দুলেন্দ্র ভৌমিক

আমাদের বাল্যকালে স্কুলে ‘রেনি ডে’ বলে একটা ব্যাপার চালু ছিল। বর্ষাকালে বৃষ্টিতে ভিজে ছেলেরা স্কুলে এলেই নাম ডেকে ছুটি দিয়ে দেওয়া হত। বর্ষার মরশুমে এরকম ছুটি মাসে অন্তত দু’ থেকে তিনবার পাওয়া যেত। এই হঠাৎ ছুটিটার প্রতি ছাত্রবয়সে আমাদের সবারই খুব লোভ ছিল। কিন্তু আমরা চাইলেই তো আর রোজ রোজ স্কুল শুরু হওয়ার আগে বৃষ্টি নামতে পারে না। তবে বর্ষাকালে আমাদের মস্ত সুবিধে ছিল যে, ক্লাস চলাকালীন যদি ঝেঁপে বৃষ্টি আসত তাহলে ক্লাস বন্ধ হয়ে যেত। একালের যেসব ছেলেমেয়ে পাকা দালানে স্কুল করে, তাদের পক্ষে পঞ্চাশ দশকের কোনও অখ্যাত গ্রামের স্কুলবাড়ির চেহারা কল্পনা করা একটু কঠিন ব্যাপার। ঠিক তেমনই কঠিন ব্যাপার হবে কালিদাসের মতো একজন ছাত্রবন্ধু পাওয়া।
আমি লক্ষ করেছি, পাড়ার সম্পর্কে যারা আমার বন্ধু, স্কুল-কলেজের সম্পর্কে যারা বন্ধু, এমনকী নানা সূত্রে যাঁরা আমার আত্মীয়, তাঁদের মধ্যে এমন একাধিক মানুষ রয়েছেন যাঁরা আমার কাছে খুবই দুর্লভ ব্যক্তি। এমন ব্যক্তি যে, তাঁদের খুব স্বাভাবিক কাজকর্মের নমুনা শুনলে অনেকেই ভাববেন বানিয়ে বলা, না হয় কোনও পাগলের গল্প বলছি। আবার অন্যদিকে আমার দুটি বন্ধু সত্যি পাগল, অথচ তাদের ক্রিয়াকর্ম অন্য দশজনের চেয়ে খুব বেশি আলাদা না। যেমন, ধরা যাক, ভবেশ হালদার। যুবক বয়সে মাথায় একটু গণ্ডগোল দেখা দেওয়ায় ওকে লুম্বিনীতে রেখে ছ'মাস চিকিৎসা করা হয়। ফিরে আসার পর ওর মধ্যে কোনও পাগলামো দেখা না গেলেও ওর নামটা ‘ভবা পাগলা'ই রয়ে গেল। পাড়ার লোকেরা কাউকে কোনও ঠিকানা বলতে হলে বলত, ‘ওই যে পুকুরপারে ভবা পাগলার বাড়ি, তার ডান দিকের বাড়িটাই গোকুল মাস্টারের।’ দাদাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভবেশ ছোটখাটো একটা দোকান দিল। নিজেই দোকানের নাম দিল, ‘ভবা পাগলার রকমারি ভাণ্ডার’। দোকানটা বেশিদিন চলেনি। চলবে কেমন করে? দোকানে বিক্রয়যোগ্য জিনিসপত্রের মধ্যে যা ইনস্ট্যান্ট খাওয়া যায়, যেমন বিস্কুট, লজেন্স, চানাচুর, হজমি গুলি, এগুলো সে প্রায়ই বিক্রি করত না। কিনতে গেলে দেখা যেত, ভবা নিজেই খাচ্ছে। ক্রমে ক্রমে ভবার খ্যাতি এমনই হয়ে উঠল যে, দূর থেকে ওপাড়ার কারও কাছে কেউ চিঠি লিখলে খামের ওপরে ঠিকানায় একটা লাইন লিখত, ‘ভবা পাগলার বাড়ির নিকট’ কিংবা ‘অপজিট ভবা পাগলা হাউস'। ভবার বাবা-দাদারাও অফিসে বা কলকাতার বন্ধুদের বলতেন, ‘স্টেশনে নেমে রিকশা নিয়ে বলবেন, ভবা পাগলার বাড়ি। দিব্যি পৌঁছে যাবেন।' ডাকঘরের খাম-পোস্টকার্ডে যখন ঠিকানা লিখতে গিয়ে ভবা পাগলার নামোল্লেখ চালু হয়ে গেল, তখন কে যেন ওর মাথায় ঢোকাল, ‘দ্যাখ ভবা, এই রাজ্যে পাগল হয়তো অনেক আছে, কিন্তু কেউই সরকারি স্বীকৃতি পায়নি। পোস্টাল সার্ভিসের খাতায় যখন তোর নাম উঠে গেছে, তখন তুই-ই হলি একমাত্র গভর্নমেন্ট রেকগনাইজড় পাগল। গোদা বাংলায় সরকারি পাগলা।’

ভবা পান খেতে খেতে প্রশ্ন করল, ‘তাতে আমার সুবিধে?’
যে ওকে বুদ্ধি দিচ্ছিল সে বলল, 'তুই চাইলে মাসে মাসে পাগলা-ভাতা পাবি। দেখছিস না সরকার বেকার-ভাতা দিচ্ছে। এবার পাগলা-ভাতা দেবে।'
ভবা জিজ্ঞেস করল, ‘কত দেবে?’
সেই বুদ্ধিদাতা বলল, ‘মাসে আড়াইশো টাকা করে।'
ভবা পানের পিক ফেলে জানতে চাইল, ‘বোনাস দেবে না? পুজোর সময় তো সবাই বোনাস পায়।'
পুজোতে পাঁচশো টাকা বোনাসও পাওয়া যাবে শুনে ভবা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখল। একটা কপি পাঠাল দিল্লিতে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে। দেড় বছরে গোটাদশেক চিঠি দিয়ে যখন সে ভাতা পেল না, তখন ভর সন্ধেবেলায় বাথরুমে ঢুকে ফ্যামিলি সাইজের একটা কোলগেটের মধ্যে যতটা পেস্ট ছিল সেটা খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করল। হাসপাতাল থেকে বেঁচে আসবার পর পাড়ার অল্পখ্যাতিমান উঠতি এক পাগল বিশু নন্দী ওকে সান্ত্বনা দিতে এসে বলল, ‘জগৎটা খুব বেইমান রে। পাগলকে কেউ মরতেও দেয় না। হাসপাতালের অন্য রোগীকে বাঁচাতে পারে না, অথচ তোকে কেমন চটপট বাঁচিয়ে দিল।'
ভবা বিষণ্ণ গলায় বলল, 'কী করলে নিঃশব্দে মরা যায় বল তো? আমি মরে গিয়ে শহিদ হতে চাই।'
বিশু ভেবেচিন্তে উপায় বাতলাল। বলল, ‘নিঃশব্দে মরতে হলে প্রথমে ক্ষুর দিয়ে তোর জিভটা কেটে ফেল। ব্যস, আর শব্দ করতে পারবি না। তারপর তোকে সাইকেল করে বালি ব্রিজে নিয়ে যাব। ওখান থেকে ধাক্কা দিয়ে তোকে গঙ্গায় ফেলে দেব। তুই টুক করে ডুবে নিঃশব্দে মরে যাবি। বালি থেকে গোঙরানোর শব্দ এখানে পৌঁছবে না।'
ভবা বলল, ‘তুই কী করবি?’
বিশু বলল, ‘আমি থাকব। পাড়ায় একটা পাগল না থাকলে পাড়ার ইজ্জত থাকে? তুই মরে গেলে আমার আর কোনও রাইভ্যাল রইল না। গোটা পাড়ায় আমি একাই পাগল।'
বিশুকে গোটা পাড়ায় একা পাগল হয়ে দাপিয়ে বেড়াবার কৃতিত্ব দিতে ভবা রাজি না হওয়ায় ভবার আর নিঃশব্দে মরা হল না। ভবা এবং বিশু দু’জনেই ফ্রেন্ডস ক্লাবের মাঠে যায়। ভবা ছোট ছোট ছেলেদের ফুটবল খেলার রেফারি হয়, আর বিশু ছোটদের ড্রিল শেখায়। ভবার সঙ্গে থাকে বাঁশির বদলে চোঙা। কিছু হলেই চোঙা ফুঁকে বলে দেয়, ফাউল ফাউল। কিংবা হ্যান্ডবল হ্যান্ডবল। ওর নেতৃত্বে যত খেলা আজ পর্যন্ত হয়েছে সব খেলার একই রেজাল্ট, ‘ড্র’। ভবার এক কথা, ‘কাউকে দুঃখু দেব না। সবাই সমান।'
আমার বন্ধু কালিদাস অবশ্য পাগল নয়। ওর সঙ্গে আমার পরিচয়, আলাপ এবং সখ্য ক্লাস ফাইভ থেকে। দু'দুটো সেকশন থেকে বদলি হয়ে কালিদাস এল আমাদের সেকশনে।
দেখবার মতো চেহারা। কালো লিকলিকে শরীর। শরীরের তুলনায় মাথাটা বেশ বড়। মনে হবে কে যেন জন্মাবার পরই ওর গায়ের মেদ চেঁচেপুঁছে নিয়ে গেছে। ও যখন আমাদের সেকশনে এল, অর্থাৎ যেদিন ওকে প্রথম দেখলাম সেদিনই প্রায় চমকে উঠেছিলাম। একটা বিশাল ঢলঢলে পাতলা প্যান্ট, গায়ে লম্বা একটা জামা, হাতে বই-খাতা। ক্লাসের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, ‘মে আই কামিং সার?’
আমাদের প্রথম পিরিয়ড ছিল বাংলা। সুধাংশুবাবু সবে ক্লাস নিতে ঢুকেছেন। তখনও চেয়ারে বসেননি। কালিদাসকে দেখে প্রায় আঁতকে ওঠার ভঙ্গিতে বললেন, ‘তোকে এই সেকশনে পাঠাল?’
তারপর কালিদাসকে আপাদমস্তক দেখতে দেখতে বললেন, ‘এটা কী পোশাক?’ কালিদাস ক্লাসে ঢুকে আমার পাশে বসতে বসতে বলল, 'কী করব সার! রেনি টাইম, প্যান্ট-জামা শুকোয়নি, তাই বাবার আন্ডারওয়্যার, বড়দার শার্ট আর মা’র লেডিজ চটি পরে চলে এসেছি।'
কালিদাসের জামা-প্যান্ট না শুকনোটা সত্যিই বড় রহস্যময় ব্যাপার ছিল। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত সব সিজনেই ও স্কুলে আসত ওই একই পোশাকে। এখনকার দিন হলে হয়তো এমন ছেলেকে স্কুলেই ঢুকতে দিত না। কিন্তু গ্রামের স্কুলে অত কড়াকড়ির বালাই ছিল না। কালিদাসের মধ্যে অদ্ভুত একটা গুণ ছিল। ক্লাস ফাইভে আমাদের সেকশনে যখন এল তখন মার্চ মাস। এপ্রিল শেষ হওয়ার আগেই ওর সঙ্গে আমার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আমি দেখলাম, খেলাধুলোর ব্যাপারে ওর প্রচণ্ড আগ্রহ। নিজে একেবারেই খেলতে পারত না। গায়ের জোরে একটা কিক করার পর নিজেই হুমড়ি খেয়ে পড়ত আর বলটা যেত বড়জোর তিন থেকে পাঁচ গজ দূরে। কিন্তু ফুটবলের নানা খুঁটিনাটি ওর কণ্ঠস্থ ছিল। যেখানেই ফুটবল খেলা, কালিদাস সেখানেই হাজির। শুধু কি ফুটবল? ওর আগ্রহ সর্বক্ষেত্রে। পাড়ার কোনও ক্লাব হয়তো পুজোর সময় শখের নাটক করছে। তাঁদের মহলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কালিদাস গিয়ে হাজির। নাট্য পরিচালকের হাতে-পায়ে ধরত একটা পার্ট পাওয়ার জন্য। কোথাও হয়তো দরিদ্রনারায়ণ সেবার খিচুড়ি বিতরণ হচ্ছে, দেখা গেল কালিদাস লাইনের সবার আগে। কালিদাসের বাবা বিশ্বনাথবাবু ছিলেন বড় চাকুরে এবং অত্যন্ত রাশভারী লোক। তাঁকে দেখে মনে হত তিনি সর্বদাই বেজায় রেগে আছেন। আমরা কখনও তাঁর মুখোমুখি হতাম না। কালিদাসের এসব কাজকর্মের জন্য ওর বাবা মাঝেমধ্যেই ওকে বেদম পেটাতেন। আমাদের তখন খুব কষ্ট হত। কিন্তু কালিদাসকে নিয়ে ঝামেলাও তো কম ছিল না। একবার কালীপুজোর সময় খুব বড়াই করে গেল উড়ন তুবড়ি ছাড়বে। আমরা বার বার নিষেধ করলাম। ও এমন উড়ন তুবড়ি ছাড়ল যে, সে আকাশে না উড়ে গোত্তা খেয়ে ঢুকে গেল কালিদাসের বাবার বিছানায়। মশারিতে আগুন লেগে সে এক দারুণ ব্যাপার। কালিদাস প্রায়ই এইরকম কাণ্ড করত। ওর গায়ের রং কালো ছিল বলে কেউ কেউ ওকে ‘ঠাট্টা করে ডাকত ‘কেলো’। একবার ওদের পাড়ার এক হোমরা-চোমরা ব্যক্তি, যাঁকে দেখলে সবাই খুব মান্য করতেন, সম্ভবত সেই কারণেই তাঁকে পাড়া কমিটির প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল, সেই প্রেসিডেন্ট একদিন বিকেলে পুকুরঘাটের বাঁধানো চাতালে বসে খুব আয়েস করে সিগারেট খাচ্ছিলেন। তাঁর পায়ের কাছে একটা কালো কুকুর। তিনি থেকে থেকে ভাঙা বিস্কুট ছুড়ে দিচ্ছিলেন কুকুরটার দিকে। কালিদাস বিকেলে খেলে এসে পুকুরে স্নান করছিল। স্নান করে উঠে আসার সময় সেই প্রেসিডেন্টসাহেব কালিদাসকে দেখে বললেন, 'অ্যাই কেলোদাস, দেখছিস, কুকুরটার গায়ের রং ঠিক তোর মতো। লক্ষ করেছিস?’
কালিদাস কুকুরটার দিকে একটু তাকিয়ে বলল, ‘জেঠু, আপনি খালি গায়ের রঙটাই দেখলেন। ওর মুখটার দিকে তাকিয়ে দেখুন, ঠিক আপনার মতো। মনে হবে যমজ ভাই।' গ্রীষ্মের বিকেলে বাঁধানো পুকুরঘাটে তখন অনেক লোক। সবার সামনে এমন একটা কথা বলায় সবাই হেসে উঠলেও প্রেসিডেন্টমশাই প্রীত হলেন না। হওয়ার কথাও নয়। তিনি তখনই নালিশ করতে ছুটলেন কালিদাসের বাবার কাছে।
কালিদাসের বাবা বিশ্বনাথবাবু সব শুনে বললেন, ‘হরিবাবু, আপনি আমার অগ্রজ। ওকে ক্ষমা করে দিন। যদিও আজ রাতেই কালীকে আমি জুতোপেটা করে পিঠের চামড়া তুলে ফেলব। আমার ছেলের আই কিউ এত কম থাকবে কেন? ওই মূর্খটা খালি মুখের মিল দেখেছে, স্বভাবের মিলটা দেখতে পেল না। ওকে জুতোপেটা করব।'
সেদিন সত্যিই কালিদাসকে জুতোপেটা করা হয়েছিল কিনা জানি না, তবে বিকেলের ঘটনাটা লোকের মুখে মুখে এমন প্রচার হয়ে গিয়েছিল যে, প্রেসিডেন্টসাহেব দু’দিন অফিস কামাই করে বাড়িতে বসে রইলেন। বাড়ির বাইরেই বেরোলেন না। তৃতীয়দিন প্রেসিডেন্টসাহেব অফিস যাওয়ার জন্য রিকশাতে উঠতে যাচ্ছেন, হঠাৎ ভবা আর বিশু এসে হাজির। ওরা দু’জনেই প্রেসিডেন্টের মুখের দিকে তাকিয়ে। তিনি রেগে উঠে বললেন, ‘অমন করে কী দেখছিস?'
ভবা আর বিশু প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠল, ‘কেলো যা বলেছে সেটা মিলিয়ে দেখছি। আচ্ছা কাকু, আপনি ডাকতে পারেন?’
প্রেসিডেন্টসাহেব রেগে গিয়ে রিকশায় না উঠে হনহন করে স্টেশনের দিকে হাঁটতে লাগলেন। যত দূর মনে পড়ে, এই ঘটনার পর দীর্ঘকাল উনি আর কালিদাসের মুখোমুখি হতে ভরসা পাননি। আমরা যখন ক্লাস এইটে উঠলাম তখন কালিদাস স্কুলের পক্ষেও সমস্যা হয়ে উঠল। কলকাতার মাঠে বড় দলের খেলা থাকলে সেদিন আর টিফিনের পর কালিদাসকে ক্লাসে পাওয়া যেত না। অনেকরকম শাস্তি দিয়েও যখন কালিদাসকে রোখা গেল না তখন শুধু আমাদের সেকশনেই নিয়ম চালু হল, টিফিনের পর আবার রোল কল হবে। তাতে যদি কালিদাসকে না পাওয়া যায়, তা হলে ওকে আর স্কুলে রাখা হবে না। এই নিয়ম চালু হওয়ার তিনদিন পর্যন্ত কালিদাস চুপচাপ রইল। কিন্তু টিফিনের পর ও গিয়ে বসত একেবারে লাস্ট বেঞ্চে। মাস্টারমশাইরা সবে ভাবতে শুরু করেছেন যে, কালিদাসকে নিয়ে রটনা একটু বেশি। ছেলেটা টিফিনের পর রোজই তো ক্লাস করছে। কোনও কোনও মাস্টারমশাইয়ের ধারণা হল, ওর স্কুলপালানো বন্ধ করতে যে ব্যবস্থাটা নেওয়া হয়েছে সেটা অব্যর্থ। চতুর্থ দিনে কলকাতা মাঠে খেলা পড়ল ইস্টবেঙ্গল আর বি. এন. আর দলের। লিগের এই খেলাটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সাতসকালে কালিদাস এসে হাজির। আমায় বলল, ‘চল, কুলীনপাড়ায় নেত্যাদার বাড়ি যাই।'
নেত্যাদা তখন কলকাতা মাঠের নামকরা খেলোয়াড়। পাড়ায় নেত্যাদা বলে সবাই চিনলেও কলকাতা মাঠে তাঁর নাম ছিল এস. ঘোষ, মানে সুশান্ত ঘোষ। ভারতীয় দলের হয়ে রাশিয়া ঘুরে এসেছেন। বড় বড় দলে খেলতেন, কিন্তু ভাল চাকরি পেয়ে বি. এন. আর দলে খেলছেন। কালিদাস যাওয়ার সময় ওলাইচণ্ডী মন্দির থেকে সিঁদুরমাখা বেলপাতা পকেটে নিয়ে নেত্যাদার বাড়িতে পৌঁছেই ফুলটা তাঁর কপালে তিনবার ঠেকিয়ে খুব যত্ন করে তাকে তুলে রাখল। তারপর উবু হয়ে বসে নেত্যাদার পা টিপতে লাগল। ঘরভরতি অনেক ছেলে। কালিদাস যে উদ্দেশ্যে এসেছে ওদের উদ্দেশ্যও তাই। নেত্যাদা পা সরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আজকের খেলার ডে-স্লিপ দিতে পারব না। অন্যদিন দেব।'
কালিদাস কোনও কথা বলল না। একটু বাদে কোন ফাঁকে উঠে গেল ভেতরের ঘরে। তারপর এ-ঘরে ফিরে এসে বলল, ‘নেত্যাদা, তোমার বুটগুলো দাও, পরিষ্কার করে দিই।' নেত্যাদা বললেন, ‘দরকার নেই। তুই বাড়ি যা।'
কালিদাস বলল, ‘তুমি স্নান করে এসো। ঠাকুরের চন্দন আর টিপ পরাতে হবে। সকালবেলা উপোস করে পুজো দিয়েছি।'
একে একে সবাই চলে গেলেও কালিদাস গেল না। আমি বললাম, ‘কালী, কোনও চান্স নেই। সব তো দিয়ে দিল।'
কালিদাস বলল, ‘আরও আছে। দেখ, ঠিক পেয়ে যাব।'
নেত্যাদার পেছনে কালিদাস এমন লেগে রইল যে, শেষপর্যন্ত বাড়ি থেকে বেরোবার সময় একটা ডে-স্লিপ ওকে দেওয়ার জন্য বাড়ির অন্যরাও নেত্যাদাকে কাতর আবেদন জানাতে বাধ্য হল। ডে-স্লিপটা হাতে নিয়েই কালিদাস বাইরে বেরিয়ে বলল, ‘এবার তোর একটা ব্যবস্থা করছি।'
আমি অভিমানের গলায় বললাম, ‘তুই তো একটাই চাইলি। আমি পাব কোত্থেকে?’ কালিদাস বলল, ‘আয় আমার সঙ্গে।'
একটা বাসের পেছনে ঝুলে ঝুলে এলাম পানিহাটিতে। বাসের ভাড়া নেই বলে পেছনে ঝুলতে হল। এসব পরামর্শ অবশ্য কালিদাসের। পানিহাটিতে থাকতেন বিখ্যাত গোলকিপার সনৎ শেঠ। সেখান থেকেও কেঁদেকেটে একটা ডে-স্লিপ জোগাড় হল। পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরবার সময় দেখা গেল রাস্তার পাশে এক জায়গায় বেশ ভিড়। আমরা ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখি একটা জোয়ান চেহারার লোক রাস্তায় শুয়ে গোঁ গোঁ করছে আর অন্যরা কেউ মাথায় জল দিচ্ছে, কেউ বা পায়ের জুতো খুলে লোকটার নাকের কাছে ধরছে। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে?'
ভিড়ের মধ্য থেকে উত্তর এল, ‘মৃগী রোগী। ভাল করে জুতো শোঁকালে সেরে যাবে।' কালিদাস খুব ভাল করে লোকটাকে দেখতে লাগল। আমাদের বাড়ি ফিরে স্কুলে যেতে হবে, তারপর খেলা দেখতে যাব বলে টিফিনে গিয়ে কোনও একটা অছিলায় ছুটি চাইতে হবে অথচ কালিদাসের কোনও তাড়া নেই। আমি তাড়া দিয়ে দিয়ে ওকে নিয়ে এলাম। সেদিন স্কুলের থার্ড পিরিয়ড চলতে চলতেই হঠাৎ গোঁ গোঁ শব্দ করে কালিদাস ক্লাসের মধ্যে ঢলে পড়ল। পড়বার আগে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘মৃগী!’
তখন চলছিল ইংরেজি ক্লাস। ইংরেজির পরেশবাবু কালিদাসকে দু’চক্ষে দেখতে পারতেন না। ক্লাস সেভেনে ওকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বল তো কালিদাস, ‘সরোবরে অনেক পদ্ম ফুটিয়া আছে’ এটা ইংরেজিতে কী হবে।'
যথারীতি সেই ঢোলা প্যান্ট ওপরে টানতে টানতে কালিদাস উঠে দাঁড়িয়ে উত্তর দিয়েছিল, ‘লোটাসেস ফোটাসেস ইন দ্য পন্ডস।'
সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস থেকে বার করে দেওয়া হয়েছিল কালিদাসকে। এইটে পড়াতে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুই প্রোমোশন পেলি কী করে?’
কালিদাস উত্তর দিয়েছিল, ‘গড নওস।’
অতএব, কালিদাস গোঁ গোঁ শব্দ করে ঢলে পড়তেই তিনি ধমক দিয়ে উঠে বললেন, ‘এটা কী? কী হচ্ছে?’
আমি বললাম, ‘সার, ওর মৃগী আছে।'
পরেশবাবু তীক্ষ্ণ চোখে কালিদাসের দিকে তাকালেন। কালিদাস গোঁ গোঁ করতে করতে একবার উঠে দাঁড়ায়, কখনও গড়াগড়ি দেয়, এইরকম করতে করতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল পরেশবাবুর বুকের ওপর। আমাদের ক্লাসের সামনে ভিড় হয়ে গেল। কেউ জুতো শোঁকায়, কেউ ব্লটিং পেপার পুড়িয়ে ধোঁয়া নাকে দেয়।
হেডসার বললেন, ‘একটা রিকশা ডেকে ওকে বাড়িতে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন। সঙ্গে দুটো ছেলে দিন।'
আমি বললাম, ‘আমি ওর বাড়ি চিনি। আমি যাব সার?’
কালিদাসের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে বুঝতে পেরে কালিদাস ধীরে ধীরে উঠে বসল। ওকে নিয়ে রিকশা করে বাড়ি পর্যন্ত না এসেই রিকশা ছেড়ে দিলাম। তারপর বলাই বাহুল্য, ট্রেনে করে কলকাতায় খেলার মাঠে।
কিন্তু রোজ রোজ কি মৃগী রোগী সেজে গোঁ গোঁ করে শুয়ে পড়া যায়? ফলে ওকে সপ্তাহে অন্তত দু'দিন টিফিনের পর স্কুল পালাবার জন্য নয়া নয়া ফন্দি বার করতে হত। আমাদের স্কুলঘরগুলো বেড়ার। বেড়া ভেঙে হামাগুড়ি দিয়ে বার-দুই পালিয়েছিল। ওই পালাবার জন্যই টিফিনের পর লাস্ট বেঞ্চে গিয়ে বসত কালিদাস। অন্যদিকে স্কুল কামাই করবারও উপায় ছিল না। তা হলে বাবা জানতে পারবেন। একদিন তো জলে ভিজে ক্লাসে এল। খটখটে শুকনো দিন অথচ কালিদাস ভিজল কেমন করে? হেডসারের সামনে কালিদাস বলল, ওকে নাকি পাগলা ষাঁড়ে তাড়া করেছিল। তাই প্রাণ বাঁচাতে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
হেডসার ‘বাড়ি যাও', বলতেই কালিদাস চলে গেল কলকাতার মাঠে। সেজন্যই বর্ষাকালে কালিদাসের খুব সুবিধে ছিল। স্কুল শুরুর আগে দু’ফোঁটা বৃষ্টি পড়লেও কালিদাস আপাদমস্তক ভিজে আসত। ওকে শায়েস্তা করতে একবার পণ্ডিতমশাই হুকুম দিলেন, ‘তুই সিক্ত বস্ত্রেই ক্লাস কর।'
কালিদাস ক্লাসে বসে এমন হাঁচি দিতে লাগল যে, পণ্ডিতমশাই বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন, ‘এই আপদটা বিদায় হোক। তুই বাড়ি যা।’
ওই অঞ্চলে ফুটবল-টিম হিসেবে আমাদের স্কুলের মোটামুটি সুনাম ছিল। আমাদের স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিল অহীন। অহীনের সেবার টাইফয়েড হল। ওই সময় টাইফয়েড ছিল খুব শক্ত রোগ। কালিদাসের তৎপরতায় এবং অহীনের ইচ্ছাতে আমাকে ক্যাপ্টেন করা হল। এই প্রথম আমাদের স্কুলে নাইন-টেনের ছাত্রদের বাদ দিয়ে ক্লাস এইটের ছাত্রকে ক্যাপ্টেন করা হল। এর আগে স্কুলটিমের ক্যাপ্টেন কখনও ক্লাস এইটের কোনও ছাত্রকে করা হয়নি। আমি যে খুব ভাল খেলতে পারতাম তা নয়। তবে উঁচু ক্লাসের ছাত্ররাও আমাকে ভালবাসত। ওরা কোনও আপত্তি না করায় আমি ক্যাপ্টেন হয়ে গেলাম। ক্যাপ্টেন হওয়ার পরই কালিদাস বলল, ‘তোর জন্যে আমি একাই লড়ে গেছি। এবার আমাকে চান্স দিস। টিমের ফাইনাল লিস্টে রাখিস।'
আমি তো অবাক! কালিদাস খেলবে কী! ও তো ভাল করে বলে লাথিই মারতে জানে না। বৈশাখ-জষ্টি মাসে বড়সড় ঝড় এলে ওর মা ওকে ঘরে আটকে রাখেন, যাতে প্যাকাটির মতো ছেলেটাকে ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে না পারে। দু’–একটা ম্যাচ আমরা খেললাম। মোটামুটি উতরে যাওয়ার মতো ব্যাপার হল। কয়েকদিন পর স্কুল লিগের খেলায় আমাদের খেলা পড়ল সোদপুর স্কুলের সঙ্গে। এই খেলাটায় যে স্কুল জিতবে সেই চ্যাম্পিয়ান হবে। দু’জনেরই সমান পয়েন্ট। দু'দিন আগে থেকেই থরথর উত্তেজনা। কিন্তু কালিদাসের সেই এক নাছোড়বান্দা বায়না, ‘আমাকে চান্স দে।'
এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ খেলায় কালিদাসকে কেমন করে চান্স দেব? সেট-করা টিম থেকে কাকে বসাব? বড়দের সঙ্গে কথা বললাম। ক্লাস টেনের মনোজ আর নাইনের স্বপন বলল, ‘তোর কি মাথাখারাপ! কেলো কী করবে? উলটে আমরা গোল খেয়ে মরব।'
আমরা যখন মাঠে নামবার জন্য তৈরি হচ্ছি তখনও কালিদাস বলে যাচ্ছে, ‘তোকে লড়াই করে ক্যাপ্টেন করলাম আর তুই বিট্রে করছিস! একবার চান্স দিয়ে দ্যাখ না।’
সব দলেই দু'-তিনখানা জার্সি বেশি থাকে। কালিদাস সবার আগে জার্সি পরে নিজেই একা একা ওয়ার্ম-আপ করতে লাগল। স্বপন এসে আমায় বলল, ‘ওই কেলেটা জার্সি পরে বানরের মতো লাফাচ্ছে কেন? ও মাঠে নামলে আমি নেই।'
আমি বললাম, ‘ও এমনই পরেছে। ওকে কেন নামাতে যাব?
তখনকার দিনে স্কুলের খেলাতে বাইরে থেকে কোনও পেশাদার রেফারি আনা হত না। যে স্কুলের মাঠে খেলা হত সেই স্কুলেরই কোনও মাস্টারমশাই রেফারি হতেন। যেমন আমাদের মাঠে খেলা হলে আমাদের ভূগোলের সার সদানন্দবাবু ছিলেন বাঁধা রেফারি। কেননা তিনিই ছিলেন আমাদের গেম-টিচার। তখন অবশ্য গেম-টিচার বলে আলাদা কোনও টিচার রাখা হত না। খেলাধুলোয় উৎসাহ আছে এমন টিচারকে গেম-টিচারের দায়িত্ব দেওয়া হত। সোদপুর স্কুলের বাংলার মাস্টারমশাই সুকোমল নন্দী ছিলেন রেফারি। যারা খেলছে সবাই যেহেতু ছাত্র, তাই সবাই ছিলেন তাঁর কাছে পুত্রবৎ। খেলা শুরু হওয়ার আগে তিনি খেলোয়াড়দের কিঞ্চিৎ উপদেশ দিয়ে খেলা আরম্ভ করলেন।
প্রথম হাফে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলেও কোনও পক্ষ গোল করতে পারল না। আমরা দুটো সুযোগ পেয়ে নষ্ট করলাম। ওরা তিনটে সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারল না।
হাফটাইমের পর খেলা শুরু হতেই আমরা তেড়েফুঁড়ে আক্রমণে গেলাম। ওরাও পালটা আক্রমণে আসতে লাগল। মিনিটদশেক খেলা চলার পর আমার পা থেকে বল পেয়ে মনোজ চড়চড় করে ওপরে উঠতে লাগল। দু’জনকে কাটিয়ে যখন পেনাল্টি বক্সের কাছাকাছি, তখন বলটা চমৎকারভাবে ঠেলে দিল স্বপনকে। স্বপন বিন্দুমাত্র দেরি না করে সেই চলতি বলে আচমকা শট করতেই বলটা গোলে ঢুকে গেল। মাঠের চারপাশে তখন আমাদের স্কুলের ছেলেদের তুমুল নাচানাচি। কালিদাস জার্সি পরেই ক্রমাগত ডিগবাজি খাচ্ছে। কিন্তু সেই আনন্দের রেশ থামতে-না-থামতেই আমরা গোল পেলাম। ওদের সেন্টার হাফের বাড়ানো থ্রু ধরে সেন্টার ফরওয়ার্ড বলটা ঠেলল বাঁয়ে। লেফট আউট সেই বল নিয়ে খানিকটা ছুটে গিয়ে নিখুঁত সেন্টার করল। আমাদের গোলকিপার সমর গোল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। ওদের সেন্টার ফরওয়ার্ড লাফিয়ে উঠে হেড করে খুব সুন্দর গোল করল। এর পর দু’পক্ষই জেতবার জন্য দাঁতে দাঁত চেপে খেলে গেলেও গোল আর হচ্ছিল না। অথচ সময় ফুরিয়ে আসছে দেখে দু’দলই যত মরিয়া হয়ে উঠতে চাইছে, ততই ফাউল বেশি হচ্ছে। খুচখাচ ঝামেলাও আরম্ভ হয়ে গেছে। সুকোমলবাবু ওরই মধ্যে কাউকে ‘গাধা’, কাউকে ‘ষণ্ড’ বলে গাল দিচ্ছেন, কোনও ছাত্রের কান মলে দিয়ে বলছেন, ‘মাঠের বাইরে বার করে দেব।'
ওদের ব্যাকে যে ছেলেটা খেলছিল সে একটু এলোপাথাড়ি পা চালায়। ছেলেটা পা দিয়ে একবার আমার তলপেটে মারতেই আমি, ‘সার দেখুন, আমার পেটে হিট করেছে।' বলে পেটে হাত দিয়ে বসে পড়লাম। যতটা লেগেছিল, আমি তার চেয়ে বেশি লেগেছে বোঝাবার জন্য মাঠের মধ্যে শুয়ে পড়লাম। কালিদাস সাইডলাইনের পাশ থেকে ‘পেনাল্টি, পেনাল্টি’ বলে চিৎকার করতে করতে মাঠে ঢুকে পড়ল। আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘শুয়ে থাক। খালি পেটে হাত দিয়ে বাবা রে, বাবা রে করে যা। অন্যরা সেই সুযোগে জিরিয়ে নিক।'
আমার সঙ্গে যে জায়গাটায় সংঘর্ষ হয়েছিল সেখান থেকে কোনওমতেই পেনাল্টি হতে পারে না। বড়জোর একটা ফ্রি-কিক দিতে পারে। সুকোমল সার দৌড়ে এসে প্রথমেই বললেন, ‘কে মারল? গোপাল, তাই না? ইউ আর এ ভেরি ব্যাড প্লেয়ার।'
ওদের ব্যাক গোপাল কী একটা বলতে গেল। মাস্টারমশাই হুংকার দিয়ে বলে উঠলেন, ‘স্ট্যান্ড আপ অন দ্য বেঞ্চ।
অন্যরা হেসে ফেলতেই মাস্টারমশাই বললেন, ‘বেঞ্চ নেই তো কী হয়েছে, তোকে মাঠেই নিলডাউন করিয়ে রাখব। নিলডাউন, নিলডাউন।'
ফুটবল খেলায় ফাউল করলে এমন শাস্তির কথা বোধ হয় ফিফার কোনও সদস্য দিবাস্বপ্নেও ভাবতে পারে না। ছেলেটার নাম ছিল গোপাল খাঁড়া। মাস্টারমশাইয়ের আদেশে গোপাল মাঠের মধ্যে সত্যি সত্যি নিলডাউন হতে বাধ্য হল। কালিদাস গোপালের কাছে গিয়ে বলল, ‘আমাদের স্কুলে নিলডাউন হলে দু'হাতে কান ধরতে হয়'। তুমি ভাই কানটা ধরো।'
মিনিটদুয়েক পরে আবার খেলা আরম্ভ হল। খেলা শেষ হতে যখন সাত মিনিট বাকি তখন আমি বুঝে গেলাম জেতার আশা নেই। বরং যে কোনও সময় আমরা গোল খেয়ে যেতে পারি। আমাদের ডিফেন্স ভেঙে গেছে। আমি নিজেও আর খেলতে পারছি না। দুটো মিস পাস করলাম। স্বপনকে আর মাস্টারমশাইকে বলে আমি মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম গিয়ে বলাইকে নামাব। কিন্তু আমি সাইডলাইন পেরোবার আগেই মাঠে মাথা ঠেকিয়ে কালিদাস ঠিক ক্যাঙারুর মতো লাফাতে লাফাতে মাঠে নেমে পড়ল এবং দৌড়ে গিয়ে সুকোমলবাবু অর্থাৎ যিনি আমাদের রেফারি, তাঁকে গড় হয়ে প্রণাম করে খেলতে আরম্ভ করল। স্বপন, মনোজ আর অন্যরা তো হতভম্ব। ওরা ভাবছে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ খেলায় আমি স্রেফ বন্ধুকে মাঠে নামিয়ে আমাদের পরাজয়টাকে নিশ্চিত করলাম। কিন্তু কালিদাস যে কী খেলছিল সেটা বোঝা দায়। কেবল গোপাল খাঁড়ার গায়ে গায়ে ঘুরছিল আর চিৎকার করে বলছিল, ‘বল বাড়া, বল বাড়া।’ মিনিট তিনেকের মধ্যে পায়ে কোনও বল না পেয়ে শুধু ছোটাছুটি করতে করতেই কালিদাস একা একাই দু’-তিনবার আছাড় খেল। আমি ‘বেরিয়ে আয়, কালিদাস বেরিয়ে আয়,’ বলে কয়েকবার ডাকলাম, কিন্তু ও কানেই নিল না। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বসে পড়লাম। খেলা শেষ হওয়ার দুই কি আড়াই মিনিট আগে মনোজের বাড়ানো বল ধরে স্বপন সোদপুর স্কুলের বক্সের কাছাকাছি চলে এসে দেখল তার পাশে কালিদাস ছাড়া কেউ নেই। কালিদাস তো মাঠে নামার পর থেকে ওখানেই ঘুরপাক খাচ্ছে আর আছড়ে আছড়ে পড়ে যাচ্ছে। স্বপন বাধ্য হয়ে বলটা ওকে ঠেলে দিয়েই বলে উঠল, ‘উঁচু করে বক্সে তোল।'
দৃশ্যটা দেখবার মতো। কালিদাসের মাথা আর বলের সাইজ প্রায় একই রকম। কালিদাস বলটা তুলল না। তুলবে কেমন করে? ওর তো পায়ে কিকই নেই। ও বলটা পায়ে চেপে দু’হাতে সামনের ডিফেন্ডারদের ডাকতে লাগল, ‘আ যাও, আ যাও।'
ভাবখানা এমন যে, বলরাম কিংবা চুনী গোস্বামী পায়ে বল নিয়ে যেন গ্রামের কচিকাঁচা বাচ্চাদের ডাকছেন। ঠিক তখনই ওদের ব্যাক গোপাল খাঁড়া এগিয়ে এসে দাঁড়াল। তারপর যে কী হল বুঝতে পারলাম না। দু'দিক থেকে খেলোয়াড়রা বল নেওয়ার জন্য ছুটে আসছিল। কালিদাস একটু এগোতেই একটা জড়াপট্টি হল এবং সেই জড়াপট্টি থেকে কালিদাসের তীব্র আর্তনাদ ভেসে এল, ‘বাবা গো, মেরে ফেলল।'
রেফারি ছুটে এলেন। আমরা ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি কালিদাস মাঠের মধ্যে লুটিয়ে পড়ে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছে আর ‘ও বাবাগো, ও মাগো’ বলে চিৎকার করছে। যন্ত্রণার বেগ এত প্রবল যে, কালিদাস কেবলই গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। স্থির থাকতে পারছে না। মাস্টারমশাই এসে ওর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘কী হয়েছে বাবা, কোথায় লেগেছে?’
কালিদাস মাস্টারমশাইয়ের পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ‘সার, আমি বাড়ি যাব। আমি মাকে দেখব। আমি বাবা-মা’র এক ছেলে। আমি মরে যাচ্ছি সার। ওই গোপাল খাঁড়া আমাকে লাথি মেরে... সার, আপনার পায়ে পড়ি, আপনি আমার বাবার মতো। আমাকে মা’র কোলে মরতে দিন। অন্য স্কুলের ছাত্র বলে... ও মাগো, কী যন্ত্রণা। পায়ে হিট করেছে। আমার লোয়ার পার্ট ড্যামেজ করে দিয়েছে সার।'
আমাদের সমর্থক ছাত্ররা ‘পেনাল্টি’ বলে একবার চিৎকার করেই থেমে গেল। কালিদাস বলল, ‘তোরা গোল করিসনে। সার আছেন, উনি যা বুঝবেন করবেন। তোরা আমাকে মা’র কাছে পৌঁছে দিয়ে আয়। সার, সার গো...'
সারের পায়ে মাথা গুঁজে কালিদাস আকুলি-বিকুলি করতে লাগল। সোদপুরের ছেলেরা চুপ করে আছে। গোটা মাঠ থমথমে। আমরা ধরাধরি করে কালিদাসকে যখন মাঠের বাইরে আনছি তখন সুকোমলসার অত্যন্ত কঠিন চোখে গোপালের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ছিঃ! এটা কি গুণ্ডামির জায়গা?’
কথা শেষ করেই বাঁশি বাজিয়ে তিনি পেনাল্টির নির্দেশ দিলেন। কালিদাস আমাদের কাঁধ থেকে লাফ দিয়ে নেমে জিজ্ঞেস করল, ‘কে কিক নিচ্ছে?’
যেইমাত্র পেনাল্টি কিক থেকে স্বপন গোল করল, তখনই মাস্টারমশাই লম্বা করে বাঁশি বাজিয়ে খেলা শেষ করে দিলেন।
আমি কালিদাসকে বললাম, ‘এখনও ব্যথা করছে?’
কালিদাস বলল, ‘লাগলে তো ব্যথা করবে। আমি তো এইরকমই একটা সুযোগ খুঁজছিলাম। গোপাল তো গোড়া থেকেই সারের ব্যাড বুকে। আমার পা থেকে বল কাড়তে গোপাল যেই না এল আমি বললাম, ‘ওরে গোপাল খাঁড়া,/ বল নিবি তো একটু দাঁড়া/ তোকে দেখিয়ে দেব হুগলির ইমামবাড়া/ তার চেয়ে কান ধরে আবার দাঁড়া।’
গোপাল বল ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি দেখলাম অনেক খেলোয়াড় চারপাশে। আমি বসে পড়ে গোপালের পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে চিৎকার জুড়ে দিলাম। তোর ওই স্বপন, মনোজদের বলিস, শুধু খেলে জেতা যায় না, কৌশলেও জিততে হয়। আজকের উইনিং স্কোরটা তো আমার।
বলা বাহুল্য, কালিদাসের এই কৌশল বেশিদিন চলেনি। সবাই জেনে ফেলেছিল। কিন্তু জেনে ফেলার আগে অন্তত চারবার আমরা জিতেছি ওর কৌশলেই।
কালিদাসের সঙ্গে প্রায়ই আমরা কলকাতা মাঠে খেলা দেখতে যেতাম। এ ব্যাপারে ও ছিল আমাদের গাইড। অধিকাংশ সময়ই কালিদাস ডে শিল্প জোগাড় করত। কালিদাসের সঙ্গে আমার শেষ খেলা দেখতে যাওয়ার ঘটনাটা আমার এখনও মনে আছে। এরপর আমি খেলা দেখতে গেছি বটে, কিন্তু কালিদাসের সঙ্গে নয়। সেটা ছিল মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলের খেলা। কিছুতেই কোনও ডে স্লিপ জোগাড় করা গেল না। জানা গেল, খেলার আগের দিন সনত্দা বাড়িতেই ফিরবেন না। টিম নাকি অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করবে। কালিদাস অনেক ভেবেটেবে বলল, ‘চল, মাঠে গিয়ে ব্যবস্থা করব।'
আমি বললাম, ‘কেমন করে?’
কালিদাস উত্তর দিল, ‘টেন্টে যাব। শঙ্করদার সঙ্গে আমার জানাশোনা আছে।'
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে শঙ্করদা? কোন দলে খেলে?’
কালিদাস আমার অজ্ঞতায় হেসে ফেলে বলল, ‘শঙ্করদা, মানে ইস্টবেঙ্গলের শঙ্কর মালি। আমি ‘কাকু’ বলে ডাকি। ক্যাপ্টেনের চাইতেও ওঁর হোল্ড বেশি।'
কালিদাসের কথায় ভরসা না করে উপায় ছিল না। আমরা বেলা দশটা নাগাদ ট্রেনে করে রওনা দিলাম। কালিদাস কখনও রেলে টিকিট কাটত না। আমি সেটা জানতাম। তবু বললাম, ‘তুই টিকিট কাটবি না?’
কালিদাস পালটা প্রশ্ন করল, ‘তুই কেটেছিস?”
আমি আমার টিকিট দেখিয়ে বললাম, ‘এই তো টিকিট!’
কালিদাস বলল, ‘ওতেই হবে। একখানা ফুল টিকিটে আমাদের দু'জনের হয়ে যাবে। আমি বললাম, ‘কেন হবে? তুই কি বাচ্চা নাকি?'
কালিদাস বলল, ‘তবে নয় তো কী! আমার বাবারও ফুল টিকিট আবার আমারও ফুল টিকিট! তাই কখনও হয় নাকি! তা ছাড়া বাবা তো মান্থলি টিকিট কাটে। কতদিন যেতে পারে না। তখন কি পয়সা ফেরত নেয়।'
তখনও আমাদের এদিকে কয়লার ইঞ্জিনে গাড়ি চলে। কালিদাস বেছে বেছে উঠল ভেণ্ডারের কামরায়। গোটা কামরায় জল থইথই করছে। বৃষ্টির জল নয়। কামরার মধ্যে ছানা যাচ্ছে। তারই জল। কালিদাস মুহূর্তের মধ্যেই ছানাওলাদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলল। শিয়ালদায় যখন নামল তখন ছানাওলাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে দিব্যি গেট পেরিয়ে আমায় ডাকতে লাগল।
সকালে একপশলা জোর বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পরও আকাশ পরিষ্কার হয়নি। শিয়ালদা থেকে যখন হাঁটতে শুরু করলাম, তখন আবার বৃষ্টি শুরু হল। আমি বললাম, ‘বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হয়ে যাবে না তো?’
কালিদাস বলল, ‘মাঠে যতক্ষণ পর্যন্ত বল জলের ওপর না ভাসবে ততক্ষণ পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যেতে হবে। একটা খেলা বন্ধ হলে ফিকশ্চার গোলমাল হয়ে যায়।'
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মাঠে এলাম। মাঠ যেন গঙ্গাসাগরের মেলা। সকাল থেকে লাইন দিয়ে লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের পাড়া থেকেও অনেকে ফার্স্ট ট্রেন ধরে মাঠে লাইন দিতে এসেছে। মাঝে মাঝে ঘোড়ার পিঠে চড়ে মাউন্ট পুলিশ ঘুরে বেড়াচ্ছে।
টেন্টে গিয়ে ডে স্লিপ জোগাড় করা তো দূরের কথা, টেন্টের কাছাকাছিই যেতে পারল না কালিদাস। পুলিশের কাছে ওর কোনও জারিজুরি খাটল না। টেন্টের গেটে কড়া পুলিশ পাহারা। আমি বুঝতে পারলাম কিছু হবার নয়। কালিদাস তবুও শেষ চেষ্টা করার জন্য গেটের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের তাড়া খেয়ে আমাদের দৌড়তে হল। ইস্টবেঙ্গল গেটের উলটো দিকে একটা গাছের নীচে ভবা পাগলার সঙ্গে দেখা। ভবা মাথায় টুপি পরে বগলে ছাতা নিয়ে আলুকাবলি খাচ্ছে।
আমি বললাম, ‘খেলা দেখবে নাকি?’
ভবা বলল, ‘একটা ছোট্ট নোট পাঠিয়েছি সনৎকে। নির্ঘাত ছুটে আসবে আমার জন্যে।' আমি বললাম, ‘কী লিখেছ?'
ভবা বলল, ‘কয়েকটা সত্যি কথা। আমি লিখেছি, ডিয়ার সনৎ, আজ তুই জার্সি পরে মাঠের ভেতরে আর আমি ছাতা বগলে মাঠের বাইরে একটি বৃহৎ বৃক্ষের নীচে। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। কয়েক মাসের জন্য লুম্বিনীতে চেঞ্জে না গেলে এর উলটোটাই ঘটা স্বাভাবিক ছিল। আমি থাকতাম মাঠের ভেতরে, তুই থাকতি ছাতা বগলে মাঠের বাইরে। যা হোক একটা ব্যবস্থা কর। পুলিশের ঘোড়াগুলো বড্ড জ্বালাচ্ছে।'
সেদিন ভবার ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা জানি না। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে যা ঘটেছিল, সেটা বেশ মনে আছে। ফুটবল সিজন এলেই কথাটা মনে পড়ে।
কালিদাসের নেতৃত্বে নানা জায়গায় ঘুরেও যখন কোনও সুরাহা হল না তখন বলল, 'চল, র্যামপাটে গিয়ে আয়না দেখি।' সেই সময় কিছু লোক দুটো কাঠের মাথায় আয়না লাগিয়ে মাঠের বাইরে থেকে খেলা দেখাত। অর্থাৎ পেরিস্কোপ জাতীয় ব্যাপার। বিনিময়ে দিতে হত দু’আনা। কিন্তু তাই বলে দু’আনায় গোটা খেলা দেখতে দিত না। দু’-তিন মিনিট পরেই ঋত থেকে ওই যন্ত্রটা টেনে নিত। ও বস্তু দিয়ে মাঠের ভেতরকার খেলা দেখা যায় কি না সেটা বলতে পারব না। তবে ডালডার টিনের ওপর দাঁড়িয়ে অনেকেই দেখছিল বা দেখবার চেষ্টা করছিল। দু’আনা দিয়ে আমিও উঠলাম। আমি বেঁটে বলেই কি না জানি না, আকাশ, মাঠের বাইরের গাছ আর দূরে মনুমেন্টের মাথা ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না। মাথার ওপর মেঘলা আকাশ, থেকে থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে, বাইরে প্যাচপেচে কাদা, তার মধ্যে দিয়ে আমি আর কালিদাস ঘেরা মাঠের তিন পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছি। খেলা শুরু হতে আর বাকি নেই। মাঠের মধ্যে পটকা ফাটার আওয়াজ আর চিৎকার শুনে বুঝলাম কোনও একটা দল বোধহয় মাঠে নেমেছে। কালিদাস তখনও আশা করছে সে মাঠে ঢুকবে।
আমি কালিদাসের পেছন পেছন হাঁটছিলাম। পায়ের জোরও কমে এসেছে। বাড়ি থেকে বেরোবার পর একবারও কোথাও বসতে পাইনি। হঠাৎ দেখি কালিদাস লুঙ্গি-পরা একটা ছেলের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। খুবই আস্তে, প্রায় ফিসফিসিয়ে কথা হচ্ছিল। আমার কানে এল দুটো শব্দ, ‘পার হেড দু’টাকা’
কালিদাস বলল, ‘ভাই দু’জন আছি। তিনে হবে না??
লোকটা বিড়িতে টান দিয়ে বলল, ‘ফালতু কথা বাড়াবেন না। দুই দুই করে চার লাগবে।' কালিদাস আমার কাছে এসে বলল, 'চারটে টাকা দে।”
আমি বললাম, ‘তোর টাকা কোথায়?’
কালিদাস উত্তর দিল, ‘আছে, কিন্তু এখন বার করা মুশকিল। খেলা দেখার পর দিয়ে দেব।'
ওর টাকা যত্রতত্র বের করা যে মুশকিল সেটা আমার জানা ছিল। ও কখনও টাকা পকেটে রাখত না। কাগজে মুড়ে কোমরে বেঁধে রাখত। বাধ্য হয়ে আমাকেই চারটে টাকা বের করতে হল। লোকটা আমাদের নিয়ে মাঠের অন্যদিকে হাঁটতে লাগল। খানিকটা হেঁটে আসার পর বুঝলাম, মাঠে আর-একটা দলও নেমে গেল। ঘন ঘন পটকা ফাটছিল। মাঠ জুড়ে চিৎকার আর হাততালি।
লোকটা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় দাঁড়াল। গোটা মাঠটা তো কাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা।
বেড়ার মাথায় কাঁটাতারের জাল। লোকটা সেই কাঠের বেড়ায় হেলান দিয়ে বলল, “কে আগে যাবে?’
কালিদাস আমার দিকে তাকাল। আমায় বলল, ‘তুই আগে যাবি?’
আমি ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে না পেরে বললাম, 'চার টাকা দিয়েছি, দু’জনেই যাব। এর আবার আগে পরে কী?’
লোকটা যেন আমায় ধমকে উঠে বলল, ‘আহ্লাদের কুলফি আর কি! একসঙ্গে দু’জন কেমন করে যাবেন। আগে-পরে করতে হবে।'
আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না সেটা টের পেয়ে কালিদাস বলল, 'আমরা তো গেট দিয়ে ঢুকতে পারব না। গেট বন্ধ।'
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তবে কোথা দিয়ে ঢুকব?’
কালিদাস বলল, ‘সুড়ঙ্গ দিয়ে। ওই যে দেখছিস একটা থলে পড়ে আছে ওটা হচ্ছে চিহ্ন। ওর নীচে গর্ত করা। তোকে ওই গর্তে ঢুকিয়ে দেবে। ওপাশে গ্যালারির নীচে ওদের লোক আছে, ওরা তোকে টেনে মাঠের মধ্যে তুলে নেবে। একবার মাঠে ঢুকতে পারলে ঠিক বসার জায়গা করে নেব।'
আমি কিছুটা ভয়ে আর বিস্ময়ে বললাম, ‘ওভাবে লোক যেতে পারে?'
লুঙ্গি-পরা লোকটা দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল, ‘যেতে পারে মানে, প্রত্যেক চ্যারিটিতে যাচ্ছে। আজকেও চোদ্দোজনকে পাঠিয়েছি। যাবেন তো বলুন, খেলা শুরু হয়ে যাচ্ছে। কে আগে যাবেন?’
আমি বললাম, ‘আগে কালিদাস যা।'
লোকটা চারদিক তাকিয়ে বস্তা সরাল। কোমর থেকে লিকেলিকে চাবুকের মতো একটা বেত বের করে গর্তের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজের মুখ নামিয়ে আনল গর্তের মুখে। লোকে যেভাবে চোঙায় মুখ রেখে ফোঁকে, লোকটাও তেমনই করে গর্তের মুখে নিজের মুখ রেখে ডাকল, ‘আব্দুল, অ্যাই আব্দুল, একটা পাঠাচ্ছি। পেমেন্ট ডান। টেনে নিস। মোট দু'পিস যাবে।'
কথা শেষ করেই লোকটা কালিদাসকে বলল, ‘আসুন।'
তারপর হুকুমের গলায় বলল, 'উপুড় হয়ে মাথা গলান।'
কালিদাস মাথা গলাল। এবার লোকটা যেভাবে সুচে সুতো ভরে সেইভাবে কালিদাসের কোমরে হাত রেখে ঠেলতে ঠেলতে বলল, 'হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে রাখুন। ওদিকে আব্দুল টেনে নেবে। ভেতরটা স্লিপারি আছে, হড়হড়িয়ে চলে যাবেন।'
আমার চোখের সামনেই কালিদাসের মুণ্ডুটা গর্তের মধ্যে ঢুকে গেল। লোকটা গর্তে মুখ রেখে বলল, ‘আব্দুল, একজন যাচ্ছে। টেনে নিস।'
আস্তে আস্তে কালিদাসের গলা, বুক গর্তের মধ্যে ঢুকে গেল। লুঙ্গি পরা লোকটা এবার কালিদাসের পা দুটোকে ধরে গর্তের মধ্যে ঠেলে দিতে লাগল। প্রায় কোমর পর্যন্ত গেছে ঠিক তখনই ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নামল একজোড়া পুলিশ। একজন খাবলা দিয়ে লুঙ্গি-পরা লোকটাকে ধরতেই সে কালিদাসকে ছেড়ে দিয়ে চোঁ চোঁ দৌড় লাগাল। মাঠের ভিতর থেকে আব্দুল তখন কালিদাসের হাত ধরে টান দিচ্ছে। মাটির সঙ্গে ঘষটে ওর শরীরটা সড়সড় করে সুড়ঙ্গের মধ্যে চলে যাচ্ছে। অন্য পুলিশটা এবার ঝাঁপিয়ে পড়ে কালিদাসের ঠ্যাং দুটো ধরল। হাত ফসকে মাছ জলে পড়বার আগে যেভাবে খাবলা দিয়ে মাছ ধরে, ঠিক সেইভাবে পুলিশটা খাবলা দিয়ে কালিদাসের ঠ্যাং দুটো ধরেছে। ওদিকে কালিদাসের হাত ধরে টানছে আব্দুল, আর মাঠের বাইরে থেকে পা ধরে টানছে পুলিশ। এই টানাপোড়েনের মধ্যে আব্দুলের চিৎকার ভেসে আসছে, টানিস না, ছেড়ে দে।'
কালিদাস চিৎকার করছে, ‘পেমেন্ট দিয়ে দিয়েছি, পেছন থেকে টানছে কেন?’
কালিদাসের অবস্থাটা অনুমান করে আমি শিউরে উঠলাম। ওর না আজ গুহামৃত্যু হয়। কিন্তু টানাটানিতে পুলিশের সঙ্গে আব্দুল পেরে উঠবে কেন! একটু পরেই পা ধরে হিড়হিড় করে কালিদাসকে বাইরে বের করে আনল পুলিশ। কিন্তু টাগ অব ওয়্যার করে যাকে টেনে আনল তাকে দেখে আমি তো বটেই, পুলিশ পর্যন্ত ঘাবড়ে গেল। সারা শরীরে কাদার প্রলেপ গোটা মুখ কাদায় লেপা মনে হচ্ছে মোটা কাদা দিয়ে উঠোন নিকানোর মতো কে যেন কালিদাসকে নিকিয়ে দিয়েছে। পুলিশ টেনে তুলেই হাত ছেড়ে দিল। আর কালিদাস সেই ফাঁকে লম্বা দৌড় দিল র্যামপাটের দিকে।
কালিদাস যখন মোহনদাস তড়াগে গিয়ে গা ধুচ্ছিল, তখন আমি মনে মনে ভাবছিলাম, কালিদাসের প্রস্তাবমতো আমিই যদি প্রথমে যেতাম, তাহলে এখন কালিদাস আমারই মতো বসে বসে দেখত আর আমি মোহনদাস তড়াগে নেমে গা ধুতাম।
এত কাণ্ডের পরেও কালিদাস বলল, 'আমাদের সাড়ে তিন টাকা লোকসান হল।' আমি বললাম, ‘সাড়ে তিন কেন হবে? আমি তো চার টাকাই দিয়েছি।'
কালিদাস জামা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল, ‘পুলিশের টানে ওপরে হড়কে ওঠার সময় সুড়ঙ্গের মধ্যে একটা আধুলি পেয়েছি। কাদায় লেপটে ছিল। যাক, তবু আট আনা রোজগার হল।'
কালিদাসের মস্ত গুণ ছিল ও কখনও স্কুল কামাই করত না। আর সত্যি কথা বলতে কী, কালিদাস ক্লাসে না থাকলে গোটা ক্লাসটাই আমাদের কাছে বড্ড আলুনি মনে হত। রোজ ক্লাসে, কোনও-না-কোনও পিরিয়ডে, কিছু-না-কিছু একটা ঘটনা কালিদাস ঘটাতই। মাঝে মধ্যে যখন খুব ঝামেলা হত, তখন আমি কালিদাসকে বলতাম, ‘তুই এরকম করিস কেন? একটু ভাল হয়ে থাকতে পারিস না?’
কালিদাস উত্তর দিত, ‘আমি তো করতে চাই না, কিন্তু ব্যাপারটা হয়ে যায়। আসলে ভাই আমি অন্যায় সইতে পারি না।'
কালিদাসের এসব কথার কোনও মানে হয় না। উলটে ও নিজেই নানারকম অন্যায় কর্ম করে আমাদেরও বিপদে ফেলে দিত। স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টসে একবার কালিদাস সব কটা ইভেন্টে নাম দিল আর প্রত্যেকটাতেই কিছু-না-কিছু গণ্ডগোল করে গোটা স্পোর্টসটাই প্রায় বাতিল করে দেওয়ার উপক্রম করল। প্রথম ইভেন্ট দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথমে খানিকটা ছুটে গিয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে উলটোদিকে দৌড়তে আরম্ভ করল। ব্যাপারটা ছিল একশো গজ দৌড়। মাঠের উত্তর থেকে দক্ষিণে পঞ্চাশ গজ, সেখানে পৌঁছে আবার দক্ষিণ থেকে উত্তরে ছুটে এসে দড়ি ছুঁতে পারলেই পুরো একশো গজ শেষ হবে। কালিদাস করল কি, প্রথমে উত্তর থেকে দক্ষিণে পনেরো গজ দৌড়েই হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে উত্তর দিকে ছুটতে লাগল। অন্যরা যখন প্রথম পঞ্চাশ গজ শেষ করে মাঝামাঝি এসে গেছে, কালিদাস তখন দৌড়ে গিয়ে দড়ি ধরে টানাটানি করতে করতে দড়ি-টড়ি ছিঁড়ে ‘আমি ফার্স্ট, আমি ফার্স্ট’ বলে লাফাতে আরম্ভ করে দিয়েছে। এবার সত্যি যারা একশো গজ কমপ্লিট করে দড়ির কাছে এসেছে, তারা আর দড়ি খুঁজে পাচ্ছে না। আমাদের গেম-টিচার সদানন্দবাবু কালিদাসের কাণ্ড দেখে এতই খেপে গেলেন যে, মাঠের মধ্যেই তিনি কালিদাসকে মারবার জন্য ধেয়ে গেলেন। কালিদাস একশো মিটার অবশ্য দৌড়তে পারেনি, কিন্তু সদানন্দবাবুর তাড়া খেয়ে যেভাবে মাঠময় এঁকেবেঁকে দৌড়ল সেটা দেখার মতো দৃশ্য। সদানন্দবাবু রেগে গিয়ে ওকে সব কটা ইভেন্ট থেকে বাদ দিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু আমরা তা হতে দিলাম না। শেষ পর্যন্ত হেডসার বললেন, ‘মাঠে দু’-একটা পাগল থাকা মন্দ না। কালিদাসকে আপনি আজকের দিনে ছেড়ে দিন। ব্যারাকপুর থেকে এসডিও সাহেব আসছেন প্রাইজ দিতে। কালীকে মাঠেই আটকে রাখুন। বাইরে থাকলে আরও ভয়ংকর কিছু করে ফেলতে পারে।'
শেষ পর্যন্ত সদানন্দবাবুর সম্মান রাখতে লং জাম্প আর হাই জাম্প এই দুটো ইভেন্ট থেকে কালিদাসকে বাদ দেওয়া হল। খানিক পরে শুরু হল জিলিপি রেস। টনসুতোর মধ্যে জিলিপি ঝোলানো। দু'জনে দু'পাশ থেকে দড়িটা ক্রমাগত নাড়াবে আর ছুটে এসে সেই জিলিপি মুখে কামড়ে নিয়ে আবার দৌড়ে যেতে হবে উলটো দিকে।
কালিদাসও দৌড়ল। জনাপাঁচেকের পর জিলিপির দড়ির কাছে পৌঁছে দেখল দড়িটা খুব নড়ছে। ক্লাস এইটের সুধাংশু শুধু বার-দুই লাফিয়ে উঠে একটা জিলিপি মুখে নিয়ে উলটো দিকে দৌড় শুরু করেছে। অন্যরা তখনও জিলিপির নাগাল পাওয়ার জন্য লাফালাফি করে যাচ্ছে। কালিদাস হঠাৎ দড়ির এক প্রান্তে ছুটে গিয়ে আমাদের স্কুলের দফতরি নারায়ণকে এক ধাক্কা দিয়ে নীচে ফেলে দিল। তারপর বলে উঠল, ‘ছোট ছোট ছেলেদের সঙ্গে ইয়ার্কি হচ্ছে। এত জোরে দড়ি নাড়াতে কে বলেছে। না হয় দুটো জিলিপি বেশিই খেল। তাতে তোমার কী?’
নারায়ণ মাটিতে পড়ে যেতেই একদিকের দড়ি ছিঁড়ে জিলিপিগুলো নীচে পড়ে গেল। কালিদাস কোনওদিকে না তাকিয়ে সব কটা জিলিপি দড়ি থেকে তুলে নিয়ে খেতে আরম্ভ করল। এই অপরাধের জন্য দড়ি-টানাটানির ইভেন্ট থেকেও কালিদাসকে বাদ পড়তে হল। শেষ ইভেন্ট ছিল ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’, অর্থাৎ ‘যেমন খুশি সাজো'। কালিদাস প্রথমে বলেছিল ক্ষুদিরাম সাজবে। পরে মত বদলে বলল, আমি পঞ্জাবি ড্রাইভার সাজব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কালিদাস সাজল পাগল। ততক্ষণে এসডিও সাহেব সস্ত্রীক এসে গেছেন। অন্য অতিথিরাও বসে গেছেন চেয়ারে। কালিদাস পাগল সেজে এসে দাঁড়াল স্কুলের আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে। নিজেকে বিশ্বাস্য করে তোলার তাগিদে রাস্তা থেকে একটা কুকুরকে দড়ি দিয়ে বেঁধে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। দড়িটা শক্ত করে বেঁধে রেখেছে নিজের কোমরের সঙ্গে। ওর সাজগোজ নিতান্ত খারাপ হয়নি। এসডিও সাহেবকে যখন কালিদাস পাগল সেজে এসে বলল, ‘হ্যালো জেন্টেলম্যান! হাউ ডু ইউ ডু?’ সাউথ ইন্ডিয়ান সেই ভদ্রলোক, পদবি বোধ হয় রাঘবন, তিনি বেশ উজ্জ্বল চোখে কালিদাসের দিকে তাকালেন। কালিদাস যদি ওই পর্যন্ত করেই থামত তাহলে আর কোনও অঘটন হত না। কালিদাস হঠাৎ হাতে তালি বাজিয়ে বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল, ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল, পার করো আমারে।'
এক লাইন গান গেয়ে রাঘবনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আন্ডারস্ট্যান্ড? আই সে টু লর্ড হরি! ডিয়ার হরি, মাই ডেজ আর গন। নাউ ইভনিং কাম, প্লিজ হেলপ মি টু ক্রস দ্য সামথিং। নাউ আন্ডারস্ট্যান্ড স্যার।'
রাঘবন-সাহেব কী বুঝলেন কে জানে। উনি হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে কালিদাসের সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করলেন। কালিদাস মাথার টুপি খুলে রাঘবনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ইউ আর মাই হরি। ইউ প্লিজ গিভ মি সাম রুপি। আই অ্যাম ভেরি ভেরি অ্যান্ড ভেরি পুয়োর।'
রাঘবন-সাহেব সত্যি সত্যি পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে কালিদাসের টুপিতে রাখলেন। আমাদের কৈশোরকালে পাঁচ টাকা নিতান্ত কম ছিল না। এবার কালিদাস সবার সামনে টুপি এগিয়ে দিয়ে ভিক্ষা করতে লাগল। আরও যেসব ছাত্র শিব, বিবেকানন্দ, কৃষক ইত্যাদি সেজেছিল তারা তো কালিদাসের কাণ্ড দেখে হতভম্ব। কালিদাস ওদের কাউকেই কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। পাগল সেজে লাঠি হাতে ওদের এমন তাড়া করছে যে, ওরা মাঠ ছেড়ে বাইরে পালিয়ে গেছে। কিন্তু যেই-না রাঘবন-সাহেব পাঁচ টাকা দিলেন এবং তাঁর দেখাদেখি হেডসারও দু'টাকা দিয়েছেন, অমনি ভবাপাগলা আর বিশুপাগলা লাফ দিয়ে এসে পড়ল রাঘবনের সামনে। ওরা প্রতিবাদ করার ভঙ্গিতে বলতে লাগল, ‘পাগল সেজেই যদি কালিদাস পাঁচ টাকা বখশিশ পায় তা হলে আমরা যারা এপাড়ার সত্যিকারের পাগল তারা কেন বখশিশ পাব না?’
রাঘবন-সাহেব চোখের চশমা খুলে হেডসারকে বললেন, ‘আপনার কতজন ছাত্র পাগল সেজেছে?’
হেডসার কী উত্তর দিয়েছিলেন জানি না। কিন্তু তখনই এমন একটা ব্যাপার ঘটে গেল যে, রাঘবন-সাহেব দ্বিতীয় কোনও প্রশ্ন করার অবকাশ পেলেন না। পাগল সেজে কালিদাস পয়লা চোটেই গো অ্যাজ ইউ লাইকের অন্যান্য প্রতিযোগীদের লাঠি নিয়ে এমন তাড়া করেছিল যে, ওরা সবাই মাঠের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ব্যাপারটা এমনভাবে করেছিল যেন রাস্তার পাগল পাগলামো করছে। ওরা মাঠের বাইরে গেলেও কালিদাসের ওপর ভীষণ চটে গিয়েছিল। ওদের মধ্যেই কেউ পর পর দুটো কালিপটকায় আগুন দিয়ে ছুড়ে দিল কালিদাসের সংগ্রহ করা কুকুরটার সামনে। কুকুরের গলায় যে দড়ি বাঁধা ছিল তার অন্য প্রান্তটা কালিদাস বেঁধে রেখেছিল নিজের কোমরের সঙ্গে। পটকার আওয়াজ পেয়েই কুকুরটা দৌড় লাগাল। সেই সঙ্গে ঘেউ ঘেউ চিৎকার। সেই চিৎকারে আরও খানতিনেক কুকুর ঢুকে পড়ল মাঠের মধ্যে। ওরা বেপাড়ার কুকুর এটা বুঝতে পেরে প্রবলবিক্রমে ধেয়ে গেল। কালিদাসের কোমরের দড়িতে আচমকা টান পড়ায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল মাঠের মধ্যে। ওর রোগা শরীর তখন যত্রতত্র গড়াগড়ি খাচ্ছে। কুকুর দৌড়চ্ছে, তার পিছনে কোমরে দড়ি-বাঁধা কালিদাস গড়াতে গড়াতে যাচ্ছে। তাড়া খেয়ে কুকুর যাচ্ছে অন্য দিকে, কালিদাসও গড়িয়ে ঘষড়ে চলে যাচ্ছে অন্য দিকে। আমরা খালি কালিদাসের গলার আর্তনাদ শুনছি, ‘সামথিং ফাউল, সামথিং ফাউল। হেলপ মি, হেলপ মি।' সেবার ওই একটা ব্যাপারেই কালিদাস ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছিল।

আমাদের স্কুলে নানা সময়েই নানা ধরনের অনুষ্ঠান হত। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান ছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী। আমাদের স্কুলের মেয়েদের মধ্যে অনেকেই ভাল নাচতে পারত, কয়েকজন ভাল গানও গাইত। দিদিমণিদের মধ্যে দু'জন তো রীতিমতো সুগায়িকা। মেয়েদের ক্লাস হত সকালে আর ছেলেদের দুপুরে। ছেলেদের মধ্যে দু’জন ভাল গাইত আর অনেকেই সুন্দর আবৃত্তি করতে পারত। ক্লাস সিক্সে ওঠার পর থেকে কালিদাস প্রতি বছরই এই অনুষ্ঠানে কিছু-না-কিছু একটা করার জন্য অনেক চেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু কোনওবারই ওকে সুযোগ দেওয়া না। কিন্তু ক্লাস এইটে ওঠার পর কালিদাস কেঁদে গিয়ে পড়ল হেডসারের কাছে। ওর কান্না দেখে হেডসারের দয়া হল। তিনি বলে দিতেই কালিদাসকে একটি আবৃত্তি করার সুযোগ দেওয়া হল। কিন্তু শর্ত হল, আমাদের মাস্টারমশাই অজয়বাবুর কাছে গিয়ে আবৃত্তিটা শিখে নিতে হবে। অজয়বাবু নিজে খুব চমৎকার আবৃত্তি করতেন। রবীন্দ্রজয়ন্তীর আগে অজয়বাবুই আমাদের আবৃত্তি শেখাতেন।
অজয়বাবু আবৃত্তি শেখাবার আগে কবিতাটির পশ্চাৎপট, কবিতার মানে, তার ব্যাখ্যা এগুলো ভাল করে বুঝিয়ে দিয়ে বলতেন, 'কবিতার অর্থ বুঝতে না পারলে সেটা আবৃত্তি করবে কেমন করে। অতএব, আগে কবিতাটি ভাল করে বুঝে নাও, তারপর কোথায় কেমনভাবে উচ্চারণ করবে, কখন দম ছাড়বে, কখন টানবে, কোথায় কতটুকু পজ অর্থাৎ বিরতি দেবে এগুলো জেনে নিতে হবে।'
আমরা লক্ষ করলাম, কালিদাস খুব ঘন ঘন অজয়বাবুর বাড়িতে যাতায়াত করছে। ওর হাতে সবসময় ‘সঞ্চয়িতা'। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুই কোন কবিতাটা বলবি?’ কালিদাস খুব গম্ভীর হয়ে বলত, ‘এখনই বলা যাবে না। আমার কণ্ঠস্বর আর উচ্চারণ শুনে সার খুব কঠিন একটা কবিতা বেছে দিয়েছেন। তাই খুব খাটতে হচ্ছে রে।'
কালিদাসের কণ্ঠস্বর মোটেও ভাল নয়। ওকে কখনও আবৃত্তি করতেও শুনিনি। তবে কেন অজয়বাবু ওকে একটা কঠিন কবিতা বেছে দেবেন?
অনুষ্ঠানের দিন দর্শক-শ্রোতার সংখ্যা প্রচুর। প্রায় হাজার বারোশো লোক। ওই তল্লাটে আমাদের স্কুলের অনুষ্ঠানের খুব নাম ছিল। আমরা কালিদাসকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। সেই ঢোলা প্যান্টের বদলে কালিদাস পরেছে তাঁতের ধুতি, গায়ে একটা পাঞ্জাবি, যার ঝুল নেমেছে হাঁটু ছাড়িয়ে আরও আধ বিঘত। কাঁধে ভাঁজ করা চাদর।
আমরা ঠাট্টা করে বললাম, ‘এটা পাঞ্জাবি না শেমিজ রে?’
কালিদাস গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল, ‘সবাই বলে আমার চেহারার সঙ্গে কবিগুরুর অনেকটা মিল আছে। তাই গুরুদেবের মতো সেজে আসবার চেষ্টা করেছি।'
সাড়ে ছ'টা নাগাদ হেডসারের প্রারম্ভিক ভাষণের পর ছাত্র-ছাত্রীদের সমবেত সংগীত ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ শুরু হল। আমরা তাকিয়ে দেখি সামনের সারিতে কালিদাস দাঁড়িয়ে আছে। আমরা তো অবাক। পণ্ডিতমশাই কালিদাসকে দেখতে পেয়ে অবাক গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘গর্দভটা গান জানে নাকি?’
আমরা কালিদাসকে বেরিয়ে আসার জন্য নানারকম ইশারা করতে লাগলাম, কিন্তু কালিদাস পাত্তাই দিল না।
গান নির্বিঘ্নেই শেষ হল। আমরা কালিদাসকে চেপে ধরতেই বলল, ‘এতে দোষের কী আছে। আমি কি সোলো গাইতে উঠেছি। কোরাস গাওয়া তো সবচেয়ে সোজা। খালি ঠোঁট আর ঘাড় নেড়ে যাবি। মুখ দিয়ে আওয়াজ না বেরুলেই হল। কিন্তু লোকে তো বুঝল আমি গাইতে জানি।'
আমাদের স্কুলের অনুষ্ঠান তখন বেশ জমে উঠেছে। অজয়বাবুর ‘আফ্রিকা’ কবিতাটির আবৃত্তি শুনে আমাদের মতো দর্শকরাও মুগ্ধ। তারপরেই এল মঞ্জুর নাচের অনুষ্ঠান। যূথিকা দিদিমণির ‘নৃত্যেরই তালে-তালে হে নটরাজ...’ গানের সঙ্গে মঞ্জু নাচতে আরম্ভ করল। যাকে বলে সুপারহিট তেমনই নাচ নাচল মঞ্জু। গানও দুর্দান্ত। পরদা পড়ার পর করতালিতে কান ফেটে যাওয়ার অবস্থা। এর পর পরদা উঠতেই ঘোষণা হল, ‘এবার কবিতা আবৃত্তি করে শোনাবেন শ্রীমান কালিদাস মুখোপাধ্যায়।'
মাইকের সামনে কালিদাস এসে দাঁড়াল। দুটো হাত তুলে সকলকে নমস্কার করেই হাত দুটো পিছনের দিকে নিয়ে গিয়ে একটু কুঁজো হয়ে যে ভঙ্গিতে দাঁড়াল, ঠিক সেইরকম পোজে রবীন্দ্রনাথের বহু ছবি আছে। আমাদের হেডসারের ঘরেও পিছনে হাত দিয়ে ঈষৎ কোমর ভেঙে দাঁড়ানো কবিগুরুর একটা বড় মাপের ছবি আমরা রোজই দেখতে পাই। কালিদাস সেই ভঙ্গি নকল করে দাঁড়াল। তারপর বলতে আরম্ভ করল, ‘মাননীয় সুধীবৃন্দ, পরম পূজনীয় শিক্ষক ও শিক্ষিকাবৃন্দ ও বৃন্দা, আমার সিনিয়ার ছাত্রদাদারা, ছাত্রবন্ধুরা এবং ছাত্রভাইয়েরা। আমি এখন আবৃত্তি করে শোনাব বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ‘প্রশ্ন’। কিন্তু প্রশ্ন হল, এত কবিতা থাকতে প্রশ্ন কেন? আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, আমাদের এই পবিত্র ভারতভূমি দীর্ঘকাল ব্রিটিশের অধিকারে ছিল। ব্রিটিশের শাসন থেকে দেশকে স্বাধীন করতে আমরা, আমাদের বাবা-জ্যাঠা-ঠাকুরদা, তাঁর বাবা-কাকারা সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু আমাদের বিশ্বকবিও চুপ করে বসে ছিলেন না! পেন ইজ মাইটার দ্যান সোর্ড, অতএব বিশ্বকবির কলমও তরবারির চেয়ে বেশি ক্ষুরধার। আপনারা জানেন, জালিয়ানওয়ালাবাগের কথা। আমাদের অতি নিকটে সে দেশ। হাজারিবাগ আর জালিয়ানওয়ালাবাগ দুটি অতি শান্ত গ্রাম। সেই গ্রামে...’
দর্শক আসনের সামনের সারিতে বসে ছিলেন শিক্ষক ও শিক্ষিকারা। ওঁরা একটু চঞ্চল হলেন। উইংসের পাশ থেকে অজয়বাবু
বললেন, ‘আবৃত্তি শুরু করে দাও।' কালিদাস শুনল কি না কে জানে। সে বলে যেতে লাগল, ‘সেই গ্রামে ব্রিটিশ সরকার নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শত শত নর-নারী এবং শিশুকে হত্যা করল। সে দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। বলতে গেলে চোখে জল আসে। মাতা মাতঙ্গিনী, ভগৎদা, বাঘা যতীনদা, আমাদের আদরের দাদা ক্ষুদিরামদা সবাই কিন্তু পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিল।'
সামনের দর্শকসারি থেকে সদানন্দবাবু আর বাংলার সার প্রায় চিৎকার করে উঠে বললেন, ‘তুই আবৃত্তি শুরু কর।'
কালিদাস হাত তুলে সারদের আশ্বস্ত করার ভঙ্গি করে বলল, “আমি জানি, শুধু আমার পূজনীয় শিক্ষকরা নন, আপনারা সকলেই আমার আবৃত্তি শোনবার জন্য অধীর হয়ে পড়েছেন। কিন্তু বন্ধুগণ, যে কবিতাটি আমি বলব, তার অন্তরের কথা, তার ভাবার্থ, তার পশ্চাৎপট আপনাদের জেনে রাখা উচিত। অন্যদের মতো না জেনে, না বুঝে আমি শব্দ আউড়ে যাই না, যেতে পারি না। যাকগে, যা কথা হচ্ছিল, সেই জালিয়ানওয়ালাবাগে যা ঘটল, রক্তের ধারায় দেশ ভিজে গেল। সেই সংবাদ জানতে পেরে বিশ্বকবির প্রাণ ডুকরে কেঁদে উঠল। কিন্তু ঘরের আড়ালে অশ্রুপাত করার লোক তিনি নন। তিনি বিশ্বকবি। তিনি আমাদের কাছে পরম পুরুষ। তিনি সেই ঘটনায় লিখে ফেললেন একটি কবিতা। যার নাম ‘প্রশ্ন’। কিন্তু প্রশ্ন হল কবিতাটির নাম প্রশ্ন কেন? কেন নয় ‘জিজ্ঞাসা’, কেন নয় ‘উত্তর চাই', কেন নয় ‘জবাব দাও’। কারণ, কবিগুরু...”
মাইক বন্ধ হয়ে গেল। অন্য উপায় না দেখে মাইক বন্ধ করে দিতে হল। কালিদাস সেটা বুঝতে পেরে মাইক ছেড়ে এগিয়ে এসে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সঙ্গীতহারা, কিন্তু তাতে ঘাবড়াই না।'
তখন পরদা টেনে দেওয়া হচ্ছে। কালিদাস পরদা সরিয়ে পরদার বাইরে এসে বলল, 'এই আচরণের প্রতিবাদে আমি আবৃত্তি না করে মঞ্চ ত্যাগ করলাম। আমার প্রতিভাকে টিপে মারার এই অপচেষ্টার সঙ্গে জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার আশ্চর্য মিল দেখতে পাচ্ছি। অতএব, আমি চললাম। আমাদের অনুষ্ঠানও শেষ। আপনারাও বাড়ি যান।'
অনেকে সত্যি উঠে দাঁড়ালেন। ভাবলেন সত্যি বুঝি অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে। তখন বাধ্য হয়ে মাইকে ঘোষণা করতে হল, ‘আপনারা যাবেন না, আপনারা দয়া করে বসুন। আমাদের অনুষ্ঠান এখনও শেষ হয়নি। এবার শুরু হবে কবিগুরুর নাটিকা ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’।’
এই ঘটনার পর থেকে স্কুলের আর কোনও অনুষ্ঠানে কালিদাসকে কখনও অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এমনকী, স্বয়ং হেডসার নিজেই বলেছিলেন, ‘ওকে কখনও কোনও ব্যাপারে যোগ দিতে দেবেন না। ও সত্যিই ডেঞ্জারাস!’
স্কুলের সব অনুষ্ঠান থেকে কালিদাসকে বাদ দেওয়া হলেও খেলাধুলোর ব্যাপারে ওকে বাদ দেওয়া গেল না। নিজে খেলতে না পারলেও খেলার ব্যাপারে ওর জ্ঞান ছিল অনেকের চেয়ে বেশি। অতএব, কালিদাসকে আমাদের দরকার হতই। ফুটবলের সবরকম আইনকানুন তখনই ওর কণ্ঠস্থ ছিল। ফুটবলের সিজন এলে বিভিন্ন পাড়ার, বিভিন্ন মাঠে গিয়ে ও সব দলের খেলা দেখত। আমরা যখন নাইনে পড়ি তখন নানা পাড়া থেকে সাতজন ছেলেকে নিয়ে কালিদাস একটা দল করল। দলের নাম সেভেন বুলেটস। আমায় এসে বলল, ‘একটা দল করেছি। নাম সেভেন বুলেটস।'
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এর পর কী করবি?
কালিদাস বলল, ‘কুলীনপাড়ার টুর্নামেন্টে নাম দেব। সেভেন সাইড খেলা।'
তখন বিভিন্ন পাড়ায় সাতজন, ন’জন এবং এগারোজনের দল নিয়ে নানা ধরনের টুর্নামেন্ট হত। কোনও কোনও টুর্নামেন্ট থাকত চার-দশ। চার-দশ মানে চার ফুট দশ ইঞ্চির মধ্যে যাদের উচ্চতা কেবল তারাই সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারত। আসলে এগুলো ছিল ছোটদের টুর্নামেন্ট। চার ফুট দশ ইঞ্চির বেশি উচ্চতা হলে তাকে বাদ পড়তে হত। সেজন্য প্রতিটি খেলার আগে খেলোয়াড়দের উচ্চতা মাপার ব্যবস্থা থাকত। স্টেশনের ওপারে ধ্রুব নামে একজন খেলোয়াড় ছিল। চার-দশের টুর্নামেন্টে ওর খুব চাহিদা ছিল। ধ্রুব খুবই বেঁটে ছিল বটে, কিন্তু তাই বলে বছরের পর বছর ওর উচ্চতা চার-দশের মধ্যেই থেকে যাবে সেটা তো সম্ভব নয়। কালিদাসের সেভেন বুলেটের একটি বুলেট ছিল সেই ধ্রুব। খেলতে এসে ধ্রুব বলল, ‘কালী, তোর কথায় এলাম বটে, কিন্তু দেখবি আমি চার-দশে অ্যালাউ হব না। আমি তো চার-এগারো ছাড়িয়ে গেছি। জুতো পরলে পাঁচ হয়ে যাই।'
কালিদাস নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ‘এক-দেড় ইঞ্চি কমাবার ব্যবস্থা আছে।'
তখন আমাদের পাড়ায় বিস্তর খেলার মাঠ ছিল। এখন যেমন খেলার মাঠ পাওয়াই ভাগ্যের কথা তখন তেমন ছিল না। মানুষজনের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলার মাঠগুলো বিক্রি হয়ে গেছে। সেখানে এখন নানা ডিজাইনের বাড়ি। এখন তো পুকুর বুজিয়েও বাড়ি হচ্ছে; কিন্তু খেলার মাঠ হচ্ছে না। যে মাঠে খেলা হচ্ছিল তার একপাশে অনেকটা জংলা জমি আর-একটা নুয়ে পড়া টালির ঘর। সেই ঘরে নাকি একসময় একজোড়া ভূত থাকত। আমরা কখনও সেই জোড়া ভূতকে দেখিনি, কিন্তু সেই অদেখা ভূতের নানা কীর্তি-কাহিনি শুনেছি। কালিদাস ধ্রুবকে সেই নুয়ে-পড়া টালির ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘জামা-প্যান্ট খুলে এগুলো পরে নে।'
আমি দেখলাম, সাইকেলের দোকানে যেমন রাবারের টিউব দেখা যায়, তেমনই কয়েকটা টিউব বার করে কালিদাস ধ্রুবর দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। আমি বললাম, ‘এগুলো দিয়ে কী হবে?’
কালিদাস উত্তর দিল, ‘কাঁধের ওপর থেকে টিউবটা এনে দুই ঠ্যাঙের মধ্যে টেনে বাঁধ। দু'ইঞ্চি হাইট কমে যাবে।'
কালিদাস যখন ধ্রুবকে টিউব দিয়ে বেঁধে তার ওপর ফুলহাতা জার্সি পরিয়ে মাঠে নিয়ে এল, তখন ধ্রুব নিজের ঘাড়টাই সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না। কালিদাস ক্ষিপ্রগতিতে ওকে নিয়ে গেল উচ্চতা মাপার কাঠিটার কাছে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ধ্রুব চার-এগারো থেকে চার নয় হয়ে গেছে। খেলতে নামার আগে আবার ওই নুয়ে-পড়া টালির ঘরে গিয়ে শরীর থেকে টিউব খুলে ফেলতে হয়। ওটা না খুললে তো খেলাই যাবে না।
যদিও সে বছর কালিদাসের সেভেন বুলেটস দুটো টুর্নামেন্টে নাম দিয়েও ফাইনালে যেতে পারল না। কিন্তু পরের বছর নতুন উদ্যোগে সেভেন বুলেটসকে সাজাল কালিদাস। ওয়ান ডে টুর্নামেন্ট থেকে আরম্ভ করে ফাইফ ডে টুর্নামেন্ট, সব জায়গাতেই কালিদাস নাম দিয়ে দিল। তখন টুর্নামেন্টে নাম দিতে হলে এন্ট্রি ফি তিন টাকা থেকে দশ টাকা লাগত। ছোটদের টুর্নামেন্ট বলে টাকার অঙ্ক কম রাখা হত। দশ টাকা নিতেন যাঁরা তাঁরা অবশ্য সব বয়সের খেলোয়াড়দেরই খেলতে দিতেন। যাকে বলে ওপেন টু অল। প্রাইজও দিতেন খুব ভাল। নাম দেওয়ার সময় যখন টাকার দরকার হত তখন টাকা জোগাড়ের জন্য নানা ফন্দিফিকির করত কালিদাস। কখনও বাড়ির পুরনো খবরের কাগজ আর তার সঙ্গে নিজের বই বেচে দিত। কখনও রেশনের চাল আর কিছুটা চিনি বেচে দিত অন্য কারও কাছে। ধরা পড়লে এসব কাজের জন্য বাড়িতে ওর লাঞ্ছনাও কম হত না। কিন্তু সেসব লাঞ্ছনা কালিদাস গায়েই মাখত না। কিন্তু যেবার দশ টাকার টুর্নামেন্টে নাম দিল সেবার খুব মুশকিল হল। দশ টাকা জোগাড় করা কঠিন ব্যাপার। আমাদের কাছ থেকে আট আনা, চার আনা করে চাঁদা তুলে তিন টাকা জোগাড় হল। বাজারের কাছেই ছিল ওলাইচণ্ডীর মন্দির। কালিদাস সকাল থেকে মন্দিরের চারপাশে ঘুরত। ওখানে প্রণামী হিসাবে কিছু খুচরো পয়সা কেউ কেউ ছুড়ে দিতেন। সেখান থেকে জোগাড় হল দেড় টাকার মতো। সাড়ে চার টাকা হাতে নিয়ে কালিদাস বলল, ‘এখনও সাড়ে পাঁচ টাকা লাগবে।'
আমি বললাম, ‘কোথায় পাবি?’
কালিদাস ভাবতে ভাবতে বলল, ‘পেতেই হবে। দেখি গোটাতিনেক গোরু যদি জোগাড় করতে পারি।'
আমি বললাম, ‘গোরু দিয়ে কী হবে? গোরু কি টাকা দেবে?’
কালিদাস উত্তর দিল, ‘গোরু টাকা দেবে কেন, গোরু দিয়ে টাকা পাব।'
ঠিক মধ্য দুপুরে কালিদাস আমাকে ডেকে নিল। চারদিকে রোদ ঝাঁ ঝাঁ করছে। রাস্তায় লোকজন বিশেষ নেই। কালিদাস বলল, ‘চল, গোরু ধরি।'
কিছুটা হেঁটে আসতেই দেখা গেল মাঠের মধ্যে দুটো গোরু বাঁধা। ওরা ঘাস খেয়ে জাবর কাটছে। কালিদাস গিয়ে খুঁটি থেকে গোরুর বাঁধন খুলে টানতে টানতে নিয়ে এল খোঁয়াড়ে। দুটো গোরু দিয়ে পাওয়া গেল তিন টাকা।
কালিদাস জিজ্ঞেস করল, ‘ছাগলের রেট কত?’
খোঁয়াড়ের লোকটা বলল, ‘আট আনা।’
আরও আড়াই টাকা সংগ্রহের জন্যে কালিদাস ছাগল ধরতে বের হল। চেষ্টার কোনও ত্রুটি ছিল না, তবুও ছাগল ধরতে পারা গেল না। অনেক কসরত করে আমি একটা ছাগল ধরে নিয়ে বললাম, ‘আট আনা পেয়ে গেছি।'
কালিদাস তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, ‘তুই যেটাকে ধরেছিস ওটার দাম আধ পয়সাও নয়।' আমি বললাম, ‘তবে যে খোঁয়াড়ের লোকটা বলল, ছাগলের রেট আট আনা।'
কালিদাস আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ছাগলের মুখটা দ্যাখ। ওর মুখে আকড়া দেওয়া। ওতে কিছু খেতেই পারবে না। ওকে খোঁয়াড়ে নেবে না। কেসটা ঝুলে যাবে।'
কালিদাস বলে দেবার পর ব্যাপারটা বোঝা গেল। খোঁয়াড়ে গোরু বা ছাগল দেওয়ার সময় অভিযোগ দিতে হয়। যেমন কোনও দোষ না করলে তো কাউকে থানার লকআপে ঢোকানো যায় না। তেমনই খোঁয়াড়ে গোরু বা ছাগল দিয়ে বলতে হয়, আমার নাম অমুক, আমার বাড়ি অমুক জায়গায়। এই গোরু বা ছাগল আমার বাগানে ঢুকে গাছ খেয়েছে, গাছ নষ্ট করেছে তাই খোঁয়াড়ে দিচ্ছি। তখন খোঁয়াড়ের মালিক গোরুটাকে আটকে রাখে। গোরুর মালিক যখন দেখে মাঠে তার গোরু নেই তখন খুঁজতে খুঁজতে স্থানীয় খোঁয়াড়ে আসে এবং টাকা দিয়ে গোরুকে মুক্ত করে নিয়ে যায়। গোরু খোঁয়াড়ে দিলে যদি দেড় টাকা পাওয়া যায় তা হলে সেটা ছাড়িয়ে আনতে তার ডবল অর্থাৎ তিন টাকা লাগে। খোঁয়াড়ের মালিকের এটাই লাভ। কিন্তু যে গোরু বা ছাগলের মুখটা জাল দিয়ে আটকানো সে তো খেতেই পারবে না। সুতরাং তার বিরুদ্ধে ‘গাছ খেয়েছে’ এই অভিযোগ টেকে না। তেমন গোরু বা ছাগল তো খোঁয়াড়ে নেয় না। তাই বাধ্য হয়ে ছাগলটাকে ছেড়ে দিতে হল।
এখনও টুর্নামেন্টের দশ টাকার জন্য আড়াই টাকা ঘাটতি রয়ে গেছে, অথচ আজই নাম দেবার শেষ তারিখ। কালিদাস মাঠে মাঠে গোরু খুঁজে বেড়াতে লাগল। দু’-চারটে গোরু যে পাওয়া গেল না তা নয়, কিন্তু কালিদাস সেগুলো ধরবার চেষ্টা করল না। সে বলল, ‘যার টাকা দিয়ে ছাড়াবার ক্ষমতা আছে তেমন লোকের গোরুকেই ধরতে হবে। গরিবদের গোরুগুলোকে ধরিস না।’
খুঁজতে খুঁজতে আমরা মন্দিরপাড়া ছাড়িয়ে উত্তরপাড়ার কাছাকাছি চলে এলাম। হঠাৎ কালিদাসের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। বলল, ‘ওই দ্যাখ পণ্ডিতমশায়ের গোরুটা শুয়ে আছে। দুধেল গোরু। নির্ঘাত দু'টাকা পাওয়া যাবে।'
এবার আমার ভয় করতে লাগল। আমি বললাম, ‘এটা কিন্তু পাপ হবে।' কালিদাস বলল, ‘পাপ হলে আগেই হয়েছে। এটাকে ছাড়া নেই।'
কালিদাস দড়ি খুলে গোরুটাকে টানতে টানতে খোঁয়াড়ে নিয়ে এল। যেহেতু এই গোরুটি দুধ দেয় তাই এর জন্য পাওয়া গেল দু'টাকা। তবু আট আনা কম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘দুধ দিলে কি খোঁয়াড়েও রেট বেড়ে যায়?’
কালিদাস বলল, ‘যাবে না। খোঁয়াড়ের লোকটা তো এখনই সব দুধ দুয়ে নেবে। এক-দেড় সের দুধ তো ফালতু পেয়ে যাবে। তাই রেট বেশি।'
আট আনা পয়সা কম নিয়েই আমরা হাঁটতে হাঁটতে পানিহাটিতে এলাম। টুর্নামেন্ট কমিটির হাতে সাড়ে ন'টাকা তুলে দিয়ে কালিদাস বলল, 'দাদা, প্রথম খেলার দিন আট আনা দিয়ে দেব।'
টুর্নামেন্টের কেউ আপত্তি করল না। বরং অনেকে বলল, ‘অনেকে তো পাঁচ টাকা দিয়েই নাম লিখিয়ে গেছে। আপনি তবু সাড়ে ন'টাকা দিয়েছেন।'
কালিদাস বিগলিতভাবে বলল, 'আমি দাদা ধার-বাকি পছন্দ করি না। ক্লাব-ফাণ্ডে যখন টাকা আছে তখন দিতে দেরি করব কেন।'
যেদিন খেলা পড়ত কালিদাস সেদিন খুব সকালে উঠে বিভিন্ন বাগানে ঢুকে যেত লেবু জোগাড় করতে। হাফটাইমে কালিদাস খেলোয়াড়দের দিত লেবু, নুন আর জল। ফাইনালে উঠলে ভিমটো (একটি ঠাণ্ডা পানীয়, এক সময় পাওয়া যেত) খাওয়াবে সেটা আগেই বলে রেখেছিল। কিন্তু টিম ফাইনালে উঠলেও খেলার দিন সকালে একটা অঘটন ঘটে গেল। পণ্ডিতমশাই এসে কালিদাসের বাবাকে তাঁর গোরু খোঁয়াড়ে দেওয়ার কথাটা বলে দিয়েছেন। খোঁয়াড়ের মালিক যে চেহারার বর্ণনা দিয়েছে তার সঙ্গে কালিদাসের চেহারা হুবহু মিলে যাচ্ছে। তা ছাড়া গোরু টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় যে দেখেছে সে কালিদাসকে চিনত। পণ্ডিতমশাইয়ের অভিযোগ শেষ না হতেই পড়শিদের অভিযোগ এল, কালিদাস তাঁদের গাছের মাথা মুড়িয়ে লেবু নিয়ে গেছে। কালিদাসের বাবা যে কোনও অভিযোগের চটজলদি সমাধান করতে পারতেন। তিনি বললেন, 'আমার অনুরোধ, আপনারা কালীকে খোঁয়াড়ে দিন।'
অন্যরা না দিলেও কালিদাসের বাবা কালিদাসকে সত্যি সত্যি খোঁয়াড়ে দিয়ে দিলেন। খবর পেয়ে আমরা হই হই করতে করতে গেলাম। কালিদাস ততক্ষণে তর্ক জুড়ে দিয়েছে, ‘বাবা দিলেও আপনি আমাকে খোঁয়াড়ে নিতে পারেন না। এটা গুরুতর অন্যায়।' আমাদের দেখে কালিদাস বলে উঠল, ‘সবাইকে খবর দে। সোডার বোতল চার্জ কর।
ভেঙে ফেল কারার ওই লৌহশালা। জ্বালা, জ্বালা, আগুন জ্বালা।’
আমরা প্রায় পনেরোজন ছেলে তখন চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু করে দিয়েছি। আমাদের চিৎকার শুনে আরও ছেলে আসছে। সেইসময় কালো কোট পরে সুধাংশুর বাবা ব্যারাকপুর কোর্টে যাচ্ছিলেন। তিনি ওকালতি করতেন। আমাদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন তারপর সব শুনে খোঁয়াড়ের মালিককে বললেন, ‘তুমি করেছ কী? তোমার তো জেল হয়ে যাবে। গোরুর খোঁয়াড়ে মানুষ আটকে রেখেছ। এটা তো ক্রিমিনাল অফেন্স। নন-বেলেবল কেস। তুমি জামিনও পাবে না। ছেলেটার যদি অসুখ করে, ধরো ফিট-টিট হয়ে যায় তা হলে অ্যাটেমট্ টু মার্ডার, মানে খুনের দায়ে পড়বে।'
যেই-না কথাটা বলা, সঙ্গে সঙ্গে কালিদাস গোঁ গোঁ শব্দ করে ফিট হয়ে পড়ে গেল। খোঁয়াড়ের লোকটা তখন কালিদাসের হাতে-পায়ে পড়ছে। কাকুতি-মিনতি করে বলছে, ‘ভাই কালি, তুমি উঠে বোসো। ভাইগো, এট্টু গোঁ গোঁ থামাও।'
কালিদাস উঠে বসেছিল ঠিকই, কিন্তু চার আনা করে মোট দশ বোতল ভিমটোর দাম খোঁয়াড়ওলার কাছ থেকে আদায় করেছিল। সেই প্রথম কালিদাসের সেভেন বুলেটস দুর্দান্ত খেলে ফাইনালে শিল্ড জিতে নিল। আমরা যখন শিল্ড নিয়ে নাচানাচি করছি, কালিদাস তখন ছলছল চোখে আমাদের দেখছে। আমি ওর কাছে যেতেই ধরা গলায় বলল, ‘এদের আনন্দে আমার পাপ নিশ্চয়ই ধুয়ে যাবে, তাই না?’
স্কুলের পড়া শেষ করার পরেই কালিদাস নামকরা একটা জুতো কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে গেল। চাকরি কেমন করত জানি না, কিন্তু খেলাধুলোর ব্যাপারে ওর উৎসাহে ভাটা পড়ল না। পাড়া-বেপাড়া সর্বত্র খেলার মাঠে ওকে দেখা যেত। কালিদাস নানা জায়গা থেকে ছেলেদের জোগাড় করে টিম করত, তাদের উৎসাহ দিত। আমাকে প্রায়ই বলত, ‘তেমন দুটো পা পাচ্ছি না রে, যা দিয়ে ঘেরা মাঠে ঝড় তোলা যায়। জংলাদার পর এ-তল্লাটে তেমন ছেলে হল না।'
পাড়ার সবাই যাকে জংলা বা জংলাদা বলে চিনত, কলকাতার মাঠে সে বিখ্যাত ছিল পি. দে অর্থাৎ পরিমল দে নামে। কালিদাস প্রায়ই তার বাড়িতে যেত। আমাদের অনেকেই যেমন গানের জলসা, সিনেমা এসব নিয়ে উৎসাহী ছিল, কালিদাসের তেমন উৎসাহ ছিল না। ওর উৎসাহ ফুটবলকে নিয়ে। খেলোয়াড়কে নিয়ে। আমরা একবার ওকে নিয়ে রাত্রির শো-তে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। আমাদের পাড়ারই হল। পাঁচ আনার টিকিট কেটে আমরা বসেছি সামনের সারিতে। আমাদের সামনে কয়েক হাত ফাঁকা জায়গা, তারপর স্টেজ এবং স্টেজের ওপর পরদা। কালিদাস খানিকক্ষণ দেখার পর সামনের ওই ফাঁকা জায়গাটায় গিয়ে শুয়ে পড়ল এবং একটু পরেই আমরা টের পেলাম কালিদাস ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমরা অর্থাৎ কালিদাসের বন্ধুরা সবাই মিলে ঠিক করলাম, ওকে একদম ডাকব না। ছবি শেষ হলে আস্তে আস্তে চলে যাব। কালিদাসকে ভেতরে রেখেই হয়তো গেটকিপার দরজা বন্ধ করে দেবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তা করা গেল না। কালিদাস ঘুমিয়ে পড়লে নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখত, আর ওকে নাকি বোবায় ধরত। বোবায় ধরা মানে বিশ্রী ব্যাপার। কেউ হয়তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে, তার ঘরে চোর ঢুকেছে। চোর সব চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। সে চিৎকার করে কাউকে ডাকতে চাইছে, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। তখন চিৎকার করে ‘চোর, চোর’ বলবার জন্য সে ছটফট করে আর অদ্ভুত একটা শব্দ গলা থেকে বের হয়। সে শব্দে চমকে উঠতে হয়। কালিদাসকে নাকি মাঝে মাঝে বোবায় ভর করত। তবে সে কথাটা আমাদের কারও মনে ছিল না। কালিদাস ঘুমোচ্ছে আর আমরা সিনেমা দেখছি। তখন পরদায় বড় মর্মান্তিক দৃশ্য ঘটতে চলেছে। ঝড়-জলের রাত্রে নায়িকার মা মারা যাচ্ছেন। কুলুঙ্গিতে মাটির প্রদীপ জ্বলছে। তখনকার দিনে নায়ক-নায়িকার বাবা-মা মারা যাওয়ার আগে তাঁদের ঘাড়সুদ্ধ মাথাটা বালিশ থেকে ওপরে উঠে আসত। খাবি খেতে খেতেও অনেক জরুরি কথা স্পষ্ট করে বলে যেতেন। মাথাটা উঁচু থেকে ধপ করে যেইমাত্র নীচে পড়ত, তখনই ঝমঝম করে একটা বাজনা বেজে উঠত, প্রদীপটা দপ করে নিভে গিয়ে ধোঁয়া বের হত আর করুণ সুরে বেহালা বাজানো হত, নয়তো তারস্বরে একটি গান। আমরা তখন খুব কম সিনেমা দেখলেও এগুলো জানতাম এবং বেশ ভালও লাগত। এইরকম একটা করুণ দৃশ্য যখন চলছে, নায়িকার মা যখন মরমর, হলসুদ্ধ দর্শক টানটান হয়ে বসে আছে, কেউ কেউ আঁচলে চোখ মুছছেন, সেই মোক্ষম সময়ে ঘুমন্ত কালিদাসকে বোবায় ধরল।
প্রথমে আমাদের মতো হলসুদ্ধ লোক ভাবল, অ্যাঁ-অ্যাঁ-ওঁ— এই বিকট আওয়াজটা বুঝি মৃত্যুপথযাত্রী নায়িকার মা’র গলা থেকে বের হচ্ছে। কিন্তু অ্যা অ্যা গোঙানিটা যখন ‘ওঁ ওঁ ওঁ’ হতে থাকল তখন কেউ কেউ ভয় পেয়ে সিটের ওপর পা তুলে বসল, কেউ কেউ চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘গেটকিপার, গেটকিপার, আলো জ্বালো!’ ওই চেঁচামেচির মধ্যে পেছন থেকে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, ‘হলের মধ্যে মার্ডার হচ্ছে! পুলিশ, পুলিশ।'
ছবি বন্ধ করে দিয়ে আলো জ্বেলে দিতে হল। আমরা গিয়ে কালিদাসকে ধাক্কা দিতে লাগলাম। ওপরের ব্যালকনি থেকে কেউ কেউ চিৎকার করছে, ‘অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যান।' কেউ জানতে চাইছে বেঁচে আছে কি না।
যাকে নিয়ে এত কাণ্ড সেই কালিদাস ঘুম থেকে ধড়ফড় করে উঠে বসে বলল, ‘ছবি শেষ হয়নি? তা হলে আবার ঘুমোই।'
কিন্তু আমরা ওকে ঘুমোতে দিলাম না। শুধু আমরা নয়, হলের দরোয়ান, গেটকিপার কেউই ওকে আর ঘুমোতে দিতে রাজি নয়। প্রায় আট-দশ মিনিট পরে আবার ছবি শুরু হল।
গত দশ-বারো বছরের কথা বাদ দিলে কালিদাসকে নিয়ে কখনওই কোনও কাজ নির্বিঘ্নে শেষ হয়নি। একটা-না-একটা কিছু ঘটনা ওর দ্বারা ঘটবেই। কিন্তু কালিদাসের স্কুলজীবনের দুটি ঘটনার কথা এখনই বলে নেওয়া দরকার। ফুটবল ছাড়া কালিদাসের আগ্রহ ছিল নাটকে। পাড়ার কোনও নাটকে ছোটখাটো একটা পার্ট করার জন্য সে হত্যে দিয়ে বসে থাকত। কিন্তু স্টেজে উঠে ও যে কখন কী করে বসবে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকত বলে কেউ ওকে একটা মৃত সৈনিকের পার্টও দিতে চাইত না। কিন্তু ওকে আটকে রাখাও তো শক্ত। সেবার পুজোর আগে পাড়ার ছেলেরা মিলে ‘দাতাকৰ্ণ’ নাটক অভিনয় করবে বলে ঠিক হল। অনেক তদ্বির-তদারকির পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, কালিদাসকে ‘বৃষকেতু’-র ভূমিকা দেওয়া হবে। দাতাকর্ণের ছেলে। মাত্র একটি দৃশ্যে তাকে দেখা যাবে। কিন্তু নাটকের মহলা দিতে এসে সত্য ভট্টাচার্য বেঁকে বসলেন। বললেন, 'ওই কেলে হবে আমার ছেলে। আমি পার্ট করব না।'
আমরা সবাই মিলে সত্যদাকে বোঝালাম। স্বয়ং পরিচালক বললেন, ‘সত্য, সহিষ্ণুতা বড় আর্টিস্টের লক্ষণ। মাত্র তো একটা দৃশ্য। মেনে নাও।'
অগত্যা রাজি হলেন। কিন্তু আমরা লক্ষ করতাম, সত্যদা মহলায় কালিদাসকে বড্ড তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন। কখনও বলতেন, ‘অ্যাই, যা তো সিগারেট নিয়ে আয়।' কখনও বলতেন, ‘পিঠটা চুলকে দে।'
বৃষকেতুর পার্টের লোভে কালিদাস সব সহ্য করে যেত। কিন্তু মহলাঘরে কালিদাসের ওপর কর্ণরূপী সত্যদা যত অত্যাচার করেছেন কালিদাস তার শোধ তুলল অভিনয়ের দিন। ব্রাহ্মণবেশে নারায়ণ এসেছেন কর্ণের দানশীলতা পরীক্ষা করার জন্য। ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ বলবেন, ‘তুমি আর তোমার স্ত্রী পদ্মা যদি নিজ হাতে তোমার পুত্র বৃষকেতু-কে কেটে তার মাংস রন্ধন করে দিতে পারো, তা হলে আমি খেতে পারি।'
বিচলিত কর্ণ বলবেন, ‘হে ব্রাহ্মণ, আপনি অন্য কোনও আহার্য আনার আদেশ দিন। জগতের শ্রেষ্ঠতম আহার্য আপনার চরণে নিবেদন করব।'
ব্রাহ্মণ ক্রোধ দেখিয়ে বলবেন, ‘হে সুতপুত্ৰ কৰ্ণ, তুমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছ আমি যে খাদ্য চাইব তুমি তাই দেবে। যদি আমার বাঞ্ছিত খাদ্য না দাও তা হলে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ে তুমি নরকগামী হবে। তোমার সর্বনাশ হবে। ব্রাহ্মণের ক্রোধে তুমি শাপগ্রস্ত হয়ে নরকযন্ত্রণা ভোগ করবে।'
ঠিক তখনই বৃষকেতু সেজে কালিদাস মঞ্চে এসে বলবে, ‘পিতা, দ্বিধা কেন। আপনি প্রতিশ্রুতি পালন করে আমার জীবন ধন্য করুন। আপনি হাস্যমুখে বৃষকেতুকে দ্বিখণ্ডিত করুন।'
আমাদের পরিচালকের নির্দেশ ছিল কালিদাস ‘দ্বিখণ্ডিত করুন' কথাটা বলেই কর্ণের সামনে দু’হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে যাবে।
কর্ণ আবেগকম্পিত গলায় ডাকবেন, ‘পুত্র, হে প্রাণাধিক পুত্র আমার।' বৃষকেতুও গলায় আবেগ নিয়ে বলবে, ‘পিতা, আপনি কর্তব্য পালন করুন।'
যেমন মহলা হয়েছিল ঠিক তেমনভাবেই কালিদাস দু’দিকে দু’হাত বিস্তার করে ‘আমাকে দ্বিখণ্ডিত করুন’ বলে হাঁটু গেড়ে বসে গেল এবং বসেই সত্যদার পা জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল, ‘পিতা, কিঁউ রুখ গয়া, মুঝে দ্বিখণ্ডিত করে দাও।'
সত্যদা প্রথমে ঘাবড়ে গেলেন। পরে সামলে নিয়ে কালিদাসকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে করতে বললেন, ‘উঠে আয় পুত্র আমার।'
কালিদাস শক্ত করে পা জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল, 'আমার স্থান তব চরণতলে। আমি উঠতে পারি না।’
উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে প্রমট্ করছিলেন সমীরদা। তিনি তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে বললেন, ‘এসব কী হচ্ছে? ফালতু ডায়লগ আসছে কোত্থেকে?’
আমরা বেশ বুঝতে পারছি কালিদাস আবার একটা অঘটন ঘটাতে চলেছে। সত্যদার পরনের পোশাক ধরে টানাটানি শুরু করেছে। সত্যদা পোশাক সামলাতে সামলাতে হঠাৎ ‘ওরে বাবা রে, আমায় মেরে ফেললে’ বলে স্টেজের ওপরেই প্রাণাধিক পুত্র বৃষকেতুকে গদাম করে একটা লাথি কষিয়ে দিয়ে কাতরাতে লাগলেন। আর লাথি খেয়ে কালিদাস ঠিক কোলাব্যাঙের মতো থপ করে ছিটকে এসে পড়ল স্টেজের বাইরে, একেবারে দর্শকদের মধ্যে।
বাধ্য হয়েই পরদা ফেলে দিতে হল। কর্ণের অবস্থা তখন খুবই কাহিল। কুরুক্ষেত্রে তাঁর রথের চাকা যখন মাটিতে আটকে গিয়েছিল তখন তাঁকে কতটা কাহিল দেখাচ্ছিল জানি না, কিন্তু স্টেজের ওপর পুত্র বৃষকেতু সেজে কালিদাস ‘পিতা, পিতা’ বলতে বলতে সত্যদার হাঁটুতে এমন কামড়ে দিয়েছে যে, রক্ত ঝরছে। নাটক আর হবে কোত্থেকে? কর্ণকে তখন টিটেনাস দেওয়া হবে কি না তাই নিয়ে ডাক্তারবাবু ডাকতে হচ্ছে। প্রায় দিন পনেরো স্টেজের কর্ণকে নাকানিচোবানি খাইয়ে ছেড়েছিল কালিদাস।
কালিদাসের শেষ মঞ্চাভিনয় দক্ষিণপল্লীর ‘দুর্গাদাস’ নাটকে। আমরা খবর পেলাম কলকাতা থেকে কমলবাবু বলে এক ভদ্রলোক সম্প্রতি এসে দক্ষিণ পল্লীতে বসবাস করছেন। তিনি নাকি কলকাতার নাট্যজগৎ এবং চলচ্চিত্র জগতের একজন কেউকেটা। তাবড় তাবড় শিল্পীদের তিনি ডেকে থাকেন ডাকনামে। সুচিত্রা সেনকে ‘রমা’, উত্তমকুমারকে শুধু ‘উত্তম’, অসিতবরণকে ‘কালো’, জহর গাঙ্গুলিকে ‘সুলাল’। তাঁর কথাবার্তা শুনে আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তিনি বিস্তর ছেলেটেলে জুটিয়ে পঞ্চ অঙ্কের দুর্গাদাস নাটক শুরু করে দিলেন। কালিদাস ব্যস্ত ছিল খেলা নিয়ে। কিন্তু এরকম একটা খবর শোনার পর ওর পক্ষে স্থির থাকা সম্ভব নয়। কালিদাস আমাকে নিয়ে সকালবেলা কমলবাবুর বাড়িতে গিয়ে হাজির। কমলবাবু ঘন ঘন চা খেতেন, আর কোনও কথা শুরু করার আগে খুক খুক করে কেশে নিতেন। ওই খুক খুক কাশি শুনলেই আমরা বুঝে যেতাম কমলদা এবার কথা শুরু করতে চলেছেন।
কালিদাসের কথা শুনে কমলদা প্রথমে খুক খুক করে কাশলেন, তারপর বললেন, ‘আমি তো ডেকে ডেকে ছেলেদের এনেছি। এতদিন তুমি কোথায় ছিলে? এখন তো আর পার্ট নেই।'
কমলদার নেতৃত্বে যারা অভিনয় করছিল, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আবার কালিদাসের ‘সেভেন বুলেট্স’ দলের খেলোয়াড়। কেউ কেউ ওই দলে খেলবার জন্য ওকে খোশামোদও করত। তাদেরও ইচ্ছে কালিদাস থাকুক। আমাদের সকলের অনুরোধের পর কমলদা খুক খুক করে কেশে নিয়ে বললেন, ‘একটা ক্যারেকটার আছে, তবে সেটা আমি বাদ দিয়েছিলাম। তুমি রাজি থাকলে ওই ক্যারেকটারটা রাখতে পারি। কিন্তু তুমি কি নাচতে পারো?’
কালিদাস উত্তর দিল, ‘নিশ্চয়ই পারি।’
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘নাচতে হবে কেন?’
কমলদা বললেন, ‘মোগলদের যুদ্ধশিবিরে একটা নাচের দৃশ্য আছে। একজন ইরানি নর্তকী লাগবে। নাচের ছেলে পাচ্ছি না ভেবে ওটা বাদ দিয়েছিলাম। তুমি যদি নাচতে পারো, তাহলে...'
কালিদাস কমলদাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠল, ‘আমি তো অনেককাল নাচ শিখেছি। ওই নর্তকীর রোলটা আমায় দিন। আমিই নেচে দেব। আপনি আমাদের গ্রামে এসে একজন নাচিয়ের অভাবে দৃশ্য বাদ দেবেন এটা হতে পারে না।'
অভিনয়ের দিন কালিদাস আমায় এসে বলল, ‘আমার নাচের সঙ্গে তুই হারমোনিয়াম বাজিয়ে দিস।'
আমি বললাম, ‘আমি বাজাব কী রে! আমি তো বাজাতেই পারি না।'
কালিদাস বলল, ‘তুই সব কটা রিড খালি চেপে যাবি। আওয়াজ হলেই চলবে। বাকিটা আমি ম্যানেজ করে নেব।'
কালিদাসের নাচের দৃশ্যটা ছিল তিনজন মোগল সৈনিক কিংবা প্রধান সৈনিক বা ওইরকম গোছের লোকদের সামনে নাচ। যুদ্ধের কথাবার্তার পর একজন সৈনিক হাঁক দেবে, ‘নর্তকী, শরবত নিয়ে এসো।'
তখন নর্তকী শরবতের গ্লাস নিয়ে আসবে নাচতে শুরু করবে। যে তিনজন সৈনিকের পার্ট করছিল কালিদাস তাদের বোঝাল, দৃশ্যটা ভাল করতে হলে তোরা অন্তত তিন বোতল ভিমটো কিনে আনিস। ওটাই আমি ঢেলে দেব আর তোরা শরবতের মতো খেতে খেতে নাচ দেখবি আর বলবি, 'বহুত আচ্ছা, বহুত আচ্ছা।'
কলকাতা থেকে সাজাবার লোক এনেছিলেন কমলদা। কিন্তু কালিদাসকে ইরানি নর্তকী সাজাবার বহু চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে মেকআপম্যান বললেন, ‘ও কমলদা, একে যে কিছুতেই ফরসা করতে পারছি না। যত টিউব-পেন্ট লাগাচ্ছি ততই ওর গায়ের কালো রং ফুটে বেরুচ্ছে। ইরানিরা তো ফরসা হয়।'
কমলদা খুক খুক করে কেশে নিয়ে বললেন, ‘ওরে বাবারে, এ যে ছাইমাখা মাগুরমাছ হয়ে গেছে। ঠিক আছে, ওকে কাফ্রি-বালিকা করে দাও। ডাকবার সময় নর্তকী না বলে ডাকবে কাফ্রি বালিকা’
আধঘণ্টার মধ্যেই কালিদাস কাফ্রি বালিকা হয়ে গেল। সামনে দুটো লম্বা বিনুনি, গায়ে নীল রঙের ছোপ ছোপ কামিজ, পরনে পা-চাপা পাজামা। পোশাকটা ঠিক সালোয়ার-কামিজ ধরনের। কত্থক নাচে যেমন পোশাক পরে তার কাছাকাছি ধরনের পোশাক। আমরাই কালিদাসকে চিনতে পারছি না। মোগল সৈনিকরা সত্যি সত্যি তিন বোতল ভিমটো কিনে আনল। কালিদাস বলল, ‘এগুলো কাফ্রি বালিকা, মানে আমার জিম্মায় থাক। আমাকেই তো নিয়ে ঢুকতে হবে।'
প্রায় রাত সাড়ে ন'টায় কালিদাসের নাচের দৃশ্যটা এল। তিন সৈনিক তখন মঞ্চে। একজন হাঁকল, ‘কাফ্রি বালিকা, ঠান্ডা লে আও।'
কালিদাস তখন তিনটে ভিমটোর বোতল খুলে একটা আমাকে দিয়েছে। বাকি দুটো নিয়েছে একটা ট্রে-তে। সঙ্গে তিনটে চায়ের কাপ। আমি তো হারমোনিয়মের রিড এ-প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত টিপে যাচ্ছি। কালিদাস মঞ্চে ঢুকেই ফাঁকা কাপ তিনটে তিনজনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নাচতে শুরু করে দিয়েছে। এক পাক করে নাচে আর বোতল থেকে ঢক ঢক করে ভিমটো খায়। যাদের পয়সায় ভিমটো কেনা হয়েছে সেই তিনজন ফাঁকা কাপে চুমুক দিচ্ছে আর রাগের চোখে কালিদাসের দিকে তাকাচ্ছে। কালিদাস কিন্তু কারও দিকে তাকাচ্ছে না। কিন্তু ও যে কী নাচছে সেটা বলা শক্ত। ট্রে নামিয়ে দু’হাতে দুটো ভিমটোর বোতল। অষ্টমীপুজোর ধুনুচি নাচের মতো একটু নাচছে আর ভিমটো খাচ্ছে। সৈনিকরা থাকতে না পেরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কালিদাস ‘চোপরও সৈনিক’ বলে তাদের এক ধমকে থামিয়ে দিয়ে বিপুল বেগে নাচতে আরম্ভ করল। নাচতে নাচতে এমনভাবে হাত-পা ছুড়তে লাগল যে মোগল সৈনিকরা ভয়ে চেয়ার ছেড়ে উলটোদিকের উইংসের কাছে সিঁটিয়ে গেল। কালিদাস কাউকে কনুই দিয়ে পেটে খোঁচা মারল, কাউকে পা দিয়ে লাথি চালাল, কাউকে বা ধাক্কা দিল। যেই না ভিমটো শেষ হল তৎক্ষণাৎ ছুটে গিয়ে একজন সৈনিকের কোমর থেকে তঁলোয়ার টেনে বের করে মঞ্চের ওপর শুরু করল অসি-নৃত্য। ওর এই তাণ্ডব শেষ হল মিনিটদশেক পরে। দর্শকরা খুব হাততালি দিল। কমলদা খুক খুক করে কাশতে কাশতে বললেন, ‘ওয়েল ডান, দারুণ নেচেছে। আমার প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল তোমার পায়ে কাজ আছে।'
কালিদাস বলল, ‘নাচের মিউজিক কেমন হয়েছে?’
কমলদা আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘দারুণ বাজিয়েছ। তোমার আঙুলে জাদু আছে। অসি-নৃত্যের সময় মনে হচ্ছিল যেন একখানা হারমোনিয়মেই তুমি ঝড় তুলে দিয়েছ। যুদ্ধের দৃশ্যে তুমিই মিউজিক দিয়ো।'
আমাকে অবশ্য আর বাজাতে হয়নি। যার হারমোনিয়ম তিনি আমার বাজনার পর হারমোনিয়মের রিডের অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন এবং ‘পাষণ্ড, অসুর’ ইত্যাদি বলে আমার দিকে ধেয়ে এসেছিলেন মারবেন বলে।
ওদিকে তখন অন্য কাণ্ড ঘটতে চলেছে। নিজেদের মেকআপ তুলেই তিন মোগল সৈন্য কালিদাসকে মারবে বলে তাড়া করেছে। কালিদাস ব্যাপারটা আগেই অনুমান করতে পেরেছিল বলে নিজের মেকআপ আর পোশাক নিয়েই বাড়ির দিকে দৌড়তে আরম্ভ করল। অর্থাৎ ওই কাফ্রি-বালিকার সাজেই কালিদাস দৌড় লাগাল। তার পিছন পিছন আমাদেরই পরিচিত তিন বন্ধু, তারা মোগল সৈন্য সেজেছিল।
আমাদের পাড়ায় তখন বিজলিবাতি এসে গেলেও সব বাড়িতে বিদ্যুতের লাইন নেওয়া হয়নি। যেমন আমাদের বাড়ি কালিদাসদের বাড়ি এবং এরকম আরও কিছু বাড়িতে তখনও হ্যারিকেন জ্বলে। কালিদাস ছুটতে ছুটতে নিজের বাড়িতে আসছিল বটে, কিন্তু ওর বাড়িটাও তো সব সময় ওর পক্ষে নিরাপদ ছিল না। সেদিনই আমাদের স্কুলের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। কালিদাস অঙ্কে আর ইংরেজিতে ফেল। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে কালিদাসের বাবা সেই রেজাল্ট দেখে ভীষণ খেপে গেলেন। একটি মোটা ডাঁটওলা পাখা নিয়ে প্রথমে বারান্দায় পায়চারি করলেন, তারপর রাত বেড়ে যেতে দরজা ভেজিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগলেন। ভাবখানা এমনই যে, যত রাতেই কালিদাস নাটক দেখে ফিরুক এই পাখার ডাঁট তার পিঠে না ভাঙা পর্যন্ত তাঁর শান্তি নেই। কালিদাস যে নাটকে কাফ্রি বালিকা সেজে নাচছে সে-খবর তার বাড়ির কেউ জানত না। তাড়া খেয়ে কালিদাস ছুটে এসে ঢুকে পড়ল নিজের বাড়িতে এবং ঘরে ঢুকেই একেবারে পিতৃদেবের মুখোমুখি। তাঁর হাতে মোটা ডাঁটওলা সেই পাখাটি যার সঙ্গে কালিদাসের পিঠের ইতিপূর্বেই কয়েকবার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। কালিদাস তো নিজেকে দেখতে পাচ্ছে না, সে দেখছে তার বাবাকে। আর বাবা দেখছেন রাত সাড়ে দশটা নাগাদ তাঁর ঘরের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়েছে বিচিত্র সাজে এক অপরিচিতা বালিকা। বাবা জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কে মা? কোত্থেকে এসেছেন?'
কালিদাস বলে উঠল, ‘বাবা আমি।'
কালিদাসের বাবা ডাকলেন কালিদাসের মাকে। বললেন, ‘এই যে দ্যাখো তো, কে একটি মেয়ে এসে বাবা বাবা করছে। একে চেনো?’
কালিদাসের মা ভাল করে দেখতে দেখতে বললেন, 'তুমি কে? তোমায় তো চিনতে পারছি না।'
কালিদাস তখন চিৎকার করে বলে উঠল, ‘আমি তোমাদের ছেলে কালিদাস।' কালিদাসের মা ভয় পেয়ে বলে উঠলেন, ‘তোর এই দশা কে করেছে?’
কালিদাস বেশ গর্বের সঙ্গে বলল, ‘আমি নাটকে কাফ্রি বালিকা সেজেছি। সবাই খুব হাততালি দিয়েছে আমার নাচ দেখে।'
কালিদাসের বাবা কাফ্রি বালিকার মুখটি চশমা লাগিয়ে ভাল করে দেখতে দেখতে যেইমাত্র টের পেলেন এটি তাঁর ছেলে, তখনই দুম করে পিঠে পাখার ডাঁট দিয়ে এক ঘা মেরেই বললেন, ‘তোকে কাফ্রি বালিকা সাজাচ্ছি। পড়তে বোস। এখনই দশটা অঙ্ক করে আমায় দেখাতে হবে।
কালিদাসকে কান ধরে হ্যারিকেনের সামনে বসিয়ে দেওয়া হল অঙ্ক কষতে। বুকের ওপর বিনুনি ঝুলিয়ে কালিদাস সত্যি সত্যি অঙ্ক করতে বসে গেল। যে তিনজন অন্যায়ভাবে ভিমটো খাওয়া এবং মঞ্চে পদাঘাত করার জন্য কালিদাসকে তাড়া করেছিল তারা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এইসব কাণ্ড দেখে ফিরে গেল।
পরদিন খুব সকালে উঠে ওই পোশাকেই কালিদাস বেরিয়ে পড়ল। ওকে যে দ্যাখে সেই অবাক হয়ে যায়। কেউ কেউ তো চিনতেই পারল না।
কালিদাসের বাবা যখন অফিস বের হচ্ছেন তখন বাড়ি খুঁজে খুঁজে কমলবাবু এসে হাজির। কলকাতার ভাড়া করা ড্রেসের একটির হিসেব মিলছে না। কাফ্রি বালিকার পোশাক এবং চুল পাওয়া যাচ্ছে না। কালিদাসের বাবা বিরক্ত হয়ে ধর্মক লাগাতেই কমলবাবু চলে যেতে বাধ্য হলেন। ওই ড্রেসটি কালিদাসের কাছে অনেক দিন থেকে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে ওই পোশাকেই সে খেলার মাঠের লাইনসম্যান হত। চুলটা অবশ্য ফেরত দিয়ে দিয়েছিল।
‘দুর্গাদাস’ নাটকে কাফ্রি বালিকা সাজার পর, যতদূর জানি কালিদাস আর কখনও মঞ্চে নামেনি অথবা নামতে দেওয়া হয়নি। তারপর থেকে খেলাই ওর ধ্যান-জ্ঞান, ইহকাল-পরকাল হয়ে গেল। নানা পাড়ায় খালি ছেলে খুঁজে বেড়াত, যাকে দিয়ে একদিন কলকাতার ঘেরামাঠে খেলানো যায়। ফুটবল নিয়ে কালিদাস সত্যিই স্বপ্ন দেখত। আমরা একটু-আধটু খেলতে পারলেও ওর মতো সর্বস্ব দিয়ে ফুটবলকে ভালবাসতে পারিনি। কালিদাস তখন সবেমাত্র জুতো কোম্পানির চাকরিতে ঢুকেছে। একদিন উত্তেজিত হয়ে এসে বলল, ‘পেয়েছি। দু’জোড়া পা পেয়েছি। ওরা গ্রামের নাম রাখবে।' আমি
বললাম, ‘কে?’
কালিদাস বলল, ‘বাবন আর পিন্টু। দেখিস ওরা কলকাতার মাঠ ফাটাবে।'
কালিদাস বাবন আর পিন্টুকে নিয়ে মেতে রইল। আমিও তখন চাকরি, সংসার ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত। কালিদাসই জোর করে ওদের খেলা দেখাতে কলকাতার মাঠে নিয়ে যেত। কালিদাস অবশ্য তার কথা রেখেছিল। বাবন, অর্থাৎ চিন্ময় চ্যাটার্জি এক সময় রাইট ব্যাক হিসেবে কলকাতার সবক'টা বড় টিমে খেলেছেন, ইন্ডিয়ার জার্সিও গায়ে চাপিয়েছেন। পিন্টুকে মাঠের সবাই জানত রঞ্জিত মুখার্জি বলে। লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মানই শুধু নয়, একজন ভাল স্ট্রাইকার হিসেবেও তাঁর নামডাক ছিল। স্বদেশ পেরিয়ে বিদেশের মাঠেও খেলেছেন রঞ্জিত। ফুটবল সিজনে একসময় বড় বড় ক্লাবের কর্মকর্তাদের গাড়ি এসে দাঁড়াত কালিদাসের বাড়ির সামনে। কালিদাসের হাতে কিছু নামকরা খেলোয়াড় ছিলেন, যাঁরা কালিদাস যে দলে বলবে সেই দলে সই করবেন। সেজন্যই কালিদাসের এত খাতির ছিল।
কালিদাস এখন কলকাতার প্রথম ডিভিশনের একটা ক্লাবের ফুটবল সম্পাদক। আই এফ এ-র গভর্নিং বডিরও সদস্য।
কিন্তু আশ্চর্য, আমরা সবাই কম-বেশি বদলে গেছি। সময় আর সমস্যা আমাদের বদলে দিয়েছে, কিন্তু কালিদাস একচুলও বদলায়নি। বিশ বছর আগে যে চেহারা ছিল এখনও সেই চেহারা। এমনকী, প্রথম যেদিন চাকরিতে ঢুকেছিল সেদিন ওর যা ওজন ছিল আজ পঁচিশ বছর পরও ওর সেই একই ওজন। একশো গ্রামও বাড়েনি অথবা কমেনি। বিয়ে, সংসার, বাবুগিরি, ছুটিতে কোথাও বেড়াতে যাওয়া কোনও কিছুতেই ওর আগ্রহ বা উৎসাহ নেই। কিন্তু ফুটবলের নাম শুনলে ওই লিকলিকে শরীরে যেন হাতির বল ফিরে পায় কালিদাস। ভাল পোশাক-আশাকের বিলাসিতাতেও ওর নজর নেই। কিন্তু মাঠে নামবার আগে কারও বুটে ময়লা দেখলে, কারও জার্সি কোঁচকানো থাকলে কালিদাস ভয়ংকর রেগে যেত।
কয়েকদিন আগে কালিদাসের সঙ্গে দেখা হল। ও আমাকে ‘গুরুজি’ বলে ডাকে। ওকে প্রথম ফুটবল খেলার সুযোগ দিয়েছিলাম এবং আমারই তদারকিতে ও প্রথম মঞ্চে নেমেছিল বলে সেই কৃতজ্ঞতা থেকে গুরুজি বলে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে মিশনের মাঠে এলাম। কালিদাস ঘাসের ওপর চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। ওর চোখ বন্ধ। গোটা আকাশ জুড়ে অজস্র তারার বিন্দু জ্বলছে। নিঃশব্দে একটা প্লেন উড়ে যাচ্ছে আকাশ দিয়ে। তার পাখায় জ্বলছে আলো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ফুটবল নিয়ে যে এত মেতে থাকিস, কিন্তু ফুটবল তোকে কী দিল?’ কালিদাস অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর উত্তর দিল, ‘ওভাবে কখনও ভেবে দেখিনি। আমি নিজে তো খেলতে পারি না। আমি তো কিছুই পারি না। কিন্তু যারা পারে আমি তাদের পাশে পাশে থাকতে চাই। ছেলে যেমন মা'র কাছে কাছে থাকতে চায় আমিও তেমনই ফুটবলের কাছে কাছে থাকতে চাই। কিন্তু...’
কালিদাস থেমে গেল। থমথমে গলায় বলল, ‘বড় দুঃখ হয় রে! কলকাতার ফুটবল কোথায় নেমে যাচ্ছে। শহরতলি থেকে খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। কেবল দল আর দলাদলি।’
আমি বললাম, ‘তুই এসব ছেড়ে দে। বিয়ে-থা করে সংসার কর।'
কালিদাস আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে মরে যাব। জানিস, আমি না স্বপ্ন দেখি, আমরা অলিম্পিকে যাচ্ছি। আমরা এশিয়াডে সোনা জিতছি। অন্য দেশগুলো সম্ভ্রমের চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। ভিকট্রি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে একজন গর্বিত ভারতীয় ফুটবলার। বিশ্বাস কর, সারা দেশ ঘুরে ঘুরে আমি সেই এগারোটা মুখ খুঁজি যাদের আমি স্বপ্নে দেখতে পাই। আমার স্বপ্নটা কি সত্যি হবে না রে?’
কালিদাসের গলায় একটা কান্নামেশানো হাহাকার ক্ষণিকের জন্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমি অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে এগারোটা তারাকে খুঁজতে লাগলাম।
.
আনন্দমেলা, পূজাবার্ষিকী ১৩৯৯
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন