দুলেন্দ্র ভৌমিক

ভাল নাম সোমনাথ। সন্তান কামনায় সোমনাথের বাবা-মা এক সময় জানা এবং অজানা নানা দেব-দেবীর মন্দিরে, ঠাকুরের থানে, পীরবাবার দরগায় মানত করে করে যখন ক্লান্ত এবং হতাশ, তখন সোমনাথের বাবা গোপালবাবুর এক বন্ধু পরামর্শ দিলেন, ‘আপনি একবার মাদুরাতে গিয়ে বাবা সোমনাথের মন্দিরে পুজো দিয়ে দেখতে পারেন। এবার পুজোয় আমরা যাচ্ছি।'
গোপালবাবু একটু অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘সে কী! আপনিও যাচ্ছেন? আপনার তো তিনটি.…..’
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বন্ধু বললেন, ‘না, না। আমি যাচ্ছি বেড়াতে। আমার ভায়রা ওখানেই চাকরি করেন তো। অতএব, থাকার কোনও অসুবিধে হবে না।'
এতদিন সন্তান কামনায় পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করেছেন। এই প্রথম অন্য প্রদেশে যেতে হল। যেহেতু সোমনাথের মন্দিরে সন্তান ভিক্ষা করে পুজো দেওয়ার দু’বছর পর ছেলে জন্মাল, তাই নাম রাখা হয়েছিল সোমনাথ। সোমনাথের মা বড়ই ধর্মভীরু। তিনি জানালেন, ‘বাবার কাছে ভিক্ষে করে পেয়েছি বলে ওর ডাকনাম থাকুক ভিখু’
সোমনাথ যত বড় হতে লাগল, ততই ওর গা থেকে পোশাকি নাম সোমনাথের খোলসটা আলগা হয়ে যেতে যেতে এখন সবার কাছেই সোমনাথ হয়ে উঠেছে ভিখু।
কেউ ডাকে ভিখু, কেউ বলে ভিখুদা, আবার কারও কারও কাছে দ্য গ্রেট ভিখু। ছেলেবেলা থেকেই ভিখুর মধ্যে নানা ব্যাপারে কৌতূহল ছিল। একমাত্র সন্তান, বাবা-মার নয়নের মণি বলে ভিখুর কোনও কাজে বাবা-মা বাধা দিতেন না। সন্তান যাতে ভাল থাকে, দীর্ঘজীবী হয়, সেই কারণে গলায়, দু’হাতে, কোমরে নানারকমের তাবিজ-কবচ বেঁধে দিয়েছিলেন ভিখুর মা। নিজেকে নিয়ে ভিখু বেশি ভাবত না। সময়মতো স্কুলে যেত, স্কুল থেকে ফিরে খেলার মাঠে, আবার সন্ধেবেলায় পড়তে বসা। এই রুটিনের বাইরে যতটা সময় ভিখু হাতে পেত, সেই সময়টা সে অপচয় করত না। নানা ব্যাপারেই তার অপার কৌতূহল ছিল বলে, সে সকলের কাছ থেকেই সব কিছু শিখতে চাইত। ভিখু ছেলে ভাল, তাই কেউ ওকে কোনও কারণে বিমুখ করত না।
সম্ভবত এই কারণেই এগারো বছর বয়সের মধ্যে সে অনেক কিছু শিখে ফেলল। যেমন, চুল কাটা, রান্না করা, সাইকেল থেকে মোটরগাড়ি চালানো, সবরকম গাছে ওঠা, দুর্গাঠাকুরের চালচিত্র আঁকা, পাড়ার থিয়েটারে অভিনয় করা, অন্যদের মেকআপ দেওয়া, ফুটবল খেলার সঙ্গে সঙ্গে রেফারি হওয়া, সব কিছু। ওদের পুরনো পাড়া গাইবান্দা থেকে ভিখুরা যখন আমাদের পাড়ায় দোতলা বাড়ি করে চলে এল, ভিখু তখন আমাদের কাছে সবজান্তা। ভিখুর নানারকম শখের মধ্যে একটা শখ ছিল গাছ পোঁতা। নিজেদের বাড়ির সামনে আর ভেতরের উঠোনে গাছ পুঁতে পুঁতে বাড়িটাকে প্রায় জঙ্গল বানিয়ে ফেলেছে। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হত জঙ্গলের মধ্যে একটা দোতলা বাড়ি। বাড়ির ছাদকেও ছাড় দেয়নি ভিখু। সেখানেও প্রায় ছোটখাটো একটা জঙ্গল তৈরি করে ফেলেছে। কিন্তু ভিখুকে কিছু বলার উপায় নেই। তাকে কে বলবে? বাবা-মা’র তো বলার প্রশ্নই ওঠে না। পাড়ার লোকেরাও বলে না। এই পাড়ার প্রায় সকলেই কোনও-না-কোনওভাবে ভিখুর দ্বারা উপকৃত। ‘ভাল ছেলে’ বলে ভিখুর যে সুনাম গাইবান্দাতে ছিল, সেই সুনাম এই পাড়াতেও আছে।
গাইবান্দা থেকে মতিরহাট বেশি দূর নয়। মাঝখানে কচুরিপানায় ঢাকা একটা খাল। এখানকার পুরনো লোকেরা বলে, এককালে ওটা নাকি নদী ছিল। সোনাই নদীর সঙ্গে তার যোগ ছিল। অন্য যোগটা গঙ্গার সঙ্গে। তা সেই সোনাই নদী তো কবেই হেজে-মজে উধাও হয়ে গেছে। এদিকে আবার, নামে মতিরহাট হলেও হাট বসা উঠে গেছে বহুকাল আগে। এখন এখানে বড় বড় বাড়ি, দোকান, নানারকমের শোরুম। বাজারের জন্য রয়েছে পাকা বাড়ি। ওই গোলাকার বাড়িটাই মতিরহাটের নিউ মার্কেট।
ভিখু এখানে এসে ভালই আছে। মাঝে মধ্যে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে গাইবান্দা যায়। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে গল্প-গুজব করে আবার মতিরহাটে ফিরে আসে। পাকা রাস্তা দিয়ে ঘুরে গেলে সময় বেশি লাগে বলে সে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে তাড়াতাড়ি যায়।
গাছ লাগানোর ব্যাপারে ভিখুর শখটা যত দিন নিজের বাড়িতে সীমাবদ্ধ ছিল ততদিন কোনও শোরগোল হয়নি। নিজের বাড়িতে স্থানাভাব ঘটার পর ভিখু অন্যের বাড়ির দিকে হাত বাড়াল। গাছ পোঁতার সময় ভিখু কাউকে কিছু জানাবার প্রয়োজন মনে করত না। হাতে সময় থাকলেই কারও না কারও বাড়ির সামনে, পেছনে, নয়তো রাস্তার ধারে গাছ লাগিয়ে দিত। এতরকম গাছের চারা বীজ ভিখু যে কোথা থেকে কীভাবে সংগ্রহ করত সেটা এখনও রহস্য। ভিখুর কাছে গাছের কোনও জাত-বিচার ছিল না। ওর মতে সব গাছই ভাল। অতএব, অন্যের বাড়ির সামনে গাছ লাগাবার কিছুদিন পর কেউ দেখত পেঁপে গাছ, কেউ দেখত বকুল ফুলের গাছ বা কারও বাড়ির সামনে পেয়ারা গাছ। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে তো এমনটা হত না। যার বাড়ির সামনে ফণিমনসা কিংবা বাবলা গাছ গজিয়ে উঠত সে তো খুশি হতে পারত না। ফলে এসব নিয়ে ছোটখাটো অশান্তি পোহাতে হত ভিখুর বাবা আর মা’কে। কিন্তু ভিখুকে কিছু বলতেন না। একবার একটু বেশিরকম বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। প্রফুল্ল ডাক্তার ভিখুকে ডেকে আদর করে বলেছিলেন, 'বাবা ভিখু, তোমার হাতের মহিমা আছে। যাই মাটিতে পুঁতে দাও, তাই দেখি তোমার হাতের গুণে ফনফনিয়ে বেড়ে ওঠে। তুমি দু’-চাররকমের বাহারি গাছ আর ফুলের গাছ দিয়ে বাড়ির সামনের বাগানটা সাজিয়ে দিতে পারবে?’

ভিখু এককথায় রাজি। প্রফুল্ল ডাক্তার বললেন, ‘গাছের চারা বা বীজ কিনতে যদি পয়সা লাগে তা হলে আমাকে বোলো।'
ভিখু বলল, ‘কিছু লাগবে না। সব আমি ম্যানেজ করব।'
ভিখু পরদিন থেকেই পরম উৎসাহে কাজে লেগে গেল। ডাক্তারবাবুর স্ত্রী ভিখুকে ডেকে বললেন, ‘তোমার দাদার কথায় এত যে খেটে বাগান বানাচ্ছ, সবটাই না জলে যায়।'
ভিখু প্রশ্ন করে, ‘জলে যাবে কেন?’
ডাক্তারবাবুর স্ত্রী বলেন, ‘পাড়ায় তো চোরের অভাব নেই। গেলবার সরস্বতী পুজোর আগের রাত্রে আমার গাঁদা ফুলগুলো টবশুদ্ধ চুরি হয়ে গেল। সেই শোকে পুজোর প্রসাদ পর্যন্ত আমি মুখে তুলতে পারিনি। অথচ ভোগের খিচুড়ি আমি কী ভালই না খাই।'
ভিখু একটু ভেবে প্রশ্ন করল, ‘গেট তো বন্ধ থাকে। চোর এল কীভাবে?’
ডাক্তারবাবুর স্ত্রী বলেন, ‘তোমার যেমন কথা। সবাই কি তোমার মতো ভিখু। ওই তো ছোট্ট পাঁচিল। ওটা ডিঙিয়ে এসেছে।'
ভিখু অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘কিছু ভাববেন না। আমি এমন ব্যবস্থা করে দেব যে, একবার আসার পর দ্বিতীয়বার আর চোর আসবে না।'
ভিখু কী ব্যবস্থা করবে সেটা আর ডাক্তারগিন্নি জানতে চাননি। চাইলে হয়তো পরবর্তীকালে এমন গণ্ডগোল হত না। ভিখু সামনের লনে ঠিক মাঝখানে অনেকটা জায়গা নিয়ে বাহারি গাছ ফুলের গাছ লাগাল। বাকি জমিটা ছোট্ট একটা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে বীজ ছড়াতে লাগল। ডাক্তার এবং ডাক্তারগিন্নি দু'জনেই মনে মনে ভাবলেন, ভিখু তো প্রকৃতিপ্রেমিক। বনসৃজনে ওর দক্ষতা প্রশংসনীয়। নিশ্চয়ই নয়নমনোহর কিছু একটা ব্যবস্থা সে করছে।
বাহারি গাছ এবং ফুল গাছে ফুল ফোটার আগেই নয়নমনোহর ব্যাপারটা মাটি থেকে পাতাশুদ্ধু গজিয়ে উঠল। পাতাগুলো ঘন সবুজ, কোনও-কোনওটায় ঈষৎ হলদে আভা। হলদে বললেও ঠিক বোঝানো যাবে না। কচি কলাপাতার মধ্যে যেমন পাকা পাকা একটা রং থাকে ঠিক তেমন।
ডাক্তারগিন্নি দেখলেন, পাতাগুলো বেশ দেখতে। ভিখুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভিখু, পাতাগুলো তো বেশ দেখতে। কী নাম এর?’
ভিখু বলল, ‘বউদি, একটু ধৈর্য ধরুন। এ বড় মূল্যবান পাতা। এখানে এ জিনিস পাওয়া যায় না। এর মহিমা পরে টের পাবেন। এ হচ্ছে অন্য গাছের রক্ষক, গৃহরক্ষক এবং চোর-তস্কর নিরোধক।
ডাক্তারগিন্নি উল্লসিত হয়ে বললেন, 'তা হলে ওই গাছ তুমি আমার জলের পাম্পের কাছে লাগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো। আমার পাম্প দু’-দুবার চুরি হয়ে গেছে।'
ভিখু বলল, ‘আপনি যেখানে যেখানে বললেন, সেখানেই লাগিয়ে দেব।' ডাক্তারগিন্নি আবদারের গলায় বললেন, ‘ভাই ভিখু, তুমি তা হলে বাড়ির ছাদেও লাগিয়ে
দাও। ছাদ থেকেই তো একবার চোর এসেছিল। ছাদে লাগানো যাবে?’ ভিখু বলল, ‘চেষ্টা করছি।'
এই পাতার ফলন খুব দ্রুত। ছারপোকারা এদের কাছে হার মেনে যায়। কয়েকদিনের মধ্যেই বাড়ির ছাদে, পাম্পের কাছে, গেটে এবং সামনের লনে পাতাগুলো সতেজ হয়ে বাড়তে লাগল। পাতার মহিমা প্রথম টের পেল বাড়ির একমাত্র কাজের লোক। সকালে পাম্প চালাতে গিয়ে পাতাটা হাতে লাগল। তারপরই শুরু হল চুলকুনি আর জ্বলুনি। যত চুলকোয়, জ্বালা তত বাড়ে এবং হাতটা ফুলতে থাকে। থাকতে না পেরে গিন্নিমা’র কাছে এল। গিন্নিমা ঠাকুরঘরে পুজোয় বসেছেন। ঘণ্টাখানেকের আগে ওই পুজোর ঘর থেকে তাঁর বেরোবার কোনও সম্ভাবনা নেই।
অন্যদিনের মতো একতলার ঘরে নিজের চেম্বারে রোগী দেখতে বসে যাবেন ডাক্তারবাবু। সকাল ন'টা থেকে এগারোটা। ভিজিট একশো টাকা। কাজের লোক, যার নাম রঘু, যে পাম্প চালাতে গিয়ে সেই যে চুলকোতে আরম্ভ করেছে এখনও থামতে পারছে না। হাত ফুলে গেছে। দুটো হাতের পাঞ্জাই টকটকে লাল হয়ে গেছে। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘রঘু, যিনি এসেছেন তাকে পাঠাও।'
রঘু ঘরে ঢুকে বলল, ‘বাবু আমিই প্রথমে এসেছি।'
ডাক্তারবাবু চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে বললেন, ‘তুই এসেছিস মানে? তোর কী হয়েছে? আমি তো পেশেন্টের কথা বলছি।'
রঘু কান্না কান্না গলায় বলল, ‘আজ্ঞে বাবু, আমি নিজেই পেশেন্ট। এই দেখুন হাত দুটোর অবস্থা।'
ডাক্তারবাবু রঘুর হাত দুটো দেখতে দেখতে বললেন, ‘কখন থেকে হচ্ছে?’
রঘু উত্তর দিল, ‘সকাল থেকে। সাতটার সময় পাম্প চালাতে গেছি, তারপর থেকেই।' ডাক্তারবাবু গম্ভীর হয়ে রঘুর হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন, ‘এই যে গবেট, কাল রাত্রে বা আজ সকালে কী খাওয়া হয়েছে?’
রঘু উত্তর দিল, ‘তেমন কিছু নয় তো। ভাত, কলাইয়ের ডাল আর আলু পোস্ত।'
ডাক্তারবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘কলাইয়ের ডাল অথবা 'পোস্ত তোর সহ্য হয়?’
রঘু উত্তর দেয়, ‘কত বছর ধরেই তো খাচ্ছি।'
ডাক্তারবাবুর আবার প্রশ্ন, ‘সকালে কী খেয়েছিস?'
রঘুর উত্তর দেয়, ‘রোজকার মতো দুটো বাসি রুটি আর গুড়।'
ডাক্তারবাবু ধমকের সুরে বলেন, ‘গুড় বললে হবে না। কী গুড়? কোথাকার গুড়।' রঘু একে তো কাতর হয়ে আছে তার দুটো হাত নিয়ে। এবার বাবুর ধমক খেয়ে কাহিল গলায় বলল, ‘আমার জন্য যে গুড় আসে, সেই ভেলিগুড়। নবীন দাসের দোকান থেকে মাসকাবারি বাজারের সঙ্গে আসে।'
ডাক্তারবাবুর কপালে ভাঁজ পড়ল। বললেন, ‘তুই হয়তো মনে করতে পারছিস না। কিন্তু এমন কিছু খেয়েছিস যাতে এইরকম ভয়ংকর অ্যালার্জি হয়েছে। কোনও চিন্তা নেই, তোকে একটা ভাল ট্যাবলেট দিচ্ছি। সেরে যাবে।'
রঘু কান্না কান্না গলায় বলল, 'সারবে না বাবু। সারবার হলে এতক্ষণে সেরে যেত।' ডাক্তারবাবু ধমক দিয়ে বললেন, ‘তুই ডাক্তার না আমি ডাক্তার? আমি বলছি সারবে আর তুই বলছিস সারবে না।'
রঘু বলল, ‘বাবু, সাধে কি বলছি, সাতটা থেকে ন'টার মধ্যে ট্যাবলেট দুটো খেয়েছি। কিছু হয়নি।'
ডাক্তার বিস্মিত দৃষ্টিতে এবং সেইরকম বিস্মিত গলায় বললেন, ‘তুই আমার এখান থেকে নিয়ে খেয়েছিস? তুই কি ডাক্তার হয়ে গেলি?
রঘু এবার হাতজোড় করতে যাচ্ছিল, কিন্তু হাতজোড় করার উপায় নেই। দুটো হাতই যে বিষম চুলকোচ্ছে। সে বলল, ‘বাবু, কথায় বলে, পণ্ডিতের বাড়ির বেড়ালটাও আড়াই অক্ষর লিখতে পারে। এতদিন আপনার সঙ্গে আছি, একটু-আধটু কি বুঝতে পারব না!’
ডাক্তার গম্ভীর হয়ে গেলেন। বাইরের গেট ঠেলার আওয়াজে বোঝা গেল রোগীরা আসতে শুরু করেছে। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘যা, তুই বাইরে গিয়ে দাঁড়া। পরে তোর ব্যবস্থা করব।'
ঘরের মধ্যে ঢুকলেন স্থানীয় পৌরসভার পুরপিতা গদাধর মণ্ডল। তাঁর সঙ্গে তাঁর বারো বছরের নাতি। ডাক্তারবাবু লক্ষ করলেন দাদু-নাতি দু'জনেই হাত চুলকোচ্ছে। ডাক্তার বললেন, ‘বলুন, আপনার নাতির প্রবলেমটা কী?’
গদাধর মণ্ডল বললেন, ‘যে সমস্যা নিয়ে এসেছিলাম সেটা আপাতত চুলোয় যাক। দাদু-নাতি দু’জনেরই বিষম হাত চুলকোচ্ছে। হঠাৎ করে এমন হল কেন?’ ডাক্তার দরজার পাশে দাঁড়ানো রঘুর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে গদাধর মণ্ডল আর তাঁর নাতির হাতের দিকে তাকালেন। বুঝতে পারলেন একই ধরনের ব্যাপার। তাই ট্যাবলেটটার কথা উচ্চারণ করতে গিয়ে ডাক্তার থেমে গেলেন। রঘু তো তার সামনে দাঁড়িয়ে হাত চুলকে যাচ্ছে। ডাক্তারবাবু এবার গদাধর মণ্ডলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কখন থেকে এটা শুরু হল?’
গদাধর মণ্ডল এবার ক্ষিপ্ত গলায় বলে উঠলেন, 'কখন থেকে মানে কী? সকাল থেকে দিব্যি ছিলুম। তোমার এখানে ওই গেটটা হাত দিয়ে ঠেললুম। আমার দেখাদেখি দাদুভাইও ঠেলল। ব্যস, এবার ভেতরে ঢুকতেই চুলকানি শুরু হয়ে গেল। ডাক্তার, ইউ সি, কী হচ্ছে আমাদের হাতগুলোতে। হাতের জিওগ্রাফি বদলে যাচ্ছে। ওষুধের ব্যবস্থা করো।'
ডাক্তারবাবু নিজেই তো ধন্দে পড়ে গেছেন। তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ছে। কিন্তু রোগীকে কিছু একটা বলতে না পারলে ডাক্তারের যে মান থাকবে না। তাই ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন, ‘মণ্ডলদা, এটা একধরনের ভাইরাস ইনফেকশন। রোগটা বিদেশ থেকে এসেছে।' গদাধরবাবু বললেন, ‘বলো কী ডাক্তার! এখন রোগও বিদেশ থেকে ইমপোর্ট হচ্ছে।'
ডাক্তার বললেন, ‘হচ্ছে বইকী! এই যে কনজাংটিভাইটিস...’
গদাধরবাবু হাত চুলকোতে চুলকোতে বললেন, ‘ধুর, ও তো আমরা চোখ-ওঠা বলতাম। আগেকার কলেরাকে এখন আন্ত্রিক বলে চালাচ্ছ। বিদেশ থেকে রোগ আমদানি হচ্ছে, তোমরা এদেশ থেকে ওদের কিছু রোগ রফতানি করতে পারছ না? যেমন ধরো আমাশা, অম্বল, গ্যাস্ট্রিক, অর্শ, ম্যালেরিয়া এগুলো দেদার পরিমাণে রফতানি করা যায় না?'
ডাক্তার চুপ করে থাকেন। গদাধরবাবুর নাতি ততক্ষণে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে। বিব্রত ডাক্তার একবার ঢোক গিলে বললেন, ‘মণ্ডলদা, এটা মনে হয় স্কিন-সংক্রান্ত ব্যাপার। আপনি হাসপাতালে গিয়ে স্কিনের ডাক্তারকে দেখাবার ব্যবস্থা করুন। দেরি করবেন না।'
গদাধরবাবু গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যাওয়ার পরই এলেন বীণাপাণি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নবলতা নন্দী। আশ্চর্য, তিনিও দুটো হাত চুলকোচ্ছেন। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘আপনার হাতে কী হল?’
নবলতা নন্দী হাত চুলকোতে চুলকোতে বললেন, ‘কী যে হল তা তো বুঝতে পারছি না। আপনার গেটে হাত রাখার পর থেকেই দেখছি এমন হচ্ছে।'
ডাক্তারবাবু মহাসমস্যায় পড়ে গেলেন। তাঁর বাড়ির গেট তো বহুদিনের। কখনও কিছু হয়নি। ডাক্তারবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'ইদানীং অনেকেরই এরকম হচ্ছে। একটু আগে আমাদের গদাধরদা এসেছিলেন। সঙ্গে নাতিও ছিল। তাঁদেরও এই একই জিনিস। আপনিও ওঁদের মতো স্কিন স্পেশালিস্টের কাছে যান।'
ডাক্তারবাবু নবলতা নন্দীকে বিদায় দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। রঘু চলে যাচ্ছিল। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’
রঘুর শরীরে আর চুলকোবার ক্ষমতা নেই। সে খালি গায়ের জামার ওপর হাত ঘষে যাচ্ছে। হাত ঘষতে ঘষতে জবাব দিল, ‘চামড়ার ডাক্তারের কাছে। এ রোগ আপনি সারাতে পারবেন না।'
ডাক্তারবাবু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু বলা হল না। দোতলা থেকে তরতরিয়ে নেমে আসতে আসতে ডাক্তারগিন্নি বললেন, ‘ওগো, ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে এটা কী হল! কেবলই হাত চুলকোচ্ছে। বড় জ্বালা হচ্ছে। এ আমার কী হল?’
ডাক্তারবাবু স্থির চোখে একবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন, তারপর গেটের দিকে। তারপর ডাক্তারবাবু নিজেই ধপাস করে বারান্দার চেয়ারে বসে পড়লেন। এই সময় ওই চেয়ারগুলোতে রোগীদের বসে থাকার কথা।
এই চুলকুনি রোগটা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারবাবুর বাড়িতে মহাসমস্যা বাধিয়ে ফেলল। এমন একটা সমস্যা যে কারও জীবনে কখনও আসতে পারে, তা ডাক্তারবাবু কল্পনায় কখনও আসেনি। ডাক্তারবাবুর মিটারে কিছু একটা গন্ডগোল ছিল বলে অফিসে খবর দেওয়া হয়েছিল। ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের লোক মিটার পরীক্ষা করতে এসে প্রথমে বলল, ‘মিটারের চারপাশে এই লতা-পাতা কেন?’
কথাটা শেষ করতেই দু’হাত দিয়ে লতাগুলো সরাতে লাগল। কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। একটু পরেই ‘ওরে বাবা রে’ বলে হাতের যন্ত্র নীচে ফেলে দিয়ে দুটো হাত চুলকোতে লাগল। ডাক্তারবাবু আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলেন না। সাপ্লাইয়ের লোক হাত চুলকোতে চুলকোতে হাতের যন্ত্র ফেলে দ্রুত প্রস্থান করল। ডাক্তারবাবু চেয়ারে বসে ভাবতে লাগলেন, এরকম কেন হচ্ছে?
এইসব ঘটনার একটু পরে ভিখু এল। ডাক্তারবাবু দেখলেন গেটটা খানিক ফাঁক করা। ভিখু একটা হকিস্টিক দিয়ে ঠেলা দিয়ে পুরো গেটটা খুলে দিয়ে ভেতরে ঢুকল। ডাক্তার-স্বামীর কাছ থেকে কোনও ভরসা না পেয়ে ডাক্তারগিন্নি ভিখুকে বললেন, ‘ভিখু, আমাদের খুব বিপদ।’
ভিখু অবাক গলায় বলল, ‘বিপদ? কীসের বিপদ? আপনার হাতে কী হল বউদি?’ ডাক্তারগিন্নি বললেন, ‘সেই কথাই তো বলছি। দেখ না, কেমন চুলকোচ্ছে আর জ্বালা করছে। হাত দুটো লাল হয়ে গেল ভিখু।'
রঘুও নিজের হাত দুটো দেখিয়ে বলল, ‘ভিখুদা, মনে হচ্ছে হাত দুটো কেটে ফেলি। আর সহ্য হচ্ছে না।'
ভিখু অভয় দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, 'না, না, হাত কাটবে কেন? ডাক্তারদা, আপনি কেমন আছেন?’
উত্তর দিলেন, ‘এখন পর্যন্ত ভাল। পরে কী হবে জানি না।' ভিখু এবার রঘুর কাছে এগিয়ে এসে বলল, ‘দেখি তো হাতটা।’ রঘুর হাতটা দেখতে দেখতে ভিখু বলল, ‘হুঁ, কখন থেকে হল?’
ডাক্তারবাবু থমথমে গলায় রঘু উত্তর দিল, ‘সকালে পাম্প চালাতে যাওয়ার সময়।'
ভিখু একটু মাথা নেড়ে বলল, ‘বউদি আপনার কখন থেকে?’
ডাক্তারগিন্নি বললেন, ‘পুজো সেরে ছাদে গেছি শাড়ি মেলতে। শাড়ি মেলার পর থেকে। ছাদের আলসেতে তুমি যে বাহারি লতা বসিয়েছ তাদের একটু আদর করতে গিয়ে...'
ডাক্তারগিন্নিকে থামিয়ে দিয়ে ভিখু বলে উঠল, ‘ব্যস, ব্যস, বুঝে গেছি। আপনাদের একটু বুদ্ধি খরচ করা দরকার। ওগুলো সাধারণ লতা-পাতা নয়। ওড়িশার জঙ্গল থেকে অনেক কষ্টে ওর বীজ আনতে হয়েছে। ওরা হচ্ছে আপনার বাড়ি আর বাগানের প্রহরী। পাম্প চুরি যায় বলে পাম্পেও ওটা চারপাশে দেওয়া আছে। গেটের বাইরেও দেওয়া আছে। দেখলেন না, আমি কেমন হকিস্টিক দিয়ে ঠেলে গেট খুললুম।'
ডাক্তারবাবু এবার উঠে দাঁড়ালেন্। চুলকে চুলকে অন্য দু’জনের হাত লাল হয়েছে। ডাক্তারবাবুর মুখটা লাল হয়ে গেল রাগে। রাগের গলাতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভিখু, এসবের মানে কী?
ভিখু একটুও বিচলিত না হয়ে জবাব দিল, ‘মানে ভেরি ভেরি সিম্পল। আপনাদের বাড়ি, গাছপালা, বিষয়-আশয় এবং জীবনরক্ষার জন্য ওই লতা লাগাতে হয়েছে। এবার নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন।'

ধমকের গলায় ডাক্তারবাবু বললেন, 'আমি মোটেও নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। রঘু আর আমার স্ত্রী দু’জনের অবস্থা তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছ। সকাল থেকে দু’পিস রোগী এসেছিল। হাত চুলকোতে চুলকোতে তারাও চলে গেছে। ভিজিটও পাইনি। সকাল থেকে এক পয়সাও বউনি হয়নি। এরকম হলে আমি বাঁচব কেমন করে!’
ভিখুর মুখ-চোখ দেখে মনে হল সে যেন গভীরভাবে কিছু একটা চিন্তা করছে। ভিখুর দিকে তাকিয়ে ডাক্তার বললেন, ‘কী ভাবছ?’
ভিখু উত্তর দিল, ‘আপনার বউনির ব্যাপারটা ডাক্তারগিন্নি গর্জন করে উঠে বললেন, ‘নিকুচি করেছে বউনির। আমার হাতদুটো নিয়ে ভাবো।'
ভিখু এবার দু’জনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, 'আপনারাই বলুন কোনটা আগে ভাবব। বউনি না হাত?’ ডাক্তারগিন্নি আর রঘু সমস্বরে বলে উঠল, 'আগে হাত। হাত ঠিক হলে অন্যসব ঠিক হয়ে যাবে।'
ভিখু বলল, ‘ওইজন্যেই বলে আপনা হাত জগন্নাথ। তা হলে ডাক্তারদা, হাত নিয়েই ভাবি।' ডাক্তারবাবু অপ্রসন্ন গলায় বলে উঠলেন, ‘শুধু বসে বসে ভাবলেই তো হবে না। প্রতিকার চাই, প্রতিকার।'
ভিখু ডাক্তারবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্রতিকার আমার হাতে। এরকম ঘটনা ঘটতে পারে সেটা আমি জানতাম। কিন্তু বাড়ির মধ্যে ঘটবে এটা ভাবিনি। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।'
ভিখু এবার চেয়ারে বসে হুকুমের গলায় হাঁক দিল, ‘রঘু।’
রঘু উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে।'
ভিখু বলল, ‘চুলকানিটা দুটো হাতের বাইরে আর কোথাও যায়নি তো? হাতের মধ্যেই আছে?’
রঘু উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, ভিখুদা। এখনও হাতের নাগাল পেরিয়ে যায়নি। নাগাল থাকতে থাকতে ব্যবস্থা করে দাও।'
ডাক্তারগিন্নি আবেদন জানাবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘ভিখু, তাড়াতাড়ি করো। আর যে পারছি না।'
ভিখু সকলের দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন হাসপাতালের বড় ডাক্তার। সে বলল, ‘তাড়াতাড়ি বললেই তো তাড়াতাড়ি করা যাবে না। সব জিনিসের একটা সিস্টেম আছে। অমাবস্যার পরের দিনই কি আকাশে আস্ত চাঁদ দেখা যায়? আপনি চুপ করে দাদার পাশে বসুন।'
ডাক্তারগিন্নি তাঁর স্বামীর পাশেই বসতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বসবার আগেই ডাক্তারবাবু যেন ইলেকট্রিকের শক খাওয়ার মতো ভঙ্গি করে উঠে গিয়ে দূরে বসতে বসতে ভাবলেন, ‘রোগটার নাম এবং প্রকৃতি তাঁর জানা নেই। কে বলতে পারে এটা ছোঁয়াচে কিনা। তাই সাবধান হওয়া উচিত।'
সবাই এই মুহূর্তে ভিখুর দিকে তাকিয়ে। ভিখু বলল, ‘রঘু, এবার চারখানা বড় ঘুঁটে জোগাড় কর।'
ডাক্তারগিন্নি বললেন, ‘ঘুঁটে! ঘুঁটে কোথায় পাব? আমাদের বাড়িতে তো গ্যাসে রান্না হয়। ঘুঁটের পাট তো কবেই চুকে গেছে।'
ভিখু বলল, ‘তবে তো বউদি মুশকিল হল। কিন্তু আমার যে ঘুঁটে চাই। ঘুঁটে না হলে চলবে না।’
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘ঘুঁটের বিকল্প কিছু নেই?
ভিখু মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘না। আমি তো দাদা আপনার মতো পাশকরা ডাক্তার নই। দোকানে এই ওষুধ না পেলে বিকল্প ব্যবস্থা থাকে।'
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘ঘুঁটের সাপ্লাই নেই।'
ভিখু অবাক গলায় বলল, ‘সাপ্লাই নেই কেন? গোরু কি তা হলে...'
ডাক্তারবাবু বুঝে গেলেন ভিখুর সঙ্গে কথা বলে পেরে ওঠা যাবে না। অতএব, চুপ করে থাকা ছাড়া তাঁর উপায় নেই। ভিখু হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। ডাক্তারগিন্নি প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায় চললে ভিখু?’
ভিখু উত্তর দিল, ‘এখানে বসে থাকলে তো আকাশ থেকে ঘুঁটের বৃষ্টি হবে না। আমাকে ঘুঁটের সন্ধানে যেতে হবে।'
ডাক্তারগিন্নি বললেন, ‘কোথায় পাবে?’
ভিখু উত্তর দিল, ‘ওই যে কচুরিখাল, খালের ওপারটা হচ্ছে গাইবান্দা। এককালে নিশ্চয়ই অনেক গাই-গোরু ছিল। ওরা তো আর লুপ্ত প্রজাতি নয়। ওখানে গেলে কয়েক পিস পেয়ে যাব।'
ডাক্তারবাবু কিছু বলতে যাওয়ার আগে রঘু বলল, ‘আমাদের বাজারের কাছে দুটো ষাঁড় কিন্তু ঘোরাঘুরি করে। বাজারে গেলে ওদের পাওয়া যাবে।'
ভিখু এবার রঘুর ওপর একটু চটে গেল। চটে গিয়ে বলল, ‘ষাঁড় দিয়ে আমার কী হবে? ষাঁড় কি বগলে করে ঘুঁটের বস্তা নিয়ে ঘুরছে? তা ছাড়া ষাঁড়ের গোবর দিয়ে যে ঘুঁটে, তাতে কাজ হবে না।'
ডাক্তারবাবু এবার দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, ‘গোবর থেকেই তো ঘুঁটে হয়। গোবর ইজ গোবর। গোবরের কোনও জেন্ডার আছে না কি?’
ভিখু উত্তর দিল, ‘আমার ওষুধের ক্ষেত্রে অবশ্যই আছে। জেলুসিল আর অ্যানাসিন দুটোই তো ট্যাবলেট। কিন্তু দুটো কি একই কাজে লাগে? তাই আমাকে গাইবান্দা যেতে হবে।'
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘যেতে-আসতে তো সময় লাগবে। তুমি বরং আমার মোটর সাইকেলটা নিয়ে যাও।'
ভিখু অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘কোনও দরকার নেই। আমি বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে যাব। আমাকে আর দেরি করাবেন না।'
ভিখু ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘ঘুঁটের সন্ধানে একাকী ভিখুন’
ভিখু ফিরে এল একথলি ঘুঁটে আর এক জ্যারিকেন কেরোসিন তেল নিয়ে। ভিখুর কাজকর্মে কেউ বাধা দিতে সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু ভিখু যে কী করছে অথবা কী করতে চাইছে, সেটাও কারও বোধগম্য হল না। বাড়ির গেটটা হকিস্টিক দিয়ে ভিখু নিজে হাট করে খুলে রেখেছে। ওই গেট দিয়ে একটু পরে এল ভিখুর এক শাগরেদ। তার মাথায় বড় মাপের একটা লোহার কড়াই। কড়াইয়ের মধ্যে কিছু জিনিসপত্রও ছিল। কিন্তু কী যে ছিল সে-কথা ভিখু আর তার শাগরেদ দামু ছাড়া কেউ জানে না। ভিখু দামুকে সতর্ক করে দেওয়ার মতো ভঙ্গিতে বলল, ‘খবরদার, কোনও লতাপাতায় হাত ছোঁয়াবি না। সব জিনিস ঠিক ঠিক এনেছিস তো ভাই?'
দামু ভিখুর চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। দামুর বাবা চটকলে চাকরি করতেন। চটকল অনেকদিন থেকে বন্ধ। এখন বাজারের বাইরে আনাজপত্রের দোকান করেন। ভিখুর খুব স্নেহের পাত্র ওই দামু।
ডাক্তারবাবু বারান্দায় বসে ভিখুর কাণ্ড দেখতে লাগলেন। ভিখু ঘুঁটে পুড়িয়ে ঘুঁটের ছাই করল। তার মধ্যে ময়দার মতো সাদা সাদা কী জিনিস দিয়ে কেরোসিন তেল ঢেলে মাখতে লাগল। ডাক্তারবাবু খুব সংকটের মধ্যে আছেন। ভিখু যে কী করছে তার মাথামুণ্ডু কিছুই তিনি বুঝতে পারছেন না। এতে হয়তো বা চুলকুনি কমলেও কমতে পারে, কিন্তু ওই ঘুঁটের ছাই, কেরোসিন আর সাদা বস্তুটা দিয়ে যা তৈরি হচ্ছে তার সাইড এফেক্ট যে কী হতে পারে সেটি ভেবেই ডাক্তারবাবু বিচলিত বোধ করছেন। অথচ ভিখুকে কিছু জিজ্ঞেস করার উপায় নেই। একবার কিছু একটা বলতে গিয়ে ভিখুর কাছে ভদ্রগোছের একটি ধমক খেয়েছেন। এরপর আবার কিছু বলতে গেলে নিছক এবং নির্ভেজাল একটি ধমকই হয়তো খেতে হবে। অগত্যা তাঁকে চুপ করেই থাকতে হচ্ছে।
ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে লোহার কড়াইয়ে যে বস্তুটি তৈরি হল, সেটি সাদা জাতীয় একটা মণ্ড। গন্ধটা কটু। ভিখু ওই মণ্ডটা প্রথমে ডাক্তারগিন্নি, তারপর রঘুর হাতে বেশ করে মাখিয়ে দিয়ে বলল, ‘দু’ঘণ্টা রাখতে হবে। তারপর গরম জলে হাত ধুয়ে পরে ঠান্ডা জলে ধোবেন। হাত মুছে হাতে কোল্ডক্রিম মাখিয়ে রাখবেন।'
ভিখুর কথামতো কাজ করে সত্যি সুফল পাওয়া গেল। ডাক্তারগিন্নি আর রঘু দু'জনেই কৃতজ্ঞ চোখে ভিখুর দিকে তাকালেন। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘তোমার তো অনেকরকম বিদ্যে জানা আছে ভিখু। এই ওষুধটার নাম কী?’
ভিখু উত্তর দিল, ‘আজ থেকে এর নাম দিলাম ভিখুর মলম। আমার কাছে আরও কিছুটা মলম রয়ে গেছে। যদি অনুমতি দেন, তবে দু’-চারজনের হাতে ওই পাতা ঠেকিয়ে আপনার চেম্বারে পাঠাই। মর্নিং শিফটের লোকসানটা তা হলে ইভনিং-এ পুষিয়ে নিতে পারবেন।'
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘তার দরকার নেই। তুমি বরং ওই লতাগুলোকে উচ্ছেদ করে বাড়ির থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে ফেলে দাও।'
ভিখু বলল, ‘ওই অপারেশনটা আজ আর করা যাবে না। কাল এসে করব।' ডাক্তারগিন্নি বললেন, ‘মনে হচ্ছে উপকার পাচ্ছি। এটাও তো এক ধরনের চিকিৎসা। এর জন্য ভিখুকে তো আমাদের ভিজিট দেওয়া দরকার। তোমায় কত দেব ভিখু?’
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘অবশ্যই ভিখুকে কিছু দেওয়া উচিত। কিন্তু তার আগে ভিখু তুমি
বলো তো, তোমার চিকিৎসাপদ্ধতিটা কী? কবিরাজি, হোমিওপ্যাথি না অ্যালোপ্যাথি।' ভিখু উত্তর দিল, ‘আমার পদ্ধতি হল সিমপ্যাথি। সেইজন্য চিকিৎসায় চিকিৎসককে কোনও টাকা দেওয়ার রেওয়াজ নেই।'
দামুকে সঙ্গে নিয়ে ভিখু চলে গেল। ডাক্তারবাবু ভিখুর চলে যাওয়ার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে নিজের মনে মনেই বললেন, ‘ছেলেটা কত কিছু জানে।'
ভিখু নিজের বাড়িতে ফিরে এসে দেখল, তার বাড়ির গেটে দু’জন লোক দাঁড়িয়ে। তাদের একজনকে ভিখু চেনে। তার নাম কানাই ঘোষ। পুরসভায় চাকরি করে। অন্যজনকে সে চিনতে পারল না। এই পাড়ার লোক হলে সে চিনত। মনে হচ্ছে অন্য পাড়ার লোক। ভিখুকে দেখে কানাই এগিয়ে এসে বলল, 'ভিখু, তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। এ হচ্ছে আমার শ্যালক। থাকে গৌরপুরে। তোমার ভাই একটু সাহায্য চাই।'
এরকম আবেদন বা কথাবার্তা ভিখুর কাছে আদৌ নতুন নয়। সে বলল, ‘কেমন সাহায্য।’
কানাই এবার তার শ্যালকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গৌর, এবার তুমি বলো।'
গৌর নামের লোকটি বলল, ‘আগামীকাল আমার ছেলের অন্নপ্রাশন। সবই ঠিক করা
আছে। কিন্তু বিপদ হয়েছে অন্য জায়গায়।'
ভিখু বলল, ‘কোন জায়গায়? আপনার ছেলে ভাত খেতে চাইছে না?’
গৌর বলল, ‘না, না। ছেলেকে খাওয়ালেই খাবে। কিন্তু আমাদের যে রান্নার ঠাকুর, তার চিকেন পক্স হয়েছে। তার দু’জন সহকারীর একজনকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার তো ফর্দ অনুযায়ী সব কেনা হয়ে গেছে। লগনশার মরশুম। কোথাও ঠাকুর পাচ্ছি না। কেটারারও পাওয়া গেল না। একদিন আগে বললে কি পাওয়া সম্ভব!’
ভিখু মাথা নেড়ে বলল, ‘সম্ভব নয়। তা ছাড়া সবই তো কিনে ফেলেছেন।'
গৌর বলল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ। সব কেনা হয়ে গেছে। মাছটা শুধু কাল সকালে আসবে।' ভিখু গৌরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আমাকে কী ধরনের সাহায্য করতে হবে? খেয়ে না খাইয়ে?’
গৌর এবার কানাই ঘোষের দিকে তাকাল। কানাই বলল, ‘তোমার রান্নার হাত তো আমি জানি। ক্লাবের পুজোয়, পিকনিকে তুমিই তো রান্না করো। পাঁচশো লোকের রান্না তোমার কাছে কোনও ব্যাপার নয়।
গৌর বলল, ‘আমার মোটে দু'শোজন ভিখুবাবু। এ যাত্রায় আমার মানটা রাখুন।' গৌর হাতজোড় করে ভিখুর দিকে তাকাল। ভিখু বলল, ‘আপনাকে হাতজোড় করতে হবে না। সকাল থেকে নানা বিষয় নিয়ে আমাকে বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে। বাড়ির ঠিকানা দিয়ে চলে যান। কাল সকালে আমি টিম নিয়ে যাব।'
গৌর যেন স্বস্তি পেল। কৃতজ্ঞ মুখে বলল, 'তা হলে আমি নিশ্চিন্ত তো?’
ভিখু উত্তর দিল, ‘আপনার অন্য চিন্তা কী আছে না আছে তা তো আমি জানি না। তবে আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। মাই কথা ইজ কথা। নো মোর কথকতা। প্লিজ গো।'
এইটুকু উপাখ্যান থেকে ভিখুকে সম্পূর্ণ বোঝা যাবে না। ভিখু নানা দিক থেকেই বিচিত্র এবং বর্ণময়৷ ভিখু সম্পর্কে নানা স্তরের মানুষ নানারকম ধারণা পোষণ করে। নানারকমের মতামত দেয়। কেউ কিন্তু বলে না, ভিখু খারাপ। ভিখু যে ভাল ছেলে এ-ব্যাপারে কারও 'দ্বিমত নেই। কিন্তু বহুবিচিত্র ভিখুকে যে যেভাবে দেখেছে সে সেইভাবে তার বর্ণনা দেয়। তার ইস্কুলের মাস্টারমশাইরা চেনেন একভাবে, পাড়ার লোক চেনে অন্যভাবে, বেপাড়ার লোক চেনে আরও অন্যভাবে। ভিখুর জন্মের পর এগারো বছর কেটেছে গাইবান্দাতে। গাইবান্দার মানুষরা আবার ওকে চেনে আরও আলাদা করে। ভিখুর বাবা-মা’র কাছে ভিখু সামান্য মানুষ নয়। বিশেষ করে ভিখুর মা সবাইকে বলেন, ‘আমার ভিখু অবতার। শিবের শক্তি তার মধ্যে। না হলে ভাবতে পারো, পাঁচ বছরের ভিখু দু’হাতে ঠেলে ড্রেসিং টেবিল এ-ঘর থেকে ও-ঘরে নিয়ে যায়?’ দশ বছর বয়সে ভিখু হাতে করে ঠেলে স্টিলের আলমারি সরিয়ে দেয়। খোলা ছাদ থেকে নীচে পড়ে গিয়েও ভিখু উঠে দাঁড়ায়। শিবের শক্তি ছাড়া এটা কি সম্ভব?’
ভিখুর ছেলেবেলার এসব কথা মতির হাটের অনেকেই জানে। কে কতটা বিশ্বাস করে তা বলতে পারব না। কিন্তু গাইবান্দার লোকেরা বিশ্বাস করে। ভিখু যে স্কুলে পড়ত সেই স্কুলের হেডমাস্টারমশাইয়ের নাম ছিল অবনী বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সামনে আধঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করতেন। স্কুল থেকে ফেরার পথে কখনও কখনও কিছু ছাত্র, যারা ওইদিকেই যাবে, তারা তাদের হেডস্যারের সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে যেত। অবনীবাবু ভিখুকে ভালবাসতেন, অন্য চোখে দেখতেন। স্কুলের যে কোনও অনুষ্ঠানে ভিখুই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় ভরসা।
একবার শীতের মুখে স্কুলের একটা ব্যাপারে ভিখু গেছে তাদের হেডস্যারের কাছে। সেই সময় গাইবান্দাতে কালীপুজোর পর থেকেই গায়ে চাদর দিতে হত। সকলবেলা ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো ফালিফালি কুয়াশা বাগানের গাছে গাছে আটকে থাকত। গিয়ে শুনল, হেডস্যার সবে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গেছেন। ভিখু হেডস্যারের বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতে লাগল। যেহেতু স্কুলের ব্যাপার, তাই ভিখু একা যায়নি। সঙ্গে আরও দুটি ছেলে ছিল। দু'জনেই ভিখুর চেয়ে বয়সে বড়, এবং এক ক্লাস উঁচুতে পড়ে। হেডস্যারের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর এবং সব শোনার পর হেডস্যার অবনীবাবু বললেন, ‘এই সামান্য ব্যাপারে তো তোমাদের ছুটে আসার দরকার ছিল না। স্কুলেই তো কথা হতে পারত।'
ভিখু বলল, ‘স্যার, স্কুলে হয়তো হতে পারত। ঠিকমতো মাইনে দিতে পারেনি বলে আমাদের তিন বন্ধু পরীক্ষায় বসতে পারবে না এটা আমাদের খারাপ লাগছে। ওদের অবস্থা তো আপনিও জানেন। তাই বলছিলাম, আমরা চাঁদা তুলে বেতনের টাকা শোধ করে দেব।'
হেডস্যার অবনীবাবু বললেন, 'তা হলে তো কোনও কথাই নেই। যদিও আমি ঠিক করেছিলাম, ওরা পরীক্ষায় বসবে। না বসলে তো একটা বছর নষ্ট। রেজাল্ট নেওয়ার আগে টাকাটা শোধ করলেই হবে। হেডমাস্টার হয়ে স্কুলের নিয়ম তো ভাঙাতে পারি না।' ভিখু বলল, ‘না স্যার। আপনি নিয়ম ভাঙবেন না। নিয়ম চালু রাখুন। আমরা ব্যবস্থা
করছি। এই নিন খাতা, প্রথম চাঁদাটা আপনি দেবেন এটাই আমাদের আশা।'
হেডস্যার অবনীবাবু একটু বেকায়দায় পড়ে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন, মাসের বাইশ তারিখে ঘরে আর কত টাকা থাকে। অথচ ওদের ফিরিয়ে দিতেও তাঁর খারাপ লাগছে।
বিশেষ করে ভিখুকে। তাঁর মনে পড়ছে, ভিখুর যখন এগারো বছর বয়স, তখন একদিন স্কুল থেকে ফিরছিলেন তিনি। তার পেছনে জনাছয়েক ছাত্র, যারা এই পথেই বাড়ি ফেরে। ওদের দলের প্রধান হল ভিখু। বাজারটা পেরোবার একটু আগেই খাকি পোশাক পরা জোয়ান চেহারার একজন লোক সাইকেল করে যেতে গিয়ে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। ভিখু বাঘের মতো লোকটার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভিখু লোকটার চুলের মুঠি ধরে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে লোকটার গালে এমন একটা ঘুসি চালায় যে, লোকটা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। একটি ঘুসিতেই তার দুটো দাঁত খসিয়ে দিয়েছিল ভিখু! তখন ওর বয়স মাত্র এগারো।
হেডস্যার অবনীবাবুর সেই কথাটা মনে পড়ল। তিনি বললেন, ‘ভিখু, চাঁদাটা যদি স্কুলে গিয়ে দিই তা হলে কি অসুবিধে হবে?’
ভিখু বলল, ‘একদম না। টাকা তো স্কুলেই জমা হবে। তা হলে আজকে স্কুল থেকেই নিয়ে দেব।'
কথাটা শেষ করে ভিখু তার এক সঙ্গীকে বলল, ‘রামু, ব্যাগটা আন। স্যারকে দিই।' ব্যাগটা আনার পর দেখা গেল ওই ব্যাগের মধ্যে খান তিন বেগুন, কিছু শিম, একটা ছোট কুমড়ো, অল্প কিছু পালংশাক।
অবনীবাবু বললেন, ‘এগুলো কেন? কোথায় পেলে?’
ভিখু বলল, ‘খেতের জিনিস। একদম টাটকা। আপনার জন্য নিয়ে এলুম।'
অবনীবাবুর মনে হল, ভিখু বা ওই দুই ছাত্রদের বাগানে হয়েছে। ভিখুর হওয়াই স্বাভাবিক। ভিখু তো বাগান করতে ভালবাসে।
আসল ব্যাপারটা ছিল অন্যরকম। আসবার সময় তার মনে হয়েছিল হেডস্যার তাদের বড় গুরু। গুরুগৃহে কি খালি হাতে যাওয়া উচিত! তাই আসার পথে যখন দেখল বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাইবান্দার চাষিরা তৈরি হচ্ছে তখন ভিখু গিয়ে কারও কাছে বেগুন, কারও কাছে শিম এইসব চেয়ে নিয়েছে। ভিখুকে কেউ ফেরায় না। ফেরাতে পারে না। অতএব, কেউ আপত্তি করেনি।
শুধু গুরুগৃহে কেন, ভিখু ছেলেবেলা থেকেই কোনও আত্মীয় বা গুরুজনদের বাড়িতে গেলে খালি হাতে যায় না। খালি হাতে যাওয়ার অভ্যাসই নেই ভিখুর। যদিও ভিখুর আত্মীয়ের সংখ্যা খুবই সামান্য। গাইবান্দাতে এক জ্যাঠা আছেন। ভিখুর বাবার আপন দাদা নন। মামাতো, পিসতুতো বা মাসতুতো হবেন। যদিও ভিখু এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। সম্পর্ক যাই হোক, জ্যাঠা তো! ভিখুর কাছে যেমন গাইবান্দার সবাই আত্মীয়, তেমনই মতির হাটের কাউকেই সে অনাত্মীয় ভাবে না। ভিখুর বাবা-মা'র ধারণা, ভিখুর মধ্যে এই যে সর্বজনে শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা, সেটা ভিখু ঈশ্বরের অবতার বলে।
ভিখুর তিন বছর বয়স থেকেই ভিখুর মা’র ধারণা জন্মে গেছে যে, সে সামান্য মানুষ নয়। মানবদেহে স্বয়ং ভোলানাথ। গাইবান্দাতে অন্নদা ঠাকুমাকে পাড়ার সকলে ঠাকুমা বলে ডাকত। ভিখুও ডাকত ঠাম্মা বলে। আর ওই ঠাম্মা ভিখুকে ভোলানাথ বলে ডাকতেন। গাইবান্দার কিছু মানুষ ভিখুর মা’র মতো বিশ্বাস করত ভিখু সামান্য মানুষ নয়। বাকিরা তাকে অবতার মনে না করলেও এটা মানত যে, ভিখু আর দশটা ছেলের চেয়ে আলাদা। গাইবান্দাতে থাকতে থাকতে মা'র সঙ্গে মাঝেমধ্যে জ্যাঠার বাড়ি যেত। জ্যাঠাকে ভিখু ডাকত শিবুজেঠু বলে। শিবুজ্যাঠা ছিলেন খুব খুঁতখুঁতে মানুষ। তাঁর ধারণা ছিল, বাজারের সমস্ত দোকানদার তাঁকে ঠকাবার জন্য তৈরি হয়ে বসে আছে। শিবুজেঠু নিজের বুদ্ধি আর দরাদরির কৌশলে না ঠকে কেবল জিতে আসতেন। একদিন শিবুজেঠুর বাড়িতে গিয়ে ভিখু এঘর-ওঘর ঘোরাঘুরি করে এসে শিবুজেঠুর স্ত্রীকে বলল, ‘জেঠিমা, তোমরা কোন দোকান থেকে ক্রিম কেনো গো?’
জেঠিমা উত্তর দিলেন, ‘কেন?’
ভিখু বলল, ‘তোমাদের ক্রিমের স্বাদটা ভাল না। আমাদের বাড়ির স্বাদটা এর চাইতে অনেক ভাল। তোমাদেরটা বুঝি পুরনো।'
জেঠিমা চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘তুই কি খেয়ে দেখলি?’
ভিখু উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, আমি খাই তো।’
ভিখুর মা একটু লজ্জিত হলেন। ভিখুকে বললেন, ‘বাবা, তুমি কি সবটা খেয়েছ?’ ভিখু বলল, ‘খুব বেশি তো ছিল না।'
জেঠি ঘরে গেলেন। ক্রিমের কৌটো এনে ভিখুর মাকে দেখিয়ে বললেন, ‘ও সুধা, ভিখু যে চেটেপুটে খেয়েছে। ওর তো অসুখ করবে। এখনই ডাক্তার দেখাও। পাঁচ বছরের ছেলে ক্রিম খাবে কী গো।'
ভিখুর মা বললেন, ‘ও নিয়ে ভেবো না দিদি। ভিখু তো মাঝে মধ্যে কোল্ড ক্রিমও খেয়ে ফেলে। কিছু হয় না। আমার যেটা ভুল হয়েছে, তা হল তোমাকে বলা উচিত ছিল ওগুলো আলমারির মধ্যে রাখতে। ভিখুর চোখে পড়লেই কৌটো খুলে খেয়ে নেবে।'
আধকৌটো ক্রিমের শোক তো জেঠিমার ছিলই। এবার ভিখুর এই বিচিত্র খাদ্যাভ্যাস শুনে তাঁর চোখ কপালে উঠল। চেয়ারের ওপর ধপাস করে বসে পড়ে তিনি বললেন, 'বাবা ভিখু, জগতে এত খাবার জিনিস থাকতে তুই এগুলো খাস কেন? তোর খেতে কষ্ট হয় না?’
ভিখু ঘরের মধ্যে লাট্টু ঘোরাবার জন্য লাট্টুতে লেত্তি পরাচ্ছিল। কাজটা করতে করতেই বলল, ‘খেতে কেন কষ্ট হবে। নরম জিনিস তো। জিভ দিয়ে চেটে খেতে কোনও কষ্ট হয় না।
জেঠিমা বললেন, ‘ওটা তো গায়ে মাখার জিনিস। কতরকম দ্রব্য দিয়ে তৈরি হয় কে জানে। ওগুলো তোর পেটে সয় কেমন করে?’
ভিখু বলল, ‘গায়ে মাখলে সয়, কিন্তু পেটে গেলে সইবে না কেন। যা দেবে উদরে তাই থাকবে অন্তরে। মা যে খালি বলে, দুধ খা, ঘি খা, তাতে শরীরে জোর হবে। শরীরে লাবণ্য হবে। তাই গায়ে মাখার জিনিস আমি খেয়ে ফেলি। দেখবে তাতে শরীরে লাবণ্য আসবে।'
ভিখুর জেঠিমা আর কথা বাড়াবার বিশেষ সাহস পেলেন না। রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নকুলের মা, তাড়াতাড়ি ভিখুর জন্য খাবার আনো। ওর বোধহয় খিদে পেয়েছে।' ভিখু বারান্দায় গিয়ে লাট্টু ঘোরাচ্ছিল। খানিক বাদে একটা কাঁসার রেকাবিতে দুটো লুচি আর একটু আলুর তরকারি নিয়ে নকুলের মা ঘরে ঢুকতেই ভিখুর মা সুধা দেবী অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘দিদি, আমার ভিখু একটু খেতে ভালবাসে। জানোই তো কত তপস্যা করে, বাবা সোমনাথের মন্দিরে হত্যে দিয়ে তবেই না ভিখুকে পেয়েছি। দুটো লুচিতে ভিখুর কিছু হবে না।”
ক্রিম খাওয়া ভিখুকে নিয়ে জেঠিমার ঘোর এখনও কাটেনি। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, ‘নকুলের মা, আরও কয়েকটা লুচি নিয়ে এসো।'
কাঁসার রেকাবিতে খানছয়েক লুচি সাজিয়ে ভিখুকে খেতে ডাকা হল। ভিখু ঘরে এসে লুচির থালা দেখে বলল, 'বাঃ লুচি! জানো জেঠিমা, লুচি আমি খুব ভাল খাই।'
জেঠিমা মুখে কিছু বললেন না। ছোট্ট একটা ঢোক গিলে মনে মনে বললেন, যে ছেলে আধকৌটো ক্রিম রাবড়ির মতো চেটেপুটে সাবাড় করতে পারে, জগতে সে আর তবে কোনটা খারাপ খাবে। ছ’খানা লুচি শেষ করে ভিখু জেঠিমার দিকে তাকিয়ে বলল, জেঠিমা, আর খানকয়েক হবে?’
মনে মনে আতঙ্কিত জেঠিমা নকুলের মা’কে ধমক দিয়ে উঠে বললেন, ‘দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছ কী? লুচি ভাজতে পারছ না।'
ধমক খেয়ে নকুলের মা লুচি ভাজতে গেল। খাওয়া শেষ করে ভিখু লুচির প্রতীক্ষায় এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ভীত জেঠিমা দেখলেন, ঘরের মধ্যে একটা পাউডারের কৌটো। কে জানে, গুঁড়ো দুধের মতো পাউডারও না খেয়ে ফেলে। তার পাশেই স্বামীর শেভিং ক্রিম। জেঠিমা আঁচলের তলায় সেগুলো লুকিয়ে নিচ্ছিলেন দেখে ভিখুর মা সুধা দেবী বড়জা’কে অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘ওসব রেখে দাও। ভিখু ওসব খায় না।'
ভিখুর জেঠিমার নাম বিভাবতী। থাকতেন শ্যামবাজারে। বিয়ের পর গাইবান্দায়। তিনি ভিখুর মা’র পাশে বসে ফিসফিস করে বললেন, 'আজ তো হবে না। পরে একদিন তোমার কাছে গিয়ে জেনে আসব, ভিখু কী কী খায় না।'
ভিখুর কোনওদিকে নজর নেই, সে পরম আনন্দে লুচি খেয়ে যাচ্ছে। শেষে থাকতে না পেরে জেঠিমা বললেন, ‘সুধা, ওইটুকু বয়স, ও কি থামবে না? ওকে থামতে বল। আমার বড্ড ভয় করছে।'
ভিখুর মা এবারও অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘মিথ্যে ভয় পেয়ো না দিদি। আমার ছেলেকে আমি জানি। এবার ও থামবে।'
খানদশেক লুচি খাওয়ার পর ভিখু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘খুব ভাল খেলাম।'
জেঠিমা ভিখুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পেট ভরেছে বাবা?’
ভিখু বলল, ‘হ্যাঁ, তা মোটামুটি একরকম হল।'
এই যে শিবুজ্যাঠা, তাঁর বাড়িতেও ভিখু একা গেলে খালি হাতে যেত না। হয় একটা লাউ, হয়তো একটা কুমড়ো, কখনও-বা ঝুনো নারকেল, কিছু-না-কিছু একটা সঙ্গে নিয়ে যেতই। এগুলো সংগ্রহ করা ভিখুর কাছে আদৌ কোনও কঠিন ব্যাপার নয়। নিজের বাড়িতে না থাকলে সে সোজা চলে যেত অন্য বাড়িতে। বাড়িতে গিয়ে ডেকে বলত, ‘মাসিমা, আপনার মাচায় অনেক অনেক লাউ ঝুলছে। একটা নেব। আপনি দেখিয়ে দিন কোনটা নেব। কুটুমবাড়ি যাব তো, খালি হাতে কেমন করে যাই।'
ভিখুর এই প্রস্তাবে কেউ বিশেষ আপত্তি করত না। তারা সবাই জানে, একটা লাউ বা কুমড়োর বিনিময়ে ভিখুর কাছ থেকে অনেক কাজ পাওয়া যাবে। অতএব, লাউটা দেওয়ার সময় কেউ বলত, ‘ভিখু কাল সকালে আমার রেশনটা তুলে দিতে পারবে?’ কেউ বলত, ‘বড্ড কেরোসিনের অভাব। এক বোতল কেরোসিন জোগাড় করে দাও না ভিখু।’ ভিখু সেগুলো জোগাড় করে দিত। ভিখু যখন এইসব কাজকর্ম করত তখন ভিখু পাঁচ বছরের নয়। তার বয়স তখন দশ ছাড়াচ্ছে। কিন্তু দেখলে মনে হত ষোলো-সতেরো বছরের ছোকরা।
ভিখুর নানা গুণপনার কথা শোনার পর ওর শিবুজ্যাঠা একদিন তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘জানো বিভা, ইচ্ছে হয় ভিখুকে একদিন ডেকে এনে পেটভরে খাওয়াই।
বিভাবতী বললেন, ‘কতদিন থেকে তো তোমাকে বলছি। ওরা আমাদের আত্মীয়। খুব দূরের তো নয়। কাছাকাছি আছি বলে ঘনিষ্ঠতা আরও বেশি। তোমায় আর কী বলব। তোমার হাত দিয়ে তো পয়সা গলে না।'
শিবুজ্যাঠা বললেন, ‘পয়সার জন্য ভাবছি না। এ বাড়িতে পাঁচ বছর বয়সে ওর লুচি খাওয়ার যে বর্ণনা তুমি শুনিয়েছ তাতে ভরসা পাচ্ছি না। এখন তো পাঁচে নেই। ছয় হয়েছে। এখন ওর পেটের কন্টেনারটা তো আরও বেড়েছে।'
বিভাবতী রাগ দেখিয়ে বললেন, ‘কীসের ছাই চাকরি করো বুঝি না। একটা ছ’বছরের শিশুকে পেটভরে খাওয়াতে ভয় পাচ্ছ।'
শিবুজ্যাঠা বললেন, ‘ভয়ের চেয়ে ভাবনা বেশি। আমি ভাবছি ওর বাবা গোপাল কেমন করে মেনটেন করছে।'
বিভাবতী বললেন, ‘তবেই বোঝো, ওরা তিনশো পঁয়ষট্টি দিন পারছে আর তুমি একটা দিন পারছ না।'
শিবুজ্যাঠা বললেন, ‘এবার পারতেই হবে। পরশুদিন গগনবাবুর মেয়ের বিয়ে। উনি তো সাহেব মানুষ। কলকাতা থেকে নামকরা কেটারার আসছে। কাঁচাগোল্লা আসবে বনগাঁ থেকে। নকুড়ের কড়াপাকের সন্দেশ আর নবীন দাশের রসগোল্লা। বিয়েটা মিটে যাক। তারপর মাসকাবারে একটা রবিবার দেখে ভিখুকে ডাকা যাবে।'
বিভাবতী খুশি হতে পারলেন না। তিনি বিরক্ত মুখে বললেন, ‘গগনবাবুর মেয়ের বিয়ের সঙ্গে ভিখুকে খাওয়ানোর কী সম্পর্ক। এমন তো কোনও নিয়ম নেই যে, গগনবাবুর মেয়ের বিয়ের আগে এ-পাড়ায় আর কাউকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো যাবে না।’
শিবুজ্যাঠা বললেন, ‘তুমি অযথা রেগে যাচ্ছ। গগনবাবুর মেয়ের বিয়েতে গোপালদের সবার নিমন্ত্রণ। ভিখুও যাবে। সেদিন পাশাপাশি বসে খাওয়ার টেবিলে ভিখুর বর্তমান পারফরম্যান্সটা একটু দেখে নিই। সেইভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে তো। ভিখু তো যেমন-তেমন ছেলে নয়। ইচ্ছে হলেই স্নো, কোল্ড ক্রিম, মায় কাঁচা উচ্ছে পর্যন্ত যে খেয়ে নিতে পারে তাকে খাওয়ানোর আগে প্রস্তুতি দরকার হবে না।'
বিভাবতী উঠতে গিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ‘কয়েকদিন আগে বাজারে সুধার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ভিখুর কথা জিজ্ঞেস করতে ভিখুর সর্বশেষ কাণ্ড যেটা বলেছে, সেটা শুনলে তো তুমি আর কখনওই ওকে বাড়িতে ডেকে এনে খাওয়াবে না।'
শিবুজ্যাঠা উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘লেটেস্ট কাণ্ডটা কীরকম শুনি?’
বিভাবতী বললেন, ‘গোপাল ঠাকুরপো সেদিন বাড়িতে রাবড়ি এনেছে। ভিখুও খাবে বলে এক কিলো এনে বলেছিল আগে ভিখুকে দেবে। ভিখু কিছুতেই পুরোটা খাবে না। অর্ধেকটা মা-বাবাকে দিয়ে বাকি অর্ধেকটা নিয়ে ভিখু বসল।'
কথার মাঝখানেই শিবুজ্যাঠা বললেন, ‘ছ’ বছরের বালক হাফ কিলো রাবড়ি ! ভাবা যায়!’ বিভাবতী বললেন, ‘কথার মাঝখানে কথা বলো কেন? আগে শোনোই না! সুধা বলল, ভিখু দেখছি রাবড়ি নিয়ে চুপ করে বসে। খাচ্ছে না! তাড়া দিতেই বলল, একটু পরে। সুধা লক্ষ করছে ওর পাত্রে রাবড়ির পরিমাণ বেশি। দুধ প্রায় নেই বললেই চলে। ভিখু কী করেছে জানো? রাবড়ির দুধে ছোট ছোট করে ব্লটিং পেপার দিয়েছে। ওর ধারণা, ব্লটিং পেপার থেকেই রাবড়ি তৈরি হয়।'
শিবুজ্যাঠা মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘ভিখুকে খাওয়ানোর পক্ষে এটা তো আরও একটা মাইনাস পয়েন্ট হয়ে গেল। আমার মনে হয় রিস্ক না নেওয়াই ভাল।'
ছ’বছর বয়সেই ভিখু যে সকলের কাছেই নানাভাবে আলোচিত হয়ে উঠেছিল সে-কথা বোধকরি আর না বললেও চলবে। ভিখু গাইবান্দা থেকে মতির হাটে এল সতেরো বছর বয়সে। তারপরের ঘটনা সবই মতির হাটে। কিন্তু মতির হাটে বাড়ি করে পাকাপাকিভাবে চলে আসার পরও গাইবান্দার লোক ভিখুকে ভোলেনি। ভিখুও তাদের ভুলতে পারেনি বলে এখনও যাতায়াত করে। ভিখুর পাঁচ থেকে ছ’বছরের মধ্যে অনেকরকম ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা তো ভিখু এখনও ঘটিয়ে চলেছে এই মতির হাটে এসে। ওই পাঁচ থেকে ছ’বছরের মধ্যে আরও দুটি ঘটনা আছে। পরে যদি আরও কিছু মনে পড়ে সেটা ফ্ল্যাশব্যাক পদ্ধতিতে বলার সুযোগ তো রইল। দুটি ঘটনাই গগনবাবুর মেয়ের বিয়েতে। গগনবাবু ভিখুকে স্নেহ করতেন। একমাত্র মেয়ের বিয়েতে ছ'বছরের ভিখু যেসব কাজ করেছে সেগুলোও খুব তুচ্ছ। গগনবাবুর পরিবারও জানত, ভিখু সবদিক থেকে আর দশটা ছেলের চেয়ে আলাদা। ভিখুর ওপর দায়িত্ব ছিল আভ্যুদয়িকের জন্য জিনিসপত্র জোগাড় করা। সেইসব জিনিসপত্রের মধ্যে ছিল গো-চোনা। দায়িত্ব নিলে ভিখু নিষ্ঠাভরে সেই দায়িত্ব পালন করে। বিয়ের দিন অতি ভোরে ভিখু নিয়ে এল এক প্লাস্টিকের বালতি ভরতি গো-চোনা। পুরোহিতমশাই বললেন, ‘সর্বনাশ! এক বালতি গো-চোনা দিয়ে কী হবে?
ভিখুর চটপট জবাব, 'কী হবে তা আমি কী জানি! আপনি তো পরিমাপ বলেননি। কাজের সময় কম পড়লে কোথায় পাব?’
পুরোহিতমশাই বললেন, ‘একটুখানি লাগবে। বাকিটা ফেলে দাও।'
ভিখু রুখে দাঁড়াল, ‘ফেলে দেব মানে? ভোর রাত থেকে কষ্ট করে সংগ্রহ করা। ফেলে দাও বললেই ফেলে দেব? পরিশ্রমের দাম নেই?'
পুরোহিতমশাই ভিখুকে বিলক্ষণ চিনতেন। সেই কবে ভিখু তাঁর টিকিতে প্রজাপতি বেঁধে দিয়েছিল। উনি টেরও পাননি। তাই কণ্ঠস্বর নরম করে বলল, ‘বাবা ভিখু, এত গো-চোনা নিয়ে আমি কী করব?’
ভিখু বলল, ‘কাজ করতে গিয়ে আপনারই তো বেশি দরকার লাগে। আপনি বোতলে করে বাড়ি নিয়ে যান। গিয়ে ফ্রিজে রেখে দেবেন। প্রয়োজনে কাজে লাগবে। বিয়ে-শ্রাদ্ধ এসব তো লেগেই আছে।'
গো-চোনা ফ্রিজে রাখার প্রস্তাব শোনার পর পুরোহিতমশাই আর কথা বাড়াবার সাহস পাননি। দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটল বিয়ের দিন রাত্রিবেলা। সকাল থেকে ভিখু বিস্তর কাজকর্ম করেছে। ওইটুকু ছেলে যে এত কাজ করতে পারে পাত্রপক্ষের লোক তা দেখে অবাক! সবাই যখন বলল, ভিখুর বয়স মোটে ছয়, পাত্রপক্ষর লোকরা বিশ্বাসই করল না। নতুন লোকের পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন। ভিখুর শরীরের গঠন এমনই যে, ওকে ছ’বছর বয়সেও দেখায় দশ বছরের মতো। পাত্রপক্ষের অনেকের সঙ্গেই ভিখুর বেশ ভাব হয়ে গেল। পাত্রপক্ষ যখন খেতে বসল তারাই আগ্রহ করে ভিখুকে তাদের সঙ্গে বসাল। কলকাতার কেতাদুরস্ত কেটারার। তাদের কতরকমের কায়দা। বরযাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ ইতিমধ্যেই ভিখুর প্রতিভার কিছু কাহিনি শুনে ফেলেছে। সেইসব শুনে ভিখুর প্রতি তাদের আগ্রহ জন্মে গেছে। ভিখু যেমন খায় তেমনভাবেই খেয়ে যেতে লাগল। শিবুজ্যাঠা নিজে এসে ভিখুকে একবার সরেজমিনে দেখে গেলেন। ভিখু যত খেতে থাকে পাত্রপক্ষের খাওয়া তত থেমে যায়। ওরা খাবে কী, ভিখুর খাওয়া দেখতেই ব্যস্ত।
খাওয়া শেষ করে ভিখু যখন বাইরে এল, তখন গগনবাবু নতুন বেয়াইয়ের সঙ্গে গল্প করছেন। ভিখুকে দেখে গগনবাবু বললেন, ‘এ হচ্ছে আমাদের পাড়ার দ্য গ্রেট ভিখু। তা বাবা ভিখু, ভাল করে খেয়েছ তো? রান্নাবান্না ভাল হয়েছিল?’
ভিখু ছোট্ট একটা ঢেকুর তুলে বলল, ‘সব রান্নাই চমৎকার। কিন্তু জেঠু, সবার শেষে বাটি করে হালকা গরম জলের মতো যেটা দিল সেটা একেবারে ডুবিয়ে দিয়েছে। কেউ খায়নি। সবাই হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করেছে। কেউ মুখে তোলেনি। এতে আপনার বদনাম হতে পারে। আপনার পয়সা দিয়ে কেনা জিনিস, আমি ফেলিনি। এক চুমুকে খেয়ে নিয়েছি। কেমন যেন সাবান-সাবান গন্ধ। স্বাদটা ভাল করতে পারেনি।'
গগনবাবুর আর তাঁর বেয়াই দু’জনেই পরস্পরের দিকে তাকালেন। ভিখু তখন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে তার বাড়ির দিকে।
এর কিছুদিন পরেই ভিখু তার বাবা-মা’র সঙ্গে গাইবান্দা ছেড়ে মতির হাটে চলে আসে। মতির হাটে তার খ্যাতি রটতে বেশি সময় লাগেনি। সেইসব সময় কেউ কেউ এসে ভিখুর মাকে বলত, ‘ও দিদি, তোমার ছেলে ভিখু তরতর করে নারকোল' গাছের মাথায় উঠে নারকোল পাড়ছে। ওইটুকু ছেলে। ওকে দেখে তো আমাদের বুক কাঁপছে।'
ভিখুর মা সুধা দেবী এসব সংবাদে আদৌ বিচলিত হন না। তিনি বলেন, ‘ভয় পেয়ো না ভাই। যাঁর শক্তিতে ভিখু গাছে উঠেছে, তাঁর শক্তিই ভিখুকে ঠিক নামিয়ে আনবে।' পাড়ার সবাই দেখত, ভিখু যাই করুক, ওর কখনও বিপদ হয় না। বরং অন্যকে সে বিপদ থেকে রক্ষা করে। ফলে মতির হাটের অনেকেরই ধারণা জন্মে গেল, ভিখু যেমন-তেমন ছেলে নয়।
গাইবান্দা থেকে মতির হাটে এসে ভিখু নতুন স্কুলে ভরতি হল। এই স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে ভাব জমাতে ভিখুর বেশি সময় লাগল না। রোজই ভিখু এমন কিছু-না-কিছু একটা কাণ্ড করত, যা স্কুলের ছেলেরা তাদের বাড়িতে গিয়ে গল্প করে শোনাত। তার ফলে যাঁরা ভিখুকে দেখেননি, তাঁরাও ভিখুকে দেখতে আগ্রহী ছিলেন। ভিখুর বয়স যখন দশ ছাড়িয়ে এগারোর দিকে সরে যেতে শুরু করেছে তখন ভিখু পড়ে ক্লাস সেভেনে। ওই সময় একদিন স্কুলে ইনস্পেক্টর এলেন। ইনস্পেক্টর হাতের ইশারায় সবাইকে বসতে বলে প্রশ্ন করলেন, ‘এখন কীসের ক্লাস চলছিল? মানে কী পড়ানো হচ্ছিল?’
সকলের আগে ভিখু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ক্লাসটা ছিল বাংলার। কিন্তু কিছুই পড়ানো হচ্ছিল না। যা হচ্ছিল সেটা আপনাকে নিয়ে আলোচনা।’
ইনস্পেক্টর একটু হাসলেন। পরে ভিখুকেই প্রশ্ন করলেন, ‘বলো তো অমিত্রাক্ষর ছন্দে বাংলার কোন কবি একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন?’
ভিখু উত্তর দিল, ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মেঘনাদবধ কাব্য লিখেছিলেন।' ইনস্পেক্টর খুশি হয়ে বললেন, ‘বাঃ! ইংরেজি পড়তে তোমাদের কেমন সকলে চুপ করে আছে দেখে ভিখু বলল, ‘মন্দ নয়।' ইনস্পেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, ‘মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং কথাটার বাংলা কী?’ ভিখু উত্তর দিল, ‘স্যর, এই কথাটার দুটো বাংলা হয়?’ ইনস্পেক্টর একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘দুটো বাংলা? বলো তো শুনি।' ভিখু উত্তর দিল, ‘একটা বাংলা হল ভুল বোঝাবুঝি। যা সবাই জানে। আর লাগে?’
একটা মানে অল্প লোক জানে। মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং অর্থ, মেয়েটি নীচে দাঁড়িয়ে আছে।'
ইনস্পেক্টর একটু কাশলেন। ক্লাস থেকে চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন কি না সেটা ভাল করে বুঝে ওঠবার আগেই ভিখু বলল, ‘স্যর, আর কোনও প্রশ্ন করবেন?? ইনস্পেক্টর একটু ভেবে বললেন, ‘আমরা সবাই বলি, ছেলেটি অমুক বিষয়ে লেটার পেয়েছে বা লেটার মার্কস পেয়েছে। আশি নম্বর পেলেই লেটার পাওয়া যায়। এবার বলো তো, একে লেটার বলে কেন? অন্য কিছু না বলে লেটার কেন বলে।'
গোটা ক্লাস একেবারে চুপ। বাংলার মাস্টারমশাইকেও যথেষ্ট বিব্রত মনে হচ্ছে। ইনস্পেক্টর মৃদু মৃদু হাসছেন। মিনিটখানেক অপেক্ষা করে বললেন, 'আমি জানতাম তোমরা পারবে না। লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। অনেকেই পারে না। এবার আমি বলে দিচ্ছি...'
ইনস্পেক্টর কথা শেষ করার আগেই ভিখু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যর, একটা চান্স দেবেন?’ ইনস্পেক্টরের ভ্রূ কুঁচকে গেল। ভিখুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি পারবে? তা হলে এতক্ষণ চুপ করে ছিলে কেন?’
ভিখু উত্তর দিল, ‘মনে মনে যোগ করছিলাম। ইংরেজিতে লেটার লিখতে হলে আমরা লিখব LETTER, কেমন?’
এইটুকু বলে ভিখু তার পাশের বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঘোঁতনা, ব্ল্যাক বোর্ডে যা। চক নে’ ‘এল’ হচ্ছে ইংরেজির বারো নম্বর অক্ষর। ‘এ’ থেকে গুনতে শুরু করলে বারোতে এসে ‘এল’ পাওয়া যায়। লেখ বারো। ‘ই’ হচ্ছে পাঁচ নম্বর, ‘টি’ হচ্ছে কুড়ি নম্বর, আবার ‘টি’ মানে আরও কুড়ি, ‘ই’ মানে পাঁচ, ‘আর’ মানে আঠারো। ঘোঁতনা, ভাল যোগ করে দ্যাখ যোগফল হবে আশি। ইনস্পেক্টর স্যরকে দেখা।'
ঘোঁতনা ততক্ষণে যোগ করে বড় করে লিখে ফেলে আশি। ইনস্পেক্টর এগিয়ে এসে ভিখুকে বললেন, 'চমৎকার! তোমরা যে এটা পারবে তা আমি আশা করিনি। একেবারে অপ্রত্যাশিত। বহু লোককে জিজ্ঞেস করেছি, কেউ পারেনি।'
বাংলার মাস্টারমশাই এতক্ষণ বিব্রত মুখে চুপ করে ছিলেন। এবার তিনি বললেন, ‘বাংলার মতো ইংরেজিটাও এখানে খুব যত্ন নিয়ে পড়ানো হয়।'
ইনস্পেক্টর তখনও ভিখুর দিকে তাকিয়ে। ভিখু বিনীতভাবে বলল, ‘স্যর, আমিও একটা প্রশ্ন বহু লোককে করেছি। কিন্তু কেউ বলতে পারেনি। আমার বিশ্বাস, আপনি পারবেন।' ইনস্পেক্টর বললেন, ‘প্রশ্নটা শুনি?’
ভিখু বলল, ‘গান্ধারীর একশোজন ছেলে। প্রত্যেকেরই তো একটা করে নাম ছিল। ওই একশো পুত্রের নামগুলো কী, জানেন?’
ইনস্পেক্টর বললেন, ‘আমি তো দুর্যোধন, দুঃশাসন আর বিকর্ণ ছাড়া কারও নাম জানি না। তুমি জানো নাকি?’
ভিখু বলল, ‘অবশ্যই জানি স্যর। প্রশ্নকর্তা যদি প্রশ্নের উত্তর না জানে তবে তো মহা বিপদ। আপনি শুনবেন স্যর? তবে শুনুন, দুর্যোধন, দুঃশাসন, দুঃসহ, দুঃশল, জলসন্ধ, সম, সহ, বিন্দ, অনুবিন্দ, দুর্ধর্ষ, সুবাহু, দুষ্পধর্ষণ, দুর্মর্ষণ, দুর্মুখ, দুষ্কর্ণ, কর্ণ, স্যর এ কর্ণ কুন্তিপুত্র নন। তাঁর অন্য নাম বসুষেণ, বিধংশতি, বিকর্ণ, সুলোচন, চিত্র, উপচিত্র, চিত্রাক্ষ, চারুচিত্র, দুর্মদ, দুর্বিগাহ, বিবিৎসু...’
ইনস্পেক্টরমশাই রুমাল দিয়ে কপাল মুছতে মুছতে বললেন, ‘আজ এই পর্যন্ত থাক ভিখু। একদিনে এত নিতে পারছি না বাবা।'
ভিখু এবার হাতজোড় করে বলল, ‘স্যর, অপরাধ নেবেন না। আমি এইখানে থেমে গেলে আজ না হয় কোনও একদিন আপনার মনে হবে, আমি হয়তো একশোটা নাম বলতে পারতাম না। নামগুলো তো, অমল, বিমল, কমল, সুনীল এরকম সোজা নয়। সব প্যাঁচমারা নাম। যেমন একজনের নাম দুষ্পরাজয়, আরেকজন সুবচস। বাবা-মা যে কেমন করে এত কঠিন নামে ডাকতেন কে জানে।'
ইনস্পেক্টর অনুনয়জড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘কোনও একদিন নয়, তোমায় বলছি আমার কখনও মনে হবে না যে, তুমি পারতে না। জীবনে গ্রাম-গঞ্জের অনেক স্কুলে গেছি। তোমাদের স্কুল আর তুমি এই দু'জনকে কখনও ভুলতে পারব না। সময়ের স্রোতে স্কুলের নামটা যদিও বা ভুলি ভিখু, তোমাকে ভুলব না। তুমি আমার কাছে দ্য গ্রেট ভিখু৷'
ইনস্পেক্টরমশাই আর কোনও ক্লাস পরিদর্শনে গেলেন না। হেডমাস্টারমশাইয়ের ঘরে গিয়ে সামান্য জলযোগ করলেন, তারপর ভিখুর প্রশংসা করে যেতে লাগলেন। সেই থেকে গাইবান্দার মতো মতির হাটেও চালু হয়ে গেল দ্য গ্রেট ভিখু।
আগেও অনেকবার বোধহয় বলা হয়েছে যে, ভিখুর চেহারা বয়সের চেয়ে বড় দেখায়। ভিখু যখন এগারোতে সবে পা দিয়েছে তখন আন্ডার ফিফটিন ফুটবল খেলায় বিপক্ষ দল আপত্তি জানাল। রেফারি বাইরে থেকে এসেছেন, ভিখুর ক্রিয়াকাণ্ড সম্পর্কে আদৌ কিছু জানেন না। ভিখু জানত, খেলার দিন তাকে নিয়ে এই সমস্যা হবে। অতএব, আপত্তি উঠতেই ভিখু হাঁক দিয়ে ডাকল, ‘দামু, সুটকেস নিয়ে আয়।”
দামু একটা সুটকেস নিয়ে মাঠে হাজির। রেফারি এবং বিপক্ষ দলের ক্যাপ্টেন বলল, ‘সুটকেস কেন? ওতে কি বোমা-টোমা আছে নাকি?’
ভিখু বলল, ‘কী আছে সেটা নিজেই দেখে নিন।'
সুটকেস থেকে একটা ফাইল বার করে ভিখু বলল, ‘পরপর দেখে যান। গাইবান্দার নিরাময় নার্সিং হোমে আমি জন্মেছিলাম। প্রথমে দেখুন বার্থ সার্টিফিকেট, পরে দেখুন গাইবান্দা থেকে মতির হাটের স্কুলে ভরতির সময় গাইবান্দা স্কুলের হেডস্যরের সই করা টি. সি.-তে আমার বয়স, মতির হাটের পুরপ্রধানের সার্টিফিকেট। আমার বাবার চিঠি। দুর্গাপুজোর অষ্টমীতে চারটে ধুনুচি নিয়ে ডান্স করে জজসাহেবের প্রশংসাপত্র। আমার বাবা আমার বয়স জানবেন না তো কি আপনার বাবা জানবেন? এত মহান মানুষ মিথ্যে কথা লিখেছেন? এবার আপনি আপনার রেফারি পাশ করার সার্টিফিকেট দেখান।'
রেফারি অন্য জায়গা থেকে এসেছেন। পাড়ার টুর্নামেন্টে কেউ যে তাঁর সার্টিফিকেট দেখতে চাইবে, এমন কথা তাঁর দূর কল্পনাতেও ছিল না। ভিখুর কথার সমর্থনে মতির হাট স্পোর্টিং ক্লাবের অনেকে মাঠে ঢুকতে শুরু করেছে। কেউ কেউ ছাতা উঁচিয়ে হনহন করে আসছে। মাঠের পাশে বিস্তর গাছ। সেই গাছেও অনেক ছেলে ছোকরা। সম্ভবত ওইদিক থেকেই একটা আধলা ইট এসে পড়ল রেফারির হাতদুয়েক সামনে। রেফারি ভদ্রলোকের নাম বিপদভঞ্জন তলাপাত্র। সংক্ষেপে লেখেন বি. ভি. তলাপাত্র। বিপদভঞ্জন নিজেই বিপদ বুঝে বললেন, ‘নো প্রবলেম।'
বিপক্ষ দলের ক্যাপ্টেন আর কর্মকর্তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সব কিছু চেক করলাম। নাথিং ফাউল। খেলা শুরু হবে। প্লেয়ার ছাড়া সবাই মাঠের বাইরে যান।'
তিন ক্রোশ দূর থেকে দল এসেছে খেলবে বলে। অতএব, এই খেলা দেখার জন্য মাঠে মতির হাটের বিস্তর লোক। ভিখুর মা তাঁর পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে খেলা দেখতে এসেছেন। ভিখুর মা সুধা দেবী জানেন, ভিখু খেললে মতির হাট জিতবেই। এমন ধারণা আরও অনেকের। ক্লাবের ছেলেরা ভিখুকে বলল, ‘ভিখু, তুই শুধু একটা কাজ করবি। পেনাল্টি বক্সের মধ্যে বল ঢুকতে দিবি না। বক্সের বাইরে যেভাবে পারবি আটকাবি। ফাউল হলে ভয়। আমাদের গোলকিপার মনা দারুণ খেলে। ও ঠিক আটকে দেবে।'
ভিখু চুইংগাম চিবোতে চিবোতে বলল, ‘তোরা ভাল করে তোদের খেলাটা খেল। আমি আমার খেলাটা খেলব।'
খেলা শুরু হয়ে গেল। শুরু হওয়ার একটু পরেই বোঝা গেল বাইরে থেকে যে দলটা খেলতে এসেছে তারা মতির হাট স্পোর্টিংয়ের চেয়ে অনেক ভাল। গাইবান্দা থেকে খেলা দেখতে ভিখুর শিবুজ্যাঠাও এসেছেন। তাঁর স্ত্রী বিভাবতী রয়েছেন ভিখুর মা'র সঙ্গে।
শিবুজ্যাঠা তাঁর ভাই গোপালকে বললেন, ‘বুঝলি গোপাল, ওদের দলটা খুব স্ট্রং। তোরা জিততে পারবি বলে মনে হয় না।'
ভিখুর বাবা গোপালবাবু বললেন, ‘দেখি কী হয়! ভিখু তো রয়েছে।'
শিবুজ্যাঠা বললেন, ‘ভিখু কী করবে? এটা তো গাছে ওঠা, সাঁতার কাটা আর ক্রিম খাওয়া নয় যে, ভিখু খেল দেখাবে। এখন খাবার খাওয়ার কম্পিটিশন হলেও না হয় ভিখু একটা কিছু করতে পারত। এটা ফুটবল খেলা। ওদের বল কন্ট্রোল দেখছিস? ওদের স্কিল?’
গোপালবাবু বলেন, ‘সবই দেখছি দাদা। তবে কী জানো, ভিখুর মা বলে ভিখু অবতার। হয়তো কিছু হতে পারে।'
শিবুজ্যাঠা বলেন, ‘মানছি অবতার। দেশে-বিদেশে ঈশ্বরের অংশ নিয়ে অনেক অবতার যুগে যুগে জন্মেছেন। তাঁরা মানবকল্যাণে অনেক কাজ করেছেন, অনেক বাণী দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের কেউ কি ফুটবল বা ক্রিকেট খেলেছেন? আমি তো জানি না।'
শিবুজ্যাঠার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মতির হাট গোল খেল। কর্নার কিকটা উড়ে এল বক্সের মাথায়। একসঙ্গে তিনজন লাফাল। কেউই বলটা মাথায় ঠেকাতে পারল না। বলটা বক্সের বাইরে পড়ার আগেই বিপক্ষ দলের একজন ছুটে এসে জোরালো শট করে বলটা গোলে ঢুকিয়ে দিল। মাঠের মধ্যে তেমন কোনও উচ্চকিত শোরগোল নেই। কী করেই বা থাকবে। সবাই তো মতির হাটের লোক। কিছু লোক গাইবান্দা থেকে এসেছে। তারাও মতির হাট স্পোর্টিং ক্লাবের সমর্থক। বিপক্ষ দলের সঙ্গে খেলোয়াড় ছাড়া এসেছে জনাবিশেক লোক। কেবল তারাই যা কিছু হইচই করছিল। মতির হাট স্পোর্টিং গোল খাওয়ার পর একটু তেড়েফুঁড়ে উঠল বটে কিন্তু গোল শোধ করতে পারল না। দুটো দারুণ গোল বাঁচিয়ে দিল মতির হাটের গোলকিপার মনা।
হাফ টাইমে ভিখু বলল, ‘আমি কিন্তু পেনাল্টি বক্সের মধ্যে বল ঢুকতে দিইনি। কর্নার থেকে যে বলটা গেল সেটাও বক্সের বাইরে। ওখান থেকে গোল হলে আমি কী করব?’
নানাজন নানা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। একটু পরে ভিখু বলল, ‘সবার তো সব দিন সমান যায় না। কোনও মানুষ প্রথম জীবনটা সুখে থাকে, পরের জীবনটা দুঃখে কাটে। ওদের ফার্স্ট হাফটা সুখে গেল। সেকেন্ড হাফটা দুঃখে যাবে। এই বলেই ভিখু গান গাইতে শুরু করল, ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।
মতির হাট স্পোর্টিং ক্লাবের ক্যাপ্টেন নিমাই বলল, ‘ভিখু, এটা কি গান গাইবার সময়? আমরা হারছি, এটা টের পাচ্ছিস না?’
ভিখু নিস্পৃহ গলায় বলল, ‘সবাইকে যে সব দিন সব খেলায় জিততে হবে তার তো কোনও মানে নেই।'
নিমাই বলল, ‘এই খেলায় হারলে আমাদের ফাইনালে যাওয়া সমস্যা হবে।'
গোলকিপার মনা বলল, ‘জিতলে রাত্রে গরম ভাত আর খাসির মাংস। না জিতলে ফক্কা।'
ভিখু বিমর্ষ বদনে বলল, ‘জামালচাচাকে বলে গোটা খাসি স্পনসর করিয়েছি। খাসিটা ভাবছে আমরা হেরে যাই। তা হলে ও আরও কয়েকদিন বেঁচে থাকবে।'
মনা বলল, ‘ছাই থাকবে। খাসিগুলো কি জামালচাচার পোষ্যপুত্র যে, বাঁচিয়ে রাখবে। কাল রবিবারের বাজার। সকালেই জবাই করে বিক্রি করবে।'
ভিখু বলল, ‘সেটাও একটা কথা বটে। কয়েক ঘণ্টার আয়ু, বেচারি কী করবে! তার চেয়ে চটপট ওর মুক্তি হয়ে যাওয়াই ভাল। কোনও সুকর্ম করে থাকলে আগামী জন্মে মানুষ হয়েও জন্মাতে পারে।'
রেফারির প্রথম বাঁশি বাজার পর সবাই উঠে দাঁড়াল। মনা বলল, ‘ভিখু, দ্যাখ, মাসিমা আসছেন।' ভিখু দেখল জেঠিমাকে সঙ্গে নিয়ে তার মা মাঠের মধ্যে ঢুকছেন। এই দৃশ্য মতির হাটে বিরল। খেলা দেখতে মহিলা আসেন ঠিকই, কিন্তু কোনওদিন মহিলাদের কেউ মাঠের মধ্যে ঢুকতে দেখেনি। শিবুজ্যাঠা ব্যাপারটা লক্ষ করে বললেন, ‘গোপাল, তোর বউদি আর তোর বউ মাঠে ঢুকে যাচ্ছে কেন? ওরা কি মতির হাটের হয়ে খেলবে নাকি?’
ভিখুর বাবা গোপাল বললেন, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না তো শিবুদা। ওরা কি ভিখুকে কিংবা টিমকে কিছু বলতে যাচ্ছে?’
শিবুজ্যাঠা রাগের গলায় বললেন, ‘বলতে যাচ্ছে মানে? ওরা কী বলবে? ওরা দু’জনে কি পি. কে. আর অমল দত্ত যে, টেকনিক বলবে। এটা তো মোচাঘণ্ট বা ইলিশ মাছের পাতুরি রান্না নয়। চারপাশের লোকজন কী ভাবছে বল তো।’
ভিখুর মা সুধা দেবী আর জেঠিমা বিভাবতী দেবী দু’জনে ভিখুর কাছে এলেন। ভিখুর চারপাশে মতির হাট স্পোর্টিং ক্লাবের ছেলেরা। সুধা দেবী বললেন, ‘ভিখু, তোরা হেরে যাবি এটা ভাবতে খারাপ লাগছে। শিবমন্দিরের এই ফুলটা পকেটে রাখ। আমি তো আগে দেওয়ার সুযোগ পাইনি। বাবা তোকে জেতাবেন।'
জেঠিমা বললেন, ‘ভিখু, তুই এত পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে খেলছিস কেন? সামনে না খেললে তুই তো গোল করতে পারবি না।'
ভিখু জেঠিমা আর মাকে প্রণাম করে বলল, ‘খেলা শুরু হচ্ছে। তোমরা মাঠের বাইরে যাও।' পরক্ষণেই দলের ক্যাপ্টেন নিমাইকে বলল, ‘নিমাই, আমার জায়গায় অন্য কাউকে দে। আমি ফরওয়ার্ডে খেলব।'
নিমাই বলল, ‘ঠিক আছে। তুই ফরওয়ার্ডে যা। বিশুকে তোর জায়গায় দিচ্ছি।'
ভিখু এবার হাতের ইশারায় দামুকে ডাকল। দামুর কাজ দলের সবাইকে হাফ টাইমে জল, আর ঠান্ডা দেওয়া। ভিখু বলল, 'আমরা তো পাড়ার দল। ওরা বাইরের। ওদের ঠান্ডা, নানারকম পানীয় ঠিক ঠিক দেওয়া হয়েছে তো? ঠিক ঠিক মাপে দিয়েছিস তো?’
দামু বলল, ‘গুরু, দামু সাঁতরা কাজে গণ্ডগোল করে না। পঞ্চাশটা বাক্স-বোমা রেডি, কিন্তু ফাটাবার স্কোপ পাচ্ছি না। গুরু, একটু স্কোপ করে দাও।'
ভিখু বলল, ‘তুই গাছে উঠে বোস। এবার আমি ফরওয়ার্ডে। গোল পাবি। জয় বাবা ভোলানাথ।’
ভিখু মাঠে নেমে গেল। খেলাও যথারীতি শুরু হল। মিনিট তিনেক পর দেখা গেল বিপক্ষ দল, যাদের ক্লাবের নাম ইয়ং স্টার, তারা কেমন যেন এলিয়ে পড়ছে। শট নিচ্ছে কিন্তু শটে জোর নেই। বেশি ছোটাছুটিও করতে পারছে না। ওদের আঁটোসাঁটো ডিফেন্স যেন, কেমন বিশৃঙ্খল, ঢিলেঢালা।
এইরকমভাবে আরও একটু খেলা চলার পর নিমাই মারফত বল গেল ভিখুর পায়ে। ভিখু এখন ফরওয়ার্ডে খেলছে। ভিখুর পায়ে বল পড়তেই গোটা মাঠ চিৎকার করে উঠল। ব্যাপারটা এমন, যেমন মারাদোনার পায়ে বল পড়েছে। ভিখু বল নিয়ে তিরবেগে ছুটছে। ভিখুকে দেখে শিবুজ্যাঠা চিৎকার করে উঠল, ‘ভিখু, চব্বিশটা লুচি আর এক কৌটো পুরো ক্রিম তোর জন্য বরাদ্দ।
ভিখু বক্সের মধ্যে ঢুকে গেল। দু’দিক থেকে দু’জন আসছে ভিখুকে আটকাবার জন্য। একজন ভিখুর এক হাত দূরত্বে এসে দু'হাতে পেট চেপে বসে পড়ল। অন্যজন ভিখুর সামনে। ভিখু তাকে কাটিয়ে গোলকিপারের মুখোমুখি। এমন গোলকিপার জীবনে কেউ কখনও দেখেনি। গোল বাঁচাবার জন্য ভিখুর পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াই তার উচিত ছিল। কিন্তু সে তা না করে গোল লাইনের ওপর ঝাঁপ দিয়ে শুয়ে পড়ল। ভিখুকে আর কষ্ট করতে হল না। সে এক পা এগিয়ে বলটা বুটের মাথায় করে গোলে ঢুকিয়ে দিল। ইয়ং স্টারের গোলকিপার তখনও শুয়ে।
গোটা মাঠ জুড়ে চিৎকার আর কানফাটানো পটকার আওয়াজ। এরই মধ্যে আবার খেলা শুরু হল। ইয়ং স্টারকে দেখে মনে হচ্ছে তাদের যেন দম নেই, গায়ে বল নেই, খেলবার আগ্রহও নেই। মিনিটদশেক পরে ভিখুর দেওয়া বল থেকে তীব্র শট করে নিমাই গোল করে দলকে জেতাল। খেলায় সমতা ফেরাল ভিখুর গোল। জয় আনল ভিখুর দেওয়া পাস থেকে নিমাই। মতির হাট স্পোর্টিং ক্লাব দুই-এক গোলে জিতে গেল। গোটাতিনেক খেলোয়াড় বদল করেও ইয়ং স্টার জিততে পারল না।
জামালচাচার দেওয়া মাংস আর গরম ভাত খেতে খেতে ভিখু বলল, 'আগেই তো বলেছিলাম, চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। দামু কি সাধ করে যেচে যেচে ওদের অত ঠান্ডা খাইয়েছে। বোতলগুলো আসল। ভেতরের জিনিসগুলো তো আমার তৈরি। এত পেট কামড়ালে আর পটি পটি ভাব হলে কেউ কি খেলতে পারে? সেকেন্ড হাফে ওরা তাই খেলতেই পারল না।
প্রফুল্ল ডাক্তারের বাড়িতে শখের বাগান করা দিয়ে ভিখুচরিত শুরু হয়। তখন তো ভিখু সবে সতেরো কি আঠারো। আমরা পিছু ফিরে দেখার মতো ভিখুর ছেলেবেলাটা একটু জেনে নিলাম। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার পর ভিখু হঠাৎ একটা চাকরি পেয়ে গেল। ভিখু বাবা-মা’কে জিজ্ঞেস করল, ‘কী করব?’
ভিখুর বাবা কিছু বলবার আগে ভিখুর মা বলে উঠলেন, ‘তুই কী করবি সেটা কি আমাদের বলে দিতে হবে বাবা? আমরাই তো তোকে জানিয়ে কাজ করি।'
ভিখুর বাবা বললেন, ‘চাকরির বাজার তো খুব খারাপ। এইরকম অবস্থায় একটা সরকারি চাকরির সুযোগ যখন এসেই গেল, তখন কি অবহেলা করা ঠিক হবে ভিখু?’
শিবুজ্যাঠা মতামত দিলেন, ‘লেখাপড়া করতে চাইলে সে তো চাকরি করেও করা যায়। নাইট কলেজে পড়তে পারিস।'
ভিখুর মা বললেন, ‘লেখাপড়া শেখে চাকরির জন্য আর বিদ্যে অর্জনের জন্য। চাকরি তো পেয়েই যাচ্ছে। আমার ভিখুর বিদ্যে কিছু কম নেই।'
এইসব আলোচনা যখন চলছে ভিখু তখন একটাও কথা বলেনি। নাইট কলেজে পড়াটা তার বেশ মনে ধরেছে। দিনের বেলা ক্লাস করার ব্যাপারটা সে জানে কিন্তু রাত্রে ক্লাস করার ব্যাপারটা সম্পর্কে তার কৌতূহল হচ্ছিল। কিছুদিনের মধ্যেই দিনে চাকরি আর রাত্রে কলেজ শুরু করে দিল ভিখু। মাসদুয়েকের মধ্যে ভিখু কলেজে এবং অফিসে তার মতির হাটের মতোই জনপ্রিয় হয়ে উঠল। অফিসে ভিখুর তেমন কোনও কাজ ছিল না। তাকে ব্যস্ত থাকতে হত সহকর্মীদের কাজে। কারও বাড়িভাড়া ঠিক করে দেওয়া, রেলের টিকিট কাটা, অফিসের পিকনিক হবে তার জায়গা খুঁজে বার করা, কাউকে হাসপাতালে ভরতি করতে হবে তার ব্যবস্থা, এমনকী হাসপাতালে রাত জাগতে হবে, এইসব কাজ নিয়ে ভিখু সদা ব্যস্ত। এই ধরনের সব কাজই ভিখু করত এবং করে আনন্দও পেত। ক্রমে ক্রমে মতির হাটের মতো ভিখুর সহকর্মীরাও ভিখু-নির্ভর হয়ে উঠল। বড় হওয়ার পর থেকে ভিখু আর আগের মতো চেটেপুটে ক্রিম বা কোল্ড ড্রিংকস খায় না। কিন্তু অন্য খাবার জিনিস যা, তা আগের থেকে একটু বেশিই খায়। সেটাই স্বাভাবিক। বয়সটা বাড়লে খিদেটাও বাড়বে।
ভিখুর জেঠিমা বিভাবতী একদিন ভিখুর মা’কে বললেন, ‘সুধা অনেককাল ভিখু আর গাইবান্দায় আমাদের বাড়িতে যায় না। ও কি একদম সময় পায় না?’
ভিখুর মা উত্তর দিলেন, ‘না গো দিদি। ভিখুর খুব সময়ের অভাব। কত রাত তো বাড়িই ফিরতে পারে না। রোগী পাহারা দিতে হাসপাতালে রাত জাগতে হয়। ওর তো দয়ার শরীর। কাউকে ফেরাতে পারে না।'
বিভাবতী একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, ‘ভিখুকে বারণ কর। এমন করলে ওর শরীর টিকবে না। না ঘুমিয়ে ক’দিন কাটাবে।'
ভিখুর মা’র মধ্যে কোনও উদ্বেগ নেই। তিনি একটুও বিচলিত না হয়ে বলেন, “যিনি কৃপা করে ওকে পাঠিয়েছেন, তিনিই ওকে রক্ষা করবেন। তুমি ভেবো না দিদি।
বিভাবতী আর কথা বাড়ান না। তিনি ভেবে পান না, কোন বিশ্বাসে তাঁর ছোট জা এতটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। ভিখু যদি অবতারই হয় তবু তো সে মানবদেহ ধারণ করেছে। সেই দেহের জ্বালাযন্ত্রণা আছে, ক্ষয়ক্ষতি আছে, বিনাশও আছে। অবতারের কি মৃত্যু হয় না? ঘুম পায় না?
বিভাবতী ভাবতে ভাবতে রিকশা করে বাড়ি চলে যান।
দিনদশেক পরে শিবুজ্যাঠার বুকে যন্ত্রণা এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হল। গাইবান্দাতে একটা ছোট হাসপাতাল আছে বটে, কিন্তু সেটা তেমন ভাল নয়। মতির হাটের সদর হাসপাতাল বেশ বড়। ভাল বলে সেই হাসপাতালের সুনামও আছে। ভিখুর নেতৃত্বে তার শিবুজ্যাঠা ভরতি হলেন মতির হাটের সদর হাসপাতালে। হাসপাতালে রাত্রে বাড়ির কাউকে থাকতে হবে। ভিখু থাকতে ওটা কোনও সমস্যা নয়। ভিখু তার জেঠিমাকে বলল, 'তুমি আমাদের বাড়িতে থেকো। হাসপাতালে আমি আর দামু থাকব। ওই হাসপাতালের সবাই আমার চেনা। তুমি কোনও চিন্তা কোরো না।'
বিভাবতী বললেন, ‘এপাড়ার লোক, ওপাড়ার লোক সবার জন্যই তো তুই হাসপাতালে রাত জাগিস। সকালে অফিস, রাত্রে কলেজ। তোর শরীরে সইবে না বাবা। আজকের রাতটা তুই বিশ্রাম কর। আজ না হয় মন্টু আর সোনা থাকুক।'
ভিখু বলল, ‘ওদের দিয়ে হবে না। আমি আর দামু থাকব। আমাদের কোনও অসুবিধে হবে না।
ভিখু আর দামু রাত আটটা নাগাদ হাসপাতালে এল। গেটের সামনে জনাকয়েক লোক। ভিখু আরও একটু অপেক্ষা করে তিনতলায় এল। দামু জিজ্ঞেস করল, ‘সব ঠিক আছে তো গুরু?'
ভিখু উত্তর দিল, ‘নো টেনশন। বিকেলে সব দেখে গেছি। জেঠু তিনতলার চার নম্বর কেবিনে আছেন। আমাদের কাছাকাছি থাকতে হবে।'
ভিখুকে কেউ আটকায় না। উলটে সবাই বলে, “ভিখু, আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।'
ভিখু হাত নেড়ে বলে, ‘হয়ে যাবে।'
তিনতলায় যেখানটায় নার্স আর ডাক্তাররা বসেন, ভিখু সোজা সেখানে এল। একজন বয়স্কা নার্স মাথা নিচু করে কী লিখছিলেন। ভিখু তাঁর সামনে গিয়ে বলল, ‘মায়াদি, এসে গেছি।'
মায়াদি চোখ তুলে ভিখুকে দেখে একটু হাসলেন। পরে বললেন, ‘কেবিন তো একটাও খালি নেই।'
ভিখু বলল, ‘জেনারেল আছে তো?’
মায়াদি বললেন, ‘ষোলো নম্বর খালি। দু'জনকে শেয়ার করতে হবে।'
ভিখু বলল, ‘নো ম্যাটার মায়াদি। জেঠুর খবর থাকলে ষোলো নম্বরে খোঁচা দেবেন।' মায়াদি চৈয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন, ‘চলো দেখিয়ে দিই।'
ভিখু বলল, ‘আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। এখানকার সব বেড আমার চেনা।' মায়াদি বললেন, ‘আমার গানের ব্যাপারটা কিন্তু...’
ভিখু বলল, ‘ওটা কোনও ব্যাপার নয়। হয়ে যাবে। এই মাসেই দুটো ফাংশন পাইয়ে দেব। তার আগে সুপার সাহেবের স্ত্রীয়ের ব্যাপারটা করতে হবে। রাতের ডাক্তার কে মায়াদি? চেনা ডাক্তার তো?’
মায়াদি বললেন, ‘তোমার অচেনা কেউ আছে নাকি? রাতে আছেন সুকুমার ঘোষ।' ভিখু বলল, “ঠিক আছে। আমি একবার জেঠুর কেবিনে উঁকি খাই।'
জেনারেল বেডগুলো হলঘরের মধ্যে দুই সারি করে পাশাপাশি পাতা। সেগুলো পেরিয়ে গেলেই কেবিন। ষোলো নম্বর বেডটা থেকে জেঠুর চার নম্বর কেবিনের কাচের দরজাটা দেখা যায়। ভিখু ষোলো নম্বর বেডের কাছে এসে বলল, ‘দামু উঠে পড়।' প্রথমে দামু উঠল তারপর ভিখু উঠে গলা পর্যন্ত চাদর টেনে শুয়ে পড়ল।
ভিখুদের বাড়িতে শুয়ে বিভাবতীর ঘুম আসছিল না। খালি এপাশ-ওপাশ করছেন। জল খাচ্ছেন, উঠে বসছেন, আবার শুয়ে পড়ছেন। এই অস্থিরতার মধ্যে যে একটু তন্দ্রা এল সেটা বিভাবতী বুঝতে পারলেন না। ওই তন্দ্রার মধ্যে স্বামীকে নিয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্ন ভাঙার পর কাঁদতে কাঁদতে বিছানা থেকে নেমে সুধার ঠাকুরঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন।
বউদির এই অবস্থা দেখে ভিখুর বাবা গোপালবাবু সাতসকালে বউদিকে নিয়ে হাসপাতালে চলে এলেন। এখন হাসপাতালের গেট দিয়ে দুধের গাড়ি, পাউরুটির ভ্যান ঢুকছে। বাধা দেওয়ার মতো তেমন কেউ ছিল না বলে তিনতলায় চলে এলেন। কোলাপসিবল গেটটা বন্ধ। কিন্তু তালা দেওয়া নয়। জেনারেল ওয়ার্ডের বেডগুলোতে রোগীরা ঘুমোচ্ছে। মায়াদি ওঁদের দেখে প্রশ্ন করলেন, ‘এত ভোরে আপনারা কী চান?’
গোপালবাবু বললেন, 'আমার দাদা, চার নম্বর কেবিনে আছেন। এই ফুলটা বউদি তাঁর মাথায় ঠেকাতে চান।'
মায়াদি বললেন, ‘ও, চার নম্বর কেবিন মানে ভিখুর জ্যাঠামশাই। উনি ভাল আছেন। ঘুমোচ্ছেন। যান, গিয়ে মাথায় ফুলটা ছুঁইয়ে আসুন। দেখবেন, ঘুম ভাঙাবেন না।'
স্বামীকে দেখে বিভাবতী মনে মনে আশ্বস্ত হলেন। ফিরে আসার সময় বিভাবতীর চোখটা গেল ষোলো নম্বর বেডের দিকে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে একহাতে ভিখুর বাবার হাতটা টেনে ধরে কম্পিত গলায় বললেন, ‘ঠাকুরপো, ওটা কে শুয়ে? ভিখুর মতো মনে হচ্ছে না?’
ভিখুর বাবা তাকালেন। নিজের ছেলের মুখ চিনতে তাঁর ভুল হওয়ার কথা নয়। দু’পা এগিয়ে গিয়ে দেখলেন। হ্যাঁ, ভিখুই বটে! পাশে আর একটা কে? বিভাবতী প্রায় কেঁদে ফেলার মতো করে বললেন, 'ভিখুর কী হয়েছে? ভিখু হাসপাতালের বেডে শুয়ে কেন?’
অবস্থা সামাল দিতে মায়াদি দু’জনকে বাইরের বারান্দায় নিয়ে এসে বললেন, ‘ভিখু হাসপাতালে রাত জাগলে ওকে আমরা যে কোনও একটা খালি বেডে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিই। আজ একটাই বেড খালি ছিল বলে ভিখু আর দামু দু’জনে শুয়েছে। ওদের একটু ঘুমোতে দিন।'
গোপালবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘যদি কোনও বেড খালি না থাকে তা হলে ভিখু কী করে?’
মায়াদি একটু হেসে বললেন, ‘সে ব্যবস্থাও ভিখুর জানা আছে। অপেক্ষাকৃত সুস্থ কোনও রোগীর কাছে গিয়ে বলে, দাদা একটু চেপে। নতুন পেশেন্ট এসেছে। এবার লোকটাকে একটু সরিয়ে ভিখু তার পাশে শুয়ে পড়ে।'
বিভাবতীর বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তিনি শুধু একবার আর্তদৃষ্টিতে ভিখুর বাবার দিকে তাকালেন। ভিখুর বাবা বললেন, ‘এসব কথা ভিখুর মা’কে না বলাই ভাল। ভিখুর কাছে যা স্বাভাবিক, আমাদের পক্ষে সেটা শোনাও কঠিন।'
শিবুজ্যাঠা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কয়েকদিন পর বিভাবতী হাসপাতালের ঘটনাটা তাঁর স্বামীকে বললেন। শিবুজ্যাঠা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘এও সম্ভব? ভিখু অবতার না দানব সেটা বুঝতে আমাদের তিনজন্ম কাবার হয়ে যাবে।'
শিবুজ্যাঠা সুস্থ হয়ে দিব্যি ভাল আছেন এই আনন্দে বিভাবতী ভিখুর বাবা-মা, ভিখু আর দামুকে বাড়িতে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করলেন। ভিখুর অনুরোধে হাসপাতালের সুপার নন্দবাবু আর মায়াদিকে বলা হল। সেদিন আবার ভিখুদের অফিসের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। অতএব, ভিখু আসবে একটু পরে। ভিখু বলে গেছে, ‘আমি এবার দুটো আইটেমে নাম দিয়েছি। দড়ি-টানাটানি আর চোখ বেঁধে হাঁড়ি ফাটানো।'
শিবুজ্যাঠা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ওই লোহার বল ছোড়াতে নাম দিসনি?’
ভিখু উত্তর দিয়েছিল, ‘দুর। লোহার বল নয়, ক্রিকেট বল ছুড়তে হয়। দু’বার বল গেল হারিয়ে, তৃতীয়বার বল মাঠের বাইরে দাঁড়ানো একটা পুলিশ জিপগাড়ির সামনের কাচে লেগে কাচ ফুটিফাটা। পুলিশ কেস হয়ে যাচ্ছিল। তাই ওটাতে আর নাম দিইনি। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব।'
ভিখু ছাড়া সবাই যখন উপস্থিত তখন ভিখু ছাড়া আর কাকে নিয়েই বা আলোচনা হবে! ভিখুর নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে করতে শিবুজ্যাঠা বললেন, ‘হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকার ব্যাপারটা ভারী অদ্ভুত।'
সুপারসাহেব বললেন, ‘ভিখু নিজেই তো অদ্ভুত। ওকে যত দেখি তত অবাক হই। এই মায়া দেবী ভিখুর হাসপাতাল বাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন।'
সবাই যখন মায়া দেবীর দিকে তাকালেন তখন মায়া দেবী, অর্থাৎ ভিখুর মায়াদি বললেন, ‘ভিখু আমার কাছে অতিমানব। আপনারা কেউ জানেন না, রক্তের প্রয়োজনে ভিখু কতবার কত গরিব পেশেন্টকে নিজে রক্ত দিয়েছে। নিজে যেমন দিয়েছে তেমনই রক্ত জোগাড়ও করে দিয়েছে অনেক। একদিন ওর হাতটা আমার মাথায় রেখে ওকে বলেছিলাম, আমি তোমার দিদি। ঢের হয়েছে, এবার আমার মাথায় রেখে প্রতিজ্ঞা করো আর রক্ত দেবে না। ভিখু এখন পর্যন্ত কথা রেখেছে। ও যে বেডে শোয়, সে নিয়ে কম ঘটনা ঘটেছে! একবার এক রোগীকে তো চেপে ঘুমোতে বলে নিজে শুয়ে পড়ল। বেড নম্বর ছিল দোতলার পাঁচ। ভিখু তো ঘুমিয়েই আছে। আসল রোগী সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গেছে। বাথরুমে গেছে তো গেছেই, ফেরে আর না। ইতিমধ্যে মর্নিং রাউন্ডে ডাক্তার মুখার্জি এসেছেন। বুড়ো মানুষ। পাঁচ নম্বর বেডে তখন ভিখু একা শুয়ে। ডাক্তার মুখার্জি নাড়ি দেখতে দেখতে বললেন, ‘কী ব্যাপার মায়া? রোগীর চেহারা বদলে গেল কেমন করে? কাল কী কী ওষুধ দিয়েছ আমায় দেখাও তো।’ অনেক কষ্টে ব্যাপারটা সামাল দিতে হয়েছে।'
এবার সুপার বললেন, ‘নিজের বিপদও ডেকে এনেছে। চণ্ডীতলার পরেশ হাজরা খুব অসুস্থ হয়ে আমাদের হাসপাতালে ভরতি হলেন। যমে-মানুষে টানাটানি করে রাত তিনটে নাগাদ রোগটাকে কাবু করা গেল। ভিখুর তখন ষোলো-সতেরো বছর বয়স। আমি তখনও সুপার হইনি। রাত আটটা থেকে ভিখু তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে। আমি বললাম, ‘সিচুয়েশন আন্ডার কন্ট্রোল। ভিখু তুমি এবার বিশ্রাম করো।’ ভিখু বলল, ‘দেখি কোথায় বেড পাই।' ভিখু কোনও খালি বেড না পেয়ে পরদা-ঘেরা একটা বেড়ে গিয়ে দেখল সারা মুখ ঢেকে একজন শুয়ে আছে। ভিখু তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘দাদা, কেটে শোন তো। নতুন পেশেন্ট এসেছে।’ বার দুই ধাক্কা দিয়ে দেখল লোকটা নড়ে না। ভিখু তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে পাশে শুয়ে পড়ে বলতে লাগল, ‘যাক, লোকটা নাক ডাকে না।’ আসলে ওই পেশেন্টটি রাত আড়াইটেতে মারা গেছে। ভোরে পুলিশ মারফত খবর পাঠানো হবে। ভিখু বাকি রাতটুকু তার সঙ্গে শুয়ে কাটিয়ে দিল। সকালে ওয়ার্ড বয় গিয়ে দেখে, ভিখু চোখ খুলে শুয়ে আছে। সে তো একলাফে আমার ঘরে এসে বলল, 'স্যর, মুর্দা জিন্দা হো গয়া।’ আমি বললাম, ‘সে কী ! এখনই তার ডেথ সার্টিফিকেট লিখব। তুমি গাঁজা খাও নাকি?’ ওয়ার্ডবয় বলল, ‘বিশ্বাস না হয় তো স্যর আপনি আসিয়ে দেখুন। মুর্দা জিন্দা হো গয়া, থোড়া থোড়া হাসতা হ্যায়।' আমি গিয়ে দেখি, ভিখু। ভিখুর কোনও তাপ-উত্তাপ নেই। সে কী বলল জানেন?’
সকলে চুপ৷ শুধু বিভাবতী বললেন, ‘কী বলল?’
ভিখু বলল, ‘কেউ মরে গেলে তাকে ছুঁয়ে থাকতে হয়। ভাল হল। ওঁকে জড়িয়েই তো শুয়ে ছিলাম। উনি তো আমার স্বজন।’ ভিখু সকালে বাড়ি ফেরেনি। হাসপাতাল থেকে বডি বার করা, গাড়ির জোগাড়, বডি নিয়ে যাওয়া এবং দাহকার্য শেষ হওয়া পর্যন্ত ভিখু ছিল ওদের সঙ্গে সঙ্গে। একেবারে নিকট আত্মীয়ের মতো।'
সেদিন অনেকক্ষণ পর্যন্ত সবাই ভিখুর জন্য অপেক্ষা করল। কিন্তু ভিখু এল না। মতির হাটের বাড়িতেও ভিখু ফেরেনি। রাত যত বাড়তে লাগল, চিন্তাও তত বাড়তে লাগল। ভিখু যাই করুক, যেখানেই যাক, বাড়িতে খবর দিতে ভোলে না। অফিসে যোগাযোগ করে মতির হাটের লোকেরা জানল, অফিসের স্পোর্টস শেষ হওয়ার পর দলে দলে ভাগ হয়ে সকলে যখন নিজের বাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছিল তখন একটা লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে উঠে যায়। আর ওখানেই বসে ঘুড়িতে সুতোর কল পরাচ্ছিল বারো বছরের এক ভিখারি বালক। ভিখু দুরন্ত এক লাফে লরির ওপর উঠে লোকটাকে নামিয়ে এনে মারতে থাকে। তারপরেই রক্তাক্ত ছেলেটাকে কোলে তুলে নিয়ে বলে, ‘বেঁচে আছে। একটা গাড়ি ডাক’
খুঁজে পেতে গাড়ি আনা হয়। হাসপাতালে পৌঁছবার ঘণ্টাখানেক পর ছেলেটা মারা যায়। লরিওলা ছেলেটার বাবার হাতে কিছু টাকা দেয়। তারপর সব কেমন স্থির আর স্বাভাবিক হয়ে যায়। ভিখু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখে। তার মুখ মলিন হয়ে যায়। প্রবল অভিমানের গলায় বলে, ‘আমি একটা ফালতু। আমি কিছু জানি না, কিচ্ছু পারি না। হাতে করে বুকে জাপটে যাকে নিয়ে এলাম তাকে বাঁচাতে পারলাম না। আজ পর্যন্ত হাসপাতালে যতজনকে এনেছি আমি সবাইকে বাড়ি নিয়ে গেছি। তাই মনে হচ্ছে আমি স্রেফ একটা ফালতু। বাবাটা টাকা নিয়ে খুশি। মানুষ, পৃথিবী, সম্পর্ক কেমন বদলে গেছে।'
এরপর ভিখু হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যায়। অফিসের যে বন্ধুরা সঙ্গে ছিল তারা জিজ্ঞেস করে, “ভিখু, বাড়ি যাচ্ছ তো?’ ভিখু একটু দাঁড়ায়। কিন্তু কোনও কথা বলে না। ভিখু চলে যায়। এরপর অফিসের বন্ধুরা আর কিছু জানে না।
আজ তিন বছর হয়ে গেল ভিখু ফিরে আসেনি। গাইবান্দা এবং মতির হাটের কেউ আর বিশ্বাস করে না যে, ভিখু ফিরে আসবে একমাত্র ভিখুর মা ছাড়া। তাঁর বিশ্বাস, ভিখু হারিয়ে যেতে পারে না। ভিখুর গাছে জল দেন, ফুল ফোটে আর তাঁর মনে হয় ভিখু আসছে। সন্ধ্যায় ম্লান থেকে ম্লানতর হয়ে ফুলগুলো ঝরে পড়ে। ভিখুর মা বিষণ্ন মনে ঘরে আসেন। আবার সকালে ফুল ফুটলে তাঁর মনে হয়, আজ ভিখু আসবে।
কিন্তু ভিখু আসে না। বিরল প্রজাতির মতো ভিখুর মতো মানুষরা আজকের দিনে যে হারিয়েই যায়, এই সহজ সত্যটা ভিখুর মা বুঝতে চান না।
.
আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪০৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন