বড়বাড়ির কৃষ্ণপক্ষ

দুলেন্দ্র ভৌমিক

মোষপোতা গ্রামের কথা বলতে হলে সেই গ্রামের বিশেষ দ্রষ্টব্য বড়বাড়ির কথা বলতে হয়। এখন শহরে এবং গ্রামে দেদার বড় বড় বাড়ি তৈরি হয়েছে। সে তুলনায় মোষপোতা গ্রামের বড়বাড়ি খুব যে একটা বড় তা নয়। ঢাউস দোতলা বাড়িটার উপর-নীচ মিলে বিশখানা ঘর। একসময় যাঁরা এই বাড়িতে থাকতেন, তাঁরা সবাই পরস্পরের আত্মীয় বা জ্ঞাতিসম্পর্কে ঘনিষ্ঠ। ব্রজনাথ চৌধুরী এই গ্রামের জমিদার ছিলেন না বটে, কিন্তু বিষয়সম্পত্তি, জমিজমায় তিনিও কিছু কম যেতেন না। হাতিমারার দিকে তাঁর বিস্তর জমি, ধানকল আর কলকাতার কাছাকাছি পানিহাটিতে ছিল কাচকল। পয়সার কিছু কমতি ছিল না। গ্রামের জমিদার বলরাম মুখুজ্জে নিজেও ব্রজনাথকে সমীহ করে চলতেন।

এইসব বেতান্ত অনেকদিন আগের। এখনকার অবস্থা অন্যরকম। ব্রজনাথ চৌধুরী আর বলরাম মুখুজ্জে অনেকদিন আগেই মারা গিয়েছেন। বড়বাড়ির সব আত্মীয় আর একসঙ্গে বড়বাড়িতে থাকেন না। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে চলে গিয়েছেন দিল্লি, কেউ মুম্বই আর দু’–একজন পাড়ি দিয়েছেন বিদেশে। তাঁদের ঘরগুলো তাঁরা ফাঁকা রাখেননি। ভাড়াটে বসিয়ে গিয়েছেন। এখন এই বাড়িটার এমন অবস্থা যে, কেউই কারও খোঁজ রাখেন না। এই বাড়িতে সম্প্রতি নতুন ভাড়াটে এসেছেন। মোটে চারজন লোক। চারজন না বলে সাড়ে তিনজন বলাই ভাল। স্বামী, স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা আর দশ বছরের একজন নাতি। এই বড়বাড়ির পুরনো লোক বলতে এখনও যিনি বেঁচেবর্তে আছেন, তিনি হলেন আদিনাথ চৌধুরী। সম্পর্কে ব্রজনাথের নাতি। নতুন ভাড়াটে এলেই তিনি পুরনো দিনের নানা গল্প করেন। কোনওটা তাঁর শোনা, কোনওটা তাঁর দেখা। কিন্তু গল্প বলার সময় সেকথা তাঁর মনে থাকে না। তখন সবই যেন প্রত্যক্ষদর্শীর মতো করে বলেন।

নতুন ভাড়াটের মধ্যে যিনি বৃদ্ধ ভদ্রলোক, তিনি বললেন, ‘জানেন, চাকরিজীবনে পোস্টমাস্টারমশাই ছিলুম। বদলির চাকরি তো, তাই অনেক জায়গায় ঘুরেছি। কত বিচিত্র বিচিত্র সব গ্রামের নাম। বাছুরডোবা পর্যন্ত জানি। এ যে দেখছি মোষপোতা। নামের ব্যাখ্যাটা কী?’

আদিনাথবাবু বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘পৃথিবীতে সব ঘটনার ব্যাখ্যা হয় না। ভগবানও করতে পারবেন না। আপনার নাম তো নবীন হালদার। এখন তো আপনার ঘাটে যাওয়ার সময়। এখনও নবীন হয়ে আছেন!’

নবীন হালদার মনে মনে কুপিত হলেন। বিরক্ত গলায় বললেন, ‘পিতৃদত্ত নাম কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলানো যায়? আমার এক ভায়রার নাম কিশলয় চক্রবর্তী। আশি বছরেও দিব্যি চলেন-ফিরে বেড়াচ্ছে। বয়স হয়ে গিয়েছে বলে কি কিশলয় নাম পালটে মহীরুহ নাম রাখবে?’

আদিনাথবাবু উত্তেজিত হলেন না। শান্তভাবেই বললেন, ‘মায়ের পেটের ভাইদের নাম মিলিয়ে, ম্যাচ করে রাখার রেওয়াজ আছে। ভায়রাদের ব্যাপারটা নতুন শুনলাম। একজন কিশলয় আর একজন নবীন। চমৎকার বলতে হবে।'

নবীন হালদার একবার খরদৃষ্টিতে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলেন। আদিনাথবাবু বলতে লাগলেন, ‘ওই যে পুব দিকে চওড়া রাস্তা দেখছেন, ওর একটা দিক গিয়েছে যশোহর রোডের দিকে, আর অন্যটা ঘুরেফিরে কলকাতায়। এক-দেড়শো বছর আগে কি এইরকম ছিল? দু’পাশে ধানখেত, জঙ্গল আর তারই মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়েছে নদী। ওই নদীতে নৌকো চলত। পাট, গুড় আর মাটির বাসনপত্র নিয়ে সেই নৌকো যেত পণ্যহাটির বাজারে বা হাটে। যেমন আজকে কলকাতার ক্রিক রো-কে দেখে কি বোঝা যায়, ওটা মস্ত বড় একটা খাল ছিল? গঙ্গা থেকে বেরিয়ে পুবে অনেক দূর, সেই ইছামতী নাকি সোঁদরবন পর্যন্ত যেত। একবার ঝড়ে একখানা নৌকো উলটে পড়েছিল ওই খালে। ঠিক তেমনই আমাদের গাঁয়ের পাশ দিয়েও একখানা খাল গিয়েছে। ওই খালের পারে ছিল মোষের খাটাল। অনেক মোষ। একবার যে কী হল কে জানে, মোষের মড়ক লাগল। দিনে দুটো করে মোষ মরতে লাগল। তখন তো এদিকে কোনও পশুচিকিৎসক ছিল না। দু’ক্রোশ দূরে হাকিমপাড়া। যদিও একটা হাকিমও সে পাড়ায় থাকে না। তবু নামটা ওইরকমই রয়ে গিয়েছে। হয়তো অতীতে ছিল। ওখানে একজন ডাক্তার ছিলেন। তাঁকে সবাই বলত, ঘোড়ার ডাক্তার। পরনে হাফ প্যান্ট, গায়ে হাফ শার্ট, গলায় স্টেথোস্কোপ ঝোলানো, নাকের নীচে কুকুরের লেজের মতো মোটা গোঁফ এবং মাথায় হ্যাট। ঠিক যেন ওভারশিয়রের মতো। তিনি ঘোড়ায় চড়ে রোগী দেখতে আসতেন। অবশেষে তাঁকে খবর দেওয়া হল। মোষের রোগ সারাতে হবে শুনে সেই ডাক্তারবাবু তো রেগে আগুন। তিনি বললেন, ‘আমি ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করি বলে কি আমি জন্তু-জানোয়ারের ডাক্তার। যিনি মোটরগাড়িতে চড়েন তিনি কি মোটর মেকানিক?’

ডাক্তারবাবু এতই উত্তেজিত হয়েছিলেন যে, যাঁরা মোষের রোগ সারাবার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের দিয়ে নিজের ঘোড়ার জন্য ঘাস কাটিয়ে তবে ছেড়েছিলেন! সেই মোষের মড়কের সময় অনেক মোষকে এই গ্রামেই পোঁতা হয়েছিল বলে সেই থেকে জায়গাটার নাম মোষপোতা।’

এতক্ষণ একমনে গল্পটা শুনছিলেন নবীনবাবুর পরিবার। এবার নবীনবাবুর ছেলে কৃষ্ণপদ জিজ্ঞেস করল, ‘মোষগুলো কোথায় পোঁতা হয়েছিল?’

আদিনাথবাবু পকেট থেকে ছোট্ট একটা কৌটো বের করে মুখে এক টুকরো হরীতকী ফেলে দিয়ে বললেন, ‘অত মোষ তো এক জায়গায় সমাধি দেওয়া যায় না। তাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে হয়েছে। আমাদের এই বাড়ির নীচেই পেল্লাই আকারের চারটে মোষকে পোঁতা হয়েছে।'

কৃষ্ণপদ’র বউ আঁতকে উঠে বলল, ‘এই বাড়ির নীচে মোষ পোঁতা আছে?'

আদিনাথবাবু মিষ্টি হেসে বললেন, ‘ছিল। আজ কি আর তার কোনও অস্তিত্ব আছে! আসলে এই জায়গাটা ছিল এই গ্রামের ভাগাড়।'

কৃষ্ণপদ এবং তার বাবা দু’জনেই বলে উঠলেন, ‘ভাগাড়?’

আদিনাথবাবু বললেন, ‘এতে চমকাবার কী আছে? যখন বড় রাস্তা করার প্ল্যান চলছিল, তখনই ভাগাড়টা এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা হল। আমার ঠাকুরদা মওকা বুঝে, একেবারে জলের দামে ভাগাড়ের জমিটা কিনে নিলেন। কেউ তো ওই জমি কিনতে চাইছিল না। ব্যস। তারপর থেকে চলছে।'

কৃষ্ণপদর বউ বলল, ‘অত মোষ না পুষে পুড়িয়ে দিলেই তো হত।'

আদিনাথ বললেন, ‘তা হয়তো হত। কিন্তু মানুষের মতো মোষের তো কোনও জাত-পাত নেই। সে হিন্দু কিনা সেটাই তো বোঝা যায় না। পশু সমাধিস্থ করা নিয়ম, তাই করে দেওয়া হল।'

নবীনবাবুসহ তাঁর পরিবারের সবাই একটু চুপ করে রইলেন। আদিনাথবাবু যখন উঠতে যাচ্ছেন, তখন কৃষ্ণপদ বলল, ‘এই বাড়ির বাসিন্দা এবং অন্য দু’-চারজন ভাড়াটিয়া যাঁরা আছেন, তাঁরা কেমন লোক?’

আদিনাথবাবু উত্তর দিলেন, ‘লোক সবাই ভাল। তবুও সাবধানে থাকবেন। কারণ, সাবধানের মার নেই। অতীতকালের বড়লোক শরিকদের বাড়ি। পুলিশও এঁদের সমীহ করত। যে ঘর দু’টিতে আপনারা ভাড়া এলেন, এই ঘরেই দু’-দুটো গুপ্তহত্যা হয়েছে। ঘরের মধ্যেই কোথাও পুঁতে রাখা হয়েছিল। তবে ওঁরা কোনও ভাড়াটিয়াকে উৎপাত করেছে, তেমন রেকর্ড নেই। তা ছাড়া, সবাই যে যার নিজের কাজ নিয়ে আছে।'

কৃষ্ণপদ’র বউয়ের নাম রেণু। রেণু একটা বড় ঢোক গিলে বলল, ‘পাড়াটা কেমন?'

আদিনাথবাবু উত্তর দিলেন, ‘এই পাড়াটা তো দেশের বাইরে নয়। অন্যত্র যা হয়, হয়ে থাকে, এখানেও তাই হয় এবং হয়ে থাকে। দেদার মশার উৎপাত আছে, লোডশেডিং আছে, আর ওটি থাকলে পাম্প চলবে না, ফলে মাঝে মাঝে জলের কষ্ট আছে। পাড়ায় ছিঁচকে চোর আছে, পেশাদার ডাকাত আছে, গ্রামরক্ষীবাহিনী আছে, চাঁদার জুলুম আছে। একখানা উন্নত গ্রামে যা যা থাকা দরকার তা সবই আছে। তবে চিন্তা করবেন না। আস্তে আস্তে সবই সয়ে যাবে।'

আদিনাথবাবু চলে যাওয়ার পর নবীন হালদার তাঁর ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এসব কী শুনছি রে কেষ্ট?’ কৃষ্ণপদ বলল, ‘সব জায়গাতেই একইরকম। এত বড় বাড়িতে এত লোক এক সঙ্গে আছি। আশা করি, তেমন কিছু হবে না।'

রেণু আঁচল দিয়ে থুতনির উপর থেকে ঘামটা মুছে নিয়ে বলল, ‘কিন্তু এই বাড়ির নীচে মোষ আর মানুষ দুই-ই পোঁতা আছে। মানুষ দুটো আবার এই ঘরে! তা ছাড়া জায়গাটা ছিল ভাগাড়। আমার কিন্তু বাপু খুব ভয় করছে।'

কৃষ্ণপদর ছেলের নাম শুভ। শুভ বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, মানুষের মতো মোষও কি ভূত হয়?’

কৃষ্ণপদ জবাব দেওয়ার আগে তার বাবা নবীন বললেন, ‘হয়ে থাকলেও এতদিন পর্যন্ত কি আছে! ভূতদেরও তো আয়ু বলে একটা ব্যাপার আছে। তা না থাকলে, রাজ্যটা তো ভূতুড়ে হয়ে যেত!’

কৃষ্ণপদ মনে মনে বাবার উপর একটু অসন্তুষ্ট হলেও মুখে বলল, ‘বাবা, তুমি কি ভূতেদের আয়ুরেখা দেখেছ নাকি কোষ্ঠীবিচার করেছ। কাগজে পড়োনি, ইংল্যান্ডে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট খেলোয়াড়রা চেস্টার-লে-স্ট্রিটের লুমলে ক্যাসল হোটেলে ভূত দেখেছেন। চতুর্দশ শতকে এই দুর্গের মহিলা মালিক লিলি লুমলেকে দু’জন যাজক দুর্গের কুয়োর মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হত্যা করে। অতদিন আগের ভূত যদি এখনও লুমলে ক্যাসলে ঘুরে বেড়ায়, তবে এই বাড়ির মধ্যে ভূত ঘুরে বেড়ানো কিছুমাত্র অসম্ভব নয়।'

শুভ এই সব কথায় একটু একটু ভয় পেলেও ভূত দেখতে তার বেজায় আগ্রহ। চিড়িয়াখানায় যেমন বহু জন্তু-জানোয়ার থাকে আর মানুষরা টিকিট কেটে গিয়ে তাদের দেখে আসে, শহরে যদি তেমনই একটা ‘ভূতখানা’ থাকত, তবে টিকিট কেটে বাবার সঙ্গে গিয়ে সেও অনেকরকম ভূত দেখে আসতে পারত।

কৃষ্ণপদ বলল, ‘রেণু, আজ যতটা পার গোছগাছ করে নাও। বাকিটা কাল হবে। বাড়ি বদলানো আর নতুন জায়গায় এসে গোছগাছ করে বসা, সে এক বিশাল হ্যাপা।’

কৃষ্ণপদর মুখের কথা শেষ হতে না হতেই ঘরে এল বেঁটেমতো একটা ছোকরা। এসেই বলল, ‘পেন্নাম। আদিনাথবাবু পাঠালেন। তিনি বল লন...'

রেণু জিজ্ঞেস করল, ‘কী বললেন?’

ছেলেটা বলল, ‘আমার নাম কালাচাঁদ। সবাই ‘কেলো’ বলেই ডাকে। চাঁদকে আর টানাটানি করে না। তিনি বললেন...’

রেণু এবার অধৈর্য গলায় বলল, ‘কী বললেন?

কালাচাঁদ উত্তর দিল, ‘উনি বললেন, 'আজকের রাতটা একটু সাবধান থাকবেন। দরজায় কেউ টোকা দিলে অথবা ধাক্কা দিলে দরজা খুলবেন না। চুপ করে বসে থাকবেন।'

রেণুর গলা শুকিয়ে গেল। সে তার স্বামী কৃষ্ণপদর দিকে তাকাল। কৃষ্ণপদর বাবা নবীনবাবু ছেলের দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁরে কেষ্ট, এসব কী শুনছি?’

কৃষ্ণপদ তার ছেলে শুভকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘ব্যাপারটা তো কিছুই বুঝতে পারছি না।'

তারপর কালাচাঁদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘দরজায় কে ধাক্কা দেবে? সে কী চায়?’ কালাচাঁদ বিজ্ঞের মতো দু’কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘সেকথা কেউ জানে না। কেউ বলতে পারে না। তবে অনেকরকম বিচিত্র ঘটনা এই বাড়িতে ঘটে। আপনারা তো আজ ভাড়া এলেন, কিন্তু পরশুদিন যাঁরা ভাড়া এসেছেন, গত রাতে তাঁদের যে অভিজ্ঞতা হল, সেটা বড় করুণ।'

নবীন হালদারের মুখ পাংশু হয়ে গিয়েছে। তিনি বললেন, ‘গত রাতে কী ঘটেছিল?’

কালাচাঁদ দরজার দিকে সরে যেতে যেতে বলল, ‘সেকথা বলবার সাহস নেই। পারলে ওই কোণের ঘরে গিয়ে জেনে আসুন। ওটা আদিনাথবাবু, মানে আমার মনিবের অংশ।'

কালাচাঁদ এই পর্যন্ত বলে এবং সারা ঘরে ভয় ছড়িয়ে দিয়ে চলে গেল। কালাচাঁদ চলে যেতেই নবীনবাবু বললেন, ‘ওরে কেষ্টা, আমি একলা ঘরে থাকব না। পাশের ঘরটা আজকের রাতের মতো ফাঁকা থাক। আমরা খাটের উপর আর নীচে করে এই ঘরেই থেকে যাব।'

সবাই যখন কপালে ভাঁজ ফেলে ভাবছে, তখন শুভ বলল, ‘বাবা, চলো না, একবার কোণের ঘরে গিয়ে সব জেনে আসি।'

শুভর কথাটা কৃষ্ণপদর মনে ধরল। সে বসে বসে ভাবতে লাগল। রেণু বলল, ‘যেতে হলে দিনে দিনে যাও। সন্ধের পর বেরোতে দেব না। বাড়ি তো নয়, যেন গোলকধাঁধা।'

কৃষ্ণপদ গেঞ্জি পরেছিল। এবার তার উপর একটা হাওয়াই শার্ট গলিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। বাবাকে যেতে দেখে শুভ বলল, 'বাবা, আমিও যাব।'

বাড়িটা বাইরে থেকে দেখে যতই সাদামাঠা মনে হয়, ভিতরটা মোটেও তা নয়। যেন এক বিচিত্র ভুলভুলাইয়া। করিডোর, তার বাঁক, সবক'টা ঘরের বাইরের রং, দরজার রং সব একরকম। অতএব, কালাচাঁদ-কথিত কোণের ঘরটা চট করে খুঁজে পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত ওই কালাচাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে কালাচাঁদই দেখিয়ে দিল। কৃষ্ণপদ একটু ইতস্তত করে দরজায় টোকা দিল। যেহেতু রাতে দরজায় টোকা পড়লে দরজা খোলা নিষেধ। কিন্তু দিনে নিশ্চয়ই সেই নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই দূরজায় টোকা দিয়ে কৃষ্ণপদ অপেক্ষা করতে লাগল। দরজা খুলছে না দেখে আবার টোকা দিতে যাওয়ার আগেই বারান্দার বাঁ দিক থেকে এগিয়ে এসে একটি মেয়ে প্রশ্ন করল, ‘কাকে চাই?’

মেয়েটির পরনে আকাশি রঙের জিনসের প্যান্ট এবং একটা গেঞ্জির উপর বুককাটা গোলাপি শার্ট। মাথার চুল খুব বেশি নয়। সেটা পনিটেলের মতো করে বাঁধা। মেয়েটি বেশ লম্বা। পাঁচ ফুট ছ’ কি সাত ইঞ্চি হবে। মেয়েটি দেখতে ভাল, তবে মুখে লাবণ্য কম। কৃষ্ণপদ মেয়েটির দিকে দেখতে দেখতে বলল, ‘এই ঘরে কেউ নেই?

মেয়েটি উত্তর দিল, ‘এই ঘরে আমরা থাকি। আমি আর আমার মা।'

কৃষ্ণপদ নিজের পরিচয় দিয়ে, আসার উদ্দেশ্যটা বলল। মেয়েটি কৃষ্ণপদকে দেখতে দেখতে বলল, ‘এবার ঘরের ভিতর আসুন।'

যে দরজায় কৃষ্ণপদ টোকা দিয়েছিল, সেই দরজা দিয়ে নয়। বাঁ দিকে করিডোর দিয়ে কয়েক পা গিয়েই আর-একটা দরজা। মেয়েটি সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, পর পর তিনটে টোকা দেওয়ার পরই দরজাটা খুলে গেল। খুলে দিলেন এক প্রৌঢ়া মহিলা। মেয়েটি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘এঁরা আজ সকালেই ভাড়া এসেছেন। আদিনাথবাবুর ভাড়াটে। গত রাতে আমাদের ঘরে কী ঘটেছিল, সেটা জানতে এসেছেন।'

প্রৌঢ়া মহিলা এখনও দিব্যি সুন্দরী। তিনি বললেন, ‘আমি তো বাপু ভয়ে মরি। ভাগ্যিস রিঙ্কু ছিল। ওর বুদ্ধি আর সাহসে আমরা রক্ষা পেলাম।'

মেয়েটি এবার বলল, ‘আমার ডাকনাম রিঙ্কু। ভাল নাম সুনেত্রা সেন। যারা টোকা দিয়ে দরজা খুলিয়েছিল, তারা এসেছিল লোডশেডিংয়ের সময়। তখন আমার পাশের ঘরে এক ভদ্রলোক তবলাচর্চা করছিলেন। পোশাক ছিল কালো। মুখেও বোধহয় কোনও রংটং ছিল। ওদের উদ্দেশ্যটা কী, সেটা বুঝতে পারিনি। কিন্তু ওরা জানত না, আমাদের ঘরে এমারজেন্সি লাইট ছিল। আমি চট করে তার বোতামটা টিপে দিতেই ওরা পালিয়ে গেল। ওরা যাওয়ার পর ঘড়িতে দেখেছি রাত দেড়টা।'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘আমার ঘরে একটা টর্চ আছে। আমি তো খুবই বিপন্ন বোধ করছি।'

রিঙ্কু কৃষ্ণপদকে অভয় দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, 'আমার মনে হয়, ওই লোকগুলো বাইরে থেকে আসেনি। ওরা এই বাড়ির ভিতরের লোক। তা ছাড়া রাত দেড়টা নাগাদ তবলাচর্চা বিষয়টা আমি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করি না।'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘থানায় জানিয়েছেন?’

রিঙ্কু উত্তর দিল, ‘নিজে যাইনি। একটা ইনফরমেশন পাঠিয়েছি। মনে হয়, আমি একাই মোকাবিলা করতে পারব।'

কৃষ্ণপদ একগলা বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘আপনি?

রিঙ্কু হাসল। বলল, ‘কেন? ২৪ বছরের একজন মেয়ে বলে আমার উপর ভরসা করতে পারছেন না? আমরা কিন্তু অবলা নই, দুর্বলও নই। আমি ক্যারাটে জানি। তা ছাড়া...’ কৃষ্ণপদ অবাক গলায় বলল, ‘তা ছাড়া?’

রিঙ্কু একটু হেসে বলল, ‘না থাক। ওটা আপাতত নাই বা জানলেন।'

কৃষ্ণপদ ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে চলে গেল। তার চিন্তাটা কমল না, বরং বেড়েই গেল। মনে হল, সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। অন্য বাড়ির খোঁজ করাটা জরুরি। দরকার হলে বাড়ির দালাল ধরতে হবে। তাই বলি, বড় বড় দু’কামরার ঘর, আলাদা বাথরুম, দক্ষিণ খোলা ঘর এত সস্তা ভাড়ায় কেমন করে দেয়?

কৃষ্ণপদ মনে মনে রিঙ্কুর কথা ভাবল। মেয়েটার সাহস আছে বটে। প্রৌঢ়া মা’কে নিয়ে দিব্যি আছে। ওরকম একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কোনও ভয়ডর নেই। বলে কিনা, একাই মোকাবিলা করতে পারবে! ক্যারাটে জানে! যতই ক্যারাটে জানা থাকুক, পিস্তল থেকে শাঁ করে যদি একটা গুলি ছোড়ে তা হলেই ক্যারাটে শেষ!

নিজের ঘরে আসার পর কৃষ্ণপদর হঠাৎ মনে হল, এই যা, যে জন্য যাওয়া সেই ঘটনাটাই তো পুরোপুরি জানা হল না। কালো পোশাকের কয়েকজন লোক। রিঙ্কু বলেছে ‘ওরা’। ‘ওরা’ মানে একের অধিক। ঘরের এমারজেন্সি লাইটটা জ্বেলে দিতেই ‘ওরা’ চটপট পালিয়ে যায়। এইটুকু তথ্য থেকে কিছু বোঝা যায় না। ওই লোকগুলোকে ছিঁচকে চোর বলেও তো মনে হচ্ছে না। নিজের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কৃষ্ণপদর মনে হল, মাত্র এইটুকু তথ্য শুনলে রেণু এবং তার বাবা কেউই খুশি হবে না। সবাই চমকপ্রদ কিছু আশা করে। যতটুকু ঘটনা রিঙ্কু, বলল, তাতে কোনওরকম চমৎকারিত্ব নেই। কৃষ্ণপদর মুখে রিঙ্কুকথিত ঘটনাগুলো শোনার পর বাবা এবং বউয়ের মুখ দেখে কৃষ্ণপদ বুঝল, এরা দু'জনেই আরও কিছু শোনার অপেক্ষায় ছিল। এইরকম সময় শুভ হঠাৎ করে বলে উঠল, ‘বাবা, রাত্রি দেড়টা পর্যন্ত যে লোকটা তবলা বাজায়, আমার কিন্তু তাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। রিঙ্কুদির কাছ থেকে জানা হল না, লোকগুলো চলে যাওয়ার পর তবলা বন্ধ হয়েছিল কিনা।'

কৃষ্ণপদ চমকে উঠল। যে প্রশ্নগুলো শুভর মাথায় এসেছে, সেগুলো একদম তার মাথায় আসেনি। কৃষ্ণপদ দরজার বাইরে এল। বিকেলের আকাশ ঘোলাটে হতে শুরু করেছে। হয়তো আর-একটু পরেই রাস্তার বাতি জ্বলে উঠবে। আজ অবশ্য সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা মেঘলা ছিল। দুপুরের দিকে মনে হয়েছিল বৃষ্টি হবে, কিন্তু হয়নি। বাইরে তেমন বাতাস নেই। কেমন একটা গুমোট ভাব। কৃষ্ণপদ নিজের ঘরের খোলা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চারদিক দেখছিল। দেখার মতো তেমন কিছু নেই। সে দেখল, বেশ শীর্ণকায় একজন লোক হাতে একখানা বই নিয়ে বিড়বিড় করে কীসব পড়তে পড়তে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। কৃষ্ণপদর সামনে এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘নতুন ভাড়াটে মনে হচ্ছে।'

কৃষ্ণপদ উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।'

সেই শীর্ণকায় ভদ্রলোক বলল, ‘কোন পক্ষের? বুঝলেন না তো? বলছি, কার ভাড়াটে? আদিনাথ, মুক্তিনাথ শক্তিনাথ এবং বিশ্বনাথ, আপনি কার ভাড়াটে?’

কৃষ্ণপদ বলল, ‘আমি আদিনাথবাবুর ভাড়াটে। আমার নাম কৃষ্ণপদ হালদার।'

শীর্ণকায় ভদ্রলোক বইয়ের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে বইশুদ্ধ দু’হাত জোড় করার ভঙ্গিতে নমস্কার করে বলল, ‘আমার নাম চিন্তামণি রায়। আমিও ভাড়াটে, ওই লাস্ট বাট ওয়ান, মানে সেজোভাই শক্তিনাথের। আমি একটি যাত্রাদল চালাই। আমাদের এ বছরের নতুন পালার নাম ‘ঘরপোড়া গোরু’। আমিই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছি।'

কৃষ্ণপদর বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা। সে বলল, ‘প্রধান চরিত্র মানে কি পোড়া গোরুর?’ প্রবলভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে চিন্তামণি বলল, ‘নো। ওটা তো প্রতীকী নাম। দু’খানা হিন্দি ফিল্ম, একখানা তামিল ফিল্ম, আর দু’খানা বাংলা ফিল্ম থেকে খাবলে খাবলে নিয়ে এমন একটা ফ্যামিলি ব্যাপার হবে। আমি করছি আত্মভোলা বড় ভাইয়ের পার্ট। আমিই পালাকার, পরিচালক, প্রধান অভিনেতা এবং সংগীত পরিচালক। আবহসংগীত আমার। ওইসব বেহালা, সেতার, বাঁশি, এরকম একঘেয়ে মিউজিক থাকবে না। আমার আবহে থাকবে তবলা। তবলার তরঙ্গ, তবলার বোল আর থেকে থেকে এক-একটা মোক্ষম তেহাই।'

কৃষ্ণপদ স্থির চোখে লোকটাকে দেখতে দেখতে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি অনেক রাত পর্যন্ত তবলা বাজান?’

চিন্তামণি ঘাড় নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, বাজাই। কোনও কোনওদিন সারারাত পর্যন্ত বাজাতে থাকি। স্রেফ তবলার উপর মিউজিক কম্পোজ করা কি চাট্টিখানি ব্যাপার!’

চিন্তামণি কথা শেষ করে আবার বইটা খুলে বিড়বিড় করে পড়তে পড়তে অন্যদিকে চলে গেল। কৃষ্ণপদ মনে মনে ভাবল, এই তা হলে তবলাবাদক। এর সঙ্গে রিঙ্কুর ওই লোকগুলোর কী সম্পর্ক? এ তো ‘ঘরপোড়া গোরু’ সামলাতেই ব্যস্ত। অথচ রিঙ্কুর ধারণা...

কৃষ্ণপদর ভাবনাটা থেমে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নীচ থেকে উপরে উঠে আসছে রিঙ্কু। এখান থেকে একতলায় যাওয়ার সিঁড়িটা অনেকখানি দেখা যায়। কৃষ্ণপদ একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। রিঙ্কু উপরে উঠেই কৃষ্ণপদকে দেখে বলল, ‘এখানে দাঁড়িয়ে কেন? কোথাও যাবেন বুঝি?’

কৃষ্ণপদ বলল, ‘না। কোথাও যাওয়ার নেই। আপনাকে দেখে দাঁড়ালাম। একটু আগে সেই তবলাবাদকের সঙ্গে আলাপ হল। উনি নাকি অনেক রাত পর্যন্ত তবলা বাজান। যাত্রাপালার মিউজিক কম্পোজ করেন তো!’

রিঙ্কু একটু হাসল। হেসে বলল, ‘আমিও ঘরপোড়া গোরু।'

রিঙ্কু চলে যাচ্ছিল। কয়েক পা গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে কৃষ্ণপদকে বলল, ‘রোজ রাতে ওঁর তবলা বাজে না। বিশেষ বিশেষ রাতে বাজে। একটু সাবধানে থাকবেন।'

কৃষ্ণপদ মনে মনে বেজায় ঘাবড়ে গেল। সবাই সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোন ধরনের বিপদ হতে পারে, সে কথা কেউই খোলসা করে বলছে না। যদি ভুত বা অশরীরী আত্মা কোনও বিপদ ঘটায় তা হলে করার কিছু নেই। থানা, পুলিশ, মন্ত্রী, আমলা কেউই কিছু করতে পারবে না। যদি জলজ্যান্ত মানুষ কোনও বিপদ ঘটায়, তা হলেই বা সে কী করতে পারে? ভূত কিংবা জঙ্গলের জানোয়ারদের থেকে মানুষের সবচেয়ে বেশি বিপদ ঘটিয়েছে মানুষই। কৃষ্ণপদ এইসব ভাবতে ভাবতেই দেখল রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। এই বাড়ির কোনও একটা ঘর থেকে শঙ্খধ্বনির আওয়াজ শোনা গেল। সন্ধেবেলা শাঁখ বাজানোর রেওয়াজ এখনও এই গ্রামে রয়ে গিয়েছে। এর আগে বাবার বদলির চাকরির সুবাদে যখন কোনও গ্রামে গিয়েছে, সেখানে শাঁখের আওয়াজ শুনেছে। শহরাঞ্চলে ছেলেমেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়া এই আওয়াজ বিশেষ শোনা যায় না।

কৃষ্ণপদ ঘরে এসে গা থেকে জামা খুলতে খুলতে দেখল রেণু স্টোভ ধরিয়ে চা করার উদ্যোগ করছে। রেণু কৃষ্ণপদকে জিজ্ঞেস করল, ‘চায়ের সঙ্গে কিছু খাবে?

কৃষ্ণপদ উত্তর দিল, 'না।'

রেণুর হাত থেকে চায়ের পেয়ালা নিয়ে কৃষ্ণপদ সবেমাত্র চায়ে প্রথম চুমুকটি দিয়েছে, অমনই আদিনাথবাবুর ঘর থেকে একটা আর্ত চিৎকার ভেসে এল, ‘গেছে রে গেছে, আমার সব্বোনাশ হয়ে গেছে। হে ভগবান, আমার কপালে এ-ও ছিল?'

চা খাওয়া বন্ধ করে সকলে দরজার বাইরে এল। দোতলার করিডোরগুলোতে যথেষ্ট আলো নেই। কৃষ্ণপদ ঘর থেকে টর্চটা এনে জ্বালল। বড়ই অল্প আলো টর্চটায়। শুভ বলল, ‘পিছনে ধাক্কা দাও, তা হলে আলোর জোর বাড়বে।'

নবীনবাবু বললেন, ‘কার পিছনে ধাক্কা দেব? কেষ্টর?’

শুভ তড়িঘড়ি বলে উঠল, 'না না বাবার নয়, টর্চের পিছনে।'

কৃষ্ণপদ টর্চের পিছনে একটা ধাক্কা দিতেই আলোর জোর কিঞ্চিৎ বাড়ল।

কৃষ্ণপদ বলল, ‘আমি কি একবার আদিনাথবাবুর ঘরে যাব? দেখব ওঁর কী হয়েছে? আজ দেখছি সন্ধে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উৎপাত।'

রেণু কৃষ্ণপদকে বাধা দিয়ে বলল, ‘অন্য ঘর থেকে লোকজন যাবে। মিছিমিছি ভিড় বাড়িয়ে লাভ কী? তা ছাড়া তুমি চিনে যেতেও পারবে না।'

কৃষ্ণপদর মনে হল, তার যাওয়া উচিত। কিন্তু স্বল্প আলোকিত এই করিডোর দিয়ে গিয়ে আদিনাথবাবুর ঘর খুঁজে পাওয়া তার পক্ষে খুব সহজ হবে না।

ঠিক এই সময় দেখা গেল রিঙ্কু আসছে। নিজের ঘরের দিক থেকে নয়। মনে হচ্ছে, আদিনাথবাবুর ঘরের দিক থেকে। কৃষ্ণপদ যেন মনে মনে একটা সাহস পেল। রিঙ্কুকে কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই, রিঙ্কু কৃষ্ণপদকে প্রশ্ন করল, ‘আপনার ঘরে ডেটল বা স্যাভলন জাতীয় কিছু আছে?’

কৃষ্ণপদ রেণুর দিকে তাকাল। বলল, ‘ডেটল আছে। কিন্তু কার কী হল?’

রিঙ্কু বলল, ‘ব্যাপারটা আদিনাথবাবুকে নিয়ে। তবে সমস্যাটা ওঁর কাছে গুরুতর হলেও, আদতে তেমন কোনও ব্যাপার নয়।'

কৃষ্ণপদ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাপারটা যদি খুলে বলেন। আদিনাথবাবুর আর্ত চিৎকার শুনে আমরা খুব ঘাবড়ে গিয়েছি।'

রিঙ্কু বলল, ‘আদিনাথবাবুর দু’পাটি দাঁতই বাঁধানো। উনি বাঁধানো দাঁতের খুব যত্ন করেন। সকালে, সন্ধেয় এবং রাতে বাঁধানো দাঁত ব্রাশ করেন। আজ সন্ধেবেলায় উনি ওঁর দু’পাটি দাঁত ওঁর অতি বিশ্বস্ত কালাচাঁদ ওরফে কেলোকে বলেছিলেন ভাল করে ব্রাশ করে দিতে। উনি তখন কতকগুলো হিসেবপত্র নিয়ে ভাইপোদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। কালাচাঁদ মনিবের হুকুমমতো দাঁতগুলোকে অতি পরিষ্কার করার তাগিদে বাসন মাজার বুরুশ দিয়ে ঘষে ঘষে দাঁত পরিষ্কার করেছে আর তাতেই দু’পাটির মোট তিনখানি দাঁত খসে পড়েছে! বুরুশে ঘষা দাঁত মুখে তোলার আগে আদিনাথবাবু আজ সারারাত তাকে, মানে ওই দু’পাটি দাঁতকে ডেটল জলে ভিজিয়ে রাখতে চান। তাই ডেটল খুঁজছি।'

একটু পরেই কালাচাঁদকে দেখা গেল। একটা বাটি হাতে সে এগিয়ে এসে বলল, ‘দোরে দোরে ডেটল ভিক্ষে করছি। মনে হয়, ডিটারজেন্ট পাউডারে দাঁতগুলো মাজলে আরও ভাল হত। বুরুশটা বুড়ো মানুষের দাঁতের পক্ষে একটু হেভি হয়ে গিয়েছে। তা আপনাদের কাছে ডেটল আছে?'

রেণু ঘাড় নেড়ে ঘরের ভিতরে যেতেই কালাচাঁদ বলল, 'আজ সন্ধে থেকেই বিভ্রাট। রাতে কী হবে কে জানে। ছোট তরফের ভাড়াটের ঘরে এক জ্যোতিষী ভাড়া এসেছেন। তিনি বলেছেন, এই কৃষ্ণপক্ষেই এই বাড়ির মধ্যে একজন খুন হবেন। খুনিকে ধরা যাবে না। কিন্তু যিনি খুন হবেন, তিনি নাকি একজন মহিলা।'

ঘরের ভিতর থেকে ডেটলের শিশিটা আনতে গিয়ে রেণু কথাটা শুনল এবং ভয়ে কাঠ হয়ে ডেটলের শিশি হাতে ঘরের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল।

প্রথম রাতটা নির্বিঘ্নেই কাটল। সন্ধের মুখে আদিনাথবাবুর ওই আর্ত চিৎকার এবং দাঁত সমস্যার পর গোটা রাতে আর বিশেষ কোনও ঘটনা ঘটেনি। তবে গোটা রাত কৃষ্ণপদ ঘুমোতে পারেনি। থেকে থেকেই সে উঠে বসে বোতল থেকে ঠেলে জল খেয়েছে। যতবারই বিছানার উপর সে উঠে বসেছে, ততবারই রেণু জিজ্ঞেস করেছে, কী হল? তার মানে, কৃষ্ণপদর মতো রেণুকেও ভয় ঘুমোতে দেয়নি। খাটের উপরে বাবা আর শুভ নির্ঘাত ঘুমিয়ে পড়েছে। রাতে চোখ বন্ধ করে জেগে ছিল বলেই কৃষ্ণপদ টের পাচ্ছিল, বাড়ির নীচে রাস্তায় দেদার কুকুর ডাকছে আর বাড়িটার মধ্যে মিউ মিউ শব্দ তুলে অনেক বিড়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে। থেকে থেকে এমন করে ডাকছে, যেন কোনও ছোট ছেলে বা মেয়ে ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠছে। একে মনের মধ্যে ভয়, তার উপর যদি কুকুর-বিড়ালের এত বিচিত্র ডাকাডাকি চলে, তা হলে ঘুম আসা কিছুতেই সম্ভব নয়!

কৃষ্ণপদ আবার বিছানার উপর উঠে বসতে বসতে ভাবল, আজ সন্ধের পর থেকে একবারও কিন্তু তবলার আওয়াজ শোনা যায়নি। রিঙ্কুর পাশের ঘরেই যদি ঘরপোড়া গোরুর মিউজিক কম্পোজ হয়, থেকে থেকে তেহাই চলে, তবে তার আওয়াজ কি এই ঘরে একটুও আসত না? নাকি, রিঙ্কুর কথাই ঠিক। রোজ রাতে ওঁর তবলাবাদ্য হয় না। মধ্যরাতে যে ঘটনাগুলো এ-বাড়িতে ঘটে, তার সঙ্গে তবলা বাদ্যের একটা যোগাযোগ আছে। কিন্তু এইসব ঘটনার সঙ্গে যাত্রাদলের মালিক চিন্তামণির কী সম্পর্ক? কৃষ্ণপদর মাথাটা যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। এবার বালিশে মাথা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল, তার দরজার সামনে দিয়ে কেউ দ্রুত হাঁটাহাটি করছে। কৃষ্ণপদ ভয়ে সিঁটিয়ে রইল। ব্যস, প্রথম রাতে এর বেশি আর কিছু ঘটেনি।

পরদিন সকালে উঠে কৃষ্ণপদ বাজারে গেল। বাজার থেকে ফিরে আসার পর আদিনাথবাবুর সঙ্গে দেখা। কৃষ্ণপদ সৌজন্যবশত জিজ্ঞেস করল, ‘ভাল আছেন?’

আদিনাথবাবু প্রশ্ন শুনে কুঞ্চিত মুখে জবাব দিলেন, ‘মোটেও ভাল নেই। কেলোটা আমার দাঁত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। দু’ পাটি দাঁত ভেজাবার পক্ষে ডেটল কম পড়েছে মনে করে আমার উর্ধ্বপাটির দাঁত সারা রাত্তির ভিনিগারে ভিজিয়ে রেখেছিল। সকালে সেই দাঁত আর মুখে তুলতে পারছি না। চিনে রেস্তরাঁর মতো গন্ধ ছাড়ছে মুখ দিয়ে। ডেটল আর ভিনিগার, এই দুইয়ের যুগল মিলনে মোষপোতা গ্রামের লুপ্ত ভাগাড়টি আমার মুখের মধ্যে ফিরে এসেছে। তা-ও যদি সব দাঁত একসঙ্গে থাকত। দু’ পাটি থেকে মোট তিনখানি খসে পড়েছে। ওই তিনটি দাঁতকে রিপ্লেস করতে কড়কড়ে তিনশোটি টাকা যাবে। কী কুক্ষণেই যে ওর হাতে আমার দাঁতের দায়িত্ব দিয়েছিলাম।'

কৃষ্ণপদ আর কোনও প্রসঙ্গ তোলার আগেই আদিনাথবাবু অন্যদিকে চলে গেলেন। কৃষ্ণপদ নিজের ঘরে ঢুকতেই রেণু বলল, ‘রিঙ্কু এসে আমার সঙ্গে আলাপ করে গেল। যাওয়ার সময় শুভকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল।'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘সঙ্গে করে কোথায় নিয়ে গেল?’

রেণু উত্তর দিল, ‘কোথায় আবার, নিজের ঘরে।'

‘ও’ বলে মুখে একটা শব্দ করে কৃষ্ণপদ বাজারের ব্যাগটা রেণুর হাতে দিল। নবীনবাবু সম্ভবত পাশের ঘরে গিয়েছিলেন। এ বার এই ঘরে এসে বললেন, ‘এই বাড়ির যা অবস্থা, তাতে দু’টো ঘর নিয়ে আমাদের কোনও লাভ হল না। আমি বাপু একটা ঘরে একা রাত কাটাতে পারব না।'

কৃষ্ণপদ রেণুর দিকে তাকাল। রেণু বলল, ‘কেন, পাশের ঘরে আপনি আর শুভ দিব্যি থাকতে পারেন।’

নবীনবাবু নিজের ছেলের বউয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বলিহারি বুদ্ধি তোমার।

ওইটুকু ছেলে শুভ। রাতে কিছু ঘটলে আমি ওকে সামলাব, না নিজেকে সামলাব। আমার বয়স হয়েছে। হার্টের অবস্থা ভাল নয়। কখন যে হার্টফেল হয়ে যায় কে জানে। আমি কোনও রিস্ক নিতে পারব না। টাকির দিকে একটা পোস্ট অফিসে কিছুদিন কাজ করেছিলাম। সেখানে ছিল মেছোভূতের উৎপাত। জানলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে দিনে-দুপুরে শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গি, গামছা যা পেত, তাই নিয়ে যেত চোরে। আর রাত্তির বেলা কী এক কৌশলে বন্ধ জানলার ভিতর হাত ঢুকিয়ে গলা টিপে মানুষকে নিয়ে যেত ভূতে

রেণু কোনও কথা না বলে বাজারের ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। কৃষ্ণপদ নিজের ঘরের দরজার বাইরে এসে ভাবল, শুভকে ডাকতে যাওয়ার অছিলায় রিঙ্কুর ঘর থেকে একবার ঘুরে আসবে কিনা। মেয়েটিকে তার বেশ সাহসী আর বুদ্ধিমতী বলে মনে হয়। এই বাড়িরই কোনও এক ঘরে এক জ্যোতিষী ভাড়া থাকেন। তিনি নাকি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, এই কৃষ্ণপক্ষেই এই বাড়িতে একজন খুন হবেন। যিনি খুন হবেন, তিনি একজন মহিলা। এই খবর শোনার পর থেকে সন্ধের পর রেণু আর দরজার বাইরে পা রাখে না। রিঙ্কুও তো একজন মহিলা। তার ঘরে একবার হামলা হয়ে গিয়েছে। অতএব, তার খুন হওয়ার আশঙ্কাই তো বেশি। খামোখা রেণুকে খুন করতে যাবে কেন?

কৃষ্ণপদ যখন এই সব কথা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিল, তখন রিঙ্কুর ঘর থেকে বেরিয়ে শুভ এগিয়ে আসছিল তার দিকে। শুভর চোখে-মুখে রীতিমতো চকচকে উত্তেজনা। নিজের ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কৃষ্ণপদ বলল, ‘কী হয়েছে? রিঙ্কুদির ঘরে...’ কৃষ্ণপদ এই পর্যন্ত বলতেই শুভ নিজের ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে বলল, ‘বাবা, চুপ। জানো, রিঙ্কুদি আমায় একটা জিনিস দেখাল। কিন্তু কাউকে বলতে বারণ করেছে।'

কৃষ্ণপদ চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, 'কী জিনিস?’

শুভ বলল, ‘বলা বারণ। তবে তোমাকে বলব। কিন্তু এখানে নয়, ঘরে গিয়ে। দরজা বন্ধ করে। তুমি কিন্তু কাউকে বোলো না। রিঙ্কুদি বারণ করেছে।'

রিঙ্কুর ঘরে শুভ কী দেখেছে, রিঙ্কু শুভকে এমন কোন জিনিস দেখাল, যা বলা বারণ! এতই যদি গোপন ব্যাপার হয়, তবে দশ বছরের বাচ্চা ছেলেকে দেখানো কেন? কৃষ্ণপদর মধ্যে কৌতূহল বাড়ছিল। সে শুভকে বলল, ‘আয়, ঘরে আয়। আমি দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি।' শুভর একটা হাত ধরে কৃষ্ণপদ টান দিতে গেল কিন্তু পারল না। ততক্ষণে আদিনাথবাবু এসে সামনে দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে দেখে মনে হল, তিনি যেন কিছু বলতে এসেছেন। কৃষ্ণপদ বলল, ‘আপনি কি আমায় কিছু বলবেন?’

আদিনাথবাবু বললেন, ‘বলব বলেই তো এলাম। আপনারা যে এত ভিতু তা তো জানা ছিল না।’

কৃষ্ণপদ আদিনাথবাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'হঠাৎ এই কথা বলছেন কেন?’ আদিনাথবাবুর গলায় ক্ষোভটা এবার স্পষ্ট হল। তিনি বললেন, 'বলছি কি আর সাধে। আপনার বাবা কিশলয়বাবু...

কৃষ্ণপদ বাধা দিয়ে বললেন, ‘কিশলয়বাবু আমার বাবা নন। আমার মেসো। আমার বাবার নাম নবীন হালদার।'

আদিনাথবাবু বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না। ওই কিশলয় আর নবীন দুটো তো প্রায় সমার্থক। তাই গুলিয়ে যায়। আপনার বাবা আমার কেলো অর্থাৎ কালাচাঁদকে বলেছেন... কৃষ্ণপদ বলল, ‘কী বলেছেন?’

আদিনাথ একটু খর চোখে কৃষ্ণপদর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বলতে যখন আরম্ভ করেছি, তখন সবটাই বলব। আপনি কথার মধ্যে গোত্তা দেবেন ।। হ্যাঁ, যে কথা হচ্ছিল, কালাচাঁদকে বলেছেন, এখানে বাড়ির দালাল আছে কিনা। আপনার বাবা অন্য বাড়ি পেলে, এই বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে উঠে যাবেন। বাড়ি ভাড়া দেওয়ার সময় তিন পাতার একটি ছাপানো নিয়মাবলি বা শর্ত আপনাদের দেওয়া হয়েছিল?’

কৃষ্ণপদ ‘হ্যাঁ’ বলতে গিয়ে থেমে গেল। যদি আবার আগের মতো ‘হ্যাঁ’ বলাটাকে কথার মধ্যে গোত্তা মারা ভেবে কুপিত হন। অতএব, কৃষ্ণপদ গোত্তা মারার অপবাদ থেকে বাঁচতে কথা না বলে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল। আদিনাথবাবু কৃষ্ণপদর ঘাড় নাড়া লক্ষ করে বললেন, ‘তাতে বলা ছিল, ঘর পছন্দ করে একবার ঘরে ঢুকে গেলে অন্তত তিনমাস থাকতে হবে। তিনমাসের আগে যদি চাকরিতে বদলি, পরিবারের কারও মৃত্যু এবং দুরারোগ্য ব্যাধি, এই সব কারণ ছাড়া ভাড়াটিয়া উঠতে চায়, তা হলে তাকে এক বছরের ভাড়া বাড়িওলাকে দিয়ে উঠতে হবে। আশা করি, এসব জেনেশুনেই চুক্তিপত্র সই করেছিলেন।'

মনে মনে বাবার উপর রাগ হলেও কৃষ্ণপদ কিছু বলল না। প্রসঙ্গটা বদলাবার জন্য বলল, ‘বাবা তো অত ভেবেচিন্তে কিছু বলেননি। আসলে এই বাড়িতে বিচিত্র সব ঘটনা ঘটে। মানে, অস্বাভাবিক ব্যাপার। তাই বুড়োমানুষ ভয় পেয়ে গিয়ে...'

কৃষ্ণপদকে থামিয়ে দিয়ে আদিনাথবাবু বললেন, ‘আপনার বাবা বুড়ো আর আমি বুঝি ছোকরা পালোয়ান। আপনার বাবার চাইতেও আমি সিনিয়র বুড়ো। তা ছাড়া এতে ভয় পাওয়ার কী আছে। ভয় তো সব জায়গাতেই। ট্রেনে করে ফিরছেন, রাত্তির বেলা রেলপুলিশ কামরায় উঠে বেধড়ক পেটাল। ভোট দিতে গিয়েও জেনুইন ভোটার বেধড়ক মার খায়। কলেজ হস্টেলে র‍্যাগিং, ভোটকেন্দ্রে রিগিং, শহরে অপহরণ, গ্রামে খাদ্যাভাবে মৃত্যু— এর মধ্যে কোনটা স্বাভাবিক ঘটনা? সে তুলনায় এই বাড়ি অনেক ভাল। এই গ্রামের চোররাও নীতিগতভাবে সৎ। একবার এক ভাড়াটিয়ার অ্যাটাচি চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। অ্যাটাচির মধ্যে সামান্য কিছু টাকা আর একটা ছোট টেবিল ঘড়ি ছিল। চোর টাকা আর টেবিল ঘড়িটা নিয়েছিল। চশমার খাপ, ঠিকানা লেখা ডায়েরি এবং স্টিলের টিফিন কৌটো পরের দিনই ফেরত দিয়ে গিয়েছিল। একজনের সোনার হার চুরি করে পরে তীব্র ভর্ৎসনা করে সেই হার ফেরত দিয়েছিল। কারণ, ওই হারটা মোটেও সোনার ছিল না। দোকানে বিক্রি করতে গিয়ে যখন বুঝেছিল, তখনই তীব্র পত্রাঘাত করে হারটি ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এমন চোর শহর অঞ্চলে পাবেন?’

কৃষ্ণপদ বলল, ‘এই গ্রামের অনেক ভাল দিকও আছে।'

আদিনাথবাবু বললেন, ‘ভাল আছে বলেই কিছু মন্দও আছে। এই বাড়িটাও তাই। বিখ্যাত বাড়ি। লন্ডন, আমেরিকা যেখান থেকেই চিঠি পাঠান, খালি ঠিকানার জায়গায় লিখবেন টু আদিনাথ চৌধুরী, বিগ হাউজ়, পো. মোষপোতা, উত্তর চব্বিশ পরগনা, ওয়েস্ট বেঙ্গল, ইন্ডিয়া। ব্যস, পাখির মতো চিঠিটা উড়ে চলে আসছে। এই বাড়ি সম্পর্কে যেসব খবর শুনেছেন, তার সবই মিথ্যে নয়। অতিরঞ্জন আছে, তবে ঘটনাগুলো ঘটেছিল। আমাদের এক পিসিমা নাকি এই বাড়ির ছাদ থেকে একলাফে উড়ে গিয়ে সাগরদিঘিতে পড়ে মারা গিয়েছিলেন। খবরটা সত্যি। এর মধ্যে অতিরঞ্জন হচ্ছে, ছাদ থেকে উড়ে গিয়ে দেড় কিলোমিটার দূরে সাগরদিঘিতে ডুবে মরা। এই বাড়িতে অনেক কাল ধরেই কিছু পুরনো ভূত বিনা ভাড়ায় আছে। তবে হ্যাঁ, ওরা কাউকে আজ পর্যন্ত বিরক্ত করেনি। হয়তো তে আপনি শুয়ে আছেন, একখানা ভূত হয়তো টুক করে গিয়ে আপনার পাশে শুয়ে পড়ল। আপনি টেরই পাবেন না। যদি গায়ে গরম নিশ্বাস লাগে তবে বুঝবেন, ওদের কেউ আপনার পাশে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আজকের পৃথিবীতে মানুষ যত হিংস্র হচ্ছে, ভূতরা তত অহিংস হচ্ছে,' আদিনাথবাবু থামলেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছে বললেন, ‘এই যে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ এত কথা বললাম, তাতে আমার মুখ থেকে কোন গন্ধটা বেশি বেরোচ্ছে? ডেটল না ভিনিগার?'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘ডেটল আর ভিনিগার মিলে এমন মিশ্রিত গন্ধ বেরোচ্ছে, যাতে মনে

হবে, অন্য ধরনের কোনও ওষুধ খেয়েছেন। তবে গন্ধটা সকালের মতো অত তীব্র নয়।' আদিনাথবাবু বললেন, ‘তীব্র হবে কেমন করে? দেদার এলাচ খেয়ে যাচ্ছি। মাউথওয়াশ দিচ্ছি।'

কৃষ্ণপদ আদিনাথবাবুকে বলল, 'আমরা এই বাড়িতেই থাকব। আপনি তো আমাদের অভয় দিলেন।'

আদিনাথবাবু বললেন, ‘থাকুন, থাকুন। অত ভয় পেলে কি এই জগতে বাস করা যায়? ভূত আছে, তবে ওরা কোনও ক্ষতি করে না। মাঝরাতে বেহাগে, পিলুতে কিংবা আড়খেমটায় যদি কোনও গান শোনেন, তা হলে মন দিয়ে শুনবেন। ওই গানগুলো গায় আমার দাদার ছেলেমেয়েরা।'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘ওঁরা বুঝি এই বাড়িতেই থাকেন?’

আদিনাথবাবু উদাস গলায় বললেন, “পৈতৃক ভিটের টান বড় টান। দাদার দুই ছেলে, তিন মেয়ের মধ্যে একজন থাকে টরন্টোতে। এক মেয়ে আছে মুম্বইয়ের জহু-তারা রোডে। আর দুই ভাই আর-এক বোন দিঘা যাওয়ার পথে মোটর দুর্ঘটনায় মারা যায়। ওদের আত্মাই ওদের এই পৈতৃক ভিটেতে বাস করে। ওরা ভাল গান জানত। মরে গিয়ে ভূত হল, কিন্তু গানবাজনার শখটা এখনও ছাড়তে পারল না। দিব্যি সুরে গায়। যেমন গত অমাবস্যায় মাঝরাতে আমার দরজার সামনে এসে দুই ভাই আর এক ভাইঝি বেহাগ/ জলদ তেতালায় গাইলে –

জয় উমেশশঙ্কর সর্বগুণাকর

ত্রিতাপসংহর, মহেশ্বর।

হলাহলাঙ্কিত কণ্ঠ সুশোভিত

মৌলি বিরাজিত সুধাকর

জানেন এটা কীসের গান? কার লেখা? জানেন না। একালের অনেকেই জানেন না। এই গান হল মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের। গানটির রচয়িতা মহারানা যতীন্দ্রমোহন। যাকগে, বিস্তর কথা হল। মোদ্দা কথাটা হল, আপনাদের এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়া হচ্ছে না। চুক্তি ভেদ করা চলবে না। তাতে এই বাড়ির বদনাম। কথাটা যেন দ্বিতীয়বার স্মরণ করিয়ে দিতে না হয়। আপনি আপনার কচি অর্থাৎ নবীন বাবাকে বলবেন।'

কথা শেষ করে আদিনাথবাবু আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। হনহন করে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেলেন। কৃষ্ণপদ যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল এবং মনে মনে বুঝল, ভূত বা কালো পোশাকপরা ওই লোকগুলোর মতো এ-বাড়ির অনেক স্বাভাবিক মানুষও থেকে থেকে ভয়ংকর রকমের অস্বাভাবিক হয়ে ওঠেন!

শুভকে নিয়ে পাশের ঘরে এল কৃষ্ণপদ। গতকাল থেকে এখন পর্যন্ত এই ঘরে বিশেষ আসা হয়নি। ঘরটা কেউ ব্যবহারও করেনি। ভাড়া নিয়ে একটা ঘর শুধু শুধু খালি ফেলে রাখার কোনও মানে হয় না। কৃষ্ণপদ মনে মনে ভাবল, ভূতের হাতেই যদি তার মৃত্যু থাকে, তবে যে কোনও সময়, যে কোনও ঘরেই মৃত্যু হতে পারে। আজ সে এই ঘরেই থাকবে। রেণু যদি রাজি না হয়, তা হলে সে একাই থাকার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু তার আগে শুভর কাছ থেকে জেনে নিতে হবে, রিঙ্কু তাকে এমন কোন গোপন জিনিসটা দেখিয়েছে।

কৃষ্ণপদ প্রথম দরজা বন্ধ করল। তারপর ঘরের অন্যদিকে সরে গিয়ে শুভকে ইশারায় ডাকল। শুভ কাছে আসবার পর কৃষ্ণপদ জিজ্ঞেস করল, ‘রিঙ্কু তোকে কী দেখিয়েছে? এমন কোন গোপন জিনিস?

শুভ একবার বন্ধ দরজার দিকে আর একবার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ডান হাতের মুদ্রায় যা দেখাল সেটা পিস্তল বা রিভলভার বোঝায়। কৃষ্ণপদ প্রশ্ন করল, ‘জিনিসটা কী? পিস্তল না রিভলভার?’

শুভ বলল, ‘তা আমি বলতে পারব না। কোনটা কেমন দেখতে তা আমি জানি না।' কৃষ্ণপদ মনে মনে বলল, সেও ওই দুটো জিনিসের তফাত বোঝে না। কিন্তু শুভর সামনে মুখে কিছু বলল না। সে গভীর বিস্ময়ে ভাবতে লাগল, রিঙ্কুর কাছে ওই জিনিস থাকবে কেন? চব্বিশ বছরের একটা মেয়ে সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘোরে, এ জিনিস তো ভাবা যায় না। মেয়েটি ক্যারাটে জানে। তাতে চী! ক্যারাটে জানলেই কি সঙ্গে ওই সব রাখা চলে? কৃষ্ণপদ ভেবে পাচ্ছে না, রিঙ্কু যদি একটা আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখে, তা রাখুক। কিন্তু সেটা ঘটা করে শুভকে দেখাতে যাওয়া'কেন? মেয়েটার মতলবটাও কৃষ্ণপদ বুঝতে পারছে না। যা একেবারেই বুঝতে পারছে না, তাকে নিয়ে মিছিমিছি ভাবতে যাবে কেন? এই ভাবনা দুশ্চিন্তার জন্ম দেওয়া ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না।

দরজা খুলে ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে কৃষ্ণপদ যখন অন্য কথা ভাবছে, শুভ তখন তার বাবাকে আরও একবার সতর্ক করে দিয়ে বলল, ‘কাউকে বোলো না যেন।

কৃষ্ণপদ ছেলের দিকে তাকাল। মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে কাউকে বলবে না। গতকাল ওরা এই বাড়িতে এসেছে। অফিস থেকে দু’দিনের ছুটি নেওয়া আছে। তার মানে আজই ছুটি শেষ। আগামীকাল থেকে অফিস। নতুন বাড়িতে কিছুই তেমন করে গোছগাছ করা হয়নি। আগামীকাল থেকে আর সময় পাওয়া যাবে না। বরং এখন যতটা পারি নিজেই গোছগাছ করে নিই। এই সব ভাবতে ভাবতে কৃষ্ণপদ নিজের ঘরে এল। নিজের ঘর মানে, যে ঘরে গত রাত থেকে ওরা আছে। অন্য ঘরটা তো ভয়ে ব্যবহারই করতে পারছে না। কৃষ্ণপদ ঘরের চারদিকে তাকাল। এখনও অনেক জিনিসের প্যাকেটই খোলা হয়নি। পুরনো খবরের কাগজ দিয়ে অনেক জিনিস মোড়া। তার উপর দড়ির বাঁধন। কৃষ্ণপদ এক-একটা প্যাকেট খুলছিল আর কাগজগুলোকে সরিয়ে দিচ্ছিল অন্যদিকে। পরে বাইরে ফেলে দিলেই হবে। কৃষ্ণপদর বাবা নবীনবাবু খাটের উপর শুয়ে পায়ের উপর পা তুলে আস্তে আস্তে নাচাচ্ছিলেন। কৃষ্ণপদ কাগজগুলো খুলে একপাশে সরিয়ে রাখছে আর শুভ বাবার কাজে তাকে টুকটাক সাহায্য করছে। এমন সময় দরজার বাইরে থেকে রিঙ্কু বলল, ‘আসতে পারি?’

ঘাড় ফিরিয়ে দেখবার আগেই কণ্ঠস্বর শুনে কৃষ্ণপদ অনুমানে বুঝেছিল, নিশ্চয়ই রিঙ্কু। এবার দরজার বাইরে রিঙ্কুকে দেখে কৃষ্ণপদ হাসতে হাসতে বলল, ‘আসুন, আসুন। এখানে আসবার পর তো আর সময় পাইনি। আগামীকাল অফিসে জয়েন করতে হবে। তাই আজকেই হাত লাগালাম। যতটা পারি এগিয়ে রাখি।'

রিঙ্কু হাসল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘যদি আপনার আপত্তি না থাকে, তা হলে আমিও হাত লাগাতে পারি।'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘অশেষ ধন্যবাদ। তার দরকার হবে না। সামান্য ক'টা মাত্র জিনিস। আপনি বসুন।'

রিঙ্কু বসার পর কৃষ্ণপদ বলল, ‘আপনি কি শুনেছেন, এই বাড়ির জনৈক জ্যোতিষী ভাড়াটিয়া কী বলেছেন?

রিঙ্কু বলল, ‘কালাচাঁদের মুখে শুনেছি। তিনি নাকি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, এই কৃষ্ণপক্ষেই এই বাড়ির একজন মহিলা খুন হবেন।'

রিঙ্কু কথা বলছিল আর পুরনো খবরের কাগজের খণ্ডগুলো খাটের নীচের দিকে সরিয়ে রাখছিল। কৃষ্ণপদ বলল, ‘খবরটা শুনে আমার স্ত্রী তো খুব ভয় পেয়ে গিয়েছে। আপনিও তো মহিলা। আপনার ভয় হচ্ছে না?’

রিঙ্কু খুব হাল্কা গলায় বলল, ‘একদম না। যদিও জানি, আমি হয়তো কারও টার্গেট! তবুও আমার ভয় হচ্ছে না।'

কৃষ্ণপদ মুখ তুলে রিঙ্কুর দিকে তাকাল। পুরনো কাগজের টুকরো খুলে খাটের নীচে সরিয়ে দিতে গিয়ে একটা বড়সড় কাগজের খণ্ড, প্রায় যে কোনও দৈনিকের একপৃষ্ঠার মতো হবে, সেটা নিয়ে রিঙ্কু খুব মনোযোগ দিয়ে পুরনো কাগজের পৃষ্ঠা থেকে কী যেন একটা পড়তে পড়তে সে হঠাৎ বলে উঠল, ‘দাদা, এই কাগজটা আমি নেব?’

কৃষ্ণপদ বলল, ‘ওটা তো আমার কোনও কাজেই লাগবে না। ফেলেই তো দিতে হবে। কিন্তু আপনার কি কোনও কাজে লাগবে? যদি লাগে, তবে নিয়ে যান।'

রিঙ্কু কাগজটা ভাঁজ করে নিতে নিতে বলল, ‘কথায় বলে না, যেখানে দেখিবে ছাই। উড়াইয়া দেখ তাই। পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন।'

রিঙ্কু আর কোনও কথা বলল না। কিন্তু সে যে বেজায় খুশি, তা টের পাওয়া গেল। কৃষ্ণপদ কিছুতেই ভেবে পেল না, রিঙ্কু ওই পুরনো কাগজের মধ্যে এমন কী পেল, যার জন্য সে এত খুশি। এই বাড়িটার মতো রিঙ্কুও যেন তার কাছে এক রহস্যময় ব্যাপার হয়ে উঠতে লাগল।

দিন দুই পরে কালাচাঁদের কাছ থেকে দু'টি সংবাদ পাওয়া গেল। এই দু'টি সংবাদের মধ্যে কোনওটাই তেমন চমকপ্রদ কিছু না। প্রথম সংবাদ, সেই ‘ঘরপোড়া গোরু’র পালাকার এবং প্রযোজক দু’দিন হল বাড়িতে আসছেন না। দ্বিতীয় সংবাদটি হল, জ্যোতিষী দ্বিতীয় দফায় ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছেন, এই কৃষ্ণপক্ষেই বড়বাড়ির ভিতরে প্রবল গন্ডগোল হবে। রক্তপাত, এমনকী মৃত্যু পর্যন্ত হওয়াও বিচিত্র নয়।

জ্যোতিষীর এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে আদিনাথবাবু সেই জ্যোতিষীকে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এইভাবে যদি বাড়ির ভাড়াটেদের মনে ভয় ঢুকিয়ে তাঁদের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়, তবে এই বাড়ির মধ্যেই একটি জলজ্যান্ত জ্যোতিষী নির্ঘাত খুন হবেন। তাঁর ভাইপোভাইঝিরা এই কাজে সিদ্ধহস্ত।

‘ঘরপোড়া গোরু’র পালাকার পালা করতে অন্যত্র কোথাও যেতেই পারেন। অতএব, সেটা তেমন বড় খবর কিছু নয়। জ্যোতিষীর ভবিষ্যৎবাণী গোড়ায় শুনে কৃষ্ণপদ যতটা ভয় পেয়েছিল, এখন আর ততটা ভয় হয় না। তবে আদিনাথবাবু যে বলেছিলেন তাঁর পরলোকগত দুই ভাইপো আর এক বোন মাঝরাতে কোরাসে গান গায়, সেই গান কিন্তু এখন পর্যন্ত কৃষ্ণপদ শুনতে পায়নি। পেলেও তার বোঝার সাধ্য ছিল না, কোনটা বেহাগ, কোনটা পিলু বা আড়খেমটা। কৃষ্ণপদ একবার ভাবল, কালাচাঁদের এই কথাগুলো রিঙ্কুকে জানানো দরকার। যদিও সে জানে না, রিঙ্কুর কথাই তার কেন বারেবারে মনে হচ্ছে। অফিস থেকে ফিরে, সন্ধের পর কৃষ্ণপদ রিঙ্কুর ঘরে গেল। এখন আর এই বাড়িটাকে প্রথম দিনের মতো গোলকধাঁধা মনে হয় না। বাড়ি সম্পর্কে ভয়টা আগের চাইতে কমে এসেছে। দরজায় গিয়ে পরপর তিনটে টোকা দেওয়ার পর রিঙ্কু দরজাটা খুলে দিয়ে বলল, ‘ভিতরে আসুন। মনে মনে আপনার কথাই ভাবছিলাম। আমার হয়ে আপনাকে একটা উপকার করে দিতে হবে।'

কৃষ্ণপদ অবাক হল। সে নিজে এত সাধারণ যে, কারও উপকারে লাগতে পারে, সেকথা সে ভাবেই না। সে বলল, ‘কী উপকার?’

রিঙ্কু চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘আদিনাথবাবুর ছোটভাইয়ের ঘরে একজন জ্যোতিষী ভাড়াটে থাকেন। উনি খুব বিখ্যাত জ্যোতিষী। ঘরটা আমি দূর থেকে দেখিয়ে দেব কিংবা কালাচাঁদকে বলে দেব, সে-ই আপনাকে নিয়ে যাবে।'

কৃষ্ণপদ কিছুই বুঝতে না পেরে বলল, ‘ওই জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে আমি কী করব?’

রিঙ্কু অনুরোধের গলায় বলল, “কিছুই করতে হবে না। যাওয়ার আগে শুভকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। বলবেন, শুভর একটা কোষ্ঠী করে দিতে। আপনিই কথা বলবেন। শুভকে কোনও প্রশ্ন করলে, সে জবাব শুভই দেবে। ওকে আমার সব বোঝানো আছে। মোট কথা, ওঁকে দিয়ে শুভর একটা কোষ্ঠী আপনাকে করিয়ে আনতে হবে। খরচ যা লাগবে, তা আমি দেব।'

কৃষ্ণপদ শুকনো গলায় বলল, ‘কোনও অনিষ্ট হবে না তো?’

রিঙ্কু সাহস দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, ‘ভয় নেই। আমি তো আছি। ভরসা এবং বিশ্বাস দু’টোই আমার উপর করতে পারেন।'

কৃষ্ণপদ রিঙ্কুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবল, কোন জিনিসটা রিঙ্কুর দরকার? ওই জ্যোতিষীর কোষ্ঠী নাকি শুভর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানা? এসব ব্যাপারের সঙ্গে শুভকে জড়াচ্ছে কেন? ‘ওকে আমার সব বোঝানো আছে’ রিঙ্কুর এই কথাটা থেকে বোঝা যাচ্ছে শুভর সঙ্গে রিঙ্কুর বেশ যোগাযোগ আছে এবং দু'জনের মধ্যে অনেক বিষয়ে আলোচনাও হয়।

কৃষ্ণপদ ঘরে এসে শুভর দিকে তাকাল। শুভ খাটের উপর বসে পড়ছে। নতুন জায়গায় এসে এখনও স্কুলে ভর্তি হয়নি। এর জন্য আবার একদিন অফিস কামাই হয়ে যাবে। প্রথমে ইচ্ছে হয়েছিল, কথাটা শুভকে বলে। কিন্তু কৃষ্ণপদ নিজে থেকে কিছু বলল না। একটু পরে শুভ খাট থেকে নেমে এসে বলল, ‘তুমি কোথায় গিয়েছিলে বাবা?”

কৃষ্ণপদ ইচ্ছে করেই আবেগহীন গলায় বলল, ‘রিঙ্কুদের ওখানে।' শুভ বাবার কাছে একটু এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘জ্যোতিষীর ব্যাপারে কথা হয়েছে?'

কৃষ্ণপদ চট করে উত্তর দিল না। ছেলের মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বলল, ‘আসল ব্যাপারটা কী?’

শুভ উত্তর দিল, ‘তা আমি জানি না। রিঙ্কুদি খালি বলেছে, এখন আমি জলে চার ফেলেছি। মাছ ভিড়লে জাল ফেলব।'

এই রকম হেঁয়ালি থেকে কিছু বোঝা যায় না। কৃষ্ণপদ কিছু আন্দাজও করতে পারল না। কিন্তু তার মধ্যে একটা কৌতূহল মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগল। গোড়ায় মনের মধ্যে যে দ্বিধা ছিল, এবার তা যেন আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে। শুভর উৎসাহ তাকে সাহস জোগাচ্ছে। কৃষ্ণপদ বলল, ‘আগামীকাল অফিস থেকে এসেই যাব। তুই তৈরি থাকিস।'

কৃষ্ণপদ অফিস থেকে পরদিন একটু তাড়াতাড়িই ফিরে এল। অন্যদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা হয়ে যায়। আজ যখন ছ'টার মধ্যে ফিরে এল, গ্রীষ্মের আকাশে তখনও রোদ আছে। দক্ষিণ দিক থেকে চমৎকার বাতাস আসছে। ঘরে ঢুকে শুভকে দেখেই বুঝল, শুভ একদম তৈরি এবং যাওয়ার প্রতীক্ষায় তার জন্যই অপেক্ষা করছে। রেণু স্বামীকে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘শুভকে নিয়ে তুমি কোথায় যাবে? শুভ খালি বলছে, বাবা এক জায়গায় নিয়ে যাবে। তা সেই জায়গাটা কোথায়?

কৃষ্ণপদ উত্তর দিল, ‘বেশি দূরে নয়। এই বাড়ির মধ্যেই।'

রেণু বলল, ‘ও মা, এই বাড়ির মধ্যে তা আমাকে বলতে বাধা কোথায়যায়নি?

কৃষ্ণপদ বলল, ‘বলার তো সময় ।

টেবিলের উপর থেকে চিরুনিটা তুলে মাথা আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল, ‘এই বাড়িতেই একজন বিখ্যাত জ্যোতিষী থাকেন। উনি নাকি দারুণ কোষ্ঠী করেন। তাই শুভকে নিয়ে যাচ্ছি। ওঁকে দিয়ে শুভর একটা কোষ্ঠী করাব।'

রেণুর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে বলল, ‘ওই সেই জ্যোতিষী, যিনি বলেছিলেন এই কৃষ্ণপক্ষে এই বাড়িতে একজন মহিলা খুন হবেন।'

কৃষ্ণপদ ঘাড় নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। তবে এখনও পর্যন্ত কেউ খুন হননি।'

শুভকে নিয়ে সেই জ্যোতিষীর কাছে কৃষ্ণপদ যাবে, এটা রেণুর ভাল লাগল না। তবুও বাধা দেওয়ার কথা ভাবল না। আপত্তিও করল না। শুভর একটা কোষ্ঠী তৈরি হোক এটা রেণুরও ইচ্ছে। ওরা দু'জনে দরজার বাইরে এসে এদিক-ওদিক তাকাল। কৃষ্ণপদ বলল, ‘জ্যোতিষীর ঘরটা আমি চিনি না। না চিনলে তো যেতে পারব না।'

শুভ বলল, ‘আমি চিনি। দুপুরবেলা দূর থেকে ঘরটা চিনিয়ে রেখেছে রিঙ্কুদি। তা ছাড়া কালাচাঁদদা আসবে। রিঙ্কুদি আমায় বলেছে।'

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। শিস দিতে দিতে কালাচাঁদ এল। তার কোলে একটা কালো বিড়াল। কালাচাঁদ এসেই বলল, ‘আমার জন্যই দাঁড়িয়ে আছেন তো? জানেন, এই বাড়ির ভিতরে মোট ছাব্বিশটা বিড়াল আছে। সবই এই চৌধুরীবাড়ির সম্পত্তি। এমন একটা সময় গিয়েছে, যখন বিড়ালের বাচ্চা হলে চৌধুরীবাবুরা গ্রামের লোকদের ডেকে ডেকে খাওয়াতেন। এখন আর সেই অর্থও নেই, দিলদার মেজাজও নেই, ইচ্ছেও নেই। ছাব্বিশটা বিড়ালের মধ্যে আটখানা হচ্ছে এই রকম কালো যেন পিচ দিয়ে গায়ে ব্রাশ করেছে। আসলে এরা হচ্ছে উগান্ডার বিড়াল। ওখান থেকেই এসেছিল। বড়কর্তা এনেছিলেন। এরা তাদেরই বংশধর। গতকাল থেকে একটা কালো বিড়াল পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে খুঁজে পেতে আমিই ওকে গুদাম ঘর থেকে বের করলুম।'

বিড়ালের গায়ের রঙটা ঘন কালো কিন্তু চোখ দু’টো লাল। আর তাতেই বিড়ালটাকে খুব হিংস্ৰ দেখাচ্ছে। শুভ বিড়ালটার দিকে দেখতে দেখতে বলল, ‘এরা কামড়ায়?’

কালাচাঁদ উত্তর দিল, ‘কামড়ায় না আবার! আটখানা কালো বিড়ালই তো হচ্ছে এই বাড়ির কমান্ডো ফোর্স। একবার এক ডাকাতের উপর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার কণ্ঠনালিতে এমনভাবে কামড়ে দিয়েছিল যে, মোষপোতার গব্বর সিংহ ওই এক বিড়ালের কাছেই শেষ হয়ে গেল। বন্দুক খোলবার অবকাশই পেল না। তুলনায় সাদাগুলো কম হিংস্র। ওরা কেবল চোখে অ্যাটাক করে ...

কৃষ্ণপদ কালাচাঁদকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘এই সব হিংস্ৰ কাহিনি শুনে কোনও লাভ নেই। আপনি আমাদের জ্যোতিষীর কাছে নিয়ে চলুন।'

শুভ বলল, ‘তার আগে উগান্ডার বিড়ালটাকে আপনি বরং কোথাও রেখে আসুন। আমার খুব ভয় করছে।'

কালাচাঁদ বলল, ‘সেই ভাল। ওই জ্যোতিষীকে দেখলে এ আবার খেপে ওঠে।'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘কাকে কাকে দেখলে বেশি খেপে?’

কালাচাঁদ উত্তর দিল, ‘ওনলি টু পারসস। ওয়ান ওই জ্যোতিষী, সেকেন্ড হচ্ছে ‘‘ঘরপোড়া গোরু’র তবলিয়া। ভদ্রলোক তবলা কেমন বাজান, তা জানি না। কিন্তু ওঁর ঘরে অনেক জোড়া তবলা। এক জোড়া নাকি দু’জোড়া সিন্দুকে তোলা। তবলা সিন্দুকে রাখে, এ তো বাপের জন্মে শুনিনি! উনি বলেন, ওই তবলা দিয়ে আহিরীটোলার কোনও এক ওস্তাদের কাছে নাকি নাড়া বেঁধেছিলেন, তাই গুরুর নির্দেশে ওগুলো সিন্দুকে পুরে রেখেছেন।'

কালাচাঁদ বিড়াল রাখতে গেল। যাওয়ার সময় কৃষ্ণপদ বলল, ‘বেশি দেরি করবেন না। কালাচাঁদ হাত নেড়ে চলে গেল। নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে রিঙ্কু আসছিল। শুভই প্রথমে দেখতে পেয়ে ডাকল। রিঙ্কু কাছে এসে কৃষ্ণপদকে বলল, ‘কালাচাঁদ আসেনি?’

কৃষ্ণপদ বলল, ‘এসেছিল। বিড়াল রাখতে গেল।

রিঙ্কু বলল, ‘একটু পরে যাওয়াই ভাল। কালাচাঁদ ঠিক সময় আপনাদের নিয়ে যাবে। এখন উনি হোম-যজ্ঞ করেন। তারপর ওঁর উপরে ঈশ্বর ভর করেন। তখন উনি অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং কোষ্ঠী করার দায়িত্ব নেন। আমি ঘরে যাচ্ছি। এই পাথরের খণ্ডটা আপনাকে দিলাম। হোম-যজ্ঞের পর বলবেন, আপনি এই পাথরটা একবার হাত দিয়ে স্পর্শ করে দিন। আপনার স্পর্শে এই পাথর আমি পুজোর আসনে রাখব।'

একটা সাদা পাথরের খণ্ড কৃষ্ণপদর হাতে দিয়ে রিঙ্কু নিজের বর্গক্ষেত্রের মতো দেখতে ঘরের দিকে চলে গেল।

রিঙ্কুর ব্যাপারস্যাপার কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। রিঙ্কু কি বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু করতে যাচ্ছে? ওর সেই বিশেষ উদ্দেশ্যটা কি কালাচাঁদ জানে? কৃষ্ণপদ একবার ভাবল, কৌতূহলের বশে সে নিজেও কি কোনও ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছে? এই বাড়িতে কে কেমন, কার মনে কোন মতলব ঘুরছে সে বিষয়ে সে কিছুই জানে না। তার কোনও সমস্যা হলে, সে বাড়িওলা আদিনাথবাবুকে বলবে। কিন্তু সে নিজেই যদি কোনও সমস্যা তৈরি করে বসে, তবে আর কার কাছে বলবে? কৃষ্ণপদ একবার শুভর দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল, তার বোধ হয় ফিরে যাওয়াই উচিত। হাল্কা গোলাপি কাগজের একটা প্যাকেটে করে যে সাদা পাথরটা রিঙ্কু তাকে দিয়েছে, তার উদ্দেশ্যটা কী? সব মিলিয়ে বিষয়টা কৃষ্ণপদর কাছে জটিল লাগছিল। সে যখন ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাই পাকা করে ফেলতে যাচ্ছে, তখনই কালাচাঁদ এসে তাড়া দিয়ে বলল, 'চলুন। বাবাজির হোম-যজ্ঞ এইমাত্র শেষ হয়েছে। এখন সব ভবিষ্যদ্বাণী দেওয়ার সময়। আসুন।'

কৃষ্ণপদর সম্মতির কোনও তোয়াক্কা না করে কালাচাঁদ শুভর হাত ধরে এগিয়ে চলল। কৃষ্ণপদকে বাধ্য হয়ে তার পিছন পিছন যেতে হল।

জ্যোতিষীর ঘরটা তখনও ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আছে। ঘরের মধ্যে লাল, সবুজ, হলদে, নানারকম বাল্বের আলো জ্বলছে। যেন কুয়াশার রাতে বা ধোঁয়াশার সন্ধেয় রাস্তায় ট্রাফিক সিগনাল। কালাচাঁদ ঘরে ঢুকে ‘বাবা, আমরা এসেছি’ বলে ঘরের একপাশে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। শুভর একটা হাত কালাচাঁদের হাতে ধরা। কালাচাঁদের দেখাদেখি কৃষ্ণপদও দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। দেওয়ালটা ঠান্ডা। কেমন যেন স্যাঁতসেঁতে বোধ হল। হোম-যজ্ঞের আগুনেও এদিকের দেওয়ালটা গরম হয়নি। হঠাৎ ঘরের মধ্যে একটা বড় বাতি জ্বলে উঠেই নিভে গেল। এ যেন শখের নাটকের আলোকসম্পাতের মতো ব্যাপার। ওই আলোতে ক্ষণিকের জন্য জ্যোতিষীকে দেখা গেল। কিন্তু যতটুকু দেখা গেল, তাতে জ্যোতিষীর মুখ মনে থাকার মতো নয়। জ্যোতিষী বললেন, ‘হাত বাড়িয়ে দে।'

কালাচাঁদের মতো কৃষ্ণপদ আর শুভও হাত বাড়িয়ে দিল। জ্যোতিষী ওদের হাতে কিছু একটা দিয়ে বললেন, ‘এটা শোধন করা হরীতকী। অমৃত ফল। ঠাকুরের আসনে রেখে নিত্য সেবা করবি।'

কালাচাঁদ কৃষ্ণপদর পিঠে একটা খোঁচা দিয়ে অত্যন্ত মৃদু গলায় বলল, ‘সাদা পাথরটা দিন। ওঁর হাতের স্পর্শ নিয়ে রাখুন।'

কৃষ্ণপদর একটু ভয় ভয় করছিল। তবুও সে গোলাপি রঙের কাগজের মোড়ক থেকে সাদা পাথরের খণ্ডটা বের করে জ্যোতিষীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘বাবা, এটা একটু স্পর্শ করে দিন। নিত্য পূজা করব।'

জ্যোতিষী হাত বাড়িয়ে পাথরের খণ্ডটা নিলেন। আবছা অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। একটু পরে পাথরের খণ্ডটা নিজেই একটা কাগজে মুড়ে কৃষ্ণপদকে দিয়ে বললেন, ‘যা, নিয়ে যা।’

কৃষ্ণপদ এবার কোষ্ঠীর কথাটা বলল। জ্যোতিষী গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আগামী এক পক্ষকালের মধ্যে আমি কারও কোষ্ঠী রচনা করব না। কারও সম্পর্কে কোনও ভবিষ্যদ্বাণীও করব না। তোরা এখন যেতে পারিস।'

আধো অন্ধকারেই কৃষ্ণপদ কালাচাঁদের দিকে তাকাল। কিন্তু কালাচাঁদের মুখটাও স্পষ্ট নয়। কোনও ইশারা করলে বুঝতে পারবে না। তাই কৃষ্ণপদ হাত বাড়িয়ে কালাচাঁদের পিঠে খোঁচা দিল। কালাচাঁদ বলল, “বাবা, এই নাবালক ছেলেটির উপর একটু দয়া হয় না? আপনি দয়ার অবতার। আপনি ফেরালে আর কোথায় যাব?’

আবার ক্ষণিকের জন্য বড় লাইট জ্বলে উঠেই নিভে গেল। এবার আদেশ হল, ‘ওকে নিয়ে পাশের ঘরে আয়।'

ওরা তিনজনে ঘরের বাইরে এসে, পাশের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়াল। খানিক পর পাশের ঘরের দরজা খুলে গেল। এই ঘর আগের ঘরের মতো অন্ধকার আর ধোঁয়াভর্তি নয়। এখানকার আলোটাও উজ্জ্বল। আগের ঘরটায় ধোঁয়ার জন্য চোখ জ্বালা করছিল। এই ঘরে সেই অস্বস্তি নেই। ঘরে ঢোকার একটু পরে জ্যোতিষীবাবাজি এলেন। একমুখ কাঁচাপাকা দাড়িতে গোটা মুখটাই প্রায় ঢাকা। এসেই শুভর দিকে তাকালেন। স্থির দৃষ্টিতে শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন, ‘তোদের ঘোরতর বিপদ। তোরা মোষপোতা ছেড়ে পালা। কোষ্ঠী করতে হবে না। আমি তোর হাত দেখে এই কাগজে যা যা লিখে দিচ্ছি, তা যেন অবশ্যই পালন করা হয়।'

কৃষ্ণপদ জানে না, জ্যোতিষী ঠিক বলছেন না বেঠিক বলছেন। তবুও নিজের নাবালক ছেলেকে এই সব কথা বললে, সব বাবাই মনে মনে ঘাবড়ে যাবে। কৃষ্ণপদও ঘাবড়ে গেল। কালাচাঁদ শুভকে এগিয়ে দিয়ে জ্যোতিষীর পায়ের কাছে বসল। জ্যোতিষী শুভর হাত দেখে, একটা সাদা কাগজে ফসফস করে কী সব যেন লিখে দিলেন। কৃষ্ণপদ লক্ষ করল, জ্যোতিষী বাঁ হাতে লিখলেন। সব কাজই বাঁ হাতে করছেন। যাকে চলতি ভাষায় ‘বাওয়া’ বলে, এই জ্যোতিষীও তাই। কাগজটা কৃষ্ণপদর হাতে দেওয়ার সময় কৃষ্ণপদ লক্ষ করল, জ্যোতিষীর বাঁ হাতে ছ'টা আঙুল। কড়ে আঙুলের পাশে আরও একটা ছোট আঙুল। জ্যোতিষীর লেখা কাগজটা নিয়ে, ওরা তিন জনে বেরিয়ে এল। বাইরে তখন কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার। অন্ধকার আকাশে কয়েকটা তারা ফুটে আছে। কৃষ্ণপদ কালাচাঁদকে জিজ্ঞেস করল, 'কৃষ্ণপক্ষ শেষ হতে আর ক’দিন বাকি?’

কালাচাঁদ বলল, ‘আরও দশদিন।'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘এই দশদিনে আরও অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে, তাই না?’ কালাচাঁদ উত্তর দিল, ‘অবশ্যই পারে।'

শুভ কালাচাঁদের কাছে জানতে চাইল, ‘কী ঘটতে পারে?’

কালাচাঁদ বলল, ‘সেটা না ঘটার আগে বলা যাবে না। তবে খুনটুন হতে পারে।' নিজেদের ঘরের সামনে এসে শুভ বলল, ‘একবার রিঙ্কুদির ঘরে যেতে হবে। ওকে বলতে হবে না, কী কী হল। কালাচাঁদদা, আমি কিন্তু জ্যোতিষী বাবার ঘরের খাটের নীচে এক জোড়া তবলা দেখেছি।'

কালাচাঁদ বলল, ‘তাই নাকি! উনিও তবলাবাদক? গোটা বাড়ি জুড়েই তবলা তরঙ্গ চলছে।'

কালাচাঁদ ওদের দু’জনকে নিয়ে রিঙ্কুর ঘরে এল। দরজা খুলে দিতেই দেখা গেল, রিঙ্কুর ঘরে একজন লোক বসে রিঙ্কুর মা’র নাড়ি দেখছে। কৃষ্ণপদ বলল, ‘আপনার মা কি অসুস্থ?’ রিঙ্কু জবাব দিল, ‘মনে হচ্ছে, প্রেশারটা বেড়েছে। তাই ডাক্তারবাবুকে ডেকে একবার পরীক্ষা করিয়ে নিচ্ছি। আপনাদের কাজ হয়েছে তো?’

কৃষ্ণপদ কিছু বলতে যাচ্ছিল, রিঙ্কু তাকে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বলল, 'আপনারা ঘরে যান। আমি কালাচাঁদের কাছ থেকে সব শুনে নেব। পরে আপনাদের সঙ্গে কথা বলব। ওই পাথরের টুকরো, যদিও ওটা পাথরের মতো দেখতে হলেও আসলে কাচ। খুব দামি কাচ। বেলজিয়ামের। ওটা দিয়ে যান।'

কৃষ্ণপদ ওটা দিল। দেওয়ার আগে এই বিচিত্র কাচটাকে দেখল, যেটা দেখতে শ্বেতপাথরের মতো। শুভ বলল, 'আমাদের একটা করে হরীতকী দিয়েছেন। আর আমার হাত দেখে একটা কাগজে কী সব লিখে দিয়েছেন।'

রিঙ্কু তড়িৎগতিতে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘দেখি সেই কাগজটা।' কৃষ্ণপদ পকেট থেকে কাগজটা বের করতে করতে বলল, ‘ওই জ্যোতিষী কিন্তু বাওয়া।

মানে বাঁ হাতে লেখেন, বাঁ হাতে সব কাজ করেন। আর বাঁ হাতে ছ'টা আঙুল। কড়ে আঙুলের পাশে আরও একটা ছোট আঙুল।

কৃষ্ণপদ যখন কথাগুলো বলছিল, তখন রিঙ্কুর মুখ ক্রমেই খুশিতে চকচক করে উঠছিল। ডাক্তারও মনোযোগ দিয়ে কৃষ্ণপদর কথা শুনছিলেন। কৃষ্ণপদ থামতেই ডাক্তারবাবু রিঙ্কুর দিকে তাকালেন। রিঙ্কু জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন দেখলেন?’

ডাক্তারবাবু বললেন, 'আপনার অনুমানই ঠিক। যে ওষুধ যেমনভাবে চলছিল, তাই চলবে।' কৃষ্ণপদ আর শুভ বেরিয়ে এল। কালাচাঁদকে রিঙ্কু একটু থেকে যেতে বলল। যদি নতুন কোনও ওষুধ কিনে আনতে হয় তা হলে এই রাতে কালাচাঁদকে দরকার হবে। কৃষ্ণপদ নিজের ঘরে এসে জামা খুলতে খুলতে ভাবল, রিঙ্কু মেয়েটাই বা কেমন? জ্যোতিষীকে নিয়ে ওরই বা এত মাথাব্যথা কেন। জ্যোতিষী সম্পর্কে রিঙ্কু কি অন্যরকম কিছু ভাবে? কিন্তু সেই অন্যরকম ভাবনাটা কেমন? পৃথিবীর বহু মানুষই তো বাঁ হাতে লেখে এবং বাঁ হাতে সব কাজ করে। জ্যোতিষীও হয়তো সেই লক্ষ লক্ষ বাওয়াদের একজন। তাতে রিঙ্কুর এত খুশি হওয়ার কারণ কী। তাঁদের অফিসের একজন লোকের তো ডান পায়ে ছ'টা আঙুল। সবাই ঠাট্টা করে বলে, ‘দত্তদা, আর-একটু বেশি পুণ্যি করলে একটার জায়গায় দু’টো মাথা হত।’

দত্তদা ও রসিক মানুষ। সে হেসে বলে, ‘দু’টো মাথা দিয়ে কাজ করলে কি অফিস আমাকে দু'জনের মাইনে দিত?’

জামা খুলে কৃষ্ণপদ পাখার তলায় বসল। সে জানে, রান্নাঘরের কাজ মিটলেই রেণু এসে জানতে চাইবে শুভকে দেখে জ্যোতিষী কী বলেছেন। যা বলেছেন, তা শুনে রেণুর ভয় বাড়বে বই কমবে না। আসলে শুভকে দিয়ে রিঙ্কু তার কোনও একটা উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে চাইছে। চব্বিশ বছরের একটা মেয়ে এতদিনে বিয়ে-থা করে সংসার করার কথা। তা না করে রিভলভার নিয়ে ঘুরছে। ওটা রিভলভার না পিস্তল, সেটা অবশ্য কৃষ্ণপদ জানে না। শুভ এসে বাবার কাছে দাঁড়াল। বলল, ‘হরীতকীটা কী করব?’

কৃষ্ণপদ বলল, ‘ওটা টেবিলে রেখে দে, নইলে জানলা দিয়ে ফেলে দে। কীসের থেকে কী হয়, সেটা তো জানি না।'

শুভ বলল, ‘আজ থাক। কাল রিঙ্কুদিকে দিয়ে আসব। ও তো ঘরের মধ্যে কত কিছু করে।

কৃষ্ণপদ এবার নিজের জামার পকেট থেকে হরীতকীটা নিয়ে দেখল। শুভরটাও দেখল। দূর থেকে দেখলে হরীতকীর মতোই মনে হয় বটে। কিন্তু হাতে নিয়ে একটু টেপাটেপি করে কৃষ্ণপদ বুঝল, এটা আর যাই হোক, হরীতকী নয়। এটা কাল সকালেই রিঙ্কুর কাছে দিয়ে দেওয়া ভাল।

কিন্তু কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল না। কালাচাঁদ এসে কৃষ্ণপদ আর শুভকে ডেকে নিয়ে গেল। ঘরের মধ্যে সেই ডাক্তার তখনও বসে। ওদের দেখে রিঙ্কু বলল, ‘আপনাদের হরীতকী দু’টো দেখি।'

ওরা দু'জনেই ওদের হরীতকী রিঙ্কুর হাতে দিল। রিঙ্কু দেখে নিয়ে ডাক্তারবাবুর হাতে দিয়ে বলল, ‘ডাক্তারবাবু দেখুন। আমার অনুমান ঠিক কিনা।'

ডাক্তারবাবু হরীতকী দুটি দেখতে দেখতে বললেন, ‘আপনার কথাই ঠিক। এগুলো হাতে বানানো হয়। পুরনো দিনে, এমনকী এখনও কোনও গুপ্ত হানায় এগুলো ব্যবহার করা হয়। এর ভিতরে এক ধরনের গ্যাস ভরা আছে। তিন থেকে চার ঘণ্টা পর নিঃশব্দে এটা খুলে যায় বা ফেটে যায়। তখন এই গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে ঘরের সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। প্রবল ঘুম। শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং অসুস্থ লোকের পক্ষে এই গ্যাস মারাত্মক। মৃত্যুও হতে পারে।'

কৃষ্ণপদর শরীর কাঁপতে লাগল। সে শুভকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমরা তো কারও ক্ষতি করিনি। আমাদের কেন ক্ষতি করবে? আমাদের দোষটা কোথায়?’

রিঙ্কু বলল, ‘সবচেয়ে বড় দোষ, আপনি বা আপনারা আমার কথা মতো কাজ করেন। এই বাড়িতে আমরা আসার আগে দু’জন রহস্যজনকভাবে খুন হয়েছেন। সেই খুনের কিনারা করার দায়িত্ব নিয়েই আমার এখানে আসা। আদিনাথবাবু আর কালাচাঁদ ছাড়া কেউ জানেন না, আমার আসল পরিচয় কী। আমি সুনেত্রা সেন, প্রাইভেট গোয়েন্দা। এই যে ডাক্তারবাবু, ইনি লালবাজার থেকে এসেছেন।'

রিঙ্কু ডাক্তারবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ রাতেই আমার অ্যাকশন শুরু হবে। আপনি আমাকে সাহায্যের জন্য তৈরি তো?’

ডাক্তারবাবু উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, ‘আমার লোকেরা বিভিন্ন বেশে বাড়িটার বাইরে

সবক'টা রাস্তা আটকে থাকবে। আমি থাকব নীচে যাওয়ার সিঁড়ির মুখে। ঠিক রাত বারোটায়।' ডাক্তারবাবু হাতে ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। কালাচাঁদ তার সঙ্গে নীচে গেল। রিঙ্কুর মা বিছানার উপর উঠে বসে শুভকে আদর করে বললেন, ‘দাদুভাই, আজ রাতে অসুরবধ পালায় তোমাকেও দরকার। ভয় পাবে না তো?’

কৃষ্ণপদ আঁতকে উঠে বলল, ‘তা কী করে সম্ভব? এই সব খুনখারাপির মধ্যে ওইটুকু ছেলে কী করবে?’

" রিঙ্কু বলল, ‘ভয় পাবেন না। শুভ থাকবে আমার ঘরে। এই যে, ইনি, ইনি, আসলে আমার মা নন, মা সেজে আছেন। উনি ভবানীপুরের বিখ্যাত মুখুজ্জে বাড়ির সেজবউ। উনিই এই কেসটা আমাকে হাতে নিতে বলেছেন। একটা জোচ্চুরি কেসের কিনারা করতে এসে, খুনির সন্ধান পেয়ে গিয়েছি।'

শুভকে রেখে কৃষ্ণপদ একা যেতে চাইল না। রিঙ্কু বলল, ‘বেশ, তা হলে কালাচাঁদ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।'

কৃষ্ণপদ এক বুক উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।

কালাচাঁদ ফিরে আসা পর্যন্ত কৃষ্ণপদকে অপেক্ষা করতেই হবে। এখন সেই অপেক্ষা করতে গিয়ে মনে হল, অপেক্ষার প্রহরগুলো কত দীর্ঘ মনে হয়। আধঘণ্টার মধ্যেই কালাচাঁদ ফিরে এল। কিন্তু এই আধঘণ্টা যেন কৃষ্ণপদর কাছে আট ঘণ্টারও বেশি সময় বলে বোধ হচ্ছিল!

কালাচাঁদ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিতে দিতে বলল, ‘ঘরপোড়া গোরু ঘরে ইন করে গিয়েছে। হাতে বিয়েবাড়ির কাঁচা বাজার করার মতো একটা ব্যাগ।'

রিঙ্কু বলল, ‘অত বড় ব্যাগে করে কী নিয়ে এল?’

কালাচাঁদ নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বলল, ‘উনি তো তবলা ছাড়া কিছু আনেন না। মনে হচ্ছে, আজ রাতে জোর তবলাচর্চা হবে।'

এই সময় রিঙ্কুর মোবাইলে ফোন এল। রিঙ্কু কানের কাছে তুলে নিয়ে উঠে গেল অন্য ঘরের দিকে। একটু পরে ফিরে এসে বলল, ‘কালাচাঁদ, আজ রাতে মাত্র দু’টো কালো বিড়াল ছাড়া থাকবে। যে দু’টোর সবচেয়ে ভাল ট্রেনিং। তুমি আজ তোমার ঘরে শোবে না। কিন্তু ট্রেনিং দেওয়া বিড়াল দু’টো থাকবে তোমার ঘরের কুলুঙ্গিতে। আজ রাতে জ্যোতিষীর টার্গেট শুভ। আর তবলিয়ার টার্গেট তুমি।'

কৃষ্ণপদ যেন শিউরে উঠল। সে বলল, ‘শুভ টার্গেট কেন? ও তো কোনও অন্যায় করেনি।'

রিঙ্কু মোবাইলটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল, ‘শুভই তো প্রথম আমাকে জিজ্ঞেস করে, মানে আমার কাছে জানতে চায়, ওই তবলিয়া কী চাকরি করেন? যাত্রাদল করার টাকা কে দিলেন? ওঁর বাবা? আমার নির্দেশমতো দরজার চাবি লাগানোর ফুটো দিয়ে দেখেছে, কিছু কিছু তবলা সিন্দুকে তুলে রাখে।'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘তাতে কী হল?’

রিঙ্কু বলল, ‘শুভর কথা শুনেই আমি ঘরপোড়া গোরুর উপর নজর রাখি। দূর থেকে তবলিয়া আর জ্যোতিষীর ফোটোও তুলি। ওরা জানতেও পারে না। সেই ফোটো, বিশেষ করে তবলিয়ার ফোটোটি দেখে এই ইনি, যিনি আমার মা সেজে আছেন, তিনি বলেন, আমি যাকে খুঁজছি তার সঙ্গে এই লোকটার মুখের মিল খুঁজে পাচ্ছি। তবে সেই লোকটার মাথায় তো এত চুল ছিল না। ছিল চকচকে টাক। তারপর তবলিয়ার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার পর বুঝি, ওটা খুব ভাল জাতের একটা উইগ। নিজেকে আড়াল করতে একজন উইগ পরেছেন আর-একজন দাড়ি রেখেছেন।'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘দাড়িটাও কি নকল?’

রিঙ্কু বলল, ‘না। ওটা আসল। আগে ছিল ফ্রেঞ্চকাট, এখন গোটা মুখেই দাড়ির জঙ্গল। ওই জ্যোতিষী জ্যোতিষবিদ্যা কতটা জানেন, তা আমি বলতে পারব না। তবে উনি একজন হিপনোটিস্ট। ওই বিদ্যেটি ভাল জানা আছে। যদি ঘর থেকে গভীর ঘুমের মধ্যে শুভকে নিয়ে যেতে পারেন, তা হলে তাকে ওই সম্মোহন শক্তির দ্বারা বশ করে শুভকে আমার বিরুদ্ধে কাজে লাগাবেন। শুভকে খুন করে, তার দায় আমার ঘাড়ে চাপিয়ে আদিনাথবাবুকে বলে, আমাকে এই বাড়ি থেকে তাড়াবেন। নয়তো নিজেরা ঠিকানা বদল করে অন্য কোথাও যাবেন।'

কৃষ্ণপদর গলা শুকিয়ে কাঠ। কোনওমতে এক গ্লাস জল খেয়ে বলল, ‘আমাদের এই সব ব্যাপারে কেন যে জড়ালেন? এখন যে কোন অঘটনের মধ্যে পড়তে হবে, সেটা কেমন করে জানব? আমার একটি মাত্র সন্তান।'

রিঙ্কু এবার একটু কঠোর গলায় বলল, ‘এত দুর্বল মন হলে আজকের পৃথিবীতে বাস করা যায় না। আজকের অ্যাটাকটা হবে আপনাদের ঘরে। দু'টো জাল হরীতকীর অ্যাকশনে আপনারা যখন গভীর ঘুমে থাকবেন, তখন জ্যোতিষীবাবাজি আপনাদের দরজা খুলে ঘরে ঢুকবেন। যে কোনও ধরনের দরজা এবং তালা তিনি অতি সহজেই খুলতে পারেন। আপনারা যে ঘরে আছেন, ওই ঘরেই অনেক বছর আগে চৌধুরীবাড়ির ছোটবউ খুন হন। ওই ঘরের দেওয়ালের মধ্যে পিতলের ঘড়ায় দেদার সোনা রাখা আছে। জ্যোতিষীর সেগুলো চাই। প্রয়োজনে ঘুমের মধ্যে আপনাদের হত্যাও করতে পারেন।'

এতক্ষণ ভয়টা কৃষ্ণপদর বুকের মধ্যে দাপাদাপি করছিল। এবার তার শরীর কাঁপতে লাগল। প্রথমে দু’টো পা, পরে দু'টো হাত, ক্রমে ক্রমে গোটা শরীর।

রিঙ্কু তার পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে বলল, ‘তবে আপনারা ভয় পাবেন না। আজ রাতে আপনারা শোবেন অন্য ঘরে। সেই ঘরটা নিরাপদ।

রিঙ্কু বলল বটে, কিন্তু কৃষ্ণপদ মনে তেমন সাহস পেল না। এই কৃষ্ণপক্ষের রাতে ভুলভুলাইয়ামার্কা একটা বাড়িতে যখন দু’পক্ষের অ্যাকশন শুরু হবে, তখন আর এই বাড়িটা নিরাপদ থাকবে না। থাকার কথাও নয়। সেই সময় কার গুলি, কার লাঠি কখন যে কার উপর পড়বে কে জানে। বাবা নবীন হালদার ভয় পেয়ে কখন যে কী করে বসবেন, সেটাও একটা সমস্যা। এ ছাড়া আছে লাল চোখওয়ালা উগান্ডার সেই হিংস্র বিড়াল দু’টো। যতই ট্রেনিং থাক, সে কি জানে কোন লোকটা ভাল আর কোন লোকটা মন্দ। অন্ধকারের মধ্যে কৃষ্ণপদর গলার শিরাও খাবলে ধরতে পারে। কৃষ্ণপদ বসে বসে যখন এই সব ভাবছিল, ততক্ষণে রিঙ্কু পাশের ঘর থেকে পোশাক বদলে এল। জিন্সের প্যান্টের উপর কালো গেঞ্জি। হাতের পিস্তলটা কোমরে গুঁজে নিয়ে বলল, 'চলুন, খাওয়াদাওয়া সেরে চট করে আমার সঙ্গে চলে আসুন। দরজায় আপনি তালা দেবেন না। তালা আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।'

কৃষ্ণপদ বলল, ‘আমাদের তালা আছে।'

রিঙ্কু বলল, ‘তা জানি। তবে আজকের রাতের জন্য আমার তালাটাই লাগাতে হবে।'

রিঙ্কু তাড়া দিয়ে কৃষ্ণপদ আর শুভকে নিয়ে গেল। কালাচাঁদ পকেট থেকে অনেক ঘুঙুর বের করে বলল, ‘আটটা কালো বিড়ালের গলাতেই আজ ঘুঙুর বেঁধে দিতে বলেছেন। তাতে ওদের মুভমেন্টটা টের পাওয়া যাবে। জ্যোতিষীবাবাজিও একটু ঘাবড়ে যাবেন। রিঙ্কুদি ফিরে আসা পর্যন্ত আমি আপনার সঙ্গে আছি।'

কালাচাঁদের কথা শেষ হতেই চিন্তামণির ঘরে তবলা বাজতে শুরু করল। সেই একই বাজনা। ধা-ধিন ধিন না...

কালাচাঁদ ফিসফিস করে বলল, ‘মনে হচ্ছে, ওরাও তৈরি। আমাদের সঙ্গে পুলিশ আছে। ভাববেন না, ওরা মাত্র দু’জন। ওরাও ভাড়া করে লোক আনতে পারে। টাকা দিলে যেমন চাল, ডাল, দুধ, ফল পাওয়া যায়, এখন টাকা দিলে মানুষ মারার লোকও মেলে। ওই টাকা দেওয়াকে বলে ‘সুপারি’ দেওয়া।'

রিঙ্কুর,মা বলে পরিচিত ভবানীপুরের সেই মুখুজ্জে গিন্নি বললেন, ‘যা বাজাবার, এখনই বাজিয়ে নিক। ও যে বাজাতে বাজাতে কারণে-অকারণে হঠাৎ করে একটা তেহাই দেয়, ওটা মনে হয় কোনও সংকেত।'

কালাচাঁদ বোতল থেকে জল খেল। বাঁ হাত দিয়ে ঠোঁটের উপর থেকে জলটা মুছে নিয়ে বলল, ‘যা বাজাবার আজকের মতো বাজিয়ে নিক। আজকের তেহাই ওঁর কোনও কাজেই লাগবে না।’

মুখুজ্জে গিন্নি আর কালাচাঁদ যাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা এলেন। প্রথমে রিঙ্কু আর তার পিছন পিছন নবীনবাবু, রেণু, শুভ আর কৃষ্ণপদ। রিঙ্কু বলল, ‘মুখে কোনও শব্দ করবেন না। আপনারা আমার পাশের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আপনারা সবাই যান, শুধু শুভ আমার কাছে থাকুক।'

রেণু আতঙ্কিত গলায় বলল, ‘শুভর কিছু হবে না তো?

রিঙ্কু রেণুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শুভকে নিয়ে কোনও চিন্তা নেই। আপনারা নিশ্চিন্তে গিয়ে পাশের ঘরে ঘুমিয়ে পড়ুন।'

ওরা তিনজন চলে যেতেই রিঙ্কু কালাচাঁদকে নিয়ে দরজার বাইরে গেল। বেশ খানিকক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, ‘ব্যস! সব ফাঁদ পাতা হয়ে গিয়েছে। ঘুঘু এবার ফাঁদে ধরা পড়বেই।' রিঙ্কুদের ঘরের বাতি নিভিয়ে দেওয়া হল। অন্ধকারে শুভ একটু ভয় পেয়ে গিয়ে পাশে বসা মুখুজ্জে গিন্নির হাত চেপে ধরল। তিনি অন্ধকারেই শুভর মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘অন্ধকারে ভয় পাচ্ছ দাদাভাই। একটু পরেই ঘরের ফুটল্যাম্প জ্বলে উঠবে। তখন আর এত অন্ধকার থাকবে না।'

সত্যি ফুটল্যাম্পটা জ্বলে উঠতেই ঘরের জমাট অন্ধকার যেন কিছুটা তরল হয়ে গেল। মুখুজ্জে গিন্নি রিঙ্কুকে খুব আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কালাচাঁদকে কোথায় রেখে এলি?’

রিঙ্কু বলল, ‘কৃষ্ণপদবাবুর খাটে চাদরঢাকা দিয়ে শুয়ে আছেন দু'জন পুলিশ। শুভর জায়গায় দু’টি বিড়াল আর তার পাশে কালাচাঁদ। কৃষ্ণপদবাবুর দরজার তালাটা আমার। ওটা একটা বিশেষ ধরনের তালা। ওর মধ্যে চাবি বা অন্য কিছু ঢোকালেই আমার এই রিমোট কন্ট্রোল মেশিনে আলো জ্বলে উঠবে এবং পিং পিং আওয়াজ হবে। চলতি ভাষায় একে বলা হয় ‘লক সেফটি অ্যালার্ম'। যেমন অনেক মোটরগাড়ি আছে না, যার স্টিয়ারিংয়ে হাত দিলে বিকট আওয়াজ হয়। এও খানিকটা ওই ধরনের। তবে আওয়াজের মাত্রাটা আমি ইচ্ছে করেই কমিয়ে রেখেছি, যাতে আমি ছাড়া আর কেউ যেন টের না পায়।'

কিছু একটা ঘটে গেলে তা সবাই বুঝতে পারে কী ঘটল। কিন্তু কিছু ঘটবার আগে যে উত্তেজনা, সেটা যে এত তীব্র, এমন টনটনে হয় সে অভিজ্ঞতা আগে কখনও শুভর হয়নি। শুভ মনে মনে অনেকক্ষণ ধরে ভেবেও বুঝতে পারছে না, রিঙ্কু তাকে কেন নিজের কাছে রেখে দিল। সে কোন কাজে লাগবে?

গোটা ঘর জুড়ে অন্ধকার। পায়ের কাছে মেঝের চার আঙুল উপরে ফুটলাইটের সামান্য আলো। ঘরের মধ্যে কেউ কোনও কথা বলছে না। রিঙ্কু নিজের হাতঘড়িটার দিকে দেখছে। টেবিলের উপর একটা বড় আকারের টেবিলঘড়ি। আজ এই ঘরের মধ্যে কোনও শব্দ নেই বলে, টেবিলঘড়ি চলার সামান্য শব্দ, যা দিনের বেলা প্রায় শোনাই যায় না, সেই শব্দটাই এখন বেশ স্পষ্ট মনে হচ্ছিল। শুভ খেয়াল করল, তবলা বাজনাটা আজ হঠাৎ করে থেমে গিয়েছে। রিঙ্কুদিকে কথাটা বলার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু বলতে সাহস পেল না। তবলা যে বন্ধ হয়ে গিয়েছে, সেটা কি এই ঘরের অন্য দু'জন টের পাননি? এই সময় রিঙ্কুর মোবাইলটা ক্ষীণভাবে বেজে উঠল। রিঙ্কু তার ঠোঁটের উপর হাত দিয়ে আড়াল করে বলল, ‘বলুন।'

ওদিক থেকে কে যে কী বলল, সে কথা শুভ জানে না। মোবাইল ফোন কান থেকে নামিয়ে ড্রয়ার থেকে কিছু একটা বের করে রিঙ্কু বলল, ‘এই জিনিসটা একটা টর্চ। দেখতে খুবই ছোট, কিন্তু এর আলোর খুব জোর আছে। ওই জ্যোতিষীর ঘরের একটা জানলার শিক বাইরে থেকে সহজেই খোলা যায়। নিজের অপকর্মের সাহায্যের জন্য এই ব্যবস্থাটা জ্যোতিষী নিজেই করেছিলেন। শুভ, তুমি আমার সঙ্গে যাবে। আমি জানলার শিক খুলে তোমাকে ওই ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দেব।'

শুভ শুকনো গলায় বলল, ‘তারপর?

রিঙ্কু বলল, ‘আলো জ্বেলে দেখবে, ওঁর বিছানাটা কোথায়। ওঁর বালিশের খোলের ভিতর একটা লাল ডায়েরি আছে। খুব ছোট। পকেট ডায়েরির মতো। ওই ডায়েরিটা নেবে। ওঁর কমণ্ডলুর মধ্যে একটা জিনিস আছে। তুমি জানলা দিয়ে ওই 'কমণ্ডলুটা আমাকে দেবে। তারপরই বেরিয়ে আসবে। আমিই তোমাকে বের করে আনব।'

মুখুজ্জে গিন্নি ফিসফিস করে বললেন, ‘সবই তো মোটামুটি জানা হয়ে গিয়েছে। এবার পুলিশ দিয়ে ঘিরে ফেললেই তো হয়।'

রিঙ্কুও ফিসফিস করে বলল, ‘তার আগে মোক্ষম প্রমাণগুলো দরকার। প্রমাণ ছাড়া ওঁকে আদালতে তোলা, এমনকী, পুলিশের হাতে দেওয়াও ঠিক নয়। এই প্রমাণের জন্যই তো আপনাকে নিয়ে এখানে এসেছি।'

মুখুজ্জে গিন্নি চুপ করে গেলেন। রিঙ্কু ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল। কখনও ঘড়ি দেখছে, কখনও নিজের লক সেফটি অ্যালার্মের দিকে দেখছে। রিঙ্কু ফিসফিস করে বলল, ‘এত দেরি তো হওয়ার কথা নয়। ওরা কি আমাদের প্ল্যান জানতে পেরে গিয়েছে। কিন্তু কেমন করে জানবে?’

রিঙ্কু নিজের চেয়ারে বসে মনে মনে নানা বিষয় ভেবে যাচ্ছিল। বেশিক্ষণ না, মিনিটদশেক পরেই লক সেফটি অ্যালার্মটা বেজে উঠল। রিঙ্কু চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। নিজের দরজার সামনে অ্যালার্ম কানে নিয়ে অপেক্ষা করতেই এক সময় ইশারায় শুভকে ডাকল। ঘরের দরজাটা ইচ্ছে করেই বন্ধ করেনি রিঙ্কু। শুধু ঘরের ভিতর থেকে ভেজিয়ে রেখেছিল। রিঙ্কু আর শুভ বাইরে এল। জ্যোতিষীর ঘরের জানলার তিনটে শিক খুলতেই যতটা ফাঁক হল, তা দিয়ে শুভ অনায়াসে গলে যেতে পারে। রিঙ্কু শুভকে জানলা দিয়ে গলিয়ে দিল। টর্চটা আগেই দেওয়া ছিল। রিঙ্কুর যা পোশাক, তাতে এই অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলে কেউ বুঝতে পারবে না, এখানে কোনও মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। শুভকে যা যা বলা হয়েছিল, ঘরের মধ্যে ঢুকে শুভ তাই তাই করতে লাগল। শুভ যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জানলার কাছে এসে ফিসফিস করে ডাকছে, ‘রিঙ্কুদি’...ঠিক তখনই একটা প্রবল চিৎকারে শুভ ঘরের মধ্যে বসে পড়ল। অন্ধকারের মধ্যে চিৎকারটা হয়েই চলেছে। শুভ ভেবে পাচ্ছে না, এমন একটা অবস্থায় তাকে ফেলে রিঙ্কুদি কোথায় গেল? এই সব চিৎকারে জ্যোতিষী যদি তাঁর নিজের ঘরে চলে আসেন, তা হলে শুভর অবস্থা কেমন হবে? জ্যোতিষী হয়তো শুভকে খুনই করে ফেলবেন। শুভ জানলার কাছে মুখ এনে বলল, ‘রিঙ্কুদি, তুমি কোথায়?’

কেউ কোনও সাড়া দিল না। শুভ বুঝতে পারছে, ওই চিৎকারে করিডোরের বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। লোকজন যাতায়াত শুরু করেছে। কিন্তু রিঙ্কুদি কোথায়? কেই বা অমন করে চিৎকার করে চলেছে? শুভ জানালার নীচে বসে পড়ল। এই ঘরের বাইরে প্রবল গন্ডগোল হচ্ছে। শুভ জানে না, তার ভাগ্যে কী আছে।

হঠাৎ জানলার বাইরে থেকে রিঙ্কুর গলা শোনা গেল। রিঙ্কুদি বলল, ‘শুভ, চলে এসো।’ রিঙ্কুর সাহায্যেই শুভ বাইরে এল। বাইরে এসে বলল, 'তুমি কোথায় গিয়েছিলে? এত চিৎকার করছে কে?’

রিঙ্কু শুভর হাত থেকে কমণ্ডলুটা নিয়ে বলল, ‘চিন্তামণি তবলিয়া, মানে ওই ঘরপোড়া গোরু কালাচাঁদের ঘরে ঢুকেছিল ওকে খুন করবে বলে। কিন্তু বিড়ালের চোখ তো অন্ধকারেও জ্বলে। সেই দু’টো কালো বিড়াল চিন্তামণির সর্বাঙ্গ খুবলে-আঁচড়ে রক্তারক্তি কাণ্ড করেছে।'

শুভ আবার জিজ্ঞেস করল, ‘সেই জ্যোতিষী কোথায়?’

রিঙ্কু হাসতে হাসতে বলল, ‘শুভ ভেবে যাকে তুলতে গিয়েছিল, তারাও তো ঘুঙুরপরা কালো বিড়াল। পালাবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারেনি। ওই ঘরে দু’জন পুলিশ ছিল। আমি ছিলাম দরজার বাইরে। জ্যোতিষী ঘরে ঢুকে যাওয়ার পর, আমি আমার রিমোট কন্ট্রোলে দরজাটা বাইরে থেকে একেবারে বন্ধ করে দিয়ে নীচের পুলিশদের ডাকলাম। এবার দেখবে চলো, জ্যোতিষী কেমন হাতকড়া পরে বসে আছেন।'

সবক'টা ঘরে তখন আলো জ্বলছে। শুভদের ঘরে হাতকড়া পরে বসে আছেন জ্যোতিষী আর তবলিয়া। তবলিয়ার দিকে তাকানো যায় না। বিড়াল যে মানুষকে এমনভাবে জখম করতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। শুভদের ঘরে আদিনাথবাবুও আছেন। রিঙ্কু কৃষ্ণপদর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এরা দু'জন কলকাতায় এক চিটফান্ডের ব্যাবসা ফেঁদে বসেছিলেন। আর এই মুখুজ্জে গিন্নি এদের কথায় বিশ্বাস করে এক লাখ টাকা ওই চিটফান্ডে রেখেছিলেন। আরও অনেকেই রেখেছিলেন। সকলের টাকা মেরে এরা দু'জন প্রথমে বনগাঁ, পরে শিলিগুড়ি, তারপর মোষপোতায় আসেন।.এই বাড়িটা যে ভূতুড়ে বাড়ি, এসব কথা এঁরাই রটান। যাতে বেশি ভাড়াটিয়া না থাকে। যদিও আদিনাথবাবু বলেন...’

আদিনাথবাবু বলেন, ‘আমি এখনও বলছি, এই বাড়িতে গুটিতিনেক মিউজিক লাভার নিরীহ ভূত ছিল এবং আছে। পরবর্তীকালে এই এঁরা দু'জন দুষ্ট ভূত এসে জুটেছেন,' আদিনাথবাবু জ্যোতিষী আর তবলিয়ার দিকে আঙুল তুলে কথাটা বললেন।

‘এঁরা গ্রাহকদের টাকা মেরে পালিয়েছে এইটুকুই আমি জানতাম। পরে কলকাতায় তদন্তে নেমে জানলাম, রামপুরহাট এবং বারাসতে দু’জন ব্যবসায়ীকে খুন করে মোট বারো লক্ষ টাকা এঁরা নিয়েছেন। জ্যোতিষীর চ্যালা সেজে এই চিন্তামণিবাবু রটাতেন, বাবাজির অলৌকিক ক্ষমতা। এক লাখ টাকা বাবাজির কাছে দিলে, দশ মিনিটের মধ্যে তিনি দু’লাখ টাকা করে দিতে পারেন। এই লোভে পড়ে দুই ব্যবসায়ী ঠকেন। তাঁরা পুলিশের ভয় দেখালে, কমণ্ডলুর ভিতর থেকে রিভলভার বের করে খুন করেন। মৃতদেহ পড়ে থাকে নির্জন ধানখেতের মধ্যে। দুটো খুনের ক্ষেত্রেই ময়না তদন্তের রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, গুলি মৃত ব্যক্তির দেহের ডান দিকে লেগেছে। গুলিটা বাঁ হাতে চালানো হয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস হয়। ‘লেফটি’ অর্থাৎ বাওয়া ছাড়া কেউ বাঁ হাতে গুলি চালায় না। সেই কারণেই শুভকে পাঠিয়েছিলাম কোষ্ঠী করার অছিলায়। উনি কোন হাতে কাজ করেন, তা দেখতে। আমার সন্দেহ মিলে গেল। এবার ছিল হাতের লেখার প্রয়োজন। শুভর হাত দেখে উনি সাদা কাগজে খসখস করে যা লিখে দিয়েছিলেন, সেই হাতের লেখা আর মুখুজ্জে গিন্নির সঙ্গে চিটফান্ডের টাকা নেওয়ার সময় যেসব লেখালেখি করেছিলেন, তা একই রকম এবং একই ব্যক্তির। বারাসতে মৃত ব্যক্তির গলায় পাঁচটা আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়। সেই হাতটা বাঁ হাত এবং সেই আঙুলের ছাপের সঙ্গে জ্যোতিষী মহারাজের আঙুলের ছাপ একেবারে মিলে গিয়েছে। আমার মোষপোতা অপারেশন সাকসেসফুল।'

পুলিশ অফিসার, যিনি ডাক্তার সেজে ছিলেন তিনি বললেন, ‘ভেরি ভেরি সাকসেসফুল। কনগ্র্যাচুলেশন রিঙ্কু। কিন্তু এই বাড়ির কোনও একটা ঘরে দু’কলস সোনার অলংকার চাপা দেওয়া আছে, সেটা কী ব্যাপার?’

আদিনাথবাবু বললেন, ‘এই রিঙ্কু মেয়েটির পরামর্শেই আমি এটা রটাই। আরে মশাই, তাই যদি থাকবে তা হলে আমরা, মানে উত্তরাধিকারীরা তো কবেই দেওয়াল-মেঝে খুঁড়ে এসব জিনিস নিয়ে নিতুম।'

রিঙ্কু বলল, ‘ওই চিন্তামণিবাবু আর জ্যোতিষী, যাঁর আসল নাম ভবেশ ঘোষ, ওঁদের মধ্যে লোভ সঞ্চার করার জন্য এই রটনার দরকার ছিল। চিন্তামণি নিজে কাউকে খুন করেননি। কিন্তু খুনের ব্যাপারে তাঁর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল। চিট ফান্ডের টাকা আর ওই দুই ব্যবসায়ীর টাকা, সব থাকত চিন্তামণির কাছে। টাকা লুকিয়ে রাখার জায়গা ছিল ওই তবলাগুলো। দু'তিন জোড়া বাদ দিলে, সব তবলার ভিতরেই টাকা লুকনো আছে। কালাচাঁদ তবলাগুলো আনতে গিয়েছে।'

ঠিক তখনই কালাচাঁদ একটা বড় ব্যাগের মধ্যে করে অনেক তবলা নিয়ে ঘরে এল। চিন্তামণির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এবার আপনাকে সত্যি ঘরপোড়া গোরু মনে হচ্ছে। আমার ব্ল্যাক ক্যাট যা করেছে না! এবার জেলে গিয়ে যাত্রা করুন। আসলে যাত্রাদলটাও ছিল আপনার ভাঁওতা।’

পুলিশ অফিসার বললেন, ‘সত্যি, আজকের অপারেশনে বিড়ালগুলোর ভূমিকা অনবদ্য। কালাচাঁদের ঘরে আর কৃষ্ণপদবাবুর ঘরে ওরা না থাকলে, কালাচাঁদ খুন হত চিন্তামণির হাতে আর শুভ এবং কৃষ্ণপদবাবুর ভাগ্যে যে কী ছিল, কে জানে। এই বিড়ালদের বাহবা দিতে হয়।

রিঙ্কু চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পুলিশ অফিসারকে স্যালুট দিয়ে বলল, ‘ওই জন্যই তো আমার সংস্থার নাম ‘ক্যাট্স আই’!’

.

আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪৯২

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%