দুলেন্দ্র ভৌমিক

অনেকদিন পর মেজো মামার কাছ থেকে একটা চিঠি এল। যেমন তেমন চিঠি নয়, একেবারে রেজিস্ট্রি চিঠি। রীতিমতো সইসাবুদ করে নিতাইকে চিঠিটা নিতে হল। চিঠিটা পেয়ে নিতাই একটু অবাক হল। মেজো মামার চিঠি পাওয়া তো লটারি পাওয়ার মতো ব্যাপার নয় যে, অবাক হতে হবে। আসলে বছরে দু’বার মেজো মামা চিঠি দেন এবং নিতাই তখন মেজো মামার চিঠির উত্তর দেয়। সেই দুটো দিন হল, পয়লা বৈশাখ এবং বিজয়া দশমী। চিঠিটা আসে নিতাইয়ের মা'র নামে। কিন্তু মা’র জবানিতে চিঠিটার উত্তর দেয় নিতাই। এবার চিঠিটা এল পৌষের গোড়ায় এবং নিতাইয়ের নামে। এমন অসময়ে মেজো মামার চিঠি কখনও আসেনি। অবাক হওয়ার ব্যাপারটা হল এইখানে।
মেজো মামার চিঠিটা খুলে পড়ার পর প্রথমে নিতাই রোমাঞ্চিত হল। পরে নিজেই নিজের ভিতরে অন্য এক ধরনের উত্তেজনা বোধ করতে লাগল। মেজো মামা লিখেছেন:
.
স্নেহের নিতাই,
আশা করি তোমরা সকলে কুশলেই আছ। দিদির শরীর কেমন, তাহা জানিতে ইচ্ছা হয়। নিজে যাইতে পারি না বলিয়া নিজেকেই অপরাধী মনে হয়। সবই কপালের লিখন। যাই হোক, এতক্ষণে তোমাকে যে কারণে এই জরুরি পত্রটি প্রেরণ করিলাম, তাহা মন দিয়া পড়িয়া দু’-একদিনের মধ্যেই কর্তব্য স্থির কোরো। সেই কিশোরকাল হইতে তোমার ভূত দেখিবার প্রচণ্ড শখ। তোমার স্বর্গত পিতৃদেব, আমার জামাইবাবুও জীবিতকালে ভূত দর্শনে অভিলাষী ছিলেন। বহুবার ভূত দেখিবার জন্য বায়না করিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহাকে দেখাইতে পারি নাই বলিয়া সেই দুঃখ অদ্যাবধি আমাকে পীড়িত করে। এতক্ষণে একটি সুযোগ আসিয়াছে। যদি তোমার মধ্যে ভূত দেখিবার বাসনা এখনও জাগ্রত থাকে, তবে পত্রপাঠ আমার বাড়িতে চলিয়া আসিও। যদি বাসনা পূর্বাপেক্ষা স্তিমিত হইয়া থাকে, তাহা হইলে সেই বাসনাকে জাগ্রত করো। পিতার অপূর্ণ সাধ পুত্রের মধ্য দিয়াই পূর্ণ হয়। ইহাই পিতৃভক্তির নিদর্শন। তুমি ভূত দর্শন করিলে তোমার পিতা অর্থাৎ আমার জামাইবাবুর আত্মা তৃপ্তিলাভ করিবে। অতএব, আমার একান্ত ইচ্ছা, মনে কোনওরূপ দ্বিধা না রাখিয়া অতি সত্বর চলিয়া আসিও। আমি তোমার ভূত দর্শনের সমুদয় বন্দোবস্ত করিয়া রাখির।
ইতি
তোমার মেজো মামা
.
মেজো মামার কাছ থেকে এমন চিঠি পাওয়ার পর চুপ করে বাড়িতে বসে থাকার কোনও মানে হয় না। বড় মামা নাকি অনেকরকম ভূতের সঙ্গে ওঠা-বসা করেছেন। তাঁর বসবার ঘরটা ছিল উঠোনের একধারে। মস্ত বড় উঠোনটা পেরিয়ে তবে শোওয়ার ঘরে বা মূল বাড়িতে আসতে হত। তখনও মামার বাড়ির সামনের রাস্তা পাকা হয়নি। কাঁচা রাস্তার পাশেই বড় মামার বসবার ঘর। সন্ধে সাতটা, বড়জোর আটটার পর এই পথ দিয়ে লোক চলাচল কমে যেত। গ্রামের দিকে কেউ তো বেশি রাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকে না। সেইসব সময় নাকি ভূতেরা আসত বড় মামার সঙ্গে দাবা খেলতে। আস্তে করে ঠেলা মেরে বসবার ঘরের ভেজানো দরজা খুলে দিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ভূত বলত, ‘কেষ্টা, এলুম। দু’ হাত খেলে যাই।'
বড় মামার নাম ছিল কৃষ্ণপদ, মেজো মামার নাম রামপদ। লোকে যে বলে ভূতের মুখে রামনাম বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার, কিন্তু ‘বড়ই অদ্ভুত’ বলে নিতাইয়ের মনে হয় না। মামার বাড়িতে ভূতেরা এসে মেজো মামাকেও নাকি অনেকবার ‘রাম রাম’ বলে ডেকেছে। দু’-তিনবার দাবাও খেলে গিয়েছে। কোনও অঘটন তো ঘটেনি। যদিও এতসব বৃত্তান্ত নিতাই নিজে কখনও দেখেনি, শুনেছে। কিছু শুনেছে মেজো মামার মুখে, কিছু শুনেছে মা’র কাছ থেকে। মা’র কাছ থেকে নিতাই এও শুনেছে যে, তার মা’র বিয়েতে বড় মামার বিশিষ্ট কয়েকজন ভূত-বন্ধুও নিমন্ত্রিত ছিলেন। তাঁরা নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে একটু অধিক রাত্রে এসেছিলেন।
চিঠিটা পকেটে নিয়ে নিতাই মা'র কাছে এল। মাকে বলল, ‘মা, মেজো মামা আমাকে রেজিস্ট্রি করে চিঠি পাঠিয়েছেন।'
নিতাইয়ের মায়ের নাম প্রিয়বালা। নিতাইয়ের কথা শুনে হাতের কাজ থামিয়ে তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। নিতাই দেখল, তার মায়ের সামনে পানের বাটা, চুন, কুচো সুপুরি আর জর্দার কৌটো। নিতাইয়ের কথা শুনে পান বানানো থামিয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘এই অসময়ে রামুর চিঠি এল কেন? তাও আবার রেজিস্ট্রি করে! কী ব্যাপার?’
নিতাই চিঠির বিষয়টা মাকে বলতেই প্রিয়বালা লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সেই ভূত দেখার ডাক এল, কিন্তু এতদিন পরে যে! তোর বাবা দেখে যেতে পারলেন না। দাদাকে তোর বাবাও কতবার বলেছেন, ‘দাদা, একবার দেখান না।’ সবই কপালের ব্যাপার। তোর বাবার কপালে ছিল না।'
নিতাইয়ের মনে হল, মা যেভাবে দুঃখপ্রকাশ করলেন, যেন ভোররাতে উঠে ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থেকেও টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখা হল না কিংবা আগ্রার তাজমহল দেখার সাধ পূর্ণ হল না। নিতাই মা’র মুখের দিকে একটু দেখে নিয়ে বলল, ‘আমি আগামীকাল দুপুরেই মামার বাড়ি রওনা দেব।'
শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেন। বনগ্রাম স্টেশনে নেমে অটো করে যেতে হবে কুঠিঘাটের কাছে। একেবারে ইছামতীর পারে। নিতাই ছেলেবেলায় স্টেশনের কাছে রিকশা দেখতে পেত। তাতে করেই দিব্যি মামার বাড়ি চলে যাওয়া যেত। সেসময়, তার মায়েদের ছেলেবেলায় ছিল গোরুর গাড়ি। এখন অবশ্য রিকশা, অটো, সাইকেল-রিকশা-ভ্যান, যাতায়াতের নানারকম ব্যবস্থা হয়েছে।
কিন্তু নিতাইয়ের যাত্রাটা শুভ হল না। স্টেশনে এসে দেখল, ট্রেন চলে গিয়েছে। অতএব, টিকিট কেটে পরের ট্রেনের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। ট্রেনে উঠে পড়ার পর ঘড়ি দেখে নিতাই অনুমান করল, সব ঠিকঠাক চললে বেলা চারটে নাগাদ সে মামার বাড়ি পৌঁছে যাবে। গোড়াতেই নিতাই টের পেয়েছিল তার যাত্রা শুভ ছিল না। ফলে কিছুই ঠিকঠাক চলল না। মছলন্দপুর স্টেশনে পৌঁছবার আগেই লাইনের ওপর গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রথমে অন্যদের মতো নিতাইও ভেবেছিল সিগনালের জন্য দাঁড়িয়ে পড়েছে। এখনই ছাড়বে। কিন্তু একটু পরেই জনৈক হকার মারফত খবর পাওয়া গেল, সামনে অবরোধ আছে বলে আগের ট্রেনটাও স্টেশনের বাইরে লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন যে কখন যাবে তা কেউ জানে না। কিন্তু এক্ষেত্রে নিতাইয়ের কী-ই বা করার আছে।
ট্রেনের কামরার মধ্যে বসে থাকতে থাকতেই সে টের পেল, বাইরে দিনের আলো কমে গিয়ে চারপাশে মলিন বিকেল স্পষ্ট হচ্ছে। নিতাই যে ভেবেছিল দিনে দিনে পৌঁছবে, সেটি হওয়ার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এল। অবশেষে নিতাই যখন স্টেশনে পৌঁছল, তখন শীতের সন্ধে উতরে গিয়ে রাত ঘন হচ্ছে। মাত্র জনাকয়েক যাত্রী স্টেশনে নামল। স্টেশনের বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। খানকয়েক দোকানে হ্যারিকেন, লম্ফজাতীয় কিছু জ্বলছে। বোধহয় এই এলাকা জুড়ে এখন লোডশেডিং। নিতাই স্টেশনের বাইরে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোনও অটো বা রিকশা দেখতে পেল না। এই অন্ধকারে পথ চিনে যাওয়া তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব বলে মনে হল। রেললাইনে অবরোধ না থাকলে এতক্ষণ সে দিব্যি পৌঁছে যেতে পারত। কিন্তু এখন কী হবে?
ভাবতে ভাবতেই সে একটা ভ্যাপো-ভ্যাপো আওয়াজ শুনে বুঝল, নির্ঘাত কোনও রিকশা আসছে। যদি যেতে রাজি হয় তা হলেই তার কষ্ট লাঘব। অন্ধকারের মধ্যে যেটি তার সামনে এসে দাঁড়াল, সেটি রিকশা নয়, রিকশা ভ্যান। ভ্যানটা এসে তার সামনে দাঁড়াতেই নিতাই বলল, ‘যাবেন?’
ভ্যানচালক জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায়?’
নিতাই বলল, ‘কুঠিঘাট।'
নিতাই শুনেছে, এইরকম রিকশাভ্যানে করে এই অঞ্চলে শুধু মালপত্র নয়, মানুষজনও যাতায়াত করে। নিতাই অন্ধকারে ভ্যানচালকের মুখটা দেখতে পাচ্ছিল না। চালকের মাথায় একটা লাল রঙের টুপি। সম্ভবত উলের। ভ্যানচালক বলল, ‘পিছনে উঠে পড়ুন।’ নিতাই জানতে চাইল, ‘কত লাগবে?’
চালক বলল, ‘এখন এই রাতেরবেলায় তো কোনও প্যাসেঞ্জার পাব না। কুঠিঘাট খুব কাছের পথও নয়। পৌঁছবার পর যা বিবেচনা করবেন তাই দেবেন।'
নিতাই যেন বর্তে গেল। চালকের সামনে থেকে পিছনের দিকে এসে দেখল, ভ্যানের ওপর একটা বস্তা আড়াআড়িভাবে শোওয়ানো। বোধহয় কোনও আনাজের বস্তা। নিতাই ভ্যানের ওপর বসে নিজের ব্যাগটা ওই বস্তাটার পিছনে রেখে বলল, 'চলুন।'
ভ্যান চলতে লাগল। স্টেশনের বাইরের দোকানগুলোতে টিমটিমে আলো জ্বলছিল। কিন্তু স্টেশন চত্বর পেরিয়ে আসতেই সেটুকু আলোও হারিয়ে গেল। নিতাইয়ের মনে হল, একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে তাকে নিয়ে ভ্যানটা এগিয়ে যাচ্ছে। সামনে-পিছনে ডাইনে-বাঁয়ে শুধু অন্ধকার। রাস্তার দু'পাশে বড় বড় গাছের পাতাগুলো রাস্তার মাথার ওপরে এমনভাবে ছেয়ে আছে যে, ওপরের আকাশটাকেও দেখা যাচ্ছে না। ভ্যানচালক ভ্যান চালাতে চালাতেই বলল, ‘ইদিকের রাস্তা ভাল না। ভ্যান গাড়ি শুধু লাফাবে। আপনি ওই বস্তাটা ধরে বসুন।
নিতাই একটু পিছনে সরে এসে বস্তাটার ওপর কনুইয়ের ভর দিয়ে বসতে যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করল, ‘কী আছে বস্তার মধ্যে? কেমন একটা গন্ধ বেরোচ্ছে?’
ভ্যানচালক বিরক্ত গলায় বলল, 'তা তো বেরোবেই। সকালের মড়া, এখন নিয়ে যাচ্ছি থানায়। ডেডবডি তো পচতে শুরু করেছে। পুলিশের হুকুমে থানায় নিয়ে যাচ্ছি। তারপর সেখান থেকে যদি মর্গে নিয়ে যেতে বলে তাই নিয়ে যাব।'
নিতাই সোজা হয়ে বসল। সে টের পেল, পৌষের শীতেও তার শরীর ঘামছে। সে কঠিন গলায় বলল, ‘ভ্যান থামান। আমি নেমে যাব।'
ভ্যানটা থামাতেই নিতাই তার ব্যাগটা নিয়ে লাফ দিয়ে নামতে যাওয়ার আগে ওই বস্তার ভিতর থেকে ভারী অদ্ভুত গলায় কে যেন বলল, ‘নেমে গেলে আর গাড়ি পাবি না। কত অসৎ লোকের সঙ্গে ওঠাবসা করছিস, আর আমার মতো নিরীহ একটা ডেডবডির সঙ্গে কিছুটা পথ যেতে তোর এত আপত্তি?’
নিতাই মুহূর্তমাত্র দেরি না করে লাফ দিয়ে নীচে নেমে পড়ল। আর তখনই চালক খপ করে তার হাতটা ধরে বলল, ‘যতটুকু এসেছেন তার ভাড়াটা অন্তত দিন।'
নিতাই পকেটে হাত ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, ‘কত?’
চালক বলল, ‘পাঁচ টাকা দিন।'
নিতাই পাঁচ টাকার একটা কয়েন বের করে লোকটার হাতে দিয়ে বলল, 'আপনার আগে বলা উচিত ছিল।'
চালক কোনও কথা না বলে ভ্যান চালিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকারে হারিয়ে গেল। অন্ধকার রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে তার মনে হল, ভ্যান থেকে নেমে সে কি ভুল করল? সে যদি বস্তার মধ্যে কী আছে সেটা না জানত, তা হলে কোনও ব্যাপার ছিল না। জানবার পর বস্তাবন্দি একটা মৃতদেহের সঙ্গে কী করে এতটা পথ যাওয়া যায়! মৃতদেহটা বন্ধ বস্তার ভিতর থেকে তাকে যতই অভয় দিক, তার কি কোনও মূল্য আছে? নিজের বাবা মারা গেলে তাঁকে যখন চিতায় শোওয়ানো হয়, তখন যদি বাবা চিতার ওপর উঠে বসে নিজের ছেলের নাম ধরে ডাকেন, তা হলে কি কোনও পিতৃভক্ত ছেলে সেই ডাকে সাড়া দেবে? সে তো ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগাবে।
নিতাই রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে এইসব ভাবছিল আর এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোনও গাড়ি আসছে কিনা দেখছিল। রাস্তা দিয়ে হুটহাট করে এক-একটা গাড়ি চলে যাচ্ছিল। হাত দেখালেও থামছে না। যতদূর চোখ যায় তত দূর পর্যন্ত শুধুই অন্ধকার। কোনও দোকান অথবা লোকজনের বাড়ি আছে কিনা বোঝা ছিল না। ঠিক এইরকম সময় তার পিছন দিক থেকে রিং রিং শব্দে বেল বাজাতে বাজাতে কিছু একটা আসছিল। নিতাইয়ের মনে হল, রাস্তার দু'ধারে তো ঘন মাঠ। ধান কাটার পর সেই শূন্য মাঠে তো কোনও রাস্তা নেই। নাকি মাঠের মধ্যে দিয়ে ইদানীং রাস্তা হয়েছে? নিতাই পেছন ফিরে অন্ধকারে স্পষ্ট করে কিছুই দেখতে পেল না। তবে মনে হল, কিছু একটা আসছে। হ্যাঁ, একটু পরেই একটা রিকশা এসে তার সামনে দাঁড়াল। নিতাই যেন হাতে চাঁদ পেল। সে বলল, 'ভাড়া যাবেন?’
রিকশাচালক বলল, ‘বোসো।’
নিতাই রিকশায় উঠে বসতে বসতে বলল, ‘আমি যাব...’
কিন্তু নিতাই কথা শেষ করার আগে রিকশাচালক বলল, ‘জানি। তুমি কুঠিঘাটে তোমার মামা রামপদ ঘোষালের বাড়ি যাবে। আমি তো তোমাকে নিতেই এলাম। আজ এখানে একদিনের জন্য বাস, অটো, রিকশা সব ধর্মঘট। ভাগনে আসবে কেমন করে? এই ভেবেই তোমার মেজো মামা উতলা। তাই তো আমার আসা।' ,
নিতাই বুঝল, তার মেজো মামাই নির্ঘাত এই রিকশাওলাকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু লোকটা এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঠিক তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। কেমন করে তাকে চিনল? নিতাই মনে মনে ভাবল, আগে মামার বাড়ি যাই, তারপর সব জানা যাবে। এখন রাত হয়তো বেশি নয়, তবু তার চলার পথে যেন মধ্যরাতের নির্জনতা। খানিক পর একটা বাড়ির সামনে এসে রিকশাটা থামল। রিকশা থেকে নামার আগে নিতাই মামার বাড়ির দিকে তাকাল। বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে আছে। নিতাই ভাবল, এখানেও লোডশেডিং! মামার বাড়ির কোনও ঘরেই কি কোনও আলো জ্বলছে না। জানলা বা দরজার ফাঁক দিয়ে একটু আলোও তো বাইরে আসতে পারে। কিন্তু এ কী অবস্থা! নিতাই অন্ধকারেই রিকশাওলার দিকে তাকাল। অন্ধকারে লোকটাকে ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। নিতাই বলল, 'বাড়িতে কেউ নেই নাকি?’
রিকশাওলা কোনও কথা না বলে জোরে জোরে রিকশার বেল বাজাল। এবার দরজা খোলার আওয়াজ শোনা গেল। একটু পরেই একটা টর্চের আলো এসে পড়ল মামাবাড়ির মস্ত উঠোনে। রিকশাওলা এবার বলে উঠল, 'ওই যে তেনারা বেরোচ্ছেন। এবার আমায় ছাড়ো।'
নিতাই রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কত দেব?’
রিকশাওলা বলল, ‘যা হয় দাও।' এই বলে নিতাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। মামার বাড়ির আলোটা এতক্ষণে ঘরের দরজা থেকে এগিয়ে এসে রিকশার ওপর পড়েছে। নিতাই দেখল, যে রিকশা করে সে এসেছে সেই রিকশাওলার বাড়ানো হাতটা সাধারণ মানুষের হাতের মতো নয়। রক্তমাংসহীন একটা কঙ্কাল হাত। এবার ভাল করে তাকিয়ে দেখল, লোকটার গোটা শরীরটাও তাই। একে কি মানুষ বলা যায় ! একটা কঙ্কাল কি রিকশা টানতে পারে! নিশ্চয়ই পারে। না পারলে সে এল কেমন করে!
নিতাই নিজের পকেটে হাত ঢুকিয়েছিল রিকশা ভাড়া দেবে বলে, কিন্তু রিকশাওলার হাত এবং শরীরের দিকে তাকিয়ে সে যেন পাথর হয়ে গেল। পকেট থেকে আর হাতই বের করতে পারছে না। টর্চ হাতে নিয়ে একটা লোক এসে দাঁড়িয়েছিল রিকশার কাছে। সেই লোকটাকে দেখে নিতাই খানিকটা ভরসা পেয়ে পকেট থেকে হাত বের করল। হাতে কুড়ি টাকার নোট। এই রিকশাওলা মানুষ নিশ্চয়ই নয়। তবে কি ভূত! ভূতেদের সঙ্গে নিতাই কখনও লেনদেন করেনি। কিছু কেনাকাটার সুযোগও পায়নি। অতএব, সে জানে না, ভূতেরা প্রাপ্য টাকা নিয়ে ব্যালেন্স ফেরত দেয় কি না। নিতাই কুড়ি টাকার নোটটা ওই কঙ্কাল হাতে দেওয়ার পর ওই ভূত অথবা কঙ্কালসার আজব মানুষটা বলল, “ঠিক আছে।'
যেভাবে কর্পূর উবে যায়, ওই রিকশাওলাও ঠিক সেইভাবে উবে গেল। এবার নিতাই টর্চ হাতে লোকটার দিকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে ভাবল, এ মানুষ তো? না কি... নিতাই লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমি কলকাতা থেকে আসছি। আমার নাম নিতাই চক্রবর্তী। আমার মেজো মামা...’
টর্চ হাতে লোকটা বলল, ‘আসুন। তিনি তো আপনার জন্যই অপেক্ষা করছেন আর চিন্তা করছেন। আমি তো মেজোবাবুকে বললাম, ‘ভয় নেই। ছোটবাবু নিজে যাবেন ভাগনেকে আনতে।'
নিতাই অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছোটবাবু মানে? আমার ছোট মামা? তিনি তো কবেই মারা গিয়েছেন!'
লোকটা এবার নিতাইকে নিয়ে বাড়ির দিকে যেতে যেতে বলল, ‘হাজার হোক, ঘোষাল বাড়ির ছোট ছেলে! অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে বলে তো ভূত হয়ে গিয়ে বনেবাদাড়ে ঘুরতে পারে না। পৈতৃক সম্পত্তিতে তার হক আছে। ক’দিন হল এ বাড়িতেই থাকে। পরের পয়সায় খাবে না বলে নিজেই রোজগার করে। দিনে অসুবিধে, তাই রাতে রিকশা চালায়। সরকারের বেজায় দয়া। তাই প্রায় রাতেই লোডশেডিং হয়। তখন ছোটবাবুর ভাল রোজগার।'
উঠোন পেরিয়ে ঘরের মধ্যে আসার পর দেখা গেল মেজো মামা সারা গায়ে চাদর জড়িয়ে একটা চৌকির ওপর বসে। তাঁর কোমর পর্যন্ত লেপ দিয়ে ঢাকা। নিতাইকে দেখে মেজো মামা বললেন, ‘আসতে কোনও কষ্ট হয়নি তো? বাস আর অটো ধর্মঘট, তার ওপর অন্ধকার রাত, তাই তোর ছোট মামা হরিপদ গিয়েছিল তোকে আনতে। তুই ট্রেনে ওঠার পরই হরি আমাকে খবর দিয়েছিল তুই আসছিস। ওরা চেষ্টা করলে সবই জানতে পারে তো!’
নিতাই ধপাস করে মেজো মামার পাশে বসে পড়ে বলল, ‘ছোট মামার রিকশাতেই তো এলাম। কুড়ি টাকা ভাড়াও দিলাম।'
মেজো মামা অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বললেন; ‘হরি তোর কাছ থেকে ভাড়া নিল? নিজের ভাগনেকে চিনতে পারেনি?
নিতাই বলল, ‘চিনেছে ঠিকই। নইলে আমায় আনল কেমন করে? বরং আমিই ছোট মামাকে চিনতে পারিনি।'
মেজো মামা আক্ষেপের গলায় বললেন, 'কী করে চিনবি বল? ওর তো আর আগের চেহারা নেই। এ বাড়িতে যাতায়াত আছে বলে আমরা দিব্যি চিনি।'
একটু চুপ করে থেকে নিতাই বলল, ‘ভূত দেখার কথাই যদি বলো, তবে তো ছোট মামার মধ্যেই তার দর্শন পেয়ে গেলাম।'
মেজো মামা বললেন, ‘তা অবশ্য ঠিক। তবে হরি হচ্ছে আমাদের ভাই। নিজের আত্মীয়, জ্ঞাতি, কুটুম, এদের ঠিক জেনুইন ভূত হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। এই হরি সেই অপঘাতে মরল, যদি আরও কয়েক বছর আগে মারা যেত, তা হলে জামাইবাবুর ভূত দেখার বাসনা কিছুটা হলেও পূর্ণ হত।'
নিতাই বলল, ‘কিছুটা কেন?’
মেজো মামা একটু হাসলেন। বেশ বিষণ্ন হাসি। তিনি বললেন, ‘মানুষের মধ্যেও যেমন সবাই পূর্ণ মানুষ নয়, ভূতেদের মধ্যেও তেমনই সবাই পূর্ণ ভূত নয়। হরি এখনও পৈতৃক ভিটের মায়া ছাড়তে পারল না। মানুষের সঙ্গেই ওর মেলামেশা বেশি। ভূতেদের সঙ্গে ওর তেমন মাখামাখি নেই। ভূতেদের কোনও অনুষ্ঠানে, সমাবেশে বা জলসায় হরি বিশেষ যায় টায় না। ফলে ভূত হলেও ভূতসমাজ ওকে এখনও পূর্ণ ভূতের মর্যাদা দেয়নি। তোকে দেখাব অন্যরকম ভূত। যাঁরা ভূতসমাজে কুলীন এবং নেতা গোছের।'

রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে যাওয়ার পর নিতাই জানতে চাইল, ‘সেই কুলীন আর নেতা গোছের ভূতেরা কোথায় থাকে?’
মেজো মামা বললেন, ‘আর থাকাথাকি! ওই নিয়েই তো বেজায় সমস্যা!’ নিতাই বিষম খাওয়ার ভঙ্গি করে বলল, ‘সমস্যা! ভূতেদেরও সমস্যা হয়?’
মেজো মামা বললেন, ‘হয় না আবার! খুব হয়। নগরায়নের ধাক্কায় দেদার ভূত এখন উদ্বাস্তু। তাদের পুনর্বাসনের কোনও ব্যবস্থাই নেই। তার ফলে যে সব্বোনাশটি হচ্ছে সেটি বড় মারাত্মক।'
নিতাই চমকে উঠে মামার দিকে তাকাল। প্রশ্ন করল, ‘মারাত্মক কেন?’
মেজো মামা লেপের নীচে পা ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন, ‘ভূতগুলো আস্তে আস্তে মানুষের সঙ্গে সমাজে মিশে যাচ্ছে। এমনভাবে মিশে গিয়ে ঘোরাঘুরি করছে যে, ভূত আর মানুষকে আলাদা করে চেনা ধাচ্ছে না। তার ফলে প্রায়ই নানারকম ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটছে। সেইসব কাণ্ডের মোকাবিলা করতে পুলিশ পড়ছে মহাবিপদে। প্রশাসনেরও কিছু করার নেই। ভূত ধরার বা উৎখাত করার কোনও পরিকাঠামো প্রশাসনের নেই।'
নিতাই মেজো মামার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তা হলে আমার কি পূর্ণ ভূত দেখা হবে না?’
মেজো মামা বললেন, ‘পূর্ণ ভূত মানে কমপ্লিট ভূত? তোকে সেই ভূত দেখাব বলেই তো জরুরি চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠালাম। এখান থেকে একটু দূরে সাহেবকুঠি বলে বড় একটা বাড়ি আছে। অব্যবহারে প্রায় পোড়োবাড়ি। সেই সাহেবকুঠি কয়েকদিনের মধ্যেই ভাঙা হবে। ওখানে নাকি কীসের ফ্যাক্টরি হবে। এবার ভেবে দেখ, সাহেবকুঠির অত ভূত যাবে কোথায়? সেই কারণেই ভূতেরা বেজায় চিন্তিত। আগামীকাল ওদের প্রতিবাদসভা। আমি তোকে ওই সভায় নিয়ে যাব। ওই সভায় একসঙ্গে অনেক কমপ্লিট ভূত দেখবি। অত কমপ্লিট মানুষও বোধহয় তুই দেখিসনি৷’
মেজো মামিমা তাকে নিয়ে এসে বললেন, ‘নিতাই, এই খাটে তুমি শোবে। মশারি টাঙিয়ে দিয়েছি।'
নিতাই মশারির মধ্যে ঢুকে পড়ার পর দেখল, তার খাটের ওপাশে আর-একটা চৌকি। তাতে চমৎকার করে বিছানা পাতা, কিন্তু কোনও মশারি টাঙানো নেই। নিতাই মেজো মামিকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওই বিছানায় কে শোবে? ওখানে তো মশারি টাঙানো নেই?’
পান চিবোতে চিবোতে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেজো মামি বললেন, ‘ওটা ঠাকুরপো’র জন্য। ওর খাবার ঢাকা দেওয়া আছে। ওর জন্য চিন্তা নেই। বসে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়বে। ঠাকুরপো’র মশারি লাগে না। শরীর বলতে তো শুধু হাড়। ওই হাড়ে মশার হুল ফোটে না।'
নিতাই দেখল মেজো মামি চলে যাচ্ছেন। সে একটা ঢোক গিলে কাতর চোখে ওই শূন্য বিছানাটার দিকে তাকিয়ে রইল। এমন একটা খবর জানার পর কেউই নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে না। নিতাইও পারল না। মেজো মামা তাঁর ভাইকে যতই ইনকমপ্লিট ভূত বলুন না কেন, তিনি যে আদ্যন্ত ভূত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ঘুমের ভান করে লেপের তলায় শুয়ে নিতাই কিন্তু ঘেমে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার মনে হল, ঘরের মধ্যে একটা উষ্ণ ভাব। তবে কি ছোট মামা এলেন? কিন্তু অন্ধকার ঘরে কিছুই দেখা না গেলেও খুটখাট আওয়াজ শুনে মনে হল, ছোট মামা এসেছেন। নিতাই চুপ করে রইল। ভূতেরা কি অন্তর্যামী? হঠাৎ ছোট মামা বলে উঠলেন, ‘কী রে নিতাই, ঘুমোলি?’
লেপের তলায় কেঁপে উঠলেও সে কোনও কথা বলল না। কোন কথায় কী বলে ফেলে বিপদ বাড়বে তার চাইতে চুপ করে থাকাই ভাল! জীবনে তো এর আগে কখনও কোনও ভূতের সঙ্গে একঘরে রাত কাটায়নি। ভূত দেখার অভিজ্ঞতা এমন হবে সেটা জানা থাকলে সে ভূত দেখতে আসত না। কিন্তু ঘরের মধ্যে এসব কী হচ্ছে? জোনাকির মতো ছোট ছোট কয়েকটা আলো ঘরের মধ্যে ঢুকল। নিতাই প্রথমে জোনাকিই ভেবেছিল। কিন্তু আলোগুলো হঠাৎ বড় হয়ে গিয়ে ঘরের মধ্যে ঘুরে ঘুরে পাক খেতে আরম্ভ করল। কে একজন যেন ছোট মামাকে জিজ্ঞেস করল, হরিপদ, মশারির মধ্যে কে শুয়ে রে? গন্ধটা তো ভাল ঠেকছে না!’
ছোটমামা জবাব দিলেন, ‘আমার ভাগনে। আজই কলকাতা থেকে এসেছে।'
তারপর ওরা ছোট মামার সঙ্গে ফিসফিসিয়ে অনেকক্ষণ কথা বলল। তারপর কখন যে কী হল তা আর মনে পড়ছে না। সকালে ঘুম ভাঙার পরই ছোট মামার বিছানাটার দিকে তাকালাম। বিছানাটা খালি। তার মানে ছোট মামা ঘুম ভেঙে উঠেই চলে গিয়েছেন।
দুপুরের পর মেজো মামার সঙ্গে সাহেবকুঠিতে এসে নিতাই দেখল, কোথাও কোনও মিটিংয়ের আয়োজন নেই। মেজো মামাকে বলতেই মেজো মামা বললেন, ‘এটা কি মানুষের মিটিং যে, রাজ্যের লোককে জানাতে জানাতে এবং জ্বালাতে জ্বালাতে মিটিংয়ের মিছিল চলবে। এখানে সব হয় নিঃশব্দে এবং সাবলীলভাবে। মনস্থির করে দেখবার চেষ্টা কর।'
নিতাই মনস্থির করে দাঁড়িয়ে থাকলেও কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। হঠাৎ তার কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলল, ‘নিতাই, তোর বাবাকে দেখ। মঞ্চের ওপর। দেখতে পাচ্ছিস?’ নিতাই বলল, ‘না।’
এবার সেই ফিসফিস করা গলা বলল, 'আমি তোর ছোট মামা। তোকে ছুঁয়ে রইলাম। এবার তুই সব দেখতে পাবি। আমার বড়দা ছুঁয়ে আছে মেজদাকে তাই মেজদা সব দেখতে পাচ্ছে।'
মানুষের হাতের স্পর্শ কেমন তা নিতাই জানে। জীবনে এই প্রথম একটা ভূতের কঙ্কালসার হাতের স্পর্শ পেয়ে তার মনে হল, ভিড়ের সময় ট্রামে, বাসে, রেলে, নানা অফিসে এরকম স্পর্শ সে আগেও পেয়েছে। এবার সে সবই দেখতে পাচ্ছে। সবই শুনতে পাচ্ছে। মঞ্চের ওপর বাবাকে দেখে সে একেবারে অভিভূত হয়ে গেল। মানুষ হয়ে বেঁচে থেকে যে সম্মান বাবা পাননি, আজ এত কমপ্লিট ভূত তার বাবাকে সেই সম্মান দিচ্ছে। গলায় মালা পরিয়ে অনুষ্ঠানের সভাপতি করেছে। তার মানে তার বাবাও কমপ্লিট ভূত। একজন ভূত বক্তৃতা দিচ্ছে, ‘আমরা শিবানুচর। অভিধানের ভাষায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুসমূহের মূল উপাদান অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ ও ব্যোম। কার্তিক মাসের কৃষ্ণচতুর্দশী মানব সমাজে ভূতচতুর্দশী নামেই বিখ্যাত। স্বর্গ ও মর্ত্য, উভয়লোকে আমাদের অবাধ যাতায়াত। অথচ আমাদের উৎখাত করার চক্রান্ত চলছে তো চলছেই। এই সমাজে, ভূতুড়ে ভোটার আছে, ভূতুড়ে অফিসকর্মী আছে, ভূতুড়ে রেশন কার্ড আছে, ভূতুড়ে মেডিকেল বিল, টেলিফোন বিল, ক্রেডিট কার্ডের বিল, সবই আছে; অথচ ভূতেদের কোনও স্থায়ী নিবাসই নেই। তাই আমাদের দাবি, নিউ টাউনে একটি ভূতবাংলো চাই। আমরা অকৃতজ্ঞ নই। প্রশাসনের সব কাজে আমরা সহযোগিতা করব।'
নিতাই দেখল, হলঘর ভর্তি ভূত। সবাই হাততালি দিল। কিন্তু হাততালির শব্দটা মানুষের হাততালির মতো শোনাল না। কেমন যেন খটাখট খটাখট আওয়াজ। এত ভূত একসঙ্গে দেখতে পাওয়া খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। ছোট মামা বললেন, ‘এত ভূত দেখে অবাক হচ্ছিস তো! গোটা ভারতের কথা বাদ দে। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই কমপ্লিট ভূতের সংখ্যা দু’ কোটি। মনে রাখিস, মানুষ মরে। কিন্তু ভূত মরে না। কেবলই বাড়ে। তাই আগামী দিনে সারা পৃথিবীতে ভূতের সংখ্যাই বেশি হবে। মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।
এইসময় নিতাইকে দেখতে পেয়ে নিতাইয়ের বাবা মঞ্চ থেকে নেমে এসে বললেন, 'বাবা নিতু, কেমন আছিস? অফিসে যে উপরি ইনকাম ছিল, সেটা এখনও চালিয়ে যাচ্ছিস? আজও অবধি কমপ্লিট মানুষ হলি না? মাকে যে দু’বেলা খেতে দিচ্ছিস, তা তো ঢের! যতদিন মানুষ ছিলুম ততদিন ভাবতুম, মানুষই সর্বোত্তম প্রাণী। কিন্তু ভূত হয়ে যাওয়ার পর ধারণা বদলাল। ভূতেদের মধ্যে কমপ্লিট ভূতের সংখ্যা বাড়ছে অথচ মানুষের মধ্যে কমপ্লিট মানুষের সংখ্যা কমেই চলেছে। তুই একটা ইনকমপ্লিট মানুষ। এ আর সহ্য হয় না।'
নিতাইকে বাবা ভর্ৎসনা করে চলে যাওয়ার আগে নিতাইয়ের কানটা এমনভাবে মলে দিয়ে গেলেন, যার যন্ত্রণা আজও টের পায় নিতাই। তার সবচেয়ে বড় দুঃখ, বাবা, কাকা, মাস্টারমশাই, এঁরা কেউ নন। কানটা মলে দিয়ে গেলেন তার ভূতবাবা। ভূতের হাতে কানমলা খাওয়াটা নিতাই আজও মেনে নিতে পারছে না।
.
আনন্দমেলা, মার্চ ২০০৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন