিল তেমনই চলুক।'
ভানুর গলায় এবার ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে উঠল। শরীরটা সোজা করে বলল, ‘তেমন আর চলবে না বলেই তো এত ভাবনা। গাঁয়ের ছেলে বলে এখন গাল-মন্দ আর লাথি-ঘুসি জুটছে। এরপর আর গাঁয়ের ছেলে বলে ক্ষ্যামা দেবে না। সোজা থানায় দিয়ে আসবে।'
কানু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘সেইজন্যই তো বলছি, এবারে গাঁয়ের মায়া কাটিয়ে বেড়িয়ে পড়।'
ভানু কোনও কথা বলল না। দু'জনে পাশাপাশি বসে ভাবতে লাগল। ওরা দু’জনে যতক্ষণ ভাবছে ভাবুক, সেই অবসরে ওদের দু’জনের পরিচয়টা একটু গুছিয়ে বলা যাক।

গৌরীপুরের মণ্ডলপাড়ায় ভানু আর কানুর বাস। গাঁয়ের অনেকেই জানে ওরা দু’ভাই। আসলে কিন্তু তা নয়। কিন্তু ওদের দু’জনকে দুই ভাই বলে অন্যরা পরিচয় দিলে ওরা আপত্তি করে না। ভানুর বাবা ঘরামির কাজ করতেন। মানে খড় দিয়ে ঘর ছাওয়া, ঘরের মাথায় টালি বসানো, মাটির দেওয়াল তৈরি করা এইসব করতেন। কানুর তো বাবা-মা’র কথা মনেই পড়ে না। ভানুর বাবা সন্ধেবেলা কাজ করে ফেরার পথে ইটভাটার কাছে কানুকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। একটা ঝুড়ির মধ্যে কলাপাতা পেতে তার ওপর এই দু’মাসের বাচ্চাকে কে যেন ফেলে রেখে গিয়েছিল। সেই থেকে কানু মণ্ডলপাড়ায়। ভানুর বাবা মতিলাল তাঁর ছেলে ভানুর সঙ্গে মিলিয়ে নাম রেখেছিলেন কানু।
ছেলেবেলায় দু’জনেই স্কুলে যেত। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছিল। কিন্তু তারপর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। ভানুর বাবা-মা কলেরায় মারা গেলেন একই সপ্তাহে। একজন সোমবার, অন্যজন শুক্রবার। দু'জনেই তখন কিশোর। মাথার ওপর কেউ নেই। উপদেশ দেওয়ার লোক আছে, খেতে দেওয়ার কেউ নেই। মণ্ডলপাড়ার মাতব্বররা বললেন, ‘দ্যাখো বাবা, প্রাণে বাঁচলে তো লেখাপড়া। খালি পেটে বিদ্যে অর্জন হয় না। তোদের বংশে কেই-বা কবে লেখাপড়া করেছে। তার চেয়ে কাজে লেগে যা।
‘কাজে লেগে যা’ বললেই তো আর কাজ জোটে না। তার জন্যও বিস্তর ধরাধরি করতে হয়। পঞ্চায়েতে অনেকরকম বাবু, এ বলে এক কথা, ও বলে অন্য কথা। ঘোরাঘুরিই সার, কাজ আর হয় না। এরকম সময়ে একদিন গজেন পাল ওদের দু'জনকে লোক দিয়ে ডেকে পাঠালেন। ওরা তো হাতজোড় করে গিয়ে দাঁড়াল গজেন পালের কাছে। পালমশাই বেশ পয়সাওয়ালা লোক। তিনি কৃপা করলে ভানু-কানুর ভাগ্য বদলে যাবে এমন একটা ধারণা নিয়েই ওরা দু’জন গিয়ে দাঁড়াল। গজেনবাবু ওদের দু’জনের দিকে একবার দেখে নিয়েই প্রশ্ন করলেন, “হ্যাঁ রে, তোরা তো কাজ খুঁজছিস, তা আমার কাছে কাজ করবি?
ওরা দু’জনেই বলল, ‘হ্যাঁ, করব। কী করতে হবে?’
গজেন পাল বললেন, ‘তোরা রাত্রে বিলকান্দার বিলটা পাহারা দিবি। দিনে আরাম করে ঘুমোবি, রাত্রে কাজ করবি। শহরে বড় বড় লোকেরা রাত্রে কাজ করে। তাকে বলে নাইট ডিউটি।
পালমশাইয়ের কথা শুনে দু’জনে শিউরে উঠে বলল, ‘এ যে বড় কঠিন কম্ম! অতবড় বিল, তার ওপর ওখানে ভূতেদের রাজ্যি। আমাদের দু'জনের ঘাড় মটকে দেবে।'
গজেন পাল দু’জনকে ছোট্ট একটা ধমক দিয়ে বললেন, ‘তোরা শুধু বিলের দক্ষিণ দিকটায় থাকবি। অন্যদিকে পাহারার দরকার নেই। বিলের মাছ যারা চুরি করে তারা দক্ষিণ দিক থেকেই নামে। অন্যদিক থেকে নামবার উপায় নেই।'
ভানু বলল, ‘ভূতের রাজত্ব তো দক্ষিণ দিকেই।'
গজেন পাল একটু হেসে বললেন, 'সব মিছে কথা। দক্ষিণের জমিগুলো জলের দরে কেনবার জন্যই আমি ভূতের গপ্পো চাউর করেছি। জমি তো পেয়েছি, কিন্তু রোজ রাতে যদি দশ-বিশ কিলো করে মাছ চুরি হয়ে যায় তাহলে কি ব্যাবসা টেকে! তাই আমাকে মাছ চুরি বন্ধ করার জন্য পাহারা বসাতে হবে।'
কানু একটু শঙ্কিত হয়ে বলল, ‘একা একজন লোক তো মাছ চুরি করতে আসে না। যদি তিন-চারজন আসে তাহলে আমরা দু’জনে কি তাদের সঙ্গে পেরে উঠব?’
গজেন পাল মুগ্ধ দৃষ্টিতে কানুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কানু, তোমার হবে। তোমার বুদ্ধি আছে। শোনো, তোমাদের লাঠি হাতে পাহারা দিতে হবে না। বিলকান্দার বিলের কাছেই গুপি থাকে। গুপি গড়াই। তোমরা সন্ধ্যার পর চুপিচুপি গুপির কাছে যাবে। ও তোমাদের ভূত সাজিয়ে দেবে। তোমরা ভূত হয়ে দুটো গাছে বসে থাকবে। গণ্ডগোল দেখলেই নাকিগলায় বলবে, ‘কে রে, কে জলার ধারে।' তারপর খিকখিক করে হাসবে।'
ভানু বলল, ‘তাতে যদি ভয় না পায়?’
গজেন পাল বললেন, ‘পাওয়া উচিত। না পেলে তোমাদের যে-দুটো বাঁশি দেওয়া হবে সেই দুটোতে ফুঁ দেবে। ফুঁ দিলেই বাঁশি থেকে যেমন শব্দ বেরোয় তেমন শব্দ বেরোবে না।' কানু প্রশ্ন করল, ‘তবে কেমন শব্দ বেরোবে?’
গজেন পাল বললেন, ‘বিদঘুটে শব্দ। ওই ধরো, শকুনের কান্নার মতো। তাতে ওরাও ভয় পাবে, গুপিও গাদাবন্দুক নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবে।'
কানু বলল, ‘গুপিবাবু গাদাবন্দুক নিয়ে তো আমাদের সঙ্গেই থাকতে পারেন। তাতে লোকবলও বাড়ে, আমরাও সাহস পাই।'
গজেন পাল বললেন, ‘তাই যদি হত তাহলে আর তোমাদের ডেকেছি কেন? গুপিও সারারাত আমারই কাজ করে। কাজ ফেলে রাতভোর পাহারা দেবে কেমন করে! আগে যে-দুটো ছেলে আমার হয়ে এই কাজটা করত তারা তো কলকাতার যাত্রাদলে চাকরি পেয়ে চলে গেছে। ওরা যাওয়ার পর আবার চুরি বেড়ে গেছে। ব্যাপারটা বুঝতে পারলে তো! মাছ চোর দেখলেই প্রথমে নাকিসুরে কথা বলবে, তারপরও যদি দ্যাখো ওরা চুরি করেই চলেছে তাহলে বাঁশি বাজাবে। তাতে শকুনের কান্না হবে। বুঝেছ তো?’
কানু একবার ভানুর দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘এখনও পুরোটা বুঝিনি। শকুনের কান্না তো কখনও শোনা হয়নি। ওরা কেমন করে কাঁদে? আমার-আপনার মতো?’
গজেন পাল বললেন, ‘ওসব ভাববার দরকার নেই। গুপি তোমাদের সব বুঝিয়ে দেবে। এবার বলো, কাজটা তোমরা করবে তো?’
কানু·আর ভানু দু’জনে দু’জনের দিকে তাকাল। ভানু বলল, ‘নতুন কাজে জয়েন করছি তো স্যার! জীবনের প্রথম চাকরি। একটু ভেবে দেখি। ভেবে এসে কাল আপনাকে বলব।'
ভানু কথা শেষ করার পর কানু বলল, 'স্যার, মাইনে কত?’
গজেন পাল প্রশ্ন করলেন, ‘কত আশা করো?’
কানু বলল, ‘আশার কথা বলবেন না স্যর। আশার কি শেষ আছে! তবে লাগাতার নাইট ডিউটি, একটু বিবেচনা করে বলুন।'
গজেন পাল ছোট্ট একটা কৌটো থেকে এলাচদানা বার করে মুখে দিলেন। দাঁত দিয়ে কুটুস কুটুস করে সেই এলাচদানা ভেঙে নিয়ে বললেন, 'আগে যারা ছিল তারা একশো করে পেত। তোমাদের না হয় একশো দশ দেব।'
ভানু বেতনের হিসেবটা পরিষ্কার করে নেওয়ার জন্য বলল, ‘মানে, দু’জনে একশো দশ করে মাসে দুশো কুড়ি তাই তো?’
গজেন পাল ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন। কানু বলল, ‘আমরা কাল এসে কথা বলব।' গজেন পাল এবার গম্ভীর গলায় বললেন, 'তোমরা এই কাজটা করো বা না করো সেটা তোমাদের ইচ্ছে। কিন্তু ভূতের ব্যাপারটা কাউকে বলতে পারবে না। যদি তোমাদের মুখ থেকে কথাটা ফাঁস হয় তাহলে তোমাদের কপালে অশেষ দুঃখ।
ভানু এবং কানু দু'জনেই জানে বড়মানুষদের চটাতে নেই। তেনারা চটলে দুঃখ তো পেতেই হবে। তাই ওরা দুজনে বলল, ‘আমরা যে কথা একবার শুনি, সেটা শোনার পর গিলে ফেলি। ও আর বার হয় না।'
দু’জনে ফিরে এসে ভাবল, শেষপর্যন্ত ভূত সাজার চাকরি। বেতন না হয় কিছু পাওয়া যাবে, কিন্তু ভূত সেজে কতকাল পাহারা দেবে! কানু-ফস করে ভানুকে বলল, ‘হ্যাঁ রে, সব চাকরিতে তো শুনেছি প্রমোশন হয়। ভূতের চাকরিতে কি প্রমোশন হয়! যদি হয় তবে সেটা কেমন?’
ভানু উত্তর দিল, ‘ভূত থেকে ব্রহ্মদত্যি, এর বেশি আর কী হবে! আমার কী মনে হচ্ছে জানিস?’
কানু জিজ্ঞেস করল, ‘কী?’
ভানু বলল, ‘বেকার বসে না থেকে মাসখানেক কাজটা করে দেখি। যদি পোষায় তা হলে কাজটা করে যাব। যদি না পোষায় তা হলে করব না।'
কানু কোনও কথা বলল না।
দু’জনে অনেক ভেবেটেবে গজেন পালের হয়ে ভূত সাজার চাকরিটা নিয়েই ফেলল। লোকজনদের বলল, 'রাতের বেলায় মাছ পাহারা দেওয়ার চাকরি। আসলে তো তা নয়, আসল চাকরি তো ভূত সেজে থাকার। না নিয়ে কোনও উপায়ও ছিল না। দু’জনের দুটো পেট চলবে কেমন করে। মিরগঞ্জের হাটে গিয়ে ব্যাপারিদের হয়ে খাটাখাটনি আর ওরই মধ্যে কখনও সুযোগ বুঝে একটা লাউ, আধখানা পাকা কুমড়ো কিংবা দু’আঁটি শাক জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে রাখা। হাটভাঙার পর ওইসব চুরি করা জিনিস এনে লোকের দরজায় গিয়ে বিক্রি করা। তাতে দেড়-দু'টাকা বাড়তি রোজগার। কিন্তু এতে কি জোয়ান দুটো ছেলের পেটের খিদে মেটে?’
মিটত না। মিটত না বলেই ছোটখাটো চুরির অভ্যেস রপ্ত হয়ে গিয়েছিল। গোড়ার দিকে ভানু মিনমিন করে আপত্তি করত, কিন্তু কানুর বুদ্ধিতে আর তাড়নায় সেই আপত্তি বেশিক্ষণ টিকত না। এইসব ছোটখাটো চুরি করতে গিয়ে ভানু-কানুর বিপদও ঘটত মাঝে মধ্যে। একবার অন্ধকার রাত্রে পাঁচু মণ্ডলের ঝুড়ি থেকে একফানা সিঙ্গাপুরি কলা তুলে নিয়ে চাদরের তলায় ঢুকিয়েছিল। চাদরের তলাতে আঙুল দিয়ে গুনতে গুনতে কানু বলেছিল, ‘ভানু পুরো বারোটা আছে। বাজারে এখন এই কলা দেড় টাকা করে যাচ্ছে। মোট আঠারো টাকার জিনিস। এ একেবারে আসল সিঙ্গাপুরি।'
ভানু বলল, ‘রাত্রিবেলা এই কলা বেচবি কোথায়?’
কানু একটু ভেবে নিয়ে বলল, 'চল, বামুনপিসির কাছে যাই। ওঁরা খুব ফলটল কেনেন। আমাদের ভালও বাসেন। গত হপ্তায় আমি মিরগঞ্জের হাট থেকে বামুনপিসির জন্য থানকুনি পাতা এনে দিয়েছিলাম। তারপর থেকে রোজই জোগাড় করে এনে দিই।'
ভানু বলল, ‘তবে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চল। বেশি রাত হলে বুড়ি ঘুমিয়ে পড়বেন।' কানু পা চালাতে চালাতে বলল, ‘সবে তো সন্ধ্যা গড়িয়েছে। মনে হয় সাতটা হবে কি হচ্ছে।'
বামুনপিসির সঙ্গে বেশি দরাদরি করতে হয়নি। বারো টাকা দিয়ে কলাগুলো কিনে নিয়েছিলেন। বামুনপিসির বারান্দা জুড়ে শেষ অঘ্রানের অন্ধকার বেশ ঘন। মাঝে মাঝে রাস্তার বাতিগুলো যেমন জ্বলে না, তেমনই ছিল সেইদিনের সন্ধ্যাটা। কলা দিয়ে বারো টাকা নিয়ে দু’জনে এসেছিল বাজারে নিজেদের খাবার কিনতে। পরের দিন সকালে বামুনপিসিকে থানকুনি পাতা দিতে গিয়েছিল কানু। দরজার গোড়া থেকে ‘পিসি’ বলে ডাকতেই দরজা খুলে পিসি রুদ্রমূর্তিতে বেরিয়ে এসেই চিৎকার, ‘হ্যা রে কানু, তুই কি মানুষ! পিসিকে ভর সন্ধেবেলা ঠকিয়ে গেলি। চোখে কম দেখি, অন্ধকারে ভাল দেখতে পাইনে, তুই সেই সুযোগটা নিলি হতভাগা!’
পিসি গর্জন করে উঠে বললেন, ‘সরু সরু এক ডজন কাঁচকলা আমায় সিঙ্গাপুরি বলে বেচে গেলি। দাঁড়া, তোর মজা আমি দেখাচ্ছি। কই রে, বিপিন, কোথায় গেলি। কানু ছোঁড়াটা এয়েচে। ওকে একবার ময়দা ডলা ডলে দে।'
বিপিনকে কানু বিলক্ষণ চেনে। ঘুসি মেরে ডাব ফাটায়, এক লাথিতে দরজা ভেঙে ফেলে, একবার ডোবায় পড়ে যাওয়া একটা রিকশা একাই দু’হাতে তুলে ফেলেছিল। সেই বিপিন যদি তাকে বারদুই ময়দা ডলে তাহলে সে তো গোরুর গাড়ির চাকার তলায় চেপটে যাওয়া কলার মতোই হয়ে যাবে। কানু আর দাঁড়াতে সাহস করেনি। বিপিন দরজায় এসে দাঁড়াতেই কানু ভোঁ-দৌড় দিয়েছিল। সেই দৌড় থেমেছিল সদর রাস্তায় এসে। এ ব্যাপারটাতে কানু ওস্তাদ। ওর লিকলিকে শরীরটা যখন দৌড়ে যায় তখন সাইকেল চেপে তাড়া করেও ওকে ধরা যায় না। ওর এই দৌড় দেখে হাই স্কুলের হেডমাস্টারমশাই একবার বলেছিলেন, ‘তুই অলিম্পিকে নির্ঘাত ভারতের হয়ে সোনা আনতিস।'
ভানুর শরীর অত লিকলিকে নয়। বেশ নাদুসনুদুস। বেশিক্ষণ দৌড়তে পারে না। কিন্তু গায়ে জোর আছে। দু’জনকে পাশাপাশি দেখে সবাই ঠাট্টা করে বলে মিরগঞ্জের লরেল-হার্ডি। ওরা দু’জনে এই ঠাট্টাটা উপভোগ করে। যদিও লরেল-হার্ডি সম্পর্কে ওদের দু’জনের কোনও ধারণাই নেই। তবে নাম দুটো যে সাহেবের, সেটুকু লোকের কথা শুনে বুঝতে পারে। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় ওদের দু'জনকে দেখে হেডমাস্টারমশাই হালকা সুরে বলেছিলেন, 'লরেল-হার্ডি, কোথায় চললি?’
কানু এগিয়ে এসে মাস্টারমশাইকে প্রণাম করে বলল, 'স্যার, লরেলদা কি আমাদের গাঁয়ের লোক, না কি কলকাতার?’
আর একবার হল কী, ইস্টিশনের প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে দু’জনে বসে আখ চিবোচ্ছিল।
স্টেশনে বেশ লোক রয়েছে। গাড়ি এলে সব লোক গাড়িতে উঠে পড়ে এবং স্টেশনটা ফাঁকা হয়ে যায়। ঠিক তেমনই হল। স্টেশন ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পর দেখল প্ল্যাটফর্মের ওপর কী যেন একটা পড়ে আছে। দু’জনে কাছে গিয়ে দেখল একগাঁট গামছা। একগাঁট গামছা মানে বেশ কিছু নতুন গামছার একটা বান্ডিল, যা পাটের দড়ি দিয়ে বাঁধা। ভানু বলল, ‘তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে ওঠবার সময় কেউ বোধহয় ফেলে গেছে।'
কানু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘কেউ যদি ভুল করে তাতে আমাদের কী করবার আছে?' ভানু বলল, ‘অত গামছা পড়ে থাকবে?
কানু বলল, ‘তাও কখনও হয় নাকি! ফাঁকা ইস্টিশনে ওদের একা ফেলে রাখা খারাপ। রাত্রে হিম পড়ে গামছাগুলো ভিজে যাবে। আমরাই ওদের ঘরে নিয়ে যাব।'
ভানু একটু ভয় পেয়ে বলল, ‘এটা কিন্তু কারও গাছের নারকোল, আম বা জামরুল নয়। কেউ দেখে ফেললে বিপদ হবে।'
কানু বলল, ‘আমরা এখানে দাঁড়িয়ে পাঁচশো পর্যন্ত গুনব। তার মধ্যে যদি কেউ এসে নিয়ে যায় নিয়ে যাবে, নইলে বুঝতে হবে এটা ভগবানের দান।'
পাঁচশো পর্যন্ত গোনার পরও কেউ এল না। কানু এবার ভানুর দিকে তাকাল। ভানু বলল, ‘আরও পঞ্চাশ পর্যন্ত গোন।'
কানু তাই করল। ইতিমধ্যে আরও একটা ট্রেন এল এবং চলেও গেল। গোনা শেষ হতেই ভানু বলল, ‘আরও পঞ্চাশ গুনলে হত না?’
কানু প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বলল, ‘আর গ্রেস দেওয়া সম্ভব নয়। তুই আমায় অন্যায় অনুরোধ করিস না।
অগত্যা গামছার গাঁট কাঁধে নিয়ে দু’জনে বাড়িতে এসে গুনে দেখল মোট পঞ্চাশখানা গামছা আছে। ভানু বলল, ‘এত গামছা দিয়ে আমরা কী করব?
কানু গামছাগুলো সাজিয়ে রাখতে রাখতে বলল, ‘কালকের হাটে গিয়ে গামছার দরদাম জেনে আসব। তারপর এগুলো বেচে দেব।'
ভানু জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় বেচবি? মিরগঞ্জের হাটে?’
কানু উত্তর দিল, ‘এখানে অত গামছা নিয়ে বসলে সবাই সন্দেহ করবে। আমরা যাব আমডাঙার হাটে। ওখানে আমাদের তেমন কেউ চেনে না।'
ভানুও বুঝল, কানুর যুক্তিটা ঠিক। কিন্তু আমডাঙার হাটে গিয়েই ওদের দু’জনের বিপদ হল। গামছার গাঁট খুলে গামছা সাজিয়ে বসে কানু হাঁকতে লাগল, ‘গামছা গামছা, গা মোছা থেকে মাথা মোছা সব চলবে। রং পাকা। শস্তায় নিয়ে যান।'
অন্যদের থেকে শস্তাতেই বিক্রি করছিল। টুকটাক বিক্রিও হচ্ছিল। তখনই ঘটল ঘটনা। কথায় বলে না, বিপদ কখনও নোটিশ দিয়ে আসে না। সেইরকম বিনা নোটিশে একজন লোক এসে জিজ্ঞেস করল, ‘এত শস্তায় দিচ্ছ, পড়তায় পোষাচ্ছে তো? কেনা দাম কত?’
ওরা কেউ উত্তর দিল না। লোকটা আবার বলল, 'আমারও গামছার ব্যাবসা। তোমাদের কেনা দর কত?’
ভানু উত্তর দিল, ‘ব্যাবসার গোপন কথা আপনাকে বলতে যাব কেন?’ লোকটা বলল, ‘তোমরা কোন হাট থেকে জিনিসপত্র কেনো?’
ভানু আর কানু দু’জনের দিকে একবার তাকাল। কানু বলল, ‘মিরগঞ্জের বড় হাট থেকে।' লোকটা বলল, ‘ছিদামের দোকান থেকে?’ ভানু বলল, ‘হ্যাঁ।'
লোকটা চলে যেতে যেতে বার দুই ওদের দিকে তাকাল। লোকটা চোখের আড়াল হওয়ার পর ভানু বলল, ‘ভাব-সাব ভাল ঠেকছে না রে কানু। মানে মানে গামছা গুটিয়ে কেটে পড়া ভাল।'
কানু সায় দিয়ে বলল, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। লোকটা গামছাগুলোর দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিল তাতে মনে হচ্ছে এই গামছাগুলো ওর চেনা।'
ভানু বলল, ‘তাড়াতাড়ি দোকান গুটিয়ে ফ্যাল।
কিন্তু গোটানো শেষ করার আগে লোকটা এল ছিদামকে সঙ্গে নিয়ে। ছিদাম ওদের দু’জনকে দেখে চমকে উঠে বলল, ‘তোরা! তোরা গামছা বিক্রি করছিস। এই গামছা পেলি কোথায়?’
কানু নিজেকে সহজ করার ভঙ্গিতে বলল, ‘কী যে বলো ছিদামকাকু! গামছা কি গাছে পাওয়া যায়? দোকান থেকে কিনলুম।'
ছিদাম কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কার দোকান থেকে?’
লোকটা, যে ছিদামকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে, সে বলল, ‘ওরা তো বলছে তোমার দোকান থেকে।'
ছিদাম অবাক গলায় বলল, 'আমার দোকান থেকে!’
কানু বলল, ‘দূর মশাই, ছিদাম কি শুধু একজন আছে নাকি? আমাদের ছিদাম হালতুর লোক। ইস্টিশনে পাইকারি বিক্রি করছিল, কিনে নিয়েছি।'
‘ইস্টিশন’ কথাটা উচ্চারণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকটা মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠল, 'ইস্টিশনেই তো আমার গামছার গাঁট খোয়া গেছে। এই গামছা আমার।' কানু গামছার গাঁট কাঁধে ফেলে বলল, ‘গামছা তোমার গলায় দেব।
কথা শেষ করেই কানু সেই ভোঁ-দৌড় দিল আর ভানু উলটোদিকে, অর্থাৎ কানু যেদিকে দৌড় মেরেছে তার উলটোদিকে দৌড়তে দৌড়তে চিৎকার করতে লাগল, ‘চোর, চোর, চোর।'
ভানুর চিৎকারে হাটের সব লোক ছুটতে লাগল ভানুর দিকে। কানুর দিকে দৌড়চ্ছে শুধু দু’জন, ছিদাম আর গামছা হারানো সেই লোকটা। দু'জনেই মোটা এবং থলথলে। কানুকে ধরার সাধ্যি কারও নেই।
এইরকম করেই দিন কেটে যাচ্ছিল ওদের। গাঁয়ের লোক বকা-ঝকা করত, বড়রা দু’–একবার কান-টান মলে দিয়েছে, ব্যস, এই পর্যন্তই। কিন্তু পুজোর পাঁঠা নিয়ে যে কেলেঙ্কারিটা ওরা দু’জন করল, তাতে গাঁয়ের সবাই রীতিমতো খেপে গেল। তখনই বাধ্য হয়ে গজেন পালের ভূত সাজার চাকরিটা নিতে হল। পাঁঠার ব্যাপারটা বলার আগে ওদের দু’জন সম্পর্কে আরও একটু বলা দরকার। গ্রামের সকলেই ওদের চিনত এবং গ্রামের সব ব্যাপারেই ওরা থাকত। যেমন বারোয়ারি পুজোয় খাটাখাটনি, কালীপুজোয় তুবড়ি প্রতিযোগিতা, রথযাত্রায় রথটানা, কেউ মারা গেলে ডেকে ডেকে লোক আনা এসব কাজে ওদের বেশ নাম হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে তুবড়ি জ্বালানোতে ভানু-কানুর মতো দক্ষতা কারও ছিল না। গতবার দুর্গাপুজোর সময় ভানু-কানু ওই পাঁঠা কেলেঙ্কারিটা করেছিল। পুজোতে অন্যান্যবারের মতো এবারও ভানু-কানু খাটাখাটি করছিল। ওরা দু’জনে বেশ উৎসাহ নিয়ে খাটত। বলাগড় থেকে অষ্টমীর বলির পাঁঠা কিনে আনার দায়িত্ব ছিল সুনীল নন্দীর। নন্দীবাবুর সঙ্গে বলাগড় যাবে ভানু-কানু। ওরা তিনজনে গেল এবং পাঁঠাও দেখল। কথা হল, অষ্টমীর দিন সকালে কিংবা সপ্তমীর দিন দুপুরে এসে পাঁঠা নিয়ে যাবে ভানু-কানু। অষ্টমীর দিন পাঁঠা নিয়ে আসা হল। বলিও হয়ে গেল। সন্ধ্যার দিকে পাঁচু মণ্ডলের বিধবা মাসি কাঁদতে কাঁদতে এসে বলল, ‘ওগো, তোমরা সবাই শোনো, আমার কালুয়াকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তোমরা মিলে আমার কালুয়াকে খুঁজে দাও গো।'
‘অষ্টমীর সন্ধ্যা মানে জমজমাট ব্যাপার। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তারাবাতি আর আলুপটকা ফাটাচ্ছে, পাড়ার বয়স্ক লোকরা চকচকে ধুতি আর গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি পরে সুভদ্রা ডেকরেটরের ভাড়া করা চেয়ারে বসে গল্প করছে, বয়স্ক জনা-তিনেক মহিলা সন্ধিপুজোর আয়োজনে ব্যস্ত। পুজো প্যাণ্ডেলের ভেতরে এবং বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরও নানা বয়সি লোকজন। তাহেরপুর থেকে আনা একজোড়া ঢাকি তারা সবেমাত্র ঢাকে কাঠি দিয়েছে। আজই একটু পরে আরতি প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এই প্রতিযোগিতায় অন্যান্য বছরের মতো ভানু-কানুও নাম দিয়েছে। ওরা নাকি এবার দ্বৈত নৃত্য প্রদর্শন করবে। পাড়ার সকলেরই আগ্রহ ওদের দ্বৈত নৃত্যের প্রতি। দিব্যি জমে উঠেছে অষ্টমীর সন্ধ্যা, ঠিক তখনই মাসির এই আর্তনাদ ঢাকের বাদ্যি ছাপিয়ে সবার কানে গেল।
বয়স্ক মানুষরা হতচকিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মাসি ডুকরে ডুকরে বলে যাচ্ছেন, ‘এই পুজোগণ্ডার দিনে আমার কালুয়া আমায় ছেড়ে কোথায় গেল গো।'
চেয়ার ছেড়ে সবাই উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। রাজীব মুখুজ্যে, যিনি একদা এই গাঁয়েই থাকতেন, কিন্তু বছর পাঁচেক হল কলকাতায় চলে গেছেন নতুন বাড়ি কিনে। গাঁয়ের বাড়িতে দাদারা থাকেন। পুজোর চারটে দিন গৌরীপুরেই থেকে যান। সেই রাজীববাবুও বললেন, ‘এ কী! গৌরীপুরেও ছেলেধরার উৎপাত শুরু হয়ে গেছে নাকি?’
গুরুদাস চাটুজ্যে ব্যাবসাদার লোক। হাতের জ্বলন্ত সিগারেট ফেলে দিয়ে দু’পা এগিয়ে এসে বললেন, ‘ও মাসি, কালুয়া কে? তোমার ছেলে, না নাতি?’
দ্বিগুণ শব্দে কেঁদে উঠে মাসি বলল, ‘ও আমার কে নয় তাই বল। ছেলে বল ছেলে, নাতি বল নাতি। ও যে আমার সর্বক্ষণের সাথী।
মাসিকে ঘিরে বৃত্তাকার ভিড়। ওই ভিড়ের ভেতর থেকে কোনও দুষ্টু ছেলে বলে উঠল ‘হাতি মেরা সাথী।’ বয়স্কদের মধ্যে কেউ একজন ধমকও দিলেন। এত কাণ্ডের মধ্যে ঢাকের বাদকরা বাজনা বন্ধ করে দিয়েছে।
রাজীববাবু বললেন, ‘ইমিডিয়েট পুলিশকে ইনফর্ম করা দরকার। সেইসঙ্গে একটা ডায়েরি করাও জরুরি।'
গুরুদাসবাবু বললেন, ‘আমি যদিও হপ্তায় হপ্তায় গৌরীপুরে আসি কিন্তু মাসির কোনও ছেলেপিলে ছিল বলে তো শুনিনি।'
গৌরীপুর সদর ব্যাংকের শিবেনবাবু বলে উঠলেন, ‘গুরুদাস, তুমি জানবে কেমন করে! গাঁয়ের কোনও খোঁজ রাখো? তোমার তো শুধু মোহনবাগান আর কলকাতায় নিজের ব্যাবসা। হপ্তায় হপ্তায় আসো বটে, কিন্তু সময়টা তো কাটে তাস খেলে।'
ইতিমধ্যে সাইকেল চেপে সুনীল নন্দীমশাই এলেন। সব শুনে বললেন, ‘এ বড় সাংঘাতিক ব্যাপার! গৌরীপুরে ছেলেধরা! তা পাঁচু কোথায়?’
মাসি সেই ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ‘তার কি মাথার ঠিক আছে বাবা! সে তো কালুয়া কালুয়া বলে পাড়াময় ঘুরে বেড়াচ্ছে।'
রাজীববাবু বললেন, ‘আর দেরি করা ঠিক হবে না। এখনই থানায় খবর দিন। গুরুদাসবাবু, আপনার বাড়িতে ফোন আছে তো?’
গুরুদাসবাবু বললেন, ‘পঞ্চমীর দুপুর পর্যন্ত ছিল, তারপরেই ডেড।' রাজীববাবু বললেন, ‘জ্যান্ত ফোন কার বাড়িতে আছে?'
শিবেনবাবু বললেন, ‘এখন পর্যন্ত আমার ফোনটা জ্যান্ত। আমি নিজে যাচ্ছি ফোন করতে।'
শিবেনবাবু ফোন করতে চলে যাওয়ার পর আরও দু’জন চলে গেল। তারাও গেল ফোন করতে। রাজীববাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এত লোকের ফোন করার দরকার কী? একটা ফোনই তো যথেষ্ট!’
সুনীল নন্দী প্রবলভাবে মাথা নেড়ে বললেন, ‘নো নো, রাজীবদা! পর পর ফোন গেলে থানার ওপর একটা চাপ সৃষ্টি হবে। ওসি স্বয়ং আসবে। আপনি দেখুন, জিপগাড়ি করে ওসি এলেন বলে।'
সবাই মনে মনে দারোগাবাবুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। শোকাতুরা মাসিকে শান্ত করার জন্য ততক্ষণে চেয়ারে বসিয়ে পুজোর মিষ্টি, লুচি আর হালুয়া খাওয়ানো হচ্ছে। মাসি আসার পর সমস্ত ব্যাপারটা যেমন হঠাৎ করে থেমে গিয়েছিল, সেই ব্যাপারগুলো আবার শুরু হল। অর্থাৎ আবার ঢাক বাজতে লাগল, ছেলেদের পটকা ফাটানো আর তারাবাতি জ্বালানোর ব্যাপারটাও শুরু হয়ে গেল। পুজো প্যাণ্ডেলে খানিক আগের সেই দৃশ্যগুলো আবার ফিরে এল।
জনাকয়েক ছেলে এসে বলল, ‘আপনারা উঠে বসুন, চেয়ারগুলো গোল করে সাজাই।
এবার আরতি প্রতিযোগিতা শুরু হবে। মাঝখানে আরতির জন্য অনেকটা জায়গা ছাড়তে হবে।'
ছেলেরা চেয়ার সাজাতে গিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে সুনীল নন্দীকে ডেকে বলল, ‘সুনীলদা, দেখুন আপনার ডেকরেটরের কাণ্ড। এবারও ভাঙা ভাঙা চেয়ার দিয়েছে।'
ডেকরেটরের মালিকের নাম মলয়। পাঁকা বাঁশের মতো পাকানো চেহারা। মাথার চুল অধিকাংশই পাকা। কিন্তু পাকা চুলগুলোর রং ঠিক সাদা নয়। রঙটা গোলা খয়েরের মতো। এমন বিচিত্র রং কেমন করে হল কে জানে!
সুনীল নন্দী রাগের গলায় বললেন, ‘মলয়কে নিয়ে তো পারা গেল না। ওর দোকানে লোক পাঠা।’
ছেলেদের মধ্যে একজন বলল, ‘ষষ্ঠীর সকাল থেকে দোকান বন্ধ। বাড়িতেও নেই। মা দুর্গার ভাসান না হওয়া অব্দি মলয়দার দেখা মিলবে না।
সুনীলবাবু বললেন, ‘আমি যে খানকয়েক গার্ডেন চেয়ার দিতে বলেছিলাম, সেগুলো দেয়নি?’
ছেলেরা উত্তর দিল, ‘কবেই বা দেয়! দুটো জলের ড্রামের একটা ফুটো। ওপরের চটগুলোর অবস্থা দেখেছেন? বৃষ্টি হলে কী হবে??
সুনীলবাবু বললেন, ‘এখন আর কী হবে। মানে মানে পুজোটা শেষ হোক, তারপর দেখা যাবে। তোরা একটু বেছে বেছে চেয়ারগুলো সাজিয়ে দে।'
সুনীল নন্দী চলে যাওয়ার পর ছেলেরা বলল, ‘অত বাছাবাছির দরকার নেই। যা হাতের কাছে পাবি সাজিয়ে দে।
আরতি প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিপর্ব ততক্ষণে প্রায় সমাধা। মাইকে ঘন ঘন ঘোষণা চলছে, ‘গৌরীপুরের সবাইকে সাদ-র আমন্ত্রণ। আমাদের পূজা প্রাঙ্গণে এখনই শুরু হতে যাচ্ছে বি-রা-ট আ-র-তি প্রতিযোগিতা। প্রথমেই ভানু-কানুর দ্বৈত নৃত্য।'
‘সাদর’, ‘বিরাট’ আর ‘আরতি’ শব্দটা বারবারই টেনে টেনে বলা হচ্ছিল। এরকমই বোধ হয় হয়। ভানু-কানুর নাচ গৌরীপুরে বেশ জনপ্রিয়। গত বছর ওদের দু'জনের শুম্ভ-নিশুম্ভ নৃত্য দেখে অনেকেই ছুড়ে ছুড়ে সিকি, আধুলি এবং টাকা দিয়েছিলেন। প্রাইজ হিসেবে দুটো স্টিলের জলের জাগও পেয়েছিল। ওরা অবশ্য দশমীর দিন সকালেই জাগ দুটো বেচে দিয়েছিল শ্রীগুরু ভাণ্ডারে। হাতে পয়সা নিয়ে পকেটে পুরতে পুরতে কানু বলেছিল, ‘এর চেয়ে পাঁচ কিলো চাল দিলে আমাদের ভাল হত।'
আরতি দেখার জন্য মোটামুটি ভিড় জমে গেল। প্রথমে দু’-একজন চেয়ারে বসতে গিয়ে বুঝলেন বসাটা খুব নিরাপদ নয়। বিচারকদের তিনটে চেয়ার অনেক বেছেটেছে দেওয়া হল। বাকিগুলোতে কেউ কেউ বসলেন কেউ কেউ না-বসে দাঁড়িয়ে রইলেন। ততক্ষণে ফোন-টোন করে সবাই ফিরে এসেছেন।
রাজীববাবু দেখলেন, অত্যন্ত বিরক্তমুখে গুরুদাসবাবু নিজের বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। রাজীববাবু তাঁকে ডেকে দাঁড় করালেন। বললেন, 'চললেন কোথায়? এখনই তো আরতি প্রতিযোগিতা শুরু হবে।'
গুরুদাসবাবু বললেন, 'আরে মশাই, আমার বাড়িতে এতক্ষণে প্রলয় নৃত্য শুরু হয়ে গেছে।'
রাজীববাবু বললেন, ‘কেন? কী হয়েছে?’
গুরুদাসবাবু বললেন, 'আমার স্ত্রী এসেছিলেন আরতি দেখতে।'
রাজীববাবু বললেন, ‘বা! সে তো বেশ উত্তম কথা।’
গুরুদাসবাবু মাথাটা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘ব্যাপারটা একেবারেই উত্তম হয়নি। ওই ব্যাটা মলয়ের চেয়ারে বসতে গিয়ে মলি, মানে আমার ওয়াইফ, চেয়ার সমেত মাটিতে। মলি মাটিতে, মলয়ের চেয়ার তার ওপরে। বাইশশো টাকার ঢাকাই জামদানিতে শুধু কাদাই লাগেনি, ছিঁড়েও গেছে। এরপর কী কোনও ভদ্রমহিলার পক্ষে আরতি দেখা সম্ভব?’
রাজীববাবু সহানুভূতির গলায় বললেন, 'আপনি কি মলি দেবীকে ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছেন?'
গুরুদাসবাবু বললেন, ‘এরকম অবস্থায় তাকে ফিরিয়ে আনা শিবেরও অসাধ্য। আমি যাচ্ছি ওই মলয়কে খুঁজতে। আমি শাড়ির দাম আদায় করে তবে ফিরব।'
গুরুদাসবাবু আর দাঁড়ালেন না। হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন। ওদিকে আরতি প্রতিযোগিতার বিচারকরা এসে গেছেন। হাতের সামনে একটা লম্বা বেঞ্চি। তার ওপর জলের গ্লাস, কাগজপত্র আর একটি ঘণ্টা। ওই ঘণ্টা বাজালে আরতি শুরু এবং আবার বাজালে আরতি শেষ। সুনীল নন্দী প্রথমে বাঁশি এনেছিলেন, কিন্তু প্রধান বিচারক নরহরি চক্রবর্তী সেটা বাতিল করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘মুখে আর দাঁত নেই। ফোকলা দাঁতে বাঁশি যদি টাইমলি অ্যান্ড প্রপারলি না বাজে তাহলে তো বিপদ। তুমি বরং ঘণ্টা আনো। ওটা হাতে করে নাড়ালেই বেজে উঠবে।'
ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় যেমন ধারাবিবরণী দেওয়া হয়, এ বছর আরতি প্রতিযোগিতাতেও মাইকে তেমন ধারাবিবরণীর ব্যবস্থা হয়েছে। গৌরীপুর স্পোর্টিং ক্লাবের কোচ কড়াইদা ধারাবিবরণী দিচ্ছেন মাইকে। কড়াইদাকে এই দায়িত্ব দেওয়াতে কেউ কেউ অখুশি। কেন যে তারা অখুশি সেটা একটু পরে আপনারাও টের পাবেন। এবার কড়াইদা তাঁর ধারাবিবরণী শুরু করলেন, ‘নোমসকার, নোমসকার, গৌরপুর শারবোজোনিন দুগ্গাপুজা কমিটির তরফ থেকে শব্বাইকে শারদীয়া অভিনন্দন। এবার আমাদের পূজা চল্লিশ বছরে পোদার্পণ করল। সেজন্যে একস্ট্রা অভিনন্দন। আজকের আরতি প্রতিযোগিতার আয়োজন শমপূর্ণ হয়ে গেছে। প্রথমে দ্বৈত নেত্য করবেন ভানু অ্যান্ড কানু। ভানু কানু শমপূর্ণ তৈরি। আমরা দেখতে পাচ্ছি দু’জনে পায়ে মোটা মোটা ঘুঙুর পরেছে। কানুর হাতে একটা বোতল। মনে হচ্ছে, ফিল্ডে নামবার আগে জল খেয়ে নেবেন। কিন্তু না, আচ্চর্য, বোতল থেকে কানু মাটিতে গোল বৃত্তের মতো করে কী সব ঢালছেন। কী ঢালছেন শেটা পরে জানাচ্ছি। মনে হচ্ছে, ওরা অভিনব কিছু করতে চলেছেন। ভানু শেষ মুহূর্তে দু’জন ঢাকির সঙ্গে শলা-পরামর্শ করে নিচ্ছেন।'
ধারাবিবরণীতে কড়াইদা যা যা বলছিলেন ভানু-কানু কিন্তু সত্যি তাই তাই করছিল। প্রধান বিচারক নরহরিবাবু পাশের বিচারককে বললেন, ‘বুঝলেন দিগম্বরবাবু, কড়াই ছোঁড়াটার উচ্চারণে বড্ড দোষ। ওকে কেন মাইকে বলতে দিল!’
মাইক যখন একবার হাতে পেয়ে গেছেন তখন তো সহজে ছাড়বার পাত্র কড়াইদা নন। তাঁকে ছাড়াবেই বা কে? পুজোর চাঁদা তোলায় কড়াই তো এক নম্বর। অতএব, কমিটির লোকরা তাঁকে চটাবেন না। কড়াইদা বলতে লাগলেন, 'আপনাদের জানিয়ে দিই, ভানু-কানু যে নেত্যটি এখন দেখাবেন তার নাম অগ্নিনেত্য। অগ্নির মধ্যে দু’জনে শাবলীলভাবে নেত্য করে যাবেন। ছোটরা শান্ত হয়ে থাকবে। অগ্নি ছেলেখেলা নয়। ঢাকের বাদ্যি শুরু হয়ে গেছে। রেফারির বাঁশি, মাফ করবেন, বাঁশি নয়, ঘণ্টা বেজে গেছে। ভানু দেশলাইকাঠি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছেন। গোল হয়ে আগুন জ্বলছে। ওই বোতলে জল ছিল না, ছিল ‘পেড্রোল’। ভারী চমৎকার আগুন জ্বলছে। এমন আগুন আমি আগে কখনও দেখিনি। ভারী চমৎকার! শুরু হয়ে গেল, নেত্য শুরু হয়ে গেল...।'
দু’খানা ঢাক যদি বাজতে থাকে তা হলে মাইকের ধারাবিবরণী কতটুকুই বা শোনা যায়! বড় একটা গোল বৃত্ত, তার মধ্যে ধুনুচি হাতে ভানু-কানুর অগ্নিনৃত্য শুরু হয়ে গেল।
ওরা তো দু’জনে গোল করে একটা বৃত্ত তৈরি করে তাতে পেট্রোল ঢেলেছিল। ওরা ভেবেছিল গোল হয়ে আগুন জ্বলতে থাকবে আর ওরা দু'জনে সেই বৃত্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিরাপদে নৃত্য দেখাবে। এমন নৃত্য ওরা একবার বাবুবাগানের চড়কের মেলায় গিয়ে দেখেছিল। কিন্তু বোতল থেকে পেট্রোল গোল করে দেওয়ার সময় কিছু কিছু পেট্রোল বৃত্তের ভেতরেও পড়ে গিয়েছিল যেটা ওরা টেরই পায়নি। নাচ শুরু হওয়ার একটু পরেই আগুনে পা পুড়ে যাচ্ছে দেখে পা ছুড়তে লাগল। আর পা থেকে ঘুঙুরগুলো খসে গিয়ে পড়তে লাগল বিচারকদের টেবিলে, মাথায় এবং দর্শকদের কপালে বা বুকে। প্রধান বিচারক নরহরিবাবুর টাকে ঘুঙুর পড়তেই উনি তো দু’হাতে মাথা ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ও রে, বাপ রে, মরে গেছি রে। কেউ ঘণ্টা বাজিয়ে ওদের স্টপ করে দিন।'
কিন্তু কে আর ঘণ্টা বাজায়! সবাই পালাতে পারলে বাঁচে। এরই মধ্যে আর এক অঘটন। সবাই যখন পালাতে ব্যস্ত তখন কোনও ছেলে দুষ্টুমি করে খানকয়েক চকোলেট বোম আর কালীপটকা ওই আগুনে ফেলে দিতেই সেগুলো ভয়ংকর শব্দে ফাটতে শুরু করল। সে এক বিশ্রী এবং ভয়াবহ কাণ্ড। গৌরীপুর সর্বজনীন পুজোর চল্লিশ বছরের ইতিহাসে এমন কাণ্ড এর আগে কখনও ঘটেনি। পূজা প্যান্ডেলের সামনে যখন এইসব চলছে তখনই ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে দমকলের একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল।
রাজীববাবু বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দমকলের গাড়িটার দিকে দেখতে দেখতে বললেন, ‘দমকল! দমকল কেন? কে খবর দিল?’
রাজীববাবুর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ ছিলেন না। কেননা, তখনই দারোগাবাবুর জিপগাড়িটা এসে দাঁড়াল। রাজীববাবু এবার শিবেনবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দমকল এল কেন?’
শিবেনবাবু বললেন, ‘তা তো বুঝতে পারছি না। আমি তো থানায় ফোন করেছিলাম। থানা আর দমকলের কি একই নম্বর?
সুনীল নন্দী বললেন, ‘ভুলটা বোধহয় আমারই হয়ে গেছে। তাড়াহুড়োতে থানায় ফোন না করে ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করে বলে দিয়েছি এখনই গৌরীপুর পুজো প্যান্ডেলে চলে আসুন।'
শিবেনবাবু বললেন, ‘আপনার ভুলটা হল কেন?’
সুনীল নন্দী বললেন, ‘কেন হবে না? এক্সচেঞ্জের নাম্বার তো একই। থানার শেষের নাম্বার হল টু সিক্স সিক্স টু, আর ফায়ার ব্রিগেড হল টু সিক্স টু সিক্স। ওই টু আর সিক্সেই গণ্ডগোল হয়ে গেছে।'
অষ্টমীর পুজো তখন মাথায় উঠেছে। একদিকে দারোগা সাহেব, অন্যদিকে ফায়ার ব্রিগেড। কাকে সামলাবে! আগুন জ্বেলে অগ্নিনৃত্য হচ্ছিল দেখে ফায়ার সার্ভিসের লোক খুব বকাবকি করে লুচি আর হালুয়া খেয়ে চলে গেলেন। দারোগাসাহেব মাসিকে জেরা করতে শুরু করলেন। দারোগা বললেন, 'আপনার কালুয়ার বয়স কত?’
মাসি বলল, ‘অতশত মনে নেই বাছা। মিরগঞ্জের হাট থেকে বড় শখ করে এইটুকুন কিনেছিলুম।'
দারোগাসাহেব সিগারেট টানতে গিয়ে বিষম খেলেন। চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘মিরগঞ্জের হাটে এখন মানুষও বিক্রি হয় নাকি? এ ব্যাপারটা তো এখনই এস পি সাহেবকে জানানো দরকার।'
রাজীববাবুও উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, ‘সে কী! মিরগঞ্জের হাটে মানুষ বিক্রি! দারোগাবাবু, আপনি এখনই ব্যবস্থা নিন।'
দারোগাবাবু বললেন, ‘আজই ব্যবস্থা নিতে হবে।'
এই ব্যবস্থা নেওয়া-নেওয়ি নিয়ে যখন কথা চলছে তখন পাঁচু মণ্ডল হাজির হল বলাগড়ের কাশেমভাইকে নিয়ে। এই কাশেম ভাইয়ের কাছ থেকেই পাঁঠা কেনা হয় প্রতিবার। পাঁচু মণ্ডল বলল, ‘শুনুন, কালুয়া আমাদের সন্তানের মতো। কিন্তু কালুয়া মানুষ নয়। কৃষ্ণবর্ণের অতি চমৎকার একটি পাঁঠা। ভানু-কানু সেই পাঁঠা মাঠ থেকে দড়ি খুলে নিয়ে এসেছে, বলি দিয়েছে। আর কাশেমভাই পাঁঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে এদিকে আসছিল। আমার সঙ্গে দেখা হতে সব জানা গেল।'
এইরকম একটা ঘটনার পর সবাই ভানু-কানুর ওপর খেপে গেল। দারোগাসাহেব বললেন, 'আপনারা যদি বলেন, তা হলে পাঁঠা চুরির দায়ে ওই ভানু-কানুকে আমি এখনই অ্যারেস্ট করতে পারি।'
নরহরিবাবুকে তখন ফার্স্ট এড দেওয়া হচ্ছিল। সেইদিকে দারোগাসাহেব তাকাতেই নরহরিবাবু জোরে ককিয়ে উঠে বললেন, ‘মি. দারোগাবাবু, আমি একজন রিটায়ার্ড সরকারি অফিসার। আঘাতটা আমার হেড-এ লেগেছে। হেড ইনজুরি অত্যন্ত ডেঞ্জারাস। ভানু-কানুকে আপনি অ্যাটেম্পট টু মার্ডার এই চার্জেও ধরতে পারেন।'
অষ্টমীর সন্ধিপুজোর লুচি আর পায়েস খেতে খেতে দারোগাবাবু নরহরিবাবুর দিকে একবার তাকালেন। তারপরই বললেন, ‘ভানু-কানু কোথায়? ওদের ঠিকানা কেউ জানেন? ওদের অ্যারেস্ট করতে হবে।'
রাজীববাবু দারোগাবাবুর পাশেই বসে ছিলেন। তিনি বললেন, ‘একবার হাজত ঘুরে এলে ওরা আরও খারাপ হয়ে যাবে। এই ব্যাপারটা পুজো কমিটির হাতে ছেড়ে দিন। এরাই ব্যবস্থা করবে।'
দারোগাবাবু চলে যাওয়ার পর সবাই দল বেঁধে গেল ভানু-কানুর বাড়িতে। গৌরীপুর সর্বজনীন পুজো কমিটি ওদের দু’জনকে শাস্তি দেবে।
মণ্ডলপাড়ার চালাঘরে বসে ভানু কানু তখন তাদের পোড়া পায়ে সরষের তেল লাগাচ্ছিল। অগ্নিনৃত্য দেখাতে গিয়ে যে এমন অঘটন ঘটবে সেটা ওরা কেউ ভাবতেই পারেনি। কিন্তু বাবুবাগানের চড়কের মেলায় যিনি অগ্নিনৃত্য দেখিয়ে বাহবা পেয়েছিলেন তাঁর কিন্তু এমন অঘটন ঘটেনি।
ভানু-কানু দু'জনের মধ্যেই আফশোস হচ্ছিল কিন্তু কী আর করা যাবে। পায়ে তেল মেখে জ্বালাটা সবেমাত্র জুড়িয়েছে, তখনই ওদের ঘরের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল সর্বজনীন পুজো কমিটির জনাকয়েক লোক। সেই লোকজনদের অগ্রভাগে সুনীল নন্দী। সবাই হুংকার দিয়ে বলে উঠল, ‘চল পুজো প্যান্ডেলে। দারোগাবাবু অপেক্ষা করছেন।'
শুকনো গলায় বলল, ‘দারোগাবাবু, তিনি কেন অপেক্ষা করছেন? তেনার সঙ্গে আমাদের কোনও কথা নেই।' সুনীল ধমক দিয়ে উঠে বললেন, ‘তোদের কথা নেই, কিন্তু তেনার আছে। গেলেই টের পাবি। এক্ষুনি উঠে আয়।'
দারোগার নাম শুনে দু'জনের মুখ শুকিয়ে গেল। কানু খালি
নিজেদের আর কষ্ট করে উঠতে হল না। যারা এসেছিল তারাই জোর করে উঠিয়ে ছাড়ল। বাড়ির বাইরে দু’খানা সাইকেল রিকশাভ্যান দাঁড়িয়ে ছিল। একটা ভ্যানে ভানু-কানু আর দু’জন উঠল। বাকিটায় সুনীল নন্দী সহ আরও তিনজন। কানু মনে মনে ভাবল, রিকশাভ্যানে চাপিয়ে আদর করে নিয়ে যাচ্ছে প্যান্ডেলে কি মারধোর করবে বলে।
ওরা পৌঁছতেই সবাই ছুটে এল ওদের দু'জনের কাছে। ভানু ফিসফিস করে কানুকে বলল, ‘কেমন ভাগ্যি দ্যাখ, প্রতিমা না দেখে সবাই আমাদের দেখছে।'
সবাই গোল হয়ে ওদের ঘিরে দাঁড়াল। নানাজনের নানা কথা। কেউ বলে, পুলিশে দাও। কেউ বলে, জলবিছুটি দিয়ে মার লাগাও। এমন সময় দারোগাবাবু এগিয়ে এসে বললেন, ‘দেখি একবার বদন দুটো।’
দারোগাবাবু আসতে সবাই সরে দাঁড়ালেন। কেউ একজন একখানা চেয়ার নিয়ে এসে বললেন, ‘স্যর, আপনি এখানে বসুন। বসে বসে জেরা করুন।'
দারোগাবাবু ডান হাতের রুলটা বাঁ হাতের তালুতে আস্তে আস্তে বারদুই ঠোকা মেরে বললেন, ‘পাঁচু মণ্ডলের পাঁঠা চুরি করেছ? এই চুরির শাস্তি জানো?’
ভানু বলল, ‘চুরি করে তো আমরা খাইনি সার। দশের সেবায় লাগিয়েছি।' দারোগাবাবু বললেন, ‘দশের সেবা মানে?’
কানু বাঁ হাতের তালুতে মুখটা মুছে নিয়ে বলল, ‘পাঁঠা তো মা দশভুজাকে নিবেদন করেছি। মা’র সামনে বলি হয়ে গেছে। মাংস তো আমরা দু'জন ছাড়া কমিটির সবাই খেয়েছে।'
দারোগাবাবু ভিড়টার দিকে তাকালেন। ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলল, 'স্যর, একটু আগে লুচির সঙ্গে যে মাংস খেলেন, সেটা ওই পাঁঠার।'
দারোগাবাবু বললেন, ‘কথাটা কে বললে? আমি জানতে চাই কে বললে?’
কেউ আর কোনও সাড়া দেয় না। দারোগাবাবু সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনারা কী চান? যদি আপনারা সম্মত থাকেন তাহলে ছোকরা দুটোকে লকআপে পুরে দিই।' কেউ কোনও কথা বলে না দেখে দারোগাবাবু আবার বললেন, ‘বলুন আপনারা কী চান?’
কথা শেষ হতেই ছোট্ট একটা ঢেকুর তুললেন দারোগাবাবু। নিজেই টের পেলেন এখনও ঠান্ডা লুচি আর মাংসের গন্ধ সেই ঢেকুরের সঙ্গে উঠে এল। এবার পাঁচুর বিধবা মাসি এগিয়ে এসে বলল, ‘পুজোগণ্ডার দিনে বাপ-মা মরা ছেলে দুটোকে আর হাজতে পুরতে হবে না। তার চেয়ে তোমরা যারা যারা মাংস খেয়েছ তারা কালুয়ার জন্য মূল্য ধরে দাও। দারোগাবাবুও দিন।'
ভিড়ের মধ্যে চাপা হাসির কলরব উঠল। দারোগাবাবু একটা হুংকার দিয়ে উঠে যেই না চেয়ারে বসতে গেলেন অমনই মলয়ের চেয়ারের পা ভেঙে দারোগাবাবু পড়লেন নীচে আর দারোগাবাবুকে চেয়ার ভেঙে নীচে পড়তে দেখে সাইকেল চালিয়ে পাঁই পাঁই করে যে লোকটা পালিয়ে গেল সেই হচ্ছে মলয়। পাঁঠা চুরির বিচার দেখতে সে দাঁড়িয়ে ছিল ভিড়ের মধ্যে। দারোগাসাহেব পড়ে যাওয়ার পর আর এই তল্লাটে থাকে?
এর পর দারোগাবাবু আর বেশিক্ষণ থাকলেন না। আপনাদের ব্যাপার আপনারা যা ভাল বুঝবেন তাই করুন- ’ এই বলে জিপগাড়িতে গিয়ে উঠলেন। ভানু-কানু ভাবল, যাক, বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু বিপদ কি অত সহজে কাটে। গৌরীপুর সর্বজনীন পুজো কমিটির সম্মান রক্ষার জন্য কিছু একটা তো করতেই হয়। পাঁচুর মাসিকে না হয় টাকা দিয়ে দেওয়া যাবে, কিন্তু তাই বলে অপরাধীর শাস্তি হবে না! অতএব, সুনীল নন্দীর নির্দেশে ওদের দু'জনকে মোটা বাঁশের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হল। ঠাকুর দেখতে এসে সবাই পাড়ার চোর দুটোকে দেখে যাক। ওদের যখন দড়ি দিয়ে বাঁধা হচ্ছে তখন ভানু কানুকে বলল, ‘এবার বেঁধে পেটাবে। এমনিতেই পায়ে জ্বালা করছে, তারপর পেটালে মরে যাব।'
কানু ফিসফিস করে বলল, ‘দুগগা মায়ের মুখে ঘাম তেল লাগানো হয়েছে। আরতির আলোতে মায়ের মুখটা জ্বলজ্বল করছে। আমরা ওই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকব। দেখবি, তাতে কষ্ট কম মনে হবে।'
ওদের অনুমানই সত্যি। বেঁধে ফেলার পর নানা দিক থেকে ওদের শরীরে চড়, কিল আর লাথি পড়তে লাগল। ঠাকুরের সামনে তখন ঢাক বাজছে। তার সঙ্গে চলেছে পুরোহিত মশাইয়ের আরতি। কিন্তু ঠাকুর দেখতে আসা লোকজনের চোখ এখন আর ঠাকুরের দিকে নয়, সবার চোখ ভানু-কানুর দিকে। ওরা দু’জনে একদৃষ্টে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুতেই দৃষ্টি এদিক-ওদিক হচ্ছে না। তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভানুর দৃষ্টিতে যেন বিভ্রম লেগে গেল। সে দেখল, তার মাকে। তার মা পুকুরঘাট থেকে স্নান করে গায়ে গামছা জড়িয়ে উঠে আসছেন। কাঁখে মাটির কলসি, বাঁ হাতে দুটো শাপলা ফুলের ডানা। ভানুকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মা বলছেন, ‘কী রে, আজ ইস্কুলে পড়া পেরেছিলি তো? কেউ বকেনি তো?’
ভানু মাথা নেড়ে বলে, ‘না।’
মা হেঁটে যাচ্ছেন বাড়ির দিকে। ভেজা শাড়ি থেকে সপসপ আওয়াজ উঠছে আর তারই সঙ্গে মিলিয়ে কলসির জলের ছলাত ছলাত শব্দ। যেতে যেতে মা জিজ্ঞেস করেন, ‘কানু কোথায়?’
ভানু উত্তর দেয়, ‘বাবার সঙ্গে বসে বেড়া বাঁধার কাজ করছে।'
ভানুর চোখে ভেসে ভেসে আসছে অতীতের খণ্ড খণ্ড ছবি। মণ্ডপের দুর্গাপ্রতিমার মুখটা কেবলই তার মায়ের মুখের মতন হয়ে যাচ্ছে। মণ্ডপের হইহট্টগোল স্তিমিত হয়ে আসার একটু আগে রাজীববাবু হন্তদন্ত হয়ে এসে বললেন, ‘এসব কী হচ্ছে সুনীলবাবু? দুটো ছেলেকে বেঁধে পেটাচ্ছেন। অপরাধের শাস্তি এইভাবে কেউ দেয়? ছিঃ ছিঃ! এ ভারী অন্যায়।'
গুরুদাসবাবু নিজে ওদের হাতের বাঁধন খুলে দিতে দিতে বললেন, ‘তোরা আমার সঙ্গে আয়। কে তোদের আটকায় দেখব।'
ঠিক এই সময় নিজে গাড়ি চালিয়ে গজেন পাল সস্ত্রীক পুজোমণ্ডপে এলেন। সব শুনে বললেন, ‘এই, তোরা দু'জন আমার সঙ্গে থানায় চল। আমি সুনীল নন্দীর নামে এফ আই আর করব। বেঁধে মারবার কোনও অধিকার কারও নেই। সুনীল কে? কোথাকার মাতব্বর?’
অবস্থা জটিল হয়ে উঠল। অবশেষে সবাই মিলে ব্যাপারটা সামাল দিলেন। ভানু-কানু আর দাঁড়াতে পারছিল না। ওরা খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। ভানু বলল, ‘আমি বোধহয়, হেঁটে বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারব না রে। পায়ের গাঁটে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে।'
কানু থেমে পড়ল। একটা লাইটপোস্ট জড়িয়ে ধরে দাঁড়াল। ভানু বুঝতে পারছে তার মতো কানুরও খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কষ্টের কথা কানু কখনও মুখ ফুটে বলে না, এটাই ওর চিরকালের স্বভাব। কানু বলল, ‘তোকে বলেছিলাম না, দুর্গা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে।'
ভানু বলল, ‘তাই তো ছিলাম। কিন্তু তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার কী হল জানিস?’ কানু বলল, ‘কী?’
ভানু বলল, ‘আমার নিজের মায়ের মুখটা ভেসে উঠল। সেই সব পুরনো কথা মনে পড়ে যেতে লাগল।
কানু লাইটপোস্টটা ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বাঁ হাতে চোখটা মুছে নিতে নিতে বলল, ‘নিজের মা-কে তো কখনও চোখেই দেখিনি। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে যাকে মা বলে জেনে এসেছি সেই মায়ের মুখ চোখ বুজলেই দেখতে পাই। ঠিক দুর্গা মায়ের মতো। মায়েদের মুখগুলো সব একরকম। কখনও বদলায় না।'
কিছুটা আসার পর ভানু বলল, 'আর পারছি না। আজকের রাতটা ওই বটতলার চাতালেই শুয়ে থাকি। শরীরে আর শক্তি নেই।'
কানু বলল, ‘চল, তাই করি। এতটা পথ হাঁটতে পারব না।'
ওরা দু’জনে খানিকটা হেঁটে এসে তিনমাথার মোড়ে বটতলায় এল। নীচে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো লাল রঙের চাতাল। সকালে আর বিকেলে বয়স্ক লোকরা এখানে বসে গল্পগুজব করে। ওরা এসে বটতলার চাতালে বসল। শরীরে অবসাদ আর যন্ত্রণা। দু’জনে বসে থাকতে থাকতে একসময় শুয়ে পড়ল।
কানু দেখল ঝকঝকে আকাশে খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘ। অষ্টমীর চাঁদ বড় হয় না। তবু, আজ যেন বেশ উজ্জ্বল। শিরশির করে হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় শীতের হালকা আভাস। দূর দূর থেকে হাওয়ায় ভাসিয়ে আনছে ঢাকের আওয়াজ, মাইকে গানের কলি।
কানু আস্তে করে ডাকল, ‘ভানু ঘুমোলি?’
ভানু উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ।'
কানুর ঘুম আসছিল না। পোড়া জায়গাটাতে কে যেন মেরেছে। যন্ত্রণাটা বাড়ছে। কানু উঠে বসল। কিন্তু উঠে বসেও শান্তি নেই। আবার শুতে যাওয়ার আগে শব্দ শুনে বাঁ দিকে তাকাল একটা ম্যাটাডোর আসছে। একটু কাছে আসতে বোঝা গেল ম্যাটাডোর ভর্তি লোক চলেছে কলকাতায় সারারাত্তির পুজো দেখবে বলে। যেতে যেতে চলন্ত ম্যাটাডোর থেকে একটা জ্বলন্ত পটকা ফেলে গেল ওদের কাছে। ওটা বিকট শব্দে ফেটে যাবার পরই ভানু উঠে বসল।
গৌরীপুর ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাটা তখনই দুজনের মাথায় এল। ভানুর মধ্যে একটু কিন্তু কিন্তু ছিল কিন্তু কানুর মধ্যে একেবারেই না। পরদিন, অর্থাৎ নবমীর সকালেই গজেন পালের লোক এসে বলল, 'বাবু তোমাদের ডেকেছেন।'
ওরা কোনও কথা বলল না। লোকটা চলে যাওয়ার পর কানু বলল, ‘গাঁয়েই যদি না থাকি তবে আর গাঁয়ের লোকের ডাকাডাকিতে সাড়া দেব কেন?’
সত্যি ওরা সাড়া দেয়নি। কিন্তু পুজো মিটে যাওয়ার পর আবার ডাক এল। এই ডাকে এবার সাড়া দিতেই হল। তারপরের ব্যাপার তো সবই জানা। ওরা মাস মাইনেতে ভূত সাজার চাকরি নিয়ে নিল। কিন্তু চাকরিটা বেশিদিন ওরা করতে পারল না। কেন পারল না, সেই কথাটা বলার আগে, গুপির কথাটা একটু বলে নেওয়া দরকার। এ হল সেই গুপি, যে বিলকান্দার জলার ধারে বাড়িতে থাকে। ভূতের বাঁশির শব্দ পেলে গাদা বন্দুক নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। গুপির কথা একটুখানি না বললে ভানু-কানুর চাকরি ছাড়ার ব্যাপারটা বোঝা যাবে না।
গুপি গড়াইয়ের একটা পা ছিল কাটা। এক সময় রেলে কী সব কাজ করত। চলন্ত রেলগাড়িতে এক কামরা থেকে অন্য কামরায় দিব্যি ঝুলে ঝুলে যেতে পারত। এইরকম যাতায়াত করতে করতেই একদিন পা ফসকে পড়ে গেল নীচে। কপাল ভাল তাই প্রাণে বেঁচেছে, কিন্তু বাঁ পাখানা বাঁচাতে পারেনি। তিনমাস হাসপাতালে থেকে ফিরে এসেছে একখানা পা খুইয়ে। হাঁটুর তলা থেকে বাঁ পা-টি আর নেই। সেই গুপি গড়াই সারারাত জেগে কী কাজ করত সেটা ভানু-কানু জানত না। মনে মনে কৌতূহল যে একেবারে ছিল না তা নয়, ছিল, কিন্তু দু’জনেই ভেবেছিল আমাদের অত কীসের দরকার। প্রথম কয়েকটা রাত্রি পাহারা দিতে গিয়ে ওদেরই ভয় ভয় করছিল। ভূত থাকুক বা না থাকুক, গভীর রাতে এমন একটা জঙ্গলে ভরা জলার ধারে বসে থাকলে ভয় তো করবেই। প্রথম সপ্তাহটা নির্বিঘ্নেই গেল। মাছ চুরি করতে জাল নিয়ে কাউকে আসতে দেখা যায়নি, ওদেরও আর নাকি গলায় বলতে হয়নি ‘জলার ধারে কে রে?’
পুজোর ওই ঘটনার পর থেকে পাড়ার লোকজন ওদের সঙ্গে বিশেষ কথা কয় না। ওরাও সবাইকে এড়িয়ে চলে। রাতভোর কাজ করে নিজেদের বাড়িতে গিয়ে ঘুমোয়। দুপুরে উঠে উনুন জ্বেলে রান্না করে। খাবার পর বাড়ির সামনে দু’জনে বসে থাকে। পাড়ার কোথাও যায় না। সন্ধে হওয়ার আগে গামছায় রুটি বেঁধে রওনা দেয় বিলকান্দার দিকে। শীতের খাটো বিকেল। বিলকান্দার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। গুপিদার বাড়িতে ঢুকে একটু বিশ্রাম করে। তারপর রাত ন'টা নাগাদ গামছা খুলে রুটি বার করে। গুপিদা বলে দিয়েছিল, ‘শুধু রুটি আনলেই হবে। ডাল-তরকারি আমার কাছ থেকে নিবি। তোরা বাচ্চা মানুষ, অত রান্না তোরা কেমন করে করবি।'
গুপিদার কথামতো তাই করত ওরা। একদিন ওরা তিনজনে যখন খাচ্ছে তখন গুপিদা বলল, ‘আজ দু’জন লোক আসবে জাল ফেলতে। তোরা কোনও শব্দ করবি না।' ভানু-কানু দু’জনেই অবাক। মুখের খাবার গিলে নিয়ে ভানু বলল, ‘চোর এসে জাল ফেলবে আর আমরা শব্দ করব না- এ তুমি কী বলছ গুপিদা!’ -
কানু বলল, ‘লোক দেখলে শব্দ করাই তো আমাদের চাকরি। পাল জানতে পারলে কী বলবে বলো তো।'
গুপিদা দু’জনের মুখের দিকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না। তিনজনে নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করার পর গুপিদা বলল, ‘তোরা কি ভাবিস, মাছ পাহারা দেওয়ার জন্যে তোদের মাইনে দিয়ে রেখেছে?’
ওরা দু'জনেই অবাক চোখে গুপিদার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তবে কীসের জন্য রেখেছে?’
গুপিদা মুখ ধুয়ে একটা সিগারেট ধরাল। জোরে জোরে দুটো টান দিয়ে বলল, ‘মিছে কথা।’
কানু জিজ্ঞেস করল, ‘তবে সত্যি কথা কী?’
গুপিদা একবার খোলা দরজার দিকে তাকাল তারপর চাপা গলায় বলল, 'দশ কিলোমিটার দূরে রেল ইয়ার্ড। ওই ইয়ার্ড থেকে চোরাই জিনিস আসে এখানে। এখান থেকেই বিক্রি হয় অন্য জায়গায়। পুলিশ বা অন্য কেউ এলে জলার ধারের পথ দিয়েই যেতে হবে। তোরা নাকিসুরে কথা কইলে আমি বা আমরা আগেভাগে জেনে যাব। মাছচোর নয়, আমাকে জানান দেওয়াই তোদের কাজ।'
গুপিদার কথা শুনে দু’জনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। গুপিদা বলল, ‘কথাটা যেন কেউ জানতে না পারে। জানলেই কিন্তু তোরা দু’জন গুমখুন হয়ে যাবি।
কানু ভয় পাওয়া গলায় বলল, ‘গুমখুনটা আবার কেমনধারা খুন?’
গুপিদা বলল, ‘প্রথমে তোদের দু'জনকে এখান থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর খুন করে বস্তায় বেঁধে পুঁতে দেবে দশহাত মাটির তলায়।'
ভানু আর কানুর গা ছমছমিয়ে উঠল। কোনওমতে ঢোক গিলে ভানু বলল, ‘কোথায় পুঁতে দেবে? এই বিলকান্দার ধারে?’
গুপি উত্তর দিল, ‘তা জানি না। তবে তোদের আগে যে দুটো ছেলে ছিল তারা তো...’ কানু কথা শেষ হওয়ার আগেই বলল, ‘তারা তো কলকাতার যাত্রাদলে চলে গেছে।' গুপিদা বলল, ‘তেমন কথাই বলা হচ্ছে বটে, কিন্তু আমার ধারণা, ওরাও গুমখুন হয়েছে।
কারণ, তোদের মতো ওরাও সব জেনে গিয়েছিল কিনা।'
এবার ভানু-কানুর গলা শুকিয়ে গেল। কানু অভিমানের গলায় বলল, ‘আমরা তো
জানতে চাইনি। তুমি কেন সেধে সেধে জানাতে গেলে। কী দরকার ছিল এসব জানাবার।’ গুপিদা বলল, ‘দ্যাখ, তোরাও গরিব, আমিও গরিব। আমরা হচ্ছি সমান সমান। জানিয়ে রাখলাম, যাতে বিপদ বুঝলে কেটে পড়তে পারিস।'
সেদিন রাত্রে পাহারা দিতেই ওরা গেল না। গুপিদার অন্য ঘরে কান পেতে বসে থেকে বুঝল রাতভর লোক আসছে, ফিসফাস কথা হচ্ছে এবং চলে যাচ্ছে। কিন্তু লোকগুলো কারা, কেমন দেখতে এবং কী বলছে সেসব টের পাওয়া গেল না।
সকালবেলা বাড়ি ফিরে কানু বলল, ‘বুঝলি ভানু, গুমখুন হওয়ার চাইতে ‘রইল ঝোলা,
চলল ভোলা’ এটা করাই ভাল। মাসকাবারে মাইনে নিয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে কেটে পড়ি।' গুপিদার কাছে শোনার পর ওদের সত্যি এত ভয় হয়ে গিয়েছিল যে, মাসকাবারে মাইনে হাতে নিয়ে সোজা চলে এল গৌরীপুর স্টেশনে। সেখান থেকে ট্রেন ধরে সোজা এল বীরপাড়ায়। ভানুর কেমন এক পিসি এই বীরপাড়ায় থাকত। দিনদুয়েক খোঁজ করে সেই পিসির কোনও হদিশ পাওয়া গেল না।
কানু বলল, ‘এবার কী হবে? মাথা গোঁজার একটা আশ্রয় তো দরকার।'
ভানু বলল, ‘বিনে পয়সায় রেলস্টেশনে শোয়া যায়। কিন্তু অচেনা দুটো ছেলেকে দেখলে লোকে নানা সন্দেহ করবে। তার চেয়ে বরং গৌরীপুরে ফিরে যাই। ওখানে তো নিজেদের ভিটে আছে।'
সমস্যাটা খুব গম্ভীর বুঝতে পেরে কানু চুপ করে রইল।
দিনের বেলাটা ওদের কোনওরকমে কেটে যায়, রাত্রি হলেই শোয়ার সমস্যা। গত রাত্রে স্টেশনের পুলিশ ওদের বন্দুকের গুঁতো দিয়ে প্ল্যাটফর্ম থেকে তুলে দিয়েছে। আজ হয়তো ধরেই নিয়ে যাবে। এখানে কোনও চেনা-জানা লোক নেই। অচেনা লোককে কে আশ্রয় দেবে। দু’-চারটে দোকানে কাজ খুঁজেছিল কিন্তু কেউ দেয়নি। হাতের পয়সা ফুরিয়ে আসছে। পেটে খিদে থাকলেও দু’বেলা খাবার ভরসা হয় না। বীরপাড়ার পশ্চিম দিকে গঙ্গা। ওদিকে ছোট বড় খানকয়েক মিল। সন্ধ্যার দিকে ওখানে লিট্টি বিক্রি হয়। একখানা খেয়ে জল খেলে অনেকক্ষণ খিদে পায় না। কিন্তু সেই লিট্টির দামও এখানে পঁচাত্তর পয়সা। কানু অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘গঙ্গার ঘাটে গিয়ে শুবি?’
ভানু বলল, ‘অচেনা দুটো ছেলেকে রোজ রোজ শুতে দেখলে লোকে ভাববে আমাদের কোনও মতলব আছে।'
কানু এবার নিজের ওপরেই খেপে গিয়ে বলল, ‘কত লোক বদ মতলবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কই কেউ তো তাদের পেছনে লাগে না। আমাদের মতলব তো শুধু বেঁচে থাকা। আমাদের পেছনে কেন তাড়া করবে!’
কানু জানে, এসব কথার কোনও উত্তর হয় না। তবুও ওরা দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গার ঘাটে এল৷ ঘাটের উলটো দিকে একটা মন্দির। ওরা এসে ঘাটে বসল। বসে থাকল অনেকক্ষণ। গঙ্গার বুক থেকে হু হু করে হাওয়া আসছে। ওপারের ঘাটের বাতি এখান থেকে দিব্যি দেখা যায়। ওদিকটায় কোন শহর, সেটা ওরা জানে না। খানিক আগেও ফটফট করে মেশিন চালিয়ে নৌকো পারাপার হচ্ছিল। এখন সেটা বন্ধ। মস্ত বড় একটা টালির নৌকো ভিড়েছে ঘাটে। ঘাট পর্যন্ত আসতে পারেনি। কাঠের পাটাতন ফেলা হয়েছে নৌকো থেকে ঘাট অবধি। সেই পাটাতনের ওপর দিয়ে মাথায় টালি নিয়ে এসে পারে সাজিয়ে রাখছিল। আপাতত তাদের কাজ আজকের মতো বন্ধ। নৌকোর মধ্যে রান্না হচ্ছে। সেই রান্নার গন্ধ এসে লাগছে ভানু-কানুর নাকে। তাতে খিদেটা যেন চড়চড়িয়ে বাড়ছে।
ভানু বলল, ‘বড্ড খিদে পাচ্ছে। মন্দিরের কাছে একটা ভুট্টা ভাজার দোকান আছে। আট আনার ভুট্টা কিনে আন।'
কানু বলল, ‘তুই যা, আমার ভাল লাগছে না।'
ভানু নিজেই গেল ভুট্টা কিনতে। ভুট্টা কিনে ফিরে আসার পর ভানু বলল, ‘গৌরীপুরে আট আনায় এর চেয়ে ঢের বেশি ভুট্টা পাওয়া যায়।'
কানু কোনও জবাব দিল না। দুই হাঁটুর মধ্যে মুখটা রেখে উদাস চোখে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল, ‘বাপ-মা মরে গেলে মানুষরা ঠিক আমাদের মতো অনাথ হয়ে যায় তাই না?’
কানুর কথা বলার মধ্যে এমন বিষাদ ছিল যে, ভানুর মনটাও কান্নায় ভিজে যেতে লাগল। আস্তে আস্তে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। গঙ্গার জলের ছলাত ছলাত শব্দ আর থেকে থেকে হাওয়া লেগে গাছের পাতায় পাতায় খসখসানির আওয়াজ, এ ছাড়া আর কিছু নেই। দু’জনে ওই ঘাটেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল।
বীরপাড়ায় এসে দিনকয়েক এইভাবেই কাটল। যদিও এটাকে কাটা বলে না। গঙ্গার ঘাটে শুয়ে থাকাটাতে কেউ বিশেষ আপত্তি করে না। তবে চায়ের দোকানের লোকগুলো খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এটা-ওটা জানতে চায়। ওরা বলে, ‘আমরা কাম-কাজের ধান্দায় ঘুরছি।’ এরই মধ্যে একদিন চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালেন লম্বামতন এক ভদ্রলোক। পরনে ধুতি, গায়ে সাদা রঙের খদ্দরের পাঞ্জাবি, চোখে চশমা। ওই ভদ্রলোককে দেখে বেঞ্চে বসা লোকজন উঠে দাঁড়াল। দোকানদার বললেন, ‘মাস্টারবাবু বসুন।’
ভদ্রলোক বসলেন। বসতে বসতে বললেন, ‘হিরু, তোমার ছেলে স্কুলে যাচ্ছে না কেন?’ হিরু মানে চায়ের দোকানদার মাথাটা নিচু করে বলল, 'কী বলব মাস্টারবাবু, ওর আর পড়ায় মন নেই।'
মাস্টারমশাই গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এই বয়সে পড়ায় মন নেই তো কিসে মন আছে?’ হিরু আগের মতোই মাথা নিচু করে বলল, ‘ও তো লক্ষ্মীঘাটের কাছে মহাদেব সাহার কাঠগোলায় চাকরি পেয়ে গেছে।'
মাস্টারমশাই রেগে গিয়ে বললেন, ‘চাকরি পেয়ে গেছে। লেখাপড়ার আর দরকার নেই। কাঠ ঘষেই সারাজীবন চলবে। ছেলের মঙ্গল চাইলে ওকে স্কুলে পাঠাও।'
মাস্টারমশাই আর দাঁড়ালেন না। ভানু-কানু দু'জনেই ছিল দোকানের সামনে। কানু দোকানের কাছ থেকে সরে এসে বলল, 'ভানু, একটা ফন্দি মাথায় এসেছে।' ভানু বলল, ‘কী?’
কানু বলল, ‘চল, লক্ষ্মীঘাটের মহাদেব সাহার কাছে যাই। চাকরি তো আমাদের দরকার। ওই ছেলেটাকে স্কুলে পাঠিয়ে আমরা দু'জনে ঢুকে পড়ি।'
ভানু বলল, ‘দুজনকে নেবে কেন?’
কানু বলল, ‘মহাদেবের ঘটে বুদ্ধি থাকলেই নেবে। যে মাইনে দিয়ে একজনকে রাখছে, আমরা ওই মাইনেতে দু’জন খাটব। শুধু রাত্রে গোলায় শুতে দিতে হবে।'
ভানুর মনে হল, এটা বেশ ভাল বুদ্ধি। চাকরিটা হলেও তা হলে হতে পারে।
কানু বলল, ‘যাবি লক্ষ্মীঘাটে?’
ভানু বলল, ‘চল, এখনই যাই।'
দু’জনে মনে মনে চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগল।
কিছুটা আসার পরই ওরা দেখতে পেল সামনে বাগানওলা একটা বাড়ির সামনে সেই মাস্টারমশাই দাঁড়িয়ে একটা রিকশাওলার সঙ্গে কথা বলছেন।
কানু বলল, ‘আমরা বরং মাস্টারমশাইকে ধরি।'
ভানু বলল, ‘ধরে কী হবে?’
কানু বলল, ‘মাস্টারমশাইদের সবাই মান্যি করে। উনি মহাদেব সাহাকে বলে দিলে মহাদেব সাহা হিরুদার ছেলেটাকে ছাড়িয়ে দিয়ে আমাদের কাজে নিয়ে নেবে। ওই ছোকরাটার কাজের দরকার নেই। কাজ তো আমাদের দরকার।'
ওরা ভেবেছিল ওই বাগানওয়ালা বাড়িটাই মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি। একটু পরে বোঝা গেল, তা নয়। ভানু বলল, ‘মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি খুঁজে পেতে দেরি হবে না।'
কানু বলল, ‘শুধু মাস্টারমশাই বললে হবে না। নামটা তো জানতে হবে।'
ভানু দেখল মাস্টারমশাই হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার বাঁক ঘুরে দৃষ্টির বাইরে চলে গেছেন। কিন্তু রিকশাওলা তখনও একটা দোকানের কাছে দাঁড়িয়ে। কানু গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারল মাস্টারমশাইয়ের নাম অনন্ত ভট্টাচার্য। এর পর আর বাড়ি খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না ওদের।
হাল আমলের গ্রিলের দরজাওয়ালা বাড়ি নয়। সাবেক কালের বাড়ির মতো মোটা মোটা থামওয়ালা বাড়ি। ওরা দু'জনে গিয়ে মাস্টারমশাইয়ের বাড়ির সামনে দাঁড়াল, তারপর ‘সার-সার’ বলে ডাকতে ডাকতে দিব্যি বাড়ির ভেতরে চলে এল। মাথার ঘোমটা টেনে দিতে দিতে একজন মহিলা বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কোত্থেকে আসছ?’
কানু বলল, ‘এই এইখান থেকে। সারের সঙ্গে একটু দরকার ছিল।'
মহিলার চেহারায় বেশ একটা ‘মা মা’ ভাব। ভানু-কানু দু'জনেরই তাদের মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। সেই মহিলা বললেন, ‘তোমরা একটু বোসো, তোমাদের স্যর আসছেন।'
মিনিট পাঁচেক বসার পর বাইরে থেকে ‘কই, কে এসেছে?’ বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন স্যর। দু’জনে ভেতরে ভেতরে একটু ঘাবড়ে গেল বটে, তবে সেটুকু সামলে নেওয়ার অভ্যাস ওদের আছে। স্যর ঘরে ডোকার সঙ্গে সঙ্গে ওরা দুজন উঠে দাঁড়াল এবং দুজনেই ঢিব ঢিব করে প্রণামও করে নিল। অনন্ত ভট্টাচার্য ওদের দুজনের মুখের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, 'তোমরা কি আমার স্কুলের ছাত্র? কিন্তু তোমাদের কখনও দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।
কথা বলতে বলতে অনন্তবাবু একটা কাঠের চেয়ারে বসলেন। ওরা দুজন দাঁড়িয়ে রইল। কানু বলল, 'স্যর, মনে পড়বে কেমন করে, আপনি তো আমাদের দেখেনইনি।' ভানু বলে উঠল, ‘আমরা ভিন গাঁয়ের ছেলে।'
অনন্তবাবু আরও একবার দু’জনের দিকে তাকালেন। এবারের দৃষ্টিটা তীক্ষ্ণ। সহজ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার কাছে কেন এসেছ? কী দরকার?’
ভানু কানুকে ছোট্ট একটা খোঁচা মেরে বলল, ‘তুই বল না?’
কানু সহজ হওয়ার জন্য একটু হাসবার চেষ্টা করল, কিন্তু তেমন সহজ হতে পারল না। উলটে ভানুকে বলল, ‘তুই বল।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘যে হোক একজন বলো, কেন, কী দরকার তোমাদের?’
কানু ফস করে বলে ফেলল, ‘স্যর, আমাদের একটা চাকরি জুটিয়ে দিন। না খেতে পেয়ে মরে যাচ্ছি।'
অনন্তবাবু অবাক হলেন। অবাক গলাতেই বললেন, ‘এই বয়সে চাকরি! তোমরা লেখাপড়া করো না?’
ভানু বলল, ‘আজ্ঞে স্যর করেছিলুম, কিন্তু শেষরক্ষা হল না।'
অনন্তবাবুর বিস্ময় বেড়ে যেতে লাগল। ছেলেদুটো এসব কী বলছে! তিনি বললেন, ‘শেষরক্ষা হল না মানে? ব্যাপারটা কী খুলে বলো তো।'
কানু যতটা পারল গুছিয়ে বলল। স্যর ওদের কথা কতটুকু বিশ্বাস করলেন সেটা ওরা বুঝতে পারল না। স্যর, অর্থাৎ অনন্তবাবু বললেন, ‘তা তোমরা গৌরীপুর ছেড়ে এখানে এলে কেন?’
কানু বলল, ‘ওখানে আর থাকা চলে না। চোর বলে বেজায় বদনাম রটে গিয়েছিল। মারধোরও খেয়েছি।'
অনন্তবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। কঠোর গলায় বললেন, 'তোমরা লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে চুরি করতে?'
ভানু বলল, ‘আপনি গুরুজন, আপনার কাছে মিথ্যে কইব না। পেট চালাবার জন্যে একটু-আধটু চুরি করতুম।'
কানু বলল, ‘সার, তেমন চুরি নয়। ওই ধরুন গাছের ফল, হাট থেকে এটা-ওটা। বড় চুরি বলতে তো সেই একটা পাঁঠা। তা মনে করুন পাঁঠা চুরি করে মা দুর্গার বলিতে দিয়ে দিলুম। এও তো এক ধরনের সেবা।'
অনন্তবাবু গভীর দৃষ্টিতে দু’জনকে দেখতে লাগলেন। ছেলেদুটো সরল। অকপটে সবই বলছে। চুরির কথাটা না বললে তাঁর পক্ষে জানা সম্ভবই ছিল না। কিন্তু এই সরলতা, এই অকপট স্বীকারোক্তির পেছনে ছেলেদুটোর অন্য কোনও মতলব নেই তো? অনন্তবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘ক্লাস সেভেন পর্যন্ত যখন পড়েছ, তখন বলো তো ক্লাস সেভেনের বাংলা বইয়ের কী নাম?’
কানু স্কুলে যেমন পড়া বলবার আগে হাত তুলত তেমন ভঙ্গি করেই বলল, ‘সাহিত্য চয়ন।'
অনন্তবাবু যাচাই করে দেখতে চান সত্যিই ওরা পড়াশোনা করেছিল কি না। করে থাকলে ছাত্র কেমন ছিল। অনন্তবাবু আবার প্রশ্ন করলেন, সাহিত্য চয়ন বইয়ের পদ্যাংশে প্রথম কবিতাটা কী ছিল? কে বলতে পারবে?
ভানু উত্তর দিল, ‘দুজনেই পারব। তবে আপনি ভাগাভাগি করে জিজ্ঞেস করতে পারেন। প্রথম কবিতা কাশীরাম দাসের ‘বনগমনের প্রাক্কালে'।’
অনন্তবাবু বললেন, ‘প্রাক্কালে মানে কী?
ভানু উত্তর দিল, ‘আগে।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘কবিতার কয়েকটা লাইন বলো তো দেখি!’ কানু আর সময় নিল না। সারের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল:
.
নগর উত্তরমুখে চলেন পাণ্ডব।
চতুর্দিকে ধাইল রাজ্যের প্রজাসব ॥
যেই মত ছিল সেই ধাইল ত্বরিতে।
পাণ্ডব দেখিয়া সবে রহে চতুর্ভিতে ॥
.
অনন্তবাবু মনে মনে ভাবলেন, দেড়-দু’বছর পড়াশোনার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। তবুও তো দিব্যি মনে আছে। স্মরণশক্তি বেশ ভাল। এই ছেলেদুটোকে যাচাই করার আগ্রহটা বেড়ে গেল। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ক্লাস সেভেনে তো ইতিহাস পড়েছ। বলো তো কোন সময় থেকে ইউরোপে মধ্যযুগের সূচনা হয়? তোমরা কে পারবে?’ ভানু বলল, ‘দুজনেই পারব। তবে আমারটা শুনুন। জার্মানদের পশ্চিম ইউরোপে আগমনের কাল থেকেই ইউরোপে মধ্যযুগের সূচনা হয়।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘তার আগে জার্মানরা কোথায় ছিল?’
কানু উত্তর দিল, ‘উত্তর ও মধ্য ইউরোপের অরণ্য অঞ্চলে।'
-কানুর দিকে দেখতে দেখতে ভাবলেন, এই ছেলেদুটো কেন চুরি করত? কেন ওদের পেটের জন্য স্কুল ছেড়ে চাকরি খুঁজতে হয়? চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে অনন্তবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোদের নাম কী?’
অনন্তবাবুর চোখে মুগ্ধতার ছোঁয়া লাগছিল। ভানু
কানু উত্তর দিল, ‘ওর নাম ভানু আর আমার নাম কানু। আপনি যদি একটা চাকরির...’ অনন্তবাবু বললেন, ‘চাকরি খুঁজছিস কেন? পেটের খিদের জন্য তো? সেই ব্যবস্থা আমি দেখব।'
ভানু বলল, ‘আমরা তা হলে কী করব? বসে বসে কে আমাদের খাওয়াবে?’
অনন্তবাবু বললেন, ‘সেসব আমি ভাবব। তোদের চাকরি হল স্কুলে পড়াশোনা করা। তবে সেইসঙ্গে তোদের দু'জনকে একটা কাজ করতে হবে।'
ভানু-কানু দুজনেই বলল, ‘কী কাজ স্যর?’
অনন্তবাবু বললেন, ‘রোজ বিকেলে আমার সঙ্গে বাউরিপাড়ায় যাবি। ওখানে একটা স্কুল আছে। বিকেলবেলা পড়ানো হয়। আমার সঙ্গে তোরাও ওদের পড়াবি।'
ভানু-কানু এবার ফিক করে হেসে ফেলে বলে উঠল, ‘স্যর, আপনি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছেন। আমরা কি পড়াতে জানি? পড়াতে গেলে অনেক বিদ্যে লাগে।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ এসব পড়াবার বিদ্যে তোদের আছে। তোরা থাকিস কোথায়?’
ওরা দুজনেই বলল, ‘থাকার জায়গা নেই বলে গঙ্গার ঘাটে শুয়ে থাকি।'
অনন্তবাবু একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘তোরা বোস, দেখি কী ব্যবস্থা করা যায়।' কথা শেষ করেই স্যর বাড়ির ভেতর দিকে চলে গেলেন। ওরা দু’জন পরস্পরের দিকে না। আমরা কী পড়াব?’
একবার তাকাল। তারপর কানু বলল, 'স্যর, কী বলছেন বুঝতে পারছি
ভানু বলল, ‘যদি থাকার আর খাওয়ার একটা ব্যবস্থা হয়ে যায় তা হলে স্যর যা বলবেন তাই করব। কিন্তু হবে কী?’
কানু কানখাড়া করে কিছু শোনার ভঙ্গি করল। তারপর ফিসফিস করে বলল, ‘কেসটা কঠিন। ভেতরে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। স্যর বোধ হয় বলছেন, ইয়েস, অন্য কেউ ছেন নো।’
ভানু নিজের দুটো আঙুল কপালে তিনবার ঘষে নিয়ে বলল, ‘একটা ধর।
কানু একটা হাত ভানুর আঙুলের দিকে বাড়াতে বাড়াতে বলল, ‘আর ধরাধরি করে লাভ নেই। যদি ‘নো’ হয়ে যায় তা হলে দু'দিনের খাবার ব্যবস্থা আমি করে দিয়েছি।' ভানু বলল, ‘কেমন ব্যবস্থা?’
কানু বলল, ‘ওই কুলুঙ্গির ওপর একটা পেতলের ধূপদানি ছিল, আর একটা ছোট বাটি। দুটোই এখন আমার পকেটে।'
বাইরে স্যরের গলার আওয়াজ পেয়ে ওরা থেমে গেল। স্যার দরজার সামনে থেকে ডাকলেন, ‘ভানু-কানু, ভেতরে এসো।'
স্যারের কৃপায় থাকা এবং খাওয়া দুটো ব্যবস্থাই হয়ে গেল। বাইরের ঘরে মেঝের ওপর মাদুর পেতে শোওয়ার ব্যবস্থা। সকালে গুড়-মুড়ি, কোনওদিন বা আটার রুটির সঙ্গে আলুর ছ্যাচড়া। দুপুরে এবং রাত্রে খাওয়ার ব্যবস্থা ভালই। কানু রাত্রে শুয়ে ফিসফিস করে ভানুকে বলে, ‘ব্যবস্থা তো বেশ ভালই মনে হচ্ছে। কাজ বলতে পড়া আর বিকেলে গিয়ে ধাড়ি বাড়ি লোকদের পড়ানো। বাবা-কাকার বয়সি মানুষগুলোও আমাদের মাস্টারবাবু বলে ডাকে।'
ভানুও ফিসফিস করে বলে, ‘আমাদের ভাগ্যটা খুলে গেল দেখছি।' কানু বলে, ‘এমনি খোলেনি, খোলাতে হয়েছে।'
ভানু অবাক গলায় বলে, ‘খোলাতে হয়েছে মানে? কে খোলাল?’
কানুর গলায় আত্মতৃপ্তি আর অহংকারের ছোঁয়া। কানু বলল, ‘ভাগ্যিস পাঁঠাটা ধরে এনে মা’র সামনে বলি দিয়েছিলাম, তাই মা দশ হাতে আশীর্বাদ করেছে।'
ভানু আর কথা না বলে চুপ করে গেল। অনন্তবাবু একদিন বাউরিপাড়া থেকে ফিরতে ফিরতে ওদের বলল, 'দ্যাখ, আগামী বছর আমি তোদের আমার স্কুলে ক্লাস এইটে ভর্তি করব। কাজটা খুব সোজা নয়। অনেক ঝক্কি আছে।'
কানু বলল, ‘আমাদের জন্য আর কত ঝক্কি আপনি পোয়াবেন। তার চেয়ে ভর্তির ঝক্কিটা বাদ দিন।
অনন্তবাবু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বাঁ হাতে কানুর কানটা ধরে বললেন, ‘স্কুলে ভর্তি না হলে তোদের দু'জনকে কান কেটে এই গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেব।'
কানু আস্তে করে বলল, 'স্যর, বাউরিপাড়ার লোকেরা দেখছে। আমি তো ওদেরও মাস্টারবাবু। ওরা হয়তো ভাববে মাস্টারবাবুরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে।'
নিজের মনেই হেসে ফেললেন অনন্তবাবু। কানটা ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘কথাটা মনে থাকে যেন। তাহলে ওদের কাছেও আর কোনও সম্মান থাকবে না।'
মাঝেমধ্যে একটু আধটু দুরন্তপনা করলেও ওরা দুজনে পড়াশোনাটা মন দিয়ে করতে লাগল। বছর দেড়েকের মধ্যে মাস্টারমশাই এবং তাঁর স্ত্রীর মতো ওরা ভুলে গেল যে, এরা রক্তের সম্পর্কে কেউ নয়। মনে হত ওরা যেন এই বাড়িরই ছেলে। দুজনের গায়ে যেমন জোর ছিল, মনেও তেমন সাহস ছিল। ওদের দেখে অনন্তবাবু মাঝে মধ্যে স্ত্রীকে বলতেন, ‘জানো, আমার বরাবর বিশ্বাস ছিল মানুষ কখনও নষ্ট হয় না। তাদের নষ্ট করে দেওয়া হয়। এই ছেলে দুটো কোনও আশ্রয় না পেলে খিদের জন্য আবার চুরি করত। ধরা পড়ে জেলে যেত। জেল থেকে ফিরে আসত আরও বড় চোর হয়ে। তারপর খুনে-ডাকাত হত। কিন্তু এখন ওদের নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখি।'
অনন্তবাবুর স্ত্রী মণিকা দেবীর দুই চোখে বিষাদের ছায়া ঘন হয়ে এল। থমথমে গলায় বললেন, ‘আর কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখিও না। একদিন যাকে নিয়ে আমরা দু'জনেই স্বপ্ন দেখতাম সে তো আমাদের স্বপ্নকে মিথ্যে করে দিয়ে চিরতরে চলে গেল।'
অনন্তবাবু চুপ করে গেলেন। তাঁর চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। চশমাটা চোখ থেকে খুলে কাপড়ে মুছলেন। চোখের কোনায় এক ফোঁটা জল গড়িয়ে এসেছিল। বাঁ হাতে সেটা মুছে নিয়ে বললেন, ‘মানুষের সব স্বপ্ন ব্যর্থ হতে পারে না। তুমি দেখো, আমাদের খোকার মতো ওরাও মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট করবে।'
নিজের স্কুলে ওদের ভর্তি করাবার মাসদেড়েক পরে বাংলার শিক্ষক প্রকাশবাবু একদিন বললেন, ‘স্যর, আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল। যদি কিছু মনে না করেন তাহলে বলি।' অনন্তবাবু একটু অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘বলুন না কী বলতে চান?’
প্রকাশবাবু বললেন, ‘আমাদের টিচারদের মধ্যে কেউ কেউ ওই ভানু-কানুকে ভর্তি করানোর ব্যাপারটা নিয়ে সমালোচনা করছে। অঙ্কের যাদববাবুর ভায়রা থাকেন গৌরীপুরে। উনি ভায়রার কাছ থেকে ওদের অতীত কীৰ্তি সব জেনেছেন। কথাটা স্কুল কমিটির কানেও গেছে।'
অনন্তবাবু গম্ভীর হয়ে গেলেন। চোখ থেকে চশমাটা খুলে বললেন, ‘স্কুল কমিটি যদি আমার কাছে কিছু জানতে চায় তবে যা বলবার সেটা আমি বলব। এবার আপনি বলুন তো, ওরা দু’জন ছাত্র হিসেবে কেমন?’
প্রকাশবাবু বললেন, ‘ছাত্র হিসেবে ওরা দু’জনেই বেশ ভাল। ওদের পড়িয়ে তৃপ্তি আছে।' অনন্তবাবু টেবিল থেকে চশমাটা তুলে আবার চোখে পরতে পরতে বললেন, ‘আপনি কি মনে করেন, ওরা যদি আরও খাটে, আমরা যদি ওদের দিকে আরও একটু নজর দিই তা হলে মাধ্যমিকে ওরা বাংলায় বেশ ভাল নাম্বার পাবে?’
প্রকাশবাবু বললেন, ‘আমারও তাই বিশ্বাস স্যর।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘ব্যস, আর কিছু জানবার দরকার নেই। প্রয়োজন হলে স্কুল কমিটির সামনে আপনার এই বিশ্বাসের কথাটাই বলবেন।'
প্রকাশবাবু নিঃশব্দে চলে যাওয়ার পরও অনন্তবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর স্কুল থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ির দিকে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। নিজের মনেই একটু ভেবে নিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলেন স্কুল কমিটির সেক্রেটারি নন্দদুলালবাবুর বাড়িতে। বাড়িতে তাঁর দেখা পাওয়া গেল না কিন্তু ফেরার পথে বটতলার মোড়ে দেখা হয়ে গেল। অনন্তবাবু নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘নন্দ, আমি তোমার বাড়ি গিয়েছিলাম। পথে দেখা হয়ে ভালই হল।'
নন্দদুলাল এখন স্কুল কমিটির সেক্রেটারি বটে, কিন্তু ছাত্রজীবনে দু’বছর এই স্যরের কাছেই পড়াশোনা করেছেন। অতএব, নন্দবাবু কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘আপনি তো আমাকে খবর দিলেই পারতেন। চলুন বাড়িতে গিয়ে বসা যাক।'
অনন্তবাবু আপত্তি করলেন না। কেননা, তিনি জানেন, এই মুহূর্তে প্রয়োজনটা তাঁর। ঘরে এসে বসার পর নন্দবাবু বললেন, ‘স্যর তো সোজা স্কুল থেকে আসছেন।'
নন্দবাবু বললেন, 'তা হলে একটু চা বলি।' কথাটা শেষ করেই ঘরের পরদা তুলে নন্দবাবু বললেন, ‘ঝরনা, স্যর এসেছেন। স্যরের জন্য চা পাঠাও।'
অনন্তবাবু ঘাড় নাড়লেন।
কথা শেষ করে সারের সামনে এসে বসলেন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘বলুন স্যর।'
অনন্তবাবু কোনও ভূমিকা না করে সোজাসুজি বললেন, 'আমাদের স্কুলে দুটি নতুন ছাত্রকে আমি ভর্তি করিয়েছি আমার দায়িত্বে। ওদের নিয়ে কি তোমাদের কোনও অসুবিধে হচ্ছে?'
নন্দবাবুর মুখটা এবার গম্ভীর হয়ে এল। স্কুল কমিটির সেক্রেটারি এবং তাঁর পদমর্যাদার কথাটা মনে থাকলে যেমন গাম্ভীর্য আসে তেমন। নন্দবাবু বললেন, ‘ওই ছেলে দুটির নাম সম্ভবত ভানু-কানু। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি নিজেই আপনার সঙ্গে কথা বলব বলে ভাবছিলাম। আসলে স্কুল কমিটির কেউ কেউ এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘কেমন প্রশ্ন?’
নন্দবাবু বললেন, ‘গৌরীপুরে ওরা দু’জনেই চোর বলে পরিচিত ছিল। ওদের সঙ্গে একত্রে পড়তে অন্য ছাত্ররা কিংবা তার গার্জেন বা আপত্তি তুলতে পারেন। সেক্ষেত্রে আমাকেই তো ফেস করতে হবে।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘স্কুল কমিটির দায়িত্বের একটা সীমা আছে। সে তার দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু ক্লাসরুমে, ছাত্রদের মধ্যে আমরা কাজ করি। সেখানে তোমাদের এতটা চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কে ভর্তি হবে, কে কেমন পড়বে, কাকে কেমন করে পড়াতে হবে সেটা শিক্ষকদের দায়িত্ব।'
নন্দবাবু বললেন, ‘আসলে, বুঝতেই তো পারছেন, জবাব তো আমাকেই দিতে হবে। যদি চোর হয়...’
অনন্তবাবু বললেন, ‘জবাব দেওয়ার দায় আমার। তুমি স্কুল কমিটির মিটিং ডাকো। ছেলেবেলায় দুষ্টুমি করার মতো সামান্য এটা-ওটা অনেক ছেলেই নেয়। সেটাকে চুরি বলা চলে না।’
নন্দবাবু প্রশ্ন করলেন, 'তাহলে কী বলা চলে?’
অনন্তবাবু হাসলেন। ঠোঁটের ওপর হাসিটা রেখে বললেন, ‘নন্দ, তোমার কি মনে পড়ে, হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার পর তোমরা তিন বন্ধু মিলে গোপাল ঘোষের পোলট্রিতে গিয়ে মুরগি চুরি করে পিকনিক করেছিলেন। সেই চুরির দায়ে কি তোমার কলেজে পড়া বন্ধ হয়েছে? হয়নি। ওই বয়সে এসব একটু-আধটু হয়। তখনও আমি তোমাদের হয়ে যা বলেছিলাম, আজ ভানু-কানুর হয়েও তাই বলব। কমিটি মিটিং ডাকো।'
অনন্তবাবু বাড়িতে চলে এলেন। বাড়িতে এসেই স্ত্রীকে বললেন, ‘ভানু-কানু কোথায়?’ মণিকা দেবী উত্তর দিলেন, ‘কোথায় আবার? ওরা তো বাউরিপাড়ায় পড়াতে গেছে।' অনন্তবাবু থেমে গেলেন। পরদিন স্কুলে পৌঁছেই টের পেলেন নন্দদুলালের বাড়িতে তাঁর যাওয়ার খবরটা সবাই জেনে গেছে এবং প্রত্যেকেই নিজের নিজের মতো ব্যাখ্যা করছে। অঙ্কের টিচার যাদববাবু বলছেন, ‘স্যর এবার বুঝেছেন কাজটা উনি ভাল করেননি। তাই নন্দবাবুকে ম্যানেজ করতে বাড়ি পর্যন্ত ছুটেছেন।'
অন্য একজন বলছেন, 'নন্দবাবু না হয় কিছুদিন ওঁর ছাত্র ছিলেন। কিন্তু নন্দবাবু কী করবেন? গার্জেনরা যদি জয়েন্ট পিটিশন দেয় তা হলে কমিটি কি নন্দবাবুর কথা শুনবেন নাকি হেডস্যরের কথা মানবেন।'
কথাগুলো অনুচ্চ গলায় বলা হলেও অনন্তবাবুর কানে গেল। উনি ধীর পায়ে টিচার্সরুমের কাছে এসে বললেন, 'আপনারা নিজেদের ক্লাসে যান। প্রায় তিন মিনিট আগে ঘণ্টা পড়ে গেছে।'
সবাই উঠে দাঁড়িয়ে রোলকল-এর খাতা টেনে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সেইদিন স্কুলের শেষ ঘণ্টা বাজার আগেই স্কুল কমিটির লিখিত চিঠি এল। চিঠির সংক্ষিপ্ত বয়ানে লেখা আছে, আগামী শনিবার স্কুল ছুটির পর টিচার্সরুমে স্কুল কমিটির মিটিং।
অনন্তবাবু মনে মনে হাসলেন। তিনি জানেন, হঠাৎ এই মিটিং কেন এবং কীসের জন্য। স্বভাবতই মনটা ভাল লাগছিল না। ভেতরের জেদটা বাড়ছিল। সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে এসে দেখলেন ভেতরের বারান্দায় বসে ভানু একা পড়ছে। কানু নেই। প্রয়োজনের চেয়ে গলার স্বরটা উঁচু হয়ে গেল। ভানুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কানু কোথায়?’ ভানু একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘মা যেন কোথায় পাঠিয়েছেন।'
তাকিয়ে ডাকলেন, ‘মণি, মণি, একবার এদিকে এসো।' রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মণিকা দেবী এসে বললেন, ‘কী হল? অত জোর গলায় ডাকছ কেন?’
অনন্তবাবু ভেতরের ঘরের দিকে
গম্ভীর গলায় অনন্তবাবু বললেন, ‘কানুকে তুমি কি কোথাও পাঠিয়েছ?’
মণিকা দেবী অবাক দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, 'হ্যাঁ।'
অনন্তবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায় মণিকা দেবী বললেন, ‘ওকে গমকলে পাঠিয়েছি। গমটা ভাঙাতে হবে তো।'
অনন্তবাবু একই ভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘এতদিন কে গম ভাঙাতে যেত? ওরা আসার আগেও তো গম ভাঙানো হত। হত না?’
মণিকা দেবীও এবার তপ্ত গলায় বললেন, ‘একটা ঠিকে কাজের লোক ছাড়া আর কোনও লোক তো তোমার সংসারে নেই। কাছের গমকলটা বন্ধ। এটা খোলা থাকলে আমিই যেতাম। স্টেশনের কাছে যেতে হবে বলে কানুকে পাঠালাম।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘আমার ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতে। না হয় আমিই যেতাম।'
কিছুটা বিদ্রুপের গলায় মণিকা দেবী বললেন, ‘তুমি যেতে। জীবনে কোনওদিন গিয়েছ?’ অনন্তবাবু বললেন, ‘প্রয়োজন হলে যেতে হবে।'
মণিকা দেবী বললেন, ‘কাল তো কাজের লোক আসবে না। আজ বলে গেছে। সকালে এককাঁড়ি বাসন কে মাজবে? তুমি?’
গম ভাঙিয়ে এই সময় কানু ফিরে আসায় তর্কটা থেমে গেল।
রাত্রে পাশাপাশি শুয়ে ভানু সমস্ত ঘটনাটা কানুকে বলল। কানু সব শুনে উঠে বসল। ভানু বলল, ‘কী হল, উঠে বসলি কেন?’
কানু বলল, ‘শোন, খুব ভোরে উঠে রান্নাঘরের শেকল খুলে সব এঁটো বাসন আমরা মেজে রাখব। আমরা থাকতে মা কেন মাজবে?’
কথাটা, ভানুরও মনে ধরল। ভোররাত্রে উঠে বাসন মেজে ওরা আবার শুয়ে পড়ল।
সকালে উঠে ধন্দে পড়ে গেলেন মণিকা। কাজের মেয়ে লক্ষ্মী তো বলেই গেছে আসবে না। তবে কে বাসন মাজল? লক্ষ্মীর বোনের মেয়ের বিয়ে। একদিনের কথা বলে তিন দিন কামাই হয়ে গেল। অথচ তিন দিনই বাসন মাজা শেষ। লক্ষ্মী আসে সকাল সাতটায়। সে এসেও দেখল বাসন মাজা হয়ে গেছে। এবার তক্কে রইলেন মণিকা দেবী। ভোর রাত্রে মনে হল কলতলায় জলের আওয়াজ। বিছানা থেকে উঠে ঘরের বাতি না জ্বেলে টর্চ দিয়ে দেখলেন ভোর সোয়া চারটে। স্বামীকে ডাকলেন। দু’জনে দোতলা থেকে নেমে এসে দেখলেন, কলতলায় বাসন মাজছে ভানু আর কানু। বাসন মাজছে আর নিজেরাই মিহি সুরে গান গাইছে ‘আমরা কাজ করি আনন্দে / মাঠে মাঠে বেলা কাটে সকাল হতে সন্ধে।'
বারান্দায় তখনও তরল অন্ধকার। সেই অন্ধকারেই মণিকা দেবী স্বামীর দিকে তাকালেন। অস্ফুটে বললেন, ‘বিশ্বাস করো, এটা কিন্তু আমি ওদের বলিনি।'
অনন্তবাবু স্ত্রীর একটা হাত ধরলেন। হাতে মৃদু একটা চাপ দিয়ে বললেন, ‘জানি। পা টিপে টিপে ওপরে চলো। ওদের আবেগ আর ভালবাসাকে অসম্মান করতে পারব না।'
শনিবার দুটোর পর স্কুল কমিটির মিটিং বসল। প্রথমে স্কুলের উন্নয়ন, নতুন ক্লাসঘর, আগামী মাধ্যমিক পরীক্ষা ইত্যাদি নিয়ে কিছু আলোচনা হল। অনন্তবাবু বুঝতে পারলেন, মূল বিষয়ে আসার আগে এগুলো হচ্ছে নিছক ভূমিকা। ভূমিকা অথবা ভণিতা। স্কুল কমিটি আজকের মিটিংয়ের আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যে কোথাও লেখেনি বা উল্লেখ করেনি যে ভানু-কানুকে নিয়েও আলোচনা হবে। অনন্তবাবু অপেক্ষা করেছিলেন মূল বিষয়টার জন্য। সবশেষে বিষয়টা উঠল। বিষয়টা তুললেন হরিপদ কাঞ্জিলাল। তিনি বললেন, ‘অনন্তবাবু, ভানু-কানু নামে যে দুটি ছেলেকে আপনি স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন সেই ছেলে দুটোর অতীত আপনি জানেন?’
অনন্তবাবু বললেন, ‘যতটুকু জানা প্রয়োজন মনে করেছি ততটুকু জেনেছি। নন্দবাবু কোনও কথাই বলছিলেন না। অতএব হরিপদবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘ছেলে দুটি নাকি চোর?’
অনন্তবাবু বললেন, ‘আপনাদের কারও কাছে কোনও প্রমাণ আছে? পুলিশের খাতায় কোনও ডায়েরি আছে?’
হরিপদবাবু বললেন, ‘খবরটা এসেছে গৌরীপুর থেকে। যাদববাবুর ভায়রা সব শুনে এসেছেন। ওঁর ছেলেও এই স্কুলে পড়ে। এখন গার্জেনদের কথা তো ভাবতে হবে। তাঁরা যদি প্রতিবাদ করেন?’
অনন্তবাবু বললেন, ‘তার জবাব আমি দেব। হরিপদবাবু, সারা দেশ জুড়ে সাক্ষরতার আন্দোলন চলছে। আমরা মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে চাইছি। একটা তুচ্ছ কারণ নিয়ে ওদের লেখাপড়াটা বন্ধ করা অন্যায় হবে। জেলে দাগি আসামিদেরও পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হয়। বালক বয়সে দুষ্টুমি করে অনেকেই কিছু কিছু অন্যায় করে থাকে। সেটাকে বড় করে দেখার কোনও কারণ নেই।'
হরিপদবাবু শিক্ষকদের দিকে তাকালেন। যাদববাবু বললেন, ‘সবই মানছি। কিন্তু ওরা যে চোর ছিল সেটা তো অস্বীকার করতে পারেন না। সেই কারণেই তো ওদের গৌরীপুর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।'
অনন্তবাবু চশমাটা খুললেন। হাত দিয়ে চোখটা একটু রগড়ে নিয়ে চশমা পরতে পরতে বললেন, ‘দস্যু রত্নাকর বাল্মীকি হয়েছিলেন। সেটা তো জানেন?’ হরিপদবাবু বললেন, ‘ওরা কি ভাবছে বাল্মীকি
হবে?’
অনন্তবাবু বললেন, ‘বাল্মীকি এ যুগে আমরা কেউই হতে পারব না। ওরা মানুষ হবে এটাই আমার বিশ্বাস। প্রোফেশনাল ডাকাত যদি ভারতীয় সংবিধানের আইন অনুযায়ী নির্বাচনে জিতে এম পি হতে পারে, যদি পঞ্চায়েতের তহবিল তছরুপের অভিযোগে আদালতে হাজিরা দিয়েও স্কুল কমিটির সদস্য থাকতে পারে, পনেরো টাকা সময়মতো না পাওয়ার জন্য যিনি পুত্রবধূকে বাপের বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েও স্কুলের শিক্ষক হতে পারেন তা হলে ভানু-কানুর বিরুদ্ধে কেন প্রতিবাদ হবে। আমি আপনাদের কাছে হাতজোড় করে মিনতি করছি, ওই অনাথ ছেলে দুটির শিক্ষার সুযোগ আপনারা কেড়ে নেবেন না।'
সবাই চুপ করে গেল। গোটা টিচার্স রুম নিস্তব্ধ। অনন্তবাবু উঠে দাঁড়ালেন। কমিটির মধ্যে থেকে কেউ একজন বলে উঠল, ‘ওদের দু’জনকে অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দিলেই তো হয়।'
অনন্তবাবু ঘুরে দাঁড়ালেন। কঠিন দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘রেজিগনেশন লেটার আমি পকেটে নিয়েই এসেছি। আপনারা বাধ্য করলে সেটা এখনই দিতে পারি। যে কোনও ফুটবল টিমে দু’জন ভাল স্ট্রাইকার দরকার হয় ম্যাচ জেতাবার জন্য। ভানু-কানু আমার সেই স্ট্রাইকার। এখানে সব বিষয়ের শিক্ষক মহাশয়রা উপস্থিত আছেন। আপনারা বলুন, ওরা কেমন ছাত্র? যাদববাবু, আপনি তো অঙ্ক করান। দুটো টার্মিনাল পরীক্ষায় ওরা কত পেয়েছে?’
হরিপদবাবু উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কত পেয়েছে বলুন তো?
যাদববাবু মুখটা নিচু করতে করতে বললেন, ‘দু’জনেই নব্বইয়ের কোঠায়। হরিপদবাবু যেন আহত বিস্ময়ে বলে উঠলেন, ‘নব্বইয়ের কোঠায়?’
অনন্তবাবু বললেন, ‘ওদের সুযোগ দিলে মাধ্যমিকে ওরা একশো পাবে।'
এতক্ষণ পর নন্দবাবু কথা বললেন, ‘দুটি ভাল ছাত্রর পড়ার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হবে না। আপনারা কী বলেন?’
কেউ কোনও কথা বলছে না দেখে অনন্তবাবু বললেন, ‘দেশে এখনও আইন আছে।
ওদের তাড়ালে আমি এডুকেশন মিনিস্টারের কাছে যাব। দরকার হলে কোর্টে যাব।' নন্দবাবু বললেন, ‘স্যর, আপনি উত্তেজিত হবেন না। ডোন্ট বি একসাইটেড। ওরা থাকবে। নিশ্চয়ই থাকবে।'
এবার হরিপদবাবু বললেন, ‘এসব ব্যাপারে হেডস্যরই অল ইন অল। উনি যা করবেন সেটাই হবে।'
মিটিং শেষ হয়ে গেল। আস্তে আস্তে সবাই চলে গেলেন। ফাঁকা ঘরে অনন্তবাবু খানিকক্ষণ বসে থেকে ভাবলেন, সময় এগোয়, মানুষও এগোয়। কিন্তু সব মানুষ বোধহয় এগোতে জানে না। এই না জানাটাই অশিক্ষা। ডিগ্রিধারী লোকের মধ্যেও এই অশিক্ষা অনেক পরিমাণে থেকে গেছে। যদি নাই থাকত তাহলে দেশে এত অনাচার হতে পারত না।
সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে এলেন অনন্তবাবু। ভানু-কানু বাউরিপাড়ায় পড়িয়ে ফিরে এসেছে। শনিবার তিনটে থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ওদের পড়ানো হয়। অনন্তবাবু দেখলেন, দু’জনেই বারান্দার কোণে চুপচাপ বসে আছে। তাঁকে দেখে দু’জনে উঠে দাঁড়াল। অনন্তবাবু কোনও কথা না বলে চলে যাচ্ছিলেন। ভানু ডাকল, ‘স্যর।'
অনন্তবাবু দোতলার সিঁড়িতে পা রাখতে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঘাড় ঘুরিয়ে দু'জনকে দেখলেন। তারপর বললেন, ‘কী হল? কিছু বলবি?”
কানু দু’পা এগিয়ে এসে বলল, 'স্যর, আমরা সব জেনে গেছি।'
অনন্তবাবু ঘুরে দাঁড়ালেন। ওদের দু'জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী জেনে গেছিস?’ কানু বলল, ‘স্যর, আমাদের দু'জনকে নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। আজ মিটিং হয়েছে। আমাদের জন্য আপনার অসম্মান হচ্ছে। আপনি আমাদের ছেড়ে দিন।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘ছেড়ে দিলে কী করবি? সেই চুরি?’
কানু বলল, ‘যারা আপনাকে অসম্মান করছে তাদের দেখে নেব।'
অনন্তবাবু ভর্ৎসনার গলায় বললেন, ‘গুণ্ডাগিরি করবি। লোকজনদের মারধোর করবি। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এটা আমাকে তোদের মুখ থেকে শুনতে হল।'
ওরা দু'জনে মাথা নিচু করে রইল। অনন্তবাবু এগিয়ে এসে বললেন, ‘স্কুল কমিটির কাছে, শিক্ষকদের কাছে আমি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এসেছি। আমি বলেছি, তোরা মাধ্যমিকে স্টার পাবি। স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করবি। আজ আমি হারিনি, অপমানিতও হইনি সেইদিন হারব, সেইদিন অপমানিত হয়ে চাকরিতে রেজিগনেশন দেব, যেদিন তোরা ভাল রেজাল্ট করতে পারবি না।'
আবেগে থর থর করে করে গলাটা কাঁপছিল অনন্তবাবুর। ভানু-কানু সেই আবেগের উত্তাপটা নিজেদের বুকের মধ্যে অনুভব করল। হেডস্যর আর কোনও কথা না বলে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলেন। ভানু-কানু স্যরকে যেতে দেখল, তারপর দু’জন দুজনের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে নিজেদের ঘরে গিয়ে পড়ার বইপত্র বার করতে লাগল। পড়তে বসার আগে ভানু বলল, ‘আমরা খারাপ রেজাল্ট করলে স্যরকে চাকরি ছেড়ে দিতে হবে।'
কানু কোনও কথা না বলে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে থাকল।
পরদিন থেকেই অনন্তবাবু ভানু-কানুর জন্য আলাদা ব্যবস্থা শুরু করলেন। বললেন, ‘বাউরিপাড়ায় যেমন পড়াচ্ছিস তেমন পড়াবি। সকালে তোরা যাবি যোগেনবাবুর কাছে পড়তে। আমি বলে রেখেছি। প্রতি সপ্তাহে আমি তোদের পরীক্ষা নেব। ক্লাস নাইনে উঠে তোরা অঙ্ক অ্যাডিশনাল নিবি। তা হলে মোট পরীক্ষা হবে হাজারে। তোদের টার্গেট হবে আটশো আশি। এর থেকে কম হলে চলবে না। আটশো আশি এই সংখ্যাটা মনের মধ্যে গেঁথে রাখ। আমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে বল, মন্ত্রের মতো উচ্চারণ কর, আটশো আশি।
ওরা দু’জনে তাই উচ্চারণ করল আর তখনই দেখল সিঁড়ির গোড়ায় এসে বিবর্ণ মুখে দাঁড়িয়ে পড়েছে স্যরের স্ত্রী অর্থাৎ তাদের মা। তিনি আস্তে আস্তে সিঁড়ির ওপর বসে পড়লেন।
অনন্তবাবু ছুটে গেলেন। বললেন, ‘কী হয়েছে?'
মণিকা দেবী একবার ভানু-কানুর দিকে তাকালেন। তারপর ক্লান্ত গলায় বললেন, ‘ওপরে চলো।'
ওপরে এসে অনন্তবাবু বললেন, ‘তোমার কী হয়েছে, মণি?’
মণিকা দেবী স্বামীর হাতটা চেপে ধরে বললেন, ‘খোকাকেও তুমি বলেছিলে তোর টার্গেট আটশো আশি।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘জানি। সব মনে আছে। খোকা আটশো আশি পায়নি। কিন্তু সাতশো নব্বই পেয়ে সেকেন্ড হয়েছিল। ওদের মধ্যে লক্ষ্যটা উঁচু করে দিলাম। সাতশো পেলেও আমি খুশি।'
মণিকা দেবী বললেন, ‘খোকার নাম্বারেও আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু কী লাভ হল এত ভাল রেজাল্ট করে। মৃত্যু এসে তো অসময়ে ওকে কেড়ে নিয়ে গেল।'
অনন্তবাবু জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। উদাস গলায় বললেন, ‘মৃত্যু তার নিজস্ব নিয়মে আর সময়ে চলে। তার কাছে অসময় বলে কিছু নেই। মৃত্যু একদিন আসবে এই সত্যটা জেনেও কি মানুষ হাত-পা গুটিয়ে চুপ করে বসে থাকে নাকি থাকতে পারে। মানুষকে তার কাজ করে যেতে হয়।'
মণিকা দেবী কোনও কথা বললেন না। আঁচলে চোখ মুছে আস্তে আস্তে উঠে গেলেন। অনন্তবাবু দেওয়ালে টাঙানো খোকার ছবিটার দিকে তাকালেন। তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর চোখও ঝাপসা হয়ে এল।
স্কুলে এসে ভানু-কানু দু'জনেই বুঝল, স্যররা নিজেদের মধ্যে ওদের নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ কেউ বলছেন, ‘হেড স্যরের দুই স্ট্রাইকার।
এটা যে ঠাট্টা করে বলা হচ্ছে সেটা দুজনেই টের পায়। কানুর মধ্যে রাগ হয়। ভানু ওকে সামলায়। ভানু বলে, ‘স্যর বলেছেন সব জবাব দিতে হবে পরীক্ষার খাতায়। এখন কিছু বললে স্যরের অসম্মান হবে।' কানু চুপ করে যায়।
ক্লাস এইট থেকে ভালভাবে পাশ করে নাইনে ওঠার পর পড়ার সময় আরও বাড়িয়ে দিলেন অনন্তবাবু। বাউরিপাড়া থেকে ফেরার পথে গল্পের মতো করে পড়ার বিষয়গুলো ভানু-কানুকে বলতেন তিনি। এমনভাবে আলোচনা করতেন যেন তিনিও ছাত্র। ক্লাস এইটের রেজাল্ট দেখার পর অন্য মাস্টারমশাইরাও বুঝতে পারলেন, হেডস্যর তাঁর স্ট্রাইকার চিনতে ভুল করেননি। এখন আর আগের মতো তেমন ঠাট্টা-রসিকতা কেউ বিশেষ করেন না। কেবল ক্লাসের দু’-তিনটে ছেলে থেকে থেকে পেছনে লাগে। কানুর তো হাতের পেশি চিড়বিড় করে, কিন্তু কিছু বলতে পারে না। একদিন বিশু ওদের দু’জনকে দেখে বলে উঠল, ‘হেডস্যরের দুই গাধা। সার যে কেন গাধা পোষেন।
এবার আর ভানুর দিকে তাকাল না কানু। একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিশুর ওপর। গায়ের জোরে বিশুর তো পেরে ওঠার কথা নয়। সে ভয় পেয়ে গিয়ে পরিত্রাহি চিৎকার জুড়ে দিল। সেই চিৎকারে অন্য ক্লাসের ছাত্রদের মতো টিচার্স রুম থেকে শিক্ষকরাও বেরিয়ে এলেন। সবাই জানতে চায় ব্যাপারটা কী? কানুর কবল থেকে কেউই বিশুকে ছাড়াতে পারছে না। ক্ষিপ্ত বাঘ হরিণছানাকে যেমন করে ধরে থাকে কানু তেমনভাবেই ধরে পেটাচ্ছে বিশুকে। চিৎকার শুনে অনন্তবাবু এলেন। চিৎকার করে ডাকলেন, ‘কানু৷’
এই একটি ডাকেই কানুর শরীর শিথিল হয়ে গেল। বিশুকে ছেড়ে দিয়ে হেডস্যরের দিকে তাকাতেই হেডস্যর এগিয়ে এসে কানুর গালে জোরে একটা চড় কষিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা মারামারি করার জায়গা? কেন ওকে মারছিলি? ও কী করেছে?’
কানু উত্তর দেওয়ার আগে ভানু বলল, ‘বিশু আমাদের বারবার গাধা বলছিল। পরে যখন আপনাকে নিয়েও বলল তখনই কানু ওকে মার শুরু করেছে।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘তোমরা সবাই ক্লাসে যাও। ভবিষ্যতে কেউ এরকম কাণ্ড করবে না। কিছু হলে টিচারকে বলবে। তিনিই ব্যবস্থা নেবেন।'
হেডস্যর নিজের ঘরে চলে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন, এইসব ঘটনা নিয়ে হয়তো কানুর ওপর আবার কেউ কেউ রুষ্ট হয়ে কমিটিতে নালিশ করবেন। কিন্তু সেরকম কিছু হল না। বরং বিশুই ছুটির পর হেডস্যরের কাছে এসে ক্ষমা চেয়ে গেল। বিশুর এই আচরণে সবাই খুশি হল। কিন্তু কেউই জানল না, এরও পেছনে ভানু-কানুর বুদ্ধি।
ভানু বলল, ‘বিশুর বাবা নাকি পয়সাওলা লোক। পয়সা থাকলেই ক্ষমতা হয়। এই ঘটনা নিয়ে ওরা ঘোঁট পাকালে আবার স্যরকে কমিটির কাছে জবাব দিতে হবে।'
কানু বলল, ‘তাহলে কী করা যায়?’
ভানু বলল, ‘ব্যবস্থাটা আমি করছি।'
টিফিনের সময় ভানু বিশুকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গেল স্কুলের পেছনে। বিশু দেখল কানু ওখানে দাঁড়িয়ে। কানুকে দেখেই বিশু ভয় পেয়ে গেল। ভানু বলল, ‘তোকে এখানে ডেকেছি কেন জানিস?'
বিশুর গলা শুকিয়ে গেল। কানুর খানকয়েক ঘুসির ব্যথা এখনও দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। শুকনো গলায় বিশু বলল, 'আমি কিছুই জানি না।'
ভানু বলল, ‘কানু ঠিক করেছে রোজ স্কুল ছুটির পর তোকে আধঘণ্টা করে পিটুনি দেবে। এরকম পিটুনি এক হপ্তা খেলে তুই আর বিছানা থেকে উঠতে পারবি না।'
বিশু বিষম ভয় পেয়ে গিয়ে বলল, ‘কেন? পিটুনি দেবে কেন? আমি তো আর কিছু বলিনি।'
ভানু বলল, ‘তুই যদি আমার কথা শুনিস তাহলে তোকে বাঁচিয়ে দিতে পারি।' বিশু বলল, ‘কী কথা?’
ভানু বলল, ‘ছুটির পর হেডস্যর যখন টিচার্সরুমে থাকবেন তখন ওখানে গিয়ে হেডস্যরকে বলবি, স্যর, আমি ওসব কথা বলে অন্যায় করেছি। আপনি ক্ষমা করে দিন। কথাটা বলেই হেডস্যরের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়বি। পারবি তো?’
বিশু কোনও উত্তর দিল না। কানু এবার একটু এগিয়ে এসে বিশুর ঘাড়ে হাত রাখল। হাতের থাবাটা দিয়ে ঘাড়টা চেপে ধরতেই বিশু বলল, ‘বলব। আজই বলব।'
ভানু বাড়ি ফিরতে কানুকে বলল, ‘দেখলি তো, ব্যাপারটা কেমন সহজ হয়ে গেল। শুধু গায়ে জোর থাকলে হয় না, মগজে বুদ্ধিও দরকার। দোষটা যে বিশুই করেছে সেটা মাস্টারমশাইরা জেনে গেলেন।'
মাধ্যমিক পরীক্ষার এক মাস আগে থেকে অনন্তবাবুর ঘুম উধাও। সকাল, দুপুর, বিকেল এবং রাত্রি সবসময় তিনি ভানু-কানুকে বলে যাচ্ছেন, ‘মনে আছে তো, আটশো আশি।'
ওরা দু’জনে মাথা নাড়ে। মণিকা দেবী বললেন, ‘সবসময় ওদের অত তাড়া কোরো না। ওরা ভালভাবে পাশ করবে।'
অনন্তবাবু অস্থির হয়ে বলেন, ‘শুধু ভালভাবে পাশ করলে হবে না। ওদের স্ট্যান্ড করতে হবে। বিশজন নয়, দশজনের মধ্যে ওদের আসতে হবে। ওদের মধ্যে সেই প্রতিজ্ঞা আর জেদটা সব সময় জাগিয়ে রাখতে চাই। মানুষ পারে, চেষ্টা করলে সব পারে।'
মণিকা দেবী বলেন, ‘আমার তো মনে হচ্ছে পরীক্ষাটা ওরা নয়, তুমি দিচ্ছ।'
অনন্তবাবু হাসতে হাসতে বলেন, “ঠিক তাই। মাঠে যখন খেলোয়াড়রা খেলে তখন টিমের কোচ থাকে মাঠের বাইরে। মনে মনে সেও কিন্তু খেলে। তার মধ্যেও একই উত্তেজনা। ফুটবলের কোচ সেই খেলাটা নিজের চোখে দেখতে পায়। শিক্ষক ছাত্রদের পরীক্ষাটা দেখতে পায় না। ভুলগুলো তার অজানা থাকে।'
মণিকা দেবীর কাছে এসব কোনও নতুন অভিজ্ঞতা নয়। ভানু-কানু ছাড়াও আর যেসব ছাত্র পরীক্ষা দিচ্ছে অনন্তবাবু তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়েও খোঁজ করে আসেন। এই অভ্যাস আজকের নয়, অনেকদিনের। পরীক্ষার দু'দিন আগে সাইকেল করে ফিরছিলেন। সব ছাত্রই তো কাছাকাছি থাকে না। দূরের ছাত্রদের বাড়ি থেকে ফিরতে হলে বড় রাস্তা দিয়ে ফিরতে হয়। আজই তেমনই ফিরছিলেন। কিছুক্ষণ আগে জোরে বৃষ্টি হয়ে গেছে। বৃষ্টি থেমে গেলেও আকাশের মুখ ভার। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এলোমেলো হাওয়া বইছে। রাস্তার দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাস্তাটা কম আলোকিত। সামনে থেকে আসা বাস আর লরির হেডলাইটের আলোগুলো এসে পড়ছিল অনন্তবাবুর মুখে। চোখ অন্ধকার হয়ে যায়। অনন্তবাবু বাঁ হাতটা তুলে হাতের ঘড়িটা দেখবার চেষ্টা করলেন, ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দে একটা বাজ পড়ল এবং তারপর অনন্তবাবুর মনে হল সামনের থেকে প্রবল একটা ধাক্কা তাঁকে ছিটকে দিল রাস্তার পাশে। তারপর সব অন্ধকার।
হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না। তাঁর সারা শরীর জুড়ে তীব্র যন্ত্রণা। গোটা শরীর জুড়ে ব্যান্ডেজ। চোখেও তাই। তিনি কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না। তাঁর কানে এল মণিকার উৎকণ্ঠিত কণ্ঠস্বর। ‘এখন কেমন আছ?’
মণিকা দেবীর কথার উত্তর দিলেন না। অনন্তবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজ কত তারিখ?’ মণিকা দেবী বললেন, ‘আজ পয়লা মার্চ।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘কাল থেকে আমার ছেলেদের পরীক্ষা। ভানু-কানু কোথায়?” মণিকা দেবী বললেন, ‘এই তো আমার পাশেই আছে।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘মনে হচ্ছে আমার চোখও বাঁধা। আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। ওদের আমার কাছে আসতে বলো।'
মণিকা দেবী ইশারা করতেই দু’জন এগিয়ে গেল। অনন্তবাবু দুটো হাত বাড়ালেন। ওরা দু’জনে হাত দুটো ধরল। অনন্তবাবু ওদের হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বললেন, ‘মনে আছে তো, আটশো আশি। আগামী কাল থেকে সেই লড়াই শুরু। মনে রাখবি, প্রত্যেকটা সাবজেক্ট এক-একটা দুর্গ। তোদের সেই দুর্গ জয় করতে হবে। অনেক কম নাম্বারে দুর্গে প্রবেশ করা যায়, কিন্তু সেটা জয় নয়। বেশি নাম্বার পেলে দুর্গ তোদের অধিকারে।’
হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার পর ভানু-কানু যখন পড়তে বসেছে তখন নন্দদুল এলেন। মণিকা দেবীকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, 'মাসিমা, স্যরের চিকিৎসার জন্য ভাববেন না। আমরা সবাই আছি। কিন্তু...’
নন্দবাবু থেমে গেলেন। মণিকা দেবী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কী হল, তুমি থেমে গেলে কেন? বলো, কী বলতে চাইছ সেটা বলো।' নন্দবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘লরির সঙ্গে মুখোমুখি যে দুর্ঘটনাটা ঘটেছে তাতে
স্যরের বেঁচে থাকার কথা নয়। ঈশ্বর ওঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু...’
নন্দবাবু আবার থেমে গেলেন। একবার মণিকা দেবীর দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলেন। মণিকা দেবী বললেন, ‘মনে হচ্ছে তুমি কিছু বলতে চাইছ, অথচ বলতে পারছ না। তোমার দ্বিধা করার কোনও কারণ নেই। বলো কী বলতে চাও।”
পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখটা মুছতে মুছতে নন্দবাবু বললেন, ‘স্যর শরীরে বেঁচে ফিরবেন এটা ঠিক, কিন্তু চোখে আর দেখতে পাবেন না। দুটি চোখই নষ্ট হয়ে গেছে।'
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে পাওয়ার কাট হয়ে গেল। গোটা বাড়ি অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে দু'হাতে মুখ ঢেকে মণিকা দেবী চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। সেই চিৎকার একটা বুকফাটা হাহাকারের মতো অন্ধকার বাড়িটার দেওয়ালে দেওয়ালে আহত পাখির মতো ধাক্কা খেয়ে খেয়ে লুটিয়ে পড়তে লাগল।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার দু'দিন পর চোখে কালো চশমা পরে বাড়ি ফিরে এলেন অনন্তবাবু৷ ভানু-কানু ভেজা ভেজা চোখে সেই দৃশ্যটা দেখল। ভানু বলল, ‘কানু, আমাদের স্যর অন্ধ হয়ে গেছেন। আর চোখে দেখতে পাবেন না।'
কানু কোনও উত্তর না দিয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে চুপ করে রইল। তার চোখ থেকে জলের ফোঁটা পড়ে তার দুই গাল ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
ভেতর থেকে মণিকা দেবী ডাকলেন, ‘ভানু-কানু, তোরা ভেতরে আয়। স্যর তোদের ডাকছেন।'
ওরা ভেতরে গেল। দোতলার বারান্দায় একটা ইজিচেয়ারে স্যর বসে। চোখে কালো চশমা। সামনে মধ্য দিনের গনগনে রোদ। ওরা গিয়ে পায়ের কাছে বসল। স্যার হাত বাড়িয়ে ওদের স্পর্শ করলেন, তারপর আর্দ্র গলায় বললেন, ‘তোদের রেজাল্টটা নিজে চোখে দেখার শখ ছিল। তা আর হল না। এবার কানে শুনব। তাতেই আমার পরম শান্তি।'

ভানু-কানুর বুকের ভেতরটা মোচড়াচ্ছিল। ওরা দু’জনে স্যরের পায়ের কাছে চুপ করে বসে রইল। সার নিজেই আবৃত্তি করে যাচ্ছিলেন:
আমারে ফিরায়ে লহো অয়ি বসুন্ধরে,
কোলের সন্তানে তব কোলের ভিতরে
বিপুল অঞ্চলতলে। ওগো মা মৃন্ময়ী,
তোমার মৃত্তিকা-মাঝে ব্যাপ্ত হয়ে রই,
দিগ্বিদিকে আপনারে দিই বিস্তারিয়া
বসন্তের আনন্দের মতো।
এই পর্যন্ত বলে স্যর থেমে গেলেন। দু’হাত বাড়িয়ে কিছু একটা খোঁজার বা ধরার চেষ্টা করতেই ভানু-কানু স্যরের দুটো হাত ধরতেই স্যর বললেন, ‘তোদের তো শিখিয়েছিলাম। তোরা কি এর পরের লাইনগুলো জানিস? মনে আছে?’
ভানু-কানু দু’জন কোনও উত্তর না দিয়ে শুরু করল,
.
বিদারিয়া এ বক্ষ পঞ্জর, টুটিয়া পাষাণ বন্ধ
সংকীর্ণ প্রাচীর, আপনার নিরানন্দ
অন্ধ কারাগার-
.
এইভাবেই স্যরের সঙ্গে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল ভানু-কানুর। একদিন ভানু এসে বলল, ‘কানু, খুব খারাপ খবর।'
কানু বাড়ির বাগানে বাড়তি ঘাস ছাঁটছিল। কানু মুখ তুলে বলল, 'কী খারাপ খবর?’ ভানু বলল, ‘স্যর তো অন্ধ হয়ে গেছেন, তাই স্যরের আর স্কুলের চাকরি থাকবে না। বাইরে থেকে অন্য হেডস্যর আনা হবে।'
কানু উঠে দাঁড়াল। থমথমে ভানুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যর, যদি চোখের দৃষ্টি ফিরে পান তাহলে?’
ভানু বলল, ‘তাহলে নিশ্চয়ই চাকরি থাকবে।'
কানু এগিয়ে এসে ভানুর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘স্যর আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। আজ আমরাও চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি।'
ভানু বলল, ‘কীসের চ্যালেঞ্জ?’
কানু দৃঢ় গলায় বলল, ‘স্যর স্কুলেই থাকবেন।'
ভানু কানুকে বোঝাবার মতো ভঙ্গি করে বলল, ‘সেটা হয় না। উনি তো অন্ধ। কমিটি কি আমাদের অন্ধ স্যরকে হেডস্যর রাখবেন না?’
কানু বলল, ‘তুই আমার সঙ্গে থাক। সব ব্যাপার আমি দেখছি।'
ভানুকে সঙ্গে নিয়ে কানু এল বীরপাড়ার সদর হাসপাতালে। ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে সব বলার পর ডাক্তার বললেন, ‘এটা হয় না। কোনও সুস্থ এবং জীবন্ত লোকের দু’চোখ নিয়ে কাউকে দেওয়া যায় না।'
ভানু বলল, ‘ডাক্তারবাবু, যদি আমরা দু'জনে একটা একটা করে চোখ দিই। তাতে তো আমরা পুরো অন্ধ হচ্ছি না।'
ডাক্তারবাবু বললেন, 'আমি এসব প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না। তোমরা অন্যত্র খোঁজ করো।'
দু’জনে নিরাশ হয়ে ফিরে এল। কিন্তু ভানু-কানুর মনে শান্তি নেই। ওরা নানা জায়গায় খোঁজ করতে যায়। কেউই আশার কথা শোনাতে পারে না। ভানু বলে, ‘কী হবে কানু?’
কানু জবাব দেয়, ‘কিছু একটা হওয়াতেই হবে। চল একদিন কলকাতায় যাই।'
স্যর ওদের ডেকে বললেন, 'হ্যাঁ রে, তোরা কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াস? হায়ার সেকেন্ডারির পড়াশোনা এখন থেকেই শুরু করতে হবে। মনে রাখিস, এখন থেকেই শুরু করতে হবে। লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে তোরা কী হতে চাস?'
ভানু কানু দু’জনেই বলে, ‘আপনার মতো স্যর হতে চাই।'
অনন্তবাবুর শুনতে ভাল লাগে। কিন্তু তিনি জানেন, বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাইরা কেউ গ্রামের স্কুলের মাস্টার হতে চায় না। কত লোভনীয় চাকরির অফার তাদের সামনে। তারা কেন গ্রামের স্কুলের শিক্ষক হবে। সুযোগ পেলে বিদেশে গিয়ে চাকরি করবে। গ্রিন কার্ড নিয়ে ওখানেই থেকে যাবে। স্বদেশের টান এখন আর নাড়ি পর্যন্ত পৌঁছয় না। কালো চশমার আড়ালে বাইরের দুনিয়া তাঁর কাছে অন্ধকার। সেই অন্ধকারেই স্বপ্ন বোনেন অনন্তবাবু।
হঠাৎ একদিন মণিকা দেবী এসে বললেন, ‘জানো, ভানু-কানুকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ওরা যে কোথায় গেছে সেটা কেউ বলতে পারছে না।'
অনন্তবাবু লাঠি হাতে উঠে দাঁড়ালেন। গলায় উদ্বেগ, বললেন, ‘সে কী! তোমায় কিছু বলে যায়নি?’
মণিকা দেবী বললেন, ‘দিন দুই আগে একবার বলেছিল গৌরীপুরে যাবে। ওখানে তো ওদের বাপের ভিটে আছে। কিন্তু যাওয়ার সময় কিছু বলে যায়নি।'
অনন্তবাবু ইজিচেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ‘তাহলে গৌরীপুরেই গেছে। দু’-একদিনের মধ্যেই ফিরে আসবে।'
কিন্তু চারদিন চলে যাওয়ার পরও ওরা ফিরে এল না দেখে অনন্তবাবু চিন্তিত হলেন। ইতিমধ্যে নন্দবাবু বাড়িতে এসে খবর দিলেন, ‘স্যর, ভাল খবর। আমরা আপনার জন্য কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম, সেই বিজ্ঞাপনের সুফল মিলেছে। আপনাকে চক্ষুদান করতে সম্মত হয়েছে হাওড়ার এক ভদ্রলোক। আগামী কাল আপনাকে নিয়ে আমি কলকাতায় যাব।'
অনন্তবাবু অস্ফুটে বললেন, ‘ঈশ্বর স্বর্গে থাকেন না। মানুষের মধ্যেই তার প্রকাশ। হাওড়ার সেই ভদ্রলোক আমার কাছে ঈশ্বর।'
অপারেশনের পর নিজের দৃষ্টি ফিরে পেয়ে অনন্তবাবু মণিকার দিকে তাকালেন। তারপর একে একে দেখলেন নন্দবাবু, প্রকাশবাবু, যাদববাবু আর ডাক্তারকে। নতুন দৃষ্টিতে তিনি আরও কাউকে খুঁজছিলেন। দেখতে না পেয়ে হতাশ গলায় বললেন, ‘ভানু-কানুরা এখনও গৌরীপুর থেকে ফিরে আসেনি?’
প্রশ্নটা মণিকা দেবীকে করা হলেও উত্তর দিলেন নন্দবাবু। তিনি বললেন, ‘ছেলে দুটো বেজায় অকৃতজ্ঞ। পরীক্ষা দিয়েই উধাও। আর এদের জন্যই আপনি জীবনপাত করেছেন।'
অনন্তবাবু চুপ করে রইলেন। একটু পরে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ডাক্তারবাবু, বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে হাওড়ার সেই ভদ্রলোককে একটিবার দেখতে চাই। তিনি শুধু আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেননি, আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। আমার সেই জীবনদাতাকে আমি একটিবার প্রণাম করতে চাই। তাঁকে কি এখানে আনা সম্ভব?’
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘নিশ্চয়ই সম্ভব। কিন্তু মনে রাখবেন এ সময় বেশি আবেগ অথবা উত্তেজনা আপনার পক্ষে ক্ষতিকর।'
অনন্তবাবু বললেন, ‘আমি ওকে দেখতে চাই।'
ডাক্তারবাবু স্মিত হেসে বললেন, 'আমি নিয়ে আসছি।'
ডাক্তারবাবু চলে গেলেন। ঘরের মধ্যে সবাই টুকটাক কথা বলতে লাগল। নন্দবাবু বললেন, ‘পৃথিবীটা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। হাওড়ার ওই ভদ্রলোকের মতো মানুষ এখনও বেঁচে আছে। সেই জন্যই পৃথিবী এখনও সুন্দর।'
নন্দবাবুর কথা শেষ হওয়ার পর ডাক্তার ঘরে ঢুকলেন। দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নিয়ে আসুন।’
দুটো ট্রলি চেয়ার পর পর ঘরে ঢুকল। নন্দবাবু থেকে মণিকা দেবী সবাই স্তব্ধ। বিস্ময় ওঁদের বোবা করে দিয়েছে। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘এই দুটি ছেলে, জেদ করে, হাঙ্গার স্ট্রাইক করে, আমার পায়ে মাথা খুঁড়ে আমাকে রাজি করিয়েছে। এই দু’জনের একটা করে চোখ নিয়ে হেডস্যরের দুটো চোখ দেওয়া হয়েছে।'
অনন্তবাবু উত্তেজনায় বিছানায় উঠে বসলেন। ওদের দিকে তাকাতে গিয়ে তাঁর দু'চোখ জলে ভরে এল। তিনি বললেন, ‘তোরা এটা কী করলি? কেন করলি? তোদের এখন নবীন বয়স। এক চোখ নিয়ে তোরা...’
ভানু আর কানু উঠে দাঁড়াল। স্যরের দিকে এগিয়ে এসে পায়ে হাত রেখে বলল, 'স্যর, আপনার চোখ না থাকলে জগতে ভানু-কানুরা কোনওদিনই স্কুলে ভর্তি হতে পারবে না। আপনার দৃষ্টি মানুষ গড়ার জন্য।'
অনন্তবাবু ওদের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘আমি চলে গেলে এই কাজ তোরা করবি। এক চোখে করতে পারবি তো?’
কানু বলল, দক্ষিণা না দিলে পুজো সিদ্ধ হয় না। এটা আমাদের গুরুদক্ষিণা। প্রতিবন্ধী ভাই যদি ইংলিশ চ্যানেল পার হতে পারে তা হলে এক চোখের দৃষ্টি নিয়ে আমরা কেন শিক্ষক হতে পারব না। আপনার আশীর্বাদ আমাদের অনন্ত দৃষ্টি দেবে।'
অনন্তবাবু দেখলেন তাঁর খোকা যেন ফিরে এসেছে। খোকা তাঁর পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এ বড় সুখের সময়। তবু এত কষ্ট হচ্ছে কেন? পরম সুখের মধ্যেও কি যন্ত্রণা থাকে?
.
আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪০৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন